ইরানের বিপ্লবে বামপন্থী লেখক–শিল্পীদের অবদান

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ইরানের ইতিহাসে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব শুধু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক জাগরণও ছিল। যে জাগরণ না হলে হয়তো শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির স্বৈরতন্ত্র আজও অটল থাকত। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভ্রূণ থেকে যেত বিপ্লবীদের মস্তিষ্কে।

বিপ্লব-পূর্ব সময়েই ইরানের শিল্প-সাহিত্য-চলচ্চিত্র জগৎ দমননীতি ও সেন্সরশিপের মধ্যে থেকেও এক প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। বিশেষ করে বামপন্থী শিল্পী, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা, যাঁরা সামাজিক ন্যায়, শ্রেণিসংগ্রাম ও স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতেন, তাঁরা বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। 

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন বামপন্থীদের সঙ্গে ইসলামপন্থীদের কীভাবে সন্ধি হয়! ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিপ্লবের পথ কখনোই একক আদর্শের উত্থান নয়। প্রায় সব ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিপ্লবী আন্দোলনের শুরুতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আদর্শের মানুষেরা সাধারণ শত্রু বা নির্যাতনের বিরুদ্ধে একত্রিত হয়। রাশিয়ান বিপ্লবে লেবারারস ও মেনশেভিকরা বলশেভিকদের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল, চীনে কমিউনিস্ট পার্টি জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল, কিউবায় কাস্ত্রো বিভিন্ন লিবারেল ও বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে বাতিস্তার শাসনের পতনের জন্য একত্র হয়েছিল, এবং ফরাসি বিপ্লবে জাকবিনস ও মন্টানাররা রাজতন্ত্রবিরোধী প্রথম আন্দোলনে একত্রিত হয়েছিলেন। তবে বিপ্লবের পর এই মিত্রতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না; ক্ষমতা দখল ও আদর্শগত দ্বন্দ্বের কারণে একসময় তাঁদের মধ্যে বিভাজন ঘটে এবং প্রাথমিক মিলনভূমি ভেঙে পড়ে।

বামপন্থী দলগুলো—যেমন তুদেহ পার্টি বা ফেদাইন–ই–খাল্ক জনপ্রিয় হলেও এতটা বিস্তৃত জনভিত্তি ছিল না যে এককভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ইসলামপন্থীদের মসজিদভিত্তিক সংগঠন ও গ্রামীণ জনসমর্থন ছিল বিরাট, যা বামপন্থীরা নিজেদের বার্তা ছড়াতে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।
ইরানি শিল্পী হাবিব সাদেগির ‘হৃদয়ের জানাজা’ শীর্ষক পেইন্টিং

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের ‘ডক্রিন অব আনস্ট্যাবল অ্যালায়েন্সেস’ নীতিতেও এই ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বহিরাগত জোটগুলিকে সুবিধামতো অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করবে এবং জাতীয় স্বার্থে স্বাধীনভাবে পরিত্যাগ করবে। এই নীতিতে, সাময়িক স্বার্থের ভিত্তিতে গঠিত মিত্রতাগুলোকে অস্থায়ী হিসেবে দেখা হয়েছে, যা বিপ্লবী মিত্রতার অস্থায়িত্বের আরও একটি উদাহরণ।

বিপ্লবের প্রাক্কালে বামপন্থী সাংস্কৃতিক কর্মীরা একাত্ম হওয়ার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ ছিল। শাহের শাসন ছিল মার্কিনপন্থী, দমনমূলক ও জনবিচ্ছিন্ন। সাভাক (গোপন পুলিশ) শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা—সবাইকে নজরদারিতে রাখত। যারা শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রমিক অধিকার বা দুর্নীতিবিরোধী কথা বলত, তাদের আটক, নির্যাতন বা নির্বাসিত করত। এই দমননীতির বিরুদ্ধে ইসলামপন্থী ও বামপন্থী উভয়ই লড়ছিল, তাই তারা একসঙ্গে দাঁড়ায়।

বামপন্থী দলগুলো—যেমন তুদেহ পার্টি বা ফেদাইন–ই–খাল্ক জনপ্রিয় হলেও এতটা বিস্তৃত জনভিত্তি ছিল না যে এককভাবে বিপ্লব ঘটাতে পারে। ইসলামপন্থীদের মসজিদভিত্তিক সংগঠন ও গ্রামীণ জনসমর্থন ছিল বিরাট, যা বামপন্থীরা নিজেদের বার্তা ছড়াতে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

১৯৭৮-৭৯ সালে মিছিল, ধর্মঘট ও গণপ্রতিবাদ তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা যৌথভাবে পোস্টার, দেয়ালচিত্র, নাটক ও গান তৈরি করে জনতার মনোবল বাড়ায়। বামপন্থীরা বিশ্বাস করত, শিল্প জনগণের জন্য, জনগণের পক্ষে কথা বলার জন্য। ইসলামপন্থীদের সঙ্গে মিলে এই শিল্পকে তারা শাহবিরোধী প্রচারণার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যদিও আদর্শে তারা এক ছিল না।

খোসর গোলোসর্কি ছিলেন এক বামপন্থী কবি ও সাংবাদিক, শাহের বিচারালয়ে ‘সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় যিনি বলেছিলেন—‘সাহিত্য মানুষকে জাগ্রত করে’। বোজরগ আলাভি, তুদেহ পার্টির সহপ্রতিষ্ঠাতা, তাঁর লেখা উপন্যাসগুলো বিপ্লবী চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছিল—তিনিও বিপ্লবের পর নির্বাসনে ছিলেন।

ট্রাঙ্কুয়ালিটি ইন দ্য প্রেজেন্স অব আদার্স–এর পোস্টার

ফরুঘ ফাররুখজাদ ও কামরান শিরদিলর সামাজিক-বাস্তববাদী ডকুমেন্টারি, যেমন ‘উইমেন্স প্রিজন’ ও ‘দ্য হাউস ইজ ব্ল্যাক’—দারিদ্র্য ও পুরাতন রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সরাসরি প্রশ্ন তোলে। ‘প্রিন্স ইহতেজাব’ (১৯৭৪) ও ‘ট্রাঙ্কুয়ালিটি ইন দ্য প্রেজেন্স অব আদার্স’ (১৯৭৩)–এর মতো ফিল্মগুলো সামাজিক সংকট ও প্রত্যাশাকে চলচ্চিত্রের ভাষায় উপস্থাপন করে।

শিরিন নেশাত আধুনিক চিত্র ও ভিডিও আর্টের মাধ্যমে ধর্ম, নারী ও বিপ্লবের পরবর্তী চিত্র তুলে ধরেন—প্রশাসনের ভিত্তিতে প্রতিরোধের চিত্র। মরহেস—কার্টুনিস্ট ও স্যাটারিস্ট, ভারতের কিংবদন্তি ‘ল্যোনহার্জ’ খ্যাত, বামদলীয় হিউমার ও ভাঙার শক্তি প্রয়োগ করে দমনের বিরুদ্ধে কথা বলতেন। বাহমান জলালি ও রানা জাভাদি—ডকুমেন্টারি ফটোগ্রাফির মাধ্যমে বিপ্লবের মুহূর্তগুলো সংরক্ষণ করেন, ‘ডে অব ব্লাড, ডে অব ফায়ার’ বইতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে।

ইসলামপন্থী ও বামপন্থী শিল্পীরা যৌথভাবে পোস্টার, নাটক ও মিছিলের গান তৈরি করেন। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, থিয়েটার হল ও শহরের দেয়ালগুলো বিপ্লবী চিত্র ও কবিতায় ভরে ওঠে। আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা ও লিফলেটে রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়। চলচ্চিত্র নির্মাতারা ডকুমেন্টারি আকারে শ্রমিক ধর্মঘট, ছাত্র আন্দোলন এবং পুলিশের দমননীতি রেকর্ড করে রাখেন—যেসব পরে গোপনে ছড়ানো হয়।

বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র দ্রুত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে। নতুন শাসন ধর্মীয় আদর্শকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র গঠন শুরু করে। ১৯৮১–৮৩ সালে বামপন্থী দলগুলো (তুদেহ, ফেদাইন) নিষিদ্ধ হয়। বহু শিল্পী, লেখক, পরিচালক গ্রেপ্তার হন, কেউ মৃত্যুদণ্ড পান, অনেকে যান নির্বাসনে।

সব বামপন্থীই যে এই বিপ্লবে একাত্মতা পোষণ করেছিলেন, এমনও নয়। ইরানি বামপন্থী নেতা মানসুর হেকমাত তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ইসলামি বিপ্লবের প্রতি সমর্থন জানাননি এবং ইসলামি শাসনের প্রতি তাঁর বিরোধিতা স্পষ্ট ছিল। তিনি ‘জাতীয় ও প্রগতিশীল বুর্জোয়া’ ধারণাকে মিথ্যা বলে অভিহিত করেছেন, যা তাঁর বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি ও ইসলামি বিপ্লবের প্রতি সমালোচনাকেই প্রতিফলিত করে।

এ ছাড়া জালাল আল-ই-আহমাদ নামের একজন প্রখ্যাত বামপন্থী লেখক ও চিন্তাবিদ ছিলেন, যিনি ১৯৪৮ সালে ‘সোশ্যালিস্ট সোসাইটি অব দ্য ইরানিয়ান মাসেস’ নামে একটি নতুন দল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে তিনি মস্কো রেডিওর সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি কয়েক দিনের মধ্যে বিলুপ্ত করেন, যা তাঁর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও আদর্শগত অস্থিরতার প্রতিফলন।

বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্র দ্রুত সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে। নতুন শাসন ধর্মীয় আদর্শকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্র গঠন শুরু করে, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষ বা মার্ক্সবাদী আদর্শের জায়গা ছিল না।

১৯৮১–৮৩ সালে বামপন্থী দলগুলো (তুদেহ, ফেদাইন) নিষিদ্ধ হয়। বহু শিল্পী, লেখক, পরিচালক গ্রেপ্তার হন, কেউ মৃত্যুদণ্ড পান, অনেকে যান নির্বাসনে। বিপ্লব-পূর্ব চলচ্চিত্র ও গান ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। দারিউশ মেহরজুই—নির্বাসনে গিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ চালিয়ে যান। মারজিয়ে—ফ্রান্সে নির্বাসনে থেকে স্বাধীনতার গান গেয়ে যান। আহমদ শামলু—দেশে থেকে সেন্সরের মুখে পড়েন, তাঁর বহু কবিতা প্রকাশে বাধা দেওয়া হয়।

বিপ্লবকালীন দেয়ালচিত্রে আয়াতুল্লাহ খামেনি ও আলী শরিয়তি

এই দমনের ফলে ইরানের বামপন্থী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল প্রায় ভেঙে পড়ে। অনেক প্রতিভাবান শিল্পী বিদেশে ছড়িয়ে পড়েন, আর দেশে সাংস্কৃতিক প্রকাশ ক্রমে একমুখী হয়ে যায়। বামপন্থী শিল্পী, সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতারা ইসলামি বিপ্লবের আগে ও চলাকালে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে অপরিসীম অবদান রেখেছিলেন। তাঁরা শিল্পকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন—যা বিপ্লবের আবেগ ও একতার শক্তি জুগিয়েছিল।

তবে বিপ্লব-পরবর্তী আদর্শিক অসংগতি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তাঁরা প্রান্তিক হয়ে পড়েন, অনেকেই প্রাণ বা স্বাধীনতা হারান। তবুও তাঁদের সৃষ্ট কাজ ইরানি বিপ্লবের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমলিন হয়ে আছে। বিপ্লব–পরবর্তী সময়ের ইরানের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বিপ্লবের মিত্রতা সব সময় স্থায়ী হয় না, কিন্তু সৃজনশীল প্রতিরোধ ইতিহাসে চিরকাল বেঁচে থাকে।