বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কাবুল, মে ১৯৮৮

কাল রাতে কাবুলে এসে পৌঁছেছি। প্রথমে মস্কো, সেখান থেকে দুশানবে, তারপর কাবুল। পাক্কা দেড় দিনের ঝক্কি। বিমানের জানালা দিয়ে কাবুল দেখার চেষ্টা করেছিলাম, ঘন কালো আঁধার ছাড়া অন্য কিছু নজরে আসেনি। মুজাহিদিনদের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে, অধিকাংশ হামলা রাতেই ঘটে। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নৈশকালীন কারফিউ—এই ভেবে মোটেই বিস্মিত হইনি।

সকালে নাশতার টেবিলে ইরতেজা বাবু কানে কানে বলল, বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। যে বিমানে আমরা কাবুল আসি, তার ওপরেও হামলা হয়েছিল।

আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, তুমি কী করে জানলে? পাশাপাশি বসিনি বটে, কিন্তু আমরা দুজনে তো একই সঙ্গে এলাম।

বাবু জানাল, বিমানে তাঁর পাশে এক ভারতীয় ব্যবসায়ী ভদ্রলোক বসে ছিল, সেই জানিয়েছে কাবুল বিমানবন্দরে যেসব সোভিয়েত বিমান ওঠা–নামা করে, তার সব কটিই মুজাহিদিনদের টার্গেট। আমেরিকানরা স্টিঙ্গার নামে এক নতুন ধরনের মিসাইল আবিষ্কার করেছে। এটা একধরনের পোর্টেবল মিসাইল, উত্তপ্ত যেকোনো লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে এদের জুড়ি নেই। কাঁধের ওপর রেখে খুব সহজেই যেকোনো উড়ন্ত বিমান বা হেলিকপ্টার ঘায়েল করা যায়। আমেরিকানদের কাছ থেকেই এটা আফগান মুজাহিদিনরা পেয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের দাপটে আফগানিস্তানে সোভিয়েতদের এখন নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড়।

শুনে ভয়ে মুখখানা শুকিয়ে আধখানা। তার মানে আমাদের বিমানকেও তাহলে আঘাতের চেষ্টা হয়েছে!

একবার বাঁয়ে একবার ডাইনে তাকিয়ে, যেন খুব গোপন কোনো তথ্য সে ফাঁস করছে, এভাবে বাবু বলল, আপনি হয়তো লক্ষ করেননি, আমাদের বিমানের লেজ থেকে ঘন ঘন আগুনের হলকা বেরোচ্ছিল। স্টিঙ্গার মিসাইলের বোমা বিমানের ইঞ্জিন তাক করে করা হয়, কারণ সেটাই সবচেয়ে গরম স্থান। কিন্তু আগুনের হলকাগুলো সে বোমার বিরুদ্ধে বর্মের মতো কাজ করে। বোমাকে দিগ্​ভ্রষ্ট করে ফেলে।

বাবু ইতিমধ্যে স্টিঙ্গার মিসাইল নিয়ে এত বিদ্যা অর্জন করেছে দেখে আমার ঈর্ষা জাগে। কিছুটা সমীহ নিয়ে জিজ্ঞেস করি, ভয়ের কিছু নেই তো? এই বিমানে করেই তো আমাদের ফিরতে হবে। বাবু সে প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রাতরাশে মনোযোগ দেয়। সে যে উদ্বিগ্ন নয়, তা দেখে আশ্বস্ত হই। সদ্য বিয়ে করেছে, ফলে জীবন নিয়ে তারই বেশি চিন্তিত হওয়ার কথা।

আমরা দুই সাংবাদিক ঢাকা থেকে অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে এসেছি। কাবুল সরকারের উদ্যোগে জোটনিরপেক্ষ দেশগুলোর সাংবাদিকদের একটি সংহতি সম্মেলন ডাকা হয়েছে। আমরা সেখানে অতিথি। ঢাকায় আফগান রাষ্ট্রদূত—ভদ্রলোকের নামটা এখন কিছুতেই মনে পড়ছে না—রীতিমতো হাত কচলে অনুরোধ করেছেন, যেন একটা পজিটিভ রিপোর্ট করি। কয়েক বছর ধরে গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অন্তর্দ্বন্দ্বে দেশটা কোণঠাসা হয়ে আছে। কোথাও কোনো ভালো খবর নেই।

আমরা উঠেছি ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে, কাবুলের একমাত্র পাঁচতারা হোটেল। চেক-ইন শেষ করে হাতে ব্যাগ নিয়ে লিফটে উঠেছি, সুইচে হাত দিতেই হালকা বিদ্যুতের চমক। আমি চমকে বাবুকে খামচে ধরি। সে সব বিষয়েই তালেবর, সে-ই জানাল, এর নাম স্টাটিক। বিদ্যুৎ প্রবাহের অসাম্যের কারণে এই হালকা ইলেকট্রিক শক ঘটে। খুব ছোটবেলা থেকেই বৈদ্যুতিক শক নিয়ে আমার প্রবল ভীতি। একবার ইলেকট্রিক রেডিওর খোলা নব ঘোরাতে গিয়ে প্রায় মরতে বসেছিলাম। স্টাটিক শক খেয়ে সে কথা মনে পড়ল। কাবুলে প্রথম দিনেই এমন অভিজ্ঞতায় মনটা খিঁচড়ে ছিল। তার ওপর স্টিঙ্গার মিসাইলের হুমকি!

ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসে অবশ্য মনটা ভরে গেল। টেবিলের ওপর খাবারের স্তূপ। কাবাব ও তন্দুর তো রয়েছেই। আরও রয়েছে প্লেটভর্তি ফল। সৈয়দ মুজতবা আলীর কল্যাণে আফগান খাদ্যের সুনাম শুনেছি। বিশেষ করে শুনেছি এ দেশের তরমুজের নাম। সম্রাট বাবুর দিল্লির মসনদে বসার পর একবার উপঢৌকন হিসেবে কাবুল থেকে পাঠানো তরমুজ পেয়েছিলেন। বরফকুচি দিয়ে সাজানো সে তরমুজের একখণ্ড কামড় দিয়ে তিনি কেঁদে ফেলেছিলেন। বাবুরনামায় নিজেই সেই অভিজ্ঞতার কথা লিখে গেছেন। ফারগানা থেকে পালিয়ে কাবুলে তিনি আস্তানা গেড়েছিলেন, পেয়েছিলেন নতুন রাজত্ব। আফগানিস্তানই ছিল তাঁর দ্বিতীয় জন্মভূমি। সে তরমুজ ঠোঁটের আগায় লাগতেই তিনি জন্মভূমির স্বাদ পেয়ে চোখের জল ফেলেছিলেন।

আমিও কাবাব ছেড়ে তরমুজে হাত বাড়াই।

আমরা দুজন বাংলায় কথা বলছি দেখে পাশের টেবিল থেকে এক পাকিস্তানি ভদ্রলোক আমাদের টেবিলে এসে বসেন। হাত বাড়িয়ে নিজের নাম বলেন, খাতিব। একসময় ঢাকার অবজারভার পত্রিকায় কাজ করতেন। একাত্তরে করাচি চলে আসেন, এখন ডন পত্রিকার কলাম লেখক। তাঁর কাছ থেকেই জানা গেল, আফগানিস্তানের অবস্থা ভালো নয়। মুজাহিদিনদের হাতে ইতিমধ্যেই দেশের দুই-তৃতীয়াংশ চলে গেছে। সোভিয়েতরা বুঝে গেছে এখানে টেকা যাবে না, তারাও মানে মানে সটকে পড়ার পথ খুঁজছে। তাঁর সে কথার সত্যতা আমরা নিজেরাই পেয়ে গেলাম সেদিন।

দুই দিনের কনফারেন্স, প্রথম দিনের উদ্বোধনীতে আফগান প্রেসিডেন্ট নজিবুল্লাহর দেখা মিলল। মোটাসোটা ভদ্রলোক, হাঁটবার সময় মচমচ শব্দ হয়, মনে হয় তিনি যে আসছেন, জানান দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর অবশ্য তেমন কোনো প্রয়োজন নেই, চারপাশে কমান্ডো পোশাকে রুশ সামরিক প্রহরী, তাঁরাই প্রেসিডেন্টকে ঘিরে রেখেছে। নজিবুল্লাহ এক পা হাঁটেন, প্রহরীরাও সঙ্গে পা মেলান। দুকথা বলে তিনি দ্রুত বিদায় হলেন।

সম্মেলনকক্ষের ভেতরে-বাইরে চতুর্দিকে সেনা প্রহরা। আমাদের ওপরেও কড়া নজর। সকালের সেশন শেষে বাবু বুদ্ধি দিল, চলুন, এখান থেকে ফুটি। আমার সঙ্গে এক আফগান ট্যাক্সি ড্রাইভারের আলাপ হয়েছে, সে কথা দিয়েছে শহরের নিরাপদ এলাকা ঘুরিয়ে দেখাবে। বাবুর সঙ্গে ক্যামেরা, ছবি তোলা তাঁর পেশা ও নেশা। উদ্যোক্তারা অপ্রয়োজনে হোটেলের বাইরে না যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। মনে ভয় জাগলেও ঘুরে দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না।

এখন গ্রীষ্মের শুরু, অথচ এমন মলিন ও জীর্ণ শহর আর দুটো দেখিনি। সমুদ্রপিঠ থেকে হাজার পাঁচেক ফুট ওপরে হিন্দুকুশ পাহাড়ের পাদদেশে এক সরু উপত্যকা এই শহর, যেদিকেই তাকাই দেখি ছাই রঙের পাহাড়। সেই পাহাড়ের গা ঘেঁষে ওপরে–নিচে ছড়িয়ে– ছিটিয়ে ঘরবাড়ি। গাছপালা নজরে আসে কি আসে না। উত্তরে কাবুল নদী, অধিকাংশ সরকারি অফিস-আদালত নদীর গা ঘেঁষে। পুরোনো নকশার ভবন, যার অধিকাংশই বাদশাহি আমলে তৈরি, এখন নামীদামি লোকজনের বাস। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রুশ ও আফগান সৈন্য। কেউ সাঁজোয়া গাড়িতে, কেউ ট্যাংকে। সেসব এড়িয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাদের নিয়ে এল শহরের বনেদি বিপণিপাড়া চিকেন স্ট্রিটে। শুনলাম, এখানে হেন বিদেশি জিনিস নেই যা পাওয়া যায় না। অধিকাংশ চোরাই।

দু-চারটে উপহার কিনব বলে আমরা এক দোকানে ঢুকেছি। খানিক পর সেখানে দুই রুশ জওয়ান এসে হাজির। পায়ে হেঁটে নয়, গাড়ি চালিয়ে নয়, তারা সরাসরি ট্যাংক চালিয়ে এসেছে। দেখে তো আমাদের আক্কেল গুড়ুম।

default-image

ইসলামাবাদ, অক্টোবর ২০০১

৯/১১–এ আল-কায়েদার হামলার জবাবে আফগানিস্তানে মার্কিন বিমাল হামলা শুরু হয়েছে। আমি ইসলামাবাদে, জাতিসংঘ মিশনে তথ্য দপ্তরে। উঠেছি এক গেস্টহাউসে। এক দিন পরে সন্দ্বীপের এক যুবক এল দেখা করতে। সে এই গেস্টহাউসে পরিচারকের কাজ নিয়েছে। জানলাম, আফগানিস্তানে আল-কায়েদার সঙ্গে যুদ্ধ করতে সে বছরখানেক আগে কাবুলে এসেছিল। ট্রেনিং নিয়েছে, রুশ রাইফেল কালাশনিকভ চালাতে জানে। মার্কিন বোমা শুরু হওয়ার আগেই পালিয়ে এসেছে। সব মিলিয়ে তিনজন, তাদের একজন বাংলাদেশে ফিরে গেছে। জিজ্ঞেস করলাম, যুদ্ধ করলেন না?

কানে দুই হাতে দিয়ে বলল, তওবা তওবা।

শামসেতু ক্যাম্প, পেশওয়ার, নভেম্বর ২০০১

default-image

আমাদের আফগান দোভাষী জোবেদা পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। সঙ্গে নরওয়ের স্বেচ্ছাসেবক এরিক। আমাদের লক্ষ্য শহরের বাইরে কয়েক মাইল দূরে শামসেতু উদ্বাস্তু ক্যাম্প। জোবেদা নিজেও উদ্বাস্তু, বাবা-মা নেই, আর থাকলেও সে জানে না তারা কোথায়। বছর পনেরো আগে বাবা-মা ও ছোট এক বোনের সঙ্গে পায়ে হেঁটে সীমান্তের এপারে চলে আসে। পথে লড়াই বেধে যাওয়ায় সবাই ছিটকে পড়ে, অনেক খুঁজেও তাদের আর দেখা মেলেনি। ইসলামাবাদে হাইস্কুল শেষ করে এখন সে জাতিসংঘের দোভাষী।

১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত অধিগ্রহণের পর যে গৃহযুদ্ধের শুরু, তার জেরে প্রায় চল্লিশ লাখ আফগান এ দেশে আশ্রয় নিয়েছে। অধিকাংশই পশতুন গোত্রভুক্ত, অল্পবিস্তর হাজারা ও তাজিকও রয়েছে। এদের জন্য সারা দেশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে উদ্বাস্তু শিবির তৈরি হয়েছে। গোড়াতে ভাবা হয়েছিল, যুদ্ধ থেমে গেলেই সবাই ফিরে যাবে। যুদ্ধও থামে না, আফগান উদ্বাস্তুদেরও আর ঘরে ফেরা হয় না। এসব উদ্বাস্তু শিবিরের শিশুরা, যারা এখন আর শিশু নয়, বিভিন্ন মাদ্রাসার তালেব বা ছাত্র। সেখান থেকে তালেবান কথাটার উদ্ভব।

জোবেদা আমাদের প্রথমে নিয়ে গেল পেশওয়ার বাজারে। মানুষে গিজগিজ করছে। ক্রেতা যত, তার চেয়ে বেশি বিক্রেতা। কারও কাঁধে কার্পেট বা গরম শাল। কেউবা শুকনো ফলমূল নিয়ে বসে। নজরে এল একদল লোক ওসামা বিন লাদেনের ছবি হাতে নিয়ে মিছিল করছে। আরেক দল জটলা পাকিয়ে জর্জ বুশের ছবিতে আগুন দিচ্ছে। ভয়ে আমাদের বুক শুকিয়ে আসে। জোবেদা আশ্বাস দেয়, আমরা জাতিসংঘের গাড়িতে, ভয় নেই। এরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জাতিসংঘের নুন খায়।

শামসেতুর শিবিরে এসে হতবাক হয়ে গেলাম। জনমানব পরিত্যক্ত এই জায়গায় উদ্বাস্তুদের জন্য ক্যাম্প তৈরি হয়েছে। শহর থেকে দূরে, যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই। ঢোকার পথে পুলিশি প্রহরা। কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে সারি সারি মাটির ঘর, আশপাশে কোনো গাছপালা নেই। এক ফোঁটা পানি নেই। দিনে দুবার শহর থেকে ট্রাকে করে পানি আনা হয়। শিবিরের লোকজনের কারও কোনো কাজকর্ম নেই, অধিকাংশই রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে-বসে। ছেলেরা দল বেঁধে ফুটবল খেলছে।

জোবেদা আমাদের দেখাতে এনেছে এই ক্যাম্পের একটি স্কুল। স্কুল মানে একটা মাটির ঘর, দশ-বারোজন মেয়ে মাটিতে যার যার পাটির ওপর বসে, সঙ্গে বইখাতা। কম বয়সী পুরুষ শিক্ষক এদের অক্ষরজ্ঞান দিচ্ছে। ছাত্রীদের কেউ আমাদের দেখে বিস্মিত হয় না, বরং জোরে জোরে মাথা ঝুঁকিয়ে পড়া চালিয়ে যায়। বুঝলাম আমাদের মতো আরও অনেক বিদেশি অতিথিই আগে এখানে পরিদর্শনে এসেছে। জোবেদাকে দেখে আট-দশ বছরের একটি মেয়ে লাফিয়ে উঠে পশতু বা দারিতে উত্তেজিত হয়ে কী যেন বলে। জোবেদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে, এখন নয়, পরে কথা হবে। আমাদের জন্য ‘শো অ্যান্ড টেল’–এর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শিক্ষকের প্রশ্নের জবাবে সেই মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে নিজের নাম বলে, আইনা, মানে আরশি। তার কথা শুনে অন্য সবাই ফিক করে হেসে ফেলে। এরিক জানতে চায়, বড় হয়ে সে কী হতে চায়। পশতুতে আইনার জবাব, আমি ডাক্তার হব।

জোবেদা জানায়, জালালাবাদে মেয়েটির বাবা নামকরা ডাক্তার ছিলেন, মাইন বিস্ফোরণে সস্ত্রীক মারা গেছেন। প্রথম দিকে মেয়েটি একদম নিথর হয়ে ছিল, কারও সঙ্গে কোনো কথা বলত না। বছর দুয়েক আগে ইসলামাবাদে এক হাসপাতালে আইনাকে দেখতে পেয়ে সে-ই শামসেতুর ক্যাম্পে এনে দিয়েছে। চেয়েছিল নিজের কাছে নিয়ে রাখবে, কিন্তু ইসলামাবাদে সে মেয়েদের হোস্টেলে থাকে। সেখানে শিশুদের রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। এই স্কুলে আসার পর থেকে মেয়েটি কথা বলা শুরু করেছে। উঠবার আগে আমি ফিরে আইনাকে আরেকবার দেখি, জোবেদাকে আঁকড়ে ধরে সে যেন কী বলছে। অকারণেই আমার চোখে জল ভরে আসে।

ক্যাম্প থেকে বেরোব, একদল কিশোর আমাদের গাড়ি ঘিরে ধরে। আসার সময় আমরা কিছু চকলেট নিয়ে এসেছিলাম, সেসব মেয়েদের ক্লাসেই বিলি করে এসেছি। একটি ছেলে উর্দুতে বলে, চকলেট নয়, আমরা পেনসিল চাই।

default-image

নিউইয়র্ক, এপ্রিল ২০০৩

সকালে অফিসে সদ্য এসেছি, দেখি আমার অফিসকক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে জোবেদা। হাসি হাসি মুখ। জানায়, উদ্বাস্তু ভিসায় সে মাসখানেক আগে কানাডা চলে এসেছে। উদ্বাস্তু হাইকমিশনার অফিসে একটি সাময়িক চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে। সে জন্য এখন নিউইয়র্কে। ফিসফিস করে, যেন খুব গোপন একটি কথা বলছে, জোবেদা বলে, আমি একা নই, আমার সঙ্গে আইনাও এসেছে। ওকে আমি মেয়ে হিসেবে দত্তক নিয়েছি।

default-image

আমি উদ্বিগ্ন

প্রথম আলোকে বললেন

বিশ্বখ্যাত আফগান ঔপন্যাসিক খালেদ হোসাইনি

দ্য কাইট রানার উপন্যাসের লেখক খালেদ হোসাইনির জন্ম আফগানিস্তানে। ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চলে এলেও জন্মভূমির সঙ্গে তিনি বরাবর নিকট সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তাঁর প্রকাশিত তিনটি উপন্যাসের বিষয়বস্তু আফগানিস্তানকে ঘিরে। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, রক্ষণশীল তালেবানদের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনকে তিনি কীভাবে দেখেছেন? ই–মেইলে এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তিনি।

default-image

গভীর বেদনার সঙ্গে আমি আফগানিস্তানের ঘটনাবলি অনুসরণ করেছি। আমার দেশে যা ঘটে চলেছে, তাতে আমি অত্যন্ত হতাশ ও উদ্বিগ্ন হয়েছি। শত সমস্যার ভেতর দিয়েও গত বিশ বছর সেখানে নারী অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বহু ক্ষেত্রেই অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। এর সবই এখন হুমকির মুখে। আফগানিস্তানে মানবিক দুর্যোগ এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যেসব আফগান সহিংসতা এড়াতে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে, তাদের নিরাপদ যাত্রা ও আশ্রয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অসহায় আফগানদের বিদেশের মাটিতে আশ্রয় লাভের সুযোগ বৃদ্ধির জন্য আমি আবেদন করছি। তালেবান কর্তৃপক্ষ যাতে সে দেশের নাগরিকদের, বিশেষত নারী ও বালিকাদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করে এবং নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর সহিংসতা পরিহার করে, তা নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন