মুক্তিযুদ্ধকালীন এক পাকিস্তানি কূটনীতিকের ভাষ্য
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি কূটনীতি
ইকবাল আখুন্দ পাকিস্তানের প্রথম প্রজন্মের কূটনীতিকদের অন্যতম। একাত্তরে তিনি বেলগ্রেডে পাকিস্তানি হাইকমিশনে কর্মরত ছিলেন। সে সূত্রে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক পাকিস্তানি কূটনীতির তিনি ভেতরের একজন চরিত্র ও দর্শক। এখানে আছে তার বই মেমোয়ার্স অব এ বাইস্ট্যান্ডার/এ লাইফ ইন ডিপ্লোম্যাসি থেকে চুম্বক অংশ।
প্রায় ২৬ বছর আগে ২০০০ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে লেখাটি প্রথমবার ছাপা হয়েছিল। আমাদের বহু মূল্যবান লেখা শুধু মুদ্রণের পাতায় রয়ে গেছে; তেমনি একটি লেখা এই—‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি কূটনীতি’।
স্বাধীনতা দিবস ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনলাইনপূর্ব যুগে যত লেখা, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ ও কবিতা ছাপা হয়েছিল, স্বাধীনতার পুরো মাসজুড়ে সেসব ধুলোঝরা পৃষ্ঠা আমরা প্রথমবারের মতো অনলাইনে তুলে আনছি।
১৯৭১ সালের মার্চ মাস। কায়রো দূতাবাস থেকে ছুটি নিয়ে করাচিতে গিয়ে বেলগ্রেডে বদলির আদেশ পেলাম। যেদিন ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠালেন, সেদিন সন্ধেবেলা ইয়ার দোস্তরা আমাকে ধরে নিয়ে গেল কাওয়ালির আসরে। কুর্তা-পাজামায় ধোপদুরস্ত খান সমঝদাররা মেঝেতে মোটা বালিশে আয়েশে হেলান দিয়ে পান চিবুচ্ছেন আর মারহাবা ধ্বনিতে গায়কদের দিকে ব্যাংকনোট বাড়িয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটে চলেছে, তা দেশের জন্য কী নিয়ে আসবে, সে ব্যাপারে কারও মুখে টুঁ শব্দটি নেই। এই হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্ট, শাসক ও প্রশাসক চক্র। কেউ কেউ বাঙালিদের দুঃখ-দুর্দশার ব্যাপারে সহানুভূতিশীল ছিলেন, তবে অনেকেই সম্ভবত ভেবেছিলেন যা ঘটার তা-ই ঘটেছে শেখ মুজিবের বেলায়। ওই আসরে সংকট নিয়ে, অনিবার্য বিপর্যয় নিয়ে কারও চেহারায় কোনো ভাবান্তর নেই। ঢাকার মানুষের জন্য কোনো উদ্বেগ ঝরল না কারও কণ্ঠে।
ঢাকা থেকে ফিরে জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করলেন, ‘এ যাত্রায় ফাঁড়া কেটে গেছে পাকিস্তানের!’ অবশ্য পরদিন সকালে আমি যখন তাঁর করাচির বাড়িতে ফোন করলাম, কণ্ঠ শুনে তাঁকে কিছুটা হতোদ্যম মনে হলো। জানতে চাইলাম, যেহেতু আওয়ামী লীগকেই শুধু দেশদ্রোহীর জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে ইয়াহিয়া খান সব রাজনৈতিক দলকে কেন নিষিদ্ধ করলেন। তিনি বললেন, ‘এটা নিছক লোকদেখানো ব্যাপার। শিগগিরই আরও নতুন ঘটনা ঘটতে দেখবে তুমি।’ কী ঘটুক তিনি চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট হলো না। বোধ করি মিলিটারি তাঁকে এটা বিশ্বাস করিয়েছে যে তারা তাঁকে একটা অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে, একটা মজবুত অবস্থান গড়তে দেবে, রাজনৈতিক উপায়ে পূর্ব পাকিস্তানকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করতে দেবে। অচিরেই এটা পরিষ্কার হয়ে গেল, আর যা-ই হোক এমন চিন্তা ওদের মাথায় ঘুণাক্ষরেও নেই। এ সত্ত্বেও ভুট্টো অবিচল থাকলেন। যখন কয়েকটা মাস কেটে গেল তখনই কেবল ভয়াল সেই রাতের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেন ভুট্টো, আর পূর্ব পাকিস্তানে শাসক চক্রের কর্মকাণ্ডকে ধিক্কার জানালেন।
২৫ মার্চে সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার পর নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সময়টা ছিল এবং আজও এক দুঃস্বপ্ন, বিভ্রান্তি ও অন্ধকারের কাল হয়ে আছে। যে বর্বরতা চালানো হয়েছিল, তাতে মসিলিপ্ত হয়েছে ওই সময়টা। কারোরই জানা ছিল না আসল সত্যটা কী এবং কী ঘটে চলেছে সেখানে। প্রাথমিক বিভীষিকার ওপর কাটছাঁট করা টুকরোটাকরা কিছু খবরাখবর ফাঁকফোকর গলে আমাদের কাছ বরাবর পৌঁছলেও পরে তার পথও বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে বাস্তবতাকে আড়াল করা হলো পাকিস্তানি সেন্সরশিপের খাঁড়া দিয়ে ও সব বিদেশি সংবাদদাতাকে বহিষ্কারের মাধ্যমে। অপরদিকে সবকিছুকে অতিরঞ্জিত করে ও বানোয়াট গল্প ফেঁদে। পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত সংবাদপত্র এমনসব কাহিনি প্রচার করত যাতে মনে হতো সবকিছুই দিব্যি স্বাভাবিক আছে, কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা নেই। গ্রামের গোয়ালা তাঁর দৈনন্দিন কাজকর্মে মগ্ন, জীবন বয়ে চলেছে স্বাচ্ছন্দ্যে। বাইরের দুনিয়া পরিস্থিতির খবর জানত কলকাতা থেকে পাওয়া পূর্ব পাকিস্তানি শরণার্থীদের দেওয়া বর্ণনা ও ভারতীয় প্রোপাগান্ডার বদৌলতে। তথাপি পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত কাগজগুলোও পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে তথাকথিত ‘দুর্বৃত্ত’ ও ভারতীয় চরদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ঘটনার উল্লেখ না করে পারেনি। আর এ সত্যটাও অস্বীকার করার জো নেই যে যতই দিন যাচ্ছিল বাঙালিরা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য তত বেশি সংখ্যায় ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছিল।
যেদিন ইয়াহিয়া বাঙালিদের বিরুদ্ধে সৈন্য পাঠালেন, সেদিন সন্ধেবেলা ইয়ার দোস্তরা ধরে নিয়ে গেল কাওয়ালির আসরে। খান সমঝদাররা মেঝেতে মোটা বালিশে আয়েশে হেলান দিয়ে পান চিবুচ্ছেন আর গায়কদের দিকে ব্যাংকনোট বাড়িয়ে দিচ্ছেন। পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটে চলেছে, সে ব্যাপারে কারও মুখে টুঁ শব্দটি নেই।
প্রকৃত সত্য ও ‘কলকাতার বানানো গালগল্প’ দুনিয়াজোড়া প্রচারমাধ্যমে ফলাও হতে শুরু করায় অচিরেই পাকিস্তানের মাথার ওপর চারদিক থেকে প্রতিবাদ ধিক্কার এসে আছড়ে পড়তে লাগল। একসময় তাবৎ মানবাধিকার সংগঠন, পরিবেশবাদী সম্প্রদায়, রক গানের দল, বিটলস গোষ্ঠী ও হলিউড তারকারা বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতি প্রবল একাত্মতা ঘোষণা করল। পাকিস্তানে ওই প্রচারণাকে দেখা হতো ইসলামি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু-ইহুদি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে। ওই পরিস্থিতিতে ভারতের সংশ্লিষ্টতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের দিকটি সবার চোখেই ছিল পরিষ্কার। ইসরায়েলি দরদিরা যে তাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল, তাতে সন্দেহ কী! ওই ইসরায়েলিরা পাকিস্তানের মধ্যে দেখতে পায় তাদের দুশমনের চেহারা। আর তাই পাকিস্তানকে পরোক্ষভাবে একহাত দেখে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে খুশিতে বগল বাজাল ওরা।
প্রথম সারির দেশগুলোতে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতদের নিয়ে জেনেভায় এক বৈঠক বসল পররাষ্ট্রসচিব সুলতান মোহাম্মদ খান এবং ইয়াহিয়া খানের অন্যতম অন্তরঙ্গ ব্যক্তি ও উপদেষ্টা জেনারেল গোলাম ওমরের যৌথ সভাপতিত্বে। ওই বৈঠকের লক্ষ্য ছিল দুনিয়াজোড়া প্রচারমাধ্যমে পাকিস্তানের ভাবমূর্তি কেন এতটা খারাপ তা খতিয়ে দেখা। ভর্ৎসনার সুরে আমাদের কাছে জানতে চাওয়া হলো, ‘এ ব্যাপারে আমাদের রাষ্ট্রদূতরা কী করছেন?’ অন্যদিকে রাষ্ট্রদূতরা দাবি জানালেন, পূর্ব পাকিস্তানে আসলে যা ঘটে চলেছে, কোনো রাখঢাক না করেই তা জানানো হোক। কেউ কেউ সাহস করে এমন পাল্টা প্রশ্নও করে বসলেন, ‘হ্যাঁ বাস্তবতার বাইরে কোন ভাবমূর্তিটি প্রকট হবে বলে আপনারা আশা করেন?’ কিন্তু ইসলামাবাদ আত্মপ্রবঞ্চনায় এতটাই বিভোর ছিল যে যে মাসে ‘প্রেসিডেন্টের জন্য পাঠানো এক সামারিতে’ ইয়াহিয়া খানকে জানাল, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমনে আমাদের প্রচেষ্টার প্রতি সারা বিশ্বে বিপুল কূটনৈতিক সমর্থন রয়েছে।’ কিন্তু আসল সত্যটা হচ্ছে এরই মধ্যে পাকিস্তান নামটা এতটাই কালিমালিপ্ত হয়ে উঠেছিল যে দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশন থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, এক ডিনার পার্টিতে এক বিদেশি সাংবাদিকের স্ত্রী যখন দেখলেন যে এক পাকিস্তানি প্রথম সচিবের পাশেই তাঁর আসন পড়েছে, তখন তিনি ঝটিতি অন্যত্র গিয়ে বসলেন।
এরই মধ্যে যুদ্ধ ঘনিয়ে এল। আর অনেকেই ব্যাপারটি ঠাওর করতে পেরেছিলেন। দিল্লিতে লন্ডন টাইমসের প্রতিনিধি পিটার হ্যাজেলহার্স্ট তাঁর পত্রিকার ১৩ জুলাই সংখ্যায় এই মর্মে প্রতিবেদন পাঠালেন যে ভারতের সবচেয়ে দায়িত্বশীল মহলটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে সক্রিয় চিন্তাভাবনা করছে। প্রায় একই সময়ে জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট অক্টোবর অথবা নভেম্বরেই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে বলে তাঁর ‘ক্রমশ ঘনীভূত আশঙ্কার’ কথা জানালেন জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধিকে। নিরাপত্তা পরিষদকেও তিনি তাঁর উদ্বেগের কথা জানানোর পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার একটি ‘রাজনৈতিক সমাধান’ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলেন। ওই বছর গ্রীষ্মে মার্শাল টিটো এক রাষ্ট্রীয় সফরে নয়াদিল্লি যান এবং দেশে ফিরে গিয়ে পাকিস্তান সরকারকে এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাইলেন যে ‘উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ব্যাপারে তিনি সত্যিকার পূর্বাভাস দেখতে পেয়েছেন।’ অন্যভাবে বললে, তিনি ভারতকে যুদ্ধের জন্য আটঘাট বেঁধে তৈরি হতে দেখেছিলেন। ওই সফর শেষে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে টিটো পাকিস্তানকে (শেখ) মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একটা মীমাংসায় পৌঁছার তাগিদ দিয়ে প্রকারান্তরে ভারতের অবস্থানের পক্ষেই সাফাই গাইলেন।
তাবৎ মানবাধিকার সংগঠন, পরিবেশবাদী সম্প্রদায়, রক গানের দল, বিটলস গোষ্ঠী ও হলিউড তারকারা বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতি প্রবল একাত্মতা ঘোষণা করল। পাকিস্তানে ওই প্রচারণাকে দেখা হতো ইসলামি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘হিন্দু-ইহুদি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে।
তিনি অবশ্য এটা জাহির করতে চেয়েছিলেন যে ওই ইস্যুর সমাধানে যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়ার বিরুদ্ধে ইন্দিরা গান্ধীর কাছে তিনি তাঁর জোরালো অভিমতও তুলে ধরেছেন। যুদ্ধবিরতিতে উপনীত হওয়া ও পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে নাক না গলানোর জন্য জাতিসংঘের আহ্বানের পক্ষে যুগোস্লাভিয়া পরে ভোটও দিয়েছিল। এই সময়টাতে আমি ছিলাম বেলগ্রেডে আর যে কর্মকর্তা আমাকে আগাম তথ্য জানিয়েছিলেন তিনি বললেন, পাকিস্তান চাইলে টিটো মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত আছেন। আমি মনে করি, প্রস্তাবটা টিটো আন্তরিকভাবেই দিয়েছিলেন। কেননা তিনি তাঁর নিজের দেশের পরিস্থিতির সঙ্গেও এর মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। ভারত একটি সার্বভৌম দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর নজির স্থাপন করুক, টিটো তা চাননি। যখন আমি আমার পরিচয়পত্র পেশ করি, মার্শাল টিটো জাতিগত ও জাতীয়তাবাদী সংঘাতে দূতিয়ালির প্রসঙ্গ তুলে বললেন, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এসবের সমাধানের চেষ্টা করা ভুল ও নিরর্থক। তিনি ঘোষণা করলেন, ‘যুগোস্লাভিয়ায় আমরা চিরকালের জন্য ওসব সমস্যার সমাধান করেছি। পৃথিবীতে আর কখনো বলকান সমস্যা বলে কিছু থাকবে না।’
ঘুণাক্ষরেও তিনি ভাবতে পারেননি যে লোমহর্ষক ও নজিরবিহীন রক্তপাত ও বর্বরতার মধ্য দিয়ে তাঁর দেশের নামটি পর্যন্ত একদিন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের যুদ্ধ শেষ হতে না হতেই তাঁর নিজ প্রজাতন্ত্র ক্রোয়েশিয়ায় প্রথমবারের মতো গুরুতর গোলযোগ মাথাচাড়া দিল। আর সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রতি তাঁর বিচক্ষণ পরামর্শের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে ওই গোলযোগ দমনে বল প্রয়োগ করাতে মোটেই ইতস্তত করলেন না। আমি টিটোর দেওয়া প্রস্তাবের কথা জানিয়ে ইসলামাবাদে তারবার্তা পাঠালাম। পার্সপোলিশে ইরানের শাহ পারস্য রাজবংশের ২ হাজার বর্ষপূর্তির বর্ণাঢ্য উদ্যাপনে ব্যস্ত, তখন সেখানে তাঁর (টিটোর) এবং ইয়াহিয়া খানের মধ্যে ব্যবস্থা করা হলো এক বৈঠকের। বৈঠকের সময় টিটোর সঙ্গী এক কর্মকর্তা আমাকে বললেন, বৈঠকটা হয়ে উঠেছিল এক বোবার সংলাপ। টিটো আসল ব্যাপারে ইয়াহিয়ার মুখ থেকে খুব বেশি কথা আদায় করতে পারেননি। আর ইয়াহিয়া পুরোটা সময় তাঁকে (টিটোকে) লম্বা চওড়া বক্তৃতা শোনালেন ভারতের সম্প্রসারণবাদ, ছলচাতুরী, যুদ্ধংদেহী মনোভাব ইত্যাদি ইত্যাদি নিয়ে। যুগোস্লাভিয়া যে ধারণাটি লাভ করল তা হলো, ইয়াহিয়া খান আদতেই কোনো ধরনের ‘রাজনৈতিক মীমাংসা’ চাচ্ছেন না, চাচ্ছেন কেবল পূর্ব পাকিস্তানে তাঁর কুকর্মকে হালাল করতে। ইয়াহিয়াতন্ত্র বাস্তবিকই সব মহলের সতর্কবাণীকে কোনো পাত্তাই দিল না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, ওরা বিযুক্ত হয়ে পড়েছে বাস্তবতা থেকে। ভারত কী করছে না করছে, সে ব্যাপারে গোয়েন্দা মারফত পর্যাপ্ত ও নির্ভুল তথ্য পাচ্ছিল সরকার। ঘনায়মান যুদ্ধের আলামত ঠাওর করতে বেগ পেতে হয়নি সরকারের। তথাপি চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠল যে সর্বনাশের ছবি, শাসকতন্ত্র তা দেখেশুনেও নিষ্ক্রিয়তায় বুঁদ হয়ে রইল। আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পুরোটা ব্যস্ত থাকল বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের ষড়যন্ত্র ও গোপন অভিসন্ধিকে তুলে ধরার চেষ্টায়। জাতিসংঘে আমাদের স্থায়ী প্রতিনিধি তাঁর অবস্থান থেকে যতটা ভালোভাবে সম্ভব দায়িত্ব পালন করলেন। নিজের দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি পরিষদ সদস্যদের ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে দেখালেন, হিন্দুরা তখনো কীভাবে মুসলিম বাংলার ধারণাটির বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে আছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিষদ সদস্যরা এ থেকে কী বুঝলেন, তা কেউ জানে না। তবে নিজের দুরভিসন্ধি আড়াল করতে ভারতকে কোনো বেগই পেতে হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন তো তার ছিলই, আর ওই অবস্থায় এসে সম্ভবত তাঁর পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সহৃদয় উদাসীনতাও যোগ হলো। ভারতীয় প্রতিনিধি পাকিস্তানি প্রতিনিধি আগা শাহির অভিযোগের জবাব দেওয়ার মোক্ষম সুযোগটি হাতছাড়া করলেন না। তিনি বললেন, ‘পাকিস্তানি প্রতিনিধি তাঁর দেশে ভাঙনের কথা বলতে গিয়ে একেবারেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছেন। কিন্তু তাঁর দেশের ভাঙনের ষোলোকলা পূর্ণ হয়ে গেছে। দুনিয়ার কারও সাধ্যি নেই একে ঠেকিয়ে রাখে। এখন সেটি ঘটেই গেছে।’ ইন্দো-সোভিয়েত মিত্রতা চুক্তিটি সম্পাদিত হওয়ার সময়ই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল পাকিস্তানের। ওই চুক্তিতে সামরিক বিষয়–সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের দিকটা ছিল পরিষ্কার। আর তা হলো, পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের নেওয়া চরম সামরিক পদক্ষেপকে চীন নস্যাৎ করার চেষ্টা করলে তা প্রতিরোধ করা। যুগোস্লাভরা আমার কাছে বাঁকাভাবে বিষয়টি তুলে ধরে বলল: ‘সাহায্য করার ব্যাপারে মিত্রদের ক্ষমতার দৌড় কতটা, তা পাকিস্তান এ যাত্রা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে।’ আপাতদৃষ্টিতে যদিও ব্যাপারটি তেমন ছিল না। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মস্কোর দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর সোভিয়েতরা বিনম্র প্রতিশ্রুতি দিল, পাকিস্তান ওই চুক্তির টার্গেট নয়। ওই চুক্তির আসল উদ্দেশ্য খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে দফায় দফায় বৈঠকের পরিকল্পনা হলো। কিন্তু এটা-ওটা কারণে এসব বৈঠক স্থগিত হয়ে যেতে থাকল এবং শেষমেশ দেখা গেল, আদতে কোনো বৈঠকই হয়নি। চুক্তিটির নিজস্ব ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যা বলল তাতে আত্মতুষ্টির ভাবটাই ছিল স্পষ্ট: ‘সোভিয়েতরা তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি কীভাবে মেনে চলছে এখন কেবল সেটাই দেখার বিষয়।’ ওয়াশিংটন বা বেইজিং (পিকিং) কোথাও সোভিয়েত হুমকি মোকাবিলায় কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হলো না। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে কৌশল ও কর্মপন্থায় কোনো পরিবর্তন আনার বিষয়টিও শাসক চক্র একটিবারের মতো ভেবে দেখল না। বাইরে থেকে বিরাজমান আপাত শান্ত-সুনসান ভাব দেখে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনগড়া ব্যাখ্যাটা দাঁড়াল এ রকম: যুদ্ধে ভারতের জড়িয়ে পড়ার পক্ষে সোভিয়েতরা সমর্থন দেবে না। প্রকৃতপক্ষে পরিস্থিতির ব্যাপারে সোভিয়েতদের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল খুবই সাবধানী। এপ্রিল মাসে (নিকোলাই) পদগোর্নি এক প্রীতিপূর্ণ বার্তা পাঠিয়ে ইয়াহিয়া খানকে জানালেন: এখনো তিনি সমগ্র পাকিস্তানের তাবৎ জনগণের কল্যাণ কামনা করেন।
২১ নভেম্বর ভারতীয় বাহিনী ‘ছায়ার সঙ্গে কুস্তি লড়া’ বাদ দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ‘এরই মধ্যে কার্যত বাংলাদেশ-হয়ে-যাওয়া’ পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়ল। দুই সপ্তাহ পরে নিরাপত্তা পরিষদ যখন শেষমেশ নড়েচড়ে বসল, জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন আগা শাহির অভিযোগের দাম্ভিক জবাব দিলেন, ‘আমরা ২১ নভেম্বরের পর পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে পড়েছি বলে পাকিস্তান প্রতিনিধি ঘোষণা করেছেন। অস্বীকার করছি না, আমরা তা করেছিলাম বটে!’
টিটো ঘোষণা করলেন, ‘যুগোস্লাভিয়ায় আমরা চিরকালের জন্য ওসব সমস্যার সমাধান করেছি। পৃথিবীতে আর কখনো বলকান সমস্যা বলে কিছু থাকবে না।’ ঘুণাক্ষরেও তিনি ভাবতে পারেননি যে লোমহর্ষক ও নজিরবিহীন রক্তপাত ও বর্বরতার মধ্য দিয়ে তাঁর দেশের নামটি পর্যন্ত একদিন পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে।
বেলগ্রেডে আমাদের দূতাবাসের বেশির ভাগ কর্মী ও কূটনৈতিক কর্মকর্তাই ছিল বাঙালি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানিরা সব কাজকর্ম ফেলে সবাই মিলে গাদাগাদি করে রেডিওতে যখন যে কেন্দ্র ধরা যেত তা-ই শুনতে বসে পড়ত। বিবিসি-সহ অন্য যেসব বিদেশি বেতারকেন্দ্র দুঃসংবাদ প্রচার করত তারা তাকে ভুয়া ও বৈরী প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিত আর রেডিও পাকিস্তানে শ্রুত পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিমত্তা ও বীরত্বের কাহিনি উত্তেজিত স্বরে আমাকে আবার শোনাত। এর মধ্যে থাকত পাকিস্তানি সৈন্যদের ছোট ছোট দলের বিশাল শত্রু বাহিনীকে রুখে দেওয়ার কথা, থাকত বিধ্বস্ত শত্রু ট্যাংক ও বিমানের সংখ্যা ও শত্রুপক্ষের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ। বিশ্বের বিভিন্ন পত্রপত্রিকাও শত্রুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের প্রচণ্ড ও ঘোরতর লড়াইয়ের খবর দিচ্ছিল। দীর্ঘ ৯টি মাস অফিসে বাঙালিদের তাদের আসন ছেড়ে উঠতে দেখা যায়নি। তারা রেডিওর ধারেকাছেও ঘেঁষেনি। দূতাবাসের ‘টিকার’-এ যেসব সংবাদ সাঁটা থাকত, সেদিকে ফিরেও তাকাত না। বরং নিজের নিজের আসনে বসে থেকে কর্তব্যনিষ্ঠার সাক্ষ্য হয়ে নীরবে ফাইল লেখালেখিতে বুঁদ হয়ে থাকত ওরা।
ডিসেম্বরের ৩ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনী পশ্চিম দিকে বেশ এগিয়ে গেল। এসবের মধ্যে ছিল ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়—এমন গোটাকয় ভারতীয় বিমানক্ষেত্রের ওপর বিমান হামলা, কাশ্মীরের শামব সেক্টরে স্থল আক্রমণ। আর ইয়াহিয়া সারাটা বছর যে সর্বাত্মক যুদ্ধের ‘হুমকি’ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আপাতদৃষ্টে তা শুরু হয়ে গেল। আমেরিকানরা পুরোটা ব্যাপারকেই অবাস্তব বলে গণ্য করলেও যখন দেখল এর পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্রটি রাজনৈতিক ও সামরিক হুমকির মুখে, তখন তাদের টনক নড়ল। পাকিস্তান যদি হেরে যায় কিংবা যদি ভারতের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলে সেটা হবে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বড় পরাজয়। চীনের সঙ্গে সদ্য জোড়লাগা সম্পর্কের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও এটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আর এর ফলে এশিয়াতে সোভিয়েতদের প্রাধান্য বেড়ে যাবে। নিক্সন সে সময়কার মার্কিন জনমতের মূলস্রোতকে তোয়াক্কা না করেই ‘পাকিস্তানকে বাঁচাও’ বলে হাঁক ছাড়লেন। কিন্তু ততক্ষণে পাকিস্তান বাঁচাও বলে পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার সুযোগ খতম হয়ে গেছে। হেনরি কিসিঞ্জার জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের এক বৈঠকে বলতে বাধ্য হলেন, ‘আমরা সবকিছুই করেছি দু’সপ্তাহ পরে, কিছু করার মতো ক্ষমতা হাত থেকে ফস্কে যাওয়ার পর।’
৮ ডিসেম্বর ইসলামাবাদ থেকে নির্দেশ পেলাম, নিউইয়র্কে ভুট্টোর সঙ্গে যোগ দিতে হবে। তিনি সবেমাত্র উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। পাকিস্তানের বিষয়টি নিরাপত্তা পরিষদে তুলে ধরার দায়িত্ব বর্তেছে তাঁর ওপর। স্থলভাগে সামরিক পরিস্থিতি গুরুতর রূপ নিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর জওয়ানরা প্রাণপণে শত্রুর মোকাবিলা করে যাচ্ছে। দুয়েক জায়গায় তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। পশ্চিমে তারা কাশ্মীর ফ্রন্টের শামব সেক্টরের যুদ্ধে তারা অগ্রগামী। অধিকন্তু ওই দিন সকালে সাধারণ পরিষদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতি ও পূর্ব পাকিস্তান ভূখণ্ড থেকে ভারতীয় বাহিনীর প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।
এসবের মধ্যে যখন কিনা ভুট্টো জাতিসংঘে এসে পৌঁছলেন, বিষয়টির আবেদন ততটা না থাকলেও খেলার মতো তাস ভুট্টোর হাতে কম ছিল না। ১০ তারিখে যখন আমি নিউইয়র্কে জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন সংশ্লিষ্ট মিশন কর্মকর্তা একটি অপ্রত্যাশিত সংবাদ দিলেন: ঢাকায় জাতিসংঘ প্রতিনিধি জাতিসংঘ মহাসচিবকে পাকিস্তান ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল রাও ফরমান আলীর একটি টেলিগ্রাম বার্তা পাঠিয়েছেন। ওই বার্তার মোদ্দাকথা হলো এই যে ইস্টার্ন কমান্ড অস্ত্র সংবরণে প্রস্তুত। সে চায় জাতিসংঘ পাকিস্তানি সৈন্য ও কর্মকর্তাদের সেখান থেকে সরিয়ে আনার ব্যবস্থা করুক। খালিদ মাহমুদ নামের ওই কর্মকর্তা আমাকে জানালেন যে ভুট্টো, যিনি কিনা কিছুক্ষণ হলো এসে পৌঁছে হোটেলে উঠেছেন, এই ঘটনা তাকে বিস্ময়ে হতবাক করল। আমি সোজা ছুটলাম ফিফথ অ্যাভিনিউর পিয়েরে হোটেলে মি. ভুট্টোর হোটেলকক্ষের দিকে হন্তদন্ত হয়ে। একদম ফাঁকা বসার ঘরের মধ্য দিয়ে গিয়ে দরজায় নক করে বেডরুমে ঢুকলাম। একনজর দেখলেই বোঝা যায় এ যাত্রা পাকিস্তানের খেল খতম! স্বল্পালোকিত একটি কক্ষে সারি সারি রুক্ষ কঠিন চেহারা, জানালার বাইরে সেন্ট্রাল পার্কের পাতাহীন গাছপালার ওপর সন্ধ্যার পড়ন্ত আভা। থ্রি পিস স্যুট পরা একদল থার্ড সেক্রেটারি একপাশে জটলা করে নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে। আর ভুট্টো স্বয়ং কক্ষটির অন্য প্রান্তে একটি টেবিলে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে একখণ্ড সবুজ কাগজের ওপর দ্রুত হাতে কী যেন লিখে চলেছেন। তাঁর পাশে দাঁড়ানো রফি রাজাও সবুজ রঙা সেই কাগজের ওপর ঝুঁকে আছেন। ঠিক একই সময়ে দীর্ঘদেহী, কৃশকায় অথচ ভুঁড়িওয়ালা এক লোক ছায়ামূর্তিগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন। অসময়ের দর্শনার্থী ভেবে আমাকে তিনি নিয়ে চললেন সেই বসার ঘরটিতে। পেছন থেকে আমাদের লক্ষ্য করে ভুট্টো বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বসেন গিয়ে। খানিক বাদেই আমি এসে হাজির হচ্ছি।’ কৃশকায় ওই লোক আমাকে কোমল পানীয় খেতে দিয়ে নিজেকে একজন কর্নেল বলে পরিচয় দিলেন। সামরিক ঘটনাবলির ব্যাপারে ব্রিফ করার জন্য উপপ্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রয়েছেন তিনি। আমার বরং মনে হলো ওর আসল কাজ ভুট্টোর ওপর সারাক্ষণ নজর রাখা। কেউ একজন এসে ফরমান আলীর সেই টেলিগ্রামের একটি কপি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী চান আপনি এটা পড়ে দেখেন।
আমেরিকানরা পুরোটা ব্যাপারকেই অবাস্তব বলে গণ্য করলেও যখন দেখল এর পরীক্ষিত বন্ধুরাষ্ট্রটি রাজনৈতিক ও সামরিক হুমকির মুখে, তখন তাদের টনক নড়ল। পাকিস্তান যদি হেরে যায় কিংবা যদি ভারতের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তাহলে সেটা হবে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের বড় পরাজয়।
ওই টেলিগ্রামে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ঢাকায় সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসলামাবাদ ‘চরম ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ গ্রহণের দায়িত্ব স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করেছে বলেও উল্লেখ রয়েছে। এর পরেই এসেছে আসল প্রসঙ্গটি: (১) অনতিবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, (২) সশস্ত্র বাহিনীকে সসম্মানে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো, (৩) পশ্চিম পাকিস্তানি সব বেসামরিক নাগরিককেও একইভাবে ফেরত পাঠানো এবং (৪) ১৯৪৭ সালের পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরতদের নিরাপত্তা ও যেকোনো প্রতিশোধস্পৃহার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে অনুরোধ জানানো হয়। ওই তারবার্তায় জোর দিয়ে বলা হয়, এ হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব। একে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব বলে গণ্য করা যাবে না। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রের কনসালরা যাতে অবিলম্বে শহরটির (ঢাকা) নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন, টেলিগ্রামে সে প্রস্তাবও রাখা হয়।
উ থান্ট অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি ও পাঁচটি স্থায়ী সদস্যকে বার্তাপ্রাপ্তি এবং এর বক্তব্যের কথা জানালেন। উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চিয়াও কুয়ান হুয়া সাধারণ পরিষদে চীনা প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মহাসচিবের দেওয়া খবরটি গ্রহণ করতে রাজি না হয়ে, বরং বার্তাপ্রাপ্তির খবরটি প্রচারে উ থান্টের এই ভূমিকাকে পক্ষপাতিত্ব বলে সমালোচনা করলেন। অন্যদিকে দুই দিন পর সোভিয়েত প্রতিনিধি নিরাপত্তা পরিষদে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বললেন, পূর্ব পাকিস্তানেই বেশ কজন গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পরিস্থিতিকে বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে আগ্রহী।
জাতিসংঘের করিডরে যখন এই মর্মে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে পাকিস্তান যুদ্ধে ইতি টানতে রাজি, তখন ব্যাপারটা পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে দারুণ খাটো করল। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের অসম যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী হবে, সে নিয়ে কারও মনে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। ১৩ ডিসেম্বর ডেভিড হোসেগো দ্য টাইমস পত্রিকায় লিখলেন, পাকিস্তানি সৈন্য বা ইউনিটগুলোর নিজে থেকে আত্মসমর্পণের বেশ কিছু নজিরও দেখা গেছে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রেরিত বার্তাটি পরিস্থিতির ওপর অন্য রকম আলো ফেলল। তবু তখনো আমাদের মিত্রদের মধ্যে কারও কারও ধারণা ছিল যে আরও দিন কতক নিজেদের অবস্থানে টিকে থাকতে পারলে পাকিস্তানই জয়ী হবে। চীনা উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী চিয়াও কুয়ান হুয়া পাকিস্তান মিশনে গিয়ে পরের দিন সকালবেলা ভুট্টোর সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি জোরালো অনুরোধ জানালেন, পাকিস্তানি বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে আর একটা সপ্তাহ যেন প্রাণপণ যুদ্ধ চালিয়ে যায়। চিয়াও বললেন, যুদ্ধ যদি আরও সপ্তাহখানেক চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে ‘দারুণ লাভবান’ হওয়া যাবে। তিনি এ-ও বললেন, বেইজিং এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়, তা খতিয়ে দেখছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও চাপ ও পরামর্শ অব্যাহত ছিল। ঢাকার খবর জেনে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে অনুরোধ করল, আরও অন্তত দুটো দিন যেন লড়াই চালিয়ে যাওয়া হয়। কেননা, এ ব্যাপারে তারা সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ মানে বঙ্গোপসাগরে বিমানবাহী রণতরি ইউএস এন্টারপ্রাইজকে পাঠানো। কিন্তু বাস্তব অবস্থা যা, তাতে তেমন কোনো প্রভাব পড়ার অবকাশ আর ছিল না। তবে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের এই মনোভাবের উদ্দেশ্য ছিল চীনাদের জন্য একটি অনুকূল সংকেত দেওয়া। ‘একটা কিছু করো’এই চাপের মধ্যে থেকে আমেরিকানরা এ অবস্থায় কী ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে, সে ব্যাপারে চীনারা লিখিত আশ্বাস দাবি করল। চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বের ব্যাপারটি তখনো ছিল নতুন। এ কারণে চীনারা উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবছিল, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো চীনকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে এক আত্মঘাতী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজে নিরাপদ দূরত্বে বসে নীরব দর্শকের ভূমিকা নেবে।
এদিকে ভুট্টো কমপক্ষে আরও একটি সপ্তাহ লড়াই অব্যাহত রেখে পশ্চিম দিকে কার্যকর পাল্টা আঘাত হানার জন্য ইয়াহিয়া খানকে জোরালো অনুরোধ জানালেন। জবাবে ইয়াহিয়া যে তারবার্তাটি ভুট্টোর কাছে পাঠালেন, তা ছিল দ্ব্যর্থবোধক ও বিভ্রান্তিকর। ওই বার্তায় ফরমান আলীর বার্তাটিকে ‘ভুল’ বলে আখ্যায়িত করে বলা হয়, ‘আরও এক সপ্তাহ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে “আমাদের জন্য মারাত্মক”।’ আর পশ্চিমাঞ্চলীয় সেক্টরে বড় ধরনের পাল্টা আঘাত হানার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আঞ্চলিক সমর অধিনায়কদের ওপর।
চিয়াও বললেন, যুদ্ধ যদি আরও সপ্তাহখানেক চালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে বেইজিং এই পরিস্থিতিতে কী করা যায়, তা খতিয়ে দেখছে। একইভাবে ঢাকার খবর জেনে যুক্তরাষ্ট্র ইসলামাবাদকে অনুরোধ করল, আরও অন্তত দুটো দিন যেন লড়াই চালিয়ে যাওয়া হয়।
পরের দিন সকালে মন্ত্রীর (ভুট্টোর) হোটেলকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত সবার মাথায় ছিল একটাই প্রশ্ন: ‘চীনারা কিছু করবে, নাকি করবে না?’ ভুট্টোর পেছনে ছায়ার মতো লেগে থাকা সেই কর্নেল বললেন, আর একটি মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে এখনই চীনাদের তরফে বড় ধরনের হস্তক্ষেপ জরুরি। চীনাদের পক্ষ থেকে কী করার সম্ভাবনা রয়েছে, ভুট্টো সে ব্যাপারে সবার মতামত জানতে চাইলেন। উত্তর কী হবে, ভুট্টো সেটা ভালোভাবেই জানতেন। ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ভুট্টো নিরাপত্তা পরিষদে পাকিস্তানের বিষয়টি উত্থাপন করলেন। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই তিনি তাৎক্ষণিক বক্তব্য দেন। তাঁর দুই ঘণ্টা লম্বা বক্তব্য শেষ হলো ঠিক মধ্যরাতে। পরের দিন সকালে দ্য লন্ডন টাইমস পত্রিকার প্রতিবেদক তাঁর প্রতিবেদনে লিখলেন, মি. ভুট্টোর পরামর্শটা মাত্র পাঁচটি শব্দেই দেওয়া যেত, ‘সক ইট টু দেম বেবি!’ এর পরের দিনগুলোয় কোনো ধরনের হিসাব-নিকাশের সময় আর ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের সামরিক অবস্থান ঘণ্টায় ঘণ্টায় মুখ থুবড়ে পড়ছিল। আমাদের সৈন্যদের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ভারতীয় বাহিনীর হাতে যশোরের পতন ঘটল। শেষ মুহূর্তের প্রতিরোধের জন্য আমাদের সৈন্যরা দুটি স্থানে এসে জড়ো হচ্ছিলেন বলে খবর পাওয়া গেল। (আর এদিকে বিদেশি সাংবাদিকেরা ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যশোরে প্রবেশ করার পরও পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ‘যশোর এখনো পাকিস্তানের হাতে’ বলে সামনে গলাবাজি চালিয়ে যাচ্ছিল।) অবস্থা এমন দাঁড়াল যে নিরাপত্তা পরিষদে নতুন যেকোনো উদ্যোগ মানেই ছিল ভারতের জন্য মওকা। আর এ সুবাদে প্রতিটি উদ্যোগকেই ভন্ডুল করে দিচ্ছিল তারা। এই পর্যায়ে এসে ভারতের লক্ষ্য ছিল একটাই—ঢাকা অবরোধ করে পাকিস্তানি বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। ওই লক্ষ্য অর্জনে ভারতের দরকার ছিল আর মাত্র কয়েকটি দিন। আর নিরাপত্তা পরিষদের কার্যবিবরণীতে যে সময়ের কথা উল্লেখ ছিল, ভারতের জন্য তা ছিল পর্যাপ্ত। পাকিস্তান মিশনের এক কর্মকর্তা আড়ি পেতে শুনতে পেলেন, একজন ভারতীয় কূটনীতিক সোভিয়েতদের নিরাপত্তা পরিষদে বিতর্ক মঙ্গল-বুধবার পর্যন্ত স্থগিত রাখতে বলছেন। তাঁদের আশা, ওই সময়ের মধ্যেই ঢাকা ভারতীয়দের কবজায় এসে পড়বে। কথা রাখল সোভিয়েতরা। যারপরনাই অকারণে অধিবেশনের কাজ নানা ছলছুতোয় তারা বাধাগ্রস্ত করে চলল; চলল লম্বা বক্তৃতা, পয়েন্টস অব অর্ডার, প্রস্তাব ইত্যাদি। সচরাচর কম কথা বলতে অভ্যস্ত গম্ভীর স্বভাবের কমরেড ইয়াকব মালিকের কণ্ঠে কথার খই ফুটতে শুরু করল। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীকে তিনি বর্ণনা করলেন, ‘আমাদের প্রাণের প্রিয়...লেনিনের স্বপ্ন’ ইত্যাদি গালভরা বুলি দিয়ে। সবচেয়ে বড় যে উদ্যোগটা তিনি নিলেন, তা হচ্ছে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিরাপত্তা পরিষদে এসে ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর একটি সোভিয়েত প্রস্তাব। ১৪ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের জন্য ভারতের দাবির পটভূমিতে নিরাপত্তা পরিষদ পরের দিন সকাল ৯টায় নাকি সাড়ে ৯টায় আবার বৈঠকে বসবে, সে নিয়ে বিতর্ক করেই ৪০ মিনিট পার করে দিল।
যুক্তরাজ্য নিজস্ব একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে ফ্রান্সের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছিল। তবে তখনো তাদের এ ব্যাপারে কাজ শেষ করতে বাকি থাকায় তারা ২৪ ঘণ্টার জন্য অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রস্তাব করল। কিন্তু যখন পেশ করার জন্য খসড়াটি চূড়ান্ত করা হলো, তখন আর সময় নেই। জাতিসংঘে একজন ব্রিটিশ প্রতিনিধি আমাদের জানালেন, নিয়াজি যেহেতু ভারতীয় অধিনায়ককে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব করেছেন, সেহেতু তাঁরা তাঁদের চূড়ান্ত খসড়ায় ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বানটি আর রাখবেন না। আর সোভিয়েতরা এরই মধ্যে ইঙ্গিত দিয়ে রাখল, খসড়া প্রস্তাবের বিরুদ্ধেও তারা ভেটো দেবে।
নিয়াজি নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার জন্য ‘কয় ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি’র যে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, ভারতীয় পক্ষের অধিনায়ক তাতে সাড়া দিলেন। তবে তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছাড়া কোনো কিছুই তাঁরা মেনে নেবেন না।
চতুর্দিক থেকে অবরুদ্ধ, মনোবল হারিয়ে বসা পাকিস্তানি কমান্ডের ওপর তারা সামরিক ও মনস্তাত্ত্বিক সব ধরনের চাপ অব্যাহত রাখল। তারা গভর্নর মালিকের বাসভবনের ওপর বোমা বর্ষণ করে নিয়াজিকে হুঁশিয়ার করে দিল যে ‘ঢাকার চারপাশ থেকে মরণফাঁসটা ক্রমশ আঁটসাঁট করা হচ্ছে।’ ঢাকার পতন তখন সময়ের ব্যাপারমাত্র। গভর্নর মালিক নামাজ আদায় করে কাঁপা কাঁপা হাতে তাঁর পদত্যাগপত্র লিখলেন। তখনো আমেরিকানরা আরও কয়টা দিন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়ে যাচ্ছিল। আগা শাহী আমাকে বললেন, চীন ‘কিছু একটা’ করতে যাচ্ছে। চীনা হস্তক্ষেপের ব্যাপারে জল্পনা-কল্পনাটা শুরু করেছিলেন আসলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র। তিনি প্রচার করলেন যে চীন সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপের পথে এগোচ্ছে বলে ভারত জানতে পেরেছে। চীনের দুরভিসন্ধির ব্যাপারে উদ্বেগ ছড়ানোর পেছনে সম্ভবত ভারতের নিজস্ব যুক্তি ছিল। ওই রকম অবস্থায় চীনের করার আর মতো কীই–বা ছিল? পরের দিনই নিয়াজি আত্মসমর্পণে রাজি হয়ে বসলেন, আর এভাবে নটেগাছটিও মুড়াল। ইয়াহিয়া চক্রকে পূর্ব পাকিস্তানে ১০ মাস দীর্ঘ সামরিক অভিযানের পুরো সময়টা সমস্যার রাজনৈতিক সুরাহার সুযোগ বারবার হাতে পেয়েও ইয়াহিয়া চক্র তা গ্রহণ করেনি। এমনকি ৪ ডিসেম্বর (ভুট্টো জাতিসংঘে এসে পৌঁছানোর আগে) সোভিয়েতরা ‘সংঘাতের রাজনৈতিক সুরাহার’ আহ্বান জানিয়ে যখন একটি খসড়া প্রস্তাব দিল, তখনো ইয়াহিয়া চক্র তাতে আমল দেয়নি।
১৫ ডিসেম্বর পোল্যান্ড মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি প্রস্তাব আনল বটে, কিন্তু তখন সময় হাত ফসকে বেরিয়ে গেছে। নিরাপত্তা পরিষদের লাউঞ্জে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্য চার্লি না’শ আমাকে বললেন, ‘এ মুহূর্তে মুশকিল হলো পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচানো...’
১৬ ডিসেম্বর বিকেলবেলা ঢাকায় আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষর হলো। নিউইয়র্কে তখন সকাল ৯টা। টিকারে আত্মসমর্পণের খবর আসতে লাগল। এদিকে ইয়াহিয়ার সর্বশেষ নির্দেশ–সংবলিত একটি তারবার্তা পৌঁছালো ভুট্টোর নামে।
নিরাপত্তা পরিষদ হচ্ছে ‘সেই ফ্যাশন হাউস, যেখানে জগতের তাবৎ নোংরামি সুন্দর কথায় মোড়ানো।’ আগের দিন এই বলে গজগজাতে গজগজাতে ওয়াকআউট করেছেন ভুট্টো। সদস্যদের উদ্দেশ করে তিনি ক্রুদ্ধস্বরে ঘোষণা দিলেন, ‘শিকেয় তুলে রাখো তোমার নিরাপত্তা পরিষদ। আমার দেশের একাংশ অন্যের দখলে চলে যাবে, সেটা হজম করার দলে আমি নেই!’ এরপরই উঠে দাঁড়িয়ে হাতে ধরা একতাড়া কাগজ ছিঁড়ে কুটি কুটি করে শূন্যে ছুড়ে মেরে ঝড়ের বেগে অধিবেশন চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। পড়িমরি করে পেছনে ছুটলেন একদল সাংবাদিক। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল পরিষদের সদস্যরা অপস্রিয়মাণ মূর্তিটির দিকে নীরবে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। আর এদিকে ভুট্টোর নিজ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মুহূর্তের জন্য সম্বিৎ হারিয়ে পরক্ষণেই বিশৃঙ্খল ছোটাছুটির মধ্যে ছুটলেন তাঁর পেছন পেছন। আগা শাহিই কেবল দাবি করল যে এই কাজে সে মোটেই অবাক হয়নি। আমাকে সে পরে বলেছিল, ‘আমি নিশ্চিত যে বৈঠকে আসার আগে ভুট্টো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটারই মহড়া দিয়েছে।’
ঢাকায় পল্টন ময়দানে (আসলে হবে রেসকোর্স ময়দান: অনুবাদক) আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি ছিল দীর্ঘ; শেষে খাবারের আয়োজনও ছিল। এক ভারতীয় জেনারেলের রুচিতে বাঁধেনি তাঁর বিজয়ের আনন্দ তাড়িয়ে উপভোগের জন্য নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে আসতে। নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ করলেন, তখন জেনারেল-পত্নী তাঁর স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে তা প্রত্যক্ষ করলেন। অবজারভার পত্রিকার ১৯ ডিসেম্বর সংখ্যায় গ্যাভিন ইয়ং বর্ণনা লিখলেন সেই ঘটনার। করুণঘন ভঙ্গিতে তিনি ‘কপালপোড়া ব্যাঘ্র নিয়াজির’ কথা বয়ান করলেন। ওই দিন সকালে পাকিস্তানের স্তূপাকার সব অপমানের বোঝা একা নিজের কাঁধে তুলে নিলেন নিয়াজি। গোড়ার দিকের আস্ফালন ও বুক-চাপড়ানো বাহাদুরির কারণে তাঁর অপমানের বোঝা আরও বাড়ল। তবে তাঁরা ছিলেন সেই ভ্রান্ত পলিসিরই অসহায় ক্রীড়নকমাত্র, যা ডেকে এনেছে এই বিপর্যয়। গ্যাভিন ইয়ংকে তিনি বলেছিলেন, আমেরিকানরা ও চীনারা তাঁকে হস্তক্ষেপ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল। এবার দুশ্চিন্তাটা হলো, বাকি পাকিস্তানের ভাগ্য কী হবে। যুক্তরাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলল, যদি তারা ভারতকে যুদ্ধবিরতি ও দখল ছেড়ে দিতে রাজি না করায়, তাহলে গোটা সোভিয়েত-মার্কিন সম্পর্ক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত জর্জ বুশ নিরাপত্তা পরিষদে ভারতকে লক্ষ্য করে কিছু চোখা প্রশ্নবাণ ছুড়লেন—‘ভারত কি চায় পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান বাহিনীকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে? ভারত কি চায় ১৯৪৮, ’৪৯ এবং ’৫০ সালের গৃহীত জাতিসংঘ সিদ্ধান্তকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের অংশবিশেষ দখল করে নিতে? ভারত আসলে কী চায়, জানার অধিকার বিশ্ববাসীর আছে।’
‘আমার দেশের একাংশ অন্যের দখলে চলে যাবে, সেটা হজম করার দলে আমি নেই!’ বলে একতাড়া কাগজ ছিঁড়ে শূন্যে ছুড়ে মেরে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন। আগা শাহি বলেছিল, ‘আমি নিশ্চিত যে বৈঠকে আসার আগে ভুট্টো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো ব্যাপারটারই মহড়া দিয়েছে।’
ভারত কী জবাব দেয়, তা শোনার জন্য ১৮ ডিসেম্বর দুপুরবেলা নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসল। শরণ সিং ঘোষণা করলেন: জোরপূর্বক দখল বা অন্য কোনোভাবে পশ্চিম পাকিস্তান বা বাংলাদেশের কোনো অংশ কুক্ষিগত করার কোনো দুরভিসন্ধি ভারতের নেই। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান যদি আমাদের নিরাপত্তার ওপর থেকে হুমকি সরিয়ে নেয়, তাহলে আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধানকে সামনে রেখে যুদ্ধবিরতি ও সেনা প্রত্যাহারের যেকোনো প্রস্তাব সানন্দে বিবেচনা করে দেখব।
শেষমেশ জুড়ে দেওয়া শর্তটি ছিল কৌতূহলোদ্দীপক। আর তার ঘোষণাটি ছিল ‘যদি’ এবং ‘কিন্তু’র ঘেরাটোপে বাঁধা। অধিকন্তু, একটিবারও কাশ্মীর নিয়ে এতে কোনো কথা বলা হয়নি।
আগের দিন সন্ধ্যায় পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলটি পশ্চিমা রণাঙ্গনে ভারতের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীর একতরফা যুদ্ধবিরতির ঘোষণা শোনার অসহনীয় মর্মজ্বালা এড়াতে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে যোগদান করা থেকে বিরত থাকল। পরিষদের বৈঠকে কী কী হচ্ছে না হচ্ছে, তার খবরাখবর রাখতে আমরা কয়েকজন পরিষদকক্ষের লাগোয়া নিরাপত্তা পরিষদ লাউঞ্জে বসে আছি। একজন একজন করে ভারতীয় প্রতিনিধি বৈঠকের উদ্দেশ্যে চলেছেন। তাঁদের কারও পক্ষেই সম্ভব ছিল না দীর্ঘকালীন দুশমন এবং এ মুহূর্তে মাথা-হেট দেশের প্রতিনিধিদের দিকে বাঁকা চোখে তাকানোর লোভ সংবরণ করা। কাজটা মানুষমাত্রেই স্বাভাবিক হলেও, তা ছিল আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় জেনারেলের নিজের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হওয়ার মতোই অশোভন। ওসবের মধ্যে ইসলামাবাদ থেকে উড়ে এল আরেক সংবাদ: ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানসহ প্রদেশগুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দিয়ে একটি সাংবিধানিক ডিসপেনসেশন ঘোষণা করেছেন।
সংকটকালে জাতিসংঘে পাকিস্তানকে সমর্থনকারী ৫০টির মতো দেশকে ধন্যবাদ জ্ঞাপনের জন্য ভুট্টো দ্য পিয়েরে হোটেলে এক মধ্যাহ্নভোজ দিলেন। ভোজের আগে তিনি রাষ্ট্রদূত নিয়াজ নায়েক, আকবর তৈয়বজি এবং আমি—প্রতিনিধিদলের এই তিন সদস্যকে তাঁর হোটেলকক্ষে ডেকে পাঠিয়ে এরপর কী করণীয়, তা জানতে চাইলেন। আমার বিনীত অভিমত ছিল: অতীত ঘটনা, সামরিকতন্ত্র ও এর প্রতিভূ যা কিছু আছে, তাকে দূরে সরিয়ে রেখে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে তাঁকে নিজের দেশে যেতে দেওয়ার মাধ্যমে সবকিছু নতুনভাবে শুরু করা। ভোজে আমন্ত্রিতদের মধ্যে প্রতিনিধিদলের তিনজন পূর্ব পাকিস্তানি সদস্যও প্রতীকী অংশগ্রহণ করলেন। লাঞ্চ টেবিলে শোকে পাথর হয়ে ভূতের মতো চেহারা নিয়ে বসে ছিলেন তাঁরা। ভুট্টো ভোজ শেষে তাঁর বক্তব্য রাখার সময় এদের মধ্যে একজন আইনজীবী জুলমত আলী শিশুর মতো হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। হার্ভার্ড থেকে আসা বেনজির টেবিলে তাঁর পিতার পাশটিতে বসলেন। ভুট্টো বেনজিরের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে জানালেন, তিনি বেনজিরকে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের জন্য আসতে বলেছেন, যাতে করে বড় হলে তিনি তার দেশের মুহূর্তগুলোকে স্মরণ করতে পারেন, যাতে এই শিক্ষাটুকু বেনজির পান যে চূড়ান্ত দুঃসময়েও একটি জাতিকে মাথা উঁচু রাখতে হয় এবং অন্ধকারতম মুহূর্তে ভবিষ্যতের দিকে আশা নিয়ে তাকাতে হয়।
এমন সময় পাশের কক্ষে টেলিফোন বেজে উঠল, কে একজন দৌড়ে এসে জানাল ইসলামাবাদ থেকে ফোনে ভুট্টোকে চাওয়া হচ্ছে। টেলিফোন লাইন খারাপ থাকায় ওপাশ থেকে যাতে ভালোভাবে শোনা যায় সে জন্য ভুট্টোকে চেঁচিয়ে কথা বলতে হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, ‘প্লিজ, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কিছু করবেন না। আমি সোজা চলে আসছি।’ বেশ কয়বারই তিনি ‘প্লিজ কিছু করবেন না’ বললেন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে মোস্তফা খার ভুট্টোকে বলছিলেন, দেশের পরিস্থিতি চূড়ান্ত উত্তেজনাকর এবং যেকোনো মুহূর্তে তা নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। ভুট্টো এরই মধ্যে কালবিলম্ব না করে দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য ইয়াহিয়ার কাছ থেকে জরুরি তলব পেয়েছেন। দেশজুড়ে জ্বলে উঠল বিক্ষোভের লেলিহান আগুন। বিক্ষোভকারীরা ইয়াহিয়ার মৃত্যু দাবি করছিল।
ভুট্টোর বিরোধীরা বলে বেড়াচ্ছিল ভুট্টোই আসল কালপ্রিট।
বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ হলেও আধুনিক যুদ্ধ-সংঘাতে হরহামেশাই তা ঘটেছে। এর সাক্ষী লেবানন, বসনিয়া ও চেচনিয়া। পাকিস্তানের বেলায় কেবল পূর্ব পাকিস্তানেই তা সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বারবারই ঘটেছে, ভুট্টোর আমলে বেলুচিস্তানে এবং জিয়াউল হকের আমলে সিন্ধুতে। তবে বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশভাবে জয়ী হওয়ার পরও যা ঘটানো হলো, এককথায় তাকে মারাত্মক ভুল এবং অপরাধই বলতে হয়। আরও বাজে ব্যাপার হলো, দেশের সর্ববৃহৎ প্রদেশটিতে ইয়াহিয়া-নির্দেশিত কর্মকাণ্ডের পেছনে কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল বলে মনে হয় না। এবং তাতে ছিল না কোনো সঠিক ও যথার্থ কুশলতার ছাপ। বাঙালিদের বেছে বেছে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া ও তাঁর মন্ত্রদাতারা ‘দেখি না কী হয়’ ভাব করে বসে থেকেছিলেন। এরপর তাঁদের কী করণীয় এবং কী ঘটে চলেছে তা তাঁরা জানেন, এমনটি কখনোই মনে হয়নি। ইয়াহিয়াতন্ত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলে পুরে দীর্ঘ প্রায় ৯টি মাস তাঁকে আটকে রাখল। অথচ তারা তাঁর সঙ্গে গ্রহণযোগ্য মীমাংসায় পৌঁছানোর কোনো চেষ্টাই করল না। দেখেশুনে মনে হয়, ইয়াহিয়াতন্ত্রের রাজনৈতিক কৌশলের ভিত্তিমূলে ছিল সেই বালকসুলভ বিশ্বাস, ‘ডান্ডা’ দিলে বাঙালি‘বাবু’ ঠান্ডা!
• ভাষান্তর: জুয়েল মাজহার