ডোগেন জেনজি (১২০০–১২৫৩) জাপানি জেন বৌদ্ধধর্মের একজন অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। তিনি ‘সোতো’ স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত। তিনি একজন সন্ন্যাসী, লেখক, কবি ও দার্শনিক ছিলেন। তাঁর শিক্ষা ও লেখা জেন অনুশীলনের মূল ভিত্তি গঠন করেছে। ডোগেনের দর্শন জাজেনকেন্দ্রিক, যার মানে ‘শুধু বসে থাকা’। এটি ‘শিকানতাজা’ নামেও পরিচিত। এই দর্শন অনুশীলন ও জ্ঞানলাভকে অভিন্ন বলে মনে করে। তাঁর জীবনী, দার্শনিক চিন্তা, কার্যাবলি ও কবিতা জাপানি বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ডোগেন ১২০০ খ্রিস্টাব্দে জাপানের কিয়োটোতে এক অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সেই তিনি এতিম হন—মাত্র দুই বছর বয়সে বাবা এবং আট বছর বয়সে মাকে হারান। এই ক্ষতি তাঁর জীবনের একটি পরিবর্তন-বিন্দু ছিল। জগৎ ও জীবনের অস্থায়িত্ব এবং মৃত্যুর ধারণা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা জাগে। তাঁর ভাই মিনামোটো নো মিচিতোমোর অধীনে লালিত-পালিত হয়ে তিনি ১২১২ সালে, ১৩ বছর বয়সে, মাউন্ট হিয়েইতে তেনদাই স্কুলে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি রায়োকান হোগেন এবং জিয়েনের অধীনে শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু শিগগিরই একটি মৌলিক প্রশ্ন তাঁকে পীড়া দিতে শুরু করে।
তেন্দাই ধর্মের মূল ধারণা ‘হংগাকু’ (আদি জ্ঞান) নিয়ে তিনি সন্দিহান হয়ে ওঠেন। এই ধারণা বলে, সব প্রাণী জন্মগতভাবে জ্ঞানপ্রাপ্ত। তাঁর মনে জিজ্ঞাসা জাগে: যদি সব সত্তাই স্বভাবতই বুদ্ধ হয়, তাহলে আমাদের সাধনার প্রয়োজন কেন? তাহলে বুদ্ধরা কেন জ্ঞানলাভের জন্য অনুশীলন করেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই তিনি তেনদাই পরিত্যাগ করেন।
তিনি একজন সন্ন্যাসী, লেখক, কবি ও দার্শনিক ছিলেন। তাঁর শিক্ষা ও লেখা জেন অনুশীলনের মূল ভিত্তি গঠন করেছে। ডোগেনের দর্শন জাজেনকেন্দ্রিক, যার মানে ‘শুধু বসে থাকা’। এটি ‘শিকানতাজা’ নামেও পরিচিত।
১২২৩ সালে ডোগেন চ্যান বৌদ্ধধর্ম অধ্যয়নের জন্য চীনে যাত্রা করেন। তাঁর যাত্রার উদ্দেশ্য ছিল চ্যান বৌদ্ধধর্মকে ঘনিষ্ঠভাবে অনুশীলন করা। চ্যান হলো জাপানের জেনধর্মের পূর্বসূরি।
চীনের বিভিন্ন মঠে ডোগেন লক্ষ করেন যে তখনকার মূল আধ্যাত্মিক সাধনা ছিল কোয়ান (Koan) পাঠ ও পুনরাবৃত্তি। কোয়ান হলো প্যারাডক্সিক্যাল বা ধাঁধামূলক ছোট ছোট বাক্যাংশ, যা মনকে একাগ্র করতে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ডোগেন এই সাধনায় কিছুটা বিমুখ হয়ে পড়েন। তিনি মনে করলেন, এর মাধ্যমে তিনি প্রকৃত মুক্তি বা ‘জাগরণ’ স্পর্শ করতে পারছেন না।
অবশেষে ডোগেন তিয়ানটং পর্বতের মঠে মাস্টার রুজিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর অধীনে ডোগেন নতুন এক ধ্যানপদ্ধতি শেখেন—নীরব ধ্যান (zazen)। এই অনুশীলনের মূল কথা ছিল মনকে নিস্তব্ধ করা। এই ধ্যানে না ভালো, না মন্দ—কোনো কিছুই মনে না আনা, চেতনার সমস্ত তরঙ্গ স্তব্ধ করে ফেলা। একদিন রুজিং অন্য এক সাধুকে তিরস্কার করে বলেন, ‘ধ্যান থেকে শরীর-মন ঝেড়ে ফেলো!’ এ কথা শুনে ডোগেনের সত্তায় আকস্মিক বোধিলাভ ঘটে। সেই মুহূর্তে তিনি সম্পূর্ণরূপে জাগরিত হন এবং বুঝতে পারেন যে সাধনা ও বোধিলাভ আলাদা নয়—সাধনাই হচ্ছে বোধিলাভ।
এই নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নিয়ে ডোগেন ১২২৭ সালে জাপানে ফিরে আসেন এবং এই নতুন ধারার ওপর লিখতে ও শিক্ষা দিতে শুরু করেন। জাপানে ফিরে প্রথমে কিউটোতে কেনিন-জি মন্দিরে এবং পরে ফুকাকুওয়ার কোশো-জি মন্দিরে শিক্ষা দেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধধর্মের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে ১২৪৩ সালে তিনি দূরবর্তী ইহি প্রদেশের এক পার্বত্য অঞ্চলে আইহেই-জি মন্দির (‘চিরন্তন শান্তির মন্দির’) প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেই তিনি তাঁর প্রধান রচনা ‘শোবোজেঞ্জো’ লেখা শুরু করেন। আজও এই মন্দির সোতো জেন সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র।
এবার আমরা ডোগেনের দার্শনিক শিক্ষাগুলো একটু পর্যবেক্ষণ করতে পারি। তাঁর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হলো ‘শিকান্তাজা’। এটা কোনো পদ্ধতি নয়, একধরনের অস্তিত্বযাপন। তোমার ভেতরে কিছু অর্জনের চেষ্টা নেই, কিছু বাদ দেওয়ার চেষ্টা নেই। তুমি কেবলই বসে আছ—পুরোপুরি সজাগ, পুরোপুরি খোলা, পুরোপুরি উপস্থিত।
সাধনা ও বোধিলাভের ঐক্য হলো ডোগেনের সবচেয়ে বৈপ্লবিক শিক্ষা। ‘শুশো ইতো’ তথা সাধনা ও বোধিলাভের সম্পূর্ণ অভিন্নতার কথা বলেন তিনি। সাধনার পথেই লক্ষ্য নিহিত; লক্ষ্যের জন্য সাধনা নয়। ডোগেনের মতে সাধনা এবং জাগরণ বা আলোকপ্রাপ্তি আলাদা নয়। ডোগেনের সবচেয়ে বড় ঘোষণা: সাধনা ও আলোকপ্রাপ্তি একই ব্যাপার। অর্থাৎ তুমি যখন সাধনা করছ, তখনই তুমি জাগরণের অবস্থায় আছ। বুদ্ধত্ব ভবিষ্যতের পুরস্কার নয়—এখনকার অবস্থান। ডোগেনের মতে, ‘ধ্যান করার সময়ই তুমি বুদ্ধ।’ এটি কোনো প্রাথমিক ধাপ নয়, বরং বুদ্ধত্বের সরাসরি অভিব্যক্তি।
প্রাতিষ্ঠানিক বৌদ্ধধর্মের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে ১২৪৩ সালে তিনি দূরবর্তী ইহি প্রদেশের এক পার্বত্য অঞ্চলে ‘চিরন্তন শান্তির মন্দির’ প্রতিষ্ঠা করেন। আজও এই মন্দির সোতো জেন সম্প্রদায়ের প্রধান কেন্দ্র।
‘বুজি’ অর্থাৎ বুদ্ধ-সত্তা বা স্বভাব-বুদ্ধত্ব বা বুদ্ধ-মনের ধারণা সম্পর্কে ডোগেন নতুন ব্যাখ্যা দেন। তাঁর মতে, বুদ্ধ হওয়া কোনো স্থির অবস্থা নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। সমগ্র অস্তিত্বই বুদ্ধসত্তার প্রকাশ।
‘উজি’ বা সময়-অস্তিত্ব ডোগেনের আরেকটি আলোচ্য বিষয়। তাঁর বিখ্যাত ‘উজি’ প্রবন্ধে ডোগেন সময় ও অস্তিত্বের ঐক্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, ‘অস্তিত্ব আর সময় আলাদা জিনিস নয়।’ তুমি যখন হাঁটছ—সেটাই সময়। তুমি যখন শ্বাস নিচ্ছ—সেটাই সময়। সময় কোথাও দূরে বইছে না; তোমার প্রতিটি মুহূর্তই তার প্রকাশ। সময়ই হচ্ছে অস্তিত্ব এবং অস্তিত্বই সময়। প্রতিটি মুহূর্ত স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ এবং সমগ্র মহাবিশ্ব ধারণ করে। অতীত বা ভবিষ্যৎ নয়, কেবল বর্তমান মুহূর্তের সম্পূর্ণতা।
ডোগেনের শিক্ষায় সাধনা একটি সার্বক্ষণিক বিষয়। থালা ধোয়ার সময় থালাই তোমার সাধনা। ভাত রান্নার সময় ভাতই তোমার ধ্যান। মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই জেন অনুশীলনকে স্থাপন করেন তিনি: রান্নাঘর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, কাজকর্ম সবই সাধনা। ডোগেন শেখান, শিক্ষক দরকার, অনুশাসনও দরকার, কিন্তু দরজা খোলার শক্তি আছে সাধকের ভেতরেই। বোধি জাগে সাধকের ভেতর থেকেই।
‘গেঞ্জোকোয়ান’ তথা সর্বব্যাপী বুদ্ধত্বের কথা বলেন ডোগেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত অস্তিত্ব—মানুষ, পাহাড়, নদী, পাথর, এমনকি ক্ষণস্থায়ী ধূলিকণাও স্বভাবতই বুদ্ধ। তাঁর মতে, বুদ্ধের স্বভাব কোনো গোপন বা লুকানো জিনিস নয়, বরং এটি প্রকাশ্য বাস্তবতা যা সবকিছুর মধ্যে প্রকাশিত। কোনো সত্তাই বুদ্ধত্ব থেকে বঞ্চিত নয়।
ডোগেনের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শোবো গেঞ্জো’ (Treasury of the True Dharma Eye)। এটি হলো ডোগেনের ম্যাগনাম ওপাস। ৯৫টি প্রবন্ধের সংকলন এটি, যা জেন বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক রচনাগুলোর মধ্যে একটি। এটি সরাসরি অভিজ্ঞতার ভাষায় লেখা, যুক্তির কাঠামো এড়িয়ে।
ডোগেনের ‘এহেই শিংগি’ সন্ন্যাসীর জীবনের বিস্তারিত নির্দেশিকা। এতে ধ্যান, খাওয়া, রান্না, পরিষ্কার করা—প্রতিটি ক্রিয়াকে ধর্মীয় অভ্যাস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ডোগেনের অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘এহেই কোরোকু’—সংকলিত বক্তৃতা এবং ‘ফুকান জাজেনগি’—জাজেনের মৌলিক নির্দেশিকা। তাঁর ভাষা কখনো দার্শনিক, কখনো কবির মতো। কখনো ধাঁধার মতো জটিল, কখনো বজ্রাঘাতের মতো পরিষ্কার। তাঁর রচিত আরও গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর রচনাবলি সোতো জেনের ভিত্তি ও নির্দেশনা তৈরি করে।
ডোগেনের ধ্যানবোধ এবং উপদেশাবলির একটি উদাহরণ :
‘বুদ্ধ হওয়ার সহজ পথ আছে:
যখন তুমি অশুভ কর্ম থেকে বিরত থাকো,
জন্ম-মৃত্যুর আসক্তি ত্যাগ করো,
সকল জীবের প্রতি করুণা দেখাও,
বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করো ও কনিষ্ঠদের প্রতি সদয় হও,
কিছু চাও না, কিছু বাদ দাও না,
চিন্তা বা দুশ্চিন্তা না করে থাকো—
তখনই তুমি বুদ্ধ নামে পরিচিত হবে।
অন্য কিছু খুঁজো না।’
এই বাক্যে ডোগেন স্পষ্ট করে বলেছেন, আসক্তিহীনতাই চূড়ান্ত মুক্তি। এমনকি ‘বুদ্ধ হতে চাওয়া’—এ আকাঙ্ক্ষাটিও একপ্রকার আসক্তি এবং তা ত্যাগ করাও প্রয়োজন।
ডোগেন ইহি পর্বতে যে আইহেই-জি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, তা পরবর্তী সময়ে সোতো জেনের প্রধান মঠে পরিণত হয়। তিনি কঠোর ধ্যান, সরল জীবনযাপন এবং প্রতিদিনের কাজকে আধ্যাত্মিক অভ্যাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
ডোগেন ১২৫৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন; কিন্তু তাঁর শিক্ষা সোতো জেন বৌদ্ধধর্মের ভিত্তি হয়ে ওঠে, যা আজ জাপানের বৃহত্তম জেন সম্প্রদায়। তাঁর দর্শন শুধু বৌদ্ধধর্মেই নয়, জাপানি শিল্প–সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বিশ শতকে তাঁর রচনাসমগ্র পাশ্চাত্যে পরিচিত হওয়ার পর তিনি বিশ্বব্যাপী একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।
ডোগেনের সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ ‘শোবো গেঞ্জো’। ৯৫টি প্রবন্ধের সংকলন এটি, যা জেন বৌদ্ধধর্মের সবচেয়ে গভীর দার্শনিক রচনাগুলোর মধ্যে একটি। এটি সরাসরি অভিজ্ঞতার ভাষায় লেখা, যুক্তির কাঠামো এড়িয়ে।
ডোগেনের শিক্ষার কেন্দ্রীয় বার্তা হলো, প্রতিটি মুহূর্তের সম্পূর্ণতা ও প্রতিটি ক্রিয়ার মধ্যে নিহিত দিব্যতা উপলব্ধি করা। শিকান্তাজার মাধ্যমে তিনি আমাদের বর্তমান মুহূর্তের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বসবাস করার, নিজের প্রকৃত স্বরূপকে সরাসরি অনুভব করার পথ দেখিয়েছেন, যা কোনো লক্ষ্যের দিকে যাত্রা নয়, বরং এই মুহূর্তেই সম্পূর্ণ জাগ্রত হওয়ার অনুশীলন।
ডোগেনের জীবন ও শিক্ষা জেন বৌদ্ধধর্মকে জাপানে একটি স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে। আজও তা বিশ্বব্যাপী অনুশীলিত হয়। তাঁর দর্শন অস্থায়িত্ব, অনুশীলনের গুরুত্ব এবং বাস্তবতার গতিশীলতার ওপর জোর দেয়। তাঁর কার্যাবলি ও কবিতা তাঁর দার্শনিক গভীরতার প্রমাণ, যা অনুশীলনকারীদের জ্ঞানলাভের পথ দেখায়।
ডোগেন একজন বিশিষ্ট কবিও ছিলেন, বিশেষ করে জাপানি প্রকরণ ‘ওয়াকা’ এবং চীনা শৈলীর কবিতা রচনায়। তাঁর কবিতা কোনো সাধারণ কবিতা নয়, বরং জেনের দার্শনিক অভিব্যক্তি। তাঁর কবিতায় প্রায়ই প্রতিদিনের জীবন ও প্রকৃতির চিত্রের মাধ্যমে গভীর দার্শনিক সত্য ও আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি প্রকাশ পায়। তাঁর কবিতা বুদ্ধ-প্রকৃতির সর্বজনীনতা এবং সময়ের প্রক্রিয়াকে কবিতাময়ভাবে প্রকাশ করে। তাঁর কবিতা ওয়াকা ফরম্যাটে, যা হাইকুর চেয়ে পুরোনো এবং জেনের প্রকৃতিবাদী ও নান্দনিক দর্শন প্রতিফলিত করে।
ডোগেন জেনজির একগুচ্ছ কবিতা
১.
পাহাড়ের নীরবতা
যতবার শুনি,
ততবার বুঝি—
আমার নিজের ভেতরেও
একটা পাহাড় আছে।
২.
ধোঁয়া ভেসে যায়,
আগুন থাকে না—
কিন্তু উষ্ণতার স্মৃতি
মাঝেমধ্যেই ফিরে আসে।
৩.
এক ফোঁটা শিশিরে
পৃথিবী পুরোটা ধরা পড়ে—
অদ্ভুত,
আমরা দেখতে ভুলে যাই।
৪.
বাতাসের দিকে
চোখ তুলে দাঁড়ালেই
বুঝে ফেলো—
হাওয়ার কোনো উদ্দেশ্য নেই,
তবু সে পথ দেখায়।
৫.
মেঘের নিচের আলো
যখন মৃদু হয়ে আসে,
মনও তখন
সঠিক উচ্চতা খুঁজে পায়।
৬.
বইতে থাকা নদী
পেছনে ফিরে তাকায় না।
আমরা তাকিয়ে থেকে
শুধু সময় নষ্ট করি।
৭.
বৃষ্টি থেমে গেলে
যে গন্ধ জেগে ওঠে—
সেটাই জাগরণ,
বাকিটা ভাবনামাত্র।
৮.
যে ফুল ফোটে
নিজেকে না জেনে,
তার সৌন্দর্য
কীভাবে ব্যাখ্যা করব?
৯.
অতীতের ছায়া
যখন একটু দূরে সরে,
বর্তমানের আলো
নিজেকে চিনতে শেখে।
১০.
রাত যতই ঘন হোক,
একটা ছোট আলো
নিজেই পথ বানিয়ে নেয়।
১১.
ফাঁকা কক্ষে
যদি মন বসে—
কক্ষই তাকে
পরিপূর্ণ করে ফেলে।
১২.
তোমার হেঁটে চলা
যেন পথেরই জাগরণ—
তুমি নেই,
শুধু হাঁটার ইশারা।
১৩.
নিস্তব্ধতা
কোনো ফাঁকা জিনিস নয়—
এটা শুনলে বোঝা যায়
কেমন করে কথা বলা উচিত।
১৪.
চাঁদ যখন ওঠে
জল মুখ তুলে নেয়—
এইটুকুর মধ্যেই
সম্পর্কের পূর্ণতা।
১৫.
একটা সাধারণ পাথর
সূর্য পেলে
স্বর্ণ হয়ে ওঠে—
এটাই বোধির রূপ।
১৬.
হাত দিয়ে
হাওয়া ধরা যায় না—
তবু হাওয়াই
আমাদের ছুঁয়ে যায় প্রথমে।
১৭.
যে বাঁশ একবার নুয়ে পড়ে,
ফিরে দাঁড়ানোর মাঝেই
তার শিক্ষা লুকানো।
১৮.
সামনের দরজা খোলা,
কিন্তু মন জানালায়—
এই ভুলটাই
আমাদের দেরি করায়।
১৯.
ঢেউ ওঠে,
ঢেউ নামে—
কিন্তু সাগরের
চিন্তাটা কখনো বদলায় না।
২০.
একটু থেমে দাঁড়াও—
হয়তো ঠিক এ মুহূর্তেই
তোমার সমস্ত বিভ্রান্তি
নিজে থেকেই সরে যাবে।
২১.
দরজার ফাঁক দিয়ে
যে আলো ঢোকে—
ওটাই বলে দেয়
সত্য কখনো গোপন থাকে না।
২২.
পাতা ঝরার শব্দ
মনকে থামিয়ে দেয়—
অকারণে, অথচ
প্রয়োজনমতো।
২৩.
গভীর রাতে
মশালের আঁচ কমলে
অন্ধকারও
মমতার মতো নরম হয়।
২৪.
চায়ের ধোঁয়া
একমুহূর্তে মিলিয়ে যায়—
আমাদের জীবনের
ছায়াটাও এমনই।
২৫.
কুয়াশার ভেতর দিয়ে
হাঁটলে বোঝা যায়—
দূরত্বের ধারণা
নিশ্চিত নয়।
২৬.
পাহাড়ের কোলে
একটা ছোট নুড়ি—
দেখলে মনে হয়
নম্রতাই সবচেয়ে বড় শক্তি।
২৭.
নিজেকে ভুলে
যে কাজ করা যায়—
সেই কাজই
চিহ্ন রেখে যায়।
২৮.
ঘাসের মাথায়
জলকণা গড়িয়ে পড়ার আগে
তার স্থিরতা—
অবিশ্বাস্য শিক্ষাগুরু।
২৯.
জং ধরা ঘণ্টা
বাজে কম,
কিন্তু তার শব্দ
মনকে টেনে নেয় গভীরে।
৩০.
সূর্যের আলো
যখন দেয়ালে পড়ে
ঘরের জিনিসপত্রও
উৎসবমুখর হয়ে যায়।
৩১.
পথ যত সরল,
চলা তত কঠিন—
কারণ ভুল করার জায়গা কম।
৩২.
নদী অল্প বাঁক নিলে
দিগন্তের আকার বদলায়—
চোখও তেমন,
যখন মন পরিষ্কার।
৩৩.
উপত্যকায় দাঁড়িয়ে
নিজের নিশ্বাস শুনলে
তার কথা বোঝা যায়।
৩৪.
সহজ আনন্দ
সবচেয়ে স্থায়ী—
কারণ ওরা
কোনো প্রতিদান চায় না।
৩৫.
যে বীজ মাটিতে পড়ে,
সে জানে না
তার ভবিষ্যৎ বৃক্ষ হওয়া।
তবু সে প্রস্ফুটিত হয়।
৩৬.
শুকনো পাতায়
পা দিলে
যে শব্দ ওঠে—
মুহূর্তটা জীবনের
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।
৩৭.
চাঁদের আলোয়
ছায়া লম্বা হয়—
মানুষও কখনো
নিজেকে বড় ভাবতে শেখে
অকারণেই।
৩৮.
কুয়ো থেকে পানি তুলে
মুখে দিলে—
বুঝি, তৃষ্ণার মানেও
দেহের মতোই ক্ষণস্থায়ী।
৩৯.
ঝিঁঝি পোকার ডাক
রাতে এত স্পষ্ট—
কারণ অন্ধকার
চারপাশের উচ্ছ্বাসকে
তীক্ষ্ণ করে দেয়।
৪০.
হাঁটা থামালে
পথও থামে কিছুক্ষণ—
মনে হয়
এভাবেই
জগৎ আমাদের সঙ্গে কথা বলে।
৪১.
পাহাড় যেমন
পাহাড় হয়েই থাকে,
নদী যেমন
নদী হয়েই বয়,
তেমনি মানুষ
নিজে হয়ে ওঠার পথেই মুক্ত।
৪২.
রাতের মেঘ কেটে গেলে
চাঁদ তো আগেই ছিল আকাশে—
কেবল চোখের নিচের পর্দাটা উঠতে
সময় লাগে।
৪৩.
যদিও বসন্তের ফুল ঝরে যায়,
তার মন (Buddha-Mind) প্রকাশিত হয়—
হাজার হাজার নদীর ওপরে ভেসে থাকা
একটি পাতায়।
৪৪.
যেদিকেই হাঁটি,
শেষে এসে মেশে
একই উৎসে—
জীবনের সব পথই
একই নদীর বিভিন্ন স্রোত।
৪৫.
তুষার পড়ে,
পড়েই মিলিয়ে যায়।
হাওয়ায় ভেসে ওঠা তুলোর মতো—
আমার মনও কি
এমনই ক্ষণস্থায়ী?
৪৬.
খুঁজতে গেলে
কোনো চিহ্ন থাকে না।
কারণ পথটা
এখানেই—
এ মুহূর্তেই পায়ের নিচে।
৪৭.
যা খুঁজতে গিয়েছি,
হয়তো আসলে ছিল
মনের গভীরে।
স্বপ্নে, জাগরণে
চেয়ে দেখলে দেখা যায়।
৪৮.
স্বচ্ছ রাতের ভেতর
মন্দিরের ঘণ্টা বাজে।
শব্দটা কানে থেমে যায়,
কিন্তু তার আসল ইশারা
থাকে মনের গভীরে।
৪৯.
যদিও এই অজ্ঞ আমি
কখনো বুদ্ধ হতে না–ও পারি—
আমি অঙ্গীকার করি,
অন্যদের পার করাব:
কারণ, আমি একজন সন্ন্যাসী।