ইবনুল আরাবির প্রেমগাথা

তাঁর নাম নিজাম, উপাধি ‘আইনুশ শামসি ওয়াল বাহা’—জ্যোতি ও মহিমার উৎস। ত্রয়োদশ শতকে মক্কায় বসবাসকারী এ নারী ছিলেন বিদুষী, সুফি, শায়খ, আর ছিলেন ইবনুল আরাবির অনুপ্রেরণা! নিজামের রূপ ও গুণে মুগ্ধ ছিলেন সুফি ইবনুল আরাবি। এতটাই যে নিজামকে উৎসর্গ করে তিনি রচনা করেন ‘তরজুমান আল আশওয়াক্ব’ (বাংলা করলে হয় বাসনার বয়াতি)—একষট্টি (মতান্তরে ষাট কিংবা বাষট্টিটি কবিতার এক সংকলন৷ দেবী ও মানবী—উভয়ভাবেই তাঁর রূপের বর্ণনা দিয়েছেন কবি। ইবনুল আরাবির ভাষায়, নিজাম তাঁর নামের অর্থের মতোই সুন্দর। নিজাম মানে সুর, ঐকতান, সমন্বয়; একইভাবে নিজামের মধ্যে ইবনুল আরাবি মহাজাগতিক ছন্দময়তাকে আবিষ্কার করেছিলেন। আবার নিজাম শব্দের মূল ধাতু ‘নজম’—অর্থ কবিতা। সে কারণেই কি তবে নিজামের রূপ ও সৌন্দর্য প্রকাশের বাহন হিসেবে ইবনুল আরাবি কবিতাকে বেছে নিলেন? নিজাম সম্পর্কে তিনি লেখেন—‘সে আমার লক্ষ্যবস্তু, আমার আকাঙ্ক্ষা; নিষ্কলুষ এক কুমারী।’

প্রথম দেখা

নিজামের সঙ্গে ইবনুল আরাবির দেখা হয় ১২০২ খ্রিষ্টাব্দে। ইবনুল আরাবি সে বছর মক্কা সফরে গিয়েছিলেন। তৎকালীন মক্কার বিখ্যাত ধর্মবেত্তা ফখরুন নিসা বিনতে রুস্তমের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণের উমিদ ছিল তাঁর। কিন্তু ইবনুল আরাবির বেশি বয়সের কারণে ফখরুন নিসা তাঁকে ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। পরিবর্তে তিনি ইবনুল আরাবিকে তাঁর ভাই মাকিনউদ্দিন আবু শাজা জহির ইবনে রুস্তম আল ইসপাহানির কাছে পাঠিয়ে দেন এবং তাঁর হয়ে ইবনুল আরাবিকে হাদিসের সনদ দিতে বলেন। মাকিনউদ্দিন নিজামের পিতা আর ফখরুন নিসা হলেন ফুফু। মাকিনউদ্দিনের ঘরেই ইবনুল আরাবি নিজামকে প্রথম দেখেন। তরজুমান আল আশওয়াক্বের ভূমিকায় নিজামের সঙ্গে সাক্ষাতের একটি ভিন্ন বয়ান দেন ইবনুল আরাবি। একদিন তিনি কাবা শরিফ তাওয়াফ করছিলেন। একপর্যায়ে তিনি মাস্তি হালতে উপনীত হন। উচ্চস্বরে নিজের লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। হঠাৎ কাঁধে কার যেন আলতো ছোঁয়া! এক নারী, তাঁকে ভর্ৎসনা করছেন, কেননা কবিতার শব্দাবলি তাঁর মতো সুফির জন্য মোটেও উপযোগী নয়। ইবনুল আরাবির কবিতাটি কী বিষয়ে ছিল, এ নিয়ে অধিকতর গবেষণার অবকাশ রয়েছে। কাবা প্রদক্ষিণকালীন ইবনুল আরাবির সঙ্গে কি মানবী নিজামের সাক্ষাৎ হয়েছিল, নাকি সে সময় তিনি ইবনুল আরাবির অন্তর্জগতে কোনো অলৌকিক সত্তা হিসেবে তাঁর অধিকতর আধ্যাত্মিক উত্তরণের দিশারূপে হাজির হয়েছিলেন, এ বিষয়ে বিতর্ক আছে। বস্তুত প্রথম সাক্ষাতেই নিজাম ইবনুল আরাবির মনে এমন এক চিরস্থায়ী ছাপ ফেলেন যে এর পর থেকে বাস্তব ও পরাবাস্তব উভয় দশাতেই তিনি নানাভাবে ইবনুল আরাবিকে তাড়িত করেছিলেন। নিজামের প্রতি ইবনুল আরাবির আকুলতার তীব্রতা ফুটে উঠেছে এ কটি শব্দে—‘এ বইয়ের (তরজুমান আল আশওয়াক্ব) প্রতিটি নাম দ্বারা আমি তাঁকেই (নিজাম) সম্বোধন করি; আর আমার হাহাকার কেবল তাঁর আবাসকে ঘিরেই!’ নিজামের বসতি পবিত্র মক্কা নগরী ইবনুল আরাবির জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এখানেই তিনি তাঁর ম্যাগনাম ওপাস ‘আল ফুতুহাত আল মক্কিয়্যাহ’ লেখা শুরু করেছিলেন, যা শেষ করতে তাঁর জীবনের বত্রিশটি বছর খরচ হয়েছিল; আর এখানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল নিজামের, যার প্রণয় তাঁকে দিয়েছিল বসন্তের তাজা বাতাস আর দিয়েছিল এক চিরস্থায়ী মধুময় যাতনা!

রূপ ও গুণের বর্ণনা

প্রেয়সীর রূপ বর্ণনায় ইবনুল আরাবি কোনো সংকোচ করেননি। নিজামের আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষতা বয়ানের পাশাপাশি তিনি নির্দ্বিধায় তাঁর শারীরিক সৌন্দর্যের বর্ণনাও ফুটিয়ে তুলেছেন। তরজুমান আল আশওয়াক্বের নানা ছত্রে তিনি নিজামের মধুময় অধরোষ্ঠ, উন্নত বক্ষ, কুমারীসুলভ লাজুকতা ও আবেগী মনোভাবের চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। নিজামের এ সৌন্দর্যকে কবি মহান স্রষ্টার ঐশ্বরিক উপহার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই নিজামকে পাওয়ার বাসনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নেয় স্রষ্টাকে পাওয়ার আকুলতায়। স্রষ্টার পরম সৌন্দর্য যেন প্রতিভাত হয় নিজামের আয়নায়!

নিজামের গুণের বয়ান দিতে গিয়ে তরজুমান আল আশওয়াক্বের ভূমিকায় ইবনুল আরাবি লেখেন—‘তিনি একজন দরবেশ ও তপস্বী। দুই পবিত্র নগরীর (মক্কা ও মদিনা) আধ্যাত্মিক শিক্ষক। তিনি কথা বললে সবাই চুপ হয়ে যায়। যখন সংক্ষেপে বলেন, স্বকীয় শৈলীতে বলেন, আর যখন অধিক বলেন, তখন তা হয় প্রাঞ্জল। জ্ঞানীদের মাঝে তিনি এক জ্যোতিষ্ক, মার্জিতদের মাঝে এক সুদৃশ্য বাগানসদৃশ। তিনি নিখুঁতভাবে তৈরি হারের মূল রত্নটির মতো। তিনি অতুলনীয়, সবচেয়ে দামি।’ ইবনুল আরাবি নিজামকে তাঁর কবিতায় পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের এক প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। বোধ, শিক্ষা, আধ্যাত্মিকতা, অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক সৌন্দর্যে যে অতুলনীয়৷ নিজামের সৌন্দর্যে অবগাহনের মাধ্যমে ইবনুল আরাবি স্রষ্টার পরম সৌন্দর্যকে অবলোকন করতে চেয়েছিলেন। তিনি লেখেন—‘কামনায় মরে যাই, আবেগেতে গলি; আমার যে দশা, তাঁরও তো সেই একই!’ তরজুমান আল আশওয়াক্বের কবিতাগুলোতে কবি নিজামকে নানাভাবে বর্ণনা করেছেন। কখনো তিনি রক্ত–মাংসের নারী, কখনো–বা স্বপ্ন, কখনো আবার মরীচিকা! তিনি আছেন, আবার নাই! কিংবা তাঁর না থাকাই যেন তাঁর বেশি করে থাকা! তিনি নির্দয়, আবার সহানুভূতিশীল! প্রতিনিয়ত তিনি কবিকে বাধ্য করেন হৃদয়ের গহিনে তাঁর সতত উপস্থিতিকে উপলব্ধি করতে। নিজাম সপরিবারে মক্কায় বসবাস করলেও তাঁর শিকড় ছিল পারস্যে, বর্তমান ইরাকে। নিজামের সঙ্গে ইবনুল আরাবির প্রণয়ে বিরহভাব ছিল প্রবল। একটি কবিতার অংশবিশেষ এমন—‘তিনি ইরাকের মেয়ে, আমার ইমামের মেয়ে, বিপরীতে আমি ইয়েমেনের ছেলে। কেউ কি কখনো শুনেছ তেলে আর জলে মিলন হতে!’ এ পঙ্‌ক্তিগুলোতে নিজামকে না পাওয়ার বেদনার বয়ান দেওয়ার পাশাপাশি আরব ও অনারবের যে বৈপরীত্য সেটির দিকেও সূক্ষ্মভাবে ইঙ্গিত করলেন কি ইবনুল আরাবি? ইবনুল আরাবির কাছে নিজাম এমন এক আলো যা প্রেমিকের হৃদয়কে আলোকিত করে। তরজুমান আল আশওয়াক্বের কিছু কবিতায় কবি নিজামের মুখ দিয়েও বলিয়েছেন। তেমনই এক কবিতায় নিজাম ইবনুল আরাবিকে উদ্দেশ করে বলছেন—‘তাঁর হৃদয়ে আমার সতত বসতি, এটাই কি তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়? বলো, বলো, এটাই কি তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়?’ আরেকটি কবিতায় নিজাম বলছেন—‘আমাকে প্রেমিকদের সম্পর্কে বলো, না না, তুমি নিজেই বরং প্রেমিক হয়ে যাও, এমন প্রেমিক, যাঁর তালাশে থাকেন স্বয়ং প্রেমাস্পদ! তোমার উচ্চারণ তখন হবে আগুনের মতো, প্রজ্বলিত আগুন—সমস্ত কোলাহল আর নীরবতার ঊর্ধ্বে!’ নিজামকে উদ্দেশ করে ইবনুল আরাবি লিখেছেন—‘তাঁর দর্শনে অন্ধকার রজনী মোর আলোকিত হয়, তাঁর কেশরাজির অন্তরালে উজ্জ্বল দিন মোর আঁধারে হারায়!’ অন্যত্র তিনি লেখেন—‘তাঁর ঝলমলে উপস্থিতি যেন সূর্য, তার দীঘল চুল যেন রাত; সূর্য আর রাতের মিলন হলো!’ তরজুমান আল আশওয়াক্বের কিছু কবিতা নিজাম ও ইবনুল আরাবির মাঝে সংলাপ আকারে হাজির হয়েছে। তেমনই একটি নমুনা—ইবনুল আরাবি: তিনি (নিজাম) ছিলেন রহস্যে আবৃত, তিনি ছিলেন আমার চোখের আকর্ষণ, তিনি ছিলেন এক নারী, আমার হৃদয়ের বাসনা। নিজাম: আমাকে বলা হয়েছে রহস্যময়! আমার মাঝেই তাঁর চোখ দেখতে শিখেছে। আমি ছিলাম এক নারী।

নিজের রচনাবলির মধ্যে তরজুমান আল আশওয়াক্ব ইবনুল আরাবির কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। জীবনের শেষদিকে তিনি দামেস্কে এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর প্রাত্যহিক সভায় তরজুমান আল আশওয়াক্বের কবিতাগুলো আবৃত্তি করা হতো; আর তা আবৃত্তি করতেন স্বয়ং ইবনুল আরাবি!

বিতর্ক

নিজামের সঙ্গে প্রণয় নিয়ে ইবনুল আরাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়েছে। তাঁর দিকে ছোড়া হয়েছে নৈতিক স্খলন ও চারিত্রিক অসততার তির। নিজাম ও ইবনুল আরাবিকে এ হেন অভিযোগ থেকে বাঁচাতে কোনো কোনো গবেষক অনুমান করার প্রয়াস পেয়েছেন যে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং কাবা শরিফ তাওয়াফের সময় নিজামের সঙ্গে যে সাক্ষাৎ হয়েছিল, এটিকে তাঁরা বিয়ের প্রস্তাব হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। কিন্তু নিজাম ও ইবনুল আরাবি সম্পর্কে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মতামত হলো, তাঁদের মধ্যে কোনো বৈবাহিক কিংবা জৈবিক সম্পর্ক ছিল না, বরং তাঁদের মধ্যে ছিল গভীর এক বন্ধুত্ব, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে আধ্যাত্মিকতায় রূপ নিয়েছে। গবেষক সাদিয়া শেখের ভাষায়—‘নিজাম চিরকুমারী ছিলেন এবং আধ্যাত্মিকভাবে অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিলেন।’

শেষকথা ইবনুল আরাবির সুফি দর্শন নিয়ে বহুকাল ধরে আমাদের দেশে গবেষণা হয়ে আসছে। কিন্তু তাঁর যে প্রণয়, নিজামের সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক, তা নিয়ে বাংলায় কোনো লেখা আছে কি? অন্তত আমার চোখে পড়েনি। এ লেখাটিকে তাই আমি মনে করি কেবল একটি ঢিল ছোড়া, যা তরঙ্গায়িত হয়ে নিজাম ও ইবনুল আরাবির সম্পর্ক নিয়ে অধিকতর গবেষণায় হয়তো কাউকে উদ্বুদ্ধ করবে।

সূত্র: ইরিনা কুজমিনস্কি রচিত ‘নিজাম, ইবনে আরাবি অ্যান্ড দি ইম্পরট্যান্স অব বিউটি অ্যাজ আ পাথ টু গড’ অবলম্বনে।