রেমব্রান্ট। পুরো নাম রেমব্রান্ট হারমেনসজোন ফান রেইন। তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘নাইট ওয়াচের’ গায়ে একটি শিল্ড আছে, সেখানে আঠারোটা নাম খোদাই করা। এই আঠারোজন আমস্টারডামের নাগরিক মিলিশিয়ার সদস্য ছিলেন। ব্যবসায়ী, দোকানদার, পেশাজীবী, যাঁরা শহরের নিরাপত্তায় স্বেচ্ছায় অংশ নিতেন। সপ্তদশ শতকের আমস্টারডামে এটা সামাজিক মর্যাদার বিষয় ছিল। মিলিশিয়ায় থাকা মানে শহরের দায়িত্বশীল নাগরিক। আর সেই মর্যাদা স্থায়ী করার একটা সহজ পথ ছিল, দলের একটা গ্রুপ পোর্ট্রেট আঁকানো, যেটা তাদের সদর দপ্তরে ঝুলবে।
এই আঠারোজনের প্রত্যেকে নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়েছিলেন ছবিতে জায়গা পাওয়ার জন্য। টাকার পরিমাণ এক শ গিল্ডারের কাছাকাছি, কেউ একটু বেশি, কেউ কম। কত দেবেন, সেটা নির্ভর করত ক্যানভাসে কোথায় দাঁড়াবেন তার ওপর। আলোর কাছে দাঁড়াতে চাইলে বেশি, ছায়ায় থাকতে রাজি হলে কম।
এক শ গিল্ডার কি অনেক টাকা? সেই সময়ে আমস্টারডামে একজন দক্ষ কারিগরের বার্ষিক আয় ছিল আনুমানিক আড়াই শ গিল্ডার। অর্থাৎ একটা ছবিতে জায়গা পেতে প্রায় পাঁচ মাসের আয় লাগত। এটা বিলাসিতা, এবং সেই বিলাসিতার বিনিময়ে যা কেনা হচ্ছিল, সেটা আসলে দৃশ্যমানতা।
কিন্তু ক্যানভাসে আঠারোর বেশি মানুষ আছে। ছবির ডান দিকে, প্রায় প্রান্তে, একজন ড্রামবাদক ড্রাম বাজাচ্ছে। শিল্ডে তার নাম নেই। সে টাকা দেয়নি। তাকে বিনা মূল্যে ছবিতে রাখা হয়েছে, সম্ভবত দৃশ্যটাকে জীবন্ত করার জন্য, রেমব্রান্টের নিজের সিদ্ধান্তে। ফলে ইতিহাসের নথিতেও তার নাম পাওয়া যায় না। চার শ বছর ধরে এই মানুষটা ক্যানভাসে আছে, কিন্তু ইতিহাসে নেই।
সে দৃশ্যমান, কিন্তু স্বীকৃত নয়।
২.
শত শত বছর ধরে ইউরোপে শিল্পীর পৃষ্ঠপোষক ছিল দুজন, চার্চ আর রাজা। ইতালিতে পোপ মাইকেলেঞ্জেলোকে সিস্টিন চ্যাপেলের ছাদ আঁকতে বলেছিলেন। স্পেনে রাজা ফিলিপ ভেলাস্কেজকে দরবারি চিত্রকর নিয়োগ করেছিলেন। শিল্পী জানতেন তাঁর ছবি কোথায় যাবে, গির্জায় নাকি প্রাসাদে। এবং কাকে তাঁর সন্তুষ্ট করতে হবে। স্বাধীনতা কম, কিন্তু জীবিকার নিশ্চয়তা ছিল।
ইউরোপের মধ্যে নেদারল্যান্ডসে পুরো ছবিটা এর চেয়ে আলাদা দাঁড়াল। ষোড়শ শতকে ক্যালভিনিস্ট ধর্মসংস্কার এই অঞ্চলের শিল্পকাঠামো ভেঙে দিল। ক্যালভিনিজম ধর্মীয় চিত্রকলাকে সন্দেহের চোখে দেখত। তাদের মতে, ঈশ্বরের ছবি আঁকা মূর্তিপূজার কাছাকাছি। ফলে গির্জায় ছবি রাখার রীতি প্রায় বন্ধ হলো। একই সঙ্গে নেদারল্যান্ডস স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে একটা প্রজাতন্ত্র হলো, যেখানে রাজার বদলে বণিক পরিষদ শাসন চালাত। দরবারি পৃষ্ঠপোষকতাও তাই নেই। শিল্পীর দুটি চিরকালীন আশ্রয়, ঈশ্বর ও রাজা, দুটোই সরে গেল।
তাহলে ছবি কে কিনবে?
সপ্তদশ শতকে ডাচ প্রজাতন্ত্র ইউরোপের সবচেয়ে ধনী বাণিজ্যিক শক্তি। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। ইন্দোনেশিয়া থেকে মসলা, ভারত থেকে কাপড়, জাপান থেকে রুপা আনছে। আমস্টারডাম ইউরোপের আর্থিক রাজধানী। এই সম্পদের ভেতর থেকে একটি নতুন শ্রেণি উঠে এসেছে। জাহাজমালিক, কাপড় ব্যবসায়ী, যাদের হাতে টাকা আছে কিন্তু রক্তে অভিজাত বংশের সিল নেই।
তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রমাণের হাতিয়ার হয়ে উঠল প্রতিকৃতি। আমার ঘরের দেয়ালে আমার ছবি ঝুলছে, এটা একটা সামাজিক ঘোষণার মতো হয়ে দাঁড়াল।
সপ্তদশ শতকে শুধু ডাচ প্রজাতন্ত্রেই আনুমানিক দশ লাখ ছবি আঁকা হয়েছিল, যার বড় অংশ প্রতিকৃতি। তখনকার জনসংখ্যা বিশ লাখের কাছাকাছি। প্রতি দুজনে একটি ছবি। ছবি প্রায় নিত্যপণ্যে পরিণত হয়ে গেল।
প্রথম ছবি, ‘দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ড. নিকোলেস টুল্প’। সপ্তদশ শতকের আমস্টারডামে বিভিন্ন পেশাদার সংগঠন, সার্জন, মিলিশিয়া, বণিক সমিতি, তাদের সদর দপ্তরে একটা দলীয় ছবি ঝোলাতেন। এটা ছিল সাংগঠনিক গর্বের প্রতীক এবং ছবিতে থাকা প্রত্যেক মানুষ নিজের অংশের টাকা দিতেন।
এই বাজারে শিল্পীরা ‘গিল্ড অব সেন্ট লুক’-এর অধীনে সংগঠিত ছিলেন। ঠিক যেমন রুটির দোকানদার বা ছুতোর মিস্ত্রিদের গিল্ড ছিল, শিল্পীদেরও। গিল্ড প্রশিক্ষণ দিত, মান নিয়ন্ত্রণ করত, বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিত। শিল্পী হওয়া মানে একটা স্বীকৃত পেশায় ঢোকা, যার নিয়মকানুন আছে, প্রতিযোগিতা আছে, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ক্রেতা সন্তুষ্ট করার চাপ আছে।
রেমব্রান্ট এই বাজারের ভেতর থেকেই উঠে এসেছিলেন। তিনি লেইডেনের একজন মিলারের ছেলে। পরিবার শ্রমজীবী, অভিজাত না। লেইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন, কিন্তু ছেড়ে দিয়ে ছবি আঁকা শুরু করেন। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে আমস্টারডামের সার্জনদের সংগঠন তাকে বেছে নিল তাদের গ্রুপ পোর্ট্রেটের জন্য, ‘দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ড. নিকোলেস টুল্প, ১৬৩২’।
একজন তরুণ, প্রায় অপরিচিত শিল্পী, আর শহরের সবচেয়ে ক্ষমতাবান পেশাদার গোষ্ঠী তাকে বেছে নিয়েছে। এটাই বলে দেয় এই বাজার কতটা প্রতিযোগিতামূলক আর কতটা সুযোগসন্ধানী। কিন্তু বাজারের যেকোনো ব্যবস্থার মতো এরও অন্ধকার দিক আছে। যেখানে ছবি আঁকা হয় টাকার বিনিময়ে, সেখানে ক্যানভাসে কে থাকবে আর কে থাকবে না, সেটা নিছক শৈল্পিক সিদ্ধান্ত ছাড়াও একধরনের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত।
৩.
এই অর্থনীতি ক্যানভাসের ভেতরে কীভাবে কাজ করে, সেটা দেখা যায় রেমব্রান্টের তিনটি গ্রুপ পোর্ট্রেটে। তিনটি ভিন্ন দশকে আঁকা, তিনটি ভিন্ন পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠীর জন্য। কিন্তু তিনটিতেই একটা প্রশ্ন করা যায়, আলো কাদের ওপর পড়ছে, আর কারা অন্ধকারে?
প্রথম ছবি, ‘দ্য অ্যানাটমি লেসন অব ড. নিকোলেস টুল্প’। সপ্তদশ শতকের আমস্টারডামে বিভিন্ন পেশাদার সংগঠন, সার্জন, মিলিশিয়া, বণিক সমিতি, তাদের সদর দপ্তরে একটা দলীয় ছবি ঝোলাতেন। এটা ছিল সাংগঠনিক গর্বের প্রতীক এবং ছবিতে থাকা প্রত্যেক মানুষ নিজের অংশের টাকা দিতেন।
ডক্টর টুল্পের এই ছবিতে তিনি একটি মৃতদেহের বাঁ বাহুর পেশি ব্যবচ্ছেদ করছেন, এটা তখনকার আমস্টারডামে একটা বার্ষিক আনুষ্ঠানিক ঘটনা ছিল, যেখানে গিল্ডের অনুমতিতে মৃতদেহ কেটে দেখানো হতো এবং শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দর্শক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন।
ছবিতে ডক্টর টুল্পের হাতে ফরসেপস, আলো পড়ছে সেই হাতে আর মৃতদেহের খোলা বাহুতে। চারপাশে সাতজন সার্জন, প্রত্যেকের মুখ স্পষ্ট, তারা ব্যক্তি হিসেবে চেনা যায়।
কিন্তু মৃতদেহটি? ক্যানভাসের সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করে শুয়ে আছে, অথচ সে এই ছবির সবচেয়ে অদৃশ্য মানুষ। অনেক পরে জানা গেছে তার নাম অ্যারিস কিন্ট। একজন দণ্ডিত চোর, সেদিন সকালেই যার ফাঁসি হয়েছিল। ডাচ আইনে শুধু ফাঁসির আসামিদের দেহ ব্যবচ্ছেদের জন্য ব্যবহার করা যেত। জীবিত অবস্থায় সমাজের বাইরে, মৃত অবস্থায় ছবির ভেতরে, দুই জায়গাতেই নামহীন। ডক্টর টুল্প আলোয়, কিন্ট অন্ধকারে। একজন জ্ঞানের উৎপাদক, আরেকজন জ্ঞানের কাঁচামাল।
রেমব্রান্ট সারা জীবনে তিন শর বেশি এচিং করেছেন এবং এগুলোতেই তার সবচেয়ে স্বাধীন কাজ পাওয়া যায়, কারণ এখানে ধনী পৃষ্ঠপোষকের রুচি মানার চাপ কম। এই এচিংগুলোতে যাঁরা বারবার ফিরে আসেন, তাঁদের কোনো কমিশন নেই, কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই, তাঁদের ছবি কেউ কিনতে আসেনি। ভিক্ষুক। ভবঘুরে। রাস্তার মানুষ।
দ্বিতীয় ছবি, ‘দ্য নাইট ওয়াচ, ১৬৪২’। আলোর খেলা এখানে আরও জটিল। ক্যাপ্টেন কক আর লেফটেন্যান্ট ভান রয়টেনবুর্খ মাঝখানে, সবচেয়ে উজ্জ্বল। বাকিরা বিভিন্ন মাত্রায় আলো-ছায়ায়। নেচার জার্নালের এনপিজে হেরিটেজ জার্নালে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণায় এক্স-রে ইমেজিংয়ের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, ভান রয়টেনবুর্খের পোশাকের ছায়া রেমব্রান্ট প্রথম স্তর থেকেই পরিকল্পিতভাবে বসিয়েছিলেন, পরে যোগ করেননি। কে আলো পাবে আর কে ছায়ায় থাকবে, সেটা শুরু থেকেই স্থির।
রেমব্রান্টের এই আলো-ছায়ার কৌশলকে বলা হয় কিয়ারোস্কুরো। ইতালীয় শব্দ, আলো-অন্ধকার। শিল্প-ইতিহাসে এটা নাটকীয়তার কৌশল হিসেবে পরিচিত। কিন্তু নাইট ওয়াচে কিয়ারোস্কুরো শুধু নাটক না, সামাজিক বক্তব্যও। আলো পাচ্ছে যে টাকা দিয়েছে। ছায়ায় যে কম টাকা দিয়েছে। একদম প্রান্তে, নামহীন, টাকাহীন, ড্রামবাদক।
তৃতীয় ছবি, ‘দ্য সিনডিকস অব দ্য ড্র্যাপার’স গিল্ড, ১৬৬২’। পরিণত বয়সের কাজ। পাঁচজন ব্যক্তি টেবিলে বসে আছেন, সামনে হিসাবের বই। তাদের কাজ ছিল কাপড়ের গুণগত মান যাচাই করা, আমস্টারডামের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ। পাঁচজনই প্রায় সমান আলোয়, সমান মর্যাদায়।
কিন্তু পেছনে একজন দাঁড়িয়ে আছেন, টুপি ছাড়া। বাকি পাঁচজনের মাথায় চওড়া কালো টুপি। ডাচ স্বর্ণযুগে টুপি শুধু পোশাক না, সামাজিক অবস্থানের চিহ্ন। যার টুপি নেই, সে ভৃত্য। পরে জানা গেছে তার নাম ফ্রান্স হেন্দ্রিকসজন বেল। তিনি ছবিতে আছেন, কিন্তু টেবিলে নেই। দাঁড়িয়ে আছেন পেছনে, শারীরিকভাবে একটু উঁচুতে, সামাজিকভাবে সবার নিচে।
তিনটি ছবি, তিন দশক, একই কাঠামো। টুল্পের টেবিলে কিন্ট নামহীন মৃতদেহ। নাইট ওয়াচের শিল্ডে ড্রামবাদকের নাম নেই। সিনডিকসের টেবিলে বেলের জায়গা নেই। ক্যানভাসে তারা আছে, রেমব্রান্ট তাদের রেখেছেন, কিন্তু ক্যানভাসের অর্থনীতিতে তারা গণনার বাইরে।
৪.
কিন্তু রেমব্রান্ট শুধু কমিশনের ছবি আঁকেননি। বলা ভালো, কমিশনের বাইরে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জগৎ এঁকেছেন।
ছবি তৈরি হয় ক্যানভাসে, ক্রেতা কিনে দেয়ালে ঝোলান, সেটা এক কপি, দামি। কিন্তু এচিং, সেটা ভিন্ন জিনিস। ধাতুর পাতে সূক্ষ্ম সুচ দিয়ে ছবি খোদাই করা হয়, তারপর কালি লাগিয়ে কাগজে ছাপ নেওয়া হয়। একটি পাত থেকে অনেক কপি বের করা যায়। ফলে এচিং সস্তা, বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়।
রেমব্রান্ট সারা জীবনে তিন শর বেশি এচিং করেছেন এবং এগুলোতেই তার সবচেয়ে স্বাধীন কাজ পাওয়া যায়, কারণ এখানে ধনী পৃষ্ঠপোষকের রুচি মানার চাপ কম। এই এচিংগুলোতে যাঁরা বারবার ফিরে আসেন, তাঁদের কোনো কমিশন নেই, কোনো পৃষ্ঠপোষক নেই, তাঁদের ছবি কেউ কিনতে আসেনি। ভিক্ষুক। ভবঘুরে। রাস্তার মানুষ।
প্রথম দিকের আত্মপ্রতিকৃতিগুলো একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণের। ভেলভেটের পোশাক, সোনার চেইন, পশমের টুপি, প্রায় অভিজাতের মতো সাজানো। পোশাকগুলো নিজের নয়, স্টুডিওতে রাখা প্রপ; কিন্তু নির্বাচনটা ইচ্ছাকৃত। মিলারের ছেলে নিজেকে দেখাচ্ছেন ক্ষমতাবানের কাতারে। ১৬৩৪ সালে ধনী শিল্প-ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে সাসকিয়া ভান আইলেনবুর্খকে বিয়ে, শুধু প্রেম নয়, সামাজিক উত্থানও। ব্রিস্ট্রাটে তেরো হাজার গিল্ডারে বিশাল বাড়ি।
ডাচ স্বর্ণযুগের চকচকে পৃষ্ঠতলের নিচে এই মানুষগুলো ছিল। আমস্টারডাম তখন ইউরোপের ধনীতম শহরগুলোর একটা, কিন্তু সেই সম্পদ সবার কাছে পৌঁছায়নি। যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিবার, কাজ হারানো কারিগর, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শরণার্থী। সমসাময়িক ডাচ শিল্পে এদের দেখানো হতো প্রায়ই ব্যঙ্গচিত্রে—অলস, মাতাল, হাস্যকর। ইয়ান স্তেন বা আদ্রিয়ান ভান ওস্তাদের ছবিতে গরিব মানুষ মজার বিষয়, করুণার নয়।
রেমব্রান্ট অন্যভাবে দেখলেন। ‘বেগারস রিসিভিং আমস অ্যাট দ্য ডোর অব আ হাউস, ১৬৪৮’-এ একদল ভিক্ষুক বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে, একজন নারী ভেতর থেকে কিছু দিচ্ছেন। ভিক্ষুকদের মুখে লজ্জা নেই, কৃতজ্ঞতার অভিনয় নেই। তারা দাঁড়িয়ে আছে, এটুকুই। দারিদ্র্যের চিহ্ন আছে, কিন্তু দারিদ্র্যকে নাটক বানানো হয়নি।
সবচেয়ে অদ্ভুত কাজটি ১৬৩০ সালের। ‘বেগার সিটেড অন আ ব্যাংক’, রাস্তার ধারে বসে থাকা একজন ভিক্ষুক। জীর্ণ পোশাক, ক্লান্ত চেহারা। কিন্তু সেই ভিক্ষুকের মুখটা রেমব্রান্টের নিজের। তিনি নিজের চেহারা বসিয়ে দিয়েছেন ভিক্ষুকের শরীরে।
কেন? নিশ্চিত করে বলা যায় না। হয়তো ব্যবহারিক কারণ, নিজের মুখ সবচেয়ে সহজলভ্য মডেল, আয়নায় দেখে আঁকা যায়। কিন্তু নির্বাচনটা তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি নিজেকে রাজার পোশাকে আঁকতে পারতেন, সৈনিকের বেশে আঁকতে পারতেন, এঁকেছেনও অন্য ছবিতে। কিন্তু এখানে বেছে নিয়েছেন ভিক্ষুকের শরীর। যে শিল্পী ধনী মিলিশিয়া ক্যাপ্টেনদের আলোয় বসান, তিনি অন্যদিকে নিজেকে রাখছেন সমাজের সবচেয়ে অন্ধকারে থাকা মানুষের পাশে।
কমিশনের বাইরে, বাজারের বাইরে, পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতির বাইরে রেমব্রান্ট নিজের সিদ্ধান্তে আঁকছেন এমন মানুষদের, যাদের ছবি কেউ চায়নি। নাইট ওয়াচে আলো বিক্রি হয়। এচিংয়ে আলো বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে, যাদের সমাজ অন্ধকারে রাখতে চায়, তাদের জন্য।
৫.
এই দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন রেমব্রান্ট নিজে। এবং নিজেকে দেখার ক্ষেত্রে তিনি যা করেছেন, সেটা পশ্চিমা শিল্পের ইতিহাসে তুলনাহীন।
সারা জীবনে আশি থেকে নব্বইটির মতো আত্মপ্রতিকৃতি, তেলরং। এচিং, ড্রয়িং মিলিয়ে। চার দশক ধরে, তরুণ বয়স থেকে মৃত্যুর ঠিক আগপর্যন্ত। কোনো শিল্পী এর আগে বা পরে নিজেকে এতবার, এত দীর্ঘ সময় ধরে, এত নির্মমভাবে দেখেননি।
প্রথম দিকের আত্মপ্রতিকৃতিগুলো একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণের। ভেলভেটের পোশাক, সোনার চেইন, পশমের টুপি, প্রায় অভিজাতের মতো সাজানো। পোশাকগুলো নিজের নয়, স্টুডিওতে রাখা প্রপ; কিন্তু নির্বাচনটা ইচ্ছাকৃত। মিলারের ছেলে নিজেকে দেখাচ্ছেন ক্ষমতাবানের কাতারে। ১৬৩৪ সালে ধনী শিল্প-ব্যবসায়ী পরিবারের মেয়ে সাসকিয়া ভান আইলেনবুর্খকে বিয়ে, শুধু প্রেম নয়, সামাজিক উত্থানও। ব্রিস্ট্রাটে তেরো হাজার গিল্ডারে বিশাল বাড়ি। শিল্পকর্মের সংগ্রহ, ইতালীয় রেনেসাঁর প্রিন্ট, প্রাচ্যের অস্ত্র, বিদেশি শেল, রোমান সম্রাটদের আবক্ষ মূর্তি। আমস্টারডামের শিল্প-বাজারে তিনি তারকা।
১৯৬৮ সালে শুরু হয় রেমব্রান্ট রিসার্চ প্রজেক্ট। একদল শিল্প-ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ছিল জাদুঘরে ‘রেমব্রান্টের’ নামে ঝোলানো ছবিগুলো আসলে কার আঁকা, সেটা যাচাই করা। প্রশ্নটা কেন উঠেছিল? কারণ, রেমব্রান্টের স্টুডিও একটা প্রায় কারখানার মতো চলত। ছাত্ররা তার স্টাইলে আঁকতেন, এতটাই নিখুঁতভাবে যে মাস্টার আর ছাত্রের কাজ আলাদা করা প্রায়ই অসম্ভব।
মাঝবয়সে সুর বদলায়। ১৬৪২ সালে সাসকিয়া মারা গেলেন, উনত্রিশ বছর বয়সে। চারটি সন্তানের তিনটি শৈশবেই মারা গিয়েছিল, শুধু তিতুস বেঁচে ছিলেন। এই সময়ের আত্মপ্রতিকৃতিতে ক্লান্তি ঢুকতে শুরু করেছে, কিন্তু দৃঢ়তা তখনো আছে।
তারপর পতন। ১৬৫৬ সালে রেমব্রান্ট দেউলিয়া ঘোষিত হলেন। ব্রিস্ট্রাটের বাড়ির ঋণ, শিল্পকর্মের ব্যয়বহুল সংগ্রহ, এবং সম্ভবত বাজারের রুচি বদল। ডাচ শিল্প-বাজার তখন মসৃণ, পরিপাটি ছবি পছন্দ করছে। ইয়োহানেস ভারমিরের নীরব ঘরোয়া দৃশ্য, গেরার্ড ডাউয়ের চুলচেরা বিস্তারিত কাজ। রেমব্রান্টের রুক্ষ, পুরু রঙের প্রলেপ, অসমাপ্তের মতো দেখতে তুলির দাগ। এগুলো পুরোনো হয়ে যাচ্ছে। বাড়ি নিলামে গেল। সংগ্রহ বিক্রি হলো। তিনি চলে গেলেন রোজেনগ্রাখটের একটা ছোট ভাড়া বাড়িতে।
এরপরের ঘটনাটা প্রায় উপন্যাসের মতো। পুত্র তিতুস আর সঙ্গিনী হেন্দ্রিকইয়ে স্টফেলস মিলে একটি শিল্পকর্ম ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা খুললেন এবং রেমব্রান্টকে নিয়োগ দিলেন তাদের ‘কর্মচারী’ হিসেবে। কারণটা আইনি, দেউলিয়া ব্যক্তির সম্পত্তি ঋণদাতারা আটক করতে পারে, কিন্তু কর্মচারী হিসেবে তিনি যা তৈরি করবেন, সেটার মালিক ব্যবসাটি, তিনি নিজে নন। যে শিল্পী একসময় আমস্টারডামের শিল্প-বাজারের কেন্দ্রে ছিলেন, তিনি আইনত নিজের ছবির মালিকও আর নন।
১৬৫৯ সালের আত্মপ্রতিকৃতি এই পটভূমিতে আঁকা। পুরোনো পোশাক। ভেলভেট নেই, সোনার চেইন নেই। মুখে বলিরেখা, চোখে এমন কিছু যেটাকে শুধু দুঃখ বললে ছোট করা হয়, বরং একধরনের নিরাবেগ স্বচ্ছতা, যেন নিজেকে দেখার ক্ষেত্রে আর কোনো ভান বাকি নেই। আলো কমে গেছে, কিন্তু দেখা বন্ধ হয়নি।
বৈপরীত্যটা এখানে সবচেয়ে ধারালো। যে মানুষ নাইট ওয়াচে ধনীদের আলোয় বসাতেন, তিনি নিজেই বাজারের ছায়ায় চলে গেলেন। বাজার যাকে ওপরে তুলেছিল, বাজারই ফেলে দিল। কিন্তু ক্যানভাসে তিনি নিজেকে ফেলে দেননি। শেষ জীবনের আত্মপ্রতিকৃতিগুলো বাজারের জন্য আঁকা নয়, কেউ কমিশন দেয়নি। এগুলো নিজের সিদ্ধান্তে, নিজের জন্য আঁকা। বাজার তাঁকে আর দেখতে চাইছে না, কিন্তু তিনি নিজেকে দেখা বন্ধ করেননি। বরং আরও ভেতরে গেছেন। আলো কমে গেছে, কিন্তু সেই কম আলোতেই আগের চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে।
৬.
শেষে একটা স্তর আছে, যেটা রেমব্রান্টের দৃশ্যমানতা-অদৃশ্যতা প্রশ্নকে চূড়ান্ত মোচড় দেয়। এটা আর ক্যানভাসের ওপরের গল্প না, ক্যানভাসের নিচের।
১৯৬৮ সালে শুরু হয় রেমব্রান্ট রিসার্চ প্রজেক্ট। একদল শিল্প-ইতিহাসবিদ ও বিজ্ঞানীর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ছিল জাদুঘরে ‘রেমব্রান্টের’ নামে ঝোলানো ছবিগুলো আসলে কার আঁকা, সেটা যাচাই করা। প্রশ্নটা কেন উঠেছিল? কারণ, রেমব্রান্টের স্টুডিও একটা প্রায় কারখানার মতো চলত। ছাত্ররা তার স্টাইলে আঁকতেন, এতটাই নিখুঁতভাবে যে মাস্টার আর ছাত্রের কাজ আলাদা করা প্রায়ই অসম্ভব। গিল্ড ব্যবস্থায় এটা স্বাভাবিক ছিল, মাস্টারের নামেই কর্মশালার কাজ বিক্রি হতো, ঠিক যেমন আজকের ফ্যাশন হাউসে ডিজাইনারের নামে শত শত কারিগরের কাজ যায়।
দৃশ্যমানতা কি তাহলে শুধু ক্যানভাসের ওপরের স্তরে থাকা? নাকি প্রতিটি ছবির নিচে একটি মুছে-দেওয়া ইতিহাস চাপা পড়ে আছে, যার দিকে আমরা তাকাই না, কারণ দেখার জন্য অন্য ধরনের আলো লাগে?
গবেষণার ফলাফল চমকে দেওয়ার মতো। শত শত ছবি যা দশক দশক ধরে রেমব্রান্টের নামে চলত, সেগুলো ছাত্রের বা কর্মশালার কাজ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আরও চমকপ্রদ যেটা পাওয়া গেছে, সেটা ক্যানভাসের নিচে।
প্রমাণিত রেমব্রান্টের ছবিগুলোতে এক্স-রে আর ইনফ্রারেড রিফ্লেক্টোগ্রাফি ব্যবহার করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন রঙের পরতের নিচে কী লুকিয়ে আছে। আন্ডারপেইন্টিংয়ে কোন কোন রেখা ছিল, যেটা মুছে দেওয়া হয়েছে, কোন কোন মুখ ছিল, যেটা পরবর্তী স্তরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আমরা যে ছবি দেখি, তার নিচে আরেকটি ছবি আছে, আক্ষরিক অর্থেই। কাকে রাখা হয়েছে, কাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের ইতিহাস রঙের স্তরে স্তরে চাপা পড়ে আছে।
এটা দৃশ্যমানতার একটা পূর্ণ স্তরবিন্যাস তৈরি করে।
সবচেয়ে ওপরে, আলোয়, কেন্দ্রে, নামসহ, তারা, যারা টাকা দিয়েছে। তার নিচে—ছায়ায়, প্রান্তে, নামহীন, ড্রামবাদক, মৃতদেহ, ভৃত্য, যারা ক্যানভাসে আছে কিন্তু গণনায় নেই। তার নিচে—কমিশনের বাইরে, বাজারের বাইরে, ভিক্ষুক, গরিব প্রতিবেশী, প্রান্তিক মানুষ, যাদের রেমব্রান্ট নিজের ইচ্ছায় এঁকেছেন। তার নিচে শিল্পী নিজে, যিনি অন্যদের আলো দেন কিন্তু শেষ জীবনে নিজেই ছায়ায়। আর সবার নিচে, ক্যানভাসের তলায়, রঙের পরতে চাপা পড়া মুখ, যাদের অস্তিত্ব শুধু এক্স-রে জানে।
দৃশ্যমানতা কি তাহলে শুধু ক্যানভাসের ওপরের স্তরে থাকা? নাকি প্রতিটি ছবির নিচে একটি মুছে-দেওয়া ইতিহাস চাপা পড়ে আছে, যার দিকে আমরা তাকাই না, কারণ দেখার জন্য অন্য ধরনের আলো লাগে?