বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও একটা মারাত্মক কথা বললেন। অনেকেই বলে বাংলা ভাষায় ভালো বই পাওয়া যায় না। আমি তাঁদেরকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করি, আমাদের মধ্যে কজন বঙ্কিমচন্দ্র পুরোটা পড়েছি, কজন মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরোটা পড়েছি?

তাঁকে প্রশ্ন করলাম, আপনি যে আঞ্চলিক ভাষায় ‘পরানের গহীন ভিতর’ লিখেছেন, তা লিখেছেন সনেটে, আল মাহমুদও ‘সোনালী কাবিন’ লিখেছেন সনেটে, এটা কেন? যাতে সনেটের শাসন আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের বিপদটাকে সামলে রাখতে পারে, সে জন্য?
তিনি বললেন, হতে পারে, হতে পারে।

তিনি আরও একটা মারাত্মক কথা বললেন। অনেকেই বলেন বাংলা ভাষায় ভালো বই পাওয়া যায় না। আমি তাঁদেরকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করি, আমাদের মধ্যে কজন বঙ্কিমচন্দ্র পুরোটা পড়েছি, কজন মাইকেল মধুসূদন দত্ত পুরোটা পড়েছি?

আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে লাগলাম। একটু আগে আমি দাবি করেছি, আমি পড়ি। আমি তো মাইকেল পড়িনি, বঙ্কিম সামান্যই পড়েছি।
সার্কিট হাউস থেকে ফিরে আমি চলে গেলাম আমাদের ধাপ কটকিপাড়ায় বাংলার অধ্যাপক মাহবুবা ম্যাডামের বাসায়। তাঁর কাছ থেকে আনলাম বঙ্কিমসমগ্র, মাইকেলসমগ্র, মধ্যযুগের কবিতা, আলাওল, ‘চর্যাপদ’। শুরু করলাম পড়া। বুঝি না, কিন্তু পড়ি। পড়ে পড়ে মুখস্থ করে ফেলি। পুরোটা কখনোই পড়া হয়নি, তবে অনেকটাই পড়া হয়েছে।

সৈয়দ শামসুল হককে তাই আমি আমার গুরু বলে মান্য করি।
তাঁকে বললাম, আপনার এই সাক্ষাৎকারটি ছাপা হলে পত্রিকা কোথায় পাঠাব?
তিনি বললেন, বাড়ি নম্বর ৬, সড়ক নম্বর ৮, গুলশান, ঢাকা। ২৭ বছর আগে সৈয়দ শামসুল হকের মুখে শোনা সেই ঠিকানা আমার এখনো মুখস্থ আছে। ২০১৬ সালে ২৭ সেপ্টেম্বর আমি ছিলাম নারায়ণগঞ্জে। একটা স্কুলের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে। সন্ধ্যার পর ফিরছি। শুনলাম সেই দুঃসংবাদটি। সৈয়দ শামসুল হক আর নেই। আমি আমার ড্রাইভারকে বললাম, গাড়ি সোজা নিয়ে চলো গুলশানে, বাড়ি নম্বর ৬, সড়ক নম্বর ৮...

default-image

সৈয়দ শামসুল হকের কাছ থেকে অনেক আদর পেয়েছি। আমাকে দেখামাত্র তিনি ডেকে কাছে নিতেন, হাত ধরতেন, বলতেন, আনিস, কাছে এসো। কী লিখছ?

আমি সংকোচে কাঁচুমাচু করতাম, বলতাম, আমিও একজন লেখক, আমার আবার লেখা!
হক ভাই বলতেন, আনিস, খবরদার এইভাবে বলবে না! তুমি বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক। শোনো, এমন বিনয় কোরো না, যাতে আত্মবিশ্বাস চলে যায়, এমন আত্মবিশ্বাসী হয়ো না, যাতে অহংকারী বলে মনে হয়!

আনোয়ারা সৈয়দ হক সঙ্গে থাকলে বলতেন, মঞ্জু, এই দ্যাখো আনিস, ওকে আমি একটু অতিরিক্ত স্নেহ করি জানো তো, ও আমাদের রংপুরের ছেলে।

সৈয়দ শামসুল হকের সাক্ষাৎকার নিয়েছি একাধিকবার। একবার সাজ্জাদ শরিফ ভাই, ব্রাত্য রাইসু, ‘ভোরের কাগজ’–এর আলোচিত্রী মাসুদ পারভেজ আনিস, আর আমি গেছি হক ভাইয়ের গুলশানের বাসায়, সাক্ষাৎকার নেবার জন্য।
প্রধান কবির প্রসঙ্গ এলো। আমি জানতাম, এ ব্যাপারে হক ভাইয়ের মত, যে প্রধান কবি মানে একজন প্রধান কবি হবেন তা নয়। মেজর পোয়েটের বাংলা প্রধান কবি। একটা ভাষায় একই সঙ্গে অনেক কজন প্রধান কবি থাকতে পারেন। সৈয়দ শামসুল হক বলেন, প্রধান কবি বা লেখক তিনিই যিনি সাহিত্যের মোড় বদলে দেন। আর গৌণ কবি বা লেখকেরা সেই ঘোরানো পথ চলতে থাকেন।
ব্রাত্য রাইসু প্রশ্ন করে বসলেন, শামসুর রাহমানরে মাথার উপরে তুইলা দিছে, আর নামাইতে পারে না, উনি প্রধান কবির উঁচা ডালে ঝুইলা রইলেন।

সেই প্রশ্নে, নাকি আর কোনো প্রশ্নে হক ভাই বলে উঠলেন, ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভারস্মার্ট। ডোন্ট ট্রাই টু বি ওভারস্মার্ট।
আর আমাদের সঙ্গের ফটো সাংবাদিক আনিস আমাদের সামনে রাখা পেস্তা বাদাম ক্রমাগত খেয়েই চললেন।
সৈয়দ শামসুল হক আমাদের ‘ভোরের কাগজ’ বা ‘প্রথম আলো’ অফিসে মাঝে মধ্যে আসতেন। আমরা দল বেঁধে তাঁর সামনে গিয়ে বসতাম। তিনি গল্প করতেন, আমরা হেসে গড়াগড়ি খেতাম। একদিন বললেন, শোনো আমার এই ঘড়িতে একটা ক্যালেন্ডার আছে, চান্দ্রমাসে চলে, মাসের কয়টা দিন তাতে লাল দাগ থাকে।

পুরোটাই যে গুল, তা আমরা জানতাম। কারণ তিনি লেখক। বানিয়ে গল্প বলাই তাঁর পেশা।
হক ভাইয়ের একবার ‘প্রথম আলো’র ঈদসংখ্যার জন্য উপন্যাস দেবার কথা। তিনি বললেন, লেখা চলছে। শেষে বললেন, কম্পিউটার ক্রাশ করেছে। পুরো লেখা হারিয়ে গেছে। উপন্যাসের বদলে নাটক নিতে পারো। সাজ্জাদ শরিফ ভাই আমাদের বললেন, হক ভাইয়ের গল্প বানানোর ক্ষমতা বুঝলেন তো!

কিন্তু তিনি যা দিতেন, তা–ই হতো শ্রেষ্ঠ। আত্মজীবনীর অংশ দিয়েছিলেন, ‘প্রণীত জীবন’, পড়ে তো আমরা মুগ্ধ! একটা মানুষ কীভাবে এমনটা লিখতে পারেন!

আমি তখন কাজ করি সাপ্তাহিক ‘খবরের কাগজ’–এ। তিনি ‘খবরের কাগজ’–এ ছাপা হওয়া একটা লেখার বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিলেন। এক লেখক লিখেছেন, সৈয়দ শামসুল হক আপাদমস্তক কৃত্রিম। তিনি ফোন করে বললেন, আদালতে তোমাদের প্রমাণ করতে হবে, আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত কৃত্রিম। পারবে প্রমাণ করতে!

এটা পারার কথা না। আমরা ক্ষমা চাইলাম।
তসলিমা নাসরিনের ‘ক’-এর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। বইটা নিষিদ্ধ করার রায় হাতে নিয়ে তিনি আমাদের ‘খবরের কাগজ–এর অফিসে এসেছিলেন। রায় হাতে করে নিয়ে এসেছি, বুঝলে!

একবার আনন্দ পাবলিশার্স ঢাকা থেকে বই প্রকাশের অনুমতি চাইল। সৈয়দ শামসুল হক বিরোধিতা করলেন। শওকত আলী প্রমুখকে নিয়ে তিনি বসলেন রমনা রেস্তরাঁয়। আমরা, লেখকেরা, যোগ দিলাম সেই সভায়। তিনি ‘প্রথম আলো’য় লিখলেন এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে। লেখাটা উদ্ধার করা দরকার। তখন একটা যুক্তি সবার সামনে আপনা-আপনিই এসে গিয়েছিল যে বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ। কাজেই বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যের রাজধানী হলো ঢাকা। আনন্দ পাবলিশার্স বই করার জন্য ঢাকা এলে বাংলাদেশের সাহিত্যের ভালোমন্দের বিচারক হয়ে উঠবে তারা। কাউকে অনুকম্পা দেবে, কাউকে দেবে পুরস্কার, কাউকে বর্জন করবে। এটা হতে দেওয়া যায় না।

সরকার লেখকদের কথা শুনেছিল, আনন্দ পাবলিশার্সকে অনুমতি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছিল। একটা বিষয় লক্ষণীয়, সৈয়দ শামসুল হকের মতো বড় সাহিত্যিককে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে কোনো মাতামাতি হয়নি। অথচ সৈয়দ হকের কবিতা বুদ্ধদেব বসু তাঁর পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন।

সৈয়দ শামসুল হক দুঃখ করে বলতেন, এই দেশে সাহিত্য সমালোচনা করা হয় রাজনীতির মানদণ্ডে! কথাটা কিন্তু সত্য। চৈনিক বামেরা এই দেশের কথাসাহিত্যের ভালোমন্দ নির্ধারণের জায়গাটা দখল করে রেখেছিলেন। লেখক শিবির না করলে কথাসাহিত্যিক হওয়া কঠিন ছিল। হুমায়ূন আহমেদও সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে লেখকশিবির করতেন, তাঁর প্রথম বই প্রকাশিত হলে আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা, শামসুর রাহমান প্রমুখের প্রশংসাধন্য হয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। একবার এক সমালোচক গ্রন্থ-আলোচনায় লিখেছেন, এই বইটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাতে গরিব মানুষের জীবনের কথা উঠে এসেছে। আমি বোধ হয় ফেসবুকে প্রতিবাদ জানালাম। সাহিত্য আলোচনার এই দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়। গরিব মানুষ, প্রান্তিক মানুষ, সর্বহারা মানুষ, চরের মানুষ, দ্বীপের মানুষ নিয়েও বাজে সাহিত্য রচিত হতে পারে। আবার বড়লোকের জীবন নিয়েও ভালো সাহিত্য নির্মিত হতে পারে। ‘আন্না কারেনিনা’ গরিবের জীবনকাহিনি নয়, ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ও নয়। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ শশী ডাক্তারের কাহিনি, তাই বলে এটা ‘পদ্মানদীর মাঝি’ থেকে গৌণ হয়ে যায় না। আসল ব্যাপার হলো, লেখকের লেখার ক্ষমতা। লেনিন নিজে সমাজতান্ত্রিক চশমার ভেতর দিয়ে সাহিত্য-বিচারকে নিরুৎসাহিত করতেন। তিনি গ্যেটের মেফিস্টোফিলেসকে উদ্ধৃত করে বলতেন, ‘শোনো বন্ধু, তত্ত্ব হলো ধূসর, কিন্তু জীবনের অনন্ত বৃক্ষ চিরসবুজ। ’ হক ভাইকে ফোন করে জানালাম, শ্রমজীবী সর্বহারার জীবন নিয়ে লিখলেই মহৎ সাহিত্য, এই ধারণার বিরুদ্ধে লিখছি। তিনি বললেন, একটু কষে দিও।

কয়েক বছর আগে ‘সময়’ টেলিভিশন থেকে ফোন এলো। ঈদে মুখোমুখি সৈয়দ শামসুল হক আনিসুল হক নামে একটা অনুষ্ঠান করা হবে। আমাকে যেতে হবে হক ভাইয়ের বাসায়।

সকালবেলা ক্যামেরাসমেত প্রযোজকের সঙ্গে আমি হাজির হলাম হক ভাইয়ের বাসায়। মূল বাসার সঙ্গে একটা অনুচ্চ ছাদের নিচে একটা ছোট্ট বৈঠকখানার মতো। সেখানে আমি আর প্রযোজক বসে আছি। সৈয়দ হক এলেন। প্রযোজকের ওপরে খেপে গেলেন; এই, তুমি এই চেয়ারে বসেছ কেন? যখন দেখবে একটা চেয়ার আলাদা, তখন বুঝবে এটা গৃহকর্তার চেয়ার। ওঠো...
আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। কথা ছিল, অনুষ্ঠান হবে মুখোমুখি সৈয়দ শামসুল হক আনিসুল হক। কিন্তু হক ভাইয়ের অগ্নিমূর্তি দেখে আর কথা না বাড়িয়ে আমিই তাঁর সাক্ষাৎকার নিলাম। তাতে আমার কোনো অসুবিধা নেই। আমি তো তাঁকে গুরু বলেই মানি। রেকর্ডিং শেষ হলো। হক ভাই বললেন, আনিস, তুমি থাকো। টেলিভিশনের লোকেরা বিদায় নিলেন। আমাকে হক ভাই নিয়ে গেলেন বাড়ির ভেতরে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চেহারা গেল বদলে। মুখে হাসি। আরে আনিস বোসো। গল্প করি। মঞ্জু। দ্যাখো আনিস এসেছে। ওকে হাঁসের মাংস আর চিতই পিঠা করে খাওয়াও।

তারপর বললেন, শোনো, একবার একটা শুটিংয়ের ক্যামেরা আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিলাম। পরে দেখি, বহু মূল্যবান জিনিস খোয়া গেছে। এর পরে শুটিংয়ের লোকদের আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিই না।
হাঁসের মাংস, চিতই পিঠা সত্যি সত্যি এলো। হক ভাই বললেন, থাকো। দুপুরে খেয়ে যাও।

আমি হক ভাইয়ের এই একদিন আচরণের রহস্য আজও উদ্ধার করতে পারিনি।
তবে যতদূর মনে পড়ছে, ‘এবং সৈয়দ হক’ নামে হক ভাই চ্যানেল আইতে একটা অনুষ্ঠান করতেন। সেই অনুষ্ঠানে তিনি আমার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে আমাকে বাধিত করেছিলেন।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন