মুক্তিযুদ্ধের কবির এক শতক

কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ যেন চিরযৌবনের প্রতীক। ব্যক্তিজীবন, কবিতা, সমাজ ও রাষ্ট্র—প্রতিটি ক্ষেত্রে বশ্যতার নিয়ম ও আধিপত্যবাদী দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর বিদ্রোহ। বিট–প্রজন্মের নেতা ও ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের বিরোধী এই কবি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দাঁড়িয়েছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে। লিখেছিলেন তাঁর অমর কবিতা ‘যশোর রোডে সেপ্টেম্বর’। ৩ জুন এই কবির জন্মশতবর্ষ পূর্ণ হলো। তাঁর প্রতি বিনত শ্রদ্ধা।

নাসির আলী মামুনের ধারণ করা অ্যালেন গিন্সবার্গের আলোকচিত্র অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

অ্যালেন গিন্সবার্গ নিজের খোলামেলা জীবনযাপন দিয়ে এমনই এক ব্যক্তিত্ব গড়ে তুলেছিলেন, যেন তাঁর বয়স যৌবনেই আটকে থাকবে, কখনোই আর বাড়বে না। কবিতায় কাঁচা আবেগের প্রকাশে, অকপট জীবনাচারে, মানুষের মুক্তির জন্য বিশুদ্ধ ক্ষোভের বিস্ফোরণে তিনি ছিলেন জলজ্যান্ত যৌবনের প্রতীক। ৩ জুন বিশ শতকের স্মরণীয় ও চিরযৌবনশীল এই কবির জন্মের একটি শতক পূর্ণ হলো। তবে শততম জন্মবর্ষেও তাঁর যৌবনময়তা অবিশ্বাস্য বিস্ফোরক ও সংক্রামক।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের বিশ্বসাহিত্যে এমন কবি খুব কমই আছেন, যিনি একই সঙ্গে কবি, প্রতিবাদী বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক বিদ্রোহী এবং মানবিক বিবেকের প্রতীক হয়ে উঠতে পেরেছেন। অ্যালেন গিন্সবার্গের নাম উচ্চারণ করলেই যেমন মনে পড়ে বিট জেনারেশন, ‘হাউল’ বা ভিয়েতনামে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের কথা; তেমনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি চিরজীবিত হয়ে আছেন মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে লেখা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটির জন্য।

অ্যালেন গিন্সবার্গের জন্ম ১৯২৬ সালের ৩ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। বাবা শিক্ষক ও কবি লুই গিন্সবার্গ আর মা নাওমি গিন্সবার্গ দুজনই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় কর্মী। মা কিশোর বয়সে তাঁকে পার্টির বৈঠকে নিয়ে যেতেন। ছোট বয়স থেকেই তাই শ্রেণিবৈষম্য, শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মতো বিষয় তাঁর মনকে প্রশ্নমুখর করে তুলেছিল। পরবর্তী জীবনে তিনি হয়ে ওঠেন মার্কিন ধনতন্ত্র, যুদ্ধবাদ, যৌন রক্ষণশীলতা ও রাষ্ট্রীয় আমলাতন্ত্রের প্রবল সমালোচক। কৈশোরেই তিনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে রাজনৈতিক চিঠিপত্র লিখতেন। যৌবনে এসে এমন এক সাহিত্য আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের অনুগত মধ্যবিত্ত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আমূল বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সেই আন্দোলন খ্যাতি পায় বিট জেনারেশন নামে।

জ্যাক কেরুয়াক ও উইলিয়াম বারোজদের সঙ্গে অ্যালেন গিন্সবার্গ গড়ে তুলেছিলেন এক নতুন সাহিত্যিক ভাষা ও ভঙ্গিমা। সাহিত্য তাঁদের কাছে ছিল জীবনযাপনেরই সম্প্রসার—অকপট, ঝুঁকিপূর্ণ, কখনো বিশৃঙ্খল; কিন্তু জীবন্ত। গিন্সবার্গের নিজের জীবনও ছিল তেমনই। জীবন যাপন করতেন একান্তই সাদামাটা—খুদে একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, পরতেন পুরোনো কাপড়ের দোকান থেকে কেনা ব্যবহৃত বস্ত্র। কিন্তু তাঁর চিন্তা ও কণ্ঠ ছিল ক্ষমতার সমস্ত রকমের প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিস্ফোরক ও বিপজ্জনক।

১৯৫৬ সালে প্রকাশিত গিন্সবার্গের দীর্ঘ কবিতা ‘হাউল’ যুক্তরাষ্ট্রের সাহিত্যে রীতিমতো ভূমিকম্প ঘটিয়ে দেয়। কবিতাটিতে তিনি মার্কিন ধনতন্ত্র, যান্ত্রিকতা, যুদ্ধোন্মাদনা এবং মানুষের আত্মিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তীব্র, কাঁচা ও রুক্ষ ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। তাঁর অকপট উচ্চারণ রক্ষণশীল সমাজকে বিক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত করে তোলে। পুলিশ কবিতাটির কপি বাজেয়াপ্ত করে। তাঁর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার মামলা হয়। আদালত শেষ পর্যন্ত রায় দেন ‘হাউল’ অশ্লীল নয়। রায় দিতে গিয়ে বিচারক ক্লেটন ডব্লিউ হর্ন প্রশ্ন তোলেন, ‘নিজের শব্দভান্ডার গুটিয়ে এনে কাউকে যদি কেবলই নিরীহ, নিষ্প্রাণ ও লুকোচুরির ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে গণমাধ্যমের ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বলে কি আর কিছু থাকবে?’ সেই মামলা গিন্সবার্গকে শুধু বিশ্বজোড়া খ্যাতিই এনে দেয়নি, যুক্তরাষ্ট্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হয়ে উঠেছিল।

নিজের অ্যাপার্টমেন্টে অ্যালেন গিন্সবার্গ। নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৯৩
ছবি: নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম
গিন্সবার্গ যশোর রোডে বাংলাদেশি শরণার্থীশিবির দেখতে যান ৯ সেপ্টেম্বর। সেই যাত্রায় তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তিনজন। একজনের নাম কবিতাটির মধ্যেই আছে—‘সুনীল পোয়েট’, মানে পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাকি দুজন কারা? সুনীল লিখেছেন, ‘একজন বিদেশি পর্যটক ও কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের একটি সুদর্শন বুদ্ধিমান যুবক—এঁদের দুজনেরই নাম মনে করতে পারছি না।’ (‘একটি অসাধারণ কবিতা’, কবিতা কার জন্য?) গিন্সবার্গের কবিতাসমগ্রে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার পাদটীকা থেকে জানা যাচ্ছে, সেই বিদেশি পর্যটক একজন মার্কিন বৌদ্ধ ছাত্র, কবি জন গিয়োর্নো।

অ্যালেন গিন্সবার্গের জীবনে আধ্যাত্মিক উন্মেষেরও গভীর প্রভাব পড়েছিল। ১৯৪৮ সালে উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা পড়তে গিয়ে তাঁর এক দিব্যোন্মাদনার অভিজ্ঞতা হয়। তাঁর মনে হয়েছিল, ব্লেক তাঁকে নিজের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন। পরে তিনি এই ঘটনাকে ‘ব্লেক ভিশন’ বা ‘ব্লেক–অন্তর্দর্শন’ নাম দেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবন ও কবিতাকে গভীরভাবে বদলে দেয়। এর আরও গভীরতর প্রভাব পড়ে তাঁর ভারত ভ্রমণের অভিজ্ঞতার পর। ১৯৬০–এর দশকে তিনি ভারতে এসে দীর্ঘ সময় বসবাস করেন। থাকেন কলকাতা ও বারানসিতে। এই সময়ে তিনি বৌদ্ধধর্ম ও প্রাচ্যের দর্শনে আকৃষ্ট হন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর কবিতাকে আরও ধ্যানী ও মানবমুখী করে তোলে।

তবে এই সবকিছু ছাপিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে অ্যালেন গিন্সবার্গের নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সংস্পর্শের কারণে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম গণহত্যা ও নিপীড়নের কারণে লাখ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। সেপ্টেম্বর মাসে গিন্সবার্গ আসেন কলকাতায়। সেখান থেকে যান বনগাঁ-বয়ড়া সীমান্তের শরণার্থীশিবিরে। যশোর রোডজুড়ে তিনি দেখেছিলেন মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ—বন্যা, কলেরা, অনাহার, মৃত্যুপথযাত্রী শিশু, মাথায় অসুস্থ স্বজন বহন করে চলা উদ্বাস্তু মানুষের অন্তহীন মিছিল।

অ্যালেন গিন্সবার্গকে কলকাতা যাওয়ার টাকা দিয়েছিলেন ব্রিটেনের জনপ্রিয় রক ব্যান্ড রোলিং স্টোনসের কিথ রিচার্ডস। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও প্রশাসন বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। কিন্তু সেখানকার সাধারণ মানুষের মধ্যে সমর্থনের জোয়ার জেগেছিল বাঙালিদের প্রতি। আর সেটি সম্ভবপর করে তুলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কবি-শিল্পী-অধিকারকর্মীরা। কিথ রিচার্ডসের প্রত্যাশা ছিল, কলকাতায় গিয়ে অ্যালেন গিন্সবার্গ ‘গৃহযুদ্ধের ছোবল থেকে পালানো বাংলাদেশের কোটি মানুষের মর্মান্তিক দুর্দশার ছবি তুলে ধরবেন’।

গিন্সবার্গ যশোর রোডে বাংলাদেশি শরণার্থীশিবির দেখতে যান ৯ সেপ্টেম্বর। সেই যাত্রায় তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন তিনজন। একজনের নাম কবিতাটির মধ্যেই আছে—‘সুনীল পোয়েট’, মানে পশ্চিমবঙ্গের কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বাকি দুজন কারা? সুনীল লিখেছেন, ‘একজন বিদেশি পর্যটক ও কলকাতার বাংলাদেশ মিশনের একটি সুদর্শন বুদ্ধিমান যুবক—এঁদের দুজনেরই নাম মনে করতে পারছি না।’ (‘একটি অসাধারণ কবিতা’, কবিতা কার জন্য?)

গিন্সবার্গের কবিতাসমগ্রে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার পাদটীকা থেকে জানা যাচ্ছে, সেই বিদেশি পর্যটক একজন মার্কিন বৌদ্ধ ছাত্র, কবি জন গিয়োর্নো। শরণার্থীশিবিরে গিয়োর্নো গিন্সবার্গের ছবিও তুলেছিলেন। তেমন একটি ছবি গিন্সবার্গের ওয়েবসাইটে যত্ন করে রাখা আছে। বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাটির অবশ্য কোনো পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

শরণার্থীশিবিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা কোনোক্রমেই মধুর ছিল না। সুনীল লিখেছেন, ‘আমরা যখন যাই, তখনো সীমান্তে বিদেশিদের গমনাগমন নিষিদ্ধ হয়নি বটে, কিন্তু তখন ওখানে বন্যার দাপট চলছে। বনগাঁ শহরের মধ্যেই বড় রাস্তায় একহাঁটু জল, বয়ড়ার রাস্তায় নৌকা চলছে—শরণার্থীশিবিরের মধ্যেও জলস্রোত। তাতে অবশ্য ওই বেপরোয়া কবি নিরস্ত হননি। ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে আমরা জলের মধ্যেই হাঁটতে শুরু করি—প্রথমে পাৎলুন গুটিয়ে, তারপর মায়া ত্যাগ করে সর্বাঙ্গ ভিজিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘুরেছিলাম, কখনো কখনো নৌকায় কিছু পথ ঘুরেছি—ডাব ও সিগারেট ছাড়া আর কোনো খাদ্যপানীয় ছিল না।’

‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার বক্তব্য ছিল সরাসরি। টনি লিখেছেন, ‘গিন্সবার্গ শরণার্থীদের খাদ্যাভাবের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও তুলেছেন, ভিয়েতনামে বিরামহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন তহবিলের টাকা ওই লাখ লাখ নিরাশ্রয় শিশুকে সাহায্যের জন্য কেন ব্যয় করা হবে না।’ কবিতাটিতে জায়গা করে নিয়েছিল শরণার্থীদের আরও নানা দুর্দশার ছবি, অজানার পথে লাখো নিরাশ্রয় লোকের দেশত্যাগের মর্মন্তুদ বর্ণনা, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধনীতির কঠোর সমালোচনা।

বাংলাদেশি শরণার্থীদের যে দুর্ভোগ গিন্সবার্গ দেখতে পান, তার বিশদ বিবরণ কবিতাটিতে উঠে আসে। ওই সময়ে গিন্সবার্গ কবিতাও লিখছেন এক অদ্ভুত উপায়ে। যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি সম্পর্কে সোচ্চার প্রথাবিরোধী এই কবি তখন চষে বেড়াচ্ছেন পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আর যা কিছু দেখছেন, টেপরেকর্ডারে ধরে রাখছেন সব। বিট সাহিত্য গবেষক টনি ট্রিজিলিও জানিয়েছেন, ‘কবির তাৎক্ষণিক ভাবনা বলা হয়ে যাচ্ছিল টেপরেকর্ডারে। একই সঙ্গে রেকর্ড হয়ে যাচ্ছিল চারপাশের আওয়াজ আর গাড়ির রেডিওতে চলতে থাকা খবর।’ (এনসাইক্লোপিডিয়া অব বিট লিটারেচার, সম্পাদনা: কুর্ট হেমার) সুনীলও লিখেছেন একই কথা, ‘অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে একটা টেপরেকর্ডার ছিল, সর্বক্ষণ খোলা, যেকোনো ব্যাপারে তাঁর প্রতিক্রিয়া টেপরেকর্ডারকে শোনাচ্ছিলেন, কখনো আমরা সবাই মিলে যা আলোচনা করেছি, তা-ও টেপ-নিবদ্ধ হয়।’

টেপে শরণার্থীশিবির নিয়ে গিন্সবার্গের অভিজ্ঞতারও বর্ণনা আছে। তিনি বলছিলেন, ‘খড়ের মতো দোকানপাট দিনভর খাদ্যের জন্য ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। বাতাসে বিষ্ঠা, খাবার আর বিড়ির গন্ধ একাকার। ঝুম বৃষ্টি, মহামারি, কলেরা। অনেক ফলকওয়ালা বর্শাহাতে একটি লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। দরিদ্র বাসিন্দা ও শরণার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা। “তোমাদের আচার–আচরণ জমিদারের মতো।” দরিদ্র গ্রামবাসীর প্রতি শরণার্থীদের অভিযোগ। গ্রামবাসীরও পাল্টা অভিযোগ, “শরণার্থীরা আমাদের বাড়ির একেবারে সামনে প্রস্রাব–পায়খানা করছে।”’

‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতার বক্তব্য ছিল সরাসরি। টনি লিখেছেন, ‘গিন্সবার্গ শরণার্থীদের খাদ্যাভাবের বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও তুলেছেন, ভিয়েতনামে বিরামহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য মার্কিন তহবিলের টাকা ওই লাখ লাখ নিরাশ্রয় শিশুকে সাহায্যের জন্য কেন ব্যয় করা হবে না।’ কবিতাটিতে জায়গা করে নিয়েছিল শরণার্থীদের আরও নানা দুর্দশার ছবি, অজানার পথে লাখো নিরাশ্রয় লোকের দেশত্যাগের মর্মন্তুদ বর্ণনা, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামে মার্কিন যুদ্ধনীতির কঠোর সমালোচনা।

‘আ রিভাইভ্যাল অব পোয়েট্রি অ্যাজ সং: অ্যালেন গিন্সবার্গ, রক অ্যান্ড রোল, অ্যান্ড দ্য রিটার্ন টু দ্য বার্ডিক ট্র্যাডিশন’ শিরোনামের এক লেখায় গিন্সবার্গের আরেক গবেষক কেটি এম স্টিফেনসন বলছেন, ‘কলকাতায় যে মানুষদের গিন্সবার্গ দেখতে পেয়েছিলেন, “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” কবিতায় তিনি তাদের কণ্ঠস্বর দিতে চাইলেন। কবিতাটির মধ্য দিয়ে পৌঁছুতে চাইলেন বৃহত্তর পরিসরে ছড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপ্ত জনতার কাছে। তাদের কাছে নগ্ন করে দিতে চাইলেন এই রাষ্ট্রের কপটতা: ন্যূনতম প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত রেখে পৃথিবীর অসংখ্য মানুষকে যে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, অথচ ভিয়েতনামে খরচ করছে যুদ্ধের পেছনে।’

কলকাতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে কী করলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ? কেটি স্টিফেনসন দিচ্ছেন এক মজার তথ্য—‘১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে ফিরে এসে গিন্সবার্গ যাঁর সঙ্গে দেখা করতে উন্মুখ হয়ে উঠলেন, তিনি এজরা পাউন্ড নন, জন লেনন। তিনি তড়িঘড়ি করে সাইরাক্যুসে ছুটলেন। ওখানে ছিল জন লেনন আর ইয়োকো ওনোর অ্যাপার্টমেন্ট। জন লেননকে “সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড” পড়ে শোনালেন। “সংগীতশিল্পীটির দুচোখ বেয়ে যখন অশ্রু গড়াতে শুরু করল”, তিনি অনুভব করলেন, কবিতাটি ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছে।’

কবিতার সেই আসরে গিন্সবার্গ তাঁর সদ্য রচিত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ পড়ে শোনালেন। সেখানে যোগ দিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গের বিট দলের কবি-বন্ধুরাও—গ্রেগরি করসো, অ্যান ওয়াল্ডম্যান, পিটার অর্লভস্কি, কেনেথ কচ, এড স্যান্ডার্স, মাইকেল ব্রাউনস্টাইন, ডিক গ্যালাপ আর রন প্যাজেট। ২০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় সেন্ট জর্জেস এপিস্কোপাল চার্চে বসল এ আসর। ‘আমেরিকানস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন এর আয়োজন করল। তারা জানাল, এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে সবাইকে জানানো এবং বাংলাদেশের জন্য একটি ত্রাণ তহবিল গড়ে তোলা।’

একটি কবিতা লিখেই অ্যালেন গিন্সবার্গ বসে রইলেন না। মার্কিন চেতনার গভীরে বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার কথা কী করে পৌঁছানো যায়, এ দুর্দশা দূর করতে কীভাবে মার্কিন জনতাকে সক্রিয় করে তোলা যায়—সে ভাবনায় তিনি অস্থির হয়ে রইলেন। একটি কবিতা পাঠের আয়োজন করলেন তিনি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন প্রতিপক্ষ ও প্রবলভাবে বিবদমান। নিউইয়র্কের সেই কবিতার আসরে যুক্তরাষ্ট্রের কবি গিন্সবার্গ আর রুশ কবি আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি হয়ে উঠলেন মধ্যমণি। ইয়েভগেনি ইয়েতুশেঙ্কো আর আন্দ্রেই ভজনেসেনস্কি তত দিনে সোভিয়েত ইউনিয়নে এক জোড়া কিংবদন্তিতুল্য নাম হয়ে উঠেছেন। কবিতার নতুন ভাষায়, যৌবনের দাপটে, ব্যঙ্গ আর পরিহাসে তরুণসমাজকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছেন তাঁরা। একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে গিন্সবার্গ আর ভজনেসেনস্কি বিশ্বকে বার্তা দিলেন, রাষ্ট্র যা-ই ভাবুক বা করুক, কবিরা আছেন বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে। রাষ্ট্রের সীমান্তরেখার সব বাধা পেরিয়ে কবিরা আছেন পৃথিবীর সব নিপীড়িত মানুষের হাত ধরে।

কবিতার সেই আসরে গিন্সবার্গ তাঁর সদ্য রচিত কবিতা ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ পড়ে শোনালেন। সেখানে যোগ দিয়েছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গের বিট দলের কবি-বন্ধুরাও—গ্রেগরি করসো, অ্যান ওয়াল্ডম্যান, পিটার অর্লভস্কি, কেনেথ কচ, এড স্যান্ডার্স, মাইকেল ব্রাউনস্টাইন, ডিক গ্যালাপ আর রন প্যাজেট। ২০ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় সেন্ট জর্জেস এপিস্কোপাল চার্চে বসল এ আসর। ‘আমেরিকানস ফর বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন এর আয়োজন করল। তারা জানাল, এ আয়োজনের উদ্দেশ্য ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে সবাইকে জানানো এবং বাংলাদেশের জন্য একটি ত্রাণ তহবিল গড়ে তোলা।’

একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত হলো ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। প্রকাশের পরপরই ব্যাপক সাড়া। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবিদের মধ্যেও সে ঢেউ এসে লাগল। কবি বেলাল চৌধুরী এই তথ্য দিয়েছেন যে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই ভারতে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতাটি ব্যবহার করে একটি পোস্টার বের করা হয়। পোস্টারটির দামের জায়গায় ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘বাংলাদেশের শরণার্থীদের পুনর্বাসনে অংশ নিতে স্বেচ্ছায় যতটা সম্ভব সহযোগিতা করুন।’ এর বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা শরণার্থীদের তহবিলে জমা পড়ে। (গীনসবার্গের সঙ্গে, নির্মলেন্দু গুণ)

গিন্সবার্গ নিজেও কবিতাটির প্রেমে পড়েছিলেন। এই কবিতার প্রতি তাঁর দুর্বলতা কখনোই শেষ হয়ে যায়নি। নানা কবিতার আসরে এটি তিনি পড়ে শুনিয়েছেন। এ কবিতায় পরে সুর দেওয়া হয়। কবিতাপাঠের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্রসহযোগে প্রায়ই এটি তিনি পরিবেশন করেছেন। এমনকি কোনো কোনো আসরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ গেয়ে শোনানোর পর্বে গিন্সবার্গের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন গান লিখে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জেতা গায়ক বব ডিলান। বাংলায় অনুবাদ করেও এ কবিতা গানে বাঁধা হয়েছে। সেটি করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিক, তারেক মাসুদ পরিচালিত ছবি মুক্তির গান-এর জন্য। সে অনুবাদ অবশ্য পূর্ণাঙ্গ ছিল না। ছবির জন্য প্রয়োজনীয় কিছু অংশের ভাষান্তর করেছিলেন তিনি। মৌসুমীর বহু আগে বাংলায় কবিতাটির প্রথম ও তৃপ্তিকর অনুবাদটি করেছিলেন অকালপ্রয়াত কবি-লেখক খান মোহাম্মদ ফারাবী। তবে কোনো এক রহস্যময় কারণে তিনিও তাঁর অনুবাদে মূল কবিতার দু–তিনটি চরণ ছেঁটে দিয়েছিলেন।

অ্যালেন গিন্সবার্গের জীবন ছিল বিতর্কে ভরা। কিন্তু তাঁর কবিতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর এক দুর্মর আকাঙ্ক্ষা। তিনি বুঝেছিলেন, কবিতা শুধু কোমল অনুভূতির বিষয় নয়; এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, মানবিকতার পক্ষে সাক্ষ্যেরও ভাষা।

অ্যালেন গিন্সবার্গ এখনো বিশ্বজুড়ে একজন সমাদৃত কবি। তবে বাংলাদেশ তাঁকে বিশেষভাবে মনে রাখবে সেই কবি হিসেবে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সক্রিয় একটি দেশের নাগরিক হয়েও একাত্তরের বাঙালির আর্তিকে নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন।