বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তো সেই উপন্যাসের বিষয়বস্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, মাহমুদুল হকের কালো বরফ-এর বিষয়বস্তুও তাই। ভালো সাহিত্যকর্ম কি তবে দুঃখবেদনা থেকেই সৃষ্টি হয়? এই সব এলোমেলো কথা ভাবছিলাম, আর বারবার মনে ভেসে উঠছিল হাসান আজিজুল হকের মুখ। কথা ছিল একবার আমি তাঁর বাড়ি গিয়ে তিন দিন থাকব, যাব একদম একা, আর কাউকেই সঙ্গে নেব না; তিন দিন ধরে গল্প করব শুধু আমরা দুজন। আগে যে দুবার তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম, গিয়েছিলাম সদলবল; সারা রাত ধরে আড্ডা চলেছিল, কিন্তু আমরা দুজন যেসব বিষয় নিয়ে আলাপ করার কথা বহু বছর ধরে ভেবে আসছিলাম, সেসব আলাপ আড্ডার মধ্যে হয় না। তাই তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি একবার তিন দিনের জন্য চলে এসো।’

কথা ছিল আমি তাঁর একটা দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেব। তিনি অবশ্য বলেছিলেন, ‘সাক্ষাৎকার রাখো, আমরা গল্পগুজব করব।’ সেই সব গল্পগুজবে মানুষ হাসান আজিজুল হককে নিবিড়ভাবে দেখতে চেয়েছিলাম; যে কথাসাহিত্যিকের সব লেখা আমার পড়া হয়েছে, কোনো কোনো গল্প পড়া হয়েছে অজস্রবার, তাঁকে আমি দেখতে চেয়েছিলাম লেখার বাইরে, তাঁর মুখোমুখি বসে, তাঁর মুখের দিকে চেয়ে তাঁর কথা শুনে, তাঁর সঙ্গে পদ্মাপাড়ে বেড়াতে গিয়ে, পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে তিনি আমাকে নিজের জীবনের সেই সব কথা বলবেন, যা তিনি লেখেননি।

হাসান আজিজুল হকের গল্পের জগৎ প্রধানত গ্রামীণ নিম্নবর্গের মানুষের জগৎ, যারা প্রকৃতি, সমাজ, রাষ্ট্র, মানুষের গড়ে তোলা সমস্ত ব্যবস্থার হাতে মার খেতে খেতে টিকে থাকার প্রাণান্তকর সংগ্রাম করে চলে। তাঁর লেখায় সেই সংগ্রামের যে রূপ ফুটে ওঠে, তা মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রামের থেকে একেবারেই ভিন্ন রকমের। অবশ্য মধ্যবিত্তের জীবন নিয়ে তিনি বেশি গল্প লেখেননি। তাঁর যে কয়েকটি গল্পে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজনের দেখা যাওয়া যায়, তাদেরও পাওয়া যায় পারিবারিক সুখ-দুঃখের বাইরের কোনো প্রেক্ষাপটে, যেমন মুক্তিযুদ্ধ কিংবা দেশভাগ (‘নামহীন গোত্রহীন’, ‘খাঁচা’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’), কিংবা রাষ্ট্রীয়-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা, অন্যায়, অব৵বস্থাপনা (‘সাক্ষাৎকার’, ‘পাতালে হাসপাতালে’) কিংবা মনস্তাত্ত্বিক কোনো সমস্যা (‘উটপাখি’)। অর্থাৎ মধ্যবিত্তের পারিবারিক সুখ-দুঃখ, আন্তমানবিক সম্পর্ক ইত্যাদি যেসব বিষয় তথাকথিত ফ্যামিলি নভেলগুলোতে পাওয়া যায়, হাসান আজিজুল হকের দৃষ্টি সেদিকে ছিল না। লেখার বিষয়বস্তু নির্বাচনের ব্যাপারে সম্ভবত তাঁর মনে একটা সংস্কার কাজ করত। গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতি তাঁর বিশেষ মনোযোগই সেটার প্রমাণ।

কিন্তু আমার মনে হয়, এর ফলে আমরা বঞ্চিত হয়েছি। আগুনপাখি পড়ে আমার মনে হয়েছে, পারিবারিক উপন্যাস লেখার হাত তাঁর যথেষ্টই শক্তিশালী ছিল; কিন্তু তিনি সেদিকে যাননি। সেটা বাংলা সাহিত্যের জন্য একটা বড় বঞ্চনা। তাঁর মার্ক্সবাদী মনোভঙ্গিই কি এর জন্য দায়ী?

আমি তাঁকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনি যখন নিম্নবর্গের মানুষদের নিয়ে লিখেছেন, তখন কি আপনার ওপরে মার্ক্সবাদী চিন্তার একটা প্রভাব কাজ করেছে?’

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এ কথাটা তো খুবই চালু আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, আমি প্রধান গুরুত্বটা মানুষের জীবনটাকেই দিয়েছি। অর্থাৎ যে সংগ্রামটা চোখের সামনে দেখছি, যেটুকু যুক্তিবুদ্ধি দিয়ে সমাজটাকে বিশ্লেষণ করতে পারি, মানুষকে যেভাবে দেখতে পারি, সে জায়গা থেকেই আমি খুব সাধারণভাবে বলার চেষ্টা করেছি। তত্ত্বটত্ত্বের কথা তো আমি ওইভাবে আনতে চাইনি। যদি কোথাও তেমন হয়ে থাকে, সেটা আমার ব্যর্থতা।’

না, আসলে তাঁর গল্পে ‘তত্ত্বটত্ত্ব’ তেমন পাওয়া যায় না। গল্পে তিনি বিস্ময়কর কুশলতার সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক সত্তাটা আড়াল করতে পেরেছেন। কথাশিল্পী হিসেবে তাঁর দক্ষতার পরীক্ষাটা এখানেই হয়ে যায়: অপূর্ব সুন্দর ভাষায় প্রকৃতি ও মানুষের যে ছবি তিনি এঁকেছেন, যেসব দৃশ্য ও মুহূর্ত রচনা করেছেন, তা অতি উচ্চ মানের শিল্প। মার্ক্সবাদী হোন বা আর যা-ই হোন না কেন, তাঁর শিল্পীসত্তার ঔজ্জ্বল্যে অন্য সবকিছু ম্লান হয়ে যায়।

তাঁর সাহিত্যকর্মের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক দিক নিয়ে অনেক কথা বলা যায়: তাঁর গল্পগুলোতে সমাজবিজ্ঞানী, অ্যাথনোগ্রাফিক-অ্যানথ্রোপলজিক্যাল ডিসিপ্লিনের গবেষক, অর্থনীতিবিদ, উন্নয়নবিশারদ, দারিদ্র্যবিশেষজ্ঞ প্রমুখেরা নানা রকমের রসদ পেতে পারেন। ‘হাসান আজিজুল হকের গল্পে সমাজবাস্তবতা’ ইত্যাদি শিরোনামে পিএইচডি গবেষণা করা যেতে পারে; হয়তো কেউ কেউ ইতিমধ্যে তা করেছেনও। সবই ঠিক আছে: কিন্তু তাঁর সম্পর্কে চূড়ান্ত কথাটা এই যে তিনি শিল্পী। কথাশিল্পী বলতে প্রকৃত অর্থে যা বোঝায়, সেই অর্থে তিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পীদের একজন।

কিন্তু এই কথার মানে কী? আমি আসলে কী বোঝাতে চাইছি? বোঝাতে নয়, বলতে চাইছি যে হাসান আজিজুল হক সুন্দর। কেননা, শিল্পের সঙ্গে সৌন্দর্যের সম্পর্কই শিল্পিতার শেষ কথা। আর্ট বলতে আমি যে সাহিত্য বুঝি, সেই সাহিত্যের বিচার আমি এই দৃষ্টিকোণ থেকেই করতে চাই। শিল্পীর হাতে সৃষ্টি হয় সৌন্দর্য: হাসান আজিজুল হকের সমস্ত সাহিত্যকর্মের সারাৎসার সুন্দর। তিনি আমাদের সবচেয়ে সুন্দর কথাশিল্পী।

কিন্তু সৌন্দর্য দিয়ে আমি কী করব? শিল্পের সৌন্দর্যের কাজ কী?

এখানে আলাপটা যেদিকে অগ্রসর হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হলো, তা প্রাচীন, ক্লিশে এবং ইতিমধ্যে একঘেয়ে হয়ে উঠেছে। কিন্তু আমার বলার কথাটা হলো, শিল্প কোনো কাজের জিনিস নয়, শিল্প ছাড়াই মানুষ দিব্যি জীবন ধারণ করতে পারে, যেমন নকশিকাঁথার নকশা ছাড়াই শীত নিবারণ হয়, আর ওই নকশাটুকুই হলো শিল্প—এই ধারার কলাকৈবল্যবাদী কথাবার্তা বাতিল হয়ে যায় হাসান আজিজুল হকের সৃষ্ট শিল্পের জগতে। এখানে শৈল্পিক সৌন্দর্য পেটের ভাতের চেয়ে কম জরুরি নয়, কেননা, তা আত্মার খোরাক, যে আত্মা আমরা হারিয়ে ফেলতে বসেছি বলে সন্দেহ জাগে। হাসান আজিজুল হকের গল্পের সৌন্দর্য নীতিনিরপেক্ষ সৌন্দর্য নয়, শুধু ভদ্রলোকের বিলাসী মনের অবকাশকালীন ভোগ্যবস্তু নয়। এই সৌন্দর্য সংবেদনশীল মানবমনকে আলোড়িত করে: প্রাণান্তকর জীবনসংগ্রামে ব্যতিব্যস্ত দেহাতি মানুষের প্রতি সমমর্মিতা জাগায়, তার অদম্য প্রাণশক্তির প্রতি সমীহ জাগায়। ফলে পাঠকের মন একটা নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে: অমোঘ প্রকৃতির হাতে অবিরাম মার খেতে থাকা মানুষ সমাজ, রাষ্ট্রসহ মানুষের তৈরি সমস্ত ব্যবস্থার হাতেও আমৃত্যু আজীবন একইভাবে মার খেতে থাকবে—এটা অন্যায়।

default-image

এই কথাগুলো যখন লিখছি, তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতরে একটা নতুন কবরও যেন দেখতে পাচ্ছি। শুধু মনে হচ্ছে, তাঁকে নিয়ে, তাঁর লেখা নিয়ে আমার মনের মধ্যে যে এই সব কথা ছিল, তা তো কখনো বলা হয়নি। লেখাও হয়নি, যদিও ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ মা-মেয়ের সংসার থেকে শুরু করে পরের সব গল্পগ্রন্থ, উপন্যাস এবং আত্মজীবনীর প্রথম দুটি খণ্ডের রিভিউ আমি লিখেছি।

তাঁর লেখার আরেকটা বড় বিষয়বস্তু দেশভাগ। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘খাঁচা’ এবং সম্ভবত আরও কোনো কোনো গল্পে দেশভাগের বিষয়টি এসেছে। আর উপন্যাস আগুনপাখির কথা তো শুরুতেই বলেছি। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগ নিয়ে সাধারণভাবে যেসব আলোচনা ও তর্কবিতর্ক লক্ষ করি, তাতে হিন্দু-মুসলমানের পরস্পরকে দোষারোপ করার প্রবণতাটাই মুখ্যরূপে দেখতে পাই। ব্যাপারটা যেন এমন যে কোনো এক পক্ষকে দায়ী প্রমাণ করা গেলেই ইতিহাসের সব দায় চুকে যাবে। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের গল্প ও উপন্যাসে দোষারোপের বিষয়টি আমার চোখে পড়েনি, সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে একটা হাহাকার। যেনবা তিনি বলতে চান, যার দোষেই ভারত ভেঙে থাকুক না কেন, ভাঙনের ফলে যা ঘটেছে, তা বেদনাদায়ক। সেই বেদনাই তাঁর গল্প-উপন্যাসের পরতে পরতে মিশে আছে।

ভারত বিভাগ নিয়ে তাঁর আরও কিছু বলার ছিল কি না, এ বিষয়ে তাঁর রাজনৈতিক বিচার ঠিক কেমন ছিল, তা আমার জানা হয়নি।

তবে আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনার একমাত্র পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আগুনপাখির বিষয়বস্তু ভারত বিভাগ। আপনার কি মনে হয়, এ বিষয়ে আপনার যা কিছু বলার, তার পুরোটাই কি বলা হয়েছে?’

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘না, তা বলা হয়নি।...এটা হচ্ছে সমগ্রতার খণ্ডায়ন। যদি তুমি গোটা পৃথিবীকে একটা সমগ্র ধরো, তাহলে ওই একটা জায়গা থেকে পৃথিবীর সব দেশ কিন্তু আসলে খণ্ডীকরণের মধ্যে পড়ে। ঠিক তেমনি করে আরও নিচে আসো, আরও নিচে আসো, এই ভারতবর্ষ, উপমহাদেশ নিয়ে আসো। খণ্ডীকরণ, খণ্ডীকরণ, খণ্ডীকরণ। খণ্ডীকরণ করেছি আমরা সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান করে। তারপর এখন এই খণ্ডীকরণের মধ্যেই আমরা আছি। এতে আমাদের সব বিকাশের একটা বড় অংশ কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশ বিভাগকে যদি তুমি ওই চোখে দেখো, তাহলে এটা অপচয়, এটা মানবসমাজের ক্ষতি।’

দেশভাগের প্রসঙ্গ বাদ দিলে হাসান আজিজুল হকের গল্প-উপন্যাসে আত্মজৈবনিক উপাদান খুবই কম। আমি হয়তো কখনো বলতাম, ‘আপনার গল্পগুলোতে তো আপনাকে পাওয়া যায় না, একটুও বোঝা যায় না আপনি মানুষটা কেমন।’ তিনি হাসতেন। ২০০৯ সালের এক সাক্ষাৎকারে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম: ‘লেখক তো একজন মানুষ। তাঁরও তো নিজের একটা জীবন আছে। তো তিনি, মানে লেখক, নিজের জীবনটাকে কীভাবে দেখেন?’

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘তুমিও তো লেখক, তুমি জানো, এ প্রশ্নের জবাব অত্যন্ত কঠিন। যদি সাধারণভাবে বলো, তাহলে মনে হবে, না, আমার অভিযোগ কিছু নেই। যে দেশটা পেয়েছি, জন্মের পর থেকে যার ভেতর দিয়ে আমার জীবনের এতগুলো বছর কেটে গেল, এটাকে যদি সামনে রাখি, তাহলে আমি কিছু পাইনি, তা তো বলব না। যা পাবার-টাবার ছিল, তা পেয়েছি। কখনো কখনো মনে হয়, প্রাপ্তিটা একটু বেশি হয়েছে।

‘তার পরও এসব কথা কি এখানেই শেষ হয়? এখানে শেষ হয় না। তার পরও তো জীবনটা কাটিয়ে এলাম। সবটাই ভালো করতে পেরেছি কি না। সমুদ্রের মতো বিশাল কত কল্পনা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তখন মনে হয় যে না, কিছুই হয়নি। দার্শনিকভাবেও তাই। শেষ পর্যন্ত কী জোটে? কয়েকটা মূহূর্ত। বিশাল একটা উপন্যাস পড়লে যা হয়। একটা-দুটো চরিত্র, একটা-দুটো সংলাপ, একটা-দুটো দৃশ্য। এই জীবনটার দিকে একবার যদি তুমি ফিরে দেখো, শেষ পর্যন্ত কিন্তু একটা অর্থশূন্যতার মধ্যেই আমাদের শেষ হয়।

‘আর আমাদের সারা জীবনটা কাটে কিন্তু কোনো না কোনো অর্থ আরোপ করতেই। জেনে বা না জেনে। অশিক্ষিত বা এ দেশের সবচেয়ে নিরক্ষর মানুষের, যে প্রায় মানবেতর জীবন যাপন করে, সে-ও জানে না যে সে-ও তার জীবনকে একটা অর্থ আরোপ করছে। যখন সে সন্তানকে চুমু খাচ্ছে, যখন সে তার ছেলেমেয়ের জন্য বাইরে থেকে রোজগার করে নিয়ে আসছে, কোনো না কোনোভাবে সে নিজের অস্তিত্বটাকে অর্থবহ করে তোলার চেষ্টা করছে। আমরা এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বেশি আর আমরা তো কিছু বলতে পারি না।’

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন