বাল্টার বেনিয়ামিন স্মরণে
বার্টল্ট ব্রেখ্টের ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতা
বার্টল্ট ব্রেখ্ট ও বাল্টার বেনিয়ামিন—তাঁদের বন্ধুত্বের গভীরে ছিল ফ্যাসিজমের উত্থানের মুখে দাঁড়িয়ে চিন্তা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে লড়াই করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এই দুই মহান তাত্ত্বিকের জীবন ও কাজ আজও আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে যে সংস্কৃতি ও রাজনীতি কখনোই আলাদা কিছু নয়; বরং দুটিই মুক্তির লড়াইয়ে অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৯৪০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্পেন সীমান্তে ফ্যাসিস্টদের হাতে প্রত্যর্পণের আশঙ্কায় বেনিয়ামিন আত্মহননের পথ বেছে নেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকে নিমজ্জিত ব্রেখ্ট লিখেছিলেন হৃদয়স্পর্শী কিছু কবিতা। ব্রেখ্টের সেই সব কবিতার বাংলা অনুুবাদ করেছেন নাসিফ আমিন
অনুবাদকের ভূমিকা
বার্টল্ট ব্রেখ্ট ও বাল্টার বেনিয়ামিন—বিশ শতকের দুই অসাধারণ চিন্তাবিদ ও বন্ধু, যাঁরা সংস্কৃতি, রাজনীতি ও দর্শনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। তাঁদের বন্ধুত্বের গভীরে ছিল ফ্যাসিজমের উত্থানের মুখে দাঁড়িয়ে চিন্তা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে লড়াই করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
বাল্টার বেনিয়ামিন মূলত ছিলেন দার্শনিক ও সংস্কৃতিক সমালোচক। তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দ্য এজ অব ইটস মেকানিক্যাল রিপ্রোডিউসিবিলিটি’তে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে শিল্পের ব্যাপক পুনরুৎপাদনের মধ্য দিয়ে শিল্পের ‘অরা’ অর্থাৎ শিল্পের অনন্যতা ও ঐতিহাসিক মর্যাদা নষ্ট হয়ে যায়। বেনিয়ামিন মনে করতেন, ফ্যাসিজম এই অরা ব্যবহার করেই সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সিনেমা, ফটোগ্রাফির মতো আধুনিক প্রযুক্তি শিল্পকে জনসাধারণের কাছে পৌঁছে দেয় এবং ফ্যাসিস্টদের সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ভেঙে দিতে পারে।
অন্যদিকে, বার্টল্ট ব্রেখ্ট নাটকের মাধ্যমে ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর ‘এপিক থিয়েটার’-এর মূল উদ্দেশ্য ছিল দর্শকদের আবেগের জালে আটকে না রেখে তাঁদের সচেতন ও সক্রিয় করা। নাটকে তিনি একটি বিশেষ কৌশল ব্যবহার করতেন, যাকে বলা হয় ‘অ্যালিয়েনেশন ইফেক্ট’, যার মাধ্যমে দর্শক নাটকের চরিত্র বা কাহিনির সঙ্গে নিজেকে একাত্ম না করে বরং চিন্তা ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টিকে দেখেন। ব্রেখ্টের ‘ফিয়ার অ্যান্ড মিজারি ইন দ্য থার্ড রাইখ’ নাটকে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে ফ্যাসিস্ট নিপীড়নের সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ রূপ, যার মাধ্যমে তিনি দর্শকদের বাধ্য করতেন নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে ভাবতে।
বেনিয়ামিন ও ব্রেখ্ট দুজনই বিশ্বাস করতেন, সংস্কৃতির মাধ্যমে সমাজের পরিবর্তন আনা সম্ভব। তাঁরা দুজনে মিলে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশের পরিকল্পনা করেছিলেন, যার নাম ছিল ‘ক্রিজে উন্ড ক্রিটিক’। তাঁদের লক্ষ্য ছিল মার্ক্সবাদী তত্ত্ব, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমালোচনা একত্র করে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। যদিও এই ম্যাগাজিন শেষ পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি, তবু এটি ছিল তাঁদের যৌথ প্রচেষ্টার একটি শক্তিশালী প্রতীক।
এই দুই বন্ধুর আলাপচারিতা ছিল গভীর, বুদ্ধিদীপ্ত ও আন্তরিক। ব্রেখ্ট নিজেই বলেছেন, বেনিয়ামিন ছিলেন তাঁর সৃষ্টিশীল নাট্যচিন্তার সবচেয়ে গভীর সমালোচক। অন্যদিকে বেনিয়ামিনের দর্শন ও ইতিহাসের তত্ত্বগুলোও ব্রেখ্টের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই আরও তীক্ষ্ণ ও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁদের চিন্তার ভিত্তিতে ছিল মার্ক্সবাদ। তবে দুজনের মার্ক্সবাদের ধরন ছিল ভিন্ন। বেনিয়ামিনের মার্ক্সবাদে ছিল একধরনের মেসিয়ানিক আশা ও ইতিহাসের প্রতি দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি, যা তিনি তাঁর ‘থিসিস অন দ্য ফিলোসফি অব হিস্ট্রি’তে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ব্রেখ্টের মার্ক্সবাদ ছিল আরও সরাসরি ও বাস্তববাদী, যেখানে নাটকের মাধ্যমে স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হতো।
১৯৪০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর স্পেন সীমান্তে ফ্যাসিস্টদের হাতে প্রত্যর্পণের আশঙ্কায় বেনিয়ামিন আত্মহননের পথ বেছে নেন। তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোকে নিমজ্জিত ব্রেখ্ট লিখেছিলেন হৃদয়স্পর্শী কিছু কবিতা। ব্রেখ্টের সেই সব কবিতা শুধু বন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক প্রকাশকারী উপমা-উৎপ্রেক্ষার ঘনঘটা নয়, বরং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তাঁদের যৌথ লড়াইয়ের স্থায়ী স্মারক।
বাংলায় ব্রেখ্টের কবিতাগুলোর অনুবাদ করতে এর্ডমুট ভিৎসিসলা প্রণীত ও ক্রিস্টিন শাটলওয়ার্থ কর্তৃক ইংরেজিতে অনূদিত বই ‘বাল্টার বেনিয়ামিন অ্যান্ড বার্টল্ট ব্রেখ্ট: দ্য স্টোরি অব আ ফ্রেন্ডশিপ’-এর সাহায্য নেওয়া হয়েছে। এই দুই মহান তাত্ত্বিকের জীবন ও কাজ আজও আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে যে সংস্কৃতি ও রাজনীতি কখনোই আলাদা কিছু নয়; বরং দুটিই মুক্তির লড়াইয়ে অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাল্টার বেনিয়ামিন সমীপে, যিনি হিটলার থেকে পালাতে আত্মহত্যা করেছিলেন—
কৌশলে ক্রমশ দুর্বল করে দিতে তুমি মজা পেতে
ছায়ানিবিড় নাশপাতিগাছের নিচে দাবার টেবিলে বসে
তোমার বইগুলো থেকে তোমাকে দূরে সরাতে পারে এমন দুশমন
আমাদের মতন মানুষের কাছে বিলকুল বিপর্যস্ত নন।
শরণার্থী ডব্লিউ বি–এর আত্মহত্যা প্রসঙ্গে
আমাকে বলা হয়েছে, তুমি নিজের বিরুদ্ধে নিজেই উঠে দাঁড়িয়েছ
জল্লাদের মতলব আঁচ করতে পেরে
নির্বাসনের আট বছর পর, শত্রুর উত্থান দেখতে দেখতে
শেষমেশ, দুর্ভেদ্য সীমান্তের সামনে এসে পড়েছ
অতিক্রমও করেছ, ওরা বলল, অতিক্রম্যই নাকি ছিল।
সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। দলের পান্ডারা
প্রায় মন্ত্রীদের মতোই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
জনগণকে
আর হাতিয়ারে–হাতিয়ারে দেখা যাচ্ছে না।
তাই ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিপতিত এবং ন্যায়ের শক্তিরা দুর্বল।
এসব তুমি সহজেই বুঝেছিলে
আর নিপীড়িত একটি দেহ নষ্ট করেছিলে।
অর্থবেদজ্ঞ বেনিয়ামিন কোথায় আছেন?
অর্থবেদজ্ঞ বেনিয়ামিন কোথায় আছেন?
কোথায় আছেন রেডিও পরিবেশক ওয়ারশাওয়ার?
শিক্ষক স্টেফিনই বা কোথায়?
বেনিয়ামিনকে স্পেনীয় সীমান্তে কবর দেওয়া হয়েছে।
ওয়ারশাওয়ারকে ওলন্দে।
স্টেফিন শায়িত আছেন মস্কোতে।
আর আমি লস অ্যাঞ্জেলেসের বোমারু বিমানের ছাউনিতলে ছুটে বেড়াচ্ছি।
দুর্ঘটনার ফর্দ
একটি ডুবন্ত জাহাজ থেকে পালিয়ে আরেকটি ডুবন্ত জাহাজে উঠে পড়ে
আশেপাশে কাউকে না দেখে, আমি লিখে রাখলাম
একটুকরা দুমড়ানো কাগজে; তাদের নাম,
যারা আমার পাশে আর নেই।
খেটে খাওয়া সমাজের সেই ছোটখাটো শিক্ষক
মার্গারেট স্টেফিন। পাঠদানের মাঝখানে
অবিরত উড্ডয়নে ক্লান্ত
ছোটখাটো জ্ঞানী লোকটা নিমজ্জিত হলেন এবং মারা গেলেন।
একইভাবে, বাল্টার বেনিয়ামিন আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন—
আমার দ্বিমতের সঙ্গী, অসামান্য জ্ঞানী
সর্বদা নতুনের খোঁজে রত
অনতিক্রমণীয় সীমান্তে
নিপীড়নে ক্লান্ত তিনি শুয়ে পড়লেন।
আর কখনো সে ঘুম থেকে তিনি জাগলেন না।