২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান ও দাপট সেই আন্দোলনের প্রগতিশীল অংশগ্রহণকারীদের অনেককে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছিল। তাঁরা এমন একটা সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন— ‘আমরা কি তাহলে প্রতারিত হলাম? ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত চুলায় এসে পড়লাম?’ এ কথা সত্য যে স্বৈরাচারবিরোধী সেই আন্দোলনে বাম, ডান, মধ্যপন্থার সব ধরনের মানুষ একাকার হয়ে পথে নেমে এসেছিল। চব্বিশের আন্দোলনের সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু আন্দোলনের পরে ডান ও উগ্র ডানপন্থীরা নানা আশ্রয়-প্রশ্রয়-আশকারায় সেই আন্দোলনের ওপরে নিজেদের দখলদারি প্রতিষ্ঠা করার জোরালো দাবি জানায় এবং প্রচেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীল তত্ত্ব-আলোচনায় ধর্ম একটি জটিল এবং অনেকটাই দূরে রেখে দেওয়া বিষয়। আবার চব্বিশের গণ-আন্দোলনে যে ধর্মীয় চেতনায় সিক্ত মানুষের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী জনতাও অংশ নিয়েছে, এটাও দিবালোকের মতো সত্য। কীভাবে এটা সম্ভব হলো?
উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট লেখক সত্যেন সেনকে নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা সেই সত্যটিকে কিছুটা বোঝার চেষ্টা করি। সত্যেন সেন বলেছিলেন, ‘আমাদের লড়াই সেই অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে, যারা ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে সাধারণ মানুষকে একে অপরের শত্রু করে তোলে।’
তাঁকে ধর্মের ব্যাপারে অসংবেদনশীল চলতি ধারার একজন বামপন্থী হিসেবে প্রমাণের জন্য এই বক্তব্যটুকু চাইলে কেউ ব্যবহার করতে পারেন। তবে শুধু এটুকু দিয়ে তাঁকে বিবেচনা করতে গেলে সেটি আমাদের বিপথগামী করতে পারে। কারণ, এর ঠিক আগের লাইনেই আছে, ‘মানুষের পরিচয় হিন্দু, মুসলমান বা খ্রিষ্টান নয়, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। যে সংস্কৃতি মানুষকে ধর্মের নামে বিভাজন করতে শেখায়, তা সংস্কৃতি নয়—তা একটি বিষবৃক্ষ।’ এই অনুচ্ছেদে বাংলাদেশে চর্চিত সরল ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, বরং গভীর ধর্মীয় সম্প্রীতিই মুখ্য।
প্রকৃত সত্যেন সেন কোনটি? সত্যেন সেনকে খণ্ডিত করে পড়লে বিপদ আছে। এ রকম বিপদ ঘটেছিল কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তাঁকে নিজেদের প্রয়োজনের মাপে খণ্ডিত ও ছোট করে অপব্যবহার করেছে। সত্যেন সেনকে জানতে হলে তাঁকে পুরো পড়তে হবে। আগের অনুচ্ছেদটির শেষ লাইনে সত্যেন সেন বলছেন, ‘প্রকৃত দেশপ্রেমিক সে-ই, যে মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ না করে মানুষের সেবা করতে শেখে।’
প্রশ্নটি এভাবে তোলা যেতে পারে, চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সত্যেন সেনের রাজনৈতিক অবস্থান কী হতো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সত্যেন সেনকে আজকের বিভাজনের ভাষায় পড়লে চলবে না। তাঁকে পড়তে হবে তাঁর লেখা, তাঁর ইতিহাসচর্চা এবং তাঁর নৈতিক অবস্থানের ভেতর দিয়ে।
জাতীয়তাবাদ ও ধর্ম—এই দুই পরিচয়পন্থার টানাপোড়েন আমাদের সমাজকে অখণ্ড একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে উঠতে দেয়নি। বহু লেখক-শিল্পীকে তা একটি গোষ্ঠীর রঙে রাঙিয়ে অনেকের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। সত্যেন সেনও এর শিকার হয়েছেন। অতি জাতীয়তাবাদীরা একইভাবে দীর্ঘদিন তাঁকে ব্যবহার করেছেন।
আবার আওয়ামী লীগও মুক্তিযুদ্ধের তকমা এমনভাবে নিজের গায়ে সেঁটে রেখেছিল যে অনেকের পক্ষে দলটির বিরোধিতা করা সম্ভব ছিল না। পাছে তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়ে। এই দ্বিধার টানাপোড়েনে বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পড়তে হয়েছে। আমরা জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে প্রচুর বামপন্থী ব্যক্তি, দল ও সংগঠনের সদস্যকে অংশ নিতে এবং কারফিউর মধ্যে গানের মিছিল নিয়ে বের হতে দেখেছি। আবার অনেককে দেখেছি অভ্যুত্থানের বিরোধিতাও করতে। সত্যেন সেনের প্রকৃত সত্য বুঝতে পারলে এই দ্বিধাবিভক্তির কারণও হয়তো আমরা বুঝতে পারব।
সত্যেন সেন আমাদের মধ্যে নেই। তাই বলে কি এসবের মীমাংসা হবে না? দুঃখজনকভাবে উদীচীর কার্যালয় দুষ্কৃতকারীদের দেওয়া আগুনে পুড়েছে। তাই বলে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেনের বই তো পুড়ে যায়নি।
প্রশ্নটি এভাবে তোলা যেতে পারে, চব্বিশের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে সত্যেন সেনের রাজনৈতিক অবস্থান কী হতো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সত্যেন সেনকে আজকের বিভাজনের ভাষায় পড়লে চলবে না। তাঁকে পড়তে হবে তাঁর লেখা, তাঁর ইতিহাসচর্চা এবং তাঁর নৈতিক অবস্থানের ভেতর দিয়ে।
যাঁরা সত্যেন সেনকে পড়েছেন, তাঁরা জানেন—সত্যেন সেনের সাহিত্যে নৈতিকতা কোনো বিমূর্ত আদর্শ নয়। সেটি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরই একটি কার্যকর রূপ। নৈতিকতা মানে তাঁর কাছে নিছকই ব্যক্তিগত সদ্গুণ নয়, বরং ইতিহাস, জ্ঞান ও ক্ষমতার সঙ্গে মানুষের দায়বদ্ধ সম্পর্ক। তাই তিনি ইতিহাস-বিকৃতি, সাম্প্রদায়িকতা ও বিজ্ঞানবিরোধী চিন্তাকে কেবল তাত্ত্বিক ভুল হিসেবে দেখেননি, নৈতিক অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন।
এই নৈতিক অবস্থান থেকেই সত্যেন সেন ধর্ম ও পরিচয়কেন্দ্রিক রাজনীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, ধর্ম যখন ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পরিসর অতিক্রম করে রাষ্ট্রক্ষমতার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই তা শোষণের যন্ত্রে পরিণত হয়। তবে তাঁর এই সমালোচনা কখনো ধর্মবিদ্বেষী ছিল না।
আলবেরুনী উপন্যাসে সত্যেন সেন মধ্যযুগীয় ইসলামি জ্ঞানচর্চার ভেতরকার যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। এই উপন্যাস থেকে বোঝা যায়, তিনি ধর্মকে নয়, বরং ধর্মের নামে উৎপীড়ক ক্ষমতাকে প্রশ্ন করেছেন।
কেন সত্যেন সেনকে একজন মুসলিম পণ্ডিতের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস লিখতে হলো? কারণ, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশে চর্চিত ও রূপায়িত ধর্মের প্রতি অসংবেদনশীল ধর্মনিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে। তাঁকে আমরা বলতে পারি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক।
আলবেরুনী উপন্যাসটি সত্যেন সেন লিখেছেন জেলে বসে। একটি লেখায় তিনি বলেছেন, জেলে তথ্য-উপাত্ত না পাওয়ায় উপন্যাসটি লেখা তাঁর জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছিল।
কেন সত্যেন সেনকে একজন মুসলিম পণ্ডিতের জীবনীভিত্তিক উপন্যাস লিখতে হলো? কারণ, তিনি ধর্মনিরপেক্ষ। তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতা বাংলাদেশে চর্চিত ও রূপায়িত ধর্মের প্রতি অসংবেদনশীল ধর্মনিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে। তাঁকে আমরা বলতে পারি প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক।
ইতিহাস ও বিজ্ঞান গ্রন্থেও তাঁর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর কাছে সাম্প্রদায়িকতা ঔপনিবেশিক শাসনের একটি কৌশল হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য শোষিত মানুষকে বিভাজিত করা। তাই ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা গ্রন্থে তিনি মুসলমান সমাজকে নিছকই ধর্মীয় পরিচয়ে আটকে রাখেননি, বরং তাদের কৃষক, শ্রমিক, সৈনিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। ইতিহাসের সাম্প্রদায়িক খোপ থেকে এই জনগোষ্ঠীকে উদ্ধার করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।
একইভাবে মসলার যুদ্ধ-এর মতো ঐতিহাসিক উপন্যাসেও সত্যেন সেন ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন, জ্ঞান দখল ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাঠামো উন্মোচন করেন। সেখানে তিনি দখলদার পর্তুগিজদের ভারতবর্ষে উপনিবেশ গড়ার ছবিটি তুলে ধরেন। আর তার পাশাপাশি মুসলমানদের এখানে ব্যবসা করার চিত্রও তুলে ধরেছেন মর্যাদার সঙ্গে।
সত্যেন সেনের ইতিহাসচর্চা কখনো নিরপেক্ষতার ভান করেনি, বরং সচেতনভাবে শোষিত মানুষের পক্ষ নিয়েছে। এ পক্ষাবলম্বনই তাঁকে মার্ক্সবাদী মানবতাবাদের ধারায় স্থাপন করে, যেখানে ইতিহাস মানে ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং মানুষের মুক্তির সংগ্রাম।
তাঁর পাপের সন্তান উপন্যাসটি অভিশপ্ত নগরী উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড বলা চলে। প্রথম খণ্ডে যে অভিশপ্ত জেরুজালেম নগরীর কথা বলা হয়েছে, দ্বিতীয় খণ্ডে সেই নগরী পুনর্গঠনের কাহিনি ফুটে উঠলেও তাকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে মানবপ্রেম। চলতি ধারার প্রগতিপন্থী হলে তিনি ইব্রাহিম নবীর উত্তরসূরিদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ধর্মগুলো নিয়ে কাজ করতেন না। এগুলো ছাড়াও তো পৃথিবীতে আরও অনেক ধর্ম-দর্শন ছিল। তিনি কাজ করেছেন এই কারণেই যে তিনি ভারতবর্ষ ও বাংলার মানুষকে বুঝতে চেয়েছেন। তিনি ধর্মকে কখনোই তথাকথিত মার্ক্সবাদীদের মতো সংকীর্ণ অর্থে নেশার ‘আফিম’ হিসেবে অনুবাদ করেননি, বরং কার্ল মার্ক্সের মতো ‘আফিম’কে ব্যথা নিরাময়ের ওষুধ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, যা অচরিতার্থ স্বপ্নের দুনিয়ায় অতিপ্রয়োজনীয়। এ ছাড়া আমরা দেখেছি তিনি ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা করে পাঠ করতে পেরেছেন যুক্তিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চোখে।
ইসলামপন্থীদের উপস্থিতি নিয়ে বাম ভাবাদর্শী একাংশের যে অস্বস্তি, সে বিষয়ে অসাধারণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় হেফাজতে ইসলামের ভাবাদর্শিক নেতা মাওলানা হোসেন আহমদ মাদানী প্রসঙ্গে সত্যেন সেনের একটি মন্তব্যে।
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা গ্রন্থে মাদানী সম্পর্কে সত্যেন সেন বলেছেন, ‘এটা ১৯২০ সালের কথা, তখন ভারতে খিলাফত আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছে। হোসেন আহমদ মাদানী তাঁর গুরুর সাথে সাথেই খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করলেন। এই আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
‘অসহযোগ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতা মৌলানা আজাদের কাছ থেকে আমন্ত্রণ পেয়ে তিনি কলকাতায় চলে এলেন। এখানে এসে তিনি সম্প্রতি প্রতিষ্ঠিত জাতীয়তাবাদী আরবি মাদ্রাসার পরিচালনার ভার গ্রহণ করলেন। তিনি কলকাতা থেকে সিলেটে চলে যান। সেখানে তিনি হাদিসের অধ্যাপনা কাজ ও সংগঠন পরিচালনায় নিযুক্ত হন। তাঁর জীবনের পরবর্তী ৩০ বছর তিনি সেখানে অধ্যাপনা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে শুধু অধ্যাপনা করেই দিন কাটেনি, সেই সময় থেকে তাঁর আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত হয় এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ সরকার তাঁর ওপর নানা সরকারি নিপীড়ন আরোপ করে। প্রতিটি নির্যাতনের মুখোমুখি হয়ে তাঁর নেতৃত্ব এবং যে সমস্ত উলামা স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে চলছিলেন, তাঁরা আরও দৃঢ় ও আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে ওঠেন। কিন্তু যত বাধাই আসুক না কেন, তিনি কখনো বিচলিত হননি এবং তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সংগ্রামের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।
‘এই সময় সত্য প্রকাশ আর ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার জন্য তিনি বারবার কারাবরণ করেন। কিন্তু কারাবাস তাঁর মনোবলকে দুর্বল করতে পারেনি, বরং সংগ্রামী জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে আরও দৃঢ় করে তোলে।’
এই উদ্ধৃতির গুরুত্ব এখানেই যে সত্যেন সেন একজন আলেমকে মূল্যায়ন করেছেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে, ধর্মপরিচয় দিয়ে নয়। অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনবিরোধী সংগ্রামে অংশগ্রহণই ছিল তাঁর মানদণ্ড। সত্যেন সেনের ২৫০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে শতাধিক আলেমের নাম এসেছে। দেওবন্দপন্থী ১৫ জন আলেমের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ও জীবনালেখ্য লেখা হয়েছে আলাদা করে।
এ কারণেই বলা যায়, জুলাইয়ে সত্যেন সেন ইসলামপন্থীদের উপস্থিতির কারণে আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াতেন বলে মনে হয় না। তিনি দেখতেন, অভ্যুত্থানটি কোন শক্তির বিরুদ্ধে, কার পক্ষে। যদি রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে, যদি ছাত্রহত্যা হয়, যদি ভিন্নমত দমন করা হয়, তবে তিনি সেই শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন—যদি সেই সংগ্রামে ইসলামপন্থীরাও উপস্থিত থাকে।
সব মিলিয়ে প্রশ্নের উত্তর তাই পরিষ্কার, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সত্যেন সেন ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আদর্শগত ঐক্যের কারণে নয়, বরং কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামে উপস্থিত থাকতেন। তিনি ইসলামপন্থীদের কারণে আন্দোলন এড়িয়ে যেতেন না, একই সঙ্গে আন্দোলনের ভেতর থেকেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সংকীর্ণতার মুখোশ খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন।
আবার একই সঙ্গে তিনি ইসলামপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধেও লড়াই চালিয়ে যেতেন। সত্যেন সেনের রাজনীতি ছিল সহাবস্থানের, আত্মসমর্পণের নয়। ধর্মীয় পরিচয়বাদের বিভেদপন্থী রাজনীতি করা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সহাবস্থান থাকা বা না থাকার প্রশ্নেও তাঁর অবস্থান একই যুক্তিতে স্পষ্ট থাকত। তিতুমীরের বিশুদ্ধতাবাদী ইসলামি মতাদর্শ যেমন সত্যেন সেনের দর্শনে প্রতিপক্ষ, তেমনি তিতুমীরের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম তাঁর দর্শনে সহাবস্থানের ক্ষেত্র।
বামপন্থীদের দুটি পক্ষই ধর্মীয় পরিচয়বাদের রাজনীতির বিষয়ে সচেতন। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদী পরিচয়বাদের রাজনীতি নিয়ে তাঁদের অপর অংশটি কি সমান সচেতন? সচেতন হলে এই পরিচয়বাদ রক্ষার নামে কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমর্থন কীভাবে সম্ভব?
সময় ও প্রয়োজনের প্রশ্নে জাতীয়তাবাদী পরিচয়বাদের সঙ্গে সহাবস্থান করতে—সত্যেন সেনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী—বাম ভাবাদর্শীদের দ্বিধান্বিত হওয়ার কথা নয়। কারণ, বাম আন্দোলন মানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ইনসাফ ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো। বাম সংগঠনগুলো অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো এ ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারায় আজ ইনসাফ ও আজাদির মতো শব্দগুলো ধর্মীয় পরিচয়বাদের রাজনীতি করা প্রতারকদের দখলে চলে গেছে।
এই সহাবস্থান ও সংগ্রামের প্রতি সত্যেন সেনের দায়বদ্ধতা যে কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, তা তাঁর জীবনেই প্রমাণিত। ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা গ্রন্থটির প্রকাশকের কথায় মফিদুল হক লিখেছেন, ‘তিনি তখন দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে, নানা ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে শরীরে কিন্তু মনের দিক দিয়ে অজেয় এই চিরসংগ্রামী ব্যক্তিত্ব দুজন সহকর্মীর সাহায্যে মুখে মুখে বলে প্রস্তুত করেছিলেন পাণ্ডুলিপি।’
সব মিলিয়ে প্রশ্নের উত্তর তাই পরিষ্কার, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে সত্যেন সেন ইসলামপন্থীদের সঙ্গে আদর্শগত ঐক্যের কারণে নয়, বরং কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণসংগ্রামে উপস্থিত থাকতেন। তিনি ইসলামপন্থীদের কারণে আন্দোলন এড়িয়ে যেতেন না, একই সঙ্গে আন্দোলনের ভেতর থেকেই সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সংকীর্ণতার মুখোশ খুলে দেওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতেন।
বামপন্থী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সামনে এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। দ্বিধাবিভক্ত উভয় পক্ষের জন্যই এটি এখন বিবেচনার বিষয়। আর সেই বিবেচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি মানদণ্ড সত্যেন সেনের জীবন ও ভাবনা।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।