ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে দুই টুকরা হয়েছিল। তা না হলে ভি এস নাইপল আমাদের পাকিস্তানের মতো ‘ক্রিমিনাল’ বলে গাল দিতেন। আমাদেরও ফানডোস-অর্থাৎ ফান্ডামেন্টালিস্ট বলে পরিহাস করতেন।
পাকিস্তান নিয়ে এই পর্যবেক্ষণ লিপিবদ্ধ হয়েছে ভি এস নাইপলের ভ্রমণকাহিনিমূলক ‘বিয়ন্ড বিলিফ’ গ্রন্থে (বিয়ন্ড বিলিফ, ভি এস নাইপল, র্যান্ডম হাউস, নিউইয়র্ক, ১৯৯৮)।
এর আগে ১৯৭৯ সালে নাইপল পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া—এই চার ইসলামিক দেশ ভ্রমণ শেষে লিখেছিলেন তাঁর তীব্র বিতর্কিত অ্যামং দ্য বিলিভার্স (প্রকাশকাল ১৯৮১। প্রায় ২০ বছর পর সেই চার দেশে ফিরতি ভ্রমণে আসেন নাইপল। প্রথম গ্রন্থে মৌলবাদের উত্থান নিয়ে প্রবল উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় দফায় ভ্রমণে এসে সে উদ্বেগ প্রশমিত হয়নি মোটেও; বরং এবার তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রচ্ছন্ন পরিহাস।
নাইপলের এই বই নিয়ে এরই মধ্যে বিস্তর বাদ-প্রতিবাদ উঠেছে। প্রায় সর্বত্রই নাইপলের ‘অজ্ঞতার’ কড়া সমালোচনা হয়েছে। সবচেয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন খ্যাতিমান প্রাচ্যবিশারদ এডওয়ার্ড সাইদ। তাঁর কথায়, ৪০০ পাতার এই ঢাউস বইতে নাইপল তাঁর ‘নির্বোধ ও অপমানজনক’ তত্ত্ব প্রচার ছাড়া আর কিছুই করেননি। সাইদ নাইপলকে এককথায় ‘ইডিওটিক’ বলে খারিজ করে দিয়েছেন ও তাঁর মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ‘নাইপলের মতো এমন একজন ধীমান কথাশিল্পী এমন একটা বাজে বই লিখলেন কী করে?’ প্রশ্ন করেছেন সাইদ (দেখুন: দ্য প্রগ্রেসিভ, নভেম্বর ১৯৮৮)।
খ্যাতনামা বাঙালি ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক তপন রায়চৌধুরীও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নাইপলের সমালোচনা করেছেন, তাঁর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন রক্ষণশীল ইংরেজের দৃষ্টিভঙ্গিতে নাইপল ইসলামকে বিবেচনা করেছেন। তিনি ইসলামি মৌলবাদবিরোধী বলে নিজেকে প্রকাশ করলেও নিজেই যে একধরনের মৌলবাদী মনোভাবে আক্রান্ত, তা এড়াতে পারেননি। ধর্মান্তরিত মুসলমানদের বিষয়ে তার অধিকাংশ সিদ্ধান্তই ভ্রান্ত। ড. চৌধুরী উল্লেখ করেছেন, নাইপলের কাছে ইসলামি বিপ্লব মানেই তা ‘ইন্টারচেঞ্জেবল রেভোল্যুশনস’। অর্থাৎ তারা মূলত সবই এক, একটার জায়গায় আরেকটি বসিয়ে দিলেই হলো। অথচ নাইপল নিজেই তাঁর বইতে এই সিদ্ধান্তের পরিপন্থী একাধিক উদাহরণ দিয়েছেন (দেখুন : দেশ, ২২ জানুয়ারি ২০০০)।
নাইপল তাঁর গ্রন্থের উপনাম দিয়েছেন ‘ইসলামিক এক্সকার্সনস অ্যামং দ্য কনভারটেড পিপল’। তিনি তাঁর পরিব্রাজ্য দেশগুলোর মুসলমানদের কনভার্ট বা ধর্মান্তরিত মুসলমান বলে অভিহিত করেছেন। ধর্মান্তরকরণের আগে এসব দেশের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছিল। তার কোনোটি স্থানীয়, কোনোটি আবার আঞ্চলিক। ধর্মান্তরকরণের ফলে তাদের স্বজাতধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আনুগত্য পরিবর্তিত হয়েছে, তা স্থানান্তরিত হয়েছে ইসলামে ও আরব দেশে। নাইপলের কথা, ‘ইসলাম ধর্মের উত্স আরব দেশে। যে আরব নয় এমন মুসলমান মাত্রই ধর্মান্তরিত বা কনভারটেড। এই ধর্মান্তরকরণের ফলে একজন ধর্মান্তরিত মুসলমানের বিশ্ববীক্ষ্যা—তাঁর ওয়ার্ল্ডভিউ বদলে যায়, তাঁর নিজের ভাষার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে আরবের ভাষা। স্থানীয় বা দেশজ পবিত্র স্থানগুলোর জায়গা দখল করে নেয় ইসলামের পবিত্র স্থানগুলো। এমনকি ধর্মান্তরিত মুসলমানের স্বাদেশিক ইতিহাস পর্যন্ত বদলে যায়। আরবের ইতিহাস হয়ে পড়ে তার ইতিহাস।
এডওয়ার্ড সাইদ, যিনি একজন আরব–প্যালেস্টাইন খ্রিষ্টান, তীব্রভাবে নাইপলের এই তত্ত্বের প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর কথায়, শুধু আরবরাই ‘অথেনটিক’ মুসলমান; অন্যরা কৃত্রিম, এই হাস্যকর যুক্তি মেনে নেওয়ার অর্থ হলো এই কথা বলা যে শুধু রোমের স্থানীয় নাগরিকেরাই রোমান ক্যাথলিক ধর্মের অকৃত্রিম অনুসারী। অন্যান্য রোমান ক্যাথলিকরা, যেমন ইতালিয়ান, স্প্যানিশ বা ফিলিপিনো; তারা সবাই কৃত্রিম বা ইন–অনেথটিক রোমান ক্যাথলিক ধর্মাবলম্বী। তারাও ধর্মান্তরিত, ফলে তারাও তাহলে ইরানি বা মালয়েশীয় মুসলমানের মতো নিজ শিকড় থেকে উত্পাটিত।
খ্যাতনামা বাঙালি ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক তপন রায়চৌধুরীও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নাইপলের সমালোচনা করেছেন, তাঁর বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন রক্ষণশীল ইংরেজের দৃষ্টিভঙ্গিতে নাইপল ইসলামকে বিবেচনা করেছেন। তিনি ইসলামি মৌলবাদবিরোধী বলে নিজেকে প্রকাশ করলেও নিজেই যে একধরনের মৌলবাদী মনোভাবে আক্রান্ত, তা এড়াতে পারেননি। ধর্মান্তরিত মুসলমানদের বিষয়ে তার অধিকাংশ সিদ্ধান্তই ভ্রান্ত।
একই কথা বলেছেন তপন রায়চৌধুরী। তাঁর কথায়, নাইপলের যুক্তি মানলে বলতে হবে শুধু প্যলেস্টাইন খ্রিষ্টানেরাই জন্মসূত্রে খ্রিষ্টান, আর সবাই নানা পৌত্তলিক ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত। নাইপলের দাবি—সব মুসলমানের পুণ্যক্ষেত্র আরবে, স্বদেশে নয়। ড. চৌধুরীর বক্তব্য, তাহলে হিন্দুস্তান-পাকিস্তানজুড়ে হাজার পীরের দরগা, ঐতিহাসিক মসজিদ—এগুলো কি পুণ্যক্ষেত্র নয়? নাইপলের যুক্তির সম্ভাব্য অপব্যবহার ব্যাখ্যা করে ড. চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, এই বিচিত্র যুক্তির অনুরণন মেনে হিন্দু রাষ্ট্রের ধ্বজাধারীদের চিন্তায়—ভারত যাদের জন্মভূমি ও ধর্মভূমি, তারাই শুধু খাঁটি ভারত রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার যোগ্য। অর্থাৎ নিজামউদ্দিন আউলিয়া বা মইনুদ্দিন চিশতির দরগা যাঁদের কাছে পুণ্যস্থান, তাদের এ হিসাব থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ, তাদের ধর্মের উত্পত্তি হেজাজ অঞ্চলে, বলেছেন ড. চৌধুরী।
নাইপলের বই নিয়ে এই গেল প্রথম আপত্তি।
অন্য আপত্তি হলো ইসলামের বাইরে অন্য কোনো মৌলবাদ চিহ্নিত করতে তার ব্যর্থতা নিয়ে। তপন রায়চৌধুরী বলেছেন, অক্সফোর্ডের নানা সেমিনারে ‘মুসলিম ফ্যানাটিসিজম’ কথাটি বহুবার শুনেছি। ‘ক্রিসটিয়ান ফ্যানাটিসিজম’ বলে কিছু আছে বলে শুনিনি। অথচ শহরটির প্রায় কেন্দ্রস্থলে প্রোটেস্ট্যান্ট শহীদদের পুড়িয়ে মারার স্মৃতিতে সুউচ্চ ফলক রয়েছে।
একই যুক্তি দেখিয়েছেন ব্রিটিশ লেখক ডেভিড গিলমোর। ‘ফানডোস’ একা ইসলামের সমস্যা নয়। হিন্দু মৌলবাদ মসজিদ ভেঙে ফেলতে দ্বিধা করে না, ইহুদি মৌলবাদীরা গণখুনি বারুখ গোল্ডস্টিনের নামে সমাধি নির্মাণ করে আর পৃথিবীর সবচেয়ে ভীতিকর মৌলবাদী রয়েছে আমেরিকান খ্রিষ্টানদের মধ্যে। তা ছাড়া গিলমোর স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, ইসলাম অন্তর্গতভাবে মোটেও মৌলবাদী নয়। স্পেনের কর্ডোভায় তার দীর্ঘ শাসনকালে একমাত্র মুসলমান শাসকেরাই ইহুদিদের সমানাধিকার দিয়েছিল। (দেখুন: দ্য স্পেকটেটর, ২ মে ১৯৯৮)
নাইপলের প্রদত্ত তত্ত্বের নিখাদ চরিত্র নিয়ে সংশয় ও ভিন্নমত পোষণ করলেও অধিকাংশ সমালোচক অবশ্য এ ব্যাপারে একমত যে নাইপলের গ্রন্থটি সুপাঠ্য। গল্প বলার যে কৌশলটি তিনি ব্যবহার করেছেন, তা অত্যন্ত কুশলী। ‘তাঁর লেখায় সত্যিকারের মুনশিয়ানা ব্যক্তিচেতনার সূক্ষ্ম বর্ণনায়। তাঁর ব্যাখ্যায় ঐতিহাসিক বা সমাজতাত্ত্বিক মূল্য যা–ই হোক, সাহিত্যমূল্য অসাধারণ’ বলেছেন তপন রায় চৌধুরী। খ্যাতিমান লেখক ইয়ান বুরুমা তাঁর এই গ্রন্থকে ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি, হন্টিং বুক’ বলে অভিহিত করেছেন। (নিউইয়র্ক রিভিউ অব বুকস, ১৬ জুলাই ১৯৯৮) একমাত্র এডওয়ার্ড সাইদই নাইপলকে অতিরিক্ত কোনো বাহবা দিতে অনাগ্রহী। পুরো গ্রন্থটিকে তিনি একটি মহাবিপর্যয় ‘ইনটেলেকচুয়াল ক্যাটাস্ট্রফি অব দ্য ফার্স্ট অর্ডার’ বলে অভিহিত করেছেন।
স্যার বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও জন্মেছেন ত্রিনিদাদে (১৯৩২ সালে)। কর্মজীবনের প্রায় সবটাই কাটিয়েছেন নিজ দেশের বাইরে শিকড়হীন অবস্থায়, প্রধানত ইংল্যান্ডে। লেখা ছাড়া অন্য কোনো পেশা তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। উপন্যাস তাঁর নির্বাচিত সাহিত্যমাধ্যম। তবে তাঁর ভ্রমণকাহিনির জন্য তিনি সমধিক পরিচিত। উন্মূল মানুষ হলেও বারবার ভারতে ফিরে এসেছেন সে দেশকে বুঝতে, তার সঙ্গে পরিচিত হতে; কিন্তু ভারত, ত্রিনিদাদ বা ইংল্যান্ড কারও সঙ্গেই ঐতিহ্যগত নৈকট্য অর্জন করতে পারেননি নাইপল।
পণ্ডিতকুলের এই নির্মম সমালোচনাগুলো পাঠের পরই নাইপলের গ্রন্থটি আমার পড়ার সুযোগ ঘটে। প্রকৃতপক্ষে অধ্যাপক চৌধুরীর দীর্ঘ সমীক্ষাটি না পড়লে এই বই হয়তো আমার পড়াই হতো না এবং সবচেয়ে আশ্চর্য কথা, পণ্ডিতকুলের অধিকাংশ ব্যাখ্যার সঙ্গে কমবেশি অভিন্ন মত পোষণ করেও বলছি, স্যার বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপলের এই গ্রন্থ আমার কাছে অসাধারণ আনন্দদায়ক মনে হয়েছে। ধর্মান্তরিত মুসলমানের বিশ্ববীক্ষা তাঁর চেয়ে গভীরতম অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে অন্য আর কেউ দেখেননি। সে কথাও আমার মনে হয়েছে। এ–ও মনে হয়েছে, পাকিস্তান প্রশ্নে তাঁর যে পর্যবেক্ষণ, তা কেবল সত্য তা–ই নয়, তা গভীরভাবে ভবিষ্যৎমুখী। পাকিস্তানিরা তাঁর এই পর্যবেক্ষণ থেকে কিছু পাক বা না পাক, আগুয়ান মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধরত দেশগুলোর একটির নাগরিক হিসেবে আমরা বাংলাদেশিরা তা থেকে বিস্তর শিক্ষা লাভ করতে পারি। আমার এই আলোচনায় আমি সে প্রসঙ্গেই মনোনিবেশ করব।
২.
স্যার বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল ভারতীয় বংশোদ্ভূত হলেও জন্মেছেন ত্রিনিদাদে (১৯৩২ সালে)। কর্মজীবনের প্রায় সবটাই কাটিয়েছেন নিজ দেশের বাইরে শিকড়হীন অবস্থায়, প্রধানত ইংল্যান্ডে। লেখা ছাড়া অন্য কোনো পেশা তিনি কখনো গ্রহণ করেননি। উপন্যাস তাঁর নির্বাচিত সাহিত্যমাধ্যম। তবে তাঁর ভ্রমণকাহিনির জন্য তিনি সমধিক পরিচিত। উন্মূল মানুষ হলেও বারবার ভারতে ফিরে এসেছেন সে দেশকে বুঝতে, তার সঙ্গে পরিচিত হতে; কিন্তু ভারত, ত্রিনিদাদ বা ইংল্যান্ড কারও সঙ্গেই ঐতিহ্যগত নৈকট্য অর্জন করতে পারেননি নাইপল। তাঁর এই ব্যর্থতা অনেক ক্ষেত্রে তাঁর উপন্যাসগুলোর পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি ব্রিটিশ সভ্যতার মুক্তকণ্ঠ ঢোলবাদক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ও কুখ্যাতি রয়েছে। অনেকের ধারণা, তাঁর নাইটহুড যতটা না সাহিত্যে তার সাফল্যের জন্য, তারচেয়ে অনেক বেশি তার এই সফল ঢোলক বাদনের জন্য।
বিয়ন্ড বিলিফ, বাংলায় তার নামকরণ করা যাক ‘বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে’ নাইপলের ২৩তম গ্রন্থ। অ্যামং দি বিলিভার্সের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে এই বইয়ের তাত্পর্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তবে স্বতন্ত্রভাবে তা পড়ায় আনন্দ ও আগ্রহের কমতি হয় না। এর একটি বড় কারণ নাইপলের কথন টেকনিক।
নাইপল নিজে বলেছেন, তাঁর এই বই মতামতসর্বস্ব নয়; বরং এটি মানুষের কাহিনির, তাদের গল্পের একটি সংকলন। ১৯৯৫ সালে পাঁচ মাস একটানা চারটি ইসলামি দেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। সেখানে নানা রকম মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের কাহিনি উদ্ধার করেছেন। সাংবাদিকের অনাগ্রহী কলমে নয়, লেখকের গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সে কাহিনি সংগ্রহ করেছেন, তার বর্ণনা করেছেন অনুপুঙ্খ। নাইপলের বর্ণনার বড়জোর তার ভাবালুতাহীন—আনসেন্টিমেন্টাল পর্যবেক্ষণ। নিজে কথা না বলে তাঁর চরিত্রগুলোকে দিয়েই তাদের কাহিনি শুনিয়েছেন। কাহিনির স্বতঃস্ফূর্ততা ধরে রাখার জন্য কাগজ-কলম বা টেপরেকর্ডার নিয়ে যাননি, সে কাহিনি মাথায় রেখেছেন। পরে লিখতে বসে যখন সন্দেহ জেগেছে বা বিভ্রান্তিতে পড়েছেন, আবার ফিরে গেছেন সেসব কাহিনির কাছে।
এ কথার অর্থ অবশ্য এই নয় যে নাইপল তাঁর বইতে মতামত দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন। না, মোটেও না। এ কথা নির্ঘাত সত্য যে তিনি এসব কাহিনি একটি বিশেষ রাজনৈতিক বা আদর্শগত অবস্থানে থেকেই সেগুলো নির্বাচন করেছেন, সেগুলোকে ব্যবহার করেছেন; কিন্তু এ কথা তো সব লেখকের এবং সব লেখার বেলাই সত্য। লেখকের উদ্দেশ্য যা–ই হোক না কেন, পাঠক হিসেবে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো নির্বাচিত কাহিনিগুলো কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য, কতটুকু কনভিনসিং। নাইপল মৌলবাদের ইতিহাস লিখছেন না, তা নিয়ে ডকুমেন্টারিও বানাচ্ছেন না। তাঁর এই গ্রন্থ কেবল একটি মানবিক ভ্রমণকাহিনি। মানবিক, কারণ তাঁর পরিব্রাজ্য দেশের মানুষের কাহিনিতেই তাঁর আগ্রহ। গভীর সন্দেহবাদী পাঠকও স্বীকার করবেন নাইপলের উদ্ধারকৃত চরিত্রগুলো ও তাদের কাহিনি নিয়ে সংশয় কোনো পর্যায়েই জাগে না। তাদের স্পষ্ট নির্ভরযোগ্যতার জন্য এসব কাহিনি ও তার কথকদের সঙ্গে অনায়াসে সংহতি অর্জনও কষ্টকর হয় না। ভ্রমণনির্ভর কাহিনির সাফল্যের জন্য এই বিশ্বাসযোগ্যতা একদম প্রাথমিক পূর্বশর্ত। নাইপল সে শর্ত পূরণ করেছেন।
নাইপলের গ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে। এই দেশ, তার মানুষ ও তার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নাইপলের বিবেচনার কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তান প্রসঙ্গে নাইপলের নির্দয় পর্যবেক্ষণ: জন্মের চার দশক পরেও দেশটি এখনো একটি অপরাধী শাসনব্যবস্থা বা ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে দেশের মানুষ এখনো কার্যত অধিকারহীন, যেমন তারা ছিল তার সৃষ্টির আগে। দুর্নীতি ও লুটপাট সেখানে সর্বব্যাপী, সশস্ত্র সন্ত্রাস সর্বগ্রাসী।
তবে তপন চৌধুরী ঠিকই বলেছেন, নাইপল আর সব ধরনের মৌলবাদ বাদ দিয়ে শুধু ইসলামি মৌলবাদকেই বেছে নিয়েছেন তাঁর বিবেচনার জন্য; কিন্তু সেই নির্বাচন সমালোচনার বিষয় কেন হবে, আমার কাছে তা বোধগম্য নয়। ইসলামি মৌলবাদই তার বিবেচ্য বিষয়, অ্যামং দ্য বিলিভার্স গ্রন্থে তা–ই ছিল, বিয়ন্ড বিলিফ, এ–ও তাই। অন্য কোনো মৌলবাদী রাজনীতি তিনি যে বিবেচনা করেননি, তার অর্থ এই নয় যে সেসবের অস্তিত্ব তিনি মানেন না। এ কথাও ঠিক, ইসলামি মৌলবাদকে তিনি প্রবলভাবে আক্রমণ করেছেন। এই মৌলবাদকে তিনি ‘মোস্ট আনকমপ্রোমাইজিং কাইন্ড অব ইমপেরিয়ালিজম’ বলে চিহ্নিত করেছেন। যাঁরা ইরান বা আফগানিস্তানে ইসলামি মৌলবাদ সম্বন্ধে কিঞ্চিৎ অবহিত, তাঁরা নাইপলের এই মন্তব্যের সঙ্গে সম্ভবত দ্বিমত পোষণ করবেন না। আমার সন্দেহ হয়, কোনো কোনো সমালোচক নাইপলের মৌলবাদবিরোধী অবস্থানকে ইসলামবিরোধী বলে ধরে নিয়েছেন। ইসলামের প্রতি বাড়তি কোনো ভালোবাসা তার নেই—এই কথা সম্ভবত ঠিক; কিন্তু এই গ্রন্থে শুধু রাজনৈতিক ইসলাম বা পলিটিক্যাল ইসলামকেই বিবেচনায় এনেছেন তিনি। যাঁরা পলিটিক্যাল ইসলাম সম্বন্ধে যত্সামান্য জানেন, তাঁদের ধর্মের এই রাজনীতিকরণ নিয়ে ভীত হওয়া মোটেই অসংগত নয়। একাত্তরে এই ধর্মের নামেই তো হাজার হাজার বাঙালি খুন হয়েছিল। ধর্ষিত হয়েছিল অগুনতি নারী। সে সময় ধর্মের রাজনীতিকরণ পাকিস্তানে এত প্রবল ও সর্বব্যাপী ছিল, তার প্রভাব এত আপসহীন ছিল যে পুরো (পশ্চিম) পাকিস্তানে একজন লোককেও খুঁজে পাওয়া যায়নি যে দাঁড়িয়ে উঠে সে হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করে। ঠিক একই আপসহীনতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে ধর্মীয় রাজনীতির সমর্থকেরা সোত্সাহে সে হত্যাযজ্ঞে অংশ নিয়েছে, প্রতিবেশী ভাই-বন্ধুকে হত্যা করেছে। ধর্মীয় রাজনীতি এমনই কঠোর, এমনই নির্দয়।
৩.
নাইপলের গ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে। এই দেশ, তার মানুষ ও তার ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নাইপলের বিবেচনার কেন্দ্রবিন্দু। পাকিস্তান প্রসঙ্গে নাইপলের নির্দয় পর্যবেক্ষণ: জন্মের চার দশক পরেও দেশটি এখনো একটি অপরাধী শাসনব্যবস্থা বা ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ ছাড়া অন্য কিছু নয়। সে দেশের মানুষ এখনো কার্যত অধিকারহীন, যেমন তারা ছিল তার সৃষ্টির আগে। দুর্নীতি ও লুটপাট সেখানে সর্বব্যাপী, সশস্ত্র সন্ত্রাস সর্বগ্রাসী।
পাকিস্তানের এই অবনমনের উত্স সন্ধানে নাইপল ধর্মের রাজনীতিকরণের প্রশ্নে ফিরে গেছেন। শুধু ধর্মবিশ্বাসের ভিত্তিতে গঠিত হয়েছিল দেশটি। ধর্ম ছাড়া জাতীয় সংহতির কোনো বাহ্যিক প্রতীক বা সিম্বল পর্যন্ত নেই সে দেশের বিভিন্ন জাতির মধ্যে। ভারতবিরোধিতা একধরনের সংহতিস্থাপক প্রতীক বটে, তবে তা–ও ওই ধর্মের ভিত্তিতেই। বিভিন্ন জাতির ব্যবহূত ভাষা ভিন্ন, ভিন্ন তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এমন একটা দেশ টিকে থাকবে কী করে? ওই এক ধর্ম নিয়ে?
নাইপলের কথায়, খুব তড়িঘড়ি করে বানানো হয়েছিল পাকিস্তান। এর পেছনে কোনো কার্যকর বা বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা ছিল না। ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের বাসভূমি হিসেবে কল্পনা করা হলেও সব মুসলমানকে সে দেশে স্থান দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। প্রকৃতপক্ষে ভারত বিভক্তির ফলে পাকিস্তানে যত মুসলমান আশ্রয় পায়, তার চেয়ে বেশি রয়ে যায় ভারতে। এক অর্থে পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে অধিকারহূত হয় কোটি কোটি ভারতীয় মুসলমান। নাইপলের কথায়, মনে হয় শুধু হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিশ্বাসের বিজয় ঘোষণা করতেই যেন তৈরি হলো দেশটি।
নাইপল দেশবিভাগের সময় মুসলমানদের মধ্যে জনপ্রিয় একটি স্লোগান উদ্ধৃত করেছেন :
বাটকে রহেগা হিন্দুস্তান
বানকে রাহেগা পাকিস্তান।
ভারত ভেঙে টুকরা হবে
টিকে থাকবে এক পাকিস্তান।
বলা বাহুল্য, তাঁর ইতিহাসের তিন দশকও কাটাতে পারেনি অবিভক্ত পাকিস্তান। তার আগেই ছিটকে পড়েছে, তার পূর্বাংশ সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশ।
পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে ধর্মভিত্তিক আইডিওলজি ছাড়া ক্ষমতাভোগী শ্রেণির অর্থনৈতিক ফায়দার ব্যাপারটাও যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সে কথাও নাইপল উল্লেখ করেছেন। কারও কারও জন্য পাকিস্তানের সৃষ্টি ছিল টাকা বানানোর মস্ত মওকা। (পশ্চিম) পাকিস্তানের অর্থনীতির একটা বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করত হিন্দু ও শিখধর্মাবলম্বী মানুষেরা। দেশ ভাগের পর তাদের অধিকাংশকে হয় ঠেলে পাঠানো হলো ভারতে, নয়তো আক্ষরিক অর্থেই নির্মূল করা হয় তাদের, তারপর যে যেভাবে পারল হিন্দু ও শিখদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি লুটপাট করে রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেল। ধর্ম দিয়ে যে রাষ্ট্রের ভিত্তি রচিত, তার যাত্রা শুরু হলো এভাবে এক নির্মম লুণ্ঠনের ভেতর দিয়ে। ঈশ্বরের নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও সে রাষ্ট্রে খুব দ্রুতই ঈশ্বরের স্থান দখল করে নিল লোভ ও দুর্নীতি।
স্বাধীনতার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানি নেতারা মার্কিন সামরিক প্রভাববলয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে আরও বিস্তৃত হয় দুর্নীতি ও স্বৈরশাসন। আফগানিস্তানে রুশবিরোধী ও পরে তালেবানি যুদ্ধের ফলে সশস্ত্র সহিংসতা দেশটির আগাপাশতলা ছেয়ে ফেলে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস এত সর্বব্যাপী হয়ে পড়ে যে সেখানে খোদ রাষ্ট্রব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার সম্মুখীন হয়। আর এইভাবে দেশটি নিজেই রূপান্তরিত হয় একটি অপরাধী চক্রে। ভাবা হয়েছিল ধর্মবোধ সেখানে শুদ্ধি ঘটাবে, আনবে মুসলমানের ক্ষমতায়ন। বাস্তব সত্য হলো এই যে ধর্মের রাজনীতির ফলে দেশটি ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে। নাইপল মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর পাকিস্তান যে উপমহাদেশের সবচেয়ে কম শিক্ষিত দেশে পরিণত হয়, তা মোটেই কাকতালীয় নয়।
নামবিহীন এক রমণীর কথা লিখেছেন নাইপল। অভাবী, অধিকারহীন শ্রেণির একজন। স্বামী ও এক দেবরের আক্রমণে তার নাকের একটা অংশ থেঁতলে গেছে। পরে দীর্ঘদিন তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। এখন মেয়েটি বিচারের আশায় আইনজীবী খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে দুজনেই পিতার আশ্রয়ে। মেয়েটি তাদের ফেরত চায়।
নাইপল তাঁর বিশ্লেষণের এই পর্যায়ে দুটি আশ্চর্য শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁর কথায়, পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে এই যুক্তি দেখানো হয়েছিল যে নিজস্ব বাসভূমি ছাড়া সর্বভারতীয় পর্যায়ে মুসলমানদের পক্ষে বসবাস অসম্ভব। মোহাম্মদ ইকবালের একটি পরিচিত উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, তাঁর অর্থাৎ ইকবালের পাকিস্তান প্রস্তাবের পেছনে মোদ্দা যুক্তি ছিল এই যে মুসলমানদের পক্ষে একমাত্র মুসলমানদের সঙ্গে থাকাই সম্ভবপর। আর সে জন্য চাই পাকিস্তান যা হবে শুধু মুসলমানদের আবাসভূমি। নাইপলের মন্তব্য, ইকবালের এই যুক্তি যদি সত্যি হয় এবং অন্য সব জাতি বা গোষ্ঠী তা যদি নিজ নিজ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা শুরু করে, তাহলে মানুষের পৃথিবী রূপান্তরিত হবে ‘ট্রাইবাল ওয়ার্ল্ডে’। সেখানে থাকবে না অভিন্ন কোনো মানবসংহতি, থাকবে না অভিন্ন মানবিকতা। প্রতিটি উপজাতি বা ট্রাইব—যার যার কোনায় থাকবে, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগহীন, সম্পর্কহীন।
তাঁর দ্বিতীয় পর্যবেক্ষণ আরও তীক্ষ। নাইপল বলেছেন, পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে তাদের, যারা এই দেশটি চেয়েছিল সবচেয়ে বেশি। তারাই ক্ষতি স্বীকার করেছে সবচেয়ে বেশি। এখানে নাইপল ভারত থেকে উদ্বাস্তু হিসেবে আগত হাজার হাজার বিহারি নাগরিকের কথা বলেছেন। নিজের সহায়-সম্পত্তি ছেড়ে সম্পূর্ণ একটি নতুন দেশে চলে এসেছে এই সব উদ্বাস্তু। ধর্ম তাদের মুক্তি দেবে তাদের দেবে সংহতি। ধর্মরাষ্ট্রের তারা শক্তিশালী খুঁটি হবে, এই স্বপ্ন তাদের ছিল। অথচ বাস্তব সত্য হলো এই যে আজকের পাকিস্তানে বিহারি উদ্বাস্তুরা সবচেয়ে কম অধিকারভোগী, রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে পর্যুদস্ত। বিহারিদের প্রধান জমায়েত করাচিতে। সেখানে গত ২০ বছর ধরে রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছে। মানুষ মরছে মাছির মতো। আইন বা বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে অনেক আগেই।
তাহলে এ কেমন পাকিস্তান, যার জন্য এত রক্তগঙ্গা?
পাকিস্তানের এই যে কাহিনি, নাইপল তা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপকের চোখে দেখেননি। দেখেছেন লেখক হিসেবে, সাধারণ মানুষের চোখ দিয়ে। খ্যাতনামা বা অখ্যাত বিভিন্ন মানুষের জবানিতে তাদের কাহিনিই বলেছেন তিনি। পাকিস্তান পর্বে নাইপল প্রায় এক ডজন মানুষের ঘনিষ্ঠ সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে নির্মাণ করেছেন এক ‘ট্রাইবাল ও টোটালিটারিয়ান’ পাকিস্তানের চিত্র।
নানা ধরনের নানা ভাবনার মানুষের সঙ্গে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দেন নাইপল তাঁর গ্রন্থে। এদের অধিকাংশ হতাশ, ক্রুদ্ধ, উত্তরাধিকারহীন। নির্মম দক্ষতায় পাকিস্তানে টিকে থাকা সামন্তবাদী বৈষম্যের ছবিটি তুলে ধরেন তিনি। সন্দেহ নেই, অন্য যেকোনো সামন্ততান্ত্রিক দেশের মতো পাকিস্তানেও সবচাইতে প্রান্তবর্তী ও অন্তজ্য হচ্ছে মেয়েরা। তার একাধিক উদাহরণও দিয়েছেন নাইপল।
নামবিহীন এক রমণীর কথা লিখেছেন নাইপল। অভাবী, অধিকারহীন শ্রেণির একজন। স্বামী ও এক দেবরের আক্রমণে তার নাকের একটা অংশ থেঁতলে গেছে। পরে দীর্ঘদিন তাকে ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। এখন মেয়েটি বিচারের আশায় আইনজীবী খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে দুজনেই পিতার আশ্রয়ে। মেয়েটি তাদের ফেরত চায়।
আরেকটি মেয়ের কথা লিখেছেন নাইপল। এটি অবস্থাসম্পন্ন ঘরের কলেজ-শিক্ষিতা। বাবার মৃত্যুর পর ছয় হাজার একর জমির উত্তরাধিকারী হয় সে। এক আত্মীয়ের প্রতি অনুরক্ত ছিল মেয়েটি, কিন্তু পিতৃব্য চাইলেন মেয়েটি লেখাপড়া ছেড়ে পর্দার অন্তরালে থাকুক এবং তার নিজের নাবালক পুত্রটিকে বিয়ে করুক। তাতে রাজি না হয়ে ঘর ছেড়ে পালাল সে, পালিয়ে সেই আত্মীয়কে বিয়ে করল। তারপরে শুরু হলো লঙ্কাকাণ্ড। দুই পরিবারের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত বন্দুকের নল ঠেকিয়ে মেয়েটিকে অপহরণ করা হলো। পিতা ও স্বামী উভয়ের পরিবারের সম্মানের হানি করেছে, এই কারণে গুলি করে হত্যা করা হলো তাকে।
একটি বেলুচ রমণীর কথা লিখেছেন নাইপল। দাসী হিসেবে ১০ বছর বয়সে তাকে কিনে আনেন এক জমিদার। তখন থেকেই মালিকের রক্ষিতা সে। সে জমিদার মারা গেলে তার ছেলের রক্ষিতা হয় সে। অবশেষে যখন নতুন জমিদারের সুপুত্রটি তাকে ভোগ করতে চায়, তখন এক পুরুষ বন্ধুকে নিয়ে পালায় সে। আশ্রয় নেয় অন্য এক জমিদারের কাছে। তখন তুমুল দাঙ্গা বাধার উপক্রম হয় দুই জমিদারের মধ্যে। দাসী পালিয়েছে, এতে করে তাদের প্রবল অসম্মান হয়েছে। মেয়েটি নতুন মালিকের হাত-পা ধরে অনুনয় করে, আমাকে পাঠাবেন না। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে। শেষ পর্যন্ত দুই জমিদারে রফা হয়, মেয়েটি এখানেই থাকবে তবে তার ছয় বছরের পুত্রটিকে তার বদলি হিসেবে পুরোনো জমিদারকে অর্পণ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত তাই হলো। যেদিন ছেলেকে জমিদারের লোক এসে নিয়ে যায়, সেদিন তাকে সুন্দর করে সাজিয়েছিল অভাগা সেই মা। ছেলেটি কাঁদছিল আর মা তাকে বারবার আশ্বাস দিচ্ছিল এই বলে যে সে–ও সঙ্গে সঙ্গে আসবে। আর কখনো সে ছেলের দেখা পায়নি সেই একাকী ও দুঃখী মাতা।
ধর্মান্তরিত মুসলমানের উত্তরাধিকারহীনতা প্রসঙ্গে নাইপলের বক্তব্যের যে তীব্র প্রতিবাদ এডওয়ার্ড সায়ীদ করেছেন, সে কথা গোড়াতেই বলেছি। তপন রায়চৌধুরীও নাইপলের বক্তব্য হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। আরেক ভারতীয় লেখক শশী থারুর বলেছেন, ভারতের মাটিতেই তিনি মুসলমানদের পুণ্যস্থান সফর করেছেন। কে বলেছে ভারতীয় মুসলমানদের আনুগত্য একমাত্র আরবের মাটিতে?
সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত অথচ কার্যত ক্ষমতাহীন এমন বেশ কিছু মানুষের কথাও লিখেছেন নাইপল। রানা তাদের একজন। একসময় সে চেয়েছিল পুলিশ হতে, কারণ পুলিশ প্রবল শক্তিমান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিতার পরামর্শে আইন বিষয়ে অধ্যয়ন করে। কিন্তু আইন ও বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি আমুণ্ডু। তা দেখে হতাশ সে। এখন পালাতে চায় দেশ ছেড়ে। তার এক বন্ধু সোহেল বলে, পাকিস্তানে দুই ধরনের মানুষ রয়েছে, টাকাওয়ালা নামীদামি মানুষ আর কীটের মতো ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ।
লাহোরের বেশ্যাপাড়া হীরামণ্ডিতে নাইপলের দেখা মেলে এক মাস্তানের সঙ্গে। ‘বলো, কোন মেয়েকে তোমার চাই। পয়সা আমি দেব, আমার টাকা আছে’, অভয় দেয়, ‘পুলিশ নিয়ে ভয় নেই। বখরা পেলেই ওরা খুশি।’ শাহবাজ নামের আশ্চর্য সাহসী ও স্বাপ্নিক এক যুবকের কথা বলেন নাইপল তাঁর গ্রন্থে। বিলাতে পড়াশোনা করা উচ্চশিক্ষিত। মার্কসবাদে শিক্ষিত যুবকটি পাকিস্তানে এসেছিল বেলুচিস্তানের সামন্ততন্ত্রবিরোধী গণবিদ্রোহে অংশ নিতে। পুরো একটি অধ্যায় জুড়ে সে কাহিনি লিখেছেন নাইপল। বাংলাদেশ বিভক্তির কয়েক বছরের মধ্যেই সে বিদ্রোহ দেখা দেয়। কিন্তু নির্মম হাতে পাকিস্তানি সমরনায়কেরা সে বিদ্রোহ গুঁড়িয়ে দেয়। অথচ পৃথিবীর মানুষ জানেও না কী নির্দয় ও রক্তক্ষয়ী ছিল সে সামরিক অভিযান।
একাধিক ফান্ডোস বা মৌলবাদীর সঙ্গেও আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন নাইপল। এসব মৌলবাদীর নিজস্ব কোনো কণ্ঠ নেই, তাদের নিজস্ব কোনো বিশ্বাস নেই। জামায়াতে ইসলামীর যা বিশ্বাস, তার প্রতিই আমুণ্ডু আনুগত্য তাদের। জামায়াতের বক্তব্য, পাকিস্তান কখনোই পুরোপুরি মুসলমান রাষ্ট্রে পরিণত হয়নি। তারা ক্ষমতায় না যাওয়া পর্যন্ত সে স্বপ্ন বাস্তবায়িতও হবে না। একমাত্র জামায়াতই পারবে সে স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথ দেখাতে। নাইপল স্মরণ করেছেন, ১৯৭৯ সালে তাঁর প্রথম ভ্রমণের সময় জেনারেল জিয়াউল হকের কাছ থেকেও একই কথা শুনেছেন তিনি। জিয়াও প্রকৃত ইসলামি পাকিস্তান চেয়েছিলেন। ধর্মের নামে সন্ত্রাস ছিল তাঁর অস্ত্র। এখন জামায়াতিরা বলে জিয়া যথেষ্ট ইসলামি ছিলেন না। মৌলবাদীদের কাছে নাইপলের প্রশ্ন, ইসলামে তো মিথ্যা অহংকারের স্থান নেই। অথচ তারা কীভাবে বলে, যেসব হাজার হাজার মানুষ তাদের আগে ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত ছিল, তারা সবাই ভ্রান্ত আর একমাত্র তারাই সঠিক?
মোহাজের নিয়ে যে দীর্ঘ অধ্যায়টি তিনি লিখেছেন, নাইপল তার নাম দিয়েছেন ‘লস’। যে স্বপ্নরাজ্যের আশায় তারা স্বদেশ ছেড়ে ইসলামি পাকিস্তানে এসেছিল, অধিকাংশ বিহারির জন্যই এখন তা অহর্নিশ দুঃসহ দুঃস্বপ্ন। ক্ষমতা অর্জনের বদলে তারা এখন ক্ষমতাহীন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বদলে তারা দারিদ্র্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সামাজিক নিরাপত্তার বদলে এক সামরিক সন্ত্রাসের শিকার। বিহারিদের অধিকাংশই আশ্রয় নেয় সে দেশের প্রধান নগর করাচিতে। কিন্তু স্থানীয় সিন্ধিরা তাদের কখনোই সাগ্রহে গ্রহণ করেনি। একই ধর্মের হলে কী হবে, তাদের চোখে বিহারিরা ছিল বহিরাগত—আউটসাইডারস। গত অর্ধশতাব্দীতেও এই বিভক্তি কমেনি বরং বেড়েছে। এখন এই দুই পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই নিয়ে ব্যস্ত। সিন্ধিদের নিজের বাসভূমি আছে, তা থাকবে। কিন্তু মোহাজির পাকিস্তানির তো যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। সর্বত্রই সে বহিরাগত।
তাঁর বর্ণনার এক পর্যায়ে নাইপল ধর্মান্তরিত মুসলমানের মানসিকতার ইতিহাস ও ভূগোল খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন, পাকিস্তান এমন এক দেশ, যেখানে নিজের ইতিহাসের বদলে তার ধর্মীয় ইতিহাস অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের নিজস্ব ইতিহাস সেখানে ইসলামের ইতিহাসের একটি পর্যায় মাত্র। আরব থেকে সামরিক অভিযানে এসেছিলেন যাঁরা, এই নতুন রাষ্ট্রের তাঁরাই আসল নায়ক।
সাংবাদিক সালমানের উদ্ধৃতি দিয়ে নাইপল জানান, উপমহাদেশের সব মুসলমানই তাদের কোনো না কোনো আরব পূর্বপুরুষ আবিষ্কারে ব্যস্ত। তাদের অনেকেই নিজেদের ‘সৈয়দ’ বংশের বলে দাবি করে থাকে। আরবের সঙ্গে এই নামের সূত্রে কাল্পনিক বন্ধন সৃষ্টি করে তারা আত্মতৃপ্ত হয়। অথচ খোদ আরবরা যখন এসব ধর্মান্তরিত মুসলমানের সাক্ষাতে এসেছিল, তাদের প্রতি অপরিসীম অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই ছিল না তাদের। সালমান জানায়, আরব পর্যটক ইবনে বতুতা তাঁর গ্রন্থে কোনো স্থানীয় অর্থাৎ ধর্মান্তরিত মুসলমানের উল্লেখ করে এ কথা যোগ করতে ভোলেননি যে মুসলমান হলে কী হবে, লোকটা আসলে ভারতীয়। নাইপলের মন্তব্য, আরব পূর্বপুরুষের প্রতি পাকিস্তানিদের এই তীব্র আগ্রহের ফল দাঁড়িয়েছে এই যে আরব অভিযানের আগে এই দেশটির কোনো ইতিহাস ছিল বলে মনে হয় না। মনে হয় না তাদের নিজস্ব কোনো সংস্কৃতি ছিল, ছিল কোনো উত্তরাধিকার।
রক্তাক্ত করাচিতে সবচাইতে উত্তরাধিকারহীন হচ্ছে বিহারিরা। আবদুল নামে একজন মাঝবয়সী ব্যক্তির জবানিতে মোহাজিরের আশাভঙ্গের কথা বলেছেন নাইপল:
করাচিতে এখন কী অবস্থা?
খুব ভালো।
কেন?
এখন সরকারই সব করছে।
মানে? খুন-জখমের কথা বলছেন?
হ্যাঁ।
তো সেটা ভালো কেন?
এখন যারা মারা যাচ্ছে তারা সবাই উর্দুভাষী। এইটা হলো তাদের আত্মত্যাগ, তাদের কোরবানি। কিছু পেতে হলে আপনাকে আগে কিছু দিতে হবে। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য ২০ লাখ জান দিতে হয়েছে। আমাদের অধিকার আদায়ের জন্যও জান দিতে হবে।
৪.
ধর্মান্তরিত মুসলমানের উত্তরাধিকারহীনতা প্রসঙ্গে নাইপলের বক্তব্যের যে তীব্র প্রতিবাদ এডওয়ার্ড সায়ীদ করেছেন, সে কথা গোড়াতেই বলেছি। তপন রায়চৌধুরীও নাইপলের বক্তব্য হেসে উড়িয়ে দিয়েছেন। আরেক ভারতীয় লেখক শশী থারুর বলেছেন, ভারতের মাটিতেই তিনি মুসলমানদের পুণ্যস্থান সফর করেছেন। কে বলেছে ভারতীয় মুসলমানদের আনুগত্য একমাত্র আরবের মাটিতে?
কথাটা ঠিক, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও ঠিক যে ধর্মীয় আনুগত্যের কারণে বা তার রাজনৈতিক বৈপরীত্যের কারণেই হোক আমরা অনেকেই রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ধর্মীয় ইতিহাসকে গুলিয়ে ফেলি। প্যালেস্টাইনে সায়ীদকে সে সমস্যায় পড়তে হয় না। অথচ উপমহাদেশে তা খুবই সাধারণ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত একই কারণে আমাদের দেশেও নিজস্ব ইতিহাস-বিস্মৃতির প্রকোপ দেখা গেছে, এখনো যায়। পাকিস্তানের মতো আমরাও নামের আগে সৈয়দ জুড়ে আরবের সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজি। আরবের সমরনায়কেরা আমাদেরও সমরনায়ক হয়ে পড়ে। স্বাধীন বাংলার ইতিহাস আমাদের কাছে প্রায় অজ্ঞাত, গৌড়ের ইতিহাস আমাদের কাছে ভিন্নদেশীয়। অথচ আরব, তুর্কি ও মোগল বিজয়ী সেনাপতিদের শৌর্যে আমরা মুগ্ধ। আমরা এতটাই হীনম্মন্য যে নিজের ভাষা বাংলা হওয়ায় তা নিয়ে পর্যন্ত বিব্রত। চল্লিশ বছর আগের বাংলা কবিতা পড়ে দেখুন। কবিদের ভাষা বাহ্যত বাংলা হলেও আরবি শব্দের উপস্থিতি তাতে প্রবল ও তীব্র। আর যে স্বপ্নে ভরা কবিদের চোখ, সেখানেও আঁকা আরবি দুলদুল, মরুর হাওয়া, শুষ্ক খর্জুর।
১. জরির জোব্বা, শেরোয়ানি আর আমামার সজ্জায়
আতরের পানি, মেশকের রেণু খোসবু বিলায়ে যায়,
নেকাব খুলেছে নতুন কুমার-রাত্রি হয়েছে ভোর
ইয়াকুতি আর জুমররাতের লেবাস পরিয়ে
সুলতানা আছে তখতের পরে বসি।
বেদনাহীন সেতারা, নেমেছে মাটিতে আসমান হতে খসি।
(বেদনাবিহীন স্বপ্নের দিন, সৈয়দ আলী আহসান)
২. বে-নেকাব গুলে বকাউলি রাত।
তুমি এনেছিলে একদা এখানে প্রভাত-আরগাওয়ানী
ওগো রুখপাখী, জবীন দিনের বয়জাতে তাও দানি...
মুসা-কলীমের জাম্বিলে আজো থাকি।
(বে-নেকাব, মোফাখখারুল ইসলাম)
৩. কোন সন্ধ্যার বিয়াবনে আজ
থামলো কাফেলা সিপা’সালার
পেরেশান পথযাত্রীর, ঢুলে
তন্দ্রায় নত উটের সার।
(কোন বিয়াবনে, ফররুখ আহমদ)
এখানে উদ্ধৃত শেষ কবি ফররুখ আহমদ এক সময় লিখেছিলেন, ‘দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন/ বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকেই করিয়াছি নিকা।’ বলা বাহুল্য, উর্দুর সঙ্গে এক নিকাহ বাসনার ফল যে পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর বাংলা ভাষার হরফ বদলে আরবি করার অপচেষ্টা, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উত্তরাধিকারহীন ও হীনম্মন্য কনভার্টের বিবেচনা থেকেই সৈয়দ আলী আহসান তাই নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, আমরা অনায়াসে রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে পারি। আরেক পণ্ডিত সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন আরও সরাসরি পথ নির্দেশ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘বাংলাকে মুসলিম তমদ্দুনের উপযুক্ত বাহনে পরিণত করিতে হইলে আমাদের যে আরবি-ফারসি আলফাজ এস্তেমাল করিতে হইবে, তা অস্বীকার করা চলে না। এবং যে সমস্ত শব্দ বিজাতীয় তমদ্দুনের পরিচয় বহন করে সেইগুলিকে পরিত্যাগ করিতে হইবে। ইসলামি তমদ্দুনের নামগন্ধবর্জিত বঙ্কিমী-বিদ্যাসাগরী ভাষা পাকিস্তানের তরুণ শিক্ষার্থীরা শিখিবে, ইহার চাইতে পরিতাপের বিষয় আর কী হইতে পারে?’
(এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত দেখুন: ভাষা আন্দোলন: সাহিত্যিক পটভূমি, হুমায়ুন আজাদ, ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০)
আরবি-ফারসি আলফাজ এস্তেমাল করার সঙ্গে ধর্ম পালনের কোনো সংশ্রব যে নেই, তা বোধ হয় বলার অপেক্ষা রাখে না। আর সে আলফাজ যারা এন্তার এস্তেমাল করেছেন তাদের অনেকের হাতই খুনি রক্তে সিক্ত। ধর্ম নয়, ধর্মের রাজনীতিই তাদের কাছে প্রধান ছিল।
ভাষা, সংস্কৃতি বা ইতিহাস প্রসঙ্গে চল্লিশ বছর আগের এই বক্তব্য, এখন তা আস্তাকুঁড়ের আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নয়, এ কথা যাঁরা বলেন তাঁরা নির্ঘাত আজকের বাংলাদেশের সঙ্গে সম্যক পরিচিত নন। সহিংস ও সশস্ত্র মৌলবাদ এখন সেখানে ক্রমশ চাঙা হচ্ছে, বিস্তৃত হচ্ছে। এই সব মৌলবাদীর চোখে এখনো উটের কাফেলা, খর্জুর বৃক্ষ ও রুখপাখী। বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস মুছে ফেলতে এদের আগ্রহ ও উদ্যম এখনো অসীম, এমনকি বাংলা ভাষার ‘অ-ব্রাহ্মণীকরণে’ তাদের তত্পরতা এখনো বর্তমান।
পাকিস্তানের মতো ট্র্যাজেডি ঠেকাতে হলে মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের তর্জনী আমাদের তুলতেই হবে। এখনই, আজকেই।
Iনিউইয়র্ক, ৪ এপ্রিল ২০০০I