মরা মানুষের দাঙ্গা

১৮৩২ সালের কলেরা মহামারির এক বছর আগে প্যারিসে যান জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনে এবং বাকি জীবন সেখানেই কাটান। ১৮৩২ সালের মহামারির চিত্রাবলি পত্রিকায় লিখেছিলেন এই কবি। তাঁর সেই কলামগুলো নিয়ে ১৮৩৩ সালে ফ্রেঞ্চ অ্যাফেয়ার্স: লেটার্স ফ্রম প্যারিস নামে সংকলন প্রকাশিত হয়। এতে কলেরা মহামারি নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছিল। আজকের করোনাভাইরাস মহামারির মতোই ছিল এর ব্যাপ্তি, ছয় মাসে শুধু প্যারিসেই মারা গিয়েছিল ২০ হাজার মানুষ। এই মারিকালে ১৮৩২ সালের ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত হাইনের কলামের অংশবিশেষ এখানে অনূদিত হলো। নিউইয়র্কভিত্তিক পাক্ষিক লাফ্যাম কোয়ার্টারলিতে প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করেছেন নুসরৎ নওরিন

২৯ মার্চ তার আনুষ্ঠানিক আগমন ঘোষিত হয়েছিল। দিনটি ছিল উজ্জ্বল রোদ আর সুন্দর আবহাওয়ার। প্যারিসের বাসিন্দারা উচ্ছ্বাস, আনন্দে বুলেভার্ডে ভিড় করেছিল। তবে এদের মধ্যেও মুখোশ পরা পাংশু, অসুস্থ চেহারার মানুষ ছিল। তারা যেন কলেরার ভয়কে বিদ্রূপ করছিল। বলনাচের আসরগুলোতে ভিড় অনেক বেশি। হাসির শব্দে সংগীত শোনাই যায় না, এমন অবস্থা। লোকজন নেচে নেচে ঘাম ছুটিয়ে ফেলছিল। পানীয়ের চাহিদা তুঙ্গে। এর মধ্যেই হাসিখুশি ভাঁড়টা হঠাৎ দেখল, তার পা দুটো বিশ্রী রকমের ঠান্ডা হয়ে গেছে। মুখোশ খুলতেই সবাই অবাক হয়ে দেখল, তার মুখটা নীলচে বেগুনি হয়ে গেছে। বুঝতে কারও দেরি হয়নি যে ভাঁড়টা মজা করছিল না। সব হাসি উধাও হয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে জিয়ু হোটেলের ওই বলনাচের আসর থেকে নারী-পুরুষদের গাড়িতে করে সেন্ট্রাল হাসপাতালে আনা হলো। এখানে মুখোশ পরা অবস্থাতেই দ্রুত তাদের মৃত্যু হলো। ভয়ের প্রথম ধাক্কায় যেহেতু লোকজন ভাবছিল ছুঁলেই কলেরা হবে আর ওদিকে হাসপাতালের অন্য রোগীরা ভয়ে চিৎকার করছিল, তাই মৃতদের নাকি জামাকাপড়সহ দ্রুত কবর দেওয়া হয়। এমনকি ভাঁড়টার গায়ের পোশাকও রয়ে গিয়েছিল।

অনেক গুজব ছড়াল। যেমন লোকগুলো কোনো অসুখে নয়, বরং নাকি বিষে মারা গিয়েছিল। শোনা গেল, বাজারে যেসব খাবার বিক্রি হয়, সেগুলোতে কিছু লোক বিষ মেশানোর পদ্ধতি বের করেছিল। যে খবর যত বেশি অদ্ভুত ছিল, মানুষজন তত আগ্রহে সেটা গ্রহণ করল। যারা প্রথমে বিশ্বাস করেনি, পরে পুলিশপ্রধানের একটা বক্তব্যে তারাও কথাটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হলো। কারণ, তিনি একটি নির্দেশ জারি করেছিলেন। অপরাধ দমনের চেয়ে সব দেশের পুলিশদের একটা বিষয়ে বেশি আগ্রহ। সেটা হলো অপরাধ বিষয়ে নিজেদের সবজান্তা প্রমাণ করা। এখানেও তাদের ইচ্ছা ঘটনার সত্যাসত্য নির্ণয়ের থেকে যেকোনোভাবে সরকারের ওপর থেকে সন্দেহের তির ঘোরানোই তাদের ইচ্ছা ছিল। তাই তারা যখন বলল বিষদাতাকে তারা প্রায় ধরে ফেলেছে, তখন বিষের কথাটা আনুষ্ঠানিক ভিত্তি পেয়ে গেল।

বুড়োরা বলল, ‘এমন কথা কস্মিনকালেও শুনিনি!’ তারা বিপ্লবের কঠিন দিনেও এমন ভয়ানক অপরাধ দেখেনি। নারীরা বাচ্চাদের বুকে চেপে বিলাপ করতে লাগল। গরিব লোকেরা অভাব আর হতাশায় হাত মোচড়াতে লাগল। মনে হলো কেয়ামত আসন্ন। রাস্তার কোনায় লাল রঙের মদের দোকানগুলোতে লোকজন জড় হতো। সাধারণত এখানেই সন্দেহভাজনদের খুঁজে বের করা হতো। সন্দেহজনক কিছু পেলে লোকজন তার ওপর পাগলা কুত্তার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ত। কখনো কোনো বিবেকবান মানুষ কিংবা মিউনিসিপ্যাল গার্ডরা কাউকে কাউকে বাঁচাতে পারত। কিন্তু কেউ কেউ আহত কিংবা পঙ্গু হয়ে যেত। একবার ছয়জনকে মেরেই ফেলা হয়েছিল। রক্তপিপাসু জনতা অসহায় শিকারকে হত্যার পর জনস্রোতে মিশে যেত। এরা ছিল পুরোপুরি নির্দয়, বর্বর, শয়তানের মতো। রু দি ভুজিরাতে (প্যারিসের একটি রাস্তা) দুজন লোককে মেরে ফেলা হয়েছিল। তাদের গায়ে এক রকম সাদা পাউডার পাওয়া গিয়েছিল। ওদের একজনকে মারার সময় আমি দেখেছিলাম। বুড়ো মহিলারা ওর জুতা জোড়া খুলে যতক্ষণ না ও মারা যায়, ততক্ষণ ওর মাথায় মারছিল। নগ্ন, ক্ষতবিক্ষত লোকটা। শুধু কাপড়ই নয়, ওর চুলও টেনে ছিঁড়ে ফেলেছিল। নাক-ঠোঁট কেটে দিয়েছিল। একজন ওর পায়ে দড়ি বেঁধে শহরের রাস্তায় টেনে নিয়ে গিয়েছিল। চিৎকার করে বলছিল, ‘পাওয়া গেছে কলেরা!’

পরদিন পত্রিকাগুলোতে খবর বেরোল, লোকটি সম্পূর্ণ নির্দোষ। সাদা পাউডারটা ছিল ক্যাম্ফর বা ক্লোরিন কিংবা কোনো ধরনের কলেরা প্রতিষেধক। এ-ও বলা হলো, যারা বিষে মারা গেছে, ওরা আসলে মহামারির কারণেই মারা গিয়েছিল।

প্যারিসের জনতা অন্যদের থেকে আলাদা নয়। তারাও দ্রুত খেপে উঠত, নির্মম রূপ নিত। এ খবরে তারা মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। রাগের মাথায় ওসব করেছিল বলে তারা দুঃখ করল, নিন্দাজ্ঞাপন করল। পত্রিকাগুলোর যৌক্তিক ব্যাখ্যা এভাবে লোকদের শান্ত করতে পারল। পুলিশ যে ক্ষতিটুকু করেছিল, সংবাদমাধ্যম খুব দ্রুত সেটাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারল।

এরপর সব আবার শান্ত হয়ে গেল। মানুষের মুখ যেন পাথরের মতো। বুলেভার্ডগুলোতে ভিড় কম। যে গুটিকয় লোক, তাদের মুখে হাত কিংবা রুমাল চাপা দিয়ে রাখা। থিয়েটারগুলো যেন মরে গেল। আমাকে একটা স্যালনে ঢুকতে দেখে লোকজন বিস্মিত হয়ে গেল। তারা ভাবেনি আমি তখনো প্যারিসে আছি। কারণ, প্যারিসে থেকে যাওয়ার মতো কোনো জরুরি কাজ আমার ছিল না। আসলে আমার স্বদেশিরা অনেক আগেই চলে গিয়েছিল। ঈশ্বরভক্ত ছেলেরা তাদের বাবাদের কোমল ইচ্ছা মেনে বাড়ি ফিরেছিল। অন্যদের মধ্যেও হঠাৎ পিতৃভূমি আর রাইনের রোমান্টিক পাহাড়-উপত্যকা দেখার ইচ্ছা জেগে ওঠে। শোনা যায়, হোটেল দ্য ভিলেতে ১ লাখ ২০ হাজার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল।

কলেরা দৃশ্যত দরিদ্রশ্রেণিকেই প্রথম আক্রমণ করে। তবে প্রথম পালায় ধনীরাই। পালানোর ক্ষেত্রে ফিল্ড মার্শাল ছিলেন ধনী ব্যাংকার এম আগুয়েদো। তিনি একজন ‘লিজন অব অনার’প্রাপ্ত ছিলেন।

বড়লোকদের চিকিৎসক আর ওষুধ বগলদাবা করে স্বাস্থ্যকর জায়গায় পালানো দেখে সাধারণ মানুষ বিরক্তিতে বিড়বিড় করত। গরিবেরা দেখল, টাকা মৃত্যু থেকেও সুরক্ষা দেয়। তবে পুরো রাজপরিবার এই দুঃখময় সময়ে অভিজাত আচরণ করেছিল। কলেরা ছড়িয়ে পড়ার পর রানি তাঁর বন্ধু ও ভৃত্যদের মধ্যে ফ্লানেল (একধরনের নরম কাপড়) ব্যান্ডেজ বিতরণ করেন। ব্যান্ডেজগুলোর বেশির ভাগই তিনি নিজ হাতে বানিয়েছিলেন। যুগটা যেন ফ্লানেলে ফ্লানেলময়। নিষ্ঠুরতম শত্রুর বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ বর্ম ছিল ওটা। আমিও আমার ঘাড় পর্যন্ত ফ্লানেলে ঢেকেছি। রাজা নিজে সর্বোৎকৃষ্ট বুর্জোয়া ফ্লানেল পরে থাকতেন। অনেক পাদরি ছদ্মবেশে জনতার মধ্যে মিশে একটা জপমালার কথা বলত। তারা বলত, এটা অব্যর্থ কলেরাজয়ী। বোনাপার্ট-সমর্থকেরা বলত, কলেরার লক্ষণ বোঝামাত্র প্লেস ভঁদোমের স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। তাহলে অসুখ অবশ্যই সারবে।

এখন চিকিৎসকেরাই ভালোবাসার অপর নাম। তারা প্রায়ই ‘হা ঈশ্বর!’ শব্দ দুটো বলে। তাদের গায়ে ওষুধের দোকানের গন্ধ। একটু পরপর জিজ্ঞেস করে, কতজন মারা গেল। কেউ আসল সংখ্যাটা জানে না। সবাই একটা অস্পষ্ট আতঙ্কে আড়ষ্ট। জার্নালগুলোতে এসেছিল, শুধু ১০ এপ্রিলেই দুই হাজার লোক মারা গিয়েছিল। কিন্তু মানুষজনকে এমন একটা আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে কোনোভাবে ঠকানো যেত না। তারা বারবার বলত, আসলে অনেক বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। আমার ক্ষৌরকারের কাছে একজন বুড়ো মহিলার কথা শুনেছিলাম। সে একদিন সারা রাত জানালার ধারে বসে মড়াগাড়ি গুনেছিল। কিন্তু তিন শ পর্যন্ত গোনার পর সে ঠান্ডায় জমে গিয়েছিল, তারপর তাকে কলেরার খিঁচুনিতে ধরে আর সে মারা যায়। রাস্তায় তাকালেই শবযাত্রা দেখা যেত। যেসব মড়াগাড়ির সঙ্গে আর কেউ থাকত না, সেগুলো দেখে বেশি মন খারাপ লাগত। তারপর মড়াগাড়িরও ঘাটতি দেখা দিল। সব ধরনের গাড়িই ব্যবহার হতে লাগল। ভাড়া করা ঘোড়াগাড়িও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডজন ডজন লাশ আনতে শুরু করল।

একদিন এক বন্ধুকে দেখতে গিয়ে দেখি সে মারা গেছে। তার মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তার শেষ আর্তির কথা ভাবছিলাম। তাই একটা গাড়ি নিয়ে তাকে বহনকারী গাড়ির সঙ্গে পেরে লাইশে (প্যারিসের বৃহত্তম কবরস্থান) গেলাম। কবরস্থানের কাছাকাছি গিয়ে আমার গাড়ির চালক থেমে গেল। মনে হলো ঘুম ভেঙে জেগে উঠলাম। সামনে আক্ষরিক অর্থেই শুধু আকাশ আর কফিন। চারপাশে কয়েক শ গাড়িতে লাশ। কবরস্থানের ছোট্ট প্রবেশদ্বারের সামনে একটা লম্বা লাইন ধরে সেগুলো দাঁড়িয়ে। যেহেতু সামনে বা পেছনে যাওয়ার উপায় ছিল না, এই বিষণ্ন পরিবেশে কয়েক ঘণ্টা বসে থাকতে হলো। বিরক্ত হয়ে কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার সামনের গাড়িতে কার মৃতদেহ। কী অদ্ভুত! সে যার নাম বলল, তাকে আমি চিনি। কয়েক মাস আগে ঠিক এমন করেই ওই তরুণীর গাড়ি আমার গাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছিল। সেদিনও এভাবেই দেরি হচ্ছিল। সেটা ছিল লোয়ান্টিতে এক বলনাচের আসর থেকে বেরোনোর পথে। আজকের সঙ্গে সে দিনটির একটাই পার্থক্য। সেদিন মেয়েটি গাড়ির জানালা দিয়ে একটু পরপর তার মাথা বের করছিল। তার চুলে ছিল ফুল আর সুন্দর প্রাণবন্ত মুখে চাঁদের আলো এসে পড়েছিল। দেরি হওয়ার বিরক্তি আর অধৈর্যে তার মুখটি হয়ে উঠেছিল আরও সুন্দর। আজ সে একেবারে শান্ত হয়ে গেছে। হয়তো খুব নীল। কিন্তু যখন গাড়িটানা ঘোড়াগুলো অধৈর্য হয়ে পা ঠুকছিল। আমার মনে হচ্ছিল, মৃতরাও অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। কবরে যাওয়ার জন্য তাদের আর তর সইছে না। হঠাৎ হট্টগোল শুরু হয়ে গেল। কারণ, একজন আরেকজনকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আধা সামরিক বাহিনীর লোকজন খোলা তলোয়ার নিয়ে এগিয়ে এল। এখানে-ওখানে কান্না আর শাপশাপান্ত শুরু হয়ে গেল। কিছু গাড়ি উল্টে কফিন গড়িয়ে হাঁ হয়ে পড়ল। মনে হলো, সমস্ত হাঙ্গামার মধ্যে সবচেয়ে কুৎসিতটাকে দেখতে পেলাম। আর সেটা হলো মরা মানুষের দাঙ্গা।

পেরে লাইশেতে কী দেখেছিলাম, তা আর বলতে চাই না। আমার মতো শক্ত মানুষও ভেঙে পড়েছিল। মৃতশয্যা দেখে শেখা যায় কীভাবে মরতে হয়। তারপর শান্তভাবে মৃত্যুর অপেক্ষা করা যায়। কিন্তু কলেরায় মরা মানুষদের মাঝখানে কীভাবে কলি চুনের কবরে সমাধিস্থ হতে হয়, তা আমার আয়ত্তের বাইরে। ওখানকার সবচেয়ে উঁচু পাহাড়চূড়ায় ছুটে গেলাম। ওপর থেকে নিচে ছড়িয়ে থাকা সুন্দর শহরটাকে দেখা যাচ্ছিল। ডুবন্ত সূর্যের শেষ আভা আমাকে বিদায় জানাচ্ছিল। গোধূলির বাষ্প অসুস্থ প্যারিসকে একটি পাতলা সাদা কাফনে ঢেকে দিচ্ছিল। এই অসুখী শহরের মাথায় দাঁড়িয়ে আমি ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম।

(বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে চার্লস গডফ্রে লেল্যান্ডের ১৮৯৩ সালের ইংরেজি অনুবাদ অনুসৃত হয়েছে।)