default-image
লোকটি এক যুগ ধরে আমেরিকায়। নানা আইনি মারপ্যাঁচে এক যুগের মধ্যে একবারও দেশে আসতে পারেননি তিনি। তাই ১২ বছর সরাসরি তাঁর দেখা হয়নি মায়ের সঙ্গে।

মেট্রোপলিটন অ্যাভিনিউ ফরেস্ট হিল। প্রতিদিনের মতো হাঁটতে বেরিয়েছি। আজকাল হাঁটতেও কষ্ট হয়। বয়স বেড়েছে। মেশিনে মাপা লাগে না, সুগার লেভেল যে হাই; হাঁটুর ব্যথাই তা জানান দেয়। জোরে হাঁটতে গেলে ব্যথাটা বেশি লাগে। তাই ধীরে ধীরে হাঁটি আর দুই পাশের বাড়িগুলো দেখি। ছবির মতো সুন্দর সব বাড়ি। তবে এদিকটায় তেমন একটা বাঙালির বাসা নেই। বাঙালির বাড়ি বাইরে থেকেই দেখে চেনা যায়। গ্রীষ্ম বা সামারে লাউ, শিম, করলা, বেগুন, টমেটো—সব বাঙালি বাড়িতেই কমবেশি দেখতে পাওয়া যায়। তিন ব্লক হাঁটলাম, কোথাও লাউবাগান চোখে পড়েনি।

সকাল ছয়টা হলেও এখানে হাঁটতে কোনো ভয় লাগে না। রাস্তায় অল্প কয়টা গাড়ি। রাতের ক্যাবচালকেরা এ সময় ধীরগতিতে গাড়ি চালিয়ে পার্কিং খুঁজে বেড়ান। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই চোখাচোখি হয়। রাতজাগা ক্লান্তি তাঁদের চোখে–মুখে। এ শহরে নিজের বাড়ির পার্কিং না থাকলে রাস্তায় পার্কিং খুঁজে পাওয়া অনেকটা লটারি লেগে যাওয়ার মতো ব্যাপারই বটে।

ক্যাবচালকেরা—তাঁরা কেউই আমার আত্মীয় নন, তবে তাঁদের অনেকেই আমার মুখ চেনা। এ শহরে ক্যাবচালক বেশির ভাগই বাংলাদেশি আর ভারতীয়। এ দেশে ৮০ হাজারের ওপরে বাংলাদশি গাড়িচালক রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই রাতে গাড়ি চালিয়ে দিনে অন্য কাজও করেন। নিউইয়র্ক শহরে দিন দিন বাড়িভাডা বেড়েই চলছে। একার আয়ে এ শহরে সংসার চালানো মুশকিল। তাই অনেক ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজ করতে হয়। যাঁদের সংসারে ছোট বাচ্চা আছে, ওই সংসারে স্বামীকে একাই দুটো চাকরি করে সংসার চালাতে দেখা যায়। ফেসবুকে সুন্দর সুন্দর ছবি দেখে নিউইয়র্ক শহরের মধ্যবিত্তের কষ্টের জীবন বোঝা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

হাঁটতে বের হলে এসব ভাবনা মাথায় ঘুরতে থাকে আমার।

হাঁটছি। এমন সময় কোথা থেকে যেন ‘মা মা... আম্মা আম্মা...আম্মা গো...’—এ রকম চিৎকার আর কান্নার শব্দ ভেসে এল। ফলে আমার পথচলা গেল থেমে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একদলা বুকফাটা চাপা কষ্ট।

এত ভোরে কে কাঁদে? এই কান্না আমার খুব পরিচিত মনে হয়। কোথা থেকে এ কান্নার শব্দ আসছে? ডানে-বাঁয়ে কান খাড়া করে ভালোমতো শোনার চেষ্টা করেও কান্নার সঠিক ঠিকানা খুঁজে পেলাম না। এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে চিন্তা করলাম, আমি কি ভুল শুনছি?

আধুনিক কর্মব্যস্ত জীবনে এ শহরে দম ফেলার সময় নেই কারও। জীবনের সব সুখ-দুঃখ, হাসি–আনন্দ এবং মা–বাবা, আত্মীয়স্বজনের আদর-স্নেহ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে আমরা প্রবাসে থাকি। এটা যে কত কষ্টের, একটু উপলব্ধি করলেই বোঝা যাবে।

এখানে আসার পর দেশের জন্য আমিও তো কারণে অকারণে এমন ডুকরে কেঁদেছি। কিন্তু সত্যিই পুরুষকণ্ঠের কান্না কানে আসছে, ভেসে আসছে। সাধারণত ছেলেরা এমন চিৎকার করে কাঁদে না। চারদিকে তাকিয়ে খুঁজতে চেষ্টা করি, কোন বাসা থেকে আসছে এমন কান্নার শব্দ। নিশ্চয়ই কেউ অসুস্থ। কিন্তু কোথাও কোনো অ্যাম্বুলেন্সের দেখা পেলাম না।

বিজ্ঞাপন

এদিকে সমানে ‘মা গো... আম্মা আম্মা’ বলে পুরুষকণ্ঠটি কেঁদেই চলছে। কান্নার শব্দ শুনে অনেকটা দৌড়েই শব্দের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করলাম। জানি, বাসার ভেতরে ঢুকতে পারব না। তবুও যদি কোনো কাজে আসি।

করোনায় মানুষের জীবনে কান্না আর হতাশা যেন কিছুইতেই পিছু ছাড়ছে না। গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া মানুষের কষ্টের বোঝা নামতে চাইছে না কিছুতেই। আমি যখন দৌড়ে কান্না কোন বাড়ি থেকে আসছে, তা খুঁজছি, ঠিক তখনই রাস্তার পাশে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে এক বাঙালি ভাইকে দেখতে পেলাম। বয়স মনে হয় ৪০–এর কাছাকাছি হবে। তিনি মুঠোফোন হাতে নিয়ে কী যেন দেখছেন আর চিৎকার করে কাঁদছেন। আমি কোনোরকমে জানতে চাইলাম, ‘ভাই, কী হয়েছে?’

‘করোনায় আমার মা মারা গেছে।’

কথাটা শুনেই মনে হলো, গলার ভেতর শক্ত কিছু দলা পাকিয়ে আমার কণ্ঠ রোধ করে দিচ্ছে। আমি কাঁদতে চাইছি না, কিন্তু হাউমাউ করে কান্না চলে আসছে। আর থামাতে পারলাম না নিজেকে। নিজেই গাড়ির দরজা খুলে সামনের সিটে উনার পাশে বসে গেলাম। উনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কান্নায় শরিক হলাম।

কান্নায় এত তৃপ্তি, এই প্রথম টের পেলাম! তিনি ভিডিও কলে মৃত মায়ের মুখ দেখছেন আর চিৎকার করে কাঁদছেন। কী করুণ সে দৃশ্য, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্টকর।

বিজ্ঞাপন

বাঙালি ভাইটি বলছেন, ‘আপা গো, মারে দেখি নাই ১২ বছর। মা আজ চইলা গেল। মাকে আর দেখতে পাব না।’ এই কান্না একটা সময় বিলাপে রূপ নিল। বিলাপ তো নয়, কান্নার সুরে ১২ বছর মাকে না দেখার গল্প বলতে থাকেন তিনি।

একদা অবৈধ পথে তিনি এসেছিলেন এ দেশে, রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করছেন। এখন ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে গাড়ি চালান। এ দেশে এসে এক বাঙালি নারীকে বিয়ে করেছিলেন, তবে সংসার টেকেনি। আর আইনি নানা জটিলতায় ১২ বছরেও গ্রিন কার্ড কপালে জোটেনি তাঁর। তাই এখন একা একজনের সঙ্গে রুম ভাগাভাগি করে থাকেন। রাতে গাড়ি চালিয়ে দেশে মা-বাবার দেখাশোনা ও ভাইবোনের পড়াশোনা করান। গাড়ি চালিয়েই দুই বোনকে এমবিএ করিয়েছেন। কাঁদতে কাঁদতে জানান, ‘এরাই আমার সন্তান। এদের সুখের জন্য এ শহরের সব রকমের কষ্ট করেছি।’

হাঁটছি। এমন সময় কোথা থেকে যেন মা মা... আম্মা আম্মা...আম্মা গো... এ রকম চিৎকার আর কান্নার শব্দ ভেসে এল। ফলে আমার পথচলা গেল থেমে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একদলা বুকফাটা চাপা কষ্ট।

ভোর ছয়টা। চেনা নেই, জানা নেই—দুজন মানুষ কাঁদছি। আমি কখন যে একজন অচেনা মানুষের গাড়ির সামনের সিটে উঠে বসে তার জীবনের গল্প শুনতে শুরু করেছি, বুঝতে পারিনি। তার কথা শুনতে শুনতে আমার চোখে ভেসে উঠল আম্মার মুখ। ছোট ভাইয়ের মুখটাও যেন চোখের সামনে দেখতে পেলাম।

আমার বুকের ভেতরের জমে থাকা শোক আর কান্না যেন নতুন কোনো আশ্রয় খুঁজছিল। ফলে প্রবলতর কান্নাকে আর থামিয়ে রাখা গেল না।

জানাজা শেষে তাঁর মাকে দাফনের জন্য নেওয়া হয়েছে। এখন আর কী করব? অগত্যা তাঁকে শান্ত হওয়ার কথা বলে চোখের জলে বিদায় নিলাম।

বিজ্ঞাপন

কার লেখায় পড়েছিলাম, কিছু কিছু মানুষের জন্য পৃথিবীটা উপযুক্ত স্থান নয়, তাদের জন্য এ পৃথিবী যেন একসমুদ্র জল। এই কান্নারত সদ্য মা–হারা লোকটিকে দেখে তা-ই মনে হলো। অল্প কথাতেই বুঝতে পেরেছি, তিনি নিজে তেমন পড়াশোনা করেননি। জানেন না কবে দেশে যেতে পারবেন বা কত দিন এমন নির্বাসিত জীবন কাটাতে হবে।

যত দিন থাকবে এ শহরের ডলার দিয়ে তুমি তোমার পরিবারকে সুখে রাখার সুযোগ পাবে। তাই হয়তো তুমি খুব সহজে শহরটি ছাড়বে না। এই নিউইয়র্কের সবাই-ই হয়তো তোমাকে কষ্ট দেবে। তারপরও তোমাকে এমন একজনকে খুঁজে নিতে হবে, যার দেওয়া কষ্ট তুমি সহ্য করতে পারবে। লোকটির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মনে মনে ভাবছিলাম এসব।

বাসায় যখন ঢুকলাম, আমার চোখ–মুখ ফোলা দেখে বর জানতে চাইল, ঘটনা কী? সব খুলে বললাম তাকে। তখন তার পাল্টা প্রশ্ন, ওই গাড়িচালকের নাম কি? দেশের বাড়ি কোথায়?

এবার হাঁ হয়ে তাকিয়ে রইলাম আমি। এতটা সময় যে মানুষের হাত ধরে ছিলাম, কেন জানি একবারও তাঁর নামই জানতে চাইনি। তবে তাঁর দেশের বাড়ি কোথায়, সেটা জানি। দেশের বাড়ির নাম: বাংলাদেশ।

অন্য আলো ডটকমে লেখা পাঠানোর ঠিকানা: info@onnoalo.com

মন্তব্য পড়ুন 0