কেন আজও প্রাসঙ্গিক সুভাষ মুখোপাধ্যায়

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯—৮ জুলাই ২০০৩) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাংলা কবিতার ইতিহাসে এমন কিছু কবি আছেন, যাঁদের সাহিত্যকে কেবল নন্দনতাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তাঁদের কবিতা একদিকে যেমন শিল্পের গভীর সৌন্দর্য নির্মাণ করে, অন্যদিকে তেমনি সময়, সমাজ, রাজনীতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় (১৯১৯-২০০৩) সেই বিরল কবিদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি গণমানুষের কবি। তাঁর কবিতায় যেমন শ্রমজীবী মানুষের মুখ উঠে এসেছে, তেমনি এসেছে প্রেম, প্রকৃতি, বার্ধক্য, মৃত্যু, আত্মসমালোচনা ও সময়ের নির্মম বাস্তবতা। আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে সুভাষ মুখোপাধ্যায় এমন এক কণ্ঠস্বর, যিনি কবিতাকে অভিজাত পাঠকসমাজের সীমা থেকে বের করে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। শৈল্পিক কারুকাজের চেয়ে জীবনের আসল রূপ, লৌকিকতার চেয়ে খাঁটি মানবিকতা এবং কোনো রকম জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ভাষার বদলে মানুষের মুখের সহজ ভাষাই তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। ফলে তাঁর কবিতা যেমন রাজনৈতিক, তেমনি গভীরভাবে মানবিক; যেমন প্রতিবাদী, তেমনি কোমল; যেমন বাস্তবমুখী, তেমনি অন্তর্মুখী। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে মানুষের বৈষম্যলাঞ্ছিত দুর্দশার বিরুদ্ধে দ্রোহ তাঁর কবিতার মূল সুর।

শৈশব, শিক্ষা ও সাহিত্যজীবনের সূচনা

১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নদীয়ার কৃষ্ণনগরে তাঁর জন্ম। পরে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। ১৯৪১ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে দর্শন বিষয়ে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর আশুতোষ কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ নিলেও রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগঠনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন আর দীর্ঘায়িত হয়নি। ছাত্রজীবনেই সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি বামপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময়ই তাঁর রাজনৈতিক চেতনা সুসংগঠিত হয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল গভীর এক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বাংলার পঞ্চাশের মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থান এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন—এই সবকিছুকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই সময়কার বাংলা কবিতা যখন রূপ-রস-ছন্দের মায়াজালে আবদ্ধ, তখন সুভাষ মুখোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন সম্পূর্ণ নতুন এক কাব্যদর্শন। মাত্র ২১ বছর বয়সে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ পদাতিক (১৯৪০)। এই গ্রন্থ বাংলা কবিতায় এক নতুন যুগের সূচনা করে। তখনকার বাংলা কবিতায় রবীন্দ্র-উত্তর আবেগ, জীবনানন্দীয় নিঃসঙ্গতা কিংবা বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের প্রবণতার পাশাপাশি সুভাষ মুখোপাধ্যায় নিয়ে এলেন সংগ্রামের ভাষা। পদাতিক নামটিই প্রতীকী। তিনি কোনো সেনাপতি নন, তিনি পদাতিক—সামনের সারির সাধারণ সৈনিক। 

সুভাষ মুখোপাধ্যায়
ছবি: সংগৃহীত
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শন ছিল খাঁটি মার্ক্সবাদী সাম্যবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের মুক্তি সম্ভব। তাঁর এই রাজনৈতিক দৃঢ়তা কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে

পদাতিক-এর প্রথম কবিতাতেই তিনি পুরোনো রোমান্টিকতাকে বিদায় জানিয়ে লিখলেন:

‘প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য,
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।’

(মে-দিনের কবিতা, পদাতিক)

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের এই অমোঘ উক্তি স্পষ্ট করে দেয় যে তিনি সুন্দরের উপাসক হলেও সেই সুন্দরকে অর্জনের জন্য লড়াইয়ের ময়দানকে বেছে নিয়েছেন। ১৯৪০ থেকে ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে চিরকুট (১৯৪৬), ‘অগ্নিকোণ’ (১৯৪৮) অন্যতম। এই পর্বের কবিতাগুলোতে তীব্র ক্ষোভ, বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থার প্রতি বিদ্রূপ এবং শ্রমজীবী মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে। তিনি মধ্যবিত্তের দ্বিধাদ্বন্দ্বকে আঘাত করে মেহনতি মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

ব্যক্তিজীবন, রাজনৈতিক চেতনা ও মার্ক্সবাদী দৃষ্টিভঙ্গি

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিসত্তাকে তাঁর রাজনৈতিক সত্তা থেকে আলাদা করা অসম্ভব। ছাত্রাবস্থায় তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সংস্পর্শে আসেন এবং ১৯৪২ সালে দলের সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে যোগ দেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। ১৯৪৬ সালে সাংবাদিক হিসেবে দৈনিক স্বাধীনতা পত্রিকায় যোগ দেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তবে দ্রুতই দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তাঁর জীবনকে এক নতুন স্রোতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কমিউনিস্ট পার্টিকে বেআইনি ঘোষণা করা হলে অন্যান্য পার্টিকর্মীদের মতো তিনিও দু-বার কারাবরণ করেন। এই বন্দিজীবনের চরম প্রতিকূলতার মধ্যেই তিনি দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক অনশন ধর্মঘটে সক্রিয় ভূমিকা নেন। অবশেষে ১৯৫০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। কিন্তু মুক্তির পর শুরু হয় আরেক কঠিন লড়াই—তীব্র আর্থিক অনটন। টিকে থাকার লড়াইয়ে মাত্র ৭৫ টাকা মাসিক বেতনে একটি নতুন প্রকাশনা সংস্থায় সাব–এডিটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। অবশ্য এই চাকরিতে তিনি বেশি দিন বাঁধা থাকেননি। ১৯৫১ সালে সেখান থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি পরিচয় পত্রিকার সম্পাদনার ভার নেন। একই বছর প্রখ্যাত লেখক গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৫২ সালে জীবনযাত্রায় আসে এক বড় বদল। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে বজবজের একটি শ্রমিক বস্তির মাটির ঘরে থাকতে শুরু করেন তিনি। সেখানে তিনি কেবল কবিতার চড়াই-উতরাইয়ে আটকে না থেকে সরাসরি মেহনতি মানুষের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠেন; কাঁধ মেলান চটকলশ্রমিকদের সংগঠিত করার লড়াইয়ে। এর পরবর্তী সময়ে কলকাতার বন্দরাঞ্চলেও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শন ছিল খাঁটি মার্ক্সবাদী সাম্যবাদ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের মুক্তি সম্ভব। তাঁর এই রাজনৈতিক দৃঢ়তা কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে:

সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেবল তাত্ত্বিক বামপন্থী ছিলেন না; চটকলশ্রমিক, ট্রামকর্মী ও কৃষকদের আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। চটের বস্তা কাঁধে ফেলা কুলিদের কষ্ট, কিংবা কয়লাখনির অন্ধকারের শ্রমিকদের দীর্ঘশ্বাস তিনি নিজের বুকে ধারণ করেছিলেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন এক জায়গায় স্থির থাকেনি। ষাটের দশকের পর, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভাঙন এবং জরুরি অবস্থার সময়কার রাজনৈতিক জটিলতা তাঁর চেনা আদর্শিক বিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়।

‘কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?
কুয়াশাকঠিন বাসর যে সম্মুখে।
লাল উল্কিতে পরস্পরকে চেনা—
দলে টানো হতবুদ্ধি ত্রিশঙ্কুকে,
কমরেড, আজ নবযুগ আনবে না?’

(সকলের গান, পদাতিক)

চিরকুট বাংলা ফ্যাসিবাদবিরোধী কবিতার ধারায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ। তবে এর বিষয়বস্তু কেবল ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে প্রতিফলিত হয়েছে ভারতের স্বাধীনতার স্বপ্ন, ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের নির্মম স্মৃতি এবং সংগ্রামী মানুষের অদম্য প্রত্যয়। ‘স্ফুলিঙ্গ’, ‘জবাব চাই’, ‘প্রতিরোধ প্রতিজ্ঞা আমার’, ‘ফের আসব’, ‘এই আশ্বিনে’, ‘চিরকুট’সহ বিভিন্ন কবিতায় যেমন দৃঢ় বিশ্বাস ও সংগ্রামের সাহস উচ্চারিত হয়েছে, তেমনি তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ, গভীর মানবিক বেদনা ও আবেগের মর্মস্পর্শী প্রকাশও সমান শক্তিতে ধরা দিয়েছে। ‘ঘোষণা’ কবিতায় কবি লিখেছেন—

‘গঙ্গার জোয়ার এসে লাগে
ভল্গার তীরের স্পর্শ
চোখে নব সূর্যোদয় জাগে
মুক্তি আজ বীরবাহু
শৃঙ্খল মেনেছে পরাভব;
দিগন্তে দিগন্তে দেখি
বিস্ফোরিত আসন্ন বিপ্লব।’

(ঘোষণা, চিরকুট)

অগ্নিকোণ ও ফুল ফুটুক কাব্যগ্রন্থের মধ্যবর্তী সময়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যদৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। তিনি উপলব্ধি করেন, প্রকৃত শিল্প সেই, যেখানে জীবনের সত্য, সংগ্রাম, ভালোবাসা, জয়-পরাজয় এবং মানুষের বহুমাত্রিক অস্তিত্ব প্রতিফলিত হয়। এই উপলব্ধির ফলে তিনি কৃত্রিম কাব্যভাষা ও রাজনৈতিক স্লোগাননির্ভর উচ্চারণ থেকে সরে এসে মানুষের মুখের সহজ, প্রাণবন্ত ও অনাড়ম্বর ভাষাকে গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে চিত্রকল্প ও কাব্যভাষায় নতুন নতুন পরীক্ষা–নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতা এক নতুন শিল্পমাত্রা লাভ করে। ফুল ফুটুক কাব্যগ্রন্থের ‘আরও একটা দিন’ কবিতায় এই নবতর কাব্যদৃষ্টির এক অনন্য প্রকাশ লক্ষ করা যায়।

‘জলায় এবার ভাল ধান হবে—
বলতে বলতে পুকুরে গা ধুয়ে
এ বাড়ির বউ এল আলো হাতে
সারাটা উঠোন জুড়ে
অন্ধকার নাচাতে নাচাতে।’
(আরও একটা দিন, ফুল ফুটুক)

সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেবল তাত্ত্বিক বামপন্থী ছিলেন না; চটকলশ্রমিক, ট্রামকর্মী ও কৃষকদের আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সরাসরি যুক্ত ছিলেন। চটের বস্তা কাঁধে ফেলা কুলিদের কষ্ট, কিংবা কয়লাখনির অন্ধকারের শ্রমিকদের দীর্ঘশ্বাস তিনি নিজের বুকে ধারণ করেছিলেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন এক জায়গায় স্থির থাকেনি। ষাটের দশকের পর, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ভাঙন এবং জরুরি অবস্থার সময়কার রাজনৈতিক জটিলতা তাঁর চেনা আদর্শিক বিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। পরবর্তীকালে বামফ্রন্টের কিছু নীতির সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। যে দলটির জন্য তিনি যৌবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই দল থেকে একসময় তিনি দূরে সরে যান। এই মোহভঙ্গ তাঁর কবিতায় এক গভীর বিষাদ ও অন্তর্মুখী চেতনার জন্ম দেয়। তবে তিনি কখনো মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। দলছুট হলেও তিনি আজীবন শোষিতের পক্ষেই কথা বলে গেছেন।

সুভাষের কবিতায় প্রেম কখনো সমাজবিচ্ছিন্ন নয়; তিনি যখন প্রিয়ার চোখের প্রশংসা করেন, তখনো তাঁর মাথায় থাকে চারপাশের অনাহারী মানুষের মুখ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী শক্তির নির্মমতা এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক হামলা কবিমনকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তিনি শান্তির পক্ষে এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। ‘ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক’ স্লোগানকে তিনি কাব্যিক রূপ দিয়েছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বিষয়বৈচিত্র্য, কাব্যশৈলী ও ভাষা

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার বিষয়বস্তু ও আঙ্গিককে কয়েকটি প্রধান ভাগে আলোচনা করা যায়: মেহনতি মানুষের জয়গান ও শ্রমের মর্যাদা, প্রেম ও সমাজসচেতনতার যুগলবন্দিতা, যুদ্ধ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা। তাঁর কবিতার মূল চালিকা শক্তি ছিল কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণি। বাবু সংস্কৃতির আড়ালে যে মানুষগুলো সমাজকে সচল রাখছে, কবি তাদেরই জয়গান গেয়েছেন। ‘স্বাগত’ ও ‘মিছিলের মুখ’ কবিতায় তিনি লিখেছেন:

‘গ্রাম উঠে গিয়েছে শহরে—
শূন্য ঘর, শূন্য গোলা,
ধান-বোনা জমি আছে পড়ে।
শুকানো তুলসীর মঞ্চে
নিষ্প্রদীপ অন্ধকার নামে,
আগাছায় ভরেছে উঠোন।’

(স্বাগত, চিরকুট)

‘মিছিলে দেখেছিলাম একটি মুখ,
মুষ্টিবদ্ধ একটি শাণিত হাত
আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত;
বিস্রস্ত কয়েকটি কেশাগ্র
আগুনের শিখার মত হাওয়ায় কম্পমান।’

(মিছিলের মুখ, অগ্নিকোণ)

সুভাষের কবিতায় প্রেম কখনো সমাজবিচ্ছিন্ন নয়; তিনি যখন প্রিয়ার চোখের প্রশংসা করেন, তখনো তাঁর মাথায় থাকে চারপাশের অনাহারী মানুষের মুখ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী শক্তির নির্মমতা এবং হিরোশিমা-নাগাসাকির পারমাণবিক হামলা কবিমনকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। তিনি শান্তির পক্ষে এবং যুদ্ধের বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। ‘ফ্যাসিবাদ নিপাত যাক’ স্লোগানকে তিনি কাব্যিক রূপ দিয়েছিলেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।

সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা কেন সাধারণ মানুষের এত মন ছুঁয়েছিল? তার প্রধান কারণ তাঁর ভাষা। তিনি কবিতার ভাষা থেকে সব রকম গুরুগম্ভীর তৎসম শব্দ বা সংস্কৃতায়িত রূপ বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে গ্রহণ করেছিলেন। চলিত বাংলা, কলকাতার আটপৌরে ভাষা এবং শ্রমজীবী মানুষের কথ্যভাষাকে তিনি কবিতার শরীরে এমনভাবে বুনেছিলেন যে তা এক নতুন ঘরানার জন্ম দেয়। তাঁর কবিতা পড়ার সময় মনে হয় কেউ যেন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বলছেন। ছন্দের দোলা থাকলেও তা কৃত্রিম মনে হয় না। কবি প্রচলিত উপমা (যেমন: চাঁদ, ফুল, নদী) ব্যবহার করলেও তার অর্থ বদলে দিয়েছিলেন। জীবনের শেষভাগে এসে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার সুর অনেকটাই বদলে যায়। শুরুর দিকের সেই চড়া সুর, ভাষা ও আগ্রাসী মেজাজ অনেকটাই শান্ত হয়ে আসে। ছেলে গেছে বনে (১৯৭২), একটু পা চালিয়ে ভাই (১৯৭৯) কাব্যগ্রন্থে কবি অনেক বেশি অন্তর্মুখী ও দার্শনিক। এ সময়ে তিনি মানুষের ভেতরের একাকিত্ব, বার্ধক্য ও জীবনের অমোঘ সত্যগুলোকে আঁকতে শুরু করেন। তবে এই শান্ত রূপের মধ্যেও একধরনের অন্তর্নিহিত শক্তি লুকিয়ে ছিল। এই পর্বে তাঁর রাজনীতি দলগত গণ্ডি পেরিয়ে এক সার্বিক মানবতাবোধে রূপান্তরিত হয়েছিল।

২০০৩ সালের ৮ জুলাই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর সাহিত্যকীর্তি আজও সমান জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক। সময় যত এগিয়েছে, ততই নতুন অর্থে ফিরে এসেছে তাঁর কবিতা। সমাজে যখনই শোষণ, অবিচার কিংবা ফ্যাসিবাদের অন্ধকার বিস্তার লাভ করেছে, তখনই প্রতিবাদী যুবসমাজ সাহস ও সংগ্রামের ভাষা খুঁজে পেয়েছে তাঁর কবিতায়।

কবিতার বাইরে এক বিস্তৃত সাহিত্যভুবন

সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেবল একজন শক্তিমান কবিই নন, তিনি বাংলা সাহিত্যের নানা শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। উপন্যাস, প্রবন্ধ, ছড়া ও ভ্রমণকাহিনির পাশাপাশি জীবনী, সাহিত্য সমালোচনা এবং শিশু-কিশোর সাহিত্যেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। এর বাইরে তিনি যেমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন, তেমনি বহু কালজয়ী বিদেশি কবিতাও বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তাঁর লেখা ভ্রমণকাহিনি আমার বাংলা বাংলা সাহিত্যের একটি ক্ল্যাসিক সৃষ্টি। অত্যন্ত সহজ, সরল ও রসময় গদ্যে তিনি বাংলার গ্রামীণ জীবন, সাঁওতাল বিদ্রোহের পটভূমি এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে হাংরাস (১৯৭৩), কে কোথায় যায় (১৯৭৬), অন্তরীপ বা হ্যানসেনের অসুখ (১৯৮৩), কমরেড, কথা কও (১৯৯০) অন্যতম। ভ্রমণসাহিত্যে আমার বাংলা (১৯৫১), যখন যেখানে (১৯৬০), ডাকবাংলার ডায়েরি (১৯৬৫), নারদের ডায়েরি (১৯৬৯), যেতে যেতে দেখা (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ), ক্ষমা নেই (১৯৭২), ভিয়েতনামে কিছুদিন (১৯৭৪), আবার ডাকবাংলার ডাকে (১৯৮১) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য ও রচনাকে বাংলাভাষী পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি অনুবাদ করেছেন নাজিম হিকমতের কবিতা (১৯৫২), নির্বাচিত পাবলো নেরুদারোজেনবার্গ-এর পত্রগুচ্ছ (১৯৫৪), ব্যাঘ্রকেতন (নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জীবন ও কর্মভিত্তিক একটি অনুবাদ), রুশ গল্প সঞ্চয়ন (১৯৬৮), ইভান দেনিসোভিচের জীবনের একদিন (১৯৬৮), ডোরাকাটার অভিসারে (১৯৬৯), চে গুয়েভারার ডায়েরি (১৯৭৭), আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি (১৯৮২)। শিশু ও কিশোর পাঠকদের জন্যও তিনি লিখেছেন অক্ষরে অক্ষরে আদি পর্ব (১৯৫৪), কথার কথা (১৯৫৫), দেশবিদেশের রূপকথা (১৯৫৫), বাংলা সাহিত্যের সেকাল ও একাল (১৯৬৭), ইয়াসিনের কলকাতা (১৯৭৮)। পাশাপাশি কেন লিখি (১৯৪৫) ও একসূত্র (১৯৫৫)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংকলন সম্পাদনার মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যচর্চায়ও তিনি স্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা বঞ্চনা ও বিতর্কের মুখোমুখি হলেও সাহিত্যজগতে সুভাষ মুখোপাধ্যায় সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেন। তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার (১৯৬৪), অ্যাফ্রো-এশিয়ান লোটাস প্রাইজ (১৯৭৭), কুমারন আসান পুরস্কার, আনন্দ পুরস্কার, সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার (১৯৮৪) এবং ভারতীয় জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৯২) লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি সাহিত্য অকাদেমি ফেলোশিপে ভূষিত হন। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তাদের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দেশিকোত্তম’ প্রদান করে। পাশাপাশি তিনি সাহিত্য অকাদেমির এক্সিকিউটিভ বোর্ডের সদস্য এবং অ্যাফ্রো-এশীয় লেখক সংঘের সাধারণ সংগঠকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বও পালন করেন।

২০০৩ সালের ৮ জুলাই কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর সাহিত্যকীর্তি আজও সমান জীবন্ত ও প্রাসঙ্গিক। সময় যত এগিয়েছে, ততই নতুন অর্থে ফিরে এসেছে তাঁর কবিতা। সমাজে যখনই শোষণ, অবিচার কিংবা ফ্যাসিবাদের অন্ধকার বিস্তার লাভ করেছে, তখনই প্রতিবাদী যুবসমাজ সাহস ও সংগ্রামের ভাষা খুঁজে পেয়েছে তাঁর কবিতায়। সুভাষ মুখোপাধ্যায় কেবল ২১ বছরের তরুণ পদাতিক-এর কবি নন; তিনি ছিলেন আজীবন সংগ্রামে অবিচল এক পথিক। তাঁর কবিতা শুধু একটি সময়ের রাজনৈতিক উচ্চারণ নয়, বরং ন্যায়, মানবমুক্তি ও প্রতিরোধের এক স্থায়ী কাব্যভাষা, যা যুগে যুগে মেহনতি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি ও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়ে যাবে। তাঁর বিখ্যাত কবিতার সেই অবিনশ্বর লাইন, যা চিরকাল মানুষের মনে আশার আলো জ্বেলে রাখবে:

‘ফুল ফুটুক না ফুটুক
আজ বসন্ত।
শান-বাঁধানো ফুটপাথে
পাথরে পা ডুবিয়ে এক কাঠখোট্টা গাছ
কচি কচি পাতায় পাঁজর ফাটিয়ে
হাসছে।’

(ফুল ফুটুক না ফুটুক, ফুল ফুটুক)