‘শিখা’র আলোয়: একটি কাল-অসংগতিদোষে দুষ্ট চিঠি

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের শতবর্ষ পূর্ণ হলো। সংগঠন মুসলিম সাহিত্য সমাজের পত্রিকা ‘শিখা’ ছিল এর বাহন। কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন এ আন্দোলনের অন্যতম নেতা। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন নিম্নবর্গের ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তী। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের লরেন্স এ কিম্পটন ডিস্টিংগুইশড সার্ভিস প্রফেসর।

কাজী আবদুল ওদুদের প্রতিকৃতি অবলম্বনে অলংকরণ: আরাফাত করিম

মরহুম চিন্তক-সাহিত্যিক কাজী আবদুল ওদুদ
শ্রীচরণেষু,

আপনি চিরনিদ্রায় শায়িত আজ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি। কোনো দিন এই চিঠি পড়বেন না আপনি। স্মৃতি, কথোপকথন, রাজনীতি, পৃথিবীর সবই তো শুধুই জীবিতের জন্য। তাহলে এই একতরফা চিঠি আপনাকে কেন লিখছি? লিখছি ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর শতবার্ষিকী উপলক্ষে। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর প্রতিষ্ঠা এবং ১৯২৭ সালে শিখা পত্রিকার প্রবর্তনা বাঙালির বৌদ্ধিক জীবনের ইতিহাসে এক স্বর্ণময় অধ্যায়। সেই অধ্যায়ের আজ এক শ বছর পূরণ হলো। সেই উপলক্ষে জনাব মোরশেদ শফিউল হাসান যখন একটি প্রকাশিতব্য বইয়ের জন্য আমাকে কিছু লিখতে অনুরোধ করলেন, তখন কর্মজীবনের অশেষ ব্যস্ততা সত্ত্বেও তাঁর আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারিনি।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বা শিখা পত্রিকার ইতিহাসের আমি আগ্রহী পাঠক হলেও সেই বিষয়ের গবেষক নই। এ পর্যন্ত আহৃত তথ্যে যে আমি নতুন কিছু তথ্য যোগ করতে পারি, তা নয়। কিন্তু এই সূত্রে আপনাদের তর্কবিতর্ক এবং বিশেষত আপনার রচনা পড়তে গিয়ে আমার যেন আপনার সঙ্গে কথোপকথনের ইচ্ছেটাই মনের মধ্যে উদ্বেল হয়ে উঠল। মনে হলো, আজ এক শ বছরের পর আমি—এক ভিনদেশি ও অন্য প্রজন্মের বাঙালি বৃদ্ধ—আপনাদের সেই সময়কার আলোচনা থেকে আমাদের বাঙালি সত্তার ইতিহাসচিন্তায় যা কিছু আমার জীবনের ভেতরে বসে গ্রহণ করতে পারি, তার কিছুটা আজকের বিশ্বায়িত বাঙালি পাঠককে মাথায় রেখে এই একতরফা আলোচনায় তুলি। আপনাদের সেই সামূহিক উদ্যোগ ও প্রয়াসের স্মৃতির উদ্দেশে একে আমার নৈবেদ্যও বলতে পারেন।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও শিখা গোষ্ঠীর নায়কদের মধ্যে আপনিই একমাত্র আমার স্বচক্ষে দেখা মানুষ। দেখেছি ছেলেবেলায়। দেশভাগের পরে, ১৯৫০-এর দশকে। কলকাতায় পার্ক সার্কাস অঞ্চলে যে তারক দত্ত রোডে আপনি সস্ত্রীক থাকতেন, ঠিক সেই রাস্তার ওপরেই একটি ভাড়া বাড়ির দোতলায় থাকতেন আমার পূর্ব বাংলা থেকে সদ্য আগত দুই মামা ও মামিরা, আমার দাদু, দিদিমা, মায়ের পিসতুতো ভাই ‘সোনামামা’ ও মামাতো ভাইবোনেরা। তখন আমার বয়স বড়জোর ১০ হবে। আপনি বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে রোজ হেঁটে যেতেন। পরনে সাদা ধবধবে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি (পরে জেনেছি তখনো দুই দিকের বাঙালি মুসলমান ভদ্রলোক ধুতি পরতেন)। চলনে ধীরস্থির চিন্তামগ্নতার ভাব। আপনি যে একজন বিশিষ্ট মানুষ, বোঝা যেত। আপনাকে দেখে এক মামিমা সম্ভ্রমভরে বলতেন, ‘ওই দ্যাখ, কাজী আবদুল ওদুদ যাচ্ছেন।’ আমি একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘উনি কে?’ এখনো মনে আছে, মামিমা বললেন, ‘খুব নাম-করা লেখক’। তার বেশি বুঝিনি। কিন্তু আপনাকে দেখেই মনে হতো, একজন অতিপরিশীলিত, গম্ভীর, সম্ভ্রান্তস্বভাব মানুষ। হিন্দু-মুসলমান নিয়ে সেই বয়সেও একটি আমরা-ওরা মনোভাবের ঢেউ আমার শিশুমনে ধাক্কা দিত। ‘কাজী আবদুল ওদুদ’ যে কোনো হিন্দুর নাম নয়, বুঝতাম। দেশভাগের কথা, আমার মামাবাড়ির ঢাকার জীবনের কথা, এসব অনেক শুনতাম, কিন্তু, যা বললাম, সম্পূর্ণ হৃদয়ঙ্গম হতো না।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও শিখা গোষ্ঠীর নায়কদের মধ্যে আপনিই একমাত্র আমার স্বচক্ষে দেখা মানুষ। দেখেছি দেশভাগের পরে, ১৯৫০-এর দশকে। তখন আমার বয়স বড়জোর ১০ হবে। আপনি বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে রোজ হেঁটে যেতেন। চলনে ধীরস্থির চিন্তামগ্নতার ভাব। আপনি যে একজন বিশিষ্ট মানুষ, বোঝা যেত।

পার্ক সার্কাসের পাড়ায় তখনো বেশ কিছু শিক্ষিত মুসলমান পরিবারের বাস। যত দূর মনে পড়ে হুমায়ুন কবীরদের বাড়ি ছিল কাছাকাছি। আমার এক মামাতো দাদা—‘ছোড়দা’ বলতাম, সোনামামার ছোট ছেলে—তার পাড়ার বন্ধু ‘বাবুল মামু’ না এলে আমাদের বাড়ির কোনো পুজোর খাওয়া সম্পূর্ণ হতো না। ছোটবেলায় বুঝতাম বাবুল মামু মুসলমান, কেমন একটা পার্থক্যের সাড়াজাগানো চেতনা হতো, কিন্তু এটাও জানতাম যে বাবুল মামু আত্মীয়ের মতো। আমরা—আমার বাবা, মা, আমি ও আমার ছোট বোন—থাকতাম তারক দত্ত রোডের আড়াআড়ি কর্নেল সুরেশ বিশ্বাস রোডে। যে বাড়িতে থাকতাম, সে বাড়ির মালিক বাড়িটি সস্তায় বিক্রি করে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন। আমার বাবা সেই পরিবারের আসবাবপত্র কিনে তাঁর শ্বশুরবাড়ির নিকটে বাসা বেঁধেছিলেন। আমার ছোটবেলা কেটেছে ও পাড়ায়।

আপনার সঙ্গে নতুন করে পরিচয় হলো স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়তে গিয়ে। আপনার ‘বাংলার নবজাগরণ’ আমাদের পাঠ্য ছিল। এ কে ফজলুল হক সাহেবের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় যেসব বাঙালি মুসলমান লেখকের রচনা বাঙালির পাঠ্যপুস্তকে সংকলিত হয়েছিল, তাঁদের বেশ কিছু মানুষ—যেমন প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ—আমাদের পাঠসংকলন থেকে তত দিনে ঝরে গেছেন। আবুল মনসুর আহমদের জোরালো গদ্য যে আমরা ছোটবেলায় পড়িনি, এটা আমার একটা দুঃখ। মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশভাগ হয়ে আমাদের ছোটবেলাটা যেন নতুন করে আরও হিন্দু হয়ে গেল! আপনি ছিলেন রয়ে-যাওয়া মুসলমান লেখকদের মধ্যে অন্যতম। আপনি দেশভাগের পরের জীবনটা সাধ করে পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছেন। এখন বুঝতে পারি, আপনার মতো সৎ, সাহসী, সত্যসন্ধ চিন্তক আমাদের মধ্যে বেশি ছিলেন না। ইচ্ছে করে জানতে, পশ্চিমবঙ্গে থাকার অভিজ্ঞতা আপনার কেমন হয়েছিল। আর খুব দুঃখ হয় যে আপনি এত হাতের কাছে থাকতেও যৌবনে আপনার সঙ্গে যেচে গিয়ে আলাপ করিনি।

সমস্ত প্রজন্মই হয়তো এই প্রতীতি নিয়ে জীবন শুরু করে যে পৃথিবীটা তাঁদের সময়েই যেন আবার নতুন করে জন্মগ্রহণ করেছে বা কৌতূহলোদ্দীপক হয়েছে। সমসাময়িক বয়স্ক মানুষের অভিজ্ঞতার কথা জানতে তাঁদের কোনো বিশেষ উৎসাহ জন্মায় না। মানুষ বুড়ো হলে বুঝতে পারে, বয়স্ক মানুষদের কত কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল, কিন্তু সময়মতো জিজ্ঞেস করেনি। লিখিত ইতিহাস, সে যতই তথ্যভিত্তিক হোক, তা বর্তমানমনস্কতার ও বর্তমানের সমস্যার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে।

মাঝে মাঝে মনে হয়, দেশভাগ হয়ে আমাদের ছোটবেলাটা যেন নতুন করে আরও হিন্দু হয়ে গেল! আপনি ছিলেন রয়ে-যাওয়া মুসলমান লেখকদের মধ্যে অন্যতম। আপনি দেশভাগের পরের জীবনটা সাধ করে পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েছেন। এখন বুঝতে পারি, আপনার মতো সৎ, সাহসী, সত্যসন্ধ চিন্তক আমাদের মধ্যে বেশি ছিলেন না।

এই সমস্যা থেকে মুক্তি নেই মানুষের। ফলে আমাকেই প্রশ্ন করে আপনার কিছু লেখার মাধ্যমে জেনে নিতে হবে যে কী প্রশ্নের ঘুরপাকে আপনি ও আপনারা ঘুরেছেন। কিন্তু আমার সেসব প্রশ্নের পুনর্নির্মাণে আবার আমার সময়কার প্রশ্নরাও জড়িয়ে থাকবে। তাই কথোপকথন এটা ঠিক এমনিতেও নয়, আপনাকে মনের মধ্যে বসিয়ে আপনাকে অছিলা করে আপনাদের সময় ও আমার সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে একটি স্বকথনের প্রচেষ্টা। কিন্তু সেটা, ওই গোড়াতেই যা বললাম, আপনার ও আপনার সতীর্থদের স্মৃতির উদ্দেশে আমার একটি শতবর্ষের শ্রদ্ধার্ঘ্যও বটে।

২.

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও শিখা প্রসঙ্গে পড়লে আপনাদের সময়বোধের একটি বৈশিষ্ট্য—বিশেষ করে তার পরবর্তীকালের (১৯৩৭-১৯৪৭) তুলনায়—আমার কাছে খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে: ১৯২৬/৭-১৯৩১, এই বছরগুলোয়—হিন্দুর ও মুসলমানের পরস্পরের প্রতি ন্যায্য-অন্যায্য বহু অভিযোগ সত্ত্বেও—দেশভাগ অকল্পনীয় ছিল। এই ঐতিহাসিক সত্যকে আপনারাও হয়তো সবাই বিশের ও ত্রিশের দশকের গোড়ায় ধারণ করতেন। এবং দেশভাগ যে হিন্দু-মুসলিম বিরোধের একটি সমাধান হতে পারে (পরবর্তীকালে আবুল মনসুর আহমদ বা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যেমন ভাববেন), এই অনুমানের অনুপস্থিতি আপনাদের ভাবনা-চিন্তার জন্য এমন একটি পরিসর তৈরি করে দেয়, যা বাঙালি মুসলমান একবার ‘পাকিস্তান’-এর কল্পনাতে নিজেদের নিয়োজিত করার পর আর সম্ভব ছিল না। আপনারা মুসলমান ও হিন্দু একই সঙ্গে বসবাস করতে ভূখণ্ড ও ইতিহাসগতভাবে বাধ্য, এটি ধরে নিয়ে বাঙালি মুসলমানের আধুনিকতার সমস্যাটি ভাবতেন। ভাবতেন যে রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত বাঙালি হিন্দু আধুনিকতা ও জাতীয়তাবাদের সাধনা করে এগিয়েছে, কিন্তু তাঁদের আধুনিকতা বা ‘জাতি’র ধারণায় বাঙালি মুসলমান উপেক্ষিত, অবহেলিত অথবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় সম্পূর্ণ বিস্মৃত। আর এ অভিযোগ মিথ্যাও নয়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তাঁর নানান রচনা ও উক্তিতে এই অভিযোগ মেনেও নিয়েছেন। আমি এখনো অবাক হয়ে ভাবি ১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র যখন অবলীলাক্রমে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতে লিখলেন:

সপ্তকোটিকণ্ঠকলকলনিনাদকরালে,
দ্বিসপ্তকোটীভুজৈর্ধৃতখর-করবালে,
অবলা কেন মা এত বলে॥

তখন একবার ভুল করেও তাঁর মনে হলো না যে ১৮৭২ ও ১৮৮১ আদমশুমারিতে গণনা করা এই সাত কোটি কণ্ঠের, আর দ্বিসপ্তকোটি হাতের মধ্যে অর্ধেকের বেশি কণ্ঠ আর হাতের মালিক মুসলমান বাঙালি? ভুলে না গেলে কী করে বঙ্কিম এই সাত কোটি মানুষের জন্য লিখে বসলেন:

বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি
মন্দিরে মন্দিরে॥
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িনী
নমামি ত্বাং। 

১৯৪০-এর সময় পাকিস্তান আন্দোলন এসে এই বিস্মৃতির উত্তর হিসেবে বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের একটি সম্ভাবনা খুলে দিল। বলা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সেই সার্বভৌমত্বের বিকাশেরই যেন একটি রেখা টানা ইতিহাস। প্রয়োজনে হিন্দুর হাত ছেড়ে দিয়েই সেই যাত্রা শুরু হবে। দেশভাগ না হলে বাঙালি মুসলমানের জীবনে এই রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব আসত না কিংবা অনেক দেরিতে আসত। আমি দেশভাগের পরে জন্মেছি, কাজেই দেশভাগের বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমার নিজের সব চিন্তা।

দেশভাগ তখনো কল্পনার বাইরে। আপনারা ভাবতেন বাঙালি মুসলমানের ও হিন্দুর রাজনৈতিক ও জাতিগত সার্বভৌমত্বের সাধনা যেন শত অভিযোগ ও অভিমান সত্ত্বেও পরস্পরের সংস্পর্শে থেকে পরস্পরের হাত ধরেই করতে হবে। তাই আপনাদের চিন্তা ততটা সরাসরি রাজনৈতিক নয়, যতটা সে সাংস্কৃতিক।

১৯২৬-১৯৩১, এই বছরগুলোতে কিন্তু আপনাদের চিন্তার শর্ত অন্য ছিল। দেশভাগ তখনো কল্পনার বাইরে। আপনারা ভাবতেন বাঙালি মুসলমানের ও হিন্দুর রাজনৈতিক ও জাতিগত সার্বভৌমত্বের সাধনা যেন শত অভিযোগ ও অভিমান সত্ত্বেও পরস্পরের সংস্পর্শে থেকে পরস্পরের হাত ধরেই করতে হবে। তাই আপনাদের চিন্তা ততটা সরাসরি রাজনৈতিক নয়, যতটা সে সাংস্কৃতিক। এ কথাটা পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, ১৯৩৫ সালে শান্তিনিকেতনে যে তিনটি ‘নিজাম বক্তৃতা’ দিয়েছিলেন, তা একটু খুঁটিয়ে পড়লে। আপনি স্পষ্টতই লিখছেন:

‘এই দুই [হিন্দু ও মুসলমান] ভাগ্যবিড়ম্বিত দলের বিরোধ বর্তমানে এমন দশায় এসে পৌঁছেছে যে, একটিকে নির্মূল করে বিরোধশান্তির কথা ভাবা অপরটির পক্ষে বিচিত্র নয়।…আসলে এ সম্ভবপর নয়। দেশের হিন্দু ও মুসলমান কারও গায়ে এত জোর নেই যে, অপরকে পর্যুদস্ত করতে পারে। তাই সে চেষ্টায় অগ্রসর হলে কিছুকাল মারামারি ও তার পর রেষারেষি এই হবে সার।…ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা নয়[,] জ্ঞান ও জাতীয়তা দেশের লোকের শরণ্য হবে, নিঃসন্দেহে; কিন্তু জাতি বলতে কি বোঝা হবে? বাঙ্গালী, মাদ্রাজী, পাঞ্জাবী?—না ভারতীয়? ভারতবর্ষ বহুকাল ধরে একটি দেশ। ভৌগোলিক পরিস্থিতির জন্য ভারতীয় না হলে ভারতবাসীর পরিত্রাণও নেই। তবু আপাতত বাঙ্গালী, মাদ্রাজী ও পাঞ্জাবী হওয়াই বেশী ভাল মনে হয়;…অবশ্য ভারতীয়ত্বের বিরোধী যে বাঙ্গালীত্ব, মাদ্রাজীত্ব বা পাঞ্জাবীত্ব তা কদাচ কাম্য নয়।’

বলেছিলেন ১৯৩৫ সালে। এ কথা কি বলা যায় না যে ১৯৪০ সালের পর পাকিস্তানের রাজনৈতিক কল্পনা এবং তার ক্রমবর্ধমান বাস্তবতা আপনার এই বক্তব্যের অন্তস্তিত ভারতবর্ষ-কল্পনারই একটি সম্পূর্ণ পরাজয়? আমি অবশ্য এই কথাই বলব যে এই পরাজয় সত্ত্বেও আপনার চিন্তার প্রাসঙ্গিকতা কমে না।

৩.

চিন্তার মধ্যে শুধু বক্তব্য থাকে না, চিন্তার একটা স্বভাব বা চরিত্রও আছে বলে মনে হয়। হিন্দু-মুসলমান বিরোধের ক্ষেত্রে আপনার আলোচনা যেহেতু এই সাংস্কৃতিক সূত্র থেকে শুরু হয় যে, এঁদের পরস্পর ব্যতীত কোনো অস্তিত্ব নেই, আমি আপনার চিন্তার মধ্যে পাঁচটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য দেখি, যা আমাকেও আমার চিন্তার প্রকল্প বুঝতে সাহায্য করে। আপনি কোনো দিনই ভাবেননি যে এই সমস্যার একটা ভূরাজনৈতিক সমাধান হতে পারে; আমিও মনে করি—বাংলাদেশের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব শুধু মেনে নিয়ে নয়, তাকে স্বাগত জানিয়ে—যে রাজনৈতিক বিভাজন আমাদের সামূহিক ইতিহাসের জটিলতা বোঝা এবং তার মোকাবিলা করার কোনো উপায় হতে পারে না। এর দ্বারা বিভাজন যে অবস্থাবিশেষে প্রয়োজন হতে পারে, তা অস্বীকার করছি না। কিন্তু সেটা একটা অবস্থাগত ব্যবস্থা। প্রশ্ন হচ্ছে: একই ভাষাভাষী ও বিভিন্ন পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও একই ঐতিহ্যবাহী জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত বিবদমান দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে যদি সত্যিকার সংলাপ চালু রাখতে হয়, তাহলে সেই সংলাপের শর্ত কী হতে পারে?

এই প্রশ্ন মাথায় রেখে আমি মূলত আপনার শিখা পর্যায়ের (এবং পরবর্তীকালেরও) কিছু রচনা পড়ে আপনার চিন্তার চরিত্রে অন্তত যে পাঁচটি গুণের সমাহার দেখতে পাই, তার সম্পর্কে কিছু বলব। আপনার তীব্রতার প্রতি অনাসক্তি; চিন্তার সততা ও সাহস; যাঁদের সমালোচনা করছেন তাঁদের থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে না দেখা; জনকল্যাণের কথাটা সব সময় চোখের সামনে রাখা—আপনার চিন্তার এই বৈশিষ্ট্যটি অনেক সময়েই আপনার ‘প্রেম’ কথাটির ব্যবহারে প্রকাশ পেয়েছে; এবং পঞ্চমত, আপনার চিন্তনের শেষ যে স্বভাবটির কথা বলতে চাই, তা হলো নিজেকে সংখ্যাগরিষ্ঠের আসনে না বসিয়ে ভাবা। চিন্তার এই গুণগুলো ব্যতীত দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ অথচ দ্বন্দ্বজটিল সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া শক্ত। অথচ বাঙালি বিষয়ে আপনার চিন্তার গোড়াতেই বসে আছে যে একটি স্বতঃসিদ্ধ অনুমান, তা হয়তো আমারও আছে—তা হলো এই ভাষা ও সংস্কৃতির দিক থেকে বাঙালির দিকে চাইলে আমিও দেখি যে ‘জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম বাঙালি জাতি’। এর দ্বারা জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের যে ‘বাংলাদেশি’ বলে একটি জাতি নির্ধারণ বা কল্পনা করতে হতে পারে, অথবা ভারতের বাঙালি যে ‘ভারতীয়’ জাতীয়তাবাদের শরিক হতে পারে, সেই রাজনৈতিক প্রয়োজন, সত্য এবং তার সম্ভাবনাকে অস্বীকার করছি না।

এবার আপনার চিন্তার স্বভাবগত যে গুণগুলো আমার আজও প্রাসঙ্গিক লাগে, সেগুলো একটু বিশদে বলি। আপনার প্রবন্ধের ভাষার ‘যুক্তিতন্ময়তা, [আপনার] রচনাশৈলীর মনোরমভঙ্গিমা, ভাষার সাধু আকর্ষণীয়তা…’ ইত্যাদির কথা অনেক পাঠকই খেয়াল করেছেন, কিন্তু আমার ইচ্ছে বর্তমান সময়ে আপনার চিন্তার পদ্ধতি কেন আজও প্রাসঙ্গিক, সেই আলোচনায় পৌঁছে এই পত্রের ইতি টানা। তাই আপনার চিন্তার স্বভাবের এই পাঁচটি গুণের কথা একটু আলাদা করে বলতে চাই।

এক. আলোচনায় তীব্রতা পরিহার করা: কথাটা আপনি বলেছিলেন বন্ধু ‘তসলিম’ ওরফে মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলীকে (১৮৯৬-১৯৫৪) বাংলা ১৩৪৪ সালে কার্তিক মাসে লেখা একটি চিঠিতে। লিখেছিলেন, ‘আপনি দুঃখ করেছেন এই বলে যে অতীত-প্রীতির অভাব তীব্রভাবে আমার ভিতরে দেখতে পেলেন না।’ বলে আপনার চিন্তার চরিত্র ব্যক্ত করে লিখেছেন, ‘আপনার দুঃখ বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু তীব্রতাকেই যে আমি ভয় করি—সকলেরই ভয় করা উচিত, দেখতে পাচ্ছেন এই আমার ধারণা।’ আপনার চিঠিটা একটু খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায় ‘তীব্রতা’ বলতে আপনি একপেশে, একচক্ষু বিচারবুদ্ধি বুঝিয়েছিলেন। আপনার বন্ধু তর্ক তুলেছিলেন যে “ধর্মের ভিতরে যা ভাল তার সঙ্গে এত আবর্জনার সংস্রব ঘটেছে যে ধর্মকে পুরোপুরি বাদ না দিলে মানুষের কল্যাণ নেই—মানুষ বারবার তাহলে কেবলই নানা পাকে নিজেকে জড়াবে।” আপনার বক্তব্য: ‘ভাল-মন্দ তো চিরদিন মিলেমিশেই আছে, সাধক নিজের প্রয়োজনে এ দুটিকে বিভিন্ন করে দেখেন ও সেই দেখার সাহায্যে জীবনের পথে চলেন।’ যুক্তি দিয়েছিলেন, ‘এর দৃষ্টান্ত আপনার বিজ্ঞানবাদের ভিতরেও পাবেন—পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে এর সঙ্গে মারণ-বিলাসও মানুষের মনে সমাদরের আসন লাভ করেছে। সত্যকার বিজ্ঞানবাদ আর এই মারণ-বিলাস এ দুটিকে আলাদা করতে পারে কে?—আর কেউ নয়, মানুষের কল্যাণবুদ্ধি—মানবসমাজে সমর্পিতচিত্ততা, যার নাম ধর্মবোধ।’ নতুবা ‘বিজ্ঞানবাদ পরিচ্ছন্ন বুদ্ধি মাত্র;…পরিষ্কার বুদ্ধি জোরালো অস্ত্রই, আর কিছু নয়; তার দ্বারা পাহাড়-জঙ্গল ধ্বসিয়ে নব-বসতির সৃষ্টি হতে পারে, আবার ভাইয়ের গলাও অবলীলাক্রমে তা দিয়ে কাটা যায়।’

আপনার চিন্তার পদ্ধতি কেন আজও প্রাসঙ্গিক...। আপনার চিন্তার স্বভাবের এই পাঁচটি গুণের কথা একটু আলাদা করে বলতে চাই। এক. আলোচনায় তীব্রতা পরিহার করা; দুই. চিন্তায় সততা ও সাহসিকতা; তিন. আপনার বিশ্বনাগরিকতা; চতুর্থ. আপনার প্রেমতত্ত্ব; পঞ্চম. সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা।

আজকের পৃথিবীব্যাপী পরিবেশ সংকটের দিনে আপনি হয়তো আর ওই আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে পাহাড়-জঙ্গল কেটে ফেলার ক্ষমতাকে নিছক ভালো বলতে পারতেন না, কিন্তু আপনার ‘তীব্রতা’ বিরোধিতার যুক্তিটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। মুসলমান ও হিন্দু যদি তাঁদের পরস্পরের নানান কলহের মধ্যে সম্পর্কটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান, তাহলে কি নিজের দিকে বা কি অন্যের দিকে ওই একপেশে দৃষ্টিনিক্ষেপ পরিহার করতে হবে। আপনি এই যুক্তি সারা জীবন ধরেই দিয়েছেন। কথাটা বিশ্বভারতীতে রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ’ নিয়ে বক্তৃতা করতে গিয়ে আপনি অন্যভাবেও বলেছেন, ‘মধ্যযুগের সমন্বয়কারীদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান বোধহয় কবীরের ও তাঁর পরে দাদু ও রজ্জবজীর।…তাঁদের চিন্তা সমসাময়িক রূপ যা পেয়েছিল তাইই সে সবের চরম রূপ নয়। সব বিক্ষোভের ভিতরে সত্যকে শান্ত হয়ে দেখবার সঙ্কেত এসবে আশ্চর্যভাবে সঞ্চিত আছে।’

দুই. চিন্তায় সততা ও সাহসিকতা: কোনো চিন্তকই সততাকে মূল্য না দিলে চিন্তার একদেশদর্শিতা এড়াতে পারেন না। কিন্তু সেই চিন্তা প্রকাশ করার জন্য সাহসও প্রয়োজন। আমি চিন্তায় সৎ হয়েও লোকভয়ে আমার উপলব্ধ সত্য প্রকাশ না করতে পারি। কিন্তু আপনার সাহস ছিল, হয়তোবা এ জন্য নিন্দা বা ঝাঁঝালো সমালোচনা সহ্য করতে রাজি ছিলেন। এবং আমি যেটুকু আপনাকে পড়েছি ও বুঝেছি, আপনি সারা জীবনই এই অবস্থানে থেকেই কথা বলেছেন। শিখা চলাকালে আপনার নব পর্যায় পুস্তকে ‘সম্মোহিত মুসলমান’ প্রবন্ধটি প্রকাশ করে আপনি যে মাসিক মোহাম্মদীর রোষানলে দগ্ধ হয়েছিলেন, সে কথা সুবিদিত। তবু নিজের সম্প্রদায়ের সমালোচনা একরকম করা যায়—আপনার শিখা গোষ্ঠীর অন্য সহকর্মীরা তা করেছেন। কিন্তু যে সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিরোধ তাঁদেরই আমন্ত্রণে বক্তৃতা করতে গিয়ে তাঁদের সম্বন্ধে যে অপ্রিয় কথাকে সত্য মনে হয়, তা বলা অনেক কঠিন। আমি ভারতে দেখেছি কট্টর মার্ক্সবাদী মুসলমান ঐতিহাসিক মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, কিন্তু ধরেই নিয়েছেন যে হিন্দুর সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা করবেন হিন্দু মার্ক্সবাদীরা। কারণটি বুঝতে অসুবিধা হয় না। কিন্তু আপনি এই সহজ পথের পথিক নন। আবার আপনার ওই রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে প্রদত্ত ‘হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ’ বক্তৃতার প্রসঙ্গেই ফিরে যাই। অবশ্য রবীন্দ্রনাথেরও সমর্থন ও প্রশ্রয় ছিল আপনার পক্ষে। তিনি লিখেছিলেন যে ‘এদেশে হিন্দু-মুসলমান-বিরোধের বিভীষিকায় মন যখন হতাশ্বাস হয়ে পড়ে, এই বর্বরতার অন্ত কোথায় ভেবে পায় না, তখন মাঝে মাঝে দূরে দূরে সহসা দেখতে পাই দুই বিপরীত কূলকে দুই বাহু দিয়ে আপন করে আছে এমন এক-একটি সেতু। আবদুল ওদুদ সাহেবের চিত্তবৃত্তির ঔদার্য সেই মিলনের একটি প্রশস্ত পথরূপে যখন আমার কাছে প্রতিভাত হয়েছে, তখনি আশান্বিত মনে আমি তাঁকে নমস্কার করেছি। সেই সঙ্গে দেখেছি তাঁর মননশীলতা, তাঁর পক্ষপাতবিহীন সূক্ষ্ম বিচারশক্তি, বাংলা ভাষায় তার প্রকাশশক্তির বিশিষ্টতা।’

কাজী আবদুল ওদুদ (২৬ এপ্রিল ১৮৯৪—১৯ মে ১৯৭০)
ছবি: সংগৃহীত

এখানে রবীন্দ্রনাথ কোনো অতিকথন করেননি। অবাক হয়ে খেয়াল করি কীভাবে আপনি হিন্দুদের উনিশ শতকে রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, রামকৃষ্ণ, কেশবচন্দ্র, বিবেকানন্দ প্রমুখের ধর্মান্দোলনকে আপনার সব সমালোচনা-প্রশংসা মিলিয়ে নিজেরই ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বলে মেনে নেন (যেভাবে আপন বলে মনে করেছেন ভক্তি আন্দোলনের কবীর বা দাদুকে)। লিখেছেন: ‘[হিন্দুর] এই ধর্মান্দোলন শুধু যে বাংলার গৌরব, তা নয়, সমগ্র ভারতের গৌরব।’ আবার একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এই আন্দোলনের প্রবক্তারা যখন যুক্তি দেবার চেষ্টা করেন যে ‘হিন্দু-সভ্যতা জগতের শ্রেষ্ঠ সভ্যতা’, তখন সেই হিন্দুত্ব মুসলমানের চোখে একটি ‘রুদ্র’ রূপ নেয় এবং একটি অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন কথা আপনার শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন। কথাটি, আমার কাছে, আজও সত্যি, ‘হিন্দুদের এই যে রুদ্রমূর্তি তার সঙ্গে ইসলামের ওহাবী মতের আশ্চর্য মিল রয়েছে। দুয়ের উৎপত্তির সূত্র একই। মুসলমান জগতের শক্তিহীনতা থেকে ওহাবী প্রতিক্রিয়া জন্মলাভ করেছে, তেমনি হিন্দুর যুগযুগান্তরের শক্তিহীনতা ও ব্যর্থতা থেকে জন্ম হয়েছে এই রুদ্র হিন্দুত্বের।…মুসলিম-বিদ্বেষ হিন্দুত্বের অতি বড়ো পরিচয়চিহ্ন বলে একালের মুসলমানদের মনে হয়েছে।’

তিন. আপনার বিশ্বনাগরিকতা: এই মনোভাব আপনার লেখার প্রতিটি পাতায় জড়িয়ে আছে। আপনার আধুনিক ‘কসমোপলিটন মন’ (স্বর্গীয় বিনয় ঘোষের ভাষার অনুকরণে বা আমন্ত্রণে বলি) সব ট্র্যাডিশন থেকেই ভালোটা আহরণ করতে চায়। খুব জানতে ইচ্ছে হয়, ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর চতুর্থ বার্ষিক অধিবেশনে ‘গ্যেটে’ বলে যে প্রবন্ধটি ১৩৩৬ সনের চৈত্র মাসে পাঠ করেছিলেন, তাতে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হয়েছিল? জানার উপায় নেই, কিন্তু গ্যেটের মধ্য দিয়ে আপনি যে নিজের জীবনাদর্শ তৈরি করছিলেন—এবং প্রক্রিয়াটি আপনার শেষ জীবনে রবীন্দ্রনাথের আলোচনা ও কোরআনের অনুবাদ ধরে চলতেই থাকবে—সেটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। একটা মহতী জীবনবোধের মধ্যে আপনি আপনার বাঙালি জীবনকে স্থাপনা করতে চাইছিলেন। লিখেছিলেন, ‘গ্যেটের ভিতরে স্বজাতিপ্রেমের তীব্রতা ছিল না’—আবার সেই ‘তীব্রতা’র প্রতি আপনার বিরাগ। আপনি কোনো চরমপন্থী বিপ্লবী ছিলেন না, বোঝা যায়। আপনি আপনার বিশ্বমানবিকতা ও গভীরভাবে মুসলমানিত্বের বোধ, কোনোটাই ছাড়তে চাননি।

চতুর্থ. আপনার প্রেমতত্ত্ব: ১৯৪৬ সালের মে মাসে আপনার বন্ধু এস ওয়াজেদ আলীর গুলিস্তাঁ-সাহিত্য-চক্রের পঞ্চম অধিবেশনে—পাকিস্তান আন্দোলন তখন জোরালো—আপনি একটি প্রবন্ধ পড়লেন— ‘গৃহযুদ্ধের প্রাক্কালে’। সেই প্রবন্ধে হাফিজকে বর্ণনা করলেন ‘প্রেমপন্থীদের গুরু’ বলে। শুধু এখানে নয়, আপনার সমস্ত রচনার জমিনেই যেন এই প্রেম বা প্রীতির চুমকি বসানো। আপনি ভূমাকে স্পর্শ করতে চান, আপনি আগে মানুষ, পরে মুসলমান হতে চান, এবং দুইই হতে চান গভীরভাবে এবং এই হয়ে ওঠা কখনো সম্পূর্ণ হতেই পারে না একটি শর্ত যদি পালিত না হয়—অর্থাৎ, ‘যদি প্রেম দিলে না প্রাণে!’ এই প্রেমপন্থা কী? এ কি শুধুই আবেগ? কথাটা রামমোহন প্রসঙ্গে আপনি আরও স্পষ্ট করে বলেন: ‘রামমোহনের প্রতিভার বেশ স্পষ্ট দুইটি ধারা—একদিকে তিনি মনীষী, বিচারকুশল; অন্যদিকে তিনি মানব-প্রেমিক।’ দেখুন, এই আবার প্রেমের কথা এসে পড়ল!

আপনার চিন্তাভাবনার মধ্যে আমি আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীতে বসে বাঙালির ইতিহাস নিয়ে চিন্তা করার জন্য একটি অবস্থান ও উপায় খুঁজে পাই। ঠিক একই অবস্থান নয়, আপনাদের সময়ে যেন আমার সময়ের একটি মুকুরিত প্রতিচ্ছবি পাই, আয়নায় আমাদের ছবির যেমন বাঁ দিকটা ডান দিক হয়ে যায়, সেই রকম।

আসলে আপনার চিন্তার পরতে পরতে প্রেম। আপনি আরও বেশি পরিষ্কার করে বললেন: ‘মধ্যযুগের সাধকদের সঙ্গে রামমোহন সুপরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে তাঁর বড় পার্থক্য এই যে তাঁদের মতো তিনি ভক্ত ও কবি নন, তিনি ভক্ত ও মানবহিতাকাঙ্ক্ষী—সে হিতাকাঙ্ক্ষার লক্ষ্য দৈনন্দিন সাংসারিক জীবনের উৎকর্ষ সাধন।’ হিন্দু-মুসলমানের বিরোধিতা বোঝাতে গিয়ে বিষয়টা অন্যভাবে অন্যত্রও তুলেছেন, ‘আমাদের দেশের রাজনৈতিক অসার্থকতার মূলে আমাদের শিক্ষিতদের শোচনীয় আত্মসর্বস্বতা ও অপ্রেম।’ ‘অপ্রেম’ অর্থ কী? ‘যদি বলা যায় যে দেশের রাজনৈতিক চেতনার প্রারম্ভে তাঁরা পূজারি হয়েছিলেন পরিতোষ-দেবতার আর আজ পূজারি হয়েছেন অসন্তোষ-দেবতার তবে অপ্রিয় কথা বলা হয় সত্য[,] কিন্তু অসত্য কথা হয়ত নয়। দেশ বলতে যে বহু শ্রেণীর বহু মানসিক স্তরের লোক বোঝায়, আর দেশসেবা বলতে যে সেই সব মানুষের উন্নয়নের জন্য অক্লান্ত সাধনা বোঝায়, এমন কথা…যাঁরা রাজনৈতিক ক্ষেত্রের কর্মী…তাঁদের বোঝানো সম্ভবপর হয়নি।’

ভক্ত সন্তদের প্রেমের তত্ত্বকে আধুনিক ‘সেবার’ তত্ত্বে—গণমানুষের ‘দৈনন্দিন সাংসারিক জীবনের উৎকর্ষ সাধনের’ তত্ত্বে পরিণত করা আপনার ‘আধুনিক’ মানসিকতার দিকেই নির্দেশ করে, যদিও এখানে একটি সমালোচনার কথাও উঠতে পারে এই বলে যে ‘বুদ্ধির মুক্তি’র আন্দোলন করতে গিয়ে মননশীলতার যে জগতের আপনি এক উৎসাহী ও সৃষ্টিশীল অধিবাসী ছিলেন, সেই জগতের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্রের সংযোগ স্থাপন করার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা সংগঠিত করার প্রয়োজন ছিল, সে বিষয়ে আপনার বা আপনাদের লেখায় বিশেষ কোনো সংকেত বা ইঙ্গিত আমার চোখে পড়েনি।

পঞ্চম. সংখ্যাগরিষ্ঠের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করা: ১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন-চৈত্র সংখ্যায় আবদুল কাদিরকে লেখা চিঠিতে লিখছেন, ‘যদি নির্বাচন হয়, আপনি মুসলমানদের জন্য “স্বতন্ত্র-নির্বাচন” নয়, বরং “মিশ্র-নির্বাচন” দলে’। বলা বাহুল্য, সময়টা তখনো এমন নয় যে দেশভাগের কথা ভাবা যায়। কিন্তু কে সংখ্যাগুরু আর কে সংখ্যালঘু, তার কথা আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত। গোটা ভারতবর্ষ ধরে ভাবলে মুসলিমরা সংখ্যালঘু, আপনার ভাষায় ‘ছোটদল’ ও হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, আপনার ভাষায় ‘বড় দল’। আপনি লিখছেন, ‘রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রভুত্ব করার বাসনা ত্যাগ করা বড় দলের পক্ষে নিতান্তই অসম্ভব ব্যাপার’ কারণ তাঁরা ‘সংখ্যাগুরুত্বের অভিমানী’। ‘কাজেই মীমাংসা হচ্ছে—প্রভুত্ব তার বজায় থাকুক কিন্তু সে প্রভুত্ব হোক দেশের সব শ্রেণীর জন্যই যথাসম্ভব কল্যাণকর; আর সেটি হতে পারে দেশের ছোট দল যদি শুধু দলাদলির কথা মন থেকে দূর করে দিয়ে বিভিন্ন সৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করে বড় দলকে কল্যাণপথে চালিত…করতে পারে তবেই।…এ কথা অনেকের কাছে হেঁয়ালির মতো শোনাবে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে এই হয়ত জগতের নিয়ম। Ibsen বলেছেন— The strongest man is he who stands in the minority of one.’ বলা বাহুল্য, আপনার সুপারিশ মেনে পাকিস্তান হয়নি। কোনো গোষ্ঠীরই এই আস্থা ছিল না যে ‘সংখ্যালঘু’ অবস্থায় তাদের কল্যাণ হবে। আপনি কিন্তু পার্টিশনের পরের কলকাতায় সারা জীবন কাটিয়ে স্বেচ্ছায় ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েছিলেন। ‘সংখ্যাগুরুত্বের অভিমান’ আপনি একেবারেই চাননি। এর মধ্যে আমি একটা আজকের যুগে অত্যন্ত জরুরি নৈতিকতার হাতছানি দেখতে পাই।

৪.

এবার আমার সময়ে ফিরে এসে বলি আপনার এবং বিশেষত আপনার ওই সময়কার চিন্তাভাবনা আমাকে টানে কেন? টানে, কারণ আপনার চিন্তাভাবনার মধ্যে আমি আজকের বিশ্বায়িত পৃথিবীতে বসে বাঙালির ইতিহাস নিয়ে চিন্তা করার জন্য একটি অবস্থান ও উপায় খুঁজে পাই। ঠিক একই অবস্থান নয়, আপনাদের সময়ে যেন আমার সময়ের একটি মুকুরিত প্রতিচ্ছবি পাই, আয়নায় আমাদের ছবির যেমন বাঁ দিকটা ডান দিক হয়ে যায়, সেই রকম। কারণ ওই শিখার সময় ও আমার সময়ের মধ্যে একটি পরিখার মতো বয়ে গেছে দেশভাগের রাজনীতি।

আমি বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের একজন। ভারতের নাগরিকও নই। আমারও দুই বাঙালিকেই আমার ঐতিহ্য না মনে করার কোনো কারণ নেই। আপনি ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্যের প্রশ্নের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক সমাধান খোঁজেননি। এখানেই আপনাকেও আমার ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষ বলে ভাবার আছে।

ফলে পূর্ববঙ্গ যে আজ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র, সেই রাষ্ট্র যে ১৯৪৭ ছাড়া হতো না এবং সেই রাষ্ট্র হওয়ার ফলে যে বাঙালি মুসলমানের জীবনের মধ্যে ‘হিন্দুর আধিপত্য’ হটিয়ে একটি সার্বভৌম জাতীয় জীবন সৃষ্টির অবকাশ তৈরি হয়েছে, আমাকে এই ঐতিহাসিক সত্যের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাঙালি মুসলমানের প্রতি আত্মীয়তার শুভেচ্ছা নিয়েই বাঙালির বৃহত্তর ইতিহাসে হিন্দু-মুসলমান বিরোধ ও তার সম্ভাব্য নিষ্পত্তির—বা চূড়ান্ত কোনো নিষ্পত্তি না হলেও দৈনন্দিনের যেসব চলমান ছোটখাটো নিষ্পত্তি যা আবার সব সময়েই নতুন করে ঝালিয়ে নিতে হয়—তার কথা ভাবতে হবে। আর এই ভাবনাটাও ভাবি একটা বিশ্বায়িত বা গোলকায়িত পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে।

আজ বাংলাদেশের ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি পৃথিবীর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে দেশভাগের ফলে হিন্দু-মুসলমান বিরোধের যে সমাধান হয়েছিল, তা হয়েছিল ভূরাজনীতিভিত্তিক। তার ফলে আমরা ‘স্থান’-এর সঙ্গে ‘কালচার’ জুড়ে দিতাম, যেভাবে আবুল মনসুর আহমদ একসময় পাক-বাংলার কালচার বইটি লিখেছিলেন। ‘ভারতের আধিপত্যবাদ’ বা ‘কলকাতার আধিপত্যের’ তত্ত্বও এই স্থান ও সংস্কৃতি একসঙ্গে জুড়ে তৈরি করা। বা অধুনা যে নিন্দাসূচক শব্দবন্ধ বাংলাদেশের রাজনৈতিক তরজায় জায়গা করে নিয়েছে—‘ভারতের দোসর’—তা-ও সম্ভব হয়েছে ওই মনে মনে বাংলাভাষী মানুষকে স্থান দিয়ে ভাগ করে ফেলায়। হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের রাজনৈতিক ‘সমাধান’ না হলে এই লব্জগুলো তৈরি হতো না।

বিশ্বায়নের কারণেই এই ভূরাজনৈতিক সমাধান আজ আর যথেষ্ট মনে হয় না। কারণ, দুদিকের বাঙালির আজ দেখা, পরিচয়, আলাপ, বন্ধুত্ব যেমন দেশে বসেই হয় আবার তেমনি হয় পৃথিবীর নানান প্রান্তে যেখানে বাঙালি ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৭১ না হলে কি এত যে বন্ধুত্ব, আনাগোনা, পরস্পরকে এই নতুন করে আবিষ্কার, এসব হতো? এই বিশ্বায়িত দুনিয়ার বাঙালি তো শুধু ভারত বা বাংলাদেশ দিয়ে পরিচিত নয়; তাঁদের অনেকেই এখন দুটি বা তার বেশি পাসপোর্টধারী। আবার এই নতুন পরিচয়ের মধ্যেই যে দ্বন্দ্বের পুরোনো স্রোত আবর্তিত হয় না, তা-ও তো না। বন্ধুত্বের মধ্যেই অনেক পার্থক্যের চোরাস্রোতে সাঁতার দিয়ে বন্ধুত্ব জিইয়ে রাখতে হয়। আবার জিইয়ে রাখার জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নিজেদেরই তাগিদে জিইয়ে রাখি। হিন্দু ও মুসলমান বাঙালি বহুদিনের পড়শি, পড়শি থাকার ইতিহাস আমাদের ভাগ হওয়া দেশের ইতিহাসের চেয়ে অনেক বড় ও গভীর।

তাই বলছিলাম, যদিও আপনি ও আমি দুই যুগের মানুষ, তবু বাঙালি হিসেবে বাঙালি মুসলমান ও হিন্দুর বিরোধের ইতিহাস নিয়ে চিন্তা করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রস্থানপর্বে মিল আছে। আপনি দেশভাগকে কোনো বাস্তব সমাধান হিসেবে কল্পনা করতে পারার আগের যুগে বসে ভেবেছেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় বাঙালির কালচারই আপনার ঐতিহ্য মনে করে লিখেছেন। আমি বিশ্বে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালিদের একজন। ভারতের নাগরিকও নই। আমারও দুই বাঙালিকেই আমার ঐতিহ্য না মনে করার কোনো কারণ নেই। আপনি ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক পার্থক্যের প্রশ্নের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক সমাধান খোঁজেননি কোনো দিন। এখানেই আপনার কাছে আমার শেখার আছে, কিংবা অন্যভাবে বললে আপনাকেও আমার ঐতিহ্য ও পূর্বপুরুষ বলে ভাবার আছে। তাই আপনার কাছে কী শিখি, তারই কিছুটা আপনার শিখাপর্বের মুসলমান ও হিন্দুর বিরোধের সমস্যাবিষয়ক লেখাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি। তবে আজ Others abide our question, thou art free. তাই শিষ্য একলব্যের মতো মনের মধ্যে আপনাকে দ্রোণাচার্যের আসনে বসিয়ে আপনার সঙ্গে এই কথাগুলো বললাম।

ইতি
প্রণত
দীপেশ চক্রবর্তী

শিকাগো, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

সূত্র

১. এই প্রসঙ্গে কয়েকটি বইয়ের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি: খোন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য-সমাজ: সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪)—এই বইটি পড়ার সুযোগ করে দেন আমার প্রাক্তন ছাত্র ড. তৈমুর রেজা, তাঁকেও ধন্যবাদ); মুস্তাফা নুরউল ইসলাম সম্পাদিত ও সংকলিত, শিখাসমগ্র (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৩); আবদুল মানান সৈয়দ সংকলিত, নির্বাচিত শিখা: মুসলিম সাহিত্য সমাজের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের দলিল (ঢাকা: ?, ২০০০)। এই শেষ বইটির পরিশিষ্টে অনেক মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করা আছে।
২. কাজী আবদুল ওদুদ: নির্বাচিত রচনা, সংকলন ও সম্পাদনা, হাবিব আর রহমান (কলকাতা করুণা প্রকাশনী, ২০১৭), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৩৪-২৩৫
৩. কাজী আবদুল ওদুদ: নির্বাচিত প্রবন্ধ (শাশ্বত বঙ্গ) (ঢাকা: স্কাই পাবলিশার্স, ২০১২), রুহুল আমিন বাবুলের ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
৪. কাজী আবদুল ওদুদ: নির্বাচিত রচনা, সংকলন ও সম্পাদনা, হাবিব আর রহমান (কলকাতা করুণা প্রকাশনী, ২০১৭), ১ম খণ্ড, পৃ. ২৮২
৫. ওই পৃ. ২৮১-২৮২
৬. ওই পৃ. ২২৮. ঝোঁক আমার—দী. চৌ.
৭. যেমন শিখার প্রথম সংখ্যায় আপনার ও অধ্যাপক কাজী আনোয়ারুল কাদিরের প্রবন্ধদ্বয়—যথাক্রমে ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সাহিত্য-সমস্যা’ ও ‘বাঙ্গালী মুসলমানের সামাজিক সনদ’। মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সংকলিত ও সম্পাদিত, শিখাসমগ্র (ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৩) দ্রষ্টব্য।
৮. কাজী আবদুল ওদুদ: নির্বাচিত রচনা, পৃ. ২০৫
৯. ওই, পৃ. ২২৫
১০. ওই, পৃ. ৩৩৬
১১. ওই, পৃ. ১৬৮
১২. ওই, পৃ. ২১৮-২১৯
১৩. ওই, পৃ. ২২১
১৪. ওই, পৃ. ২৬৫
১৫. ওই, পৃ. ২৬৭
১৬. এ প্রসঙ্গে আরেকটি জরুরি এবং আপনার সমধর্মী ও সমকালীন রচনা আবুল হুসেনের ‘আমাদের রাজনীতি’, শিখা-সমগ্র, পৃ. ৫৯২-৬০০