রমজান মাস, ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমেছে। এ অঞ্চলে বৃষ্টি এক আশীর্বাদের নাম, যা গরম থাকে সারা বছর! বৃষ্টি হলে খানিকটা স্বস্তি মেলে। এ রাজ্যকে বলা হয় খোদার নিজের দেশ। সত্যিই কি খোদা এখানে থকেন? এ রাজ্যবাসীর তেমনই বিশ্বাস। তা না হলে দিগন্তবিস্তৃত সবুজ বনভূমি, জলাধার, সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, চা–বাগান, নারকেল বন, অসাধারণ সব মানুষ সবকিছু এমন একত্র হলো কী করে!
ভারতের কেরালা রাজ্যের ত্রিশূর জেলায় এক ‘আশ্চর্য’ আছে, যে জন্য অনেকের মতো আমিও ছুটে এসেছি এখানে। সে ‘আশ্চর্য’ হলো দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ—চেরামান।
নবিজি জীবিত থাকা অবস্থায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত উপমহাদেশে যাঁরা আসেন, তাঁদের মাঝে উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন মালিক দিনার। তিনি ভারতবর্ষের মালাবার উপকূলে এসে থেকে গিয়েছিলেন এ সমুদ্রতটেই। তবে ইসলামের সাথে কেরালাবাসীর পরিচয় ঘটে গেছে এরও কয়েক বছর আগে। তখনকার চেরামান বংশের রাজা চেরামান পেরুমাল তাজউদ্দিন নবীজির সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে আরব দেশে যান এবং সেখানেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। দেশে ফিরে এসে ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজে মনোযোগ দেন। মালাবার উপকূলে অবশ্য আরবরা ব্যবসা–বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এর আগেও পায়ের ধুলা দিয়েছেন। তখন এই বণিকেরা কেরালার নারীদের বিয়ে করে কয়েক বছর বসবাস করতেন। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়া হতো কন্যার পরিবারকে। আরব পিতা ও মালাবার মাতার ঘরে যে সন্তান জন্ম নিত স্থানীয় ভাষায় তাদের মাপিলা বলা হতো। মাপিলাদের পিতারা কখনো কয়েক মাস বা কয়েক বছর মালাবার উপকূলে থেকে আবার আরব দেশে ফিরে যেত। এদের কেউ কেউ ব্যাবসার কাজে আবারও আসত, কেউ কেউ আর আসত না।
নবিজি জীবিত থাকা অবস্থায় ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারত উপমহাদেশে যাঁরা আসেন, তাঁদের মাঝে উল্লেখযোগ্য একজন ছিলেন মালিক দিনার। তিনি ভারতবর্ষের মালাবার উপকূলে এসে থেকে গিয়েছিলেন এ সমুদ্রতটেই।
এসব অবশ্য প্রাক্ ইসলামিক যুগের কথা। ইসলাম প্রচারের জন্য যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই থেকে যান মালাবার উপকূলে। ভারত উপমহাদেশে প্রথম ইসলামের আগমন ঘটে সপ্তম শতকে প্রথমে দক্ষিণ ভারতের মালাবার উপকূলে। এরপর উত্তর ভারতের বিভিন্ন রাজ্য জয়ের জন্য মুসলমান যোদ্ধারা আসেন। ইসলাম বিস্তৃত হতে থাকে ভারতবর্ষের দক্ষিণ, উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম সব দিকে।
আমি ত্রিশূর জেলার অপর প্রান্ত থেকে রওনা দিয়েছি চেরামান মসজিদের উদ্দেশে। মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে। চারদিক সবুজে ছাওয়া। চেরামান মসজিদ ও ত্রিশূরের অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করেছি। গাড়ি ছুটে চলছে গ্রামের পথ ধরে। কেরালার মাত্র দুটি শহর ছাড়া অন্য সব জায়গাকে কেরালাবাসী গ্রাম বলেই পরিচয় দেয়। এই বিনয় আমার কাছে ভালো লাগে। শহরের চাকচিক্যে গা ভাসানোয় এদের মনোযোগ নেই। আমি নিজেও ত্রিশূরের একটি গ্রামেই উঠেছি। বৃষ্টির কারণে বাইরে সবুজ ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। চেরামান মসজিদ অবধি পৌঁছাতে পৌঁছাতে বৃষ্টি ধরে এল।
গাড়ির ড্রাইভার ভাই কেরালার সাধারণ সাদা দেয়ালের, ছাদে লাল রঙের ট্যালি দেওয়া একতলা বাড়ি দেখিয়ে বললেন যে এটিই চেরামান মসজিদ৷ আমি বেশ অবাক হলাম। কারণ, কেরালার প্রায় সব বাড়িতে একই স্থাপত্যকলা অনুসরণ করা হয়। আর মসজিদটি তুলনামূলকভাবে বেশ ছোট। দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মসজিদ অথচ ঠাটবাট একেবারেই সাধারণ।
নবীজির জীবদ্দশায় ৬২৯ সালে এই মসজিদটি নির্মাণ করেন ইরাক থেকে আসা ধর্ম প্রচারক মালিক দিনার। তখন মসজিদটি দেখতে হয়তোবা এমনই ছিল বা এমনও হতে পারে মসজিদটি প্রবালের ইট বা কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদেরা বলেন, তখনকার দিনে কেরালার প্রায় সব ভবন প্রবাল, মাটি বা কাঠ দিয়ে নির্মাণ করা হতো। মালাবার উপকূলে পাথর খুব একটা পাওয়া যেত না। তাই পাথরের ব্লক বা ইট দিয়ে নির্মিত বাড়ি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
চেরামান মসজিদ ও ত্রিশূরের অন্যান্য জায়গায় যাওয়ার জন্য একটা গাড়ি ভাড়া করেছি। গাড়ি ছুটে চলছে গ্রামের পথ ধরে। কেরালার মাত্র দুটি শহর ছাড়া অন্য সব জায়গাকে কেরালাবাসী গ্রাম বলেই পরিচয় দেয়।
মসজিদের সামনের চত্বরটি খুব একটা বড় নয়। চত্বরের মেঝে সাদা রঙের মার্বেল পাথর দিয়ে বাঁধানো। কেরালার অন্যান্য ভবনের মতো এই ভবনটিও চারচালা ঘরের মতো দেখতে। ট্যালি দেওয়া চারচালা ছাদের ওপরে আরেকটি ছোট চারচালা ছাদ বসানো। আর ট্যালির সামনের দিকে কাঠ দিয়ে ত্রিভুজাকার নকশা করা। এটি কেরালার স্থাপত্যশিল্প বা বাস্তুশাস্ত্রের প্রতীক। প্রতিটি বাড়ি, মসজিদ, মন্দির, গির্জা এই আদলে নির্মাণ করা হয়। অবশ্য নতুন কিছু মসজিদ আর গির্জা ভবনে আধুনিক রূপ দেওয়া হচ্ছে।
সত্যি বলতে কি, চেরামান মসজিদ দেখে প্রথমে আমি মন্দির ভেবেছিলাম, কারণ কেরালার সব মন্দিরও একই আদলে গড়া। কেরালায় মসজিদ যে অন্যান্য সাধারণ ভবনের মতো দেখতে হবে, তা ভাবিনি। এই মসজিদে গম্বুজ নেই, কোথাও নেই এর মিনার। গম্বুজবিহীন মসজিদ দেখে চোখ অভ্যস্ত নয়। তবুও মেনে নিলাম। বৃষ্টিতে সামনের চত্বর ভিজে পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে মসজিদের একমাত্র ছোট দরজা দিয়ে ভেতরে উঁকি মারলাম। ভেতরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রবল কিন্তু ভেতরে নারীদের প্রবেশ নিষেধ। তাই বাইরে থেকে যতখানি দেখা যায় দেখে নিলাম। ভেতরে শতরঞ্জি বিছানো। কাঠের চৌকাঠ পার হলে সামান্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে মিহরাব। সাদা দেয়ালে আর মিহরাবে খুব একটা নকশা নেই। মিহরাব আর দরজার মাঝখানে পিতলের বড় একটা দুই তাকের প্রদীপ ছাদ থেকে ঝুলছে। এমন দৃশ্য আমি দেখব বলে আশা করিনি। কেরালার বাইরে সমস্ত ভারত উপমহাদেশে প্রদীপকে আমরা মন্দিরে শোভা পেতে দেখি। মসজিদে–মন্দিরে ব্যবহার করার প্রদীপ দেখে মেলাতে পারছি না। কেরালাবাসীর প্রার্থনার এই আচারটি অসাধারণ।
কেরালা রাজ্যের ভাষা মালয়ালম। আমি কান্নাড়, তামিল ভাষা জানলেও মালয়ালম ভীষণ কঠিন বলে শেখা হয়ে ওঠেনি। আকার–ইঙ্গিতে মসজিদের একজন সেবককে অনুরোধ করলাম ভেতরে যাওয়া যাবে কি না। তিনি বললেন, অনুমতি নেই। আমি তাই ঘুরে মসজিদের পেছনের দিকে চলে এলাম। মসজিদের পেছনে একটি পুকুর আছে। পুকুর ঘাটের আগে একটি সুদৃশ্য তোরণ। কেরালায় এমন তোরণ অনেক জায়গায় দেখা যায়। তোরণের মাথায় লাল ট্যালি দেওয়া ছাদ। আর এরপর বয়ে যাচ্ছে সবুজ টলটল পানি। একসময় এই নান্দনিক পুকুরে মুসল্লিরা অজু করতেন। এখন অজু করার জন্য মসজিদের পেছনে কয়েকটা পানির কল বসানো আছে। তাই এই পুকুর এখন একা নিরালায় পথ চেয়ে রয়। কেউ আর আসে না, ঘাটে বসে খোদার ভাবনায় ডুবে যায় না। তবে খোদার ভাবনায় ডুবে যাওয়া যায় এমনই জায়গা এই চেরামান মসজিদ। শান্ত, নির্ভার এক এলাকা। কোথাও কোনো শব্দ নেই, মানুষজনও দেখা যাচ্ছে না। শুধু নামাজের সময় মুসল্লিরা এসে নামাজ আদায় করেন। বাকি সময় নীরবে বয়ে যায় মালাবার উপকূলের যত কথা।
আমি কবরস্থান পার হয়ে মসজিদের পুকুরের ঘাটে গিয়ে বসলাম। এমন শান্তির পরিবেশ আর হয় না। এমন স্থানীয় সজ্জায় সজ্জিত খোদার ঘরের তুলনা নেই। পুকুরের সবুজ পানিতে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ে তরঙ্গ তুলছে।
পুকুরের এক পাশে প্রাচীন একটি দেয়ালের ক্ষয়িষ্ণু অংশ দাঁড়িয়ে আছে। লাল ইটের মতো বড় বড় প্রবাল দিয়ে দেয়ালটি নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রবালে কালের সাথে চলতে চলতে ক্ষয়ে ছিদ্র ছিদ্র হয়ে গেছে দেয়াল। এই দেয়াল চেরামান মসজিদ নির্মাণের সময়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। দেয়ালে লেখা আছে তেরো শ সাতানব্বই বছরের পুরোনো মসজিদের ইতিহাস। লেখা আছে মালাবার উপকূল থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস।
মসজিদ প্রাঙ্গণের ডান পাশে একটি কবরস্থান। আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। সবুজের মাঝে সারি সারি সাধারণ কবরের পাশাপাশি অবস্থান। কবরগুলোর কোনোটাতেই বেড়া দেওয়া নেই বা কোনোটিই বাঁধাইও করা নয়। কোনো কোনো কবরে নামফলক আছে তবে তা মালয়ালম ভাষায় লিখিত। কোনো কোনো কবরের ফলক দেখে মনে হচ্ছে হাজার বছরের পুরোনো। আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষায় কোথাও কিছু লেখা নেই। একটা জাতি নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব সংস্কৃতিকে যে ধরে রাখতে জানে এবং মনেপ্রাণে লালন–পালন করে তার উদাহরণ মালায়ালি জাতি।
কবরস্থানে আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। কবরস্থান বিষয়ে একেক জায়গার একেক নিয়ম। কোথাও কোথাও নারীদের প্রবেশ নিষেধ। তবে এখানে ঢোকার আগেই মসজিদের খাদেম সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নিয়েছিলাম, প্রবেশ করা যাবে কি না। তিনি সম্মতি দিয়েছেন। সারি সারি অপরিচিত মানুষের কবরের মাঝে দাঁড়িয়ে আমি দোয়া করলাম গত হয়ে যাওয়া সব নেক বান্দাদের জন্য। আমি বেরিয়ে আসতে আসতে দেখি একজন ভদ্রলোক কেরালার স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পোশাক মানে সাদা শার্ট আর সাদা লুঙ্গি পরে কয়েকটা কবরের সামনে দাঁড়িয়ে কবর জিয়ারত করছেন। কবর জিয়ারতের সময় তিনি মাথায় টুপি পরেননি।
এর মাঝেই আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হলো। আমি কবরস্থান পার হয়ে মসজিদের পুকুরের ঘাটে গিয়ে বসলাম। এমন শান্তির পরিবেশ আর হয় না। এমন স্থানীয় সজ্জায় সজ্জিত খোদার ঘরের তুলনা নেই। পুকুরের সবুজ পানিতে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ে তরঙ্গ তুলছে আর ঠিক তখন জোহরের আজানের ধ্বনি আসে মসজিদ থেকে। মাইকবিহীন মসজিদের সুর এখন পুকুরের স্বচ্ছ সবুজ পানিতে মিলেমিশে তরঙ্গায়িত হচ্ছে আর একই মৃদু সুরে বলে উঠছে—
‘আল্লাহু আকবার
আল্লাহু আকবর
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।’








