সমতল লোহায় প্রাকৃতিক দৃশ্য

জাপানের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির ‘আফটার দ্য কোয়েক’—১৯৯৫ সালের হানশিন ভূমিকম্পের ছায়ায় লেখা ছয়টি গল্পের সংকলন। ‘আফটার দ্য কোয়েক’ বইয়ের দ্বিতীয় গল্প ‘ল্যান্ডস্কেপ উইথ ফ্ল্যাটআয়রন’-এর বাংলা রূপ ‘সমতল লোহায় প্রাকৃতিক দৃশ্য’।

• ভাষান্তর: জিয়া হাশান

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মধ্যরাতের ঠিক কয়েক মিনিট আগে জুনকোর চোখ যখন টেলিভিশনের দিকে, তখন ফোনটা বেজে ওঠে। তার বন্ধু কেইসুকি রুমের এক কোণে হেডফোন পরে বসা। সে আধাবোজা চোখে মাথা এদিক–ওদিক দোলায়, আর দ্রুত তালের একটা সুর বাজানোর চেষ্টা চালায়। তাই তার লম্বা আঙুলগুলো বিদ্যুৎ–গতিতে ইলেকট্রিক গিটারের তারের ওপর ছুটে বেড়ায়। ফলে ফোন বাজার শব্দ তার কানেই যায় না। তাই জুনকো নিজে রিসিভারটা তোলে।

সাথে সাথে ওপাশ থেকে মিয়াকির চেনা স্বর ভেসে আসে। খানিকটা ওসাকার আঞ্চলিক উচ্চারণে জিজ্ঞেস করে—‘তোমার ঘুম কি ভেঙে দিলাম?’

‘না,’ জুনকো বলে। ‘আমরা এখনো জেগেই আছি।’

‘আমি সমুদ্রসৈকতে আছি। এখানে এত কাঠ ভেসে এসেছে দেখলে অবাক হবে! এবার আমরা একটা বড় দেখে বনফায়ার বানাতে পারব। তুমি আসবে?’

‘নিশ্চয়ই,’ জুনকো বলে। ‘কাপড়টা বদলে নিয়ে দশ মিনিটের মধ্যে আসছি।’

হারুকি মুরাকামি। প্রতিকৃতি: মাসুক হেলাল

সে পায়ে টাইটস চড়ায়, তারপর জিনস। ওপরের দিকে গলাবন্ধ সোয়েটার পরে নেয়, আর উলের কোটের পকেটে গুঁজে দেয় এক প্যাকেট সিগারেট, পার্স, দেশলাই, চাবির গোছা। শেষে পা দিয়ে কেইসুকির পিঠে হালকা ঠেলা মারে। তাতে করে সচেতন হয়ে কেইসুকি ঝটপট হেডফোন খুলে ফেলে।

‘বিচে একটা বনফায়ার করতে যাচ্ছি,’ জুনকো বলে।

‘আবার সেই মিয়াকির কাছে?’—ভ্রু কুঁচকে বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করে কেইসুকি। ‘মজা করছ? এখন ফেব্রুয়ারি, জানো তো। রাত বারোটা! এই সময়ে তুমি বনফায়ার করতে যাবে?’

‘ঠিক আছে, তোমার যেতে হবে না। আমি একাই যাব।’

কেইসুকি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে—‘না, ঠিক আছে, আমি আসছি। কাপড় পাল্টাতে এক মিনিট সময় দাও।’

সে তার গানের যন্ত্রপাতি বন্ধ করে পায়জামার ওপর প্যান্ট, সোয়েটার আর পালকের জ্যাকেট পরে নেয়। চিবুক পর্যন্ত তুলে তার জিপ বন্ধ করে দেয়। এ সময়ে জুনকো গলায় একটা স্কার্ফ পেঁচিয়ে নিয়ে মাথায় একটা বোনা টুপি চড়ায়।

বিচের দিকে নামা পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কেইসুকি বলে, ‘তোমরা দুজনই পাগল। বনফায়ারে এমন কী মজা আছে?’

রাতটা ভীষণ ঠান্ডা, তবে বাতাস একেবারেই নাই। মুখ থেকে বেরোনো কথাগুলো যেন মাঝ আকাশেই জমে ঝুলে যায়।

‘পার্ল জ্যামের গানে এমন কী আছে?’ জুনকো বলে। ‘সব মিলিয়ে তো কেবল আওয়াজ আর আওয়াজ।’

‘পার্ল জ্যাম ব্যান্ডের ভক্ত সারা বিশ্বজুড়ে এক কোটির বেশি,’ কেইসুকি বলে।

‘তাই,’ জুনকো বলে, ‘পঞ্চাশ হাজার বছর ধরেই তো বিশ্বজুড়ে লোকজন বনফায়ারের ভক্ত।’

‘তোমার কথায় যুক্তি আছে বটে,’ কেইসুকি বলে।

‘পার্ল জ্যাম হারিয়ে যাওয়ার অনেক পরেও অনেক মানুষ আগুন জ্বালাবে।’

‘তোমার এ কথায়ও কিছুটা যুক্তি আছে বটে,’ কেইসুকি ডান হাতটি পকেট থেকে বের করে বান্ধবীর কাঁধে হাত দিয়ে বলে, ‘সমস্যা হলো, পঞ্চাশ হাজার বছর আগে বা পঞ্চাশ হাজার বছর পরের কোনো কিছুর সাথেই আমার কোনো যোগ নেই। একেবারেই নেই। তবে যা গুরুত্বপূর্ণ, তা হলো এখন। কে জানে পৃথিবী কখন খতম হবে? কে ঠিক করতে পারে ভবিষ্যৎ? একমাত্র বিবেচনার বিষয় হলো—আমি কি এই মুহূর্তে আমার পেট ভরাতে পারছি এবং ঠিক এখন তা বের করতে পারছি কি না। তাই?’

তিনজন নীরবে তাকিয়ে থাকে ভেসে আসা কাঠের স্তূপপানে। একসময় তার ভেতরে গুঁজে দেওয়া খবরের কাগজগুলো হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, তবে তার শিখা এক মুহূর্তের জন্য নেচে উঠেই কুঁচকে গিয়ে নিভে যায়। নাহ! কিছুই হলো না, ভাবে জুনকো। কাঠগুলো নিশ্চয়ই দেখতে যতটা শুকনো দেখায়, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি ভেজা।

তারা তীররক্ষা বাঁধের ধাপগুলো পার হয়ে এগিয়ে যায়। নিচের বিচে মিয়াকিকে পায়। তিনি ভেসে আসা ছোট-বড় নানা আকারের কাঠ সংগ্রহ করে একটা সুন্দর স্তূপ গড়ে তুলেছেন। তার ভেতরে একটা বিশাল গুঁড়ি দেখা যায়। সম্ভবত অনেক টানাহেঁচড়া করে সেটা এনেছেন।

চাঁদের আলোয় সাগরের তীর যেন এক ধারালো তলোয়ারের আকার নেওয়া। তাতে শীতকালের ছোট ছোট ঢেউ একেবারে চুপচাপ এসে বালির ওপর আছড়ে পড়ছে। সৈকতে একমাত্র মিয়াকি ছাড়া আর কাউকেই দেখা যায় না।

‘কাঠের স্তূপটা ভালো হয়েছে, তাই না?’ তিনি সাদা ধোঁয়ার মতো নিশ্বাস ফেলে বলেন।

‘অবিশ্বাস্য!’ জুনকো বলে।

‘এ রকম কাঠ মাঝেমধ্যে আসে। জানো তো, সেদিন যে ঝড় হয়েছিল, বড় বড় ঢেউ এসেছিল। তখনই বলেছিলাম, ‘আজকে হয়তো আগুন ধরানোর মতো কিছু কাঠ ভেসে আসবে।’

‘ওকে, ওকে, আমরা বুঝে গেছি আপনি বেশ বলেন,’ হাত দুটো ঘষতে ঘষতে কেইসুকি বলে।

‘এবার চলো শরীরটা গরম করে নেই। এমন শীত যে বললে বিশ্বাস করবে না—গা-টা একেবারে কুঁচকে যাচ্ছে।’

‘এই, একটু ধীরে ভাই। বনফায়ার করারও একটা নিয়ম আছে। আগে পরিকল্পনা করতে হয়। সবকিছু এমনভাবে গুছিয়ে নিতে হবে, যাতে পরে কোনো গন্ডগোল না হয়। এরপর ধীরে ধীরে আগুন ধরাতে হবে। তাড়াহুড়া করলে চলবে না। ধৈর্য ধরলে ভিক্ষুকও তার ভাত জোটাতে পারে।’

‘হ্যাঁ তাই’—কেইসুকি বলে। ‘ঠিক যেমন ধৈর্য ধরলে বেশ্যার ভাত জোটাতে কোনো সমস্যা হয় না।’

মিয়াকি মাথা নেড়ে বলেন, ‘সব সময় এমন ফালতু রসিকতা করার বয়স এখনো তোমার হয়নি।’

মিয়াকি বড় বড় কাঠের গুঁড়ি আর ছোটখাটো কাঠের টুকরা নিপুণভাবে একে–অপরের সঙ্গে জড়িয়ে এমনভাবে সাজিয়ে নেন যে তার কাঠের স্তূপটি দেখতে যেন কোনো আধুনিক শিল্পীর গড়া পরীক্ষামূলক ভাস্কর্যের মতো হয়ে দাঁড়ায়। কয়েক কদম পেছনে সরে গিয়ে তিনি মনোযোগ দিয়ে নিজের গড়া কাঠামোটার চেহারাসুরত পরীক্ষা করেন। এরপর কিছু কাঠ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেন, শেষে আবার অন্যদিক ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকান—এভাবে তিনি কয়েকবার করেন। সব সময় একই রকম করে। কাঠগুলোর পারস্পরিক বিন্যাসের দিকে একবার তাকালেই তার মনে ভেসে ওঠে আগুনের শিখার সূক্ষ্মতম নড়াচড়ার কল্পচিত্র—ঠিক যেমন ভাস্কর একখণ্ড পাথরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা মূর্তিটার ভঙ্গি আগেই কল্পনা করে নেয়।

মিয়াকি ধীরেসুস্থেই কাজ করেন। সবকিছু নিজের মনমতো সাজানো হয়ে গেলে তিনি যেন নিজেকেই বলেন—এটাই, একদম ঠিক—এই ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন। এরপর সঙ্গে আনা খবরের কাগজগুলো গুটিয়ে নিয়ে কাঠের স্তূপের নিচের ফাঁকফোকরের ভেতর গুঁজে দেন এবং একটা প্লাস্টিকের সিগারেট লাইটার দিয়ে তাতে আগুন ধরান। আর জুনকো পকেট থেকে সিগারেট বের করে একটা মুখে নিয়ে তাতে দেশলাই দিয়ে জ্বালায়। চোখ সরু করে মিয়াকির কুঁজো হয়ে থাকা পিঠ আর টাক পড়তে শুরু করা মাথার দিকে তাকিয়ে থাকে। তখনই তৈরি হয় শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত—আগুন কি ধরবে? বিশাল শিখায় কি তা হঠাৎ জ্বলে উঠবে?

তিনজন নীরবে তাকিয়ে থাকে ভেসে আসা কাঠের স্তূপপানে। একসময় তার ভেতরে গুঁজে দেওয়া খবরের কাগজগুলো হঠাৎ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, তবে তার শিখা এক মুহূর্তের জন্য নেচে উঠেই কুঁচকে গিয়ে নিভে যায়। নাহ! কিছুই হলো না, ভাবে জুনকো। কাঠগুলো নিশ্চয়ই দেখতে যতটা শুকনো দেখায়, আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি ভেজা।

এভাবে যখন তার আশাভঙ্গ হতে থাকে, তখনই স্তূপের ভেতর থেকে সাদা ধোঁয়ার একটা ফোঁয়ারা হঠাৎ আকাশের দিকে ছুটে ওঠে। বাতাস না থাকায় ধোঁয়ার রেখাটা এতটুকু ছড়িয়ে পড়ে না; বরং সোজা আকাশের দিকে উঠে যেতে থাকা একটা লম্বা সুতোর মতো দাঁড়িয়ে যায়। তার মানে কোথাও না কোথাও কাঠের স্তূপে আগুন লেগেছে—এ কথা বোঝা যায় ঠিকই, কিন্তু আগুনের শিখার দেখা পাওয়া যায় না কোথাও।

জুনকোর অভিমতটাকে শিক্ষক বিদ্রূপ করে বলেন, ‘মৃত্যুই নাকি সে আসলে চাইছিল? এটা তো আমার কাছে একেবারেই নতুন কথা! আর বেশ অদ্ভুত! বলতে গেলে, বেশ “মৌলিক’—তাই না?’ তিনি ক্লাসের সামনে জোরে জোরে জুনকোর মন্তব্যটা পড়ে শোনান, আর তা শুনে সবাই হেসে ওঠে। কিন্তু জুনকো জানত। তারা সবাই ভুল।

একটি শব্দও বলে না কেউ। কথাবার্তায় সব সময় উচ্ছ্বসিত কেইসুকিও হাত দুটি কোটের পকেটে গুঁজে দিয়ে মুখ বন্ধ রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। মিয়াকি বালিতে আরামে বসে যান। জুনকো সিগারেটটা আঙুলে ধরে দুহাত জড়িয়ে বুকের ওপর রাখে। যেন হঠাৎ যখন মনে পড়ে হাতে সিগারেট আছে, তখন মাঝেমধ্যে তাতে টান দেয়।

স্বাভাবিকভাবেই জুনকোর মনে পড়ে জ্যাক লন্ডনের ‘টু বিল্ড আ ফায়ার’ গল্পটার কথা। সেটা একা এক মানুষের গল্প—সে তুষারঢাকা আলাস্কার ভেতর দিয়ে পথ চলতে চলতে আগুন জ্বালাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আগুন ধরাতে না পারলে সে জমে মরে যাবে। সূর্য তখন অস্ত যেতে বসেছে। জুনকো খুব বেশি কল্পকাহিনি পড়েনি, কিন্তু হাইস্কুলের প্রথম বর্ষে গরমের ছুটিতে শিক্ষক জ্যাক লন্ডনের গল্পটা পড়তে দেন, এরপরও গল্পটা সে বারবার পড়েছে। পড়তে বসলে গল্পের দৃশ্যগুলো তার মনে সব সময়ই অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে ওঠে। সে যেন লোকটার ভয়, আশা আর হতাশা নিজের মতো করে অনুভব করতে পারে; মৃত্যুর কিনারায় দাঁড়িয়ে তার হৃৎস্পন্দনের ধকধকানিও যেন টের পায়।

তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, লোকটা অন্তরে অন্তরে আসলে মৃত্যুকেই কামনা করেছে। এ কথা জুনকো নিশ্চিতভাবে জানত। কীভাবে জানত, তা সে ব্যাখ্যা করতে পারত না, কিন্তু শুরু থেকেই সে বুঝেছিল। মৃত্যুই ছিল লোকটার প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা। জুনকো জানত—লোকটার জন্য সেটাই সঠিক পরিণতি। তবু তাকে সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়। বেঁচে থাকার জন্য তাকে এক দুর্বার প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। এই গভীর, মূলগত দ্বন্দ্বটাই জুনকোকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করে।

জুনকোর অভিমতটাকে শিক্ষক বিদ্রূপ করে বলেন, ‘মৃত্যুই নাকি সে আসলে চাইছিল? এটা তো আমার কাছে একেবারেই নতুন কথা! আর বেশ অদ্ভুত! বলতে গেলে, বেশ “মৌলিক’—তাই না?’ তিনি ক্লাসের সামনে জোরে জোরে জুনকোর মন্তব্যটা পড়ে শোনান, আর তা শুনে সবাই হেসে ওঠে।

কিন্তু জুনকো জানত। তারা সবাই ভুল। তা না হলে গল্পের শেষটা কীভাবে এত নীরব আর সুন্দর হতে পারে?

‘হায়! মিস্টার মিয়াকি,’ কেইসুকি একটু সাহস করে বলে, ‘আপনার কি মনে হয় না আগুনটা নিভে গেছে?’

‘চিন্তার কিছু নাই, আগুন কেবল ধরেছে। এখনই দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে। দেখছ না, ধোঁয়া উঠছে? কথায় আছে—যেখানে ধোঁয়া, সেখানেই আগুন।’

তাই! তবে আরেকটা কথাও তো আছে, ‘যেখানে রক্ত, সেখানেই উত্তেজনা।’

‘এই কথাটাই কি তুমি সব সময় বলো?’

‘না, কিন্তু আপনি কীভাবে এত নিশ্চিত যে আগুনটা নিভে যায়নি?’

‘আমি শুধু জানি। এটা আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে।’

‘এমন কৌশলে আপনি কীভাবে দক্ষ হলের, মিস্টার মিয়াকি?’

‘আমি একে “কৌশল” বলব না। বয় স্কাউটে থাকতে শিখেছি। স্কাউট হলে, পছন্দ করো বা না করো—আগুন জ্বালানো সম্পর্কে যা কিছু জানার আছে, সবই শিখতে হয়।’

‘বুঝেছি,’ কেইসুকি বলে। ‘আপনি একজন বয় স্কাউট ছিলেন, তাই তো?’

‘তবে সেটাই সব কথা নয়। আমার নিজেরও একধরনের প্রতিভা আছে। বড়াই করতে চাই না, কিন্তু বনফায়ার বানানোর ব্যাপারে আমার এমন একটা বিশেষ দক্ষতা আছে, যা বেশির ভাগ মানুষেরই নেই।’

‘তাতে নিশ্চয়ই আপনার অনেক আনন্দ হয়, কিন্তু আমার মনে হয় না এই প্রতিভা আপনাকে খুব বেশি টাকা এনে দেয়।’

‘সেটা ঠিক। টাকা একেবারেই আনে না,’ মিয়াকি হাসতে হাসতে বলেন।

শুনেছি আপনি কোবে থেকে এসেছেন, মিস্টার মিয়াকি,’ কেইসুকি হালকা চনমনে স্বরে বলে, যেন কথাটা হঠাৎ তার মাথায় এসেছে। ‘কানসাইয়ে গত মাসে যে ভূমিকম্প হয়েছে তাতে আপনার কোনো আত্মীয়স্বজন বা এমন কেউ কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?’ ‘ঠিক জানি না,’ মিয়াকি বলেন। ‘কোবে’র সঙ্গে আমার এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। বহু বছর হলো।’

তিনি যেমন মনে করেছিলেন, তেমনি কাঠের গাদাটার মাঝখানে কয়েকটি ছোট শিখা টিমটিম করে জ্বলে উঠতে শুরু করে, সঙ্গে শোনা যায় ক্ষীণ খসখস শব্দ। জুনকো দীর্ঘক্ষণ ধরে আটকে রাখা নিশ্বাস ছেড়ে দেয়। এখন আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তাদের আগুন জ্বলবেই। সদ্য জন্ম নেওয়া শিখাগুলোর দিকে মুখ নিয়ে তিনজনই হাত বাড়িয়ে দেয়। আর কীভাবে অল্প অল্প করে আগুনের শক্তি বাড়ছে তা নীরবে তাকিয়ে দেখা ছাড়া পরের কয়েক মিনিট তাদের আর কিছুই করার থাকে না। জুনকো ভাবে, পঞ্চাশ হাজার বছর আগের মানুষগুলোও নিশ্চয় এমনই বোধ করত, যখন তারা আগুনের দিকে হাত বাড়িয়ে দিত।

শুনেছি আপনি কোবে থেকে এসেছেন, মিস্টার মিয়াকি,’ কেইসুকি হালকা চনমনে স্বরে বলে, যেন কথাটা হঠাৎ তার মাথায় এসেছে। ‘কানসাইয়ে গত মাসে যে ভূমিকম্প হয়েছে তাতে আপনার কোনো আত্মীয়স্বজন বা এমন কেউ কি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?’

‘ঠিক জানি না,’ মিয়াকি বলেন। ‘কোবে’র সঙ্গে আমার এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। বহু বছর হলো।’

‘বহু বছর থেকে? তা হলেও আপনার কানসাইয়ের প্রতি টান তো একেবারেই যায়নি।’

‘তাই নাকি? আমি নিজে তো বুঝতে পারি না।’

‘আরে মশাই, নিশ্চয়ই মজা করছেন,’ কেইসুকি বাড়াবাড়ি রকম কানসাইয়ের টানে বলে।

‘ধুর, বাজে কথা বাদ দাও, কেইসুকি। তবে তুমি ইবারাগি অঞ্চলের লোক হয়ে আমার আঞ্চলিক উচ্চারণ নকল করে কথা বলছ। তোমার কাছ থেকে এমন ভাঁড়ামো আমি একেবারেই আশা করি না। তুমি তো শহুরে বা পলিশ কেউ নও—একেবারে গ্রামের দিকের ছেলেপেলে। তাই তোমার মতো লোকের উচিত নিজের গ্রাম্য কাজ করা বা ফাঁকা সময়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘোরাঘুরি করে সময় কাটানো।’

‘আরে বাবা, আপনি তো দেখছি বেশ রেগে গেছেন। তবে আপনাকে তো দেখতে শান্তশিষ্ট ভালো লোকের মতো মনে হয়। অথচ মুখের ভাষা তো বেশ ভয়ংকর। আর এটা “ইবারাগি” নয়, “ইবারাকি”। আপনারা কানসাইয়ের লোকজন তো সুযোগ পেলেই আমাদের এই পূর্ব দিকের “গ্রাম্য ছেলেদের” ছোট করে দেখতে ওস্তাদ। আমি আপনার কাছে হার মানছি।’ কেইসুকি বলে। ‘কিন্তু সত্যি বলতে কি, কেউ কি সত্যিই আহত হয়েছিল? কোবেতে আপনার নিশ্চয়ই পরিচিত কেউ ছিল। টিভির খবর কি দেখছেন?’

‘চলো, অন্য বিষয় পাল্টাই,’ মিয়াকি বলেন। ‘হুইস্কি চলবে?’

‘নিশ্চয়ই,’ কেইসুকি বলে।

‘জুনকো, তুমি নেবে?’

‘অল্প একটু দিন’—জুনকো বলে।

মিয়াকি তার চামড়ার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটি সরু ফ্লাস্ক বের করে কেইসুকির হাতে দেন। সে ঢাকনাটা ঘুরিয়ে খুলে, মুখের কিনারায় না লাগিয়েই একটু হুইস্কি সরাসরি মুখে ঢালে। এরপর গড়গড় করে গিলে নিয়ে তীক্ষ্ণভাবে শ্বাস টেনে নেয়।

শেষে বলে, ‘মালটা দারুণ। এটা নিশ্চয়ই একুশ বছরের পুরোনো সিঙ্গল মল্ট! অসাধারণ! ওক কাঠের পিপায় সংরক্ষিত ছিল। এতে যেন সমুদ্রের গর্জন আর স্কটিশ দেবদূতদের নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।’

‘ধুর, ওসব কথা বাদ দাও, কেইসুকি। এটা তো সান্টরির সবচেয়ে সস্তা বোতল। সেখানে সেখানে কিনতে পাওয়া যায়’ মিয়াকি বলেন।

এরপর জুনকোর পালা আসে। সে কেইসুকির কাছ থেকে ফ্লাস্কটি নেয়, ঢাকনায় সামান্য ঢালে, আর ছোট ছোট করে চুমুক দিয়ে চেখে দেখে। তার মুখ কুঁচকে যায়, কিন্তু তরলটা গলা বেয়ে পেটে নামার সময় যে বিশেষ উষ্ণ অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়, তার পেছনে জুনকো যেন ছুটে চলে। তার শরীরের ভেতরের কেন্দ্রটা সামান্য উষ্ণ হয়ে ওঠে। এরপর মিয়াকি নীরবে এক ঢোঁক খায়, আর কেইসুকি এরপর আরেক দফা গলাধঃকরণ করে। এভাবে ফ্লাস্কটি হাত থেকে হাতে ঘুরতে থাকে। আর ততক্ষণে আগুনটা হঠাৎ একবারে নয়, বরং ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে আকারে ও শক্তিতে বাড়ে ওঠে। এটাই ছিল মিয়াকির আগুন জ্বালানোর সবচেয়ে বড় কৌশল। শিখাগুলোর বিস্তার হয়ে ওঠে কোমল ও মৃদু, যেন কোনো দক্ষ কারিগরের আদরভরা ছোঁয়া—কোথাও রূঢ়তা বা তাড়াহুড়া নেই; তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য যেন মানুষের হৃদয়কে উষ্ণ করা।

জুনকো তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী থাকাকালে বাবার সিল আর পাসবই নিয়ে ব্যাংক থেকে তিন লাখ ইয়েন তুলে নিয়ে, যতটা পারা যায় কাপড়চোপড় একটা ব্যাগে গুঁজে মে মাসে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই শহরে আসে। এক ট্রেন থেকে আরেক ট্রেনে সে টোকোরোজাওয়া থেকে বহু দূরের এই ছোট সমুদ্রতীরবর্তী জায়গায় পৌঁছে।

আগুনের সামনে জুনকো খুব একটা কথা বলে না। এমনকি খুব বেশি নড়াচড়া করে না। শিখাগুলো নীরবে সবকিছু গ্রহণ করে, সবকিছু নিজের ভেতরে টেনে নেয় এবং সব দুঃখকষ্ট শোধবোধ করে দেয়। জুনকোর মনে হয়, একটা পরিবার—একটা সত্যিকারের পরিবার—সম্ভবত এমনই হয়।

জুনকো হাইস্কুলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী থাকাকালে বাবার সিল আর পাসবই নিয়ে ব্যাংক থেকে তিন লাখ ইয়েন তুলে নিয়ে, যতটা পারা যায় কাপড়চোপড় একটা ব্যাগে গুঁজে মে মাসে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এই শহরে আসে। এক ট্রেন থেকে আরেক ট্রেনে এলোমেলোভাবে বদলাতে বদলাতে সে টোকোরোজাওয়া থেকে বহু দূরের ইবারাকি প্রিফেকচারের এই ছোট সমুদ্রতীরবর্তী জায়গায় পৌঁছে। এ শহরের নাম সে আগে কখনো শোনেইনি। স্টেশনের সামনের রিয়েল এস্টেট কোম্পানির এক কামরার একটা ফ্ল্যাটে সে ওঠে। আর পরের সপ্তাহেই উপকূলীয় মহাসড়কের ধারের একটা দোকানে চাকরি নেয়। এরপর সে মাকে চিঠিতে লেখে: ‘আমার জন্য চিন্তা কোরো না, আর দয়া করে আমাকে খুঁজতে এসো না—আমি ভালোই আছি।’

সে স্কুলে যেতে যেতে একেবারেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিল এবং বাবার দৃষ্টি সহ্য করতে পারত না। তবে ছোটবেলায় তার বাবার সঙ্গে সম্পর্ক ভালোই ছিল। সপ্তাহিক ও অন্য ছুটির দিনে তারা সব জায়গায় এক সাথে যেত। বাবার হাত ধরে রাস্তা পার হতে গর্বিত ও শক্তিশালী বোধ করত। কিন্তু যখন প্রাথমিক স্কুলের শেষের দিকে তার মাসিক শুরু হয়, লিঙ্গের চুল বেড়ে উঠতে শুরু করে, বুক ফুলে ওঠে, তখন তার বাবার দৃষ্টিতে কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা দেয়। জুনিয়র হাইস্কুলের তৃতীয় বর্ষে জুনকো যখন পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতায় পৌঁছে, তখন সে তার সাথে বাবা কথা বলা প্রায় ছেড়ে দেয়।

তা ছাড়া তার পরীক্ষার রেজাল্ট গর্ব করার মতো ছিল না। যখন সে মাধ্যমিকে ভর্তি হয়, তখন সে ক্লাসের ওপরের দিকে ছিল, কিন্তু স্নাতক হওয়ার সময় পর্যন্ত তার অবস্থান ওপরের বদলে নিচ থেকে গোনা সহজ হয়ে পড়ে। কোনো রকমভাবে ক্লাসে জায়গা পায়। এর মানে এই নয় যে সে অজ্ঞ ছিল; সে কেবল মনোযোগ দিতে পারত না। যা কিছু সে শুরু করত, তা কখনো শেষ করতে পারত না। যখনই সে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করত, তার মাথার ভেতর গভীরভাবে ব্যথা হতো। শ্বাস নিতে কষ্ট হতো এবং হৃদয়ের ধুকধকানির ছন্দ এলোমেলো হয়ে যেত। তাই স্কুলে যাওয়া তার জন্য একেবারেই যন্ত্রণাদায়ক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

এই নতুন শহরে বসবাস শুরু করার কিছুদিন পর তার কেইসুকির সাথে পরিচয় হয়। সে জুনকোর চেয়ে দুই বছর বড় এবং একজন দারুণ সার্ফার। তার লম্বা চুল ব্রাউন রঙে রঙানো এবং সুন্দর সোজা দাঁত। ভালো সার্ফিং করার জন্য সে ইবারাকিতে বসতি গড়ে এবং কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একটা রক ব্যান্ড দলও গঠন করে। নামদামহীন একটা প্রাইভেট কলেজে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু প্রায়ই ক্লাস মিস দিত এবং স্নাতক হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই তার ছিল না। মিটো শহরে তার বাবা-মা একটা পুরোনো প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকান চালায়। কিন্তু এ পারিবারিক ব্যবসা চালানোর মানে মিষ্টির দোকানের মালিক হয়ে স্থায়ীভাবে বসার কোনো ইচ্ছা কেইসুকির নাই। বরং তার একমাত্র চাওয়া—বন্ধুদের সাথে তার ছোটখাটো ট্রাকটায় ঘুরেফিরে বেড়ানো, সার্ফিং করা এবং তাদের শখের ব্যান্ডে গিটার বাজানো। কিন্তু চিরস্থায়ীভাবে এ রকম সহজসাধ্য জীবনযাপন করা সম্ভব নয় তা যে–কেউ সহজেই বুঝতে পারে।

কেইসুকিকে নিয়ে বসবাস শুরু করার পরই জুনকোর সাথে মিয়াকির ঘনিষ্ঠতা হয়। মিয়াকি দেখতে চল্লিশের মাঝামাঝি বয়সের বলে মনে হয়—খাটো, রোগা গড়ন, চোখে চশমা, লম্বাটে সরু মুখ আর ছোট চুল। ক্লিন সেভ করে কিন্তু তার দাড়ি এত ঘন হয়ে গজায় যে প্রতিদিন সন্ধ্যার দিকে তাঁর মুখ ছায়ায় ঢেকে যায়। সে সাধারণত ফিকে রঙের ডেনিম শার্ট বা আলোহা শার্ট পরে, যা কখনোই ঢিলেঢালা পুরোনো চিনো প্যান্টের ভেতরে গুঁজে দেয় না। পায়ে থাকে তার সাদা, জীর্ণ স্নিকার্স। শীতকালে সে ভাঁজ পড়া চামড়ার জ্যাকেট পরে এবং কখনো কখনো মাথায় বেসবল ক্যাপও দেয়। তাঁকে জুনকো কখনোই অন্য কোনো ধরনের পোশাকে দেখেনি। তবে সে যা-ই পরুক না কেন, সবকিছুই থাকে একেবারে ঝকঝকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।

সমুদ্রসৈকতময় এই জায়গায় কানসাই উপভাষায় কথা বলা লোক প্রায় নেই বললেই চলে, তবে মিয়াকি যেহেতু বলেন, তাই তার প্রতি সবাই আলাদাভাবে নজর দেয়। ‘আশপাশেই কোনো ভাড়া করা একটা বাড়িতে মিয়াকি একাই থাকেন,’ জুনকোর অফিসের এক মেয়ে বলে। ‘তিনি ছবি আঁকেন। খুব নামকরা শিল্পী কি না জানি না, আর আমি কখনো তার কাজও দেখিনি। কিন্তু মোটামুটি ভালোই চলে তার। ঠিকঠাক সামলে নেন। মাঝেমধ্যে টোকিও যান, আর সন্ধ্যার দিকে ফিরে আসেন রংতুলি বা আঁকার জিনিসপত্র নিয়ে। আরে, ঠিক জানি না—হয়তো পাঁচ বছর মতো হলো এখানে আছেন। সমুদ্রতটে তাকে সব সময়ই দেখা যায় আগুন জ্বালাতে। মনে হয় ওটা তার খুব পছন্দ। মানে, আগুন জ্বালানোর সময় তার চোখে অন্য রকম এক তীব্র দৃষ্টি দেখা দেয়। খুব একটা কথা বলেন না, তাই তাকে একটু অদ্ভুত ধরনের মনে হয়, তবে মানুষ খারাপ না।’

মিয়াকি দিনে অন্তত তিনবার কাছের কোনো দোকানে আসেন। সকালে দুধ, পাউরুটি আর একটা সংবাদপত্র কেনেন। দুপুরে কেনেন লাঞ্চবক্স, আর সন্ধ্যায় ঠান্ডা এক ক্যান বিয়ারের সাথে নাশতার একটা প্যাকেট কিনে নেন। দিনের পর দিন তিনি এই একই জিনিস কেনেন। মিয়াকির সাথে প্রথম দিকে জুনকোর ন্যূনতম ভদ্রতা ছাড়া বেশি কথা হতো না, তবু কিছুদিন পর জুনকো অজান্তেই মিয়াকির প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে।

এক সকালে দোকানে যখন তারা শুধু দুজন, তখন জুনকো সাহস করে মিয়াকিকে জিজ্ঞেস করে—কেন তিনি এত ঘনঘন আসেন, যদিও কাছেই তো থাকেন? কেন তিনি একবারে অনেক দুধ আর বিয়ার কিনে ফ্রিজে রেখে দেন না? তাতে তো আরও সুবিধা হয়। অবশ্য দোকানের লোকদের কাছে এতে কোনো তফাত পড়ে না, কিন্তু তবু…

‘হ্যাঁ, মনে হয় তুমি ঠিকই বলেছ,’ মিয়াকি বলেন। ‘মজুত করে রাখলে বেশি যুক্তিসংগত হয়, কিন্তু আমি পারি না।’

‘কেন পারেন না?’ জুনকো জিজ্ঞেস করে।

‘আসলে ব্যাপারটা হলো—আমি পারি না, এই পর্যন্তই।’

‘আমি খোঁচা দিতে চাইনি বা তেমন কিছু,’ জুনকো বলে। ‘অনুগ্রহ করে এটাকে খারাপভাবে নেবেন না। এটাই আমার স্বভাব। কিছু না জানলে আমি প্রশ্ন না করে থাকতে পারি না। এতে আমার কোনো খারাপ উদ্দেশ্য নেই।’

মাথা চুলকায়ে মিয়াকি এক মুহূর্ত দ্বিধা করেন, তারপর একটু কষ্ট করে বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, আমার কোনো ফ্রিজ নেই। আমি ফ্রিজ পছন্দ করি না।’

জুনকো হেসে ওঠে। ‘আমিও ফ্রিজ পছন্দ করি না, কিন্তু আমার একটা আছে। ফ্রিজ না থাকাটা কি একটু অসুবিধাজনক না?

‘অবশ্যই অসুবিধা হয়, কিন্তু জিনিসটা আমি একেবারেই সহ্য করতে পারি না, তাহলে আর কী করা? আশপাশে কোনো ফ্রিজ থাকলে রাতে আমার ঘুমই আসে না।’

লোকটা কী অদ্ভুত, মনে মনে ভাবে জুনকো। কিন্তু এতে সে মিয়াকির প্রতি আগের চেয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে।

কিন্তু সব আগুনে এটা ঘটে না। এমন কিছু ঘটতে হলে আগুনটাকেও স্বাধীন হতে হয়। গ্যাসের চুলায় বা সিগারেট লাইটারে এটা হবে না। এমনকি সাধারণ কোনো বনফায়ারেও হবে না। আগুনকে স্বাধীন হতে হলে তাকে ঠিক ধরনের জায়গায় জ্বালাতে হয়—যেটা মোটেই সহজ নয়। যে কেউ এটা করতে পারে না।

কয়েক দিন পর এক সন্ধ্যায় সমুদ্রতটে হাঁটতে হাঁটতে জুনকো দেখে মিয়াকি আগুন জ্বালিয়ে একা তার পানে তাকিয়ে আছেন। ভাসমান কাঠ কুড়িয়ে এনে তিনি আগুনের কুণ্ডটা তৈরি করেন। জুনকো তা দেখে মিয়াকিকে ডাকে, তারপর আগুনের পাশে গিয়ে তার সাথে দাঁড়ায়। তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখে, তার চেয়ে জুনকো প্রায় দু–এক ইঞ্চি লম্বা। তখন দুজনের মধ্যে শুধু সাধারণ কুশল বিনিময় হয়, তারপর তারা আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে।

আগুনের শিখার দিকে তাকিয়ে সেই প্রথম জুনকো ‘কিছু একটা’ অনুভব করে—মনের গভীর থেকে উঠে আসা সেই ‘কিছু’। তাকে অনুভূতির একটা গুচ্ছ বলা যায় হয়তো। কারণ সেটা খুবই হালকা, খুবই কাঁচা, খুবই ভারী, খুবই বাস্তব। অনুভূতিটা তার শরীরজুড়ে বয়ে গিয়ে তারপর মিলিয়ে যায়; রেখে যায় একধরনের মিষ্টি-বিষণ্ন, বুক চেপে ধরা অদ্ভুত অনুভূতি। চলে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ তার হাতের লোম খাড়া হয়ে থাকে।

‘বলেন তো, মিস্টার মিয়াকি, বনফায়ারের আগুনে যেসব আকার তৈরি হয়, সেগুলো দেখলে আপনার কি কখনো অদ্ভুত লাগে?’

‘কেমন অদ্ভুত?’

‘ঠিক জানি না—হঠাৎ করে যেন এমন কোনো কিছু খুব স্পষ্ট হয়ে যায়, যেটা মানুষ সাধারণ জীবনে খেয়ালই করে না। কীভাবে বলব বুঝি না, আমি অতটা বুদ্ধিমান নই; কিন্তু এখন আগুনটার দিকে তাকিয়ে আমার ভেতরে এক ধরনের গভীর, শান্ত অনুভূতি হচ্ছে।’

মিয়াকি কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলেন, ‘জানো তো জুনকো, আগুন যেকোনো আকার নিতে পারে—যেমনটা সে হতে চায়। সে স্বাধীন। তাই যে মানুষটা আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে, তার ভেতরে যা আছে তার ওপর নির্ভর করে আগুনটা যেকোনো কিছুর মতো দেখাতে পারে। তুমি যদি আগুনের দিকে তাকিয়ে ওই গভীর, শান্ত ধরনের অনুভূতি পাও, তার মানে হলো আগুনটা তোমার ভেতরে থাকা সেই গভীর, শান্ত অনুভূতিটাই তোমাকে দেখাচ্ছে। বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাই?’

‘হুঁ।’

‘কিন্তু সব আগুনে এটা ঘটে না। এমন কিছু ঘটতে হলে আগুনটাকেও স্বাধীন হতে হয়। গ্যাসের চুলায় বা সিগারেট লাইটারে এটা হবে না। এমনকি সাধারণ কোনো বনফায়ারেও হবে না। আগুনকে স্বাধীন হতে হলে তাকে ঠিক ধরনের জায়গায় জ্বালাতে হয়—যেটা মোটেই সহজ নয়। যে কেউ এটা করতে পারে না।’

‘কিন্তু আপনি পারবেন, মিস্টার মিয়াকি?’

‘মাঝে মাঝে পারি, মাঝে মাঝে পারি না। বেশির ভাগ সময় পারি। যদি সত্যিই মন দিয়ে চেষ্টা করি, প্রায়ই পারি।’

‘আপনি বনফায়ার পছন্দ করেন, তাই তো?’

মিয়াকি মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। ‘আমার জন্য এটা প্রায় একধরনের অসুখ। তুমি ভাবো কেন আমি এই নামধামহীন তুচ্ছ ছোট্ট শহরে এসেছি? কারণ, এই জায়গায় অন্য যেকোনো সমুদ্রতটের চেয়ে বেশি ভাসমান কাঠ আসে। কেবল এই কারণেই। আমি এত দূরে আসি বনফায়ার করতে। কিছুটা অর্থহীন, তাই না?’

এর পর থেকে জুনকো সময়সুযোগ পেলেই মিয়াকির সাথে তার বনফায়ারে যোগ দেয়। আর তিনি বছরভর বনফায়ার করেন, শুধু গরমের সময় বাদে, তখন সমুদ্রতট মানুষে ভরে যায়। তারা গভীর রাত অবধি সৈকতে ঘুরে বেড়ায়। কখনো কখনো তিনি সপ্তাহে দুইবার বনফায়ার করেন, আর কখনো এক মাস ধরে একটাও না। তার রীতিনীতি নির্ধারিত হয় সমুদ্র থেকে তীরভূমিতে ভেসে আসা ভাসমান কাঠের পরিমাণের ওপর। আর যখন বনফায়ারের সময় আসে, তখন তিনি জুনকোকে ডেকে নেন। কেইসুকি যদিও একটু ঈর্ষান্বিত স্বভাবের ছেলে; এরপরও মিয়াকিকে এতটুকু ঈর্ষার কাতারে ফেলে না। তবে তার ‘বনফায়ারের সঙ্গী’ বলে জুনকোর সাথে রসিকতা করে।

আগুনের শিখা অবশেষে সবচেয়ে বড় খুঁটির দিকে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ফলে এবার বনফায়ারটা দীর্ঘ সময় জ্বলে থাকার জন্য স্থির হয়ে যায়। জুনকো বালি ভর্তি সমুদ্রতটে বসে পড়ে এবং মুখ বন্ধ রেখেই আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে। মিয়াকি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে আগুনের অগ্রগতি সামলায়। শিখা যাতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে বা শক্তি হারিয়ে না ফেলে তাই একটা লম্বা ডাল দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণ। মাঝে মাঝে তিনি তার কাঠের স্তূপ থেকে একটা কাঠের টুকরা তুলে নেন এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে গুঁজে দেন।

‘আমি শুধু জানতে চাইছি…আপনার কোথাও কোনো বউ আছে কি না।’ মিয়াকি তার চামড়ার জ্যাকেটের পকেট থেকে ফ্লাস্কটা বের করেন, তার মুখ খুলে ধীরে ধীরে লম্বা একটা চুমুক দেন। এরপর ঢাকনা লাগিয়ে ফ্লাস্কটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে জুনকোর দিকে তাকান। ‘হঠাৎ করে এই কথাটা মাথায় এলো কোত্থেকে?’

কেইসুকি নিজের পেটে ব্যথার কথা জানায়, ‘মনে হয় ঠান্ডা লেগেছে। হাগুটা হলেই ঠিক হয়ে যাবে।’

‘তুমি রুমে গিয়ে বিশ্রাম নাও না?’ জুনকো বলে।

‘হ্যাঁ, আমার সেটাই করা উচিত,’ কেইসুকি দুঃখের সাথে বলে। ‘তোমার কী হবে?’

‘জুনকোকে নিয়ে ভেবো না,’ মিয়াকি বলে। ‘আমি ওকে পৌঁছে দেব। ওর কোনো সমস্যা হবে না।’

‘ঠিক আছে, তাহলে। ধন্যবাদ।’ বলে কেইসুকি সৈকত ছেড়ে চলে যায়।

‘ও একদম বোকা,’ মাথা নেড়ে জুনকো বলে। ‘উত্তেজনায় ভেসে যায় আর মদ খেয়ে বেড়ায়।’

‘এ কথার মানে বুঝি, জুনকো, কিন্তু তরুণ বয়সে খুব বেশি বুদ্ধিমান হয়ে উঠেও তো লাভ নেই। তাতে মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়। কেইসুকির ভালো দিকও আছে।’

‘হতে পারে, কিন্তু ও কোনো কাজেই মাথা খাটায় না।’

‘কিছু কিছু ব্যাপারে মাথা খাটিয়েও কোনো কাজ হয় না। তরুণ থাকা মোটেই সহজ নয়।’

নিজ নিজ ভাবনায় ডুবে দুজন আগুনের সামনে কিছুক্ষণ নীরব হয়ে থাকে। সময়কে আলাদা আলাদা পথে বয়ে যেতে দেয়।

তারপর জুনকো বলে, ‘জানেন, মিস্টার মিয়াকি, একটা বিষয় আমাকে একটু অস্বস্তিতে ফেলেছে। সেটা নিয়ে কথা বলতে আপনার কোনো আপত্তি আছে?’

‘কী ধরনের বিষয়?’

‘ব্যক্তিগত।’

মিয়াকি হাতের তালু দিয়ে নিজের খোঁচাখোঁচা গাল চুলকায়—‘ঠিক আছে। মনে হয়, বলতে পারো।’

‘আমি শুধু জানতে চাইছি…আপনার কোথাও কোনো বউ আছে কি না।’

মিয়াকি তার চামড়ার জ্যাকেটের পকেট থেকে ফ্লাস্কটা বের করেন, তার মুখ খুলে ধীরে ধীরে লম্বা একটা চুমুক দেন। এরপর ঢাকনা লাগিয়ে ফ্লাস্কটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে জুনকোর দিকে তাকান।

‘হঠাৎ করে এই কথাটা মাথায় এলো কোত্থেকে?’

‘হঠাৎ করে নয়। কেইসুকি যখন ভূমিকম্পের কথা বলতে শুরু করে, তখনই আমার এ কথা মনে হয়েছে। আপনার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝেছি আপনার বউ আছে। আর আপনি একবার আমাকে যা বলেছিলেন, মনে আছে, আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মানুষের চোখে একটা সৎ ভাব ফুটে ওঠে।’

‘বলেছিলাম নাকি?’

‘আর আপনার কি বাচ্চাও আছে?’

‘হ্যাঁ। দুজন।’

‘তারা কোবেতে থাকে, তাই তো?’

‘সেখানেই বাড়ি। মনে হয় ওরাই এখনো সেখানে আছে।’

‘কোবের ঠিক কোথায়?’

‘হিগাশি-নাদা এলাকায়। পাহাড়ের দিকে। ওখানে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি।’

মিয়াকি চোখ সরু করে মুখ তুলে অন্ধকার সমুদ্রের দিকে তাকান। এরপর আবার আগুনের দিকে দৃষ্টি ফেরান।

‘এ কারণেই আমি কেইসুকিকে দোষ দিতে পারি না,’ মিয়াকি বলেন। ‘ওকে বোকা বলার অধিকার আমার নেই। আমি নিজেও তো ওর চেয়ে বেশি মাথা খাটাচ্ছি না। আমিই আসলে বোকাদের রাজা। আমি কী বলতে চাইছি, আশাকরি বুঝতে পারছ।’

‘আপনি কি এ নিয়ে আরও কিছু বলতে চান?’

‘না,’ মিয়াকি বলেন। ‘আমি সত্যিই চাই না।’

‘ঠিক আছে, তাহলে আমি থামছি। তবে একটা কথা বলি—আমি মনে করি আপনি একজন ভালো মানুষ।’

‘সমস্যাটা সেটা নয়,’ মিয়াকি আবার মাথা নেড়ে বলে। সে একটা ডালের আগা দিয়ে বালির ওপর যেন কোনো নকশা আঁকতে থাকে। ‘আমাকে বলো তো, জুনকো—তুমি কি কখনো ভেবেছ, তুমি কীভাবে মারা যাবে?’

জুনকো কিছুক্ষণ ভেবে দেখে, তারপর মাথা নেড়ে না বলে।

‘আমি কিন্তু তা নিয়ে সব সময়ই ভাবি,’ মিয়াকি বলে।

‘আপনি কীভাবে মারা যাবেন তা নিয়ে?’

‘একটা ফ্রিজের ভেতরে বন্ধ হয়ে,’ তিনি বলেন। ‘জানো তো, এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটে। কেউ একটা পুরোনো ফেলে দেওয়া ফ্রিজের ভেতরে খেলছে, হঠাৎ দরজাটা বন্ধ হয়ে যায়, আর সেই বাচ্চাটা দমবন্ধ হয়ে মারা যায়। ঠিক সেইভাবে।’

বড় কাঠের গুঁড়িটা এক পাশে হেলে পড়ে, চারদিকে ফুলকি ছিটকে যায়। মিয়াকি তা দেখেও নিশ্চল হয়ে থাকেন কিছুই করেন না। আগুনের আলো তার মুখের ওপর অদ্ভুত, অবাস্তব ছায়া ছড়িয়ে দেয়।

‘ফ্রিজের ভেতর ব্যাপারটা এমন দাঁড়াবে যে, আমি একটা খুবই আঁটসাঁট জায়গার ভেতরে পড়ে গেছি, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার, আর ধীরে ধীরে মরছি। যদি হঠাৎ দমবন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হয়তো এতটা খারাপ লাগবে না। কোথাও কোনো ফাঁক দিয়ে ফ্রিজে যদি সামান্য বাতাস ঢুকে পড়ে, তাহলে মরতে ভীষণ সময় লাগে। কিন্তু ব্যাপারটা তেমন হবার নয়। বরং হবে—আমি চিৎকার করব, কিন্তু কেউ শুনবে না। কেউ খেয়ালও করবে না যে আমি নিখোঁজ। ভেতরটা এতটাই সংকীর্ণ যে আমি নড়াচড়া করতে পারব না। আমি ছটফট করব, বারবার ছটফট করব, কিন্তু দরজা খুলবে না।’

জুনকো কিছুই বলে না।

‘একই স্বপ্নটা আমি বারবার দেখি। মাঝরাতে ঘামতে ঘামতে ঘুম ভেঙে যায়। স্বপ্নে দেখি, ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতরে ধীরে ধীরে মরছি, কিন্তু জেগে ওঠার পরও স্বপ্নটা যেন শেষ হয় না। এটাই স্বপ্নের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ। চোখ মেলে দেখি, আমার গলা একেবারে শুকিয়ে কাঠ। রান্নাঘরে যাই আর ফ্রিজের দরজা খুলি। অবশ্য আমার তো কোনো ফ্রিজই নেই, তাই বুঝে নেওয়া উচিত যে এটা স্বপ্ন, কিন্তু তখনও আমি তা খেয়াল করি না। মনে হয়, কিছু একটা অস্বাভাবিক হচ্ছে, তবু দরজাটা খুলে দিই। ভেতরে ফ্রিজটা সম্পূর্ণ অন্ধকার। আলো জ্বলে না। ভাবি, বুঝি বিদ্যুৎ চলে গেছে, আর মাথা ভেতরে ঢুকাই। হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে হাত বেরিয়ে এসে আমার গলা চেপে ধরে। ঠান্ডা হাত। মৃত মানুষের মতো। অসম্ভব শক্ত—ওরা আমাকে টেনে ভেতরে নিতে শুরু করে। আমি বিকট চিৎকার করি, আর তখনই সত্যি সত্যি ঘুম ভেঙে যায়। এটাই আমার স্বপ্ন। সব সময় একই। খুঁটিনাটি পর্যন্ত একেবারে এক। আর যতবারই দেখি, প্রতিবারই আগের মতোই ভয় হয়।’

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মিয়াকি ডালের আগা দিয়ে বড় কাঠের গুঁড়িটাকে খোঁচা দেন এবং সেটাকে ঠেলে আবার ঠিক দিকে বসায়ে দেন।

‘এটা এতটাই বাস্তব লাগে যে আমার মনে হয় আমি ইতিমধ্যেই শত শতবার মরে গেছি।’

‘আপনি কবে থেকে এই স্বপ্নটা দেখতে শুরু করেছেন?’

‘অনেক, অনেক দিন আগে। এত দিন আগের কথা যে ঠিক কখন থেকে শুরু হয়েছে মনে করতে পারি না,’ মিয়াকি বলেন। ‘কখনো কখনো আবার স্বপ্নটা আমাকে ছেড়ে যায়। এক বছর…না, দুই বছরের মধ্যে তাই একবারও দেখি না। তখন মনে হয়েছে, আমার সব ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু না। স্বপ্নটা আবার ফিরে আসে। ঠিক যখন ভাবতে শুরু করেছি, ‘এবার আমি ঠিক আছি, আমি বেঁচে গেছি’ তখনই সেটা আবার আসা শুরু করে। আর একবার আসা শুরু করলে, আমি আর কিছুই করতে পারি না।’

মিয়াকি মাথা নেড়ে আবার বলেন, ‘দুঃখিত, জুনকো, এসব আঁধারি গল্প তোমাকে বলা আমার উচিত নয়।’

‘হ্যাঁ, উচিতই,’ জুনকো বলে। সে ঠোঁটের মাঝে সিগারেট চেপে ধরে তাতে আগুন জ্বালিয়ে গভীর একটা টান দেয়। ‘তবে বলতেই থাকেন।’

তাদের সামনের আগুনটা তখন প্রায় নিভে আসে। ভেসে আসা কাঠের বড় স্তূপটায় যে কাঠ ছিল তার সব কটি মিয়াকি আগুনের ভেতরে ছুড়ে দেন। তার মনে হয়তোবা তখন কোনো কল্পনার খেলা চলে তবে জুনকোর মনে ভেসে আসে সমুদ্রের আরও জোরালো আওয়াজ।

‘একজন আমেরিকান লেখক ছিলেন—জ্যাক লন্ডন,’ মিয়াকি আবার বলা শুরু করেন।

‘হ্যাঁ, যিনি আগুন নিয়ে লিখেছেন।’

‘হ্যাঁ, তিনিই। অনেক দিন ধরে তিনি মনে করতেন যে তাঁর মৃত্যু হবে সমুদ্রে ডুবে। তিনি এতে একেবারে নিশ্চিত ছিলেন যে রাতে তিনি হোঁচট খেয়ে সমুদ্রে পড়ে যাবেন, কেউ খেয়াল করবে না, আর তিনি ডুবে মরবেন।’

‘তাহলে কি সত্যিই তিনি ডুবে মরেছিলেন?’

মিয়াকি মাথা নেড়ে বলে ‘না। মরফিন খেয়ে নিজেই আত্মহত্যা করেন।’

‘তাহলে তাঁর পূর্বাভাস সত্যি হয়নি। অথবা হয়তো তিনি এমন কিছু করেছেন, যাতে সেটা আর সত্যি না হয়।’

‘ওপর ওপর দেখলে তাই মনে হয়,’ মিয়াকি একটু থেমে বলেন। ‘কিন্তু এক অর্থে তিনি ঠিকই ছিলেন। একসময় সত্যিই আঁধার সমুদ্রে একা ডুবে যান। তিনি মদ্যপ হয়ে পড়েন। নিজের হতাশায় নিজের শরীরকে একেবারে গভীর অবধি ডুবায়ে দেন। আর সে যন্ত্রণার মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। অনেক সময় পূর্বাভাস অন্য কিছুর প্রতীক হয়। আর যেটার প্রতীক হয়, সেটাই কখনো কখনো বাস্তবতার চেয়েও অনেক বেশি তীব্র হতে পারে। পূর্বাভাস থাকার এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর দিক। তুমি কি বুঝতে পারছ আমি কী বলতে চাই?’

আরও পড়ুন

জুনকো কিছুক্ষণ ভেবে দেখে। কিন্তু বুঝতে পারে না মিয়াকি কী বোঝাতে চেয়েছে। তারপর জুনকো বলে, ‘কখনোই ভাবিনি আমি কীভাবে মরব। তা নিয়ে ভাবতেই পারি না। শুধু তা-ই নয়, আমি কীভাবে বাঁচব, সেটাই তো জানি না।’

মিয়াকি মাথা নেড়ে বলেন, ‘তুমি যা বলছ, আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু এমনও তো হয়—মানুষ কীভাবে মরবে, সেই ভাবনাই তার বেঁচে থাকার পথটা ঠিক করে দেয়।’

‘আপনি কি সেভাবেই বেঁচে আছেন?’ জুনকো জিজ্ঞেস করে।

‘নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কখনো কখনো তাই মনে হয়।’

মিয়াকি গিয়ে জুনকোর পাশে বসে পড়ে। তাকে আজ একটু বেশি ক্লান্ত আর বয়সে বড় দেখায়। কানের ওপরের চুলগুলো কাটা হয়নি, খাপছাড়া হয়ে বেরিয়ে আছে।

‘আপনি কী ধরনের ছবি আঁকছেন?’ সে জিজ্ঞাসা করে।

‘ওটা বোঝানো কঠিন।’

‘আচ্ছা, তাহলে বলেন—সবচেয়ে নতুন যে ছবিটা এঁকেছেন, সেটা কী?’

‘আমি নাম দিয়েছি “সমতল লোহায় প্রাকৃতিক দৃশ্য”। তিন দিন আগে শেষ করেছি। আসলে এটা শুধু একটা ঘরের ভেতর রাখা ইস্তিরির ছবি।’

‘এটা ব্যাখ্যা করা এত কঠিন কেন?’

‘কারণ ওটা আসলে কোনো ইস্তিরি নয়।’

মিয়াকির দিকে জুনকো তাকিয়ে বলে,‘ইস্তিরিটা ইস্তিরি নয়?’

‘ঠিক তাই।’

‘মানে, ওটা অন্য কিছুর প্রতীক?’

‘সম্ভবত।’

‘মানে, আপনি কেবল অন্য কিছুকে দিয়ে তার জায়গায় দাঁড় করালেই ওটা আঁকতে পারেন?’

মিয়াকি নীরবে মাথা নেড়ে সম্মতি দেন।

জুনকো তাকিয়ে দেখে, আকাশে আগের চেয়ে অনেক বেশি তারা উঠেছে। চাঁদও অনেকটা পথ পেরিয়েছে। মিয়াকি যে লম্বা ডালটা হাতে ধরেছিলেন, সেটার শেষ টুকরোটা আগুনে ছুড়ে দেন। জুনকো তার দিকে ঝুঁকে আসে, যাতে তাদের কাঁধ দুটো হালকা করে ছুঁয়ে থাকে। শত শত আগুনের ধোঁয়ার গন্ধ তার জ্যাকেটে লেগে যায়। সে সেই গন্ধটা গভীরভাবে শ্বাসে টেনে নেয়।

‘জানেন?’ জুনকো বলে।

‘কী বললে?’

‘আমি পুরোপুরি ফাঁকা।’

‘হ্যাঁ?’

‘হ্যাঁ।’

জুনকো চোখ বন্ধ করে দেয়। আর কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ডান হাত দিয়ে সে মিয়াকির প্যান্টের ওপর দিয়ে তার হাঁটু যতটা শক্ত করে পারে, আঁকড়ে ধরে। জুনকোর শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা কাঁপুনি বয়ে যায়। তখন তার কাঁধের চারপাশে হাত রেখে তাকে মিয়াকি কাছে টেনে নেন, তবু জুনকোর কান্না থামে না।

অনেক পরে, কণ্ঠটা কর্কশ হয়ে এলে জুনকো বলে, ‘এখানে সত্যিই কিছুই নেই। আমি পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেছি। ফাঁকা।’

‘তুমি কী বলতে চাইছ, আমি বুঝি,’ মিয়াকি বলে।

‘সত্যি?’

‘হ্যাঁ। আমি তো এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ।’

‘আমি কী করব?’

‘একটা ভালো ঘুম দাও। সাধারণত তাতেই ঠিক হয়ে যায়।’

‘আমার যেটা হয়েছে, সেটা এত সহজে ঠিক হওয়ার নয়।’

‘হতে পারে তুমি ঠিকই বলছ, জুনকো। এটা হয়তো এত সহজ নয়।’

ঠিক তখনই কাঠের গুঁড়ির ভেতরে আটকে থাকা পানি বাষ্প হয়ে বেরোতে গিয়ে লম্বা, ভেজা ফোঁস শব্দ ওঠে। মিয়াকি চোখ তুলে সরু করে আগুনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকেন।

‘তাহলে, আমার কী করা উচিত?’ জুনকো জিজ্ঞেস করে।

‘আমি জানি না। আমরা একসঙ্গে মরতে পারি। তুমি কী বলো?’

‘তা তো আমার কাছে তো ভালোই শোনায়।’

‘তুমি কি সত্যি বলছ?’

‘আমি সিরিয়াস।’

জুনকো কাঁধের চারপাশে হাত রেখেই মিয়াকি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। আর জুনকো তার জ্যাকেটের নরম, পুরোনো চামড়ার ভেতর মুখ গুঁজে দেয়।

‘যাই হোক, আগুনটা নিভে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি,’ মিয়াকি বলেন। ‘আমরাই তো এটা জ্বালিয়েছি, শেষ পর্যন্ত এর সঙ্গেই থাকা উচিত। একবার যখন এটা নিভে যাবে, চারদিক পুরো অন্ধকার হয়ে উঠবে, তখন আমরা মরতে পারি।’

‘ভালো আইডিয়া,’ জুনকো বলে। ‘কিন্তু কীভাবে?’

‘ভেবে কিছু একটা বের করব।’

‘আচ্ছা।’

আগুনের গন্ধে নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে জুনকো চোখ বন্ধ করে। তার কাঁধের ওপর রাখা মিয়াকির হাতটা পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষের হাতের তুলনায় যেন একটু ছোট, আর অদ্ভুতভাবে হাড়সর্বস্ব। ‘আমি কখনো এ লোকের সাথে বাঁচতে পারব না’, জুনকো ভাবে। ‘কখনো তার হৃদয়ের ভেতরে ঢুকতে পারব না। কিন্তু হয়তো তার সঙ্গে এক সাথে মরতে পারব।’

জুনকো তার নিজের ভেতরেই ঘুম ঘুম ভাব টের পায়। নিশ্চয়ই হুইস্কির প্রভাব, সে মনে করে। ভেসে আসা কাঠের বেশির ভাগই জ্বলে ছাইয়ের গুঁড়ো হয়ে গেছে, কিন্তু সবচেয়ে বড় টুকরোটা এখনো কমলা রঙে জ্বলছে, আর তাই জুনকো তার ত্বকে কোমল উষ্ণতা বোধ করে। পুরোপুরি নিভে যেতে আরও কিছুটা সময় লাগবে।

‘আমি কি একটু ঘুমোতে পারি?’ সে জিজ্ঞেস করে।

‘নিশ্চয়ই, ঘুম দাও।’ মিয়াকি বলে।

‘আগুন নিভে গেলে আপনি কি আমাকে জাগাবেন?’

‘চিন্তা কোরো না। আগুন নিভে গেলে ঠান্ডা লাগতে শুরু করবে। তুমি চাই বা না চাই, তখন জেগে উঠবেই।’

জুনকো কথাগুলো মনে মনে আবার বলে: আগুন নিভে গেলে ঠান্ডা লাগতে শুরু করবে। তুমি চাই বা না চাই, তখন জেগে উঠবেই। এরপর সে নিজেকে গুটিয়ে নেয় এবং ক্ষণিকের তরে হলেও গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।