আলফঁস দোদের গল্প
বৃদ্ধ দম্পতি
আলফঁস দোদে ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। ১৮৪০ সালে ফ্রান্সের নিম শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত আলফঁস দোদের রচনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রোভঁসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম। ‘আমার হাওয়া কলঘর থেকে লেখা চিঠিগুলো’ এবং ‘তারাসকঁ-এর তারতারাঁ’ তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। বিশেষ করে তাঁর ছোটগল্প ‘শেষ পাঠ’ বিশ্বসাহিত্যে এক অমর সৃষ্টি, যা দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার গুরুত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ফরাসি সাহিত্যে স্বাভাবিকতাবাদ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তাঁর রচনাশৈলী ছিল অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি মানবিক ও গীতিধর্মী। ১৮৯৭ সালে তিনি পারীতে মৃত্যুবরণ করেন। এখানে তাঁর ‘বৃদ্ধ দম্পতি’ গল্পটি তুলে ধরা হলো।
গল্পটি অনুবাদ করেছেন আহমেদ সজীব
একটি চিঠি, বাবা আজান?
—হ্যাঁ, মহাশয়...পারী থেকে এসেছে।
পারী থেকে চিঠি এসেছে ভেবে বেচারা বাবা আজান বেশ গর্ব বোধ করছিলেন...কিন্তু আমার মোটেও সে রকম কিছু হয়নি। কিছু একটা আমাকে বলছিল যে রু জঁ-জাক থেকে আসা পারীর এই চিঠিটা সাতসকালে হঠাৎ টেবিলের ওপর আবির্ভূত হয়ে আমার পুরো দিনটাই মাটি করে দেবে। আর আমার আশঙ্কাই সত্যি হলো, নিজেই দেখো:
বন্ধু, তোমাকে আমার একটা উপকার করতে হবে। তুমি এক দিনের জন্য হলেও তোমার কলঘর বন্ধ করো এবং এখনই ‘এগিয়েরের উদ্দেশে রওনা দাও...’
এগিয়ের একটি বড় গ্রাম, তোমার ওখান থেকে মাত্র তিন-চার লিও* দূরে—একটা ছোটখাটো ভ্রমণের পথ। ওখানে পৌঁছেই তুমি ‘অনাথদের আশ্রম’ কোথায় জিজ্ঞেস করবে। ওই আশ্রমের ঠিক পরেই প্রথম যে নিচু বাড়িটা দেখবে, যার জানালাগুলো ধূসর রঙের আর পেছনে একটা ছোট বাগান আছে, সেটাই।
তুমি কড়া না নেড়ে সরাসরি ভেতরে ঢুকে যাবে—দরজা সব সময় খোলাই থাকে আর ভেতরে ঢুকেই বেশ জোরে হাক দেবে: ‘শুভ দিন, সুধীজন! আমি মরিসের বন্ধু...’ অমনি দেখবে, দুজন ছোটখাটো বুড়ো মানুষ—উফ্! সে কী বুড়ো, ভীষণ বুড়ো, একেবারে প্রাচীন—তাদের বড় বড় আরামকেদারা থেকে তোমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, তুমি আমার পক্ষ থেকে মন উজাড় করে তাঁদের জড়িয়ে ধরবে, ঠিক এমনভাবে যেন তাঁরা তোমারই আপনজন। তারপর তোমরা গল্প করবে; তাঁরা তোমার সঙ্গে কেবল আমার কথা বলবেন, শুধু আমার কথাই বলবেন; তাঁরা তোমাকে আমার হাজারটা পাগলামির গল্প শোনাবেন, তুমি কিন্তু না হেসে সব শুনবে...তুমি হাসবে না তো, ঠিক আছে?...তাঁরা আমার দাদা-দাদি, যাদের পুরো পৃথিবীটা আমাকে ঘিরেই, অথচ দশ বছর ধরে তাঁরা আমাকে দেখেননি...দশ বছর অনেক দীর্ঘ সময়! কিন্তু কী আর করা? আমি পারীতে আটকে আছি; আর তাঁদের বয়স হয়েছে অনেক...তাঁরা এতই বৃদ্ধ যে আমায় দেখতে আসতে গেলে পথেই হয়তো কোনো বিপদ ঘটিয়ে ফেলবেন। ভাগ্যিস তুমি ওখানে আছ, আমার প্রিয় বন্ধু! তোমাকে জড়িয়ে ধরে এই অসহায় মানুষগুলো ভাববেন যেন আমাকেই একটু জড়িয়ে ধরলেন...আমি তাঁদের কাছে আমাদের দুজনের এই বন্ধুত্বের গল্প এতবার করেছি যে...
বন্ধুত্বের নিকুচি করেছে! ঠিক সেই দিন সকালে আবহাওয়াটা ছিল চমৎকার, কিন্তু রাস্তায় ঘোরার জন্য মোটেও সুবিধের নয়: প্রোভঁসের প্রবল ঠান্ডা বাতাস বইছে আর কড়া রোদ, একদম খাঁটি প্রোভঁসের একটা দিন। যখন ওই অভিশপ্ত চিঠিটা এল, আমি ততক্ষণে দুটো পাহাড়ের খাঁজের মাঝে নিজের রোদ পোহানোর আস্তানা বেছে নিয়েছি; আমার ইচ্ছা ছিল সারা দিন টিকটিকির মতো সেখানে পড়ে থেকে আলো গিলব আর শুনব পাইনগাছের গান...কিন্তু কী আর করা? একরাশ বিরক্তি নিয়ে হাওয়া কলঘরটি বন্ধ করলাম, বিড়ালের যাতায়াতের পথের নিচে রাখলাম চাবিটা। তারপর লাঠি আর পাইপটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
বেলা দুটোর দিকে আমি এগিয়ের গ্রামে পৌঁছালাম। গ্রামটা জনমানবহীন, সবাই মাঠে চলে গেছে। ধুলোয় সাদা হয়ে যাওয়া রাস্তার ধারের গাছগুলোতে ঝিঁঝি পোকাগুলো এমনভাবে ডাকছিল যেন মনে হচ্ছিল আমি ‘ক্রাউ’–এর প্রান্তরে আছি। মিউনিসিপ্যাল অফিসের সামনের চত্বরে একটা গাধা রোদ পোহাচ্ছিল, আর গির্জার ঝরনার পাশে একঝাঁক পায়রা উড়ছিল; কিন্তু অনাথ আশ্রমটা দেখিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। ভাগ্যিস, হঠাৎ এক বৃদ্ধ পরির দেখা পেলাম; তিনি দরজার এক কোণে উবু হয়ে বসে সুতা কাটছিলেন। আমি তাঁকে জানালাম কী খুঁজছি; আর যেহেতু সেই পরী ছিলেন খুবই ক্ষমতাধর, তিনি কেবল তাঁর চরকাটি তুললেন: আর অমনি জাদুর মতো অনাথ আশ্রমটি আমার সামনে ভেসে উঠল...বাড়িটা ছিল প্রকাণ্ড, বিষণ্ণ আর অন্ধকার; খিলানওয়ালা ফটকের ওপরে লাল বেলেপাথরের একটা পুরোনো ক্রুশ আর তার চারপাশে খোদাই করা লাতিন লেখাগুলো বেশ মহিমার সঙ্গেই যেন ফুটেছিল। ওই বাড়ির ঠিক পাশেই আমি আরও ছোট একটি বাড়ি দেখতে পেলাম। ধূসর জানালা, আর পেছনে সেই বাগান...আমি তৎক্ষণাৎ চিনতে পারলাম এবং কড়া না নেড়েই ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
তুমি কড়া না নেড়ে সরাসরি ভেতরে ঢুকে যাবে—দরজা সব সময় খোলাই থাকে আর ভেতরে ঢুকেই বেশ জোরে হাঁক দেবে: ‘শুভ দিন, সুধীজন! আমি মরিসের বন্ধু...’ অমনি দেখবে, দুজন ছোটখাটো বুড়ো মানুষ—উফ্! সে কী বুড়ো, ভীষণ বুড়ো, একেবারে প্রাচীন
আমি সারা জীবন মনে রাখব সেই দীর্ঘ, শীতল আর শান্ত বারান্দাটির কথা; যার দেয়ালগুলো ছিল গোলাপি রঙে রাঙানো, হালকা রঙের পর্দার ওপার দিয়ে পেছনের সেই ছোট বাগানটি আবছা দেখা যাচ্ছিল, আর দেয়ালের প্রতিটি প্যানেলে আঁকা ছিল বিবর্ণ হয়ে আসা ফুল আর ভায়োলিনের ছবি। আমার মনে হচ্ছিল, আমি যেন সেই ‘সেদিন’–এর আমলের কোনো প্রাচীন বিচারকের বাড়িতে এসে হাজির হয়েছি...বারান্দার শেষ প্রান্তে, বাঁ দিকের একটা আধখোলা দরজা দিয়ে প্রকাণ্ড এক দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছিল; আর শোনা যাচ্ছিল একটি শিশুর কণ্ঠস্বর—তবে ঠিক যেন স্কুলের কোনো শিশু, যে প্রতিটি অক্ষর আলাদা করে উচ্চারণ করে পড়ছিল: ‘ত... খ... ন... স... ন্ত... ই... রে... নে... চি...ৎকার... ক... রে... ব... ল... লে... নে... আ... মি... প্র... ভু... র... শ... স্য... আমা... কে... এই... প... শু... দে... র... দাঁ... তে... পি... ষ্ট... হ... তে... ই... হ... বে...’
আমি নিঃশব্দে সেই দরজার কাছে এগিয়ে গেলাম এবং ভেতরে তাকালাম।
একটি ছোট ঘরের শান্ত আধো-আলোয়, গোলাপি গাল আর আঙুলের ডগা পর্যন্ত কুঁচকানো চামড়ার এক বয়স্ক ভদ্রলোক ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন; তাঁর মুখটি ছিল খোলা, আর হাত দুটো রাখা ছিল হাঁটুর ওপর। তাঁর পায়ের কাছে নীল পোশাক পরা এক ছোট্ট মেয়ে—কাঁধে বড় পেরেলিন (কেপ) আর মাথায় ছোট টুপি, যা অনাথ আশ্রমের মেয়েদের পোশাক—সে নিজের চেয়েও আকারে বড় একটি বই থেকে ‘সন্ত ইরেনের জীবনকথা’ পড়ছিল...এই অলৌকিক পাঠের প্রভাব যেন পুরো বাড়ির ওপর পড়েছিল। বৃদ্ধ তাঁর চেয়ারে ঘুমিয়ে ছিলেন, সিলিংয়ের মাছিগুলো স্থির হয়ে ছিল, আর জানালার ধারের খাঁচায় ক্যানারি পাখিগুলোও ছিল ঘুমে আচ্ছন্ন। বড় ঘড়িটা একঘেয়ে শব্দে টিক-টাক, টিক-টাক করে চলছিল। পুরো ঘরে জেগে ছিল কেবল একফালি দীর্ঘ আলো, যা বন্ধ জানালার ফাঁক দিয়ে সোজা ও সাদা হয়ে এসে পড়ছিল; সেই আলোর ভেতরে ছোট ছোট ধূলিকণাগুলো জীবন্ত স্ফুলিঙ্গের মতো আণুবীক্ষণিক নাচে মেতেছিল...চারদিকের এই তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবের মাঝেও শিশুটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তার পড়া চালিয়ে যাচ্ছিল: ‘ত...খ...নি... দু...টো... সি...ং...হ... তা...র... ও...প...র... ঝাঁ...পি...য়ে... প...ড়...ল... এ...বং... তা...কে... ছিঁ...ড়ে... খে...য়ে... ফে...ল...ল...’
ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম...সন্ত ইরেনের সিংহরাও যদি হঠাৎ ঘরের ভেতর তেড়ে আসত, তবে তারাও আমার চেয়ে অধিক বিস্ময় তৈরি করতে পারত না। একেবারে নাটকীয় এক কাণ্ড! ছোট মেয়েটা চিৎকার করে উঠল, সেই মোটা বইটা হাত থেকে পড়ে গেল; খাঁচার ক্যানারি পাখিগুলো আর মাছিগুলো জেগে উঠল, দেয়ালঘড়িটা বেজে উঠল, বৃদ্ধ লোকটা ভয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন; আর আমি নিজেও কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে দরজার চৌকাঠে থমকে দাঁড়ালাম এবং বেশ জোরে চিৎকার করে বললাম:
শুভেচ্ছা, সুধীজন! আমি মরিসের বন্ধু!
ওহ্! তখন যদি আপনারা তাকে দেখতেন—সেই বেচারা বৃদ্ধকে! যদি দেখতেন কীভাবে তিনি দুই হাত বাড়িয়ে আমার দিকে ছুটে এলেন, আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, আমার হাত দুটো চেপে ধরলেন; আর ঘরজুড়ে দিশাহারার মতো ছুটোছুটি করতে করতে বলতে লাগলেন:
হায়! ঈশ্বর, হায়! ঈশ্বর...
তাঁর মুখের প্রতিটি বলিরেখা যেন হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মুখটা লাল হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তিনি তোতলাতে তোতলাতে শুধু বলছিলেন:
আহ্! মহাশয়..আহ্! মহাশয়...
এরপর তিনি ঘরের ভেতরের দিকে এগিয়ে গেলেন আর ডাকতে লাগলেন:
মামেত! মামেত!
বেলা দুইটার দিকে আমি এগিয়ের গ্রামে পৌঁছালাম। গ্রামটা জনমানবহীন, সবাই মাঠে চলে গেছে। ধুলায় সাদা হয়ে যাওয়া রাস্তার ধারের গাছগুলোতে ঝিঁঝি পোকাগুলো এমনভাবে ডাকছিল, যেন মনে হচ্ছিল আমি ‘ক্রাউ’–এর প্রান্তরে আছি।
একটি দরজা খোলার শব্দ হলো, বারান্দায় ইঁদুরের পায়ের শব্দের মতো খুটখাট শব্দ... তিনি মামেত। তাঁর মতো সুন্দর আর কেউ হয় না; সেই ছোট্ট বৃদ্ধা, মাথায় তাঁর ভাঁজ করা উঁচু টুপি, পরনে খয়েরি রঙের গাউন, আর হাতে একটি নকশা করা রুমাল, যা তিনি ধরেছিলেন স্রেফ আমাকে সম্মান জানানোর জন্য, ঠিক সেই পুরোনো আমলের কায়দায়... এক অদ্ভুত মায়ার দৃশ্য! তাঁরা দুজনে দেখতে ঠিক একই রকম ছিলেন। মাথায় ওই হলুদ টুপির ভাঁজগুলো থাকলে তাঁকেও (বৃদ্ধকে) মামেত বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। তফাত শুধু এটুকুই যে আসল মামেত নিশ্চয়ই জীবনে অনেক বেশি কেঁদেছেন, তাই তাঁর মুখে বয়ে চলেছে ওই বৃদ্ধের চেয়েও বেশি বলিরেখা। ঠিক বৃদ্ধের মতোই তাঁর পাশেও অনাথ আশ্রমের একটি ছোট মেয়ে ছিল—নীল রঙের কেপ পরা এক খুদে দেহরক্ষী, যে এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে ছেড়ে যায় না; আর অনাথ বালিকাদের আশ্রয়ে থাকা এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী এক দৃশ্য।
ঘরে ঢুকেই মামেত আমাকে একটি দীর্ঘ অভিবাদন জানাতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু বৃদ্ধ তাঁর সেই অভিবাদন মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে কেবল একটি কথাই বললেন:
এটা হলো মরিসের বন্ধু...
অমনি দেখুন দেখি কী কাণ্ড! তিনি কাঁপতে শুরু করলেন, কাঁদতে লাগলেন, হাতের রুমালটি কোথায় পড়ে গেল তার খেয়াল নেই; তাঁর মুখটা লাল হয়ে উঠল—একদম টকটকে লাল, বৃদ্ধের চেয়েও বেশি লাল...এই বয়স্ক মানুষগুলো! এদের শিরায় হয়তো মাত্র আর এক ফোঁটা রক্ত অবশিষ্ট আছে, কিন্তু সামান্যতম আবেগেই সেই রক্তটুকু ছলকে মুখে এসে লাগে...
‘তাড়াতাড়ি, তাড়াতাড়ি, একটা চেয়ার নিয়ে আসো...’ বৃদ্ধা তার সঙ্গে থাকা ছোট মেয়েটিকে বললেন।
—‘জানলার পাল্লাগুলো খুলে দাও...’ বৃদ্ধ চিৎকার করে বললেন।
তারপর তাঁরা দুজনে আমার দুহাত ধরে প্রায় দৌড়ানোর ভঙ্গিতে জানলার কাছে নিয়ে গেলেন; আমাকে ভালো করে দেখার জন্য জানলাটা পুরো খুলে দেওয়া হলো। আরামকেদারাগুলো কাছে টেনে আনা হলো, আর আমি একটা ফোল্ডিং চেয়ারে সেই দুজনের মাঝখানে বসলাম। নীল পোশাক পরা ছোট মেয়ে দুটি আমাদের পেছনে দাঁড়াল, আর শুরু হলো একগাদা প্রশ্ন:
‘সে কেমন আছে? সে কী করে? কেন সে আসে না? সে কি ওখানে সুখে আছে?...’
এই কথা! সেই কথা! ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলল সেই আলাপ।
আমিও আমার সাধ্যমতো তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলাম। আমার বন্ধু সম্পর্কে যা যা জানতাম, তা বিস্তারিত জানালাম, আর যা জানতাম না—সেগুলো নির্লজ্জের মতো বানিয়ে বানিয়ে বলে যাচ্ছিলাম। আমি বিশেষ করে এই তথ্যটা গোপন রাখলাম যে ওর ঘরের জানালাগুলো ঠিকঠাক বন্ধ হয় কি না বা ওর ঘরের দেয়াল কাগজের রং কী, তা আমি কক্ষনো খেয়াল করিনি।
‘ওর ঘরের দেয়ালের কাগজ নীল রঙের, ম্যাডাম; হালকা নীল, সঙ্গে ছোট ছোট মালা আঁকা...’
—‘তাই নাকি?’ বেচারি বৃদ্ধা আবেগপ্রবণ হয়ে বলে উঠলেন; তারপর তাঁর স্বামীর দিকে তাকিয়ে যোগ করলেন: ‘ও সত্যি খুব লক্ষ্মী ছেলে!’
—‘ওহ! হ্যাঁ, ও সত্যিই একটা চমৎকার ছেলে!’ অন্যজনও বেশ উৎসাহের সঙ্গে সায় দিলেন।
আমি যখন কথা বলছিলাম, পুরোটা সময় তারা একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছিলেন, মিটিমিটি হাসছিলেন, চোখ টিপছিলেন আর এমন একটা ভাব করছিলেন যেন সব বুঝতে পারছেন। মাঝেমধ্যে বৃদ্ধ আমার কাছে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলছিলেন:
‘আরেকটু জোরে কথা বলুন...ও একটু কানে কম শোনে।’
আবার ওদিকে বৃদ্ধাও:
দয়া করে আর একটু জোরে বলবেন কি!...উনি তেমন একটা ভালো শুনতে পান না...
ঠিক সেই মুহূর্তেই আমি ভেতরে প্রবেশ করলাম...সন্ত ইরেনের সিংহরাও যদি হঠাৎ ঘরের ভেতর তেড়ে আসত, তবে তারাও আমার চেয়ে অধিক বিস্ময় তৈরি করতে পারত না। একেবারে নাটকীয় এক কাণ্ড!
তখন আমি আরও গলা চড়িয়ে কথা বলতে লাগলাম—আর তারা দুজনেই হাসিমুখে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন। সেই ম্লান হাসি নিয়ে তারা আমার দিকে ঝুঁকে পড়লেন, আমার চোখের গভীরে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তাদের প্রিয় মরিসের ছবি। আমারও খুব আবেগ কাজ করছিল এই দেখে যে তাদের সেই দৃষ্টির গভীরে আমি সত্যিই আমার বন্ধুর একটা ঝাপসা, অস্পষ্ট অবয়ব খুঁজে পাচ্ছিলাম, যেন অনেক দূর থেকে কুয়াশার আড়াল থেকে মরিস আমাকে দেখে হাসছে।
হঠাৎ বৃদ্ধ তাঁর আরামকেদারা থেকে সোজা হয়ে বসলেন:
—আরে মামেত, আমার মাথায় একটা চিন্তা এলো...উনি তো মনে হয় এখনো নাশতা করেননি!
আর মামেত তো আকাশ থেকে পড়লেন, দুহাত ওপরে তুলে চিৎকার করে বললেন:
—নাশতা করেননি!...হায় ঈশ্বর!
আমি ভেবেছিলাম তাঁরা হয়তো আবার মরিসের কথা বলছেন, তাই আমি উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম যে—ওই লক্ষ্মী ছেলেটা নাশতা করার জন্য দুপুর ১২টার বেশি কখনোই দেরি করে না। কিন্তু না, তারা আসলে আমার কথাই বলছিলেন! আর যখন আমি স্বীকার করলাম যে আমি এখনো অভুক্ত, তখন সেখানে যে কী এক হুলুস্থুল কাণ্ড শুরু হলো, তা দেখার মতো:
—তাড়াতাড়ি টেবিল সাজাও, ছোট নীলমণিরা! ঘরের মাঝখানে টেবিলটা দাও, রোববারের বিশেষ টেবিল-ক্লথটা পাতো, ফুল আঁকা প্লেটগুলো বের করো। আর এত হাসাহাসি করো না! জলদি করো...
আমার তো মনে হয় ওরা বেশ তাড়াহুড়ো করছিল। তিনটে প্লেট ভাঙার সময়টুকুও বোধ হয় পার হয়নি, তার মধ্যেই দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়ে গেল।
‘চমৎকার একটা নাশতা!’ আমাকে টেবিলের দিকে নিয়ে যেতে যেতে মামেত বললেন; ‘তবে কিনা, আপনাকে একাই খেতে হবে...আমরা তো সকালেই খেয়ে নিয়েছি।’
আহা, এই বেচারা বৃদ্ধরা! দিনের যে সময়ই আপনি তাদের কাছে যান না কেন, তাদের উত্তর সব সময় একটাই—তারা সকালেই খেয়ে নিয়েছেন।
মামেতের সেই ‘চমৎকার নাশতা’ ছিল আসলে নামমাত্র এক চুমুক দুধ, কয়েকটা খেজুর আর একটা ছোট কেক—ঠিক যেন একটা শুকনা বিস্কুটের মতো কিছু; যা দিয়ে তিনি আর তার খাঁচার পাখিগুলো অন্তত আট দিন চলতে পারতেন! আর ভাবলে অবাক লাগে, আমি একাই সেই সবটুকু খাবার সাবাড় করে দিলাম!...তাই দেখে টেবিলের চারপাশে কী এক বিস্ময় আর অসন্তোষ! নীল পোশাকের ছোট মেয়ে দুটি যেভাবে একে অপরকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ফিসফিস করছিল, আর ওদিকে খাঁচার ভেতর থেকে পাখিরাও যেন একে অপরকে বলছিল:
—ওহ্! এই ভদ্রলোক তো দেখি সবটুকু কেক খেয়ে ফেলছেন!
আমি সত্যিই সবটুকু খেয়ে ফেললাম, আর সেটা প্রায় খেয়ালই করিনি। কারণ, আমি বিভোর হয়ে দেখছিলাম সেই উজ্জ্বল আর শান্ত ঘরটি, যেখানে পুরোনো জিনিসের এক অদ্ভুত ঘ্রাণ ভেসে বেড়াচ্ছিল...বিশেষ করে সেখানে দুটো ছোট বিছানা ছিল, যেখান থেকে আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। ঝালর দেওয়া বড় বড় পর্দার নিচে ঢাকা সেই প্রায় দোলনার মতো বিছানাগুলো দেখে আমি কল্পনা করার চেষ্টা করছিলাম—ভোরবেলার সেই দৃশ্যটি যখন সেখানে তারা ঘুমিয়ে থাকেন। ঘড়িতে তিনটা বাজল। এটাই সেই সময়, যখন সব বৃদ্ধ মানুষের ঘুম ভেঙে যায়:
‘মামেত, তুমি কি ঘুমাচ্ছ?’
—না গো।
—আমাদের মরিস ছেলেটা খুব ভালো, তাই না?
—ওহ্! হ্যাঁ, ও সত্যিই খুব চমৎকার একটা ছেলে।
আর এভাবেই আমি মনে মনে এক দীর্ঘ কথোপকথন কল্পনা করে নিচ্ছিলাম, যার সূত্রপাত ছিল কেবল পাশাপাশি পাতা বৃদ্ধ দম্পতিটির ওই ছোট্ট দুটি বিছানা দেখে...
খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি গৃহপরিচারকের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উঠলাম। সেই সাহসী ছেলেটির গল্প করার জন্য তাঁরা আমাকে আরও কিছুক্ষণ রেখে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দিন ফুরিয়ে আসছিল, আর কলঘরটা ছিল বেশ দূরে—তাই আমাকে বেরিয়ে পড়তেই হতো। আমি যখন উঠলাম, বুড়ো লোকটিও আমার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
এদিকে ঘরের অন্য প্রান্তে আলমারির সামনে এক নাটকীয় কাণ্ড ঘটে যাচ্ছিল। লক্ষ্য হলো—আলমারির একেবারে ওপরের তাকে রাখা ব্র্যান্ডিতে ভেজানো চেরির সেই বয়ামটা পাড়া, যা গত দশ বছর ধরে মরিসের জন্য অপেক্ষা করছিল এবং যেটা খোলার আয়োজন আমার কাছ থেকে গোপন রাখার কথা ছিল। মামেতের শত মিনতি সত্ত্বেও বুড়ো মানুষটি নাছোড়বান্দা; তিনি নিজেই চেরিগুলো ওপর থেকে নামাবেন। তারপর তাঁর স্ত্রীর প্রবল আতঙ্কের মধ্যেই তিনি একটা চেয়ারের ওপর চড়লেন এবং একেবারে ওপরে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে লাগলেন...দৃশ্যটা একবার কল্পনা করে দেখ—বুড়ো মানুষটি কাঁপছেন আর শরীরের সবটুকু জোর দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছেন, নীল পোশাক পরা ছোট মেয়েরা তাঁর চেয়ারটা আঁকড়ে ধরে আছে, আর পেছনে দুশ্চিন্তায় হাঁপাতে হাঁপাতে দুই হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মামেত। আর এই সবকিছুর মাঝে খোলা আলমারি আর লালচে হয়ে যাওয়া স্তূপ করা কাপড়ের ভাঁজ থেকে বারগামট লেবুর এক মৃদু সুবাস ভেসে আসছে... দৃশ্যটা সত্যিই ভারী চমৎকার ছিল।
অবশেষে অনেক চেষ্টার পর সেই বিখ্যাত বয়ামটা আলমারি থেকে বের করা সম্ভব হলো। আর তার সঙ্গে বের হয়ে এলো তুবড়ে যাওয়া পুরোনো এক রুপোর পেয়ালা—মরিস যখন ছোট ছিল, তখন এটা তার ছিল।
ওরা আমার পেয়ালাটা কানায় কানায় চেরি দিয়ে ভরে দিল; মরিস চেরি বড় ভালোবাসত! আমাকে বেড়ে দেওয়ার সময় বুড়ো লোকটা বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে আমার কানে কানে বলল:
‘আপনি কত ভাগ্যবান যে এগুলো খেতে পারছেন!...এগুলো আমার স্ত্রী নিজে বানিয়েছে...দারুণ একটা জিনিসের স্বাদ পেতে যাচ্ছেন আপনি।’
আহা! তার স্ত্রী সেগুলো বানিয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে চিনি দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। কী আর করা! বয়স হলে মানুষ তো একটু ভুলোমনা হয়েই যায়। আপনার সেই চেরিগুলো খেতে একদম জঘন্য ছিল, আমার অসহায় মামেত...কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি ভ্রু কুঁচকানো তো দূরে থাক, একদম শেষ পর্যন্ত সবটুকুই খেয়েছিলাম।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি গৃহপরিচারকের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য উঠলাম। সেই সাহসী ছেলেটির গল্প করার জন্য তারা আমাকে আরও কিছুক্ষণ রেখে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দিন ফুরিয়ে আসছিল, আর কলঘরটা ছিল বেশ দূরে—তাই আমাকে বেরিয়ে পড়তেই হতো। আমি যখন উঠলাম, বুড়ো লোকটিও আমার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন।
‘মামেত, আমার কোটটা দাও তো!...আমি ওনাকে চত্বর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে চাই।’
অবশ্যই মামেতের মনে হচ্ছিল যে ওনাকে চত্বর পর্যন্ত এগিয়ে দিতে যাওয়ার জন্য আবহাওয়াটা বেশ খানিকটা ঠান্ডাই বটে; কিন্তু সেটার কিছুই উনি বুঝতে দিলেন না। শুধু যখন উনি বৃদ্ধকে মুক্তোর বোতাম লাগানো তামাক রঙের সুন্দর স্প্যানিশ কোটটির হাতা পরতে সাহায্য করছিলেন, আমি মিষ্টি মেয়েটিকে মৃদুস্বরে তাকে বলতে শুনলাম:
‘তুমি ফিরতে দেরি করবে না তো, তাই না?’
আর তিনি একটু দুষ্টুমিভরা ভঙ্গিতে বললেন:
‘হে! হে!...ঠিক জানি না...হতেও পারে...’
এই কথা শুনে তাঁরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলেন, আর তাঁদেরকে হাসতে দেখে সেই নীল চোখের ছোট্ট মেয়েগুলোও হেসে উঠল। এমনকি কোণের খাঁচায় থাকা ক্যানারি পাখিগুলোও তাদের নিজস্ব ভঙ্গিতে হাসছিল...আমাদের মধ্যে কথা হলো, আমার মনে হয় চেরি ফলের সেই কড়া গন্ধটা তাদের সবাইকে কিছুটা নেশাতুর করে দিয়েছিল।
সূর্য ডুবে রাত নেমে আসছিল যখন আমি আর দাদু বাইরে বেরোলাম। সেই নীল চোখের ছোট্ট মেয়েটি দূর থেকে আমাদের অনুসরণ করছিল ওনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য; কিন্তু দাদু সেটা খেয়াল করেননি। তিনি একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মতো আমার হাত ধরে হাঁটতে পেরে বেশ গর্ববোধ করছিলেন। দরজায় দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল মুখে মামেত এই দৃশ্য দেখছিলেন। আমাদের দিকে তাকিয়ে তিনি মিষ্টি করে মাথা দোলাচ্ছিলেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি বলছেন: ‘যা–ই বলো না কেন, আমার বেচারি বুড়োটা!...এখনো বেশ হাঁটতে পারে।’