কেন এত জনপ্রিয় হলো বিষাদ-সিন্ধু

১৮৮৫ সালে বিষাদ-সিন্ধুর প্রথম পর্ব প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পরপরই এটি বিপুলভাবে জনপ্রিয়তা পায়। মীর মশাররফ হোসেনের বিশেষ খ্যাতি এই বইয়ের জন্যই। উনিশ শতকের দ্রুত পরিবর্তনশীল গদ্য ভাষার বিচারে বইটির তাৎপর্যপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। লেখকের নিজেরও রয়েছে শক্তিশালী গদ্যশৈলী। এই লেখায় প্রকাশের ১৪০ বছর পরও বিষাদ-সিন্ধুর জনপ্রিয়তার কার্যকারণ খোঁজা হয়েছে।

মাসুক হেলালের আঁকা মীর মশাররফ হোসেনের প্রতিকৃতি অবলম্বনে অলংকরণ: এস এম রাকিবুর রহমান

মীর মশাররফ হোসেন উনিশ শতকের শেষার্ধের লেখক। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ (মহরম পর্ব ১৮৮৫) যখন প্রকাশিত হয়, তখন বাংলা গদ্য নিরীক্ষার কাল পার করেছে। এই নিরীক্ষা বলতে ভাষার সচেতন ও অসচেতন দুই রকম প্রয়োগই বুঝতে হবে। তত দিনে প্যারীচাঁদ মিত্র ও কালীপ্রসন্ন সিংহ সাহিত্যে সংস্কৃতঘেঁষা সাধু গদ্যের বিপরীতে কথ্য ভাষার প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। যদিও ‘আদর্শ ভাষা’র মানদণ্ডে তাঁদের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ (১৮৫৭) কিংবা ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ (১৮৬২) পণ্ডিতজনের কাছে নিরঙ্কুশ গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এই শতকে বাংলা ভাষার প্রমিতায়নে সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি বাংলা ভাষার গদ্যশৈলীকে ধরতে পেরেছিলেন এবং সেই ভাষার ওপর আস্থা রেখেই অনুবাদ ও অপরাপর গ্রন্থ লিখে গেছেন। মশাররফ হোসেন সাহিত্যচর্চার সূচনাকালে এ রকম প্রায়-প্রস্তুত বাংলা গদ্য পেয়েছিলেন।

বিষাদ-সিন্ধু শুধু বহুলভাবে পঠিত হয়নি, বহুলভাবে শ্রুতও হয়েছে। সাধু গদ্য কেন পাঠকপ্রিয় হলো কিংবা নিরক্ষর শ্রোতার কানেও ‘স্বাদু’ হয়ে উঠল, সেটি একটি প্রশ্ন বটে! আবার ‘বিষাদ-সিন্ধু’র তিন দশক পরে ‘সবুজপত্র’ (১৯১৪) পত্রিকায় প্রকাশিত প্রমথ চৌধুরীর ‘মুখের ভাষা’-নির্ভর চলিত গদ্য কেন খটমট ঠেকে, এটি আরেক প্রশ্ন। তার মানে, সর্বনাম আর ক্রিয়াপদের বদল ঘটালে ভাষা ‘চলিত’ হতে পারে, কিন্তু সেই গদ্যকে ‘মুখের ভাষা’ বলে দাবি করা যায় না। বক্তব্য-বিষয়, যুক্তির ধরন আর প্রকাশের ভঙ্গি লিখিত গদ্যকে জটিল ও অস্পষ্ট করে তুলতে পারে। যে কারণে, আরও পরের লেখক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের লেখায় প্রবেশ করা বিজ্ঞ পাঠকের জন্যও দুরূহ হয়।

স্রেফ ধর্মকে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে মেনে নেওয়াও কঠিন। কারণ, মশাররফ ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করেছেন; তবে ধর্মকে ‘বিষয়’ করেননি বা করতে চাননি। চাইলে গ্রন্থটি উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করত না। এমনকি এটি শিল্পোত্তীর্ণও হতে পারত না।

আবার স্রেফ ধর্মকে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র জনপ্রিয়তার কারণ হিসেবে মেনে নেওয়াও কঠিন। কারণ, মশাররফ ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করেছেন; তবে ধর্মকে ‘বিষয়’ করেননি বা করতে চাননি। চাইলে গ্রন্থটি উপন্যাসের মর্যাদা লাভ করত না। এমনকি এটি শিল্পোত্তীর্ণও হতে পারত না। ‘গাজী মিয়াঁর বস্তানী’ (১৮৯৯) পর্যন্ত সমাজ-দৃষ্টিভঙ্গি-ভাষা—এই তিনের সমন্বিত প্রকাশে মশাররফকে শিল্পীই বলতে হবে; কিন্তু এরপরে জীবনের বাকি সময়ে তিনি লিও তলস্তয় কিংবা আরও অনেক লেখকের মতো নিজের ধর্মবোধ দিয়ে চালিত হয়েছেন।

বিষাদ–সিন্ধু বইয়ের প্রচ্ছদ
সংগৃহীত

‘বিষাদ-সিন্ধু’র আলোচনায় ধর্ম প্রসঙ্গকে অবশ্য মশাররফ থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। কারণ, এই গ্রন্থের সূত্র লেখক পেয়েছিলেন দোভাষী পুঁথির ধর্মীয় কাহিনির মধ্যে। কারবালা–সম্পর্কিত লোকমুখে প্রচলিত কাহিনিও তাঁর প্রেরণা হয়েছে। মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনি যে জনপ্রিয় হয়, এর প্রমাণ জাত মহাকাব্যগুলোয় দেখা যায়, আমাদের ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’তেও (১৯২৩) তা দুর্লক্ষ নয়। ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনির বিশেষ বিশেষ জায়গা অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক লোকবিশ্বাসের ওপর নির্মিত। এই দৈবযোগ ও অলৌকিকত্বকে কাজী আবদুল ওদুদ জীবনের জন্য ‘অভিশাপ’, সাহিত্যের জন্য ‘অবাঞ্ছিত’ এবং সাহিত্যিক ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে ‘ব্যর্থ’ বলেছেন। সে যা–ই হোক, মশাররফ যে গল্প তৈরিতে পারঙ্গম, এর প্রমাণ রেখেছেন ‘রত্নবতী’তেই (১৮৬৯)—রূপকথাকে আশ্রয় করে রীতিমতো উপাখ্যান তৈরি করেছেন।

মীর মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভূমিকায় দাবি করেছেন, ফারসি ও আরবি গ্রন্থ থেকে মূল ঘটনার সারাংশ নিয়ে এটি রচিত। তবে মুনীর চৌধুরী সরাসরি তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, মুহম্মদ খান, হেয়াত মামুদ, গরীবুল্লাহ্ এবং দোভাষী পুঁথির অন্যান্য কবিও পাঠকের মনে ‘ভক্তিশ্রদ্ধার ভাব’ জাগানোর জন্য এ রকম অসত্য স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। মশাররফ হোসেন তাঁর পূর্বসূরিদের অনুকরণ করেছেন মাত্র। মুনীর চৌধুরী আরও বলেন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র অলৌকিক সব ঘটনা অবিকল পুঁথির নিয়মে ঘটেছে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দোভাষী পুঁথি যদি জনপ্রিয় হয়ে থাকে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ক্ষেত্রেও তা না হওয়ার কারণ নেই।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনির বিশেষ বিশেষ জায়গা অবিশ্বাস্য ও অলৌকিক লোকবিশ্বাসের ওপর নির্মিত। এই দৈবযোগ ও অলৌকিকত্বকে কাজী আবদুল ওদুদ জীবনের জন্য ‘অভিশাপ’, সাহিত্যের জন্য ‘অবাঞ্ছিত’ এবং সাহিত্যিক ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে ‘ব্যর্থ’ বলেছেন।

অবশ্য দোভাষী পুঁথির ভাষা আর ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষা এক নয়। এদের পার্থক্য কেবল পদ্য ভাষা আর গদ্য ভাষায় নয়, শব্দ-প্রয়োগেও। মশাররফ হোসেন ‘আদর্শ গদ্য ভাষা’র সঙ্গে কেমন করে পরিচিত হলেন, তার উল্লেখ পাওয়া যায় আত্মজীবনীতে। সেখানে বলেছেন, কিশোরকালেই তিনি পরিচিত হন তারাশঙ্কর তর্করত্ন ও বিদ্যাসাগরের গদ্য-রচনার সঙ্গে। এমনকি সাংবাদিকতার সূত্রে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’–এর (১৮৩১) সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ঘটে। আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন, মশাররফ তাঁর ‘গোরাই ব্রীজ’ অথবা ‘গৌরী-সেতু’ (১৮৭৩) কাব্যের জন্য ‘বঙ্গদর্শন’ (১৮৭২) পত্রিকায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছিলেন। এই প্রশংসাকাব্যের শিল্পমূল্যের জন্য নয়, বরং তা ‘বিশুদ্ধ’ ভাষাদর্শের জন্য।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র এমন কিছু প্রসঙ্গ আছে, যেগুলো এর জনপ্রিয়তাকে উসকে দিয়েছে। এ রকম একটি প্রসঙ্গ রূপজ প্রেম। রূপজ প্রেমেই এজিদ পুড়েছে; পাঠককেও পুড়িয়েছে। উপন্যাসে আছে, এজিদের ব্যাকুলতা দেখে মাবিয়া উৎকণ্ঠিত হন এবং পুত্রের কাছে এই ব্যাকুলতার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। জবাবে পিতার কাছে এজিদ খুব সামান্যই নিজেকে উন্মুক্ত করতে পারে: ‘পিতঃ! আমার দুঃখ অনন্ত, এই দুঃখের সীমা নাই, উপশমের উপায় নাই। আমি নিরুপায় হইয়াই জগতের আশা হইতে একেবারে বহু দূরে দাঁড়াইয়াছি। আমার বিষয় বৈভব, ধন জন ক্ষমতা, সমস্তই অতুল,—তাহা আমি জানি। আমি অবোধ নই; কিন্তু আমার অন্তরে যে মোহিনীর মূর্তির সুতীক্ষ্ণ নয়ন-বাণে বিদ্ধ হইতেছে, সে বেদনার উপশম নাই।...’

গ্রন্থের আরেকটি প্রসঙ্গ ‘সপত্নীবাদ’ বা দুই সতিনের বিরোধ। জয়নাবের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতেই জাএদা স্বামীকে বিষ প্রয়োগ করে এবং তৃতীয়বার সফলতার পরে মনে মনে বলে: ‘তোকে কাঁদাইতেই এই কাজ করিয়াছি। যদি স্বামীকে ভালোবাসিয়া থাকিস, তবে আজ কেন—চিরকালই কাঁদিবি।...যদি জাএদা বাঁচিয়া থাকে, তবে দেখিস জাএদার মনের দুঃখের পরিমাণ কত? শুধু কাঁদাইয়াই ছাড়িবে না। আরও অনেক আছে।’ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র এক যুগ আগে প্রকাশিত ‘বসন্তকুমারী’ নাটকেও (১৮৭৩) মীর মশাররফ সপত্নীবাদকে উপজীব্য করেছেন।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র এই সপত্নীবাদ ‘ঐতিহাসিক’—এভাবে বিচার করা চলে না। কারণ, মশাররফ ইতিহাস লেখেননি এবং লেখার আগে ইতিহাসের খোঁজও করেননি। এ বিষয়ে মশাররফের আলোচকদের মধ্যে দ্বিধা নেই। তবে ভাষা ও কাহিনির যত অতীত-প্রভাবই থাক, মশাররফ হোসেনের নিজস্ব গদ্যশৈলী ‘বিষাদ-সিন্ধু’র সবচেয়ে বড় শক্তি।

মীর মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভূমিকায় দাবি করেছেন, ফারসি ও আরবি গ্রন্থ থেকে মূল ঘটনার সারাংশ নিয়ে এটি রচিত। তবে মুনীর চৌধুরী সরাসরি তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, দোভাষী পুঁথির অন্যান্য কবিও পাঠকের মনে ‘ভক্তিশ্রদ্ধার ভাব’ জাগানোর জন্য এ রকম অসত্য স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

প্রায় প্রত্যেক সমালোচকই একমত, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষা কাব্যময় ও গতিশীল। গ্রন্থটির বিবরণ শুধু সাধু ভাষায় রচিত নয়, সম্ভ্রান্ত বা অন্ত্যজ সব চরিত্রের সংলাপও সাধু ভাষায় লেখা। আবার উনিশ শতকীয় আদর্শে গ্রন্থে তৎসম শব্দের ব্যবহার বেশি। এরপরও এর কাব্যময়তা ও গতিশীলতার কারণ—লেখকের ভাব প্রকাশের উচ্ছ্বাস। গদ্য ভাষায় ব্যাপকভাবে ভাবোচ্ছ্বাস ব্যবহার করে মশাররফ ভাষার গতি ও স্ফূর্তি ধরে রেখেছেন। তা ছাড়া মাঝেমধ্যেই তিনি পাঠককে লেখায় নিবিষ্ট করে রাখার জন্য সম্বোধন করে কথা বলেন; যেমন ‘পাঠক, ঐ শুনুন—ডঙ্কা! তুরী—ভেরীর বাদ্য! শুনিতেছেন? জয়ধ্বনির দিকে মন দিয়াছেন?’

মশাররফ প্রায়ই একাধিক বিশেষণের প্রয়োগ করেছেন; যেমন ‘ঈশ্বরের নিয়োজিত কার্যে বুদ্ধি অচল, অক্ষম, অস্ফুট এবং অতি তুচ্ছ।’ মাঝেমধ্যে তুলনাবাচক শব্দেরও প্রয়োগ হয়েছে একসঙ্গে অনেকগুলো; যেমন ‘তুমি আমার অন্ধের যষ্টি, নয়নের পুত্তলী, মস্তকের অমূল্য মণি, হৃদয়ভাণ্ডারের মহামূল্য রত্ন, জীবনের জীবনীশক্তি, আশাতরু মুঞ্জরিত, আশা-মুকুল অসময়ে মুকুলিত, আকাশকুসুম অসময়ে প্রস্ফুটিত’। আবার পুনঃপুন একই ক্রিয়াপদের প্রয়োগ আছে; সেটি কখনো কখনো নাটকীয় ভঙ্গি এনেছে; যেমন ‘জগৎ দেখিবে, বৃক্ষপত্র দেখিবে, আকাশ দেখিবে, আকাশের চন্দ্র-সূর্য দেখিবে হোসেনের ধৈর্য, শান্তি ও বীরপ্রতাপ কত দূর!’ মশাররফ প্রায়ই একাধিক বিশেষণের প্রয়োগ করেছেন; যেমন ‘ঈশ্বরের নিয়োজিত কার্যে বুদ্ধি অচল, অক্ষম, অস্ফুট এবং অতি তুচ্ছ।’ মাঝেমধ্যে তুলনাবাচক শব্দেরও প্রয়োগ হয়েছে একসঙ্গে অনেকগুলো; যেমন ‘তুমি আমার অন্ধের যষ্টি, নয়নের পুত্তলী, মস্তকের অমূল্য মণি, হৃদয়ভাণ্ডারের মহামূল্য রত্ন, জীবনের জীবনীশক্তি, আশাতরু মুঞ্জরিত, আশা-মুকুল অসময়ে মুকুলিত, আকাশকুসুম অসময়ে প্রস্ফুটিত’। আবার পুনঃপুন একই ক্রিয়াপদের প্রয়োগ আছে; সেটি কখনো কখনো নাটকীয় ভঙ্গি এনেছে; যেমন ‘জগৎ দেখিবে, বৃক্ষপত্র দেখিবে, আকাশ দেখিবে, আকাশের চন্দ্র-সূর্য দেখিবে হোসেনের ধৈর্য, শান্তি ও বীরপ্রতাপ কত দূর!’

একই জাতীয় শব্দের পৌনঃপুনিক প্রয়োগকে মুহম্মদ আবদুল হাই বলেছেন ‘বাহুল্য’ ও ‘সংযমহীনতা’। তবে এটিকে তিনি ‘মহরম পর্ব্বে’র জন্য কোনো ত্রুটি মনে করেননি; আবার ‘উদ্ধার পর্ব্ব’ ও ‘এজিদ–বধ পর্ব্বে’র জন্য একই বিষয়কে ঔপন্যাসিকের ‘স্বাভাবিক দোষ’ হিসেবে দেখেছেন। ‘দোষ’ বলা সত্ত্বেও আবদুল হাই স্বীকার করেছেন, এই গ্রন্থের গদ্য ‘শব্দবন্ধে ও ছন্দস্পন্দে’ ‘নদীর খরস্রোতের মতো’ দ্রুতবেগে প্রবাহিত হয়ে চলে।

মশাররফের বাক্য যোজনের কৌশলও বিস্ময়কর। ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে একই বাক্যের ভেতরে একাধিক বাক্য বা বাক্যাংশ স্থাপন করেছেন: ‘ভাবিয়া দেখিলে প্রতীতি হয়, মানুষের মনেই ভালোবাসার জন্ম; ইহা কাহাকেও শিক্ষা দিতে হয় না, দেখাদেখিও কেহ শিক্ষা করে না, ভালোবাসা স্বভাবতই জন্মে।’ আবার একের পর এক সমজাতীয় বাক্য সাজিয়ে ভাবকে জমিয়ে তুলেছেন, ‘জগতে শত শত ভালোবাসার জন্ম হইয়াছে, অনেকেই ভালোবাসিয়াছে, তাহাদের কীর্তিকলাপ—আজ পর্যন্ত কেন, জগৎ বিলয় না হওয়া পর্যন্ত মানব হৃদয়ে সমভাবে অঙ্কিত থাকিবে।...ভালোবাসার সমুদ্র যখন হৃদয়াকাশে মানসচন্দ্রের আকর্ষণে স্ফীত হইয়া উঠে, তখন আর পাত্রাপাত্র জ্ঞান থাকে না। পিতামাতা, সংসার-ধর্ম, এমনকি ঈশ্বরকেও মনে থাকে কি না সন্দেহ।’

মুসলমানি সাহিত্যে আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা ও হরফের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। উনিশ শতকের প্রায় শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হয়ে থেকেছে। মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’র মাধ্যমে কলকাতার গদ্য ভাষার সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদের সংযোগ ঘটালেন।

লেখক আবেগের আতিশয্য যেখানে ঘটাতে চেয়েছেন, সেখানে বাক্যকে ছোট ছোট করে উপস্থাপন করেছেন; যেমন ‘সীমার নাই? আমার চির হিতৈষী সীমার নাই? মহাবীর সীমার ইহজগতে নাই? হায়! যে বীরের পদভারে কারবালা প্রান্তর কাঁপিয়াছে, যাহার অস্ত্রের তেজে রক্তের স্রোত বহিয়াছে, হোসেন শির দামেস্কে আসিয়াছে, সেই বীর নাই?’ এখানকার প্রথম তিন বাক্য লেখক এভাবেও লিখতে পারতেন: ‘আমার চির হিতৈষী মহাবীর সীমার নাই?’ কিন্তু ছোট ছোট বাক্যে বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ নিয়েছেন এবং পুনরুক্তির মাধ্যমে তিনি ভাষাকে গতিময় ও উপন্যাসটিকে স্ফীত করেছেন।

মশাররফ-উত্তর লেখকদের মধ্যে শেখ আবদুর রহিম মন্তব্য করেছেন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র বিষাদমাখা সুর সরাসরি কানের ভেতর দিয়ে মর্মে প্রবেশ করে। আবার কায়কোবাদ তাঁর ‘মহরম শরীফ’ (১৯৩২) কাব্যের ভূমিকায় ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কঠোর সমালোচনা করে লিখেছেন, এটি ‘পূতিগন্ধময় রাবিশ’ ও ‘কাল্পনিক বাজে কথায় পরিপূর্ণ’। তিনি গ্রন্থটিকে ‘ইতিহাস-বিচ্ছিন্ন’ আর এর কাহিনিকে ‘অবান্তর’ বলেছেন। অথচ প্রকাশের পর অন্তত এক শতাব্দী জুড়ে এটি এ অঞ্চলের সাধারণ মুসলমানের ঘরে পবিত্র গ্রন্থের মর্যাদা নিয়ে থেকেছে, ভক্তিভরে পঠিতও হয়েছে। আর এই গ্রন্থের মধ্য দিয়েই বাঙালি মুসলমান প্রমিত ভাষায় প্রবেশ করেছে।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র আগপর্যন্ত বাংলা লিপি ও ভাষা মুসলমান বাঙালির শিক্ষা ও চর্চার বাহন হিসেবে পুরোদস্তুর আদর্শ হয়ে উঠতে পারেনি। সতেরো শতকের শেষার্ধের কবি আবদুল হাকিম ‘বঙ্গভাষা’ কবিতায় বাংলা ভাষার প্রতি তীব্র অনুরাগ ব্যক্ত করেছেন; কিন্তু সেটিও আরবি হরফে লেখা! আঠারো শতকজুড়ে মুসলমানি সাহিত্যে আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা ও হরফের বহুল ব্যবহার দেখা যায়। উনিশ শতকের প্রায় শেষ প্রান্ত পর্যন্ত আরবি-ফারসি-উর্দু ভাষা বাংলা অঞ্চলের মুসলমানদের শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হয়ে থেকেছে। মীর মশাররফ হোসেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’র মাধ্যমে কলকাতার গদ্য ভাষার সঙ্গে সাধারণ মুসলমানদের সংযোগ ঘটালেন। গ্রন্থের জনপ্রিয়তার কারণে সেই সংযোগ বিপুলবিস্তারী হয়েছে।