ঢাকার প্রাচীন ইতিহাসের উৎস সম্পর্কে অনেক ইতিহাসবিদ ও গবেষক চতুর্থ শতকের সমুদ্র গুপ্তর (৩৩৫-৭৬) এলাহাবাদ প্রস্তর স্তম্ভলিপিতে উৎকীর্ণ ডবাক বা ডবকা শব্দটিকে নির্দেশ করেছেন। যদিও পরবর্তীকালে গবেষণায় প্রমাণ করা হয়, ‘ডবাক’ বলতে (মূলত আসাম ভ্যালি) ঢাকা নয়, আসামের নওগাঁও জেলার একটি অংশবিশেষকে বোঝানো হতো। প্রাচীন ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে তাঁরা এর সংযোগ ঘটিয়েছেনমাত্র। পরবর্তী নানা প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান আবিষ্কারে বলা যায়, এই অঞ্চলে মানববসতির প্রমাণ মিললেও আজকের ঢাকা বা ঢাকা শহর বলতে যে ভূখণ্ডকে বোঝায়, সেটি প্রাচীন ও মধ্যযুগের মধ্যবর্তী সময়েও একটি অখ্যাত স্থান ছিল।
ঢাকা একটি স্বতন্ত্র নাম ও সত্তায় পরিচিত। ঢাকার উত্থান মূলত সুলতানি আমলে ঢাকার নিকটবর্তী রাজধানী সোনারগাঁ পতনের পর। এর আগে ঢাকা ছিল একটি কসবা বা ছোট শহর। স্থানটি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে বয়ন ও কুটিরশিল্পের জন্য।
ইতিহাস রচনায় মুদ্রা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান। মুদ্রার গায়ে খোদাই করা তারিখ, শাসকের নাম ও প্রতীক থেকে সাম্রাজ্যের পরিধি, শাসনকাল, অর্থনৈতিক সচ্ছলতা, ধর্মীয় বিশ্বাস, শিল্পকলা ও সভ্যতার ক্রমবিবর্তনের তথ্য মুদ্রাতত্ত্বের মাধ্যমে জানা যায়।
ঢাকা একটি স্বতন্ত্র নাম ও সত্তায় পরিচিত। ঢাকার উত্থান মূলত সুলতানি আমলে ঢাকার নিকটবর্তী রাজধানী সোনারগাঁ পতনের পর। এর আগে ঢাকা ছিল একটি কসবা বা ছোট শহর। স্থানটি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে বয়ন ও কুটিরশিল্পের জন্য।
বাংলায় প্রথম মোগল মুদ্রা জারি করেন সম্রাট হুমায়ুন। ১৫৩৮ সালে যখন তিনি বাংলা অঞ্চলের তৎকালীন রাজধানী গৌড় অবরোধ করে শহরটি দখল করেন। ৯ মাস হুমায়ুন বাংলায় অবস্থানকালে এখান থেকে টঙ্কা (১০.৪-১০.৬) ও ভারী রৌপ্যমুদ্রা (১১.২-১১.৪ গ্রাম) জারি করেন। ‘বাঙ্গালা’ টাঁকশালের নামে এই মুদ্রাগুলো ওজন ও মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। অভিযান পরিচালনাকালে ভ্রাম্যমাণ সেনাছাউনি থেকে মুদ্রাগুলো প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ঢাকার বিকাশ ও প্রসিদ্ধি ঘটে মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে। আকবরের অন্যতম নবরত্ন আবুল ফজলের আইন–ই–আকবরীতে ‘ঢাকা বাজু’ নামে যে পরগনা দেখানো হয়, সেখানে পরগনার রাজস্ব আয় ছিল ১৯ লাখের অধিক দাম মুদ্রা (তাম্রমুদ্রা)। সরকার ই বাজুহার মোট ৩২টি পরগনার রাজস্ব আয়ের তালিকায় ঢাকা বাজুর স্থান ছিল নবম। মোগল রাজস্ব ব্যবস্থপনায় ঢাকা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ঢাকার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যখন ইসলাম খান বাংলার রাজধানী (১৬১০) রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং ঢাকার নামকরণ করেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে ‘জাহাঙ্গীরনগর’। মোগল ঢাকার টাঁকশাল থেকে নিয়মিত জাহাঙ্গীরনগর নামে মুদ্রা তৈরি করা হতো।
‘ঢাকা’ নামে ঢাকার প্রাচীন মুদ্রা
ঢাকার টাঁকশাল থেকে প্রস্তুত জাহাঙ্গীরনগর নামের মুদ্রা ঢাকার একমাত্র প্রাচীন মুদ্রা নয়। ঢাকাকে জাহাঙ্গীরনগর নামকরণের আগে ঢাকা থেকে মোগল সুবেদার মানসিংহের সময় সম্রাট আকবরের নামে মুদ্রা জারি করা হয়েছিল।
বাংলায় মোগল কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো বিদ্রোহী জমিদারদের দমন করতে অম্বরের রাজা মানসিংহ বাংলাদেশে এসেছিলেন। অভিযানকালে তিনি ১৬০২ সালে ঢাকা দখল করেন। বলা হয়, সেই সময় ভাওয়াল থেকে তাঁর সদর দপ্তর ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং এখানে ঘাঁটি স্থাপন করেন। তখন ঢাকায় মোগলদের একটি থানা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৬০৫ সালেও তিনি ঢাকায় অবস্থান করতেন বলে ধারণা করা যায়। রাজা মানসিংহ সম্রাট আকবরের অন্তিম অসুস্থতার কথা জানতে পেরে আগ্রায় ফিরে গিয়েছিলেন।
সম্প্রতি পাওয়া আকবরের এরূপ চতুষ্কোণ রৌপ্যমুদ্রায় দেখা যায়: (চিত্র -১) এক পিঠে—নাস্তালিক শৈলীতে অলংকৃত কালিমা তাইয়েবা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ এবং মার্জিনের চারপাশে চার খলিফার নাম ওসমান, আলী, আবু বকর ও ওমর। অপর পিঠে—শীর্ষ লাইনে তারিখ ১০১৫ হিজরি, দ্বিতীয় লাইনে বাদশাহ জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর গাজি এবং ওপরে মার্জিনের বাইরে আল্লাহ, আল্লাহ, আল্লাহ। নিচে মার্জিনের বাইরে টাঁকশাল বা মিন্টের নাম—দাল-আলিফ-কাফ-হা= দাকাহ (ফারসি), ঢাকা।
আকবর ১৪ জুমাদা ২, হিজরি ১০১৪ (২৭ অক্টোবর ১৬০৫) তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। মুদ্রাটি হিজরি ১০১৫–এর, যা আকবরের মৃত্যুর প্রায় সাত মাস পর জারি করা হয় ঢাকা থেকে। একে আকবরের নামে মরণোত্তর ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
ঢাকার টাঁকশাল থেকে প্রস্তুত জাহাঙ্গীরনগর নামের মুদ্রা ঢাকার একমাত্র প্রাচীন মুদ্রা নয়। প্রথম ১৬০২ সালে সম্রাট আকবরের নামে মুদ্রা জারি করা হয়েছিল যখন বাংলায় মোগল কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানো বিদ্রোহী জমিদারদের দমন করতে অম্বরের রাজা মানসিংহ বাংলাদেশে এসেছিলেন।
আকবরের এই ঢাকা মুদ্রা আবিষ্কারে বলা যায়, সুবেদার মানসিংহ ঢাকা অধিকার করে এখানে শুধু একটি থানা প্রতিষ্ঠা করেননি, একই সঙ্গে মোগল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ঢাকাকে কেন্দ্র করেই পরিচালনা করেন। একটি নতুন অধিকৃত অঞ্চলে মুদ্রা জারি সেই এলাকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব প্রকাশ করে। ঢাকা তাই ইসলাম খানের আগমনের আগেই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিল। ভৌগোলিক, সামরিক কৌশলগত ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করেই ইসলাম খান ঢাকাকে মোগল বাংলার রাজধানী নির্বাচন করতে প্রভাবিত হন।
ইসলাম খান চিশতীর ঢাকায় আগমন ও ‘জাহাঙ্গীরনগর’ মুদ্রা
ইসলাম খান চিশতী বিহারের সুবেদার থাকাকালে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরিত হয়েছিল কত সালে এবং কখন, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে দ্বিমত ছিল। সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা, দরবারি লেখক বা ঐতিহাসিকদের রচনা, সম্রাটের আত্মজীবনী ইত্যাদি বর্ণনা থেকে তাঁরা প্রমাণের চেষ্টা করেন, ইসলাম খান ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৬০৮ সালের জুলাই মাসে। সাধারণভাবে এ ধারণাই সবাই পোষণ করতেন। পরবর্তীকালে ড. আবদুল করিম যৌক্তিক ব্যাখ্যা–বিশ্লেষণ দিয়ে প্রমাণ করেন, ইসলাম খান চিশতী ১৬০৮ বা ১৬০৯–এ নন, তিনি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৬১০ সালের জুলাই মাসের দিকে। তবে তথ্য-উপাত্তের স্বল্পতার দরুন সম্ভবত তিনি সঠিক মাসটি নির্ধারণ করতে পারেননি।
ইসলাম খান চিশতীকে ১৬০৮ সালে (সম্ভবত মে মাসে) বাংলার সুবেদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সেই পরিক্রমায় তিনি রাজমহল হয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে সময় নেন দুটি বর্ষাকাল। অর্থাৎ ১৬১০ সালের বর্ষার আগে তিনি ঢাকায় পৌঁছান এবং ঢাকার নতুন নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর।
ইসলাম খান চিশতী তাঁর প্রশাসনিক সদর দপ্তর, সামরিক, বেসামরিক দপ্তর, দেওয়ানিসহ (রাজস্ব বিভাগ) সব মন্ত্রণালয় সঙ্গে করে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। মির্জা নাথান ‘বাহারীস্তান–ই–গায়বী’তে বলছেন, ইসলাম খানের যাত্রাকালে বাংলার পুরো সামরিক প্রশাসন ও সংস্থাপনের লোকজন সুবেদারের সঙ্গেই ছিলেন। ঢাকায় প্রবেশের সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বকশি ও দেওয়ান এবং আসার আগে রাজমহলে তিনি কিছু জায়গির বণ্টন করেন। তাই রাজস্ব–সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ টাঁকশাল বিভাগ রাজমহলে রেখে আসার কোনো কারণ ছিল না।
ইসলাম খান চিশতী তাঁর প্রশাসনিক সদর দপ্তর, সামরিক, বেসামরিক দপ্তর, দেওয়ানিসহ (রাজস্ব বিভাগ) সব মন্ত্রণালয় সঙ্গে করে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। ইসলাম খানের যাত্রাকালে বাংলার পুরো সামরিক প্রশাসন ও সংস্থাপনের লোকজন সুবেদারের সঙ্গেই ছিলেন।
ঢাকায় জাহাঙ্গীরনগর টাঁকশাল প্রতিষ্ঠার সঠিক তারিখ জানা যায় না। তবে সাধারণ রীতিতে মোগলরা কোনো জায়গা জয় বা নতুন নামকরণ করলে সেখানে সম্রাটের নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করার আইনি বৈধতার নিয়ম ছিল। সে বিবেচনায় এ পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর টাঁকশাল থেকে প্রাচীনতম মুদ্রার তারিখ পাওয়া যায় ১৬১০ সালের মে-জুন মাসের। মুদ্রা বিশারদদের মতে, মুদ্রাটি জাহাঙ্গীরের রাজত্ব বর্ষের পঞ্চম সালের হয়ে থাকলে ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের সময় এবং জাহাঙ্গীরনগর নামকরণের প্রাসঙ্গিকতায় বিচার–বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
মুদ্রাটির দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, এর মুখ্য পিঠে পারসিয়ান কিংবদন্তিতে ‘নূরউদ্দিন জাহাঙ্গীর শাহ আকবর শাহ’ এবং গৌন পিঠে ওপরে পারস্য মাস ‘খুরদাদ’, নিচে ‘যার্ব জাহাঙ্গীরনগর’ ও রাজত্ববর্ষ সানা ‘৫’ (RY 5) লেখা রয়েছে। ওজন ১১.৪৫ গ্রাম।
সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজ্যাভিষেক হয় হিজরি ৯৮৪ আবান মাসের ১২ তারিখ, অর্থাৎ ২৪ অক্টোবর ১৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে (রাজত্ববর্ষ এক—RY 1)। মোতাবেক জাহাঙ্গীরের পঞ্চম রাজত্ববর্ষ (RY 5) হয় (১২ আবান, হিজরি ৯৮৮) ২৪ অক্টোবর ১৬০৯ থেকে ২৩ অক্টোবর ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ। খুরদাদ কোনো আরবি মাসের নাম নয়; বরং এটি পারসিয়ান বা জালালি বর্ষের মাস। মোগল সম্রাট হুমায়ুনের রাজ্য হারিয়ে পারস্যে আশ্রয় গ্রহণ এবং দিল্লির মসনদ ফিরে পাওয়ার বিষয়ে ইরানের শাহের (সাফাভি) সহায়তা বিশেষ অবদান রেখেছিল। পরবর্তীকালে আকবরের সময় থেকে মোগল দরবারের দাপ্তরিক ভাষা, মাস গণনায় পারস্য বর্ষপঞ্জি, নববর্ষ উদ্যাপন (নওরোজ) ইত্যাদি ব্যাপক আকারে অনুসরণ করা হতো, যা জাহাঙ্গীরের সময়েও প্রভাবিত ছিল।
পারসিয়ান বা জালালি বর্ষ ৯৮৯ সালের খুরদাদ মাসের সময়কাল ২২ মে থেকে ২১ জুন ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দ। মুদ্রাটি স্পষ্টত ১৬১০ সালের ২২ মে থেকে ২১ জুনের মধ্যে যেকোনো সময়ে জাহাঙ্গীরনগর টাঁকশাল থেকে জারি করা হয়েছিল। ড. আবদুল করিম ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের ব্যাপারে একটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন—‘বর্ষার প্রাক্কালে’। বাংলা মাস হিসেবে ৯৮৯ জালালি পঞ্জিকায় এই খুরদাদ মাস হয় ০৮ জ্যৈষ্ঠ ১০১৭ থেকে ৭ আষাঢ় ১০১৭ বঙ্গাব্দ। সেটি ড. আবদুল করিমের দাবির সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। তবে তিনি যে মাসের কথা উল্লেখ করেছেন, তা হলো জুলাই মাসের দিকে। কিন্তু এই মুদ্রায় প্রমাণিত হয়, ইসলাম খান ঢাকায় প্রবেশ করেছেন ২২ মে থেকে ২১ জুনের মধ্যে যেকোনো সময় বা তারও আগে। অবশ্যই জুলাই মাসে নয়। এই সময়ের মধ্যে বা আগে ইসলাম খান ঢাকার নামকরণ জাহাঙ্গীরনগর করে টাঁকশাল থেকে মুদ্রা জারি করেন। সে হিসাবে মুদ্রাটি ইসলাম খানের ঢাকায় আগমনের প্রথম বছরের, অর্থাৎ ১৬১০ সালের শুধু মুদ্রা নয়; বরং প্রথম মাসে জারি করা জাহাঙ্গীরনগর নামের প্রথম প্রকাশ। কেননা মুদ্রায় রাজত্ববর্ষ (RY) বা পার্সিয়ান মাস একটু হেরফের হলে রাজধানী হিসেবে ঢাকার শুরুর ইতিহাসটি অন্যভাবে মূল্যায়ন করতে হতো। ঐতিহাসিকদের এত বিচার–বিশ্লেষণ প্রশ্নের সম্মুখীন হতো নিঃসন্দেহে।