অসমাপ্ত সেতুর রাজপুত্র

দুই শিল্পী চিতরমান ও নানহার আঁকা সম্রাট শাহজাহান ও যুবরাজ দারা শুকোহর প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

‘শুরু করছি তার নামে যার কোনো নাম নেই।’

—কাদেরি, দিওয়ানে দারা শুকোহ

দারা শুকোহ, একজন পরাজিত রাজপুত্র। ১৬৫৯ সালে আওরঙ্গজেবের হাতে নিহত। মোগল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার–যুদ্ধে তাঁর পরাজয় বিপুল এক সম্ভাবনারও পরাজয়।

কিন্তু সেই পরাজয়ের বাইরে তাকালে দারার আরেকটি জীবন দেখা যায়। তাঁর সময়ে মোগল দরবার ছিল সুফি, সংস্কৃত, হিন্দু, খ্রিষ্টীয় ও ইউরোপীয় নানা জ্ঞানধারার মিলনস্থল। সেই জগতে দারা একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন, মানুষ নানা নামে ডাকলেও সত্য কি এক?

সপ্তদশ শতাব্দীতে সাম্রাজ্য, ধর্ম ও জ্ঞানের কঠোর সীমানার মধ্যে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি ছিল অসাধারণ।

সুফি থেকে উপনিষদ

দারা জন্মেছিলেন ১৬১৫ সালে। শৈশব কেটেছে শাহজাহানের ভারতবর্ষে—তাজমহলের নির্মাণ, শাহজাহানাবাদের উত্থান, পারস্যভাষী দরবারি সংস্কৃতির বিকাশ, শিল্প ও স্থাপত্যের জৌলুশের মধ্যে। সম্রাট আকবরের সময় থেকেই সংস্কৃত জ্ঞানকাণ্ড ফারসি ভাষায় আনার কাজ শুরু হয়েছিল। ফারসি তখন উত্তর ভারত ও বৃহত্তর ইসলামি জগতের একটি প্রধান বৌদ্ধিক ভাষা।

দারা গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন ইসলামের কাদিরিয়া তরিকার সঙ্গে। সুফি–সাধকদের কাছে গিয়ে কথা শুনতেন। খুঁজতেন এমন সত্য, যা ধর্মীয় পরিচয়ের মোটাদাগের সীমানা অতিক্রম করে যেতে পারে। সেই অনুসন্ধান তাঁকে নিয়ে গেল হিন্দু সাধক ও পণ্ডিতদেরও কাছে।

বাবা লাল দাসের সঙ্গে দারার কথোপকথন লিপিবদ্ধ আছে। নিজের পরিচিত সুফি ভাষার মধ্যে তিনি সেই দর্শনের প্রতিধ্বনি খুঁজছিলেন। ‘হিন্দুরা কী বিশ্বাস করে’—এই সরল কৌতূহলের বদলে অনুসন্ধানী প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল, ‘তাঁরা যে সত্যের কথা বলছেন, আমার নিজের ঐতিহ্যের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?’

এই প্রশ্নেরই সবচেয়ে সুন্দর উত্তর তাঁর লেখা বই মজমাউল বাহরায়েন বা দুই সমুদ্রের মিলন। এক সমুদ্র সুফিভাবনা। অন্য সমুদ্র ভারতীয় দর্শন। তিনি দুই সমুদ্রকে এক করে দিতে চাননি। দেখতে চেয়েছিলেন, তাদের পানির স্বাদে মিল আছে কি না। আজ আমরা একে তুলনামূলক দর্শন বা অধিবিদ্যা বলতে পারি।

ঠিক এখানেই দারাকে শুধু ‘হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির প্রতীক’ বলে থামিয়ে দিলে বিষয়টি ঠিক বোঝা যায় না। তিনি আরও কঠিন একটি কাজ করছিলেন। একটি জ্ঞানপ্রথার ধারণাকে অন্য একটি জ্ঞানপ্রথার ভাষায় বুঝতে চাইছিলেন।

যুবরাজ দারা শুকোহ
শিল্পী চিতরমান, ১৬৫৪ (আনুমানিক)
দারার পৃথিবী হিন্দু-মুসলমান, ভারত-পশ্চিম, ইসলাম-খ্রিষ্টধর্মের ছকবাঁধা ও বিভাজিত ছিল না। এই মুসলিম রাজপুত্র উপনিষদের সন্ধান করতেন, জেসুইট পাদরি তাঁর সঙ্গে ধর্মতর্ক করতেন, ফরাসি চিকিৎসকের মাধ্যমে তাঁর কাছে ইউরোপের নতুন দর্শনের খবর এসে পৌঁছাত। এই বহুস্বরের মাঝখানেই দারা ক্রমশ নিজের সবচেয়ে বড় কাজটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

পৃথিবী এক, জ্ঞান বহু

মোগল দরবারে ইউরোপীয়দের উপস্থিতি দারার জন্মের আগেই শুরু হয়েছিল। আকবরের দরবারে জেসুইট পাদরিদের আগমন ঘটেছিল। বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলেও মোগল রাজসভায় ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক চলেছে। শাহজাহানের আমলে ইউরোপীয়দের সঙ্গে মোগল সম্পর্কের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হলেও ইউরোপীয় মিশনারিদের উপস্থিতি বন্ধ হয়নি। দারার সময়েও জেসুইট পাদরিদের সঙ্গে ধর্ম ও দর্শন নিয়ে তাঁর কথাবার্তা হয়েছিল। তিনি জানতে চাইতেন, প্রশ্ন করতেন, অন্যের বিশ্বাস শুনতেন এবং নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে তুলনা করতেন।

ফরাসি চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বারনিয়ে ১৬৫৬ সালে ভারতে এসে দারার দরবারে যুক্ত হন। ইউরোপের সমকালীন দর্শনজগতের মধ্যে তিনি ছিলেন পিয়েরে গ্যাসাদিঁর অনুসারী। সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপে তখন রেনে দেকার্তে, টমাস হবস, গ্যাসাদিঁ প্রমুখের মধ্যে জ্ঞান, বস্তু, আত্মা, ঈশ্বর ও প্রকৃতির স্বভাব নিয়ে নতুন বিতর্ক চলছে।

১৬৬০-এর দশকের গোড়ার দিকে বারনিয়ে মোগল আমির দানিশমন্দ খানের কাছে দেকার্তে ও গ্যাসাদিঁর দর্শন ফারসিতে অনুবাদ করে ব্যাখ্যা করতেন। সেই আলোচনায় উপস্থিত ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সঙ্গে ইউরোপীয় এবং ভারতীয় দর্শন ও ধর্মতত্ত্ব নিয়ে তর্কবিতর্কও হতো। দেকার্তের দর্শন তাঁর মৃত্যুর মাত্র এক দশকের মধ্যেই বারানসির পণ্ডিতদের বৌদ্ধিক পরিসরে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। এই সূত্রে দারার বৌদ্ধিক পরিসর ইউরোপের দর্শনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। ইউরোপ তখন ভাগ্যান্বেষী হয়ে, যুদ্ধবিদ্যা হয়ে, ধর্মতত্ত্ব হয়ে, দর্শন হয়ে মোগল ভারতের ভেতরে ঢুকে পড়ছিল।

দারার এই বহুস্বরের জগতে ছিলেন সরমদ কাশানিও। ইহুদি বংশোদ্ভূত ফারসিভাষী এক মরমি সাধক। তাঁর চিন্তায় ইহুদি ঐতিহ্য, ইসলামি সুফিবাদ ও ভারতীয় দর্শনের নানা স্রোত এসে মিলেছিল। তাঁর শিষ্য অভয় চাঁদ তাওরাতের ফারসি অনুবাদ করেছিলেন।

এই ছিল মোগল ভারতের আরেকটি—আজ অনেকটাই আড়ালে পড়ে থাকা অনন্য চেহারা। দারার পৃথিবী হিন্দু-মুসলমান, ভারত-পশ্চিম, ইসলাম-খ্রিষ্টধর্মের ছকবাঁধা ও বিভাজিত ছিল না। এই মুসলিম রাজপুত্র উপনিষদের সন্ধান করতেন, জেসুইট পাদরি তাঁর সঙ্গে ধর্মতর্ক করতেন, ফরাসি চিকিৎসকের মাধ্যমে তাঁর কাছে ইউরোপের নতুন দর্শনের খবর এসে পৌঁছাত। এই বহুস্বরের মাঝখানেই দারা ক্রমশ নিজের সবচেয়ে বড় কাজটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন।

সম্রাট শাহজাহান তাঁর পুত্র দারা শুকোহর সঙ্গে
শিল্পী নানহা, ১৬২০ (আনুমানিক)
তারপর লাতিন থেকে এই গ্রন্থের জার্মান দর্শন। এই উপনেখাত পড়েছিলেন পশ্চিমের তুখোড় দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার। ইউরোপের এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকের কাছে উপনিষদের যে দরজা খুলে গিয়েছিল, তার একটি ঐতিহাসিক চাবি ছিল দারার ফারসি অনুবাদ। একজন মোগল রাজপুত্রের নিহত হওয়ার প্রায় দেড় শতাব্দী পরে ইউরোপের এক দার্শনিক তাঁর অনুবাদ-প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ভারতীয় মরমি জগতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ইতিহাসে এর চেয়ে সুন্দর পরিহাস খুব বেশি নেই।

মহাগোপন রহস্য

দারা উপনিষদকে ঐশী গ্রন্থে উল্লিখিত ‘কিতাব মকনুন’ বা ‘গুপ্ত গ্রন্থ’-এর সঙ্গে বিচ্ছিন্ন বলে ভাবতেন না। সেই ধারণা থেকে তিনি উপনিষদের ফারসি অনুবাদের কাজে হাত দেন। ১৬৫৭ সালে তাঁর সম্পাদনা ও তত্ত্বাবধানে বারানসির পণ্ডিতদের সহযোগিতায় প্রায় পঞ্চাশটি উপনিষদ সংস্কৃত থেকে ফারসিতে অনূদিত হয়। নাম সিররে আকবর বা মহাগোপন রহস্য। ভারতীয় বুদ্ধিবৃত্তির ইতিহাসে এ এক বিরাট ঘটনা।

এই অনুবাদের অর্থ ছিল ভারতীয় দর্শনের একটি গভীর স্তরকে সেই সময়ের বৃহত্তর ফারসি চিন্তাজগতে তুলে আনা। তাঁর পদ্ধতিটি ছিল অন্যের ধর্মকে দূর থেকে বিচার না করে তার গভীরে প্রবেশ করা। তিনি এ কথা বলেন না যে ‘তোমার সত্য ভুল, আমার সত্য ঠিক।’ তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘তুমি তোমার ভাষায় যে সত্যের কথা বলছ, আমি কি আমার ভাষার ভেতর তার কোনো প্রতিধ্বনি শুনতে পাচ্ছি?’ মজমাউল বাহরায়েন-এ এই অনুসন্ধান একটি দার্শনিক রূপ পেয়েছিল। সিররে আকবর-এ তার আরও গভীর ফল দেখা গেল।

দারা হয়তো জানতেন না যে তাঁর অনুবাদের ভবিষ্যৎ তাঁর নিজের জীবনের চেয়ে অনেক দীর্ঘ হবে।

একটি পাণ্ডুলিপির দীর্ঘ যাত্রা

১৬৫৯ সালে দারা নিহত হলেন। তাঁর রাজনৈতিক স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। কিন্তু থেকে গেল সিররে আকবর। প্যারিসের বিবলিওথেক নাশিওনাল দো ফ্রাঁসে আজও দারার একটি পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। ক্যাটালগে এর মূল মালিক হিসেবে বারনিয়েরের নাম পাওয়া যায়।

আব্রাহাম হায়াসিন্থ আঁকেতিল-দ্যুপেরোঁ সংস্কৃত যথেষ্ট জানতেন না। ১৭৭৫ সালে তিনি সিররে আকবর-এর একটি পাণ্ডুলিপি পেয়ে সেটি অনুবাদ করতে থাকেন। প্রথমে ফারসিতে। পরে লাতিনে। লাতিনে দুই খণ্ডে উপনেখাত ১৮০১-০২ সালে প্রকাশিত হয়।

তারপর লাতিন থেকে এই গ্রন্থের জার্মান দর্শন। এই উপনেখাত পড়েছিলেন পশ্চিমের তুখোড় দার্শনিক আর্থার শোপেনহাওয়ার। ইউরোপের এক গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিকের কাছে উপনিষদের যে দরজা খুলে গিয়েছিল, তার একটি ঐতিহাসিক চাবি ছিল দারার ফারসি অনুবাদ।

একজন মোগল রাজপুত্রের নিহত হওয়ার প্রায় দেড় শতাব্দী পরে ইউরোপের এক দার্শনিক তাঁর অনুবাদ-প্রকল্পের মধ্য দিয়ে ভারতীয় মরমি জগতের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। ইতিহাসে এর চেয়ে সুন্দর পরিহাস খুব বেশি নেই।

দারা শুকোহ এমন এক পৃথিবী কল্পনা করেছিলেন, যেখানে সত্যের কোনো একক ভাষা নেই। ফলে কেউ তার একক মালিকানাও দাবি করতে পারে না। মানুষ পরস্পরের ভাষা শিখতে রাজি হলে দুই সমুদ্রের মধ্যেও সেতু তৈরি হতে পারে। দারার জীবন সেই সেতুর অসমাপ্ত নির্মাণ। দারা দুই সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভারতীয় দার্শনিক-রাজপুত্র।

কবিতা, দর্শন ও অসমাপ্ত জীবন

দারা শুকোহ ‘কাদেরি’ কবি নামে ফারসিতে কবিতা লিখেছেন। দর্শন তাঁর কাছে ছিল মাথার কাজ। অনুবাদ ছিল জ্ঞানের কাজ। আর কবিতা ছিল সেই সত্যের অনুভবের ভাষা। এই তিনটি কাজকে আলাদা করে দেখলে দারাকে বোঝা কঠিন।

দর্শন জিজ্ঞাসা করে, সত্য কী? অনুবাদ জিজ্ঞাসা করে, অন্য মানুষ সেই সত্যকে কী নামে ডাকে? কবিতা জিজ্ঞাসা করে, সেই সত্যকে অনুভব করলে মানুষের ভেতরে কী ঘটে? দারার প্রকল্পের সৌন্দর্য এখানেই।

দারার দুর্ভাগ্যও এখানেই। সব কাজ শেষ করার মতো দীর্ঘ সময় তাঁর হাতে ছিল না।

১৬৫৭ সালে বাদশাহ শাহজাহান অসুস্থ হলেন। দারা, শুজা, মুরাদ ও আওরঙ্গজেব—চার ভাইয়ের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হলো। পিতার পছন্দের উত্তরসূরি দারা পরাজিত হলেন। ১৬৫৯ সালে তাঁকে হত্যা করলেন আওরঙ্গজেব। তাঁর বয়স তখন মাত্র চুয়াল্লিশ বছর।

দারা সম্রাট হলে ভারত ‘অবশ্যই’ অন্য রকম হতো। সেই কল্পনা বিকল্প ইতিহাস। তবু তাঁর কাজের মধ্যে একটি সম্ভাবনা স্পষ্ট। তিনি এমন এক উপমহাদেশীয় আধুনিকতার বীজ বহন করছিলেন, যেখানে ফারসি, আরবি, সংস্কৃত ও ইউরোপীয় জ্ঞান একে অন্যের শত্রু নয়। সেখানে একটি ঐতিহ্য অন্যটির সামনে নিজেকে বন্ধ করে না। অনুবাদ সেখানে ভাষা বদলানোর সঙ্গে পাঠকের বাস্তব জগৎকেও বদলে দেয়।

দারার জীবন দীর্ঘ হলে হয়তো আরও সংস্কৃত গ্রন্থ ফারসিতে অনূদিত হতো। ইউরোপীয় বিজ্ঞান ও ভারতীয় জ্ঞানপ্রথার সংলাপ আরও গভীর হতো। হয়তো কোনো স্থায়ী অনুবাদ-প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠত বাগদাদের বায়তুল হিকমার মতো। আবার হয়তো এসবের কিছুই হতো না।

কিন্তু সম্ভাবনার ভিত্তি ছিল বাস্তব। কারণ, দারার চারপাশে এমন মানুষগুলো তখন সত্যিই ছিলেন। ছিলেন জেসুইটরা। ছিলেন বারনিয়ের, সরমদ। ছিলেন সংস্কৃত পণ্ডিতেরা। তাঁরা দারার বৌদ্ধিক পরিসরে ভারতীয় জ্ঞানকে ফারসি ভাষার সঙ্গে যুক্ত করছিলেন। ছিলেন শিখদের স্বর্ণমন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা সুফি–সাধক মিয়াঁ মীর। আসছিল ইউরোপের নতুন দর্শনেরও খবর।

এই সবকিছুকে ঘিরে ছিল দারা শুকোহর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন উপমহাদেশের সপ্তদশ শতাব্দীর জগৎকে নতুনভাবে দেখতে শেখায়। ইউরোপ ছিল বৃহত্তর বৌদ্ধিক চলাচলের একটি অংশ। মোগল ভারত সেই চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দারার জগতে কেউ কাউকে একতরফাভাবে আবিষ্কার করছে না। মানুষ, বই, চিন্তা বিশ্বসভ্যতার নানা পথে ভ্রমণ করছে। ধারণার অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে অর্থও বদলাচ্ছে। সিররে আকবর-এর ইতিহাস তার উজ্জ্বল উদাহরণ। একটি বইয়ের যাত্রাপথে কতগুলো সভ্যতা যে এসে দাঁড়াল! আর সেই যাত্রার কেন্দ্রে ছিলেন একজন মোগল রাজপুত্র।

দারার জীবন আরও গভীর প্রশ্ন রেখে যায়। একটি সভ্যতা যখন নিজের বাইরের জ্ঞানকে ভয় না পেয়ে তার সঙ্গে কথোপকথনে যায়, তখন তার নিজের অন্তরও কি বদলে যায় না?

দারা মনে করেছিলেন, যায়। তিনি অন্যের মধ্যে নিজেকে খুঁজেছিলেন। নিজের মধ্যে অন্যের প্রতিধ্বনি শুনেছিলেন।

দারা শুকোহ এমন এক পৃথিবী কল্পনা করেছিলেন, যেখানে সত্যের কোনো একক ভাষা নেই। ফলে কেউ তার একক মালিকানাও দাবি করতে পারে না। মানুষ পরস্পরের ভাষা শিখতে রাজি হলে দুই সমুদ্রের মধ্যেও সেতু তৈরি হতে পারে। দারার জীবন সেই সেতুর অসমাপ্ত নির্মাণ। দারা দুই সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভারতীয় দার্শনিক-রাজপুত্র।

দারার মজমাউল বাহরায়েন-এর ‘দুই সমুদ্র’ তাই দুই জ্ঞানকাণ্ডের সমুদ্র। একটি নিজের, আরেকটি অপরের। আর সেই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির কাজ ছিল সেতু তৈরি করা। সেতুটি সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায়।

  • জাভেদ হুসেন: প্রাবন্ধিক ও গবেষক