কোলাজ: মনিরুল ইসলাম
কোলাজ: মনিরুল ইসলাম

তিতাস নদীর তীরে গোকর্ণঘাট গ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। গ্রামের এবাড়ি-ওবাড়ি খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ আনোয়ারা সৈয়দ হক বললেন, ‘ওই যে অদ্বৈত মল্লবর্মণ।’ দেখে টের পাওয়া যায়, স্থানীয় কুমোরবাড়ির কারও হাতে তৈরি অদ্বৈত মল্লবর্মণের আবক্ষ ভাস্কর্য।

ভাস্কর্যের নিচের বেসমেন্টে কয়লা দিয়ে লেখা ‘সাহিত্যিক অদ্বৈত মল্লবর্মণ’। এটি স্থাপন করা হয়েছে তিতাস নদীর পাড়েই। কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক বললেন, ‘চলো, বর্মণের বাড়ি কোনটা খুঁজে বের করি।’ সন্ধ্যায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ ভাষামঞ্চে অদ্বৈত মল্লবর্মণের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠান ছিল, সেখানে আনোয়ারা সৈয়দ হক প্রধান অতিথি হিসেবে কথা বলবেন। পরদিন সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত একাডেমি ও কাল ভৈরব নাটমন্দির দেখে আমরা ঢাকায় ফিরেছি। আলাউদ্দিন খাঁ সংগীত একাডেমির স্মৃতি-প্রামাণ্য ছিল পোড়া পোড়া, কিছুদিন আগেই সংগীত পছন্দ করে না, এমন মানুষেরা এখানে আগুনের উৎসব করেছে।

ঢাকায় ফিরেই আনোয়ারা সৈয়দ হক বললেন, ‘পুরোনো ঢাকায় কোথায় থাক তুমি?’
‘ফরাসগঞ্জে, খুব পুরোনো একটা বাড়িতে।’
‘গাড়ি সেখানেই নিয়ে চলো।’

২৭৮ বছরের একটা প্রাচীন বাড়ির চিপা গলি দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে আনোয়ারা ভাবি বললেন, ‘বিয়ের পর তোমার হক ভাইয়ের সঙ্গে আমি এই রকম বাড়িতেই প্রথম উঠি। কাজেই মনে কোরো না যে পুরোনো ঢাকার এই রকম বাড়ি বা গলি আমার অচেনা।’
এরপর পুরোনো ঢাকার বিরিয়ানি তো খেতেই হয়। খাওয়ার পর আপা যান গুলশানে তাঁর বাসার উদ্দেশে। আমি থেকে যাই ৪২ নম্বর বি, কে দাস রোডের বাড়িতে। আমি ‘কাঁটা’ সিনেমার জন্যই তখন পুরোনো ঢাকার বাসিন্দা ছিলাম। এর আগে সৈয়দ শামসুল হকের সঙ্গে একদিন আড্ডা হচ্ছিল। সেখানে আনোয়ারা সৈয়দ হক ছিলেন। কথায় কথায় তিনি বললেন, ‘সিনেমা বানাতে গিয়ে কবিতা লেখার দিকে মনোযোগ যেন না কমে যায়।’

‘কেন, হক ভাই তো সিনেমা করেছেন!’
‘হুম, করেছেন। তোমার সিনেমা কার গল্প নিয়ে বানাচ্ছ?’
‘শহীদুল জহিরের।’

‘তোমার হক ভাইয়ের গল্প নিয়ে বানাবে না কিছু?’
বলেছি, ‘“খেলারাম খেলে যা” নিয়ে তো আমার চিত্রনাট্যের কাজ চলছেই।’
তখন সৈয়দ শামসুল হক বললেন, ‘হ্যাঁ, টোকন “খেলারাম খেলে যা” নিয়ে একটা বিরাট লেখা লিখেছে। আমার পছন্দ হয়েছে।’

বিজ্ঞাপন

এভাবে সৈয়দ শামসুল হক ও তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হকের সঙ্গে খণ্ড খণ্ড অনেক আড্ডা হতো আমাদের। সৈয়দ শামসুল হকের ৭৯তম জন্মদিন বেশ ঘটা করেই পালন করেছি আমরা বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল মঞ্চে। জন্মদিন উপলক্ষে সে সময় ‘সামান্য কিছু’ নামের একটি ব্যয়বহুল সংকলন বের করি। দীর্ঘ সময় ধরে অনুষ্ঠান পরিক্রমা ছিল। আনোয়ারা সৈয়দ হক মানসিকভাবে আমাদের পাশে ছিলেন। এখনো তিনি পাশে থাকেন, নানাভাবেই। ঋণ বাড়তে থাকে অগোচরে, যে ঋণ কখনো পরিশোধযোগ্য নয়। পরিশোধের ক্ষমতায় নেই আমার।

আনোয়ারা সৈয়দ হক নিজের লেখালেখি নিয়ে মগ্ন থাকতেই পছন্দ করেন। গল্প-উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষটি একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ। অত্যন্ত কর্মঠ, হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল্যের ব্যক্তিত্ব আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাদের ‘কাঁটা’ সিনেমার জন্য অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাঁকে একদিন বললাম, ‘হক ভাই বেঁচে থাকলে বলতাম, আপনি “কাঁটা”–এর স্ক্রিনে থাকেন। ভাবি, একটি দৃশ্যে হলেও আপনাকে থাকতে হবে।’ ভাবি আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাকে নিরাশ করেননি।

একবার রাজশাহী সার্কিট হাউসে এই সৃজনমুখর যুগলের সঙ্গে দেখা হলো আমার। কবিতাপাঠের আমন্ত্রণে রাজশাহী যাওয়া। আবার কুমিল্লায় সৈয়দ হকের স্মরণসভায় আমাদের একসঙ্গে ঢাকা থেকে যাওয়া। যেতে যেতে কথা, সে কথা সাহিত্যের, সে কথা যাপিত জীবনের টুকরো টুকরো অভিজ্ঞানের, সে কথা দেশকাল-রাজনীতি-মানুষের বেঁচে থাকা সংগ্রামের। ধর্ম সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা মহারাজা বীরমাণিক্যের কথা, শচীন দেববর্মণের কথা, কুমিল্লায় নজরুলের আগমন ও চলে যাওয়ার কথা, নার্গিসের কথা, কী আলাপ হয়নি এই পরম শ্রদ্ধেয় মানুষদের সঙ্গে? হক ভাই ও আনোয়ারা ভাবির সঙ্গে?

নিজের সাহিত্য নিয়ে ভাবি একদমই কথা বলতে চান না, এটা তাঁর বৈশিষ্ট্য। বরং সৈয়দ শামসুল হককে নিয়েই কথা বলতে বেশি পছন্দ তাঁর, বলি আমরাও। তাই একবার পরিকল্পনা হলো কুড়িগ্রামে, যেখানে সৈয়দ হককে সমাহিত করা হয়েছে, সেখানে যে সৈয়দ হকের সমাধিসৌধ নির্মাণাধীন, আমরা যাব সেখানে। কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন সেই সমাধি সৌধের নকশা করেছেন। সেটি বাস্তবায়নের জন্য সরকারদলীয় সাংসদ অভিনয়শিল্পী আসাদুজ্জামান নূর, কবি তারিক সুজাত কাজ করছেন। অবশ্য এরই মধ্যে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন রবিউল হুসাইন। কবি পিয়াস মজিদ যুক্ত আছে সৈয়দ হকের বিভিন্ন অপ্রকাশিত রচনা প্রকাশনার সঙ্গে। পিয়াস যুক্ত আছে আনোয়ারা সৈয়দ হকের কাজের সঙ্গেও। বারডেমে ডাক্তারির পাশাপাশি আনোয়ারা সৈয়দ হক নিজেকে সার্বক্ষণিক যুক্ত রাখেন শিল্প-সাহিত্যের নানামুখী কাজে। মাঝেমধ্যে ভাবি, কীভাবে করেন তিনি এত কাজ?

প্রয়াণের পর হক ভাইয়ের আঁকা চিত্রমালা নিয়ে ‘ডেইলি স্টার’ একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আমি তখন ‘কাঁটা’ সিনেমার প্রি-প্রোডাকশন নিয়ে খুব ব্যস্ত। এ সময় একদিন আনোয়ারা সৈয়দ হক এলেন আমাদের মগবাজারের প্রি-প্রোডাকশন অফিসে। তিনি সঙ্গে এনেছেন বিশাল আকারের একটা দেয়ালঘড়ি ও একটি চায়ের ফ্লাস্ক। বললাম, ‘ব্যাপার কী?’

আনোয়ারা সৈয়দ হক বললেন, ‘ফ্লাস্ক এনেছি চায়ের জন্য। আর ঘড়ি এনেছি যাতে তুমি তোমার হক ভাইয়ের প্রদর্শনীতে যাওয়ার সময়টা মিস না করো।’ আমার ছোট বোন বীথি কোভিড ১৯-এর শিকার হলে চিকিৎসক আনোয়ারা সৈয়দ হক ঝিনাইদহে ফোন দিয়ে বীথির খোঁজখবর নেওয়া ছাড়াও মানসিকভাবে সাহস জুগিয়েছেন। আমার ভাগ্নি বর্ষা বিভাবরীকে ফোন দিয়ে মাঝেমধ্যে গোপনে খবর নেন, আমি কী করছি না করছি! তবে পিয়াস মজিদ সব ফাঁস করে দেয় আমার খবর। সেই অনুযায়ী তিনি পরে আমাকে বকাঝকা করেন। নিত্য এই সম্পর্ক আমাদের।

default-image

একদিন আনোয়ারা সৈয়দ হক ফোন করে বললেন, ‘সন্ধ্যায় বাসায় চলে এসো।’ গিয়ে দেখি, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন অধ্যাপক পবিত্র সরকার, কবি ও স্থপতি রবিউল হুসাইন, লেখক, অনুবাদক ও প্রকাশক মফিদুল হক। এ ছাড়া আরও ছিল প্রায় ৩০ জনের একটা উপস্থিতি। তবে এত মানুষের মধ্যে শুধু হক ভাই নেই। ভাবি, আনোয়ারা সৈয়দ হক সবকিছু সামাল দিচ্ছেন। হক ভাইয়ের কথা বলাবলি হচ্ছিল। পবিত্র সরকার দু-দুটি গান শুনিয়ে মুগ্ধ করলেন আসর। অনেক রাত হয়ে গেল। বাংলাদেশের সাহিত্যের এই রোমান্টিক যুগল সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক, দুজনেই আমাদের অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন। বাংলা সাহিত্যের অগণন পাঠক-পাঠিকা তাঁদের।

বিজ্ঞাপন

আমিও তাঁদের পাঠক। ব্যক্তিজীবনে কাছাকাছি যেতে পেরেছি, এ আমার সৌভাগ্যই বটে। আগেই লিখেছি, আনোয়ারা সৈয়দ হক নিজের লেখালেখি নিয়ে মগ্ন থাকতেই পছন্দ করেন। গল্প-উপন্যাস নিয়ে ব্যস্ত থাকা মানুষটি একজন মনোরোগবিশেষজ্ঞ।

অত্যন্ত কর্মঠ, হাসিখুশি প্রাণচাঞ্চল্যের ব্যক্তিত্ব আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাদের ‘কাঁটা’ সিনেমার জন্য অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাঁকে একদিন বললাম, ‘হক ভাই বেঁচে থাকলে বলতাম, আপনি “কাঁটা”র স্ক্রিনে থাকেন। ভাবি, একটি দৃশ্যে হলেও আপনাকে থাকতে হবে।’ ভাবি আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাকে নিরাশ করেননি।

আজ কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের জন্মদিন। শুভ জন্মদিন। আপনি বেঁচে থাকুন, লেখালেখিতে আরও সমৃদ্ধ করুন বাংলা সাহিত্য।

অন্যআলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0