ভূপেন হাজারিকার গানে মানুষের হাহাকার

ভূপেন হাজারিকার (৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬–৫ নভেম্বর ২০১১) আলোকচিত্র অবলম্বনেপ্রথম আলো গ্রাফিকস

নদী বয়ে যাচ্ছে। দুই পারে মানুষের বসতি। কিন্তু সেখানে গরিবি, খিদে, বঞ্চনা। নাগরিক সেবা নেই, মৌলিক অধিকার যেন অলীক বস্তু। নদী তবু বয়ে যায়। মানুষের দুঃখ–দুর্দশা তার স্রোত থামিয়ে দিতে পারে না। একদিন নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে একজন প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন—তুমি এত ‘নির্লিপ্ত’ কেন?

প্রশ্নটি আসলে নদীর জন্য নয়, আমাদের জন্য। সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য, আমাদের বিবেকের জন্য।

এমন অস্বস্তিকর প্রশ্ন করার এবং সেই প্রশ্নের মীমাংসার দাবি করা মানুষটির নাম ভূপেন হাজারিকা। তাই তাঁকে শুধু গায়ক, গীতিকার বা সুরকার বললে পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি এমন একজন শিল্পী, যাঁর গান শুনতে শুনতে শ্রোতা নিজের অজান্তেই সমাজের আয়নার সামনে দাঁড়ায়; ভাঙাচোরা প্রতিকৃতি দেখতে পায়, দেখে চমকে ওঠে!

ভূপেন হাজারিকার গানে যেমন নদী আছে, আছে নদীপারের ক্ষুধার্ত মানুষ; প্রেম আছে, ‘প্রেমহীন’ সমাজের বিরুদ্ধে আছে তীক্ষ্ণ উচ্চারণ। তাঁর গান কখনো চোখে বালুকণা পড়ার মতো অস্বস্তি দেয়, কখনো আবার চোখ খুলে দেয়।

মহান এই শিল্পীর জন্মের শতবর্ষে তাঁকে নিয়ে শত শত কথাও বলার পরও নিশ্চিত ‘অন্তরে অতৃপ্তি রবে’। এ কারণেই তাঁর গান কালোত্তীর্ণ।

গান যখন মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়, গানকে সাধারণত আনন্দ-বিনোদনের অনুষঙ্গ ভাবতেই অভ্যস্ত আমরা। ভূপেন হাজারিকা সেই আনন্দকে অস্বীকার করেননি; কিন্তু একই সঙ্গে তিনি গানকে আরও গভীরতর ‘ভাষা’ দিয়েছেন। গানকে তিনি মানুষের জীবনসংগ্রাম, সাম্য ও মানবিকতার ভাষায় পরিণত করেছেন। তাই তাঁর গানে প্রেম, প্রকৃতি, বিরহ বা আনন্দ—কোনো কিছুই জীবনের রূঢ় বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। তাঁর শিল্পপরিক্রমার কেন্দ্রে মানুষ, সমাজ এবং অবধারিতভাবে সমাজ-রাষ্ট্রের অসংগতি নিয়ে নিবিড় নিনাদ। বলার কথাটি হলো—মানুষ ক্ষুধার্ত থাকলে গান কি সেই ক্ষুধাকে এড়িয়ে যাবে? শ্রমিক তাঁর ন্যূনতম মর্যাদাটুকু না পেলে শিল্প কি তবু সৌন্দর্যের বন্দনাই করে যাবে? রাষ্ট্র তার নাগরিকের সঙ্গে অন্যায্য করলে শিল্পী কি নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকবেন—স্থাণুবৎ, প্রতিক্রিয়াহীন? কুসুম কুসুম প্রেম, কোমল কোমল ভালো লাগার গান গাইবেন? ভূপেন হাজারিকা আমাদের আপাত আড়ালে পড়ে থাকা এই প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে দেন।

ভূপেন হাজারিকা
ইনস্টাগ্রাম থেকে

‘মানুষ মানুষের জন্যে, জীবন জীবনের জন্যে’—গানের এই পঙ্‌ক্তি মূলত একটি নীতিবাক্যই বটে। কিন্তু ভূপেন তাঁর গায়কির মাধ্যমে শ্রোতার মনে সহানুভূতি চাগিয়ে দেন; আবার পাথরকঠিন এ প্রশ্নও তোলেন—মানুষ হয়েও যদি মানুষের পাশে না দাঁড়াই, তবে মানুষ হওয়ারই–বা অর্থ কী?

ভূপেনের মানবতাবাদ দয়ার নয়, সমমর্যাদার। তাঁর গানে মানুষের অধিকারের কথা, সমতার দাবি বারবার, ঘুরেফিরে এসেছে। সে কারণেই তাঁর গান সামাজিক ‘স্থিতিশীলতার’ মধ্যে হঠাৎ এক ধাক্কার মতো এসে লাগে; যেন হড়পা বান।

মিসিসিপি থেকে ব্রহ্মপুত্র–গঙ্গা

১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সাদিয়ায় জন্ম ভূপেন হাজারিকার। পড়াশোনা বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পাঠ্যবই ছিল ‘পৃথিবী’—মানুষের জীবন, জীবনের সংগ্রাম। দেশে ফিরে তিনি ভারতীয় গণনাট্য সংঘে (আইপিটিএ) যুক্ত হন। ফলে তাঁর শিল্পচর্চা আরও প্রত্যক্ষভাবে গণমুখী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে সংযুক্ত হওয়ার রসদ পায়।

ভূপেন হাজারিকা তাই শুধু গান লিখতেন না, জীবনের ভাষা খুঁজতেন। লোকসুরে শুনতেন ইতিহাস, নৌকার চলনে দেখতে পেতেন জীবনযাত্রা, নদীর বয়ে চলায় দেখতেন সভ্যতার নীরব সাক্ষ্য, শ্রমিকের ঘামে সভ্যতা নির্মাণের কাহিনি। তারই শাঁস ও সারে সমৃদ্ধ করেছেন নিজের শিল্পজগৎ। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ভূপেনের পরিচয় হয় কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কণ্ঠ পল রোবসনের সঙ্গে। রোবসন শিল্পকে সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে ভূপেন গভীরভাবে উপলব্ধি করেন—গান মানুষের কষ্টের কথা বলতে পারে, কণ্ঠ বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে, সুর ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে। রোবসনের বিখ্যাত ‘Ol’ Man River’-এ মিসিসিপি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শ্রম, বেদনা ও সংগ্রামের ইতিকথা। রোবসনের বিখ্যাত এই গানকে ভূপেন অনুবাদ করেননি; বরং তার অন্তর্নিহিত বেদনা, প্রতিবাদ ও নদীর প্রতীকী উপস্থাপনাকে ভারতীয় বাস্তবতায় নতুন করে রূপ দিয়েছিলেন। মিসিসিপির দীর্ঘশ্বাস তাঁর গানে এসে মিশেছিল ব্রহ্মপুত্রের জলে, গঙ্গার স্রোতে। জন্ম নিয়েছিল ‘বিস্তীর্ণ দুপারের, অসংখ্য মানুষের হাহাকার শুনেও…।’

লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে
ইনস্টাগ্রাম থেকে

শ্রমিকের ঘাম, মানুষের মর্যাদা

যে মানুষটি শহর গড়ে তোলায় হাত লাগান, তিনি হয়তো সেই শহরে জায়গা পান না। যে কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, তাঁর নিজের ঘরে হয়তো তিন বেলা উনুনে হাঁড়ি চড়ে না। যে শ্রমিক আকাশচুম্বী ভবন খাড়া করতে দিনরাত শ্রম দেন, তিনি হয়তো কোনো দিন সেই ভবনের মালিকানা পান না।

সভ্যতার ইতিহাসের পাটাতন দাঁড়িয়ে মূলত সাধারণ মানুষের শ্রমে-ঘামে। অথচ ইতিহাস প্রায়ই তাঁদের নাম ভুলে যায়। ভূপেনের গান বিস্মৃত সেই মানুষদের স্মরণ করেছে—করুণার চোখে নয়, মর্যাদার সঙ্গে। তাঁর গানের অন্তর্লীন বক্তব্য যেন একটাই—মানুষের পাশে দাঁড়ানো দয়া নয়, দায়িত্ব। একজন মানুষের অধিকার কেন আরেকজনের দয়ার ওপর নির্ভর করবে?

অনেক ‘রাজনৈতিক গান’ নির্দিষ্ট সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। অনেক ‘প্রতিবাদী গান’ কালোত্তীর্ণ হতে পারে না। ভূপেনের গান টিকে আছে, টিকে থাকবে। কেননা তাঁর গান শোষণ, বৈষম্য, নিপীড়ন ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু তাঁকে শুধু প্রতিবাদী গায়ক বললে তাঁর শিল্পের ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। তাঁর কণ্ঠে পৃথিবী বদলের আকাঙ্ক্ষা যেমন ধ্বনিত হয়েছে, প্রেম-বিচ্ছেদও তাঁর গানে জায়গা করে নিয়েছে।

কখনো কখনো গানও অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে, যদি তা মানুষের চিন্তা বদলায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, মানুষকে সাহস দেয়। ভূপেনের গান সেই অর্থে উদাসীনতা, ভীতি ও বিভেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র। তিনি যেন শ্রোতাকে বলেন, শুধু দর্শক হয়ে থেকো না; পৃথিবীতে যা ঘটছে, তা তোমারও বিষয়। কারণ, তুমি মানুষ।

এক শতাব্দীতে পৃথিবীর অনেক কিছু বদলে গেছে। মানুষের হাতে স্মার্টফোন, সহযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা; যোগাযোগ ঘটে চোখের পলকে, তথ্য ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। কিন্তু মানুষের মৌলিক অধিকারের খামতি কতটা পূরণ হয়েছে? এসব নিয়ে প্রশ্নগুলো কি বদলে গেছে?

শৈশবেই ভূপেন গীতিকার আনন্দীরাম দাস, পার্বতী প্রসাদ বড়ুয়া ও কমলানন্দ ভট্টাচার্যের মাধ্যমে স্থানীয় বরগীত, গোয়ালপাড়ার গান, চা–মজদুরের গান, বিহুগীতসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন ও প্রভাবিত হন। পরবর্তীকালে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জ্যোতিপ্রসাদের প্রভাব পড়েছিল ভূপেনের মনে। হিন্দুস্তানি ক্ল্যাসিক্যাল সংগীত ও উচ্চাঙ্গ নৃত্যের ওস্তাদ বিষ্ণুপ্রসাদ রাভার হাত ধরেই সংগীতে পথচলা শুরু হয় ভূপেনের
ইনস্টাগ্রাম থেকে

বহু মানুষ আজও খিদে পেটে ঘুমাতে যায়। নানা প্রান্তে চলছে যুদ্ধ-সংঘাত। জাতি ও ধর্মের নামে মানুষ হত্যা জায়েজ করার চেষ্টা আছে। শ্রমের ন্যায্য মূল্য নিয়ে প্রশ্ন উবে যায়নি। বঞ্চনার বন্দোবস্তও ভেঙে পড়েনি। তাই ভূপেনের গান পুরোনো হয়নি; ‘নতুন’ পৃথিবীতে তাঁর প্রশ্নগুলো আরও বরং প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

ক্ষমতাবানের মুখ বদলায়, শোষকের পোশাক বদলায়; কিন্তু শোষণ থেকে যায়। ভূপেন হাজারিকা তাই বারবার বর্তমানের হয়ে ওঠেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী, উডি গাথরি বা পিট সিগারের মতো গণমুখী ও প্রতিবাদী শিল্পীদের বৃহত্তর পরম্পরার সঙ্গে ভূপেনের গানের এক গভীর আত্মীয়তার যোগ আছে। পরবর্তীকালে প্রতুল মুখোপাধ্যায়, কবীর সুমন ও নচিকেতার গানেও মানুষের জীবন, সামাজিক অসংগতি ও প্রতিবাদের স্বর শোনা যায়।

অন্য অনেক পুরস্কার–সম্মাননাসহ ভূপেন হাজারিকা ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘ভারতরত্ন’ (মরণোত্তর, ২০১৯) পেয়েছেন। এটি তাঁর যথাযোগ্য স্বীকৃতির স্মারক, এ কথা ঠিক; কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। তিনি এমন একজন শিল্পী, যিনি গানকে জীবনের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং জীবনকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন গানের মধ্যে। যত দিন একজন মানুষ আরেকজনের দিকে হাত বাড়াবে, যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কেউ প্রশ্ন তুলবে, তত দিন কোথাও না কোথাও শোনা যাবে তাঁর কণ্ঠ—‘বিস্তীর্ণ দুপারের…।’

মানুষের পক্ষে।

মানুষের জন্য।

হাসান ইমাম, কবি, সাংবাদিক।