হাসান বসরির জীবনকথা
আগুন থেকে আলোর পথে
দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের ‘তাজকিরাত আল-আউলিয়া’ ফারসি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি আকরগ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। মূল বইটির পরিসর অনেক বিস্তৃত, কিন্তু ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ এবং তাসাউফ ও ফারসি সাহিত্যের পণ্ডিত এ জে আরবেরি (১৯০৫-১৯৬৯) এই বইটির একটি অ্যাব্রিজড বা সংক্ষিপ্ত ভার্সন প্রকাশ করেছেন। ২০০০ সালে ইংরেজি ভাষায় এটি ‘মুসলিম সেইন্টস অ্যান্ড মিস্টিক্স’ নামে বের হয়। বইটিতে ৩৮টি এপিসোডে ভাগ করে সুফি সাধক ও তাঁদের জীবনের নানা লোকাতীত ঘটনার উল্লেখ করেছেন আরবেরি। এর একটি এপিসোড বসরার প্রখ্যাত সুফি সাধক হাসান বসরির নামে। সেখান থেকে এই অধ্যায়টি মূলানুগ অনুবাদ করা হয়েছে।
বসরার হাসান, যিনি হাসান বসরি নামে অধিক খ্যাত, তাঁর পুরো নাম—আল-হাসান ইবনে আবিল হাসান আল-বসরি, জন্ম মদিনায়, ২১ হিজরিতে (৬৪২ সাল)। তিনি ইরাকের মাইসান থেকে বন্দী হওয়া এক দাসের পুত্র, যিনি পরে নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সচিব জায়েদ ইবনে সাবিতের একজন অনুগত-মুক্তদাস হয়ে ওঠেন। বসরায় লালিত-পালিত হওয়ার সুবাদে, তিনি নবী (সা.)-এর বহু সাহাবির সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন, যাঁদের মধ্যে, বলা হয়ে থাকে—৭০ জন বদরের যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরিণত বয়সে তিনি তাঁর প্রজন্মের বিশিষ্ট এক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন, খ্যাতি অর্জন করেন—নিজের আপসহীন ধর্মপরায়ণতা এবং উচ্চপদস্থদের পার্থিব ভোগবিলাসের বিরুদ্ধে চাঁছাছোলা সমালোচনার কারণে।
যদিও মুতাজিলা ধর্মতাত্ত্বিকেরা তাঁকে তাঁদের আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দাবি করেন (এবং আমর ইবনে উবায়েদ ও ওয়াসিল ইবনে আতাকে তাঁর শিষ্য গণ্য করা হয়)। তবে হ্যাজিওগ্রাফি বা সুফি জীবনচরিতে তিনি ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ওলি বা সাধক হিসেবে বরণীয় ও শ্রদ্ধার। হাসান মৃত্যুবরণ করেন বসরায়, ১১০ হিজরিতে (৭২৮)। তাঁর অনেক ভাষণ—তিনি ছিলেন তুখোড় এক বক্তা—আর বাণী আরব লেখকদের রচনায় উদ্ধৃত করা হয়েছে এবং তাঁর বেশ কিছু চিঠিপত্রও সংরক্ষিত রয়েছে।
বসরার হাসান যেভাবে পাল্টে গেলেন
বসরার হাসানের রূপান্তরের সূচনা হয়েছিল এভাবে। তিনি ছিলেন একজন রত্ন ব্যবসায়ী, আর লোকে তাঁকে ডাকত—‘মুক্তার কারবারি হাসান’। তিনি বাণিজ্য করতেন বাইজান্টিয়ামের (রোম সাম্রাজ্য) সঙ্গে, আর সিজারের সেনাপতি ও মন্ত্রীদের সঙ্গে ছিল লেনদেনের সম্পর্ক। একবার বাইজান্টিয়াম যাওয়ার পর, তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলেন আর কিছুক্ষণ তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতা করলেন। ‘আমরা একটা বিশেষ স্থানে যাব,’ মন্ত্রী তাঁকে বললেন, ‘যদি আপনি সম্মত থাকেন’। ‘আপনি যা বলবেন সেটাই হোক।’ হাসান উত্তরে বললেন। ‘আমি রাজি’। তখন মন্ত্রী হাসানের জন্য একটা ঘোড়া আনানোর আদেশ দিলেন। তিনি মন্ত্রীর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়লেন, আর তাঁরা রওনা হলেন।
যখন তাঁরা মরুভূমিতে পৌঁছালেন হাসান দেখলেন বাইজান্টীয় ব্রোকেডের একটা তাঁবু—রেশমের দড়ি ও সোনালি খুঁটি দিয়ে বাঁধা, মাটিতে শক্ত করে গাড়া। তিনি এর একপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তখন এক বিরাট সেনাবাহিনী, সবাই পূর্ণ রণসাজে সজ্জিত, বের হয়ে এল, তাঁরা তাঁবুটিকে প্রদক্ষিণ করল, কিছু কথা বলল, আর প্রস্থান করল। তারপর প্রায় ৪০০ জন দার্শনিক ও পণ্ডিত সেই দৃশ্যে আবির্ভূত হলেন, তাঁরাও তাঁবুটিকে প্রদক্ষিণ করলেন, কিছু কথা বললেন, আর প্রস্থান করলেন। তারও পর সাদা দাড়িওয়ালা ৩০০ জন জ্যোতির্ময় প্রবীণ তাঁবুটির নিকটে এলেন, সেটাকে প্রদক্ষিণ করলেন, কিছু কথা বললেন, আর প্রস্থান করলেন। তার পরপর দুই শতাধিক চাঁদ-সুন্দর কন্যা—প্রত্যেকে সোনা ও রুপা আর মূল্যবান রত্নভরা থালা হাতে—তাঁবুটির চারপাশ ঘুরল, কিছু কথা বলল, আর প্রস্থান করল।
হাসান বর্ণনা করেন—বিস্মিত ও অভিভূত হয়ে, নিজেকেই নিজে তিনি প্রশ্ন করছিলেন, এটা কী হতে পারে! ‘আমরা যখন নামলাম,’ তিনি বলতে থাকেন, ‘আমি মন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি জানালেন—সিজারের এক পুত্র ছিল অনির্বচনীয় যার রূপ, বিদ্যার সকল শাখায় নিখুঁত আর পৌরুষের পরীক্ষাক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর পিতা তাঁকে সবটুক হৃদয় দিয়ে ভালোবাসতেন।’ হঠাৎ সে অসুস্থ হয়ে পড়ে—মন্ত্রীর বরাতে হাসান যেমনটা বর্ণনা করেন। অভিজ্ঞ সব চিকিৎসকও তাঁকে সুস্থ করে তুলতে অক্ষম প্রমাণিত হয়। শেষ পর্যন্ত, সে মারা যায় আর ওই তাঁবুতেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। বছরে একবার মানুষ আসে তাঁকে দর্শন করতে।
প্রথমে, বিশাল এক সেনাবাহিনী তাঁবুটিকে চক্কর দেয়, আর তারা বলে: ‘ও রাজপুত্র, তোমার ওপর যে পরিস্থিতি নেমে এসেছে, সেটা যদি যুদ্ধের ময়দানে ঘটত, তবে তোমাকে মুক্ত করে আনতে আমরা সবাই আমাদের প্রাণ উৎসর্গ করতাম। কিন্তু তোমার ওপর যে বিপর্যয় আপতিত, সেটা এমন একজনের হাত থেকে এসেছে, যাঁর বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করতে পারি না, যাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতেও আমরা অক্ষম।’
এই তাঁরা বলেন, আর তাঁরা ফিরে যান।
তারপর দার্শনিক ও পণ্ডিতেরা এগিয়ে এসে বলেন, ‘এই পরিস্থিতি এমন একজনের মাধ্যমে আনীত, যাঁর বিরুদ্ধে আমরা বিদ্যা ও দর্শন, বিজ্ঞান আর কূটতর্ক দিয়ে কিচ্ছু করতে পারি না। কেননা, দুনিয়ার সব দার্শনিক তাঁর সামনে ক্ষমতাহীন, আর সব পণ্ডিত তাঁর জ্ঞানের পাশে অজ্ঞ। না হয়, আমরা এমন কৌশল উদ্ভাবন করতাম আর এমন কথা বলতাম, সৃষ্টিজগতের কেউ-ই যার প্রতিরোধ করতে পারত না।
এই তাঁরা বলেন, আর তাঁরা ফিরে যান।
এরপর এগিয়ে আসেন সেই মান্যবর মুরব্বিরা, আর বলেন: ‘ও রাজপুত্র, তোমার ওপর আপতিত এই পরিস্থিতি যদি প্রবীণদের মধ্যস্থতায় ঠিক করা যেত, তাহলে আমরা সবাই বিনীত প্রার্থনা নিয়ে সুপারিশ করতাম। আর তোমাকে সেখানে ফেলে রেখে যেতাম না। কিন্তু তোমার ওপর এই পরিস্থিতি এমন একজনের কাছ থেকে এসেছে, যাঁর বিরুদ্ধে মরণশীল কোনো মানুষের সুপারিশই কাজে আসে না।’
এই তাঁরা বলেন, আর তাঁরা ফিরে যান।
এবার চাঁদসুন্দর কন্যারা সোনা ও মূল্যবান রত্নভরা থালা হাতে এগিয়ে আসেন, তাঁরাও তাঁবুটিকে চক্কর দেন, আর বলেন: ‘সিজারের পুত্র, তোমার ওপর আপতিত এই দশা যদি ঐশ্বর্য ও রূপ দিয়ে সামাল দেওয়া যেত, আমরা নিজেদের উৎসর্গ করতাম আর অঢেল অর্থ দিয়ে দিতাম, আর তোমাকে এভাবে ফেলে রেখে যেতাম না। কিন্তু তোমার ওপর এই পরিস্থিতি এমন একজনের কাছ থেকে এসেছে, যাঁর ওপর সৌন্দর্য বা সম্পদের কোনো প্রভাব নেই।’
এই তাঁরা বলেন, আর তাঁরা ফিরে যান।
এরপর স্বয়ং সিজার তাঁর প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে তাঁবুতে ঢোকেন, আর বলেন: ‘ও তোমার পিতার চক্ষু আর প্রদীপ, ও তোমার পিতার হৃদয়ের ফল, ও তোমার পিতার প্রাণের প্রিয়তম—তোমার পিতার হাতে আর কী-ইবা করার আছে? তোমার পিতা বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে এসেছেন, তিনি এনেছেন দার্শনিক ও পণ্ডিত, সুপারিশকারী ও উপদেষ্টা, রূপসী কন্যা, ধনসম্পদ আর সব রকমের বিলাস—আর তিনি এসেছেন নিজেও। কিন্তু এ পরিস্থিতি এমন একজনের আনীত, যার সম্মুখে তোমার পিতা এসব সরঞ্জাম নিয়ে—এই সেনাবাহিনী ও লোকলশকর, এই বিলাস ও ঐশ্বর্য আর ধনভান্ডার—ক্ষমতাহীন। শান্তি বজায় থাকুক তোমার ওপর, আগামী বছর পর্যন্ত!’
এই তাঁরা বলেন, আর তাঁরা ফিরে যান।
মন্ত্রীর কথাগুলো হাসানের মনে এতটাই দাগ কাটল যে তিনি প্রায় হতবাক হয়ে পড়লেন। তক্ষুনি তিনি ফেরার তোড়জোড় শুরু করলেন। বসরায় ফিরে এসে তিনি এই বলে শপথ নিলেন—চূড়ান্ত গন্তব্য নিশ্চিত হওয়ার আগপর্যন্ত এ পৃথিবীতে তিনি আর কখনো হাসবেন না। এরপর ইবাদত আর কঠোর সাধনায় তিনি নিজেকে এমনভাবে নিক্ষেপ করলেন যে—তাঁর সমসাময়িক কেউই সেই শৃঙ্খলা ও একনিষ্ঠতাকে অতিক্রম করতে পারেনি।
বসরার হাসান ও আবু আমর
বর্ণিত আছে—আবু আমর, কোরআন পাঠরীতির প্রধান বিশেষজ্ঞ, একদিন কোরআন শিক্ষা দিচ্ছিলেন, সে মুহূর্তে কোত্থেকে এক সুদর্শন কিশোর এসে তাঁর পাঠচক্রে যোগ দিল। আবু আমর তাঁর দিকে অনুচিত দৃষ্টিতে তাকালেন, আর ঠিক তখনই তিনি পুরো কোরআন ভুলে গেলেন। এক আগুন তাঁকে আচ্ছন্ন করল আর তিনি পুরোপুরি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেন। এমন এক অবস্থায় তিনি শরণাপন্ন হলেন বসরার হাসানের আর খুলে বললেন নিজের দুরবস্থার কথা। ‘ইমাম,’ কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বললেন, ‘এই হলো অবস্থা। আমি পুরো কোরআনই ভুলে গেছি।’ হাসান তাঁর অবস্থা শুনে গভীর ব্যথিত হলেন। ‘এখন হজের মৌসুম,’ তিনি বললেন। ‘যাও আর হজ পালন করে এসো। যখন সেটা শেষ করবে, খায়েফের মসজিদে যেয়ো। সেখানে তুমি দেখতে পাবে এক বৃদ্ধ লোক মিহরাবে বসে আছেন। কিন্তু তাঁর একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটিয়ো না, বরং তিনি নিজ থেকে অবসর না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে তাঁর মতো থাকতে দিয়ো। তারপর তাঁকে বোলো—তোমার জন্য দোয়া করতে।’
আবু আমর সেই অনুযায়ী কাজ করলেন। মসজিদের এক কোণে বসে, তিনি এক শ্রদ্ধেয় বৃদ্ধকে দেখতে পেলেন—যাকে ঘিরে একদল মানুষ গোল হয়ে বসে আছে। কিছু সময় অতিবাহিত হলো, তারপর এক ব্যক্তি এলেন, পরনে দাগহীন সাদা পোশাক। লোকেরা তাঁর সামনে পথ ছেড়ে দিল, তাঁকে অভিবাদন জানাল, আর নিজেদের মধ্যে আলাপ করতে লাগল। যখন নামাজের সময় হলো, সেই ব্যক্তি চলে গেলেন আর লোকেরাও তাঁর সঙ্গে উঠে গেল, ফলে সেই বৃদ্ধ একা হয়ে রইলেন।
আবু আমর তখন তাঁর কাছে গিয়ে সালাম দিলেন। ‘আল্লাহর দোহাই, আমাকে সাহায্য করুন!’—তিনি অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে নিজের দুর্দশার কথা খুলে বললেন। সেই বৃদ্ধ গভীর উদ্বেগে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালেন। আবু আমর বর্ণনা করেন, ‘তিনি তখনো মাথা নিচু করেননি, এরই মধ্যে কোরআন আবার আমার স্মৃতিতে ফিরে এল। আনন্দে আমি তাঁর পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়লাম।’ ‘কে তোমাকে আমার কাছে আসার পরামর্শ দিয়েছে?’ বৃদ্ধ জানতে চাইলেন।
‘বসরার হাসান,’ আবু আমর জবাব দিলেন।
‘হাসানের মতো ইমাম যার আছে,’ বৃদ্ধ মন্তব্য করলেন, ‘তার আর অন্য কাউকে কেন প্রয়োজন?’ যাহোক, হাসান আমার পরিচয় প্রকাশ করে দিয়েছে। এখন আমিও তাঁর পরিচয় প্রকাশ করব। সে আমার পর্দা ছিন্ন করেছে—আমিও তাঁর পর্দা ছিন্ন করে ছাড়ব। ওই লোকটা, তিনি বলতে থাকলেন, “আসরের নামাজের পর সাদা পোশাকে যে ব্যক্তি ঢুকলেন, আর সবার আগে বের হয়ে গেলেন, আর অন্যরা যাকে ভক্তিভরে শ্রদ্ধা জানাল—ওই লোকটাই ছিল হাসান। প্রতিদিন তিনি বসরায় আসরের নামাজ পড়েন, আর তারপর এখানে আসেন, আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটান, আর মাগরিবের নামাজ পড়তে আবার বসরায় ফিরে যান। হাসানের মতো ইমাম যার আছে, সে কেন আসবে আমার কাছে দোয়া চাইতে?’
বসরার হাসান ও অগ্নি–উপাসক
হাসানের এক প্রতিবেশী ছিল, নাম—সিমিয়ন, সে ছিল একজন অগ্নি–উপাসক। সিমিয়ন অসুস্থ হয়ে পড়ল আর ছিল মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। বন্ধুরা হাসানকে অনুরোধ করল তাকে একবার দেখে আসতে, তিনি গেলেন আর তাকে পেলেন বিছানায় শোয়া অবস্থায়, আগুন ও ধোঁয়ায় সারা শরীর কালচে হয়ে গেছে। ‘আল্লাহকে ভয় করো,’ হাসান তাকে পরামর্শ দিলেন। ‘তুমি তোমার পুরোটা জীবন আগুন আর ধোঁয়ার মধ্যেই কাটিয়ে দিয়েছ। এবার ইসলাম গ্রহণ করো, যাতে আল্লাহ তোমার প্রতি অনুকম্পা করেন।’
‘তিনটি বিষয় আমাকে মুসলমান হওয়া থেকে আটকে রেখেছে,’ অগ্নি–উপাসক জবাব দিল। ‘প্রথমত, তোমরা দুনিয়ার নিন্দা করো ঠিকই, অথচ দিন-রাত দুনিয়াবি জিনিসের পেছনেই ছুটে বেড়াও। দ্বিতীয়ত, তোমরা বলো—মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য, যার মুখোমুখি হতেই হবে, অথচ সেই মৃত্যুর জন্য তোমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। আর তৃতীয়ত, তোমরা বলো—একদিন আল্লাহর দর্শন পাওয়া যাবে, অথচ তোমরা আজ যা কিছু করছ, সেটা তাঁর সন্তুষ্টির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।’
‘এগুলো তাদেরই বৈশিষ্ট্য, যারা সত্যকে জানে’, হাসান মন্তব্য করলেন। ‘এখন বিশ্বাসীরা যদি তোমার বর্ণনা অনুযায়ী আচরণ করে, তবে তোমার কী-ইবা বলার আছে? তারা অন্তত আল্লাহর একত্বকে স্বীকার করে, যেখানে তুমি তোমার সারাটা জীবন আগুনের উপাসনা করেই কাটিয়ে দিয়েছ। তুমি—যে ৭০ বছর আগুনকে পূজা করেছ, আর আমি—যেকোনো দিনই আগুনের পূজা করিনি, আমাদের দুজনকেই যদি জাহান্নামে নিয়ে যাওয়া হয়, তবে জাহান্নাম তোমাকেও গ্রাস করবে, আর আমাকেও। আল্লাহ তোমার দিকে ফিরেও তাকাবেন না, কিন্তু যদি আল্লাহ চান তো ওই আগুনের সামান্য স্পর্ধাও নেই যে আমার শরীরের একটা চুলও পোড়াবে। কারণ, আগুন আল্লাহরই সৃষ্ট এক বস্তু, আর সৃষ্টি সর্বদা তার স্রষ্টার আদেশের অধীন। এখন আসো, তুমি, যে ৭০ বছর আগুনের উপাসনা করেছ, চলো আমরা দুজনেই ওই আগুনের ভেতর হাত রাখি, তখন তুমি নিজের চোখেই দেখবে পাবে আগুনের অসারতা আর আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতা।’
এই কথা বলে, হাসান আগুনের মধ্যে তাঁর হাত ঢুকিয়ে দিলেন আর সেখানেই সেটা স্থির রাখলেন। তাঁর শরীরের একটা কণাও আক্রান্ত বা দগ্ধ হলো না। যখন সিমিয়ন এটা দেখল সে বিমূঢ় হয়ে পড়ল। সত্য জ্ঞানের ঊষা উদয় হতে শুরু করল। ‘সত্তরটা বছর আমি আগুনের উপাসনা করেছি,’ সে কাতরে উঠল। ‘এখন মাত্র একটা বা দুটো নিশ্বাস বাকি আছে। কী করব আমি এখন?’ ‘মুসলিম হয়ে যাও’, জবাব ছিল হাসানের। ‘তুমি যদি আমাকে এটা লিখিত দাও যে আল্লাহ আমাকে শাস্তি দেবেন না,’ সিমিয়ন বলল, ‘তবেই আমি বিশ্বাস স্থাপন করব। কিন্তু যে পর্যন্ত না লিখিত আকারে পাচ্ছি, আমি বিশ্বাস করব না।’
হাসান এই কথা লিখে দিলেন। ‘এবার বসরার ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীদের আদেশ দাও তাদের সাক্ষ্য যোগ করতে।’ সাক্ষীরা ডকুমেন্টটা সত্যায়িত করলেন। এরপর সিমিয়ন প্রচুর কাঁদলেন আর বিশ্বাস আনার ঘোষণা দিলেন। তিনি হাসানকে তাঁর অন্তিম ইচ্ছার কথা জানালেন। ‘যখন আমি মারা যাব, তাদেরকে বলো আমাকে যেন গোসল করানো হয়, তারপর নিজ হাতে তুমি আমাকে মাটির কাছে সোপর্দ করবে, আর এই ডকুমেন্টটা রাখবে আমার হাতে। এই ডকুমেন্টই হবে আমার প্রমাণ।’ হাসানের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করে, তিনি বিশ্বাসের সাক্ষ্য পাঠ করলেন আর মারা গেলেন। তারা তাঁর দেহ গোসল করাল, জানাজার নামাজ পড়াল, আর তাঁর হাতের ভেতর ডকুমেন্টটা রেখে তাকে সমাহিত করল। সেই রাতে নিজের এই কাজের কথা ভাবতে ভাবতে হাসান ঘুমিয়ে পড়লেন।
‘ডুবতে থাকা একজন মানুষকে আমি কী করে উদ্ধার করি, যখন দেখছি আমি নিজেই ডুবে যাচ্ছি? যেহেতু নিজের ভাগ্যের ওপরই আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আল্লাহ কী করবেন, সেটা নির্ধারণ করার দুঃসাহস আমি কেন দেখালাম?’ এই ভাবনা নিয়ে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। স্বপ্নে তিনি সিমিয়নকে দেখলেন মোমের মতো ঝিকমিক করছে, তাঁর মাথার ওপর মুকুট, মূল্যবান পোশাকে সজ্জিত, জান্নাতের উদ্যানে এক চিলিক হাসিমুখে তিনি হেঁটে বেড়াচ্ছেন।
‘তুমি কেমন আছ, সিমিয়ন?’ হাসান জানতে চাইলেন। ‘কেন জিজ্ঞেস করছ? নিজের চোখেই তো তুমি দেখতে পাচ্ছ,’ সিমিয়নের উত্তর। ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান তাঁর অসীম অনুগ্রহে আমাকে টেনে নিয়েছেন তাঁর কাছে, আর সদয়ভাবে দিয়েছেন আমাকে তাঁর দর্শন। যে আনুকূল্য তিনি আমার ওপর বর্ষণ করেছেন সেটা সব বর্ণনার অতীত। তুমি তোমার প্রতিশ্রুতির সম্মান রক্ষা করেছ, তাই তোমার ডকুমেন্টটা ফেরত নিয়ে যাও। আমার একে আর কোনো প্রয়োজন নেই।’
যখন হাসানের ঘুম ভাঙল, তিনি দেখলেন সেই চর্মলিপিটি তাঁর হাতে। ‘মালিক মাওলা’, তিনি কেঁদে ওঠলেন, ‘আমি নিশ্চিত জানি যে আপনার অসীম করুণা ব্যতিরেকে আপনার কর্মের অন্য কারণ নেই। আপনার দুয়ারে এসে কখনো কি কেউ লোকসানে পড়ে? ৭০ বছরের এক গ্যাব্রকে (অগ্নি-উপাসক) কেবল একটামাত্র উচ্চারণের বিনিময়ে আপনি দান করেছেন আপনার নৈকট্য। তাহলে ৭০ বছরের একজন বিশ্বাসীকে আপনি বঞ্চিত করবেন কী করে?