মহাফেজখানা থেকে
আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ: ঐতিহ্য অনুসন্ধানে
২০০৫ সালের ৭ অক্টোবর প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত এ লেখাটি এত দিন শুধু কাগজের পাতাজুড়ে ছিল, আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
প্রাচীন পুঁথি সংগ্রাহক, গবেষক, সম্পাদক হিসেবে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের (১৮৭১-১৯৫৩) খ্যাতি ও পরিচিতি। এ ক্ষেত্রে তাঁর বিস্ময়কর শ্রমনিষ্ঠা, নিরলস সাধনার কথা সর্বজনস্বীকৃত। এই জ্ঞানতাপস জীবিতকালেই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগচর্চার প্রবাদপুরুষ হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ ৬০ বছরের নিরন্তর সাধনায় তিনি আবিষ্কার ও সংগ্রহ করেছিলেন মধ্যযুগের বহুসংখ্যক পুঁথি-পাণ্ডুলিপি। তাঁর সংগৃহীত পুঁথির মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের বহু অজ্ঞাতপূর্ব কবি ও কাব্য। অনেক অজানা তথ্যের সংবাদ দিয়ে তিনি আমাদের সাহিত্যের ইতিহাস রচনায় স্মরণীয় অবদান রেখেছেন। তাঁর প্রতিভার আলোকময় স্বাক্ষর বহন করে তাঁর সম্পাদিত ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত নরোত্তম ঠাকুরের রাধিকার মানভঙ্গ (১৩০৮), কবি বল্লভের সত্যনারায়ণের পুথি (১৩২২), দ্বিজ মাধবের গঙ্গামঙ্গল (১৩২৩), মুক্তারাম সেনের সারদামঙ্গল (১৩২৪), শেখ ফয়জুল্লাহর গোরক্ষবিজয় (১৩২৪) ইত্যাদি গ্রন্থ। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ প্রকাশিত পুঁথি পরিচিতির পরিশিষ্টে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের ৪১২টি প্রবন্ধের তালিকা পাওয়া যায়। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত এবং আবুল আহসান চৌধুরী সম্পাদিত সাহিত্যবিশারদ রচনাবলীর প্রথম খণ্ডের ভূমিকা থেকে আরও ১৯টি রচনার কথা জানা যায়। কবি আলাওল রচিত ‘পদ্মাবতী’, ‘সয়ফুলমুলক বদিউজ্জামাল’, ‘সেকান্দরনামা’ ও ‘সপ্তপয়কর’—এই চারটি কাব্যের মোট ৭৭টি পুঁথি তিনি সংগ্রহ করেন। আলাওল সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর অনেক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাসের মানচিত্রকে আমাদের সামনে স্পষ্ট, পরিচিত ও পূর্ণাঙ্গতা দান করেছেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। সংগৃহীত পুঁথির দুষ্পাঠ্য পাঠোদ্ধার, কবি ও কবি সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিনিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় টীকা-ভাষ্য রচনার মধ্যে তিনি যে বিস্ময়কর প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যি তুলনারহিত। কিন্তু আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ শুধু পুঁথি সংগ্রাহক এবং পুঁথি পরিচিতির লেখক ছিলেন না, তাঁর আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা আরও বিচিত্র ও বহুমুখী ছিল।
তাঁর অন্বেষা ও অনুসন্ধিৎসার এলাকাগুলো হচ্ছে স্বদেশ, সমকালীন সমাজ, ভাষা, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস, প্রত্নকথা, পুঁথি-পুরাণের উৎসভূমি প্রভৃতি। এসব ক্ষেত্রে সাহিত্যবিশারদের যে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে, তা অনেকেই খেয়াল করেননি। খেয়াল না করার পেছনে কারণ একটিই—তাঁর পুঁথি-সংগ্রাহক খ্যাতি। প্রচলিত খ্যাতির আবরণে ঢাকা পড়ে গেছে তাঁর এসব মহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো।
আলাওল সম্পর্কে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তাঁর অনেক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। বলা যায়, বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগের ইতিহাসের মানচিত্রকে আমাদের সামনে স্পষ্ট, পরিচিত ও পূর্ণাঙ্গতা দান করেছেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ।
ইতিহাসবিষয়ক রচনাগুলোর মধ্যে ইসলামাবাদ তাঁর শ্রেষ্ঠ, আকর একটি গ্রন্থ। সাহিত্যবিশারদের মৃত্যুর পর এটি সৈয়দ মুর্তাজা আলীর সম্পাদনায় বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়। ইসলামাবাদ চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভাষা, সাংস্কৃতিবিষয়ক সবচেয়ে মূল্যবান গ্রন্থ। ‘চট্টগ্রাম’ নামের উৎপত্তি সম্পর্কে সাহিত্যবিশারদ প্রথম গ্রহণযোগ্য তথ্য প্রদান করতে গিয়ে এ গ্রন্থে লেখেন: “প্রবাদ আছে যে মুসলমান কর্তৃক গৌড় বিজয়ের কিছুকাল পরে ১২ জন আউলিয়া চট্টগ্রামে উপনীত হন। তাহারা পরীগণকে দূরীভূত করিবার জন্য একটি আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করিয়া উচ্চস্থানে স্থাপন করিলেন। কথিত আছে, ঐ বর্তিকার আলোকরশ্মি যতদূর পর্যন্ত ব্যাপ্ত হইয়াছিল, অপদেবতাগণ তথায় তিষ্ঠিতে না পারিয়া তথা হইতে পলায়ন করে। চট্টগ্রামে ‘চাটি’ অর্থ ‘আলোকবর্তিকা’। একটি চাটির সাহায্যে এই স্থানে সর্বপ্রথম মানব-বাসোপযোগী হইয়াছিল বলিয়া ইহার নাম ‘চাটিগাঁও’ হইয়াছে। এখনও জামাল খাঁ নামক স্থানে একটি উচ্চস্থান উক্ত বর্তিকা স্থাপনের স্থান বলিয়া নির্দিষ্ট হইয়া থাকে এবং উহা ‘চেরাগী-পাহাড়’ নামে খ্যাত।’ (রচনাবলী, ১ম খণ্ড, পৃ. ৬-৭)
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ইতিহাস ছাড়াও এ অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের বিবরণ, তীর্থ ও পুণ্যময়ী স্থানের বর্ণনা, বন্দর সূত্রে বাণিজ্য উপলক্ষে আগত পর্তুগিজ, চীন, আরবীয় বণিক, ইংরেজ প্রভৃতি আগুন্তুকের ইতিহাস অনুপুঙ্খভাবে পাওয়া যায় এ গ্রন্থে। চট্টগ্রাম অঞ্চল বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শাসকের অধীনে ছিল। সেই শাসকদের শাসনব্যবস্থার বিবরণ, প্রথা, বিধি, যুদ্ধবিগ্রহের প্রকৃতি লিখেছেন একজন সমাজবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ভাষা প্রসঙ্গে সাহিত্যবিশারদ লিখেছেন—‘স্থূলদৃষ্টিতে চট্টগ্রাম হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান এই জাতি চতুষ্টয়ের সৌভ্রাত্র সম্মিলনক্ষেত্র হইলেও অতি প্রাচীনকাল হইতেই ইহা নানা জাতির সঙ্গমস্থল। এজন্য ইহার ভাষায় নানা ভাষার শব্দ আসিয়া মিশিয়া গিয়াছে এবং এই কারণেই ইহার ভাষা মিশ্র ভাষা।’ মগদের মগী ও পালি ভাষার অনেক শব্দ, মুসলমানদের আগমনে আরবি, ফার্সি, উর্দু এবং হিন্দুদের রাঢ়ভাষা, পাহাড়ি অন্ত্যজ শ্রেণীর ভাষা, ইংরেজ, ওলন্দাজ, ইহুদিদের ভাষার শব্দ, উচ্চারণ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা গঠনে সহায়তা করেছে।
সাহিত্যবিশারদ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা থেকে বিভিন্ন ভাষার শব্দকে আলাদা করে সেগুলোর অর্থ ও উদাহরণও উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই ইসলামাবাদ গ্রন্থটি বাংলা ভাষার প্রথম আঞ্চলিক ইতিহাসের গ্রন্থ। উত্তরকালে আরও অনেকেই চট্টগ্রামের ইতিহাস রচনা করেছেন কিন্তু পথিকৃৎ হচ্ছেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ। অন্যদের সঙ্গে তাঁর বিশিষ্টতা এখানেই যে, তিনি কেবল ঘটনা বর্ণনা করেননি, লোকজীবন, সংস্কৃতি, আঞ্চলিক প্রকৃতি, বিশেষ বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন। প্রাচীন পুঁথি সংগ্রহ, পাঠোদ্ধার করতে গিয়ে তাঁর অন্তর্দৃষ্টির বিস্তৃতি ঘটেছিল। তাই ইতিহাস লিখতে বসে তিনি কেবল ঘটনা পরস্পরাকে বর্ণনা করেননি। একজন অনুসন্ধানী সমাজবিজ্ঞানী ও লোকবিজ্ঞানীর দৃষ্টি দিয়ে তথ্য-উপাত্য সংগ্রহ ও সংযোজন করেছেন।
সাহিত্যবিশারদ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘মেয়েলী গীত’, ‘ছেলে-ভুলনা ছড়া, ‘হেঁয়ালি’ ধাঁধা সংগ্রহ করেছেন। শুধু তা-ই নয় চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত এসব রচনার শব্দের চলিত বাংলার অর্থ সংযোজন করেছেন। যার ফলে যেকোনো পাঠক সহজে এসব রচনার রস আস্বাদন করতে পারবে।
লোকসংস্কৃতি সাহিত্যবিশারদের আগ্রহের আরেকটি উর্বর এলাকা। ‘বঙ্গের গ্রাম্য সাহিত্য’, ‘কয়েকটি প্রাচীন হেঁয়ালী’, ‘চট্টগ্রামী ছেলে-ভুলনা ছড়া’, ‘বাঙ্গালার মেয়েলী ব্রত’, ‘লৌকিক ব্রতবিবরণ’, ‘প্রাচীন মুসলমানী গীত-মালা’—এসব রচনার শিরোনাম দেখে বোঝা যায় সাহিত্যবিশারদের মনীষা, উৎসুক্য, অনুসন্ধিৎসা ও আগ্রহের প্রকৃতি কী রকম ছিল। ‘বঙ্গের গ্রাম্য-সাহিত্য’ প্রবন্ধে প্রাচীন বাংলায় গ্রামীণ পরিবেশে সাহিত্যরস পিপাসু বাঙালি মনন সম্পর্কে বলেছেন ‘এক সময়ে বঙ্গদেশে অপেক্ষাকৃত খুব বেশি সাহিত্য চর্চা ছিল। শুধু শিক্ষিত ব্যক্তিগণ যে সাহিত্যসেবা দ্বারা আমোদ উপভোগ করিতেন এমন নহে, নিরক্ষর লোকেরাও শিক্ষিত লোকের মুখে সাহিত্যসুধা পানে একান্ত আগ্রহহান্বিত ছিল।’ ধাঁধা, প্রবাদ, সারিগান, হেঁয়ালি, গীত প্রভৃতি লোকায়ত বাংলার রত্নসম্পদ। এগুলো মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, কাজের অবসরকে উপভোগ্য ও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। সাহিত্যবিশারদ চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ‘মেয়েলী গীত’, ‘ছেলে-ভুলনা ছড়া, ‘হেঁয়ালী’ ধাঁধা সংগ্রহ করেছেন। শুধু তাই নয় চট্টগ্রামী আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত এসব রচনার শব্দের চলিত বাংলার অর্থ সংযোজন করেছেন। যার ফলে যেকোনো পাঠক সহজে এসব রচনার রস আস্বাদন করতে পারবে। ‘লৌকিকব্রত বিবরণ’ প্রবন্ধে সাহিত্যবিশারদ লিখেছেন: ‘প্রসিদ্ধি আছে যে, লোকাচার শাস্ত্র অপেক্ষা বড়, কেবল প্রসিদ্ধ নয়, ইহা সর্ববাদী সম্মতও বটে। এই কারণেই যুগে যুগে সব সমাজেই শাস্ত্রাপেক্ষা লোকাচারের সমাদর বেশি। জগতের প্রায় সব জাতির মধ্যেই বহুতর শাস্ত্র বহির্ভূত আচার অনুষ্ঠান আবহমান কাল চলিয়া আসিতেছে।’ সাহিত্যবিশারদ সংগৃহীত ব্রতকথাগুলোর মধ্যে অঞ্চল-বিশেষের সমাজচিত্র আছে। নানা রকম কল্যাণচিন্তা থেকে লোকেরা এসব ব্রত পালন করে আসছে। তাঁর ভাষায়, ‘মানবহৃদয়ে ধর্মভাবের ক্রমবিকাশ বুঝিতে হইলে এই সকল ব্রতের ইতিহাস রক্ষা করা একান্ত দরকার।’ লোকবিজ্ঞানীদের মতে, শাস্ত্র বা ধর্মকথার বাইরে এসব ব্রত পালনের একটি কারণ এই যে, সেই যুগে মানুষেরা এখনকার মতো বিদ্যায়তনে গিয়ে লেখাপড়া শিখে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়নি বলে, এসব ব্রত পালন করে নিজেদের মঙ্গল সাধন করত। কেননা এসব ব্রত কথার মধ্যে একধরনের শিক্ষা বা অনুশীলন রয়েছে।
সংস্কৃতির শিকড় যে ঐতিহ্যের জমিনের গভীরে প্রোথিত, আমাদের অস্তিত্বের প্রেরণাও যে সেখানেই নিহিত-জীবনের শেষ পর্যায়ের এক অভিভাষণে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সে কথাই ঘোষণা করে দিলেন: ‘সংস্কৃতির জন্ম প্রেরণা যেখান হইতেই হউক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রসার পরিবেশ-নিরপেক্ষ নহে।
সংস্কৃতির শিকড় যে ঐতিহ্যের জমিনের গভীরে প্রোথিত, আমাদের অস্তিত্বের প্রেরণাও যে সেখানেই নিহিত—জীবনের শেষ পর্যায়ের এক অভিভাষণে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সে কথাই ঘোষণা করে দিলেন: ‘সংস্কৃতির জন্ম প্রেরণা যেখান হইতেই হউক না কেন, সংস্কৃতির উন্মেষ, বিকাশ ও প্রসার পরিবেশ-নিরপেক্ষ নহে। এই পরিবেশের প্রধান উপাদান ঐতিহ্য। ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার অর্থ ভিত্তিকে অস্বীকার করা। মাটি ভিত্তি করিয়া তাজমহল দাঁড়াইয়া আছে। সেই মাটির গুরুত্ব অনেকখানি। ইহা ছাড়া তাজমহল তৈরি সম্ভব ছিল না। তেমনি ঐতিহ্য সম্পর্কবিহীন সংস্কৃতি সাধনাও অসম্ভব।’ সাহিত্যবিশারদ মনে-প্রাণে তা বিশ্বাস করতেন বলেই ঐতিহ্য অনুসন্ধানে তিনি ছিলেন নিরলস, একনিষ্ঠ। তিনি বাঙালির ঐতিহ্য অন্বেষার এক পথিকৃৎ প্রাণপুরুষ।