প্রাচী-প্রতীচীর মরমিবাদ ও দর্শনের যৌথ ভাষ্যকার

তাঁর কবিতায় একধরনের ‘মিস্টিক’ বিষাদ ও শান্তির ছোঁয়া পাওয়া যায়। তাঁর কবিতায় প্রায়ই কুয়াশা, পাহাড়, গাছ ও ঋতু পরিবর্তনের রূপক আসে। তাঁর কবিতার বিষয়গুলো সাধারণত নিঃসঙ্গতা, মৃত্যু, প্রকৃতি, আত্মসমর্পণ, অন্তর্লীন ঈশ্বরবোধ ইত্যাদি। হেসের কবিতায় কোনো অলংকারের বাহুল্য নেই, আছে শান্ত স্বীকারোক্তি।

উপস্থাপন ও অনুবাদ: সৈয়দ তারিক

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

হেরম্যান হেসে ছিলেন জার্মান-সুইস লেখক, কবি ও চিত্রকর। তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর কাজগুলোতে আধ্যাত্মিকতা, আত্ম-অন্বেষণ এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের গভীর অনুসন্ধান দেখা যায়। তাঁর লেখায় পশ্চিমি দর্শনের সঙ্গে পূর্বাঞ্চলীয় মরমিবাদের মেলবন্ধন ঘটেছে, যা তাঁকে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত (১৯৪৬) লেখক হিসেবে স্থান করে দিয়েছে। হেসের জীবন ছিল অশান্তি, সংকট এবং আধ্যাত্মিক যাত্রার এক অসাধারণ গল্প, যা তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর রচনাবলি—উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ গভীরভাবে আলোড়িত করেছে সারা বিশ্বের পাঠককে।

হেরম্যান হেসে জার্মানির ক্যালভ শহরে ১৮৭৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার ছিল গভীরভাবে ধর্মপ্রাণ, প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারি ঐতিহ্যে গাথা। তাঁর পিতামহেরা ভারতে খ্রিষ্টান মিশনারি হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর দাদা হেরম্যান গুন্ডার্ট মালয়ালম ভাষার ব্যাকরণ, অভিধান ও বাইবেল অনুবাদে অবদান রেখেছিলেন।

তাঁর মা–বাবা দুজনই খ্রিষ্টান ধর্মতত্ত্ব ও মিশনারি কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে হেসের শৈশব গড়ে ওঠে কঠোর নৈতিকতা, আত্মসংযম ও ধর্মীয় শাসনের মধ্যে। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন বিদ্রোহী ও সংবেদনশীল। কৈশোরেই হেসে এই নিয়ন্ত্রিত ধারার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ধর্মীয় কঠোরতার সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব শুরু হয় খুব অল্প বয়সেই। তিনি একবার স্কুল থেকে পালিয়ে যান, কারণ তিনি মনে করতেন, ‘হয় আমি কবি হব, না হয় কিছুই হব না।’

মাত্র পনেরো বছর বয়সে তাঁর আত্মহত্যার চেষ্টা, মানসিক ভাঙন—এই সব তাঁর জীবনের প্রাথমিক অধ্যায়। আজকের ভাষায় যাকে বলে অস্তিত্বের সংকট, তিনি তা ভোগ করেছেন কিশোর বয়সেই। এই ভাঙন থেকেই শুরু হয় তাঁর প্রকৃত যাত্রা—বাইরের সমাজ থেকে ভেতরের মানুষের দিকে।

হেসের সাহিত্যজীবন বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি রচনা হলো ‘ডেমিয়ান’ (১৯১৯) : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক সংকট ও নতুন নৈতিকতার সন্ধানের গল্প। ‘সিদ্ধার্থ’ (১৯২২) : ভারতীয় দর্শনভিত্তিক এক যুবকের আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার কাহিনি, যা তাঁকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়।

কর্মজীবনের শুরুতে কবিতা লেখেন, যেমন ‘ম্যাডোনা’ (১৮৯৬)। ১৮৯৯ সালে ‘রোমান্টিক সংস’ ও ‘ওয়ান আওয়ার আফটার মিডনাইট’ প্রকাশিত হয়, কিন্তু সাফল্য কম। বাসেল ও টুবিঙ্গেনের বইয়ের দোকানে কাজ করেন। ১৯০৪ সালে ‘পিটার ক্যামেনজিন্ড’ সাফল্য পায়, যা সিগমুন্ড ফ্রয়েডের প্রশংসা লাভ করে এবং তাঁকে পূর্ণকালীন লেখক করে। ১৯১১ সালে তিনি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়া ভ্রমণ করেন, যা তাঁর পরবর্তী রচনায় প্রভাব ফেলে।

তাঁর জীবনে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। যুদ্ধের বিভীষিকা তাঁকে শান্তিবাদী করে তোলে। তিনি যুদ্ধবন্দীদের সেবায় কাজ করেন আর জাতীয়তাবাদবিরোধী প্রবন্ধ লেখেন। তিনি নাৎসিবাদের বিরোধিতা করেন ও নির্বাসিত লেখকদের সাহায্য করেন। এর ফলে জার্মানিতে তাঁকে দেশদ্রোহী হিসেবেও অভিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীকালে তিনি সুইজারল্যান্ডের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে নিভৃতে জীবন কাটান।

হেসের সাহিত্যজীবন বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনা হলো ‘ডেমিয়ান’ (১৯১৯) : প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক সংকট ও নতুন নৈতিকতার সন্ধানের গল্প। ‘সিদ্ধার্থ’ (১৯২২) : ভারতীয় দর্শনভিত্তিক এক যুবকের আধ্যাত্মিক অভিযাত্রার কাহিনি, যা তাঁকে বিশ্বব্যাপী খ্যাতি এনে দেয়। ‘স্টেপেনউলফ’ (১৯২৭) : আধুনিক নাগরিক সভ্যতায় বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির মানসিক দ্বন্দ্ব ও আত্মবিচ্ছেদের শক্তিশালী চিত্রণ। তাঁর প্রতিটি উপন্যাসে নায়ক আসলে একজনই—হেসে নিজে, বারবার নতুন রূপে। ‘দ্য গ্লাস বিড গেম’ (১৯৪৩): এক কাল্পনিক ভবিষ্যতে জ্ঞানের সংগঠন ও ব্যক্তির স্থান নিয়ে রচিত তাঁর শেষ ও সবচেয়ে জটিল উপন্যাস। এ ছাড়া ‘গার্ট্রুড’, ‘নার্সিসাস অ্যান্ড গোল্ডমুন্ড’-এর মতো উপন্যাস এবং অসংখ্য ছোটগল্প ও প্রবন্ধ তিনি রচনা করেছেন।

১৯৪৬ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। পরবর্তীকালে ছোটগল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পান। স্বাস্থ্য সমস্যায় ১৯৬২ সালের ৯ আগস্ট মন্টাগনোলায় মারা যান, ৮৫ বছর বয়সে।

তাঁর নায়কেরা প্রায়শই প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় বা সামাজিক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব পথে, কখনো বিপথগামী হয়ে, সত্য খোঁজে। এই যাত্রাই হেসের মিস্টিসিজমের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ঈশ্বর বা পরমসত্য কোনো বাহ্যিক বিধান নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিষয়।

হেসের দর্শনের মূল বিষয় হলো ব্যক্তির আত্ম-অনুসন্ধান, ঐক্যের সন্ধান এবং দ্বন্দ্বের অতিক্রম। তিনি ছিলেন এক অনন্য মিস্টিক-ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানবিরোধী, কিন্তু আধ্যাত্মিকভাবে গভীর। তাঁর মিস্টিসিজম বা মরমিবাদ ভারতীয় দর্শন, বিশেষ করে উপনিষদ ও বৌদ্ধধর্ম দ্বারা গভীরভাবে প্রাণিত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে আধ্যাত্মিক দিক থেকে ইউরোপ ‘ক্ষয়িষ্ণু’ হয়ে চলেছে এবং এর পরিত্রাণ এশিয়ার ভাবধারাতেই নিহিত।

তিনি কোনো দার্শনিক সিস্টেম দাঁড় করাননি। তাঁর দর্শন এসেছে সাহিত্যের ভেতর দিয়ে, চরিত্রের যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে, আত্মসংঘাতের ভাষায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ মানুষকে একটা রূপ চাপিয়ে দেয়—নাগরিক, পেশাজীবী, নৈতিক মানুষ। কিন্তু সত্যিকার মানুষ সেই রূপ ভাঙার সাহস রাখে। এই ভাঙন সহজ নয়। এতে একাকিত্ব আসে, উন্মাদনার কাছাকাছি যাওয়া লাগে। কিন্তু হেসের কাছে সেটাই পথ।

‘সিদ্ধার্থ’ উপন্যাসে হেসের এই চিন্তার পূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে। এই উপন্যাসে গৌতম বুদ্ধের জীবনের ছায়ায় তিনি তুলে ধরেন এক অন্তর্গত বোধের কথা, যা কোনো গুরু, কোনো শাস্ত্র শেখাতে পারে না। এখানে বুদ্ধের থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো পথিক সিদ্ধার্থ নিজে, তার ভুল, কাম, ক্লান্তি, নদীর কাছে বসে শোনা নীরব জ্ঞান। এখানে তিনি জীবনকে কেবল রৈখিক আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ হিসেবে দেখেননি, বরং ইন্দ্রিয়লাভ, প্রেম, বিত্তবৈভব ও তপস্যার মধ্য দিয়ে এক চক্রাকার যাত্রারূপে চিত্রিত করেছেন।

তাঁর নায়কেরা প্রায়শই প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় বা সামাজিক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব পথে, কখনো বিপথগামী হয়ে, সত্য খোঁজে। এই যাত্রাই হেসের মিস্টিসিজমের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে ঈশ্বর বা পরমসত্য কোনো বাহ্যিক বিধান নয়, বরং অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির বিষয়।

হেসে একই সঙ্গে খ্রিষ্টীয় মিস্টিসিজম ও নিটশিয়ান দ্বন্দ্বকে ধারণ করেন। ‘ডেমিয়ান’-এ আলো ও অন্ধকার, ঈশ্বর ও শয়তান একই সত্তার অংশ। হেসে মনে করতেন মানুষের মধ্যে দুটি সত্তা বাস করে—একটি পাশবিক বা পার্থিব, অন্যটি স্বর্গীয় বা আধ্যাত্মিক। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘নার্সিসাস অ্যান্ড গোল্ডমুন্ড’-এ এই দ্বন্দ্ব প্রকট। এই দৃষ্টিভঙ্গি সুফিবাদের ‘জামাল ও জালাল’, ‘নূর ও নফস’ ধারণার খুব কাছাকাছি।

হেসের কাছে মুক্তি মানে পাপমুক্ত হওয়া নয়

মুক্তি মানে সম্পূর্ণ হওয়া। আধ্যাত্মিকতাকে তিনি ব্যক্তিগত, অ-ধর্মীয় বলে দেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে ঈশ্বরের পথ একাধিক। তাওবাদের ভারসাম্য ও প্রবাহ তাঁর কাজে প্রতিফলিত।

মনোবিজ্ঞানী কার্ল গুস্তাভ ইয়ুংয়ের ‘বিশ্লেষণাত্মক মনোবিজ্ঞান’ হেসেকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। সাইকোঅ্যানালাইসিসে আগ্রহী হয়ে ১৯১৬ সালের সংকটের পর ইউংয়ের কাছে চিকিৎসা নেন এবং তাঁকে চিঠিপত্র লেখেন। বিষয়টি হেসের সৃজনশীলতায় প্রভাব ফেলে। অবচেতন মনের জটিলতা এবং ‘সেলফ’ বা আপন সত্তাকে চেনার প্রক্রিয়া তাঁর রচনায় মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে।

হেসের পরিচয় শুধু ঔপন্যাসিক হিসেবে নয়, একজন গীতিময় কবি হিসেবেও। তিনি নিজেকে সব সময় গদ্যকারের চেয়ে কবি হিসেবেই বেশি মনে করতেন। তাঁর কবিতা গর্জন করে না, তারা ফিসফিস করে। কবিতায় হেসের ভাষা অন্তর্মুখী, চিন্তাপ্রবণ এবং অনেকাংশে স্বগতোক্তি-ধর্মী, যা তাঁর গদ্য রচনার মতোই পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করে।

হেরম্যান হেসে (১৮৭৭-১৯৬২)
ছবি: সংগৃহীত

হে র ম্যা ন  হে সে র  ক বি তা গু চ্ছ

১.
জীবনের প্রতিটি ধাপ

আমাদের ডাকে বিদায় জানাতে,
প্রস্তুত হতে নতুন যাত্রার জন্য।

যে হৃদয় আঁকড়ে ধরে থাকতে চায়,
সে নিজেকেই বন্দী করে।

জীবন ডাকে

বারবার, আরও বিস্তৃত হয়ে।
প্রতিটি বিদায়ে আছে জন্মের বীজ,

প্রতিটি ভাঙনে আছে আলোর দরজা।

২.
কুয়াশার ভেতর

একাকী দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিটি বৃক্ষ।
তাদের পাতা ছুঁয়ে আছে অন্য পাতা,

তবু তারা একা।
জীবনও তেমন—

বন্ধুতা আলোয়,
কিন্তু অন্ধকারে

মানুষ থাকে নিজের কাছেই।

৩.
আমার ক্লান্ত দিন

ধীরে ধীরে শরীর ছাড়ে।
যেন একটি পোশাক খুলে ফেলছি।

আত্মা দাঁড়িয়ে থাকে নগ্ন,
নতুন স্বপ্নের প্রান্তে।

আর আমি বিশ্বাস করি—
রাত জানে পথ।

৪.
সবকিছুই যাচ্ছে,

আমিও যাচ্ছি।
যা একদিন আগুন ছিল,

আজ তা ছাই।
যা আজ স্পন্দন,

কাল তা স্মৃতি।
তবু এই ক্ষণিকতার মধ্যেই

আমি ঈশ্বরকে ছুঁই—
কারণ চিরস্থায়ী কেবল পরিবর্তন।

৫.
আমি একা হইনি—

আমি একা হয়েছি।
পৃথিবী ধীরে ধীরে

আমাকে ছাড়ে,
যেন গুরু শিষ্যকে ছেড়ে দেন

নিজের পথে হাঁটতে।
এই একাকিত্বে ভয় নেই,

আছে গভীর শ্বাস।

৬.
শৈশব ছিল এক নিঃশব্দ প্রার্থনা,
যেখানে কিছুই চাওয়া লাগত না।

সবকিছুই ছিল—
আকাশ, ভয়, বিস্ময়,

আর ঈশ্বরের নামহীন উপস্থিতি।
এখন আমি শব্দ জানি,

কিন্তু সেই নীরবতা হারিয়ে গেছে।

৭.
সুখ আসে না ধরা দিতে,
সে আসে মিলিয়ে যেতে।

যখন আমি কিছু চাই না,
কিছু বুঝতে চাই না,

ঠিক তখনই
সে আমার পাশে বসে।

৮.
মৃত্যু কোনো শত্রু নয়।

সে শেষ দরজার প্রহরী।
যে সাহস করে তাকায়,

সে দেখে—
ওপারে কোনো অন্ধকার নেই,

শুধু আরও গভীর আলো।

৯.
আমি জানি না পথের কোথায় শেষ,
কিন্তু হাঁটার শব্দই আমাকে ডাকে।

প্রতিটি পা ফেলা
একটি প্রশ্ন,

প্রতিটি থেমে যাওয়া
একটি ভ্রান্তি।

১০.
নিঃসঙ্গতা আমাকে শাস্তি দেয় না,

সে আমাকে খোলস ছাড়ায়।
যখন কেউ নেই,

ঠিক তখনই
আমি পরিপূর্ণ হই।

১১.
প্রতিটি পথ আমাকে দূরে নিয়ে যায়,

আবার নিজের কাছেই ফেরায়।
আমি জানি না শেষ কোথায়,

কিন্তু হাঁটতেই হবে—
কারণ থেমে থাকাই মৃত্যু।

১২.
পাতা ঝরে

কারণ গাছ জানে ছাড়তে।
মানুষ জানে না,

তাই কাঁদে।

১৩.
সে কারও কাছ থেকে দূরে নয়,
সে নিজের কাছেই এসেছে।

এই আগমন
ভিড় সহ্য করে না।

১৪.
বৃষ্টি আমাকে কিছু বলে না,

তবু আমি বুঝে যাই।
কারণ নীরবতার

নিজস্ব ভাষা আছে।

১৫.
আমি আর কিছু চাই না।
এই না-চাওয়াই

আমার সবচেয়ে গভীর প্রার্থনা।

১৬.
রাত্রি আমাকে ঢেকে নেয়
নামহীন চাদরে।

ভয়েরও তখন ঘুম আসে।

১৭.
আমি কোথাও পৌঁছুতে আসিনি,
আমি হাঁটতে এসেছি।

যারা পৌঁছাতে চায়,
তারা পথ হারায়।

১৮.
সময় আমাকে নেয় না,

সময় আমাকে খোলায়।
স্তর ছাড়াতে ছাড়াতে

আমি হালকা হই।

১৯.
নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়।
সে কথা বলার আগের ঈশ্বর।

২০.
আমি যে বাড়ি খুঁজি,

তা কোনো মানচিত্রে নেই।
সে আমার ভেতরের দেশ।

২১.
বৃক্ষ দাঁড়িয়ে থাকে

সব দিকের বাতাসে।
কিছু চায় না,

তবু গভীর।

২২.
আমি বহুবার নিজেকে ছেড়েছি,
তাই বারবার ফিরে আসি।

২৩.
চিরন্তন মানে সময়হীন নয়,

চিরন্তন মানে এখন।

২৪.
বেদনা দরজা খোলে,
যা সুখ কখনো পারে না।

২৫.
আলো চেঁচায় না।

সে থাকে।

২৬.
শিষ্য তখনই জন্মায়,
যখন গুরু নীরব হন।

২৭.
যে ভাঙে না,

সে বদলায় না।

২৮.
মুক্তি মানে উড়তে পারা নয়,
মুক্তি মানে ভার নামানো।

২৯.
নদী শেখায়—

যা আটকায়,
তা পচে।

৩০.
বিশ্বাস মানে মানা নয়,

বিশ্বাস মানে হাঁটা।

৩১.
সব উত্তর শব্দে আসে না।
কিছু আসে শ্বাসে।

৩২.
আমি আয়নায় তাকাই না,

কারণ সে প্রশ্ন করে।

৩৩.
বিদায় মানে হারানো নয়,
বিদায় মানে প্রস্তুতি।

৩৪.
যে একা হতে পারে,

সে আর কাউকে বন্দী করে না।

৩৫.
শ্বাসই আমার মন্ত্র,
ভুলে যাওয়া আর ফিরে আসার মাঝে।

৩৬.
বার্ধক্য ক্লান্তি নয়,

সে ধীরে হওয়া।

৩৭.
আমরা দুজন
একই পথে হাঁটি—

সে আগে,
আমি পরে।

৩৮.
জাগরণ মানে

নতুন কিছু দেখা নয়,
পুরোনোটা সত্য করে দেখা।

৩৯.
আমি জানি না কী হবে,

তবু হাঁটি।
এটাই আস্থা।

৪০.
আমি যেখান থেকে বেরিয়েছিলাম,

সেখানেই ফিরি—
কিন্তু আর আগের আমি নই।