বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হুমায়ূন আহমেদের ওই জবাবে, একটি বিষয় বেশ বোঝা যায়, হাতে লিখে এগিয়ে যাওয়া কাহিনির ক্ষেত্রে এর সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জন, সম্মার্জন—এই ধরনের বিবিধ কাটাকুটিতে লেখক ওই রচনার নিজস্ব উত্তরণের এক ব্যক্তিক সাক্ষ্য রেখে যান। টাইপরাইটারে লেখার ক্ষেত্রে সে সাক্ষ্য খানিক অথবা বেশ কিছুটা থাকলেও কম্পিউটারের সফট বা নরম অক্ষর লিপিকার পৃষ্ঠায় কোনো সংশোধনমাত্র তা উধাও হয়ে যায়।

সেই কবে প্রমথ চৌধুরী লিখেছিলেন, এখন লেখকেরা ঘড়ির দিকে চেয়ে লেখেন। যদিও তখন প্রমথ চৌধুরী অতিকষ্টের কল্পনায়ও এ কথা ভাবতে পারেননি, এখন শুধু সময়কে মান্যতা দিয়ে লেখকেরা লেখেন না, তাকে যন্ত্রের চাবি টিপে টিপে অথবা চেপে চেপে একেবারে পুরো দশটি আঙুলের ওপর নির্ভর করে লিখতে হয়। সে লেখার কোনো নমুনা কাগজে না–ও থাকতে পারে। তারহীন ডাকে তা তখনোই প্রকাশনালয়ে পাঠিয়ে দেওয়াও সম্ভব। প্রযুক্তির এই সহায়তা কালের অনিবার্য নির্মিতি। তবু এখনো কেউ কেউ হাতে লেখেন। দুনিয়াখ্যাত অন্তত দুজন লেখকের কথা জানা যায়—অরহান পামুক ও মারিয়ো বার্গাস য়োসা। তাঁদের প্রজন্মের আগের থেকেই অনেকে টাইপরাইটার আর তিন দশক ধরে কম্পিউটারেও লেখেন। সে প্রজন্মের কার্লোস ফুয়ান্ত বলতেন, ‘আমি কাগজে–কলমে লিখি, যেমন লিখতেন সার্ভেন্তাস!’ তাঁর বন্ধু গার্সিয়া মার্কেস শুরু থেকেই টাইপরাইটারে, পরে কম্পিউটারে। হাতের লেখার যুগে লেখকের পাণ্ডুলিপি আর হস্তাক্ষরের যে নমুনা আমাদের সামনে থাকত, তা আর আগামী দিনে প্রায় থাকবে না বলে ধরে নেওয়া যায়। কিছুদিন বাদে একমাত্র স্বাক্ষরই হবে লেখকের হাতের নিজস্ব খতের একমাত্র দৃষ্টান্ত!

বাঙালি লেখকের হস্তাক্ষরের সবচেয়ে বড় নমুনা সম্ভবত—সম্ভবত নয় তিনিই প্রধান—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা বর্ণমালার নিয়ম অনুযায়ী, এর ছাঁচকে সবচেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিকভাবে ব্যবহার করার উদাহরণও তাঁর হাতের লেখা। একটু ডানে হেলানো, কিন্তু প্রতিটি বর্ণকে ইংরেজির ব্রিটিশ (নাকি অক্সফোর্ড) স্টাইলে যেন কলম না প্রায় তুলে ডান কাতে লেখা সম্ভব, প্রায় সেভাবেই এই বাংলা বর্ণমালার ছাঁচকে সাজিয়েছেন তিনি। বাংলা বর্ণমালা তো ইংরেজির বর্ণমালার মতো শুধু ডট [(.), ইংরেজি আইয়ের ওপরে)] ও কাট [((-), ইংরেজি ‘এল’কে কেটে ‘টি’) জন্য কলম তুলে লেখা সম্ভব নয়, আরও অন্তত দশটি কারণে কলম তুলতেই হয়। কিন্তু রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষর ডান দিকের ওই ঝোঁক আর অক্ষরে অক্ষরে প্যাঁচ রেখে দ্রুত বাংলা লেখার একটি কৌশল বটে। তাঁর হাতের লেখার গড়ন পরের অন্তত তিনটি প্রজন্মকে ভীষণভাবে অজ্ঞাতে প্রভাবিত করেছে। লেখকেরা হরেদরে কম্পিউটারে লেখা শুরু হওয়ার আগে, অন্তত ষাটের দশক পর্যন্ত কাগজে লেখকদের বর্ণলাঞ্ছনের যে ছাপ, তাতে কোনো না কোনোভাবে রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষরের ছাঁচ খানিকটা হলেও ধরা পড়ে। পরে ধীরে ধীরে উবে গেছে বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলায়—দুই জায়গাতেই।

উবে গেছে আরও একটি বিষয়ও। এটি মূলত হস্তলিপিবিশারদদের এখতিয়ার। মানুষের হাতের লেখা নাকি তার ব্যক্তিত্বেরও অংশ। কোনো কোনো বিশারদ হস্তাক্ষর দেখে নারী-পুরুষের তফাতও করতে পারেন। কিন্তু সে কথা কি লেখকদের ক্ষেত্রে খুব খাটে। হাতের লেখা প্রায় একই, প্রচলিত কথায় ছাঁচের দিক থেকে বলা যেতে পারে রাবীন্দ্রিক, এমন দুজন লেখকের লেখা অন্তর্গত অর্থে একেবারেই দুই রকম। এমন উদাহরণ বাংলা ভাষায় আছে। আছে হাতের লেখায় নারী–পুরুষের ভেদ ঘুচিয়ে দেওয়ারও নমুনা। সাধারণ চোখেই তা দেখা। বিশারদের কোনোমাত্র যোগ্যতা সে চোখের নেই, তাই সেই বিষয়ে আপাতত বিশ্লেষণ করারও ক্ষমতা দুরস্ত! বরং লেখকদের হাতের লেখা, বাস্তবিক যা যা দেখার সুযোগ হয়েছে, কখন কোনো প্রয়োজনে কিংবা কৌতূহলে, সে নিয়ে এ কথা আরও একটু এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

দুই.

বাংলাদেশের লেখকদের ভেতরে প্রথম যিনি যন্ত্রেই ‘লেখা করতেন’, তিনি সৈয়দ শামসুল হক। মুনীর চৌধুরী তাঁর অক্ষরবিন্যাস করা জর্মান অপটিমা-মুনীর টাইপরাইটারের একটি সৈয়দ হককে দিয়েছিলেন স্বাধীনতার আগে, এরপর থেকে তিনি ওই যন্ত্রে গল্প-উপন্যাস লিখতেন, পরে কম্পিউটারে; কবিতা লিখতেন কলমে। তাঁর শেষ পর্বের ব্যক্তিগত গদ্যের বই জলেশ্বরীর দিনপত্রীর পুরো পাণ্ডুলিপি কলমে লেখা, বেশির ভাগ বলপয়েন্টে, অক্ষরের ছাঁচ খুব সুচারু সুন্দর হয়, পুরোপুরি রাবীন্দ্রিকও নয়, কখনো ডানে হেলানো একটা ভাবটা আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের অক্ষরের ছাঁচ ঈষৎ জড়ানো রাবীন্দ্রিক, কিন্তু তাঁর ধরনটা তো একটু উল্টো। প্রায়শ কলমে এক খসড়া লিখে পরে টাইপ করতেন। এ নিয়ে তাঁর কৌতুকি মন্তব্য, ‘টাইপে তো তেমন দড় নই আমি, একটা অক্ষর খুঁজতে সময় যায়, আর সেই সুযোগে লেখার পরের অংশটুকু ভেবে নিতে পারি।’ এখানে তিনি যুগপৎ বেদব্যাস ও গণেশ, রচনা করেছেন নিজস্ব মহাভারত!

হাসান আজিজুল হকের হস্তাক্ষরের ছাঁচ রাবীন্দ্রিক, তাঁর স্বাক্ষর দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়, কিন্তু সাধারণের কাছে দুষ্পাঠ্য। খুব কম মানুষই একবারে তাঁর হাতের লেখা পড়তে পারেন। একই রকম দুষ্পাঠ্য সেলিম আল দীনের হাতের লেখা। কাগজ থেকে কলম পারতপক্ষে তুলতেন না তিনি। সুন্দরতম পাণ্ডুলিপির নমুনা হায়াৎ মামুদের। শুধু রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষরের দিক থেকেই নয়, পৃষ্ঠাসজ্জার দিক থেকেও অমন পাণ্ডুলিপি খুব কম লেখকের দেখা যায়। তাঁর জুড়ি প্রাবন্ধিক অরুণ সেন। পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে তাঁদের তুলনা হতে পারে সমরেশ বসুর সঙ্গে, তবে তাঁর বর্ণমালা একটু ডানে হেলানো। কেউ উদাহরণ হিসেবে লিখেছেন, একেবারে যেন ধান বিছানো! সেই টানে সামান্য মিলসহ সামান্য খানিক প্যাঁচ থাকলেও মাহমুদুল হকের হাতের লেখা দৃষ্টি সুখকর। মোহাম্মদ রফিকের অক্ষরের গড়ন কাছাকাছি, কিন্তু ঈষৎ জড়ানো। নির্মলেন্দু গুণের লেখায় ‘কার’গুলোয় প্যাঁচানো। শহীদুল জহিরের পাণ্ডুলিপিও তাই, দুই পঙ্​ক্তিতে ফাঁকা কম।

কবি ও গদ্যলেখকদের হাতের লেখার সরাসরি কোনো তফাত না করা গেলেও একটা জিনিস মনে রাখা দরকার, গদ্যলেখকদের হয়তো খেয়াল রাখতে হয় এতগুলো বাক্য যিনি কম্পোজ করবেন, তিনি যেন সমস্যায় না পড়েন। কিন্তু লেখার মগ্নতায় সে হিসাব গদ্যলেখক সব সময় রাখতে পারেন কই? তা ছাড়া তাঁর তো কপি করা বা টোকার সুযোগও কম, সেই জন্য কলমের ডগায় কখনো কখনো লাগাম দিয়ে হয়তো দুষ্পাঠ্যতাকে দূরে ঠেলে দেওয়ার প্রয়াস নিতে হয়। তুলনায় কবি অনেক অনেক সময়ে টুকে দেওয়ার সুযোগ পান সাধারণত আট থেকে কুড়ি পঙ্​ক্তির একটি কবিতা। ফলে তা দেখতে সুন্দর। গদ্য লেখায় অক্ষর সব সময়ে ওই সৌন্দর্যের সাম্য রাখতে পারে না। সেদিক থেকে শামসুর রাহমান ও শঙ্খ ঘোষ ব্যতিক্রম। একজনের হাতের লেখা বুদ্ধদেব বসু ঘরানার, অন্যজনের রাবীন্দ্রিক। বলা হয়ে থাকে, সমসাময়িক কালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা ভাষায় সবচেয়ে শব্দ বেশি লিখেছেন। প্রায়শ রুলটানা কাগজে খুদে খুদে অক্ষরে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেছেন, অক্ষরের ছাঁচ প্রায় সর্বত্রই এক। দেবেশ রায়ও তাই, সঙ্গে দুটো পঙ্​ক্তির ওপরে নিচে ফাঁকা জায়গাটা বেশি। তবে খুদে অক্ষরের প্রকৃত নমুনা হুমায়ূন আহমেদ ও মামুন হুসাইন। হাতে নিলেই মনে হবে এত ছোট অক্ষর কী করে পড়ব, কিন্তু পড়তে শুরু করলে অক্ষরে আটকায় না, স্পষ্ট।

কৈশোরে রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষরে শুরু করে সেটি থেকে নিজস্ব হাতের লেখার আলাদা স্টাইলের সবচেয়ে বড় উদাহরণ সত্যজিৎ রায়। শান্তিনিকেতন থেকে মায়ের কাছে লেখা তাঁর কিছু চিঠির হস্তাক্ষর একেবারে রাবীন্দ্রিক। এমনকি রবীন্দ্রনাথের চেয়েও সুন্দর। সেখান থেকে ধীরে ধীরে ‘ই’ ‘ঈ’ ‘উ-কার আর মাত্রার ছাঁচ বদলে তিনি ধীরে ধীরে নিজস্ব হাতের লেখার আলাদা ছাপের দৃষ্টান্ত। এর আগে, দোর্দণ্ড রবীন্দ্র জমানায় তিরিশের প্রধান কবিদের হাতের লেখায় রবীন্দ্রনাথের ছাপ থাকলেও প্রত্যেকেই সেখান থেকে নিজেকে পৃথক করে নেন। ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথের সচিব অমিয় চক্রবর্তী। কাজী নজরুল, সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বুদ্ধদেব বসু—প্রত্যেকেরই অক্ষর রাবীন্দ্রিক ছাঁচের হলেও ভঙ্গিতে পৃথক। তবে একেবারে ভিন্ন জীবনানন্দ দাশ, ওই হাতের অক্ষর ও রচনা কোনোটাই অনুকরণ–অযোগ্য। সে তুলনায় কথাসাহিত্যিকেরা উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম। তারাশঙ্করের হাতের লেখা প্রথমে নাকি একটু খারাপই ছিল, অথচ বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় বা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত বা প্রেমেনের পাণ্ডুলিপি কী সুন্দর! কিছুদিনের চেষ্টায় তারাশঙ্কর যা করলেন, তাতে হাতের লেখা ঈষৎ রাবীন্দ্রিক, বিভূতি মুখোপাধ্যায়েরও। বিভূতিভূষণ আর সতীনাথ পুরোপুরি তা নয়, গড়নে ভিন্ন। একেবারে ব্যতিক্রম সুকুমার রায়, শিবরাম চক্রবর্তী ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওই তিনজন কি সাধে বাঙালির কাকের বাসায় কোকিলের ছা! লেখায় যে আত্মবিশ্বাসের অতিব্যক্তির কথা বলা হয়, অক্ষরের ছাঁচ যেমনই হোক, দৃঢ়তার স্ফুটন সেখানে দারুণ! তবে সেই ঘোরতর রাবীন্দ্রিক কালে শরৎচন্দ্র, তাঁর কাহিনির ক্ষেত্রে যেমন অনেক জায়গাতেই রবীন্দ্রনাথ অনুসারী, হাতের লেখাতেও অনেকটা তাই। ছন্নছাড়া মহাপ্রাণের অনিকেতসুলভ ভাব আর অন্যদিকে নজরুলের বিদ্রোহী রণক্লান্তের অস্থিরতা, তাঁদের হাতের লেখায় সরাসরি না দেগে থাকলেও ঝোঁকের দিকটা কিছুটা হলেও টের পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ঋত্বিক ঘটক সবাইকে ছাড়িয়ে। তাঁর হাতের লেখাও তাঁর মতন সংক্ষুব্ধ ও অস্থির।

বাংলাদেশে চল্লিশের লেখকদের হস্তাক্ষরে রাবীন্দ্রিক প্রভাবও একেবারে নাছোড়। প্রায় সবাই তো কলকাতাফেরত। আহসান হাবীব, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্​, রশীদ করীমের পঙ্​ক্তি বিন্যাসে পৃথক হলেও ওই ধরনের বড় উদাহরণ। ব্যতিক্রম শওকত ওসমান; তাঁর অক্ষরের মাত্রা গড়িয়ে যায় মালার মতন। পঞ্চাশের দ্বিজেন শর্মা, আনিসুজ্জামান, আল মাহমুদ, শওকত আলী, সাইয়িদ আতিকুল্লাহর হাতেও রাবীন্দ্রিক গড়ন, বুদ্ধদেব-বিষ্ণুর মিশেল আবুবকর সিদ্দিকের অক্ষরে।

আমাদের দেশে ষাটের লেখকদের ওপর বুদ্ধদেব বসুর নাছোড় প্রভাবের (মাহমুদুল হক বলেছেন) নমুনা সিকদার আমিনুল হক আর আবদুল মান্নান সৈয়দ আর হুমায়ুন আজাদের হাতের লেখায়ও পড়েছে? মান্নান-সিকদারের গদ্যের পাণ্ডুলিপি সুন্দর, হাতের লেখায় ওই প্রভাব তেমন নেই, বিন্যাসে আছে; আজাদের হাতের লেখার গড়ন তাঁর গদ্যের মতন বুদ্ধদেবীয়ই অনেকখানি। তবে ষাটের লেখকদের ভেতরে হুমায়ুন আজাদই সম্ভবত কাগজে–কলমে আর লিখতেন না এবং কিছু পরে মুহম্মদ নূরুল হুদা—দুজনই কম্পিউটারে। বাকিরা প্রায় সবই আজীবন হাতে লিখেছেন, লিখছেন। হাসনাত আবদুল হাইয়ের অক্ষর ছোট ও জড়ানো; বড় অক্ষরের নমুনা আবুল হাসনাত ও আন্ওয়ার আহমদ।

তিন.

সত্তরের ও পরের গদ্যলেখকদের হাতের লেখায় ষাটে পর্যন্ত রাবীন্দ্রিক আর বুদ্ধদেবীয় টান বা টোন বা গড়ন ছিল, তা মোটামুটি উবে যায়। ষাটের শাকের চৌধুরী, সেলিনা হোসেন ও কায়েস আহমেদের পরে শান্তনু কায়সার, জাহিদ হায়দার আর সৈয়দ মনজুরুল ইসলামই যা কিছুটা রক্ষা করেছেন রাবীন্দ্রিক-আবহ। হরিপদ দত্ত, মঞ্জু সরকার, ওয়াসি আহমেদ, সুশান্ত মজুমদার, ইমদাদুল হক মিলন আর মঈনুল আহসান সাবের—কারও লেখাই সেভাবে অতটা ডানে হেলানো নয়। সুশান্ত ও সাবেরের পাণ্ডুলিপি খুব গোছানো, অক্ষরের গড়নের সঙ্গে পাণ্ডুলিপির পরিচ্ছন্নতায় দেখতে ভালো লাগে। এরপরে লেখকেরা ক্রমশ কম্পিউটারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। পারভেজ হোসেন, সেলিম মোরশেদ, শাহীন আখতারের হাতের লেখা স্পষ্ট, তুলনায় নাসরীন জাহানের লেখা বাঁ দিকে হেলানো ও একটু জড়ানো, অভ্যাস না থাকলে পড়তে একটু কষ্ট হয়। অনায়াসে পাঠযোগ্য শাহাদুজ্জামান, আনিসুল হক, মশিউল আলম, জাকির তালুকদারের অক্ষর। তবে একবার দেখলে চোখ আটকে থাকে ইমতিয়ার শামীমের হস্তাক্ষরে, খুব প্রচলিত ছাঁচের নয় তা, কিন্তু দারুণ দৃষ্টিনন্দন আর স্পষ্ট।

আর যাঁরা লিখতে শুরু করতে না করতেই, ওই লেখাচর্চার একেবারে শৈশবে টেবিলের ওপরে ডেক্সটপ থেকে ঘাড়ে ঝোলানো ল্যাপটপ কম্পিউটার লেখার অংশ করে নিলেন, তাঁদের শুরুর দিকের হাতের লেখাই তো বাংলা ভাষায় লেখকদের হাতের লেখার শেষ নমুনা। এরপর আর তা–ও থাকবে না। সে প্রজন্মের আহমাদ মোস্তফা কামাল, জাফর আহমদ রাশেদ, রাজীব নূর, রাখাল রাহা আর শাহ্​নাজ মুন্নীর হাতের লেখা সুন্দর আর পাণ্ডুলিপি পরিষ্কার। টোকন ঠাকুর রাবীন্দ্রিক হস্তাক্ষরের নমুনাবাহী হলেও সেখানে চঞ্চলতা ভর করে আছে। চঞ্চল আশরাফ বুদ্ধদেবীয়। আলফ্রেড খোকন আর শামীম রেজার অক্ষরের প্রান্ত লাফায়, একটু জড়ানো লাগে। মুজিব মেহদীর অক্ষর ডানে হেলে পড়া। ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ আর সাঈদ হাসান দারার বর্ণ লম্বাটে, অদিতি ফাল্গুনীর অক্ষর সে তুলনায় একটু বড়। মাহবুব মোর্শেদের হাতের ঢেউখেলানো মাত্রার তুলনায় শুভাশিস সিনহার অক্ষর ঈষৎ রাবীন্দ্রিক। হামীম কামরুল হকেরটা শব্দে আর পঙ্​ক্তির মাঝখানে স্থানের যে অভাবে ও লেখার সঙ্গে আগে পরিচয় না থাকলে চোখে লাগে!

এরপর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির কাল কম্পিউটারের অক্ষর গিলে নিয়েছে।

নিবন্ধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন