বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফরাসি লেখক গুস্তাভ ফ্লবের, সাহিত্যিক বাস্তববাদের (লিটারারি রিয়ালিজম) বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত প্রধান জনক। এই ডিসেম্বর মাসে বিশ্বব্যাপী উদ্​যাপিত হচ্ছে তাঁর ২০০তম জন্মদিন। তিনি তাঁর যুগ বদলানো উপন্যাস মাদাম বোভারিতে (১৮৫৭) উপন্যাসশিল্পে প্রথমবারের মতো ‘অবিশ্বস্ততা’র থিমকে বড় আকারে সামনে নিয়ে এসে, পরে একই লেখায় নায়িকা এমাকে আর্সেনিক বিষ খাইয়ে আত্মহত্যা করানোর মধ্য দিয়ে সেটাই প্রমাণ করে ছেড়েছিলেন যে আমরা জেনেবুঝেই জীবনকে ট্র্যাজিক করে তুলি। কারণ বেঁচে থাকাটার মানে নিষ্প্রভ ও ফাঁকা এক অত্যাচারের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়া।

চার্লসের স্ত্রী এমা বোভারি উপন্যাসে বিয়ের বাইরে দুটো সম্পর্কে জড়ায় এবং শেষে গিয়ে আত্মহত্যা করে। এমার এই আত্মহত্যার মাত্র একুশ বছর পর বেরোয় তলস্তয়ের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস আনা কারেনিনা, যার মূল থিম ওই একই—স্ত্রীর অবিশ্বস্ততা। আর সেখানেও এমার মতোই শেষে গিয়ে আনা—কারেনিনার স্ত্রী, সুপুরুষ ভ্রন্সকির প্রেমিকা—চলন্ত ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। তলস্তয়ের আনার চুয়াল্লিশ বছর পর বিশ্বসাহিত্যে আবার সাংসারিক অবিশ্বস্ততার থিম কেন্দ্র করেই ঝড় ওঠে—বের হয় জেমস জয়েসের ইউলিসিস। সেখানে মলি ব্লুম—লিওপোল্ড ব্লুমের স্ত্রী, ব্লেজেস বয়লানের প্রেমিকা—ঘটা করে একদিন বাসায় নিজের শোবার ঘরে উত্তুঙ্গ যৌনতায় মত্ত হয় বয়লানের সঙ্গে। মলি ব্লুম অবশ্য সবকিছুর খেই হারিয়ে এমা ও আনার মতো আত্মহত্যা করে না। কারণ, তত দিনে অবিশ্বস্ত স্ত্রী বিশ্বস্ত স্বামীকে দোষ দিতে শিখে গেছে কিংবা উল্টোটা। তা ছাড়া জীবনদর্শনে ফ্লবেরের কিছুটা বিপরীতমুখী জয়েসের ‘মানব’ ধারণা নিয়ে আশাবাদ তো আছেই। তাই ফ্লবেরের ভাবশিষ্য হয়েও উপন্যাসের শেষে জয়েস এই আশা জারি রাখেন যে মলি ও লিওপোল্ডের মধ্যে সবকিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে, ইয়েস। তাদের সংসার এবার সুন্দর হবে, ইয়েস। জীবন অনেক আনন্দের হবে, ইয়েস। জীবনের মধ্যে অনেক বড় কোনো সত্য অবশ্যই নিহিত আছে, ইয়েস।

জয়েসের উপন্যাসের শেষ শব্দ ‘ইয়েস’-এর মধ্যে জীবনযাপনকে ‘হ্যাঁ’ বলার যে ইতিবাচকতা আমরা দেখি, সেটা কিন্তু গুরু ফ্লবেরে নেই। কেন?

এই প্রশ্নের মধ্যেই নিহিত ফ্লবেরিয়ান ‘বাস্তবতা’র মূল কথা। সেটা এমন যে সাহিত্যকে হতে হবে ভাববাচক গালভরা আদর্শিক কথাগুলো (যেমন সত্য, সুন্দর, নৈতিক শুদ্ধতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবমুক্তি) ছাড়িয়ে। অর্থাৎ আমাদের কাল্পনিক আদর্শিক বিশ্বাসগুলো পরিত্যাগ করে—সমকালীন জীবনের নিপাট-নিখাদ দর্পণ, যেখানে লেখক সত্য হিসেবে শুধু তা-ই বলবেন, যা খালি চোখে দেখা যায়। কীভাবে সেটা বলবেন লেখক? ফ্লবের বলছেন, ‘একেবারে অন্য ধরনের এক গদ্যে, যার মধ্যে মেদ নেই, নকল সৌন্দর্য সৃষ্টির তাড়না নেই, যদিও সুন্দরের নির্মাণই সাহিত্যের মূল কথা।’

ফ্লবের ভাবতেন, কোনো না কোনো আদর্শকে ঘিরে লেখা সাহিত্যে সমকালীন মানুষের মানসিক পরিগঠন ও সমাজের বস্তুগত অবস্থার চেহারাটা অনুপস্থিত। তখনকার বিচারে তাঁর এই বোধ প্রথাবিরোধী ছিল অবশ্যই। তাঁর এই বোধকে আরও মজবুত করেছিল ছোট বয়সে তরুণ দার্শনিক আলফ্রেড ল্যু পইতুভাঁর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। পইতুভাঁর হতাশাবাদী দর্শন তাঁর ওপর যেমন প্রভাব ফেলে, তেমন নিজের চিকিৎসক পিতার সান্নিধ্য তাঁকে চেনায়, সত্যিকারের জীবনে ‘অসুস্থতা’ এক বড় শব্দ। হাসপাতাল, অপারেশন থিয়েটার, অ্যানাটমির ক্লাস—এসবও জীবনের শাশ্বত রূপকে দেখানোর বিচারে বড় সত্য।

default-image

ফ্লবেরের বয়স তখন বিশও হয়নি। পইতুভাঁর সঙ্গে মিলে একটা অভিধান বানানোর কাজ শুরু করলেন। সেই অভিধানে ছিল ‘বালক’ নামের এক আজব কাল্পনিক চরিত্র, আর তাঁদের দুই বন্ধুর কাজ ছিল সেই বালকের সবচেয়ে জঘন্য চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে অভিধানের ভুক্তি বানানো। দেখা গেল, ফ্লবেরের কাছে সবচেয়ে জঘন্য শব্দ হচ্ছে ‘বুর্জোয়া’। কারণ, তাঁর হিসেবে বুর্জোয়াদের চিন্তাভাবনা ‘নিচু প্রকৃতির’। আর নিচু প্রকৃতির মানুষদের মধ্যে জীবনের ফোলানো-ফাঁপানো ইতিবাচক বিশ্বাসগুলো থাকবে কী করে? থাকলেও তা তো থাকবে মিথ্যা আকারেই। ‘কল্পনাই মিথ্যা, আর কল্পনা ভুলেও ভরা; অন্যদিকে বাস্তব জীবনে ভুল বা সঠিক বলে কিছু নেই’, তিনি লিখলেন। তাঁর বিশ্বাস এমন ছিল যে মানুষ যা, মানুষ তা-ই করে, তা-ই করবে। অবিশ্বস্ত স্ত্রী এমা বোভারি তার ভালো স্বামী চার্লসকে রেখে যে দুই অন্য পুরুষের বাহুলগ্ন হল, সেটার কারণ—এটাই মানুষের আসল চেহারা।

১৮৫৬ সালের ডিসেম্বরে সাময়িকপত্রে মাদাম বোভারি ছাপা হওয়ার পর ফ্রান্সে ঝড় উঠল, যেহেতু সাহিত্যে মানুষ মানুষের আসল চেহারাটাই দেখতে নারাজ। মানুষ সাহিত্যে চায় নৈতিক সততা, শুদ্ধতা ও প্রজ্ঞায় ভরা আদর্শ সব চরিত্র। ফরাসি সরকার এই লেখককে ‘নিচু নৈতিকতার ফেরিওয়ালা’ হিসেবে অভিযুক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করলেন। ১৮৫৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বলতে গেলে অল্পের জন্য কারাদণ্ড থেকে বেঁচে গেলেন ফ্লবের।

তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হলো, এমা বোভারির মতো এমন চরিত্রহীন স্ত্রীর চরিত্র তিনি ফ্রান্সের কোথায় পেয়েছেন? ফ্লবের দুটি বিখ্যাত উক্তি করেছিলেন সে সময়: ‘আমিই মাদাম বোভারি’, অর্থাৎ আমিই সমাজের তৈরি করা নৈতিকতার মানদণ্ড ভেঙে ফেলা ‘অনৈতিক’ এমা। আর বলেছিলেন, ‘ঠিক এই এখন ফ্রান্সের অসংখ্য গ্রামে সংসারজীবনের মিথ্যার বোঝা মাথায় নিয়ে কাঁদছে হতভাগা অনেক এমা বোভারি।’

মাদাম বোভারির বিরাট খ্যাতির পর ফ্লবের বর্তমান তিউনিসিয়ার উত্তরে সমুদ্রপাড়ের ঐতিহাসিক শহর কার্থেজে গেলেন। উদ্দেশ্য, পরের উপন্যাস সালামবোর জন্য মাল–মসলা জোগাড় করা। এই সালামবোতেই (১৮৬২) আমরা দেখি, গদ্য নতুন রূপ নিচ্ছে, গদ্য দিয়ে তিনি পৃথিবীর সৌন্দর্যকে ধরতে চাইছেন। এমনভাবে ধরতে চাইছেন যে সত্যকথনের বেলায় নৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলো সামনে চলে এলেই সৌন্দর্য যেন ভেঙেচুরে যাবে। তিনি বুঝলেন, সাহিত্যে সৌন্দর্যের নির্মাণ অতীব কঠিন কাজ। বুঝলেন, তাই সেটা করতে হবে ধীরে, যত্নসহকারে। তবেই শিল্পের সৃষ্টি হবে নিখুঁত। তিনি তাঁর প্রেমিকা লুইজ কোলেকে চিঠিতে লিখলেন, ‘আমি কথাশিল্পে এমন এক শৈলী অর্জন করতে চাই, যেখানে গদ্য হবে কবিতার মতো ছন্দময়, আর বিজ্ঞানের ভাষার মতো নিখুঁত।’ তিনি আরও জানান, কোনো শব্দের প্রতিশব্দ বলে কিছু নেই, চিন্তার প্রকাশের বেলায় লেখকের কাজ ‘একদমই অনন্য সঠিক শব্দটা’ খুঁজে বের করা।

এই উপন্যাস লেখার সময়ই তিনি বিখ্যাত ফরাসি নারী ঔপন্যাসিক জর্জ সাঁদকে লিখলেন, এলেবেলে, ভাসা ভাসা বিমূর্ত ও ধোঁয়াশা অভিব্যক্তি এবং বহুল চর্চিত ক্লিশে প্রকাশকে এড়িয়ে তিনি এমন সব সুরেলা বাক্য লিখতে চান, যার মধ্যে শব্দের ধ্বনিসাদৃশ্য থাকবে না। শব্দের নিখুঁতত্ব নিয়ে এই নেশার কারণেই এক জীবনভর লিখেও বালজাক ও এমিলি জোলার রচনাকর্মের সামান্য এক অংশও লেখা সম্ভব হয়ে ওঠেনি গুস্তাভ ফ্লবেরের পক্ষে। তাই ওয়াল্টার পিটারের এই উক্তি, ফ্লবের ‘স্টাইলের হাতে শহীদ’। লেখায় বস্তুনিষ্ঠতা বা নৈর্ব্যক্তিকতা অর্জনই ছিল ফ্লবেরের শেষ কথা। এ ব্যাপারে তাঁর বিখ্যাত বাক্য, ‘লেখার বেলায় লেখককে হতে হবে ব্রহ্মাণ্ডের ঈশ্বরের মতো। লেখক সর্বত্র আছেন, কিন্তু কোথাও দৃশ্যমান নয়।’

গুস্তাভ ফ্লবেরের এই শব্দ বাহুল্যবর্জিত, স্পষ্টরূপে নির্দিষ্ট, মেদহীন শৈলী বিশ শতকের লেখক ফ্রানৎস কাফকা, নাইপল ও জে এম কুটসিকে বিরাট প্রভাবিত করেছিল। ভ্লাদিমির নবোকভ কাফকার ওপর ফ্লবেরের প্রভাব নিয়ে লিখেছেন, ‘কাফকার লেখায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল গুস্তাভ ফ্লবেরেরই। কাফকা তাঁর শব্দ চয়ন করতেন আইন ও বিজ্ঞানের ভাষা থেকে। ওদের মধ্যে তাই থাকত লেখকের ব্যক্তিগত সেন্টিমেন্টবর্জিত একটা বিদ্রুপাত্মক স্পষ্টতা। একদম এটাই ছিল ফ্লবেরের পদ্ধতি, যা আমাদের জন্য রেখে গেছে ধীর ও প্রবল অন্তর্মুখী লেখার নতুন এক ধারা।’

যিনি লেখালেখিতে কোনো নতুন ধারার প্রবক্তা, যে ধারা পরে আবার হয়ে ওঠে বিশ্বব্যাপী কথাসাহিত্যের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ধারা (‘আত্মদর্শী বাস্তববাদ’), তাঁর দ্বিশততম জন্মদিন আমাদের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। আগেই ইঙ্গিত রেখেছি, আপনি গুস্তাভ ফ্লবের না পড়ে সাহিত্যে আসবেন, সেটা হয় না। কারণ, তাহলে সাহিত্যের আসল বিষয়টা, গদ্য নির্মাণশৈলী নিয়ে আপনার মধ্যে অনেক গলদ থেকে যাবে। আবার ফ্লবের ছাড়া আপনি এটাও জানবেন না যে বিপ্লবী লেখক না হয়েও কী করে ‘ক্ষিপ্ত লিবারাল’ হতে হয়? কী করে ‘ক্ষমতা ও স্থূল চিন্তার প্রতিটি প্রকাশের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো ব্যক্তির প্রতিবাদকে লেখালেখিতে নীরবে উদ্​যাপন’ করতে হয়!

মাঝেমধ্যেই ভাবি, এত বছর লেখালেখির মধ্যে থেকে আমি আসলে কার কাছে সবচেয়ে বেশি ঋণী? অনেকের নাম মাথায় আসে, কিন্তু ফ্লবেরের নাম না। কেন? আমাদের সব লেখকের জন্যই প্রযোজ্য এই ‘কেন’র সবচেয়ে সুন্দর উত্তরটা দিয়েছেন জেমস উড। তিনি বলছেন, ‘ঔপন্যাসিকদের উচিত ফ্লবেরকে ধন্যবাদ জানানো, যেভাবে কবিরা জানান বসন্তকে। কারণ, উপন্যাস শিল্পের সবটার শুরু ফ্লবেরের হাত ধরে। বিশ্বসাহিত্যের পর্ব দুটো। একটা ফ্লবের–পূর্ববর্তী, একটা ফ্লবের–পরবর্তী। আধুনিক বাস্তববাদী বর্ণনা বলতে অধিকাংশ পাঠক ও লেখক যা বোঝেন, সেটা ফ্লবেরেরই নির্মাণ। তাঁর প্রভাব এতটাই রোজকার, এতটাই সব সময়ের যে সেটা অদৃশ্য।’

ফ্লবেরের শিষ্য মোপাসাঁ থেকে নিয়ে এমিলি জোলা পর্যন্ত, মিশেল ফুকো থেকে নিয়ে জঁ পল সার্ত্রে কি এখনকার মারিও বার্গাস য়োসা পর্যন্ত, কেউ আজও তাই ওভাবে বলেননি, আমি ফ্লবের দিয়ে প্রভাবিত। বলেছেন (যেমন এজরা পাউন্ডকে লেখা চিঠিতে জেমস জয়েস), ‘লিখতে বসলে প্রথম কথা, শব্দ কোনটা নেব—ভোর না প্রভাত, সন্ধ্যা না প্রদোষ? আর ভাবতে বসলে প্রথম ভাবনা—পৃথিবী সুখের নাকি যাতনার?—দুই জায়গায়ই তো দেখি সবটাই গুস্তাভ ফ্লবের।’

দ্বিশতজন্মবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি হে প্রিয় শিক্ষক!

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন