বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই তারকা আর কেউ নন, গ্লেন্ডা জ্যাকসন। ১৯৭০ সালে ওমেন ইন লাভ ছবিতে অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর অস্কার পান। তাঁর দ্বিতীয় অস্কারও মেলে মাত্র তিন বছরের মধ্যে ১৯৭৩ সালে, আ টাচ অব ক্লাস ছবির প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। গ্লেন্ডা জ্যাকসন অভিনয় থেকে বিরতি নেন ১৯৯২ সালে এবং ব্রিটিশ রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সে বছরই তিনি লেবার পার্টি থেকে পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন এবং ২০১৫ সাল পর্যন্ত উত্তর লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড এলাকার এমপি ছিলেন। তিনি টনি ব্লেয়ারের মন্ত্রিসভায়ও ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯, বছর দুয়েকের একটু বেশি, পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

২৩ বছর পর ২০১৫ সালে গ্লেন্ডা আবারও অভিনয়ে ফেরেন। প্রথমে রেডিও, পরের বছর মঞ্চ এবং তারপর টিভির পর্দায়। অভিনয়জগতে তাঁর এই প্রত্যাবর্তনও দারুণ সাফল্য লাভ করে এবং তিনি এলিজাবেথ ইজ মিসিং টিভি নাটকের জন্য ২০১৯ সালে অস্কারের সমতুল্য ব্রিটিশ পুরস্কার বাফটা এবং ২০২০ সালে ইন্টারন্যাশনাল এমি পুরস্কার পান।

এই মাপের তারকাদের কাছে পৌঁছাতে হলে সাধারণত তাঁদের জনসংযোগ কোম্পানি এবং ব্যক্তিগত প্রতিনিধি বা ম্যানেজারের শরণাপন্ন হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। আবার ইউরোপে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তার নতুন আইন জিডিপিআরের কারণে তাঁদের টেলিফোন কিংবা ই–মেইলের ঠিকানাও সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। অতএব চাইলেও তা পাওয়া কঠিন। তবে দুই দশক রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে রাজনীতিবিষয়ক সংবাদদাতাদের কাছে তাঁর নম্বর থাকার কথা। এ রকম একটি সূত্র থেকেই তাঁর নম্বরটা পাওয়া গেল, তবে গোপনীয়তার শর্তের কারণে সেই ঘনিষ্ঠজনের নাম কিংবা তাঁর প্রতিষ্ঠানের পরিচয় বলা যাবে না।

এলিজাবেথ ইজ মিসিং নিয়ে যখন ব্রিটিশ গণমাধ্যমে জোর আলোচনা চলছে, সে রকম সময়ে একদিন সকালে তাঁকে ফোন করলাম। লন্ডনের ‘কনসার্ট ইন সিমপ্যাথি’ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণাই আমার আগ্রহ। কনসার্ট হয়েছিল লন্ডনসহ ব্রিটেনের আটটি শহরে। তবে তখন সবার নজরে ছিল লন্ডনের আয়োজনটি। এটি অনুষ্ঠিত হয় লন্ডনের ইজলিংটনে অবস্থিত বিখ্যাত স্যাডলারস ওয়েলস থিয়েটারে। ১৬৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই নাট্যশালার মিলনায়তনটি আয়তনে বেশ বড় ও আধুনিক। লন্ডনের অনুষ্ঠানটির ধারণ করা অডিও বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর বছরে দুটি সিডিতে প্রকাশ করেছিলেন অনুষ্ঠানের মূল সংগঠক ও প্রযোজক বীরেন্দ্র শঙ্কর। তিনি বিখ্যাত সেতারশিল্পী রবিশঙ্করের ভাইয়ের ছেলে। বীরেন্দ্র শঙ্করের মৃত্যু হয় রবিশঙ্করের আগেই—২০১৫ সালের জুন মাসে।

কাকা রবিশঙ্কর যেমন ম্যাডিসন গার্ডেন স্কয়ারে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করেছিলেন, বীরেন্দ্র শঙ্করের আয়োজনও অনেকটা সেই আদলে। যুক্তরাজ্যের ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সমিতি এই আয়োজনে সহযোগিতা করে। একটি চ্যারিটি অ্যাপিল কমিটিও গঠিত হয়েছিল। বীরেন্দ্র শঙ্করের কনসার্টের সিংহভাগজুড়ে ছিল বাংলার সংগীত—বাংলাদেশ ও ভারতের। বাংলাদেশের দুজন পল্লিগীতি গায়ক মোশাদ আলী ও শাহ আলী সরকার এবং ভারতের রুমা গুহঠাকুরতা, নির্মলেন্দু চৌধুরী, সবিতাব্রত দত্ত, রাধাকান্ত নন্দী, ফণীভূষণ ভট্টাচার্য,চন্দ্রকান্ত নন্দীসহ যন্ত্র ও সংগীতশিল্পীরাও অংশ নিয়েছিলেন এই অনুষ্ঠানে।

সেই অনুষ্ঠানের সিডিও এখন আর পাওয়া যায় না। কিন্তু তার যে কপি আমি সংগ্রহ করতে পেরেছি, এর সঙ্গে পাওয়া প্রকাশনায় গ্লেন্ডা জ্যাকসনের আবৃত্তি করা তিনটি কবিতাও আছে। অনুষ্ঠানটির খবর সম্ভবত দ্য টাইমস ডেইলি এক্সপ্রেস–এ ছাপা হয়েছিল। কেননা, স্যাডলারস ওয়েলসের ইতিহাস সংরক্ষণ করে যে ইজলিংটন লাইব্রেরি, তাদের সংগ্রহে থাকা অনুষ্ঠানটির একটা প্রচারপত্রে কনসার্ট সম্পর্কে পত্রিকা দুটির মন্তব্য উদ্ধৃত রয়েছে বলে দেখা যায়। অন্য আরেকটি প্রকাশনায় দেখা যায় বার্মিংহাম, কোলচেস্টার, লিভারপুল, স্কানথর্প, লেস্টার, শেফিল্ড ও লিডসেও নভেম্বর মাসে প্রায় সপ্তাহজুড়ে এই কনসার্টের আয়োজন হয়েছিল। লন্ডনে সম্ভবত পাঁচটি শো হয়েছিল—তিনটি ১৭ সেপ্টেম্বরে এবং দুটি ১৪ নভেম্বরে।

দু–তিনটি রিং বাজার সঙ্গে সঙ্গেই গ্লেন্ডা টেলিফোন ধরলেন। নিজের পরিচয় দিলাম, কেন ফোন করেছি তা-ও জানালাম। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কথা শুনে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের জন্য শুভেচ্ছা জানালেন। কিন্তু তারপরই বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘তাই নাকি? আমি বাংলাদেশের জন্য কনসার্টে অংশ নিয়েছি?’ আমি তাঁকে সিডিতে তাঁর কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি শোনার কথা বললাম। অনুষ্ঠানের ছবি দেখেছি বলেও জানালাম। কিন্তু তাঁর এসবের কিছুই আর মনে নেই।

গ্লেন্ডার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে যে সময়, তখন সবে এলিজাবেথ ইজ মিসিং টিভিতে দেখানো হয়েছে। টিভি নাটকের যে চরিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন, সেই চরিত্রকে েদখা যায় বয়সের ভারে স্মৃতিবিনাশী ডিমেনশিয়ায় ভুগছে। বার্ধক্যের নিঃসঙ্গতা, কষ্ট আর স্মৃতিবিভ্রাটের অভিনয়ে চমৎকৃত করা অভিনেত্রী গ্লেন্ডা যে বাংলাদেশের সমর্থনে পাঁচ যুগ আগের স্মৃতি মনে করতে পারলেন না, সেটাকে অবশ্য কাকতালীয় ছাড়া আমি অন্য কিছু ভাবতে চাই না। এখানে বরং ইরেজি থেকে অনুবাদ করে তাঁর একাত্তরের উচ্চারণের কিছুটা স্মরণ করাই ভালো:

‘বাংলার মাটির চেয়ে ভালো ব্লাড ব্যাংক আর নেই,

যেখানে প্রতি ফোঁটা রক্ত দশ ফোঁটা হয়ে যায়

তাই মানুষ আর হাসপাতালের ব্লাড ব্যাংকে যায় না

বাংলার অফুরান রক্ত মাটি শুষে নেয়।’

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন