কেন আজও নেলসন ম্যান্ডেলার কাছে ফিরে যেতে হয়

নেলসন ম্যান্ডেলার (১৮ জুলাই ১৯১৮—৫ ডিসেম্বর ২০১৩) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের জীবন কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক ঘটনাপঞ্জির অংশ নয়; বরং মানবসভ্যতার নৈতিক বিবেকের উজ্জ্বল প্রতীক। নেলসন ম্যান্ডেলা সেই বিরল মানুষদের অন্যতম। তিনি ছিলেন স্বাধীনতার সংগ্রামী, গণতন্ত্রের নির্মাতা, ক্ষমাশীলতার দার্শনিক এবং মানবমর্যাদার এক অনন্য প্রবক্তা। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন আমাদের শেখায়—স্বাধীনতা কেবল শাসক পরিবর্তনের নাম নয়; এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, ন্যায়বিচার ও সম–অধিকার প্রতিষ্ঠার নিরন্তর সংগ্রাম। তাই তাঁর জীবনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তিনি কোনো অলৌকিক নায়ক ছিলেন না; বরং ছিলেন অসাধারণ ধৈর্য, দূরদৃষ্টি ও নৈতিক সাহসের অধিকারী একজন মানুষ, যিনি নিজের জীবনকে একটি জাতির মুক্তির সঙ্গে একাত্ম করেছিলেন।

১৯৫৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (ট্রান্সভাল) সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ম্যান্ডেলা যে কথাগুলো উচ্চারণ করেছিলেন, সেগুলো আজও বিশ্বজুড়ে মুক্তিকামী মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস। তিনি বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতার পথে সহজ কোনো পথ নেই’। এই বাক্য কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি তাঁর সমগ্র জীবনের নির্যাস। কারণ তিনি জানতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম কখনো সরলরৈখিক নয়। সেখানে পরাজয় আছে, কারাবরণ আছে, দমন-পীড়ন আছে, ভুল আছে, আবার নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহসও আছে। তাই তাঁর ভাষণে যেমন সংগ্রামের ইতিহাস আছে, তেমনি আছে ভবিষ্যতের জন্য সংগঠন গড়ে তোলার বাস্তব বুদ্ধিমত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

নেলসন ম্যান্ডেলা, ২০০৮
১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ন্যাশনাল পার্টি ক্ষমতায় এসে আনুষ্ঠানিকভাবে আপার্টহেইড নীতি কার্যকর করলে ম্যান্ডেলা উপলব্ধি করেন, সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম। কিন্তু তিনি কখনো জনগণকে অবাস্তব আশ্বাস দেননি। বরং তিনি তাঁদের প্রস্তুত করেছিলেন এমন পথের জন্য, যেখানে বিজয়ের চেয়ে ধৈর্য, সাহস ও সংগঠনের প্রয়োজন অনেক বেশি।

ম্যান্ডেলার এ বক্তৃতার পটভূমি ছিল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার সবচেয়ে অন্ধকার সময়। শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবৈষম্য (যা পরবর্তীকালে ‘আপার্টহেইড’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত হয়) কৃষ্ণাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকারকে অস্বীকার করেছিল। জমি, শিক্ষা, ভোটাধিকার, চলাচল, কর্মসংস্থান এমনকি বসবাসের অধিকারও বর্ণের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতো। মানুষের জন্মই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিত। রাষ্ট্রের আইন, আদালত, পুলিশ, প্রশাসন—সবকিছুই ছিল সেই বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার রক্ষাকবচ।

ম্যান্ডেলা তাঁর বক্তৃতায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন যে ১৯১২ সালে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার পর থেকে আফ্রিকার মানুষ বারবার শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানিয়েছে। তারা সভা করেছে, আবেদন করেছে, প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে, যুক্তি দিয়েছে। কিন্তু শাসকের উত্তর ছিল আরও দমন-পীড়ন, আরও বৈষম্য এবং আরও নিষ্ঠুর আইন। এ অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় ১৯৫২ সালের ঐতিহাসিক ডিফায়েন্স ক্যাম্পেইন—অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন।

ম্যান্ডেলা অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে স্মরণ করেন, কীভাবে মাত্র তেত্রিশজন স্বেচ্ছাসেবককে নিয়ে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কারখানার শ্রমিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ছাত্র, ধর্মযাজক, নারী-পুরুষ, কৃষ্ণাঙ্গ, ভারতীয়, বর্ণমিশ্র জনগোষ্ঠী এমনকি কিছু বিবেকবান শ্বেতাঙ্গও সেই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। তাঁরা জেনেশুনে অন্যায় আইন ভেঙেছিলেন, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করতেন যে অন্যায় আইন মানা নৈতিক কর্তব্য নয়।

এ অভিজ্ঞতা ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক চিন্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে স্বাধীনতার সংগ্রাম কেবল নেতাদের সংগ্রাম নয়; এটি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই শক্তিশালী হয়। তাঁর ভাষণে তাই বারবার ফিরে আসে জনগণের সংগঠন, রাজনৈতিক শিক্ষা ও ঐক্যের প্রশ্ন। তিনি বলেন, আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি বক্তৃতায় নয়, মানুষের সংগঠিত চেতনায়।

তবে এ সংগ্রাম সহজ ছিল না। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নির্মম। আন্দোলনের হাজারো কর্মী গ্রেপ্তার হন, চাকরি হারান, কারাবরণ করেন। সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করা হয়, আইন অমান্য করাকে আরও কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়। জননিরাপত্তা আইন, ফৌজদারি আইন সংশোধনী আইন ও কমিউনিজম দমন আইন ব্যবহার করে সরকার কার্যত রাজনৈতিক বিরোধিতার সব পথ বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল।

কিন্তু এখানেই ম্যান্ডেলার নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আবেগের বশবর্তী হয়ে সংগ্রামকে আত্মঘাতী পথে নিয়ে যেতে চাননি। বক্তৃতায় তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাজনৈতিক আন্দোলনকে অবশ্যই বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হয়। কেবল দীর্ঘ বক্তৃতা, উত্তেজনাপূর্ণ ভাষণ কিংবা আবেগঘন স্লোগান দিয়ে গণ–আন্দোলন পরিচালনা করা যায় না। নতুন পরিস্থিতিতে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হয়, সংগঠনকে পুনর্গঠন করতে হয় এবং জনগণকে আরও দীর্ঘ সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করতে হয়। এই বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে সমসাময়িক বহু নেতার থেকে আলাদা করেছে।

এ বক্তৃতা পড়লে বোঝা যায়, ম্যান্ডেলা কেবল প্রতিবাদী নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সংগঠক। তিনি বুঝেছিলেন, কোনো আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। তাই মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে, সংগঠনকে টিকিয়ে রেখে, ধাপে ধাপে সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই ছিল তাঁর কৌশল। তিনি জানতেন, সাময়িক আবেগ বিপ্লব সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে কেবল সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি।

নেলসন ম্যান্ডেলার এ রাজনৈতিক পরিণতির পেছনে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতাও গভীরভাবে কাজ করেছিল। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার এমভেজো গ্রামে থেম্বু রাজবংশের এক পরিবারে তাঁর জন্ম। ম্যান্ডেলার জন্মনাম ছিল রোলিহ্লাহ্লা—খোসা ভাষায় যার অর্থ, ‘গাছের ডাল নাড়ানো’, অর্থাৎ প্রচলিত নিয়মে আলোড়ন তোলা মানুষ। বিদ্যালয়ে তাঁর ইংরেজ শিক্ষিকা তাঁকে ‘নেলসন’ নাম দেন, যা পরবর্তীকালে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়ে ওঠে।

শৈশবেই নেলসন প্রত্যক্ষ করেন উপনিবেশবাদ ও বর্ণবৈষম্যের বাস্তবতা। ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বহিষ্কৃত হন। পরে জোহানেসবার্গে এসে নানা ধরনের কাজ করতে করতে আইন অধ্যয়ন শুরু করেন। এখানেই তাঁর পরিচয় হয় ওয়াল্টার সিসুলু, অলিভার ট্যাম্বো এবং আরও অনেক রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে। তাঁদের সান্নিধ্য তাঁর রাজনৈতিক চেতনাকে সুসংহত করে। ১৯৪৪ সালে তিনি আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের যুবলীগ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুবলীগের লক্ষ্য ছিল, কেবল আবেদন-নিবেদনের রাজনীতি নয়; বরং জনগণকে সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।

১৯৪৮ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় ন্যাশনাল পার্টি ক্ষমতায় এসে আনুষ্ঠানিকভাবে আপার্টহেইড নীতি কার্যকর করলে ম্যান্ডেলা উপলব্ধি করেন, সামনে অপেক্ষা করছে দীর্ঘ ও কঠিন সংগ্রাম। কিন্তু তিনি কখনো জনগণকে অবাস্তব আশ্বাস দেননি। বরং তিনি তাঁদের প্রস্তুত করেছিলেন এমন পথের জন্য, যেখানে বিজয়ের চেয়ে ধৈর্য, সাহস ও সংগঠনের প্রয়োজন অনেক বেশি।

উমতাতায় তোলা একটি ছবিতে নেলসন ম্যান্ডেলা, ১৯৩৭
কারাগার ম্যান্ডেলাকে ভেঙে দিতে পারেনি। তিনি বরং কারাগারকেই শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করেছিলেন। সহবন্দীরা একে মজা করে ‘রবেন আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতেন। কেউ ইতিহাস শেখাতেন, কেউ আইন, কেউ অর্থনীতি, কেউ ভাষা। ম্যান্ডেলাও তরুণ বন্দীদের রাজনৈতিক শিক্ষা দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান মানুষের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান অস্ত্র। বন্দিত্ব তাঁর শরীরকে আটকে রেখেছিল, কিন্তু চিন্তাকে নয়।

এ কারণেই ১৯৫৩ সালের সেই ভাষণ আজও কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়; এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের এক অনন্য পাঠ। এখানে যেমন প্রতিবাদের ভাষা আছে, তেমনি আত্মসমালোচনার সাহসও আছে; যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান আছে, তেমনি পরিস্থিতি অনুযায়ী কৌশল বদলের প্রজ্ঞাও আছে। নেতার প্রকৃত শক্তি কেবল জনতাকে উদ্দীপ্ত করার মধ্যে নয়, বরং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংগ্রামের পথকে নতুনভাবে নির্মাণ করার মধ্যে নিহিত—ম্যান্ডেলা তাঁর জীবন ও কর্ম দিয়ে সে সত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

২.

ম্যান্ডেলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, তিনি কখনো কোনো কৌশলকে চিরস্থায়ী সত্য বলে মনে করেননি। তাঁর কাছে লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা, আর কৌশল নির্ধারিত হতো বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে। ১৯৫৩ সালের ভাষণে তিনি যে বাস্তববাদী রাজনৈতিক মূল্যায়নের পরিচয় দিয়েছিলেন, পরবর্তী এক দশকে সেটিই আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র যখন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের প্রতিটি পথ বন্ধ করে দিল, সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করল, হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করল এবং আন্দোলনের নেতৃত্বকে নির্বাসিত বা নিষিদ্ধ করল, তখন ম্যান্ডেলা উপলব্ধি করেন যে সংগ্রামের চরিত্রও পরিবর্তিত হচ্ছে।

১৯৬০ সালের শার্পভিল হত্যাকাণ্ড সেই পরিবর্তনের এক নির্মম মোড়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিরস্ত্র মানুষ নিহত হওয়ার পর দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার জরুরি অবস্থা জারি করে এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। দীর্ঘদিনের অহিংস আন্দোলনের পরও যখন রাষ্ট্র কেবল সহিংসতার ভাষায় উত্তর দিচ্ছিল, তখন ম্যান্ডেলা ও তাঁর সহযোদ্ধারা কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। বহু চিন্তাভাবনার পর তাঁরা সশস্ত্র প্রতিরোধের সীমিত পথ বেছে নেন এবং ‘উমখন্তো ওয়ে সিজওয়ে’ বা ‘জাতির বর্শা’ নামে একটি সামরিক শাখা গঠন করেন। তবে এ সিদ্ধান্তের মধ্যেও ম্যান্ডেলার একটি নৈতিক সীমারেখা ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, অবকাঠামোর বিরুদ্ধে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হোক, যাতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানি এড়ানো যায়। প্রতিশোধ নয়, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক পরিবর্তন।

১৯৬২ সালে ম্যান্ডেলা গ্রেপ্তার হন। পরে ১৯৬৩-৬৪ সালের ঐতিহাসিক রিভোনিয়া মামলায় তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহ ও নাশকতার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। সে বিচারেই তিনি যে বক্তব্য দেন, তা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা করেন, তিনি এমন একটি গণতান্ত্রিক ও স্বাধীন সমাজের স্বপ্ন দেখেন, যেখানে সব মানুষ সমান সুযোগ ও মর্যাদা নিয়ে একসঙ্গে বাস করবে। সে আদর্শের জন্য তিনি জীবনভর সংগ্রাম করেছেন এবং প্রয়োজনে সে আদর্শের জন্য মৃত্যুবরণ করতেও প্রস্তুত। একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখে এমন নির্ভীক ঘোষণা বিশ্ববাসীকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল।

এরপর শুরু হয় ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সাতাশ বছরের কারাজীবন। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলের কাছে রবেন দ্বীপের কারাগার মানবসভ্যতার ইতিহাসে নিপীড়নের এক প্রতীক হয়ে আছে। সেখানে ম্যান্ডেলাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হতো চুনাপাথরের খনিতে। বছরের পর বছর পাথরের শুভ্র প্রতিফলিত আলো তাঁর চোখের স্থায়ী ক্ষতি করেছিল। বন্দীদের চিঠি লেখার সুযোগ ছিল সীমিত, পরিবারের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ আরও সীমিত। একটি চিঠি পৌঁছাতে কখনো কখনো মাসের পর মাস লেগে যেত। সন্তানদের বড় হয়ে ওঠা তিনি চোখের সামনে দেখতে পারেননি। মা ও বড় ছেলের মৃত্যুর সময়ও শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ পাননি। ব্যক্তিগত জীবনের এসব বেদনা তাঁর আত্মজীবনী পড়লে গভীরভাবে অনুভব করা যায়।

তবু কারাগার ম্যান্ডেলাকে ভেঙে দিতে পারেনি। তিনি বরং কারাগারকেই শিক্ষাঙ্গনে পরিণত করেছিলেন। সহবন্দীরা একে মজা করে ‘রবেন আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতেন। কেউ ইতিহাস শেখাতেন, কেউ আইন, কেউ অর্থনীতি, কেউ ভাষা। ম্যান্ডেলাও তরুণ বন্দীদের রাজনৈতিক শিক্ষা দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জ্ঞান মানুষের স্বাধীনতার অন্যতম প্রধান অস্ত্র। বন্দিত্ব তাঁর শরীরকে আটকে রেখেছিল, কিন্তু চিন্তাকে নয়।

এ দীর্ঘ কারাজীবনে ম্যান্ডেলার ব্যক্তিত্বে আরেকটি অসাধারণ বৈশিষ্ট্য বিকশিত হয়—প্রতিপক্ষকে বোঝার ক্ষমতা। তিনি কারারক্ষীদের ভাষা আফ্রিকান্স শিখেছিলেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল, যে মানুষের ভাষা বোঝা যায় না, তার মনও বোঝা যায় না। তিনি শত্রুকেও মানুষ হিসেবে দেখতে শিখেছিলেন। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা থেকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রাখে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ সময় ‘ফ্রি নেলসন ম্যান্ডেলা’ আন্দোলন গড়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়, শ্রমিকসংগঠন, শিল্পী, লেখক, ক্রীড়াবিদ, মানবাধিকারকর্মী—অসংখ্য মানুষ ম্যান্ডেলার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সাংস্কৃতিক বয়কটের দাবিও জোরালো হতে থাকে। ধীরে ধীরে ম্যান্ডেলা রাজনৈতিক বন্দী থেকে বিশ্বব্যাপী স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রতীকে পরিণত হন।

কারাগারে থাকাকালেই দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার একাধিকবার ম্যান্ডেলাকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তির প্রস্তাব দেয়। বলা হয়, তিনি যদি সশস্ত্র সংগ্রাম ত্যাগ করেন এবং সরকারের নির্ধারিত কিছু শর্ত মেনে নেন, তাহলে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু ম্যান্ডেলা সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বিখ্যাত উত্তর ছিল—যে জনগণ স্বাধীন নয়, তাদের নেতা স্বাধীন হতে পারেন না। ব্যক্তিগত মুক্তির বিনিময়ে তিনি জাতির অধিকার বিকিয়ে দিতে চাননি।

ম্যান্ডেলা এখানেই বন্দী ছিলেন দীর্ঘদিন। রবেন দ্বীপে তাঁর কারাকক্ষ
আত্মজীবনী লং ওয়াক টু ফ্রিডম-এ ম্যান্ডেলা লিখেছেন, স্বাধীনতার পথে এগোতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু নিজের শৃঙ্খল ভাঙাই যথেষ্ট নয়; এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে অন্যের স্বাধীনতাও প্রসারিত হয়। এ উপলব্ধিই তাঁকে সাধারণ রাজনৈতিক নেতার সীমা অতিক্রম করে মানবতাবাদী চিন্তকে পরিণত করেছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মর্যাদা। বর্ণ, ধর্ম, ভাষা কিংবা সংস্কৃতির পার্থক্য তাঁর কাছে কখনো মানুষের মৌলিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেনি।

অবশেষে আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ গণ–আন্দোলন ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারকে আলোচনার পথে আসতে বাধ্য করে। ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি নেলসন ম্যান্ডেলা মুক্তি লাভ করেন। তাঁর কারাগারের ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসার সে দৃশ্য আজও বিশ্ব ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। কিন্তু আরও বিস্ময়কর ছিল তাঁর বক্তব্য। সাতাশ বছরের বন্দিত্বের পর তিনি প্রতিশোধের আহ্বান জানাননি; তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন আলোচনার, পুনর্মিলনের এবং একটি নতুন দক্ষিণ আফ্রিকা গঠনের।

অনেকেই ভেবেছিলেন, এত দীর্ঘ নির্যাতনের পর ম্যান্ডেলা নিশ্চয়ই শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার রাজনীতি করবেন। কিন্তু তিনি বলেছিলেন, ঘৃণা মানুষকে বন্দী করে রাখে; ক্ষমা মানুষকে মুক্ত করে। অবশ্য তাঁর ক্ষমাশীলতা কখনোই অন্যায়কে ভুলে যাওয়ার নাম ছিল না। তিনি ন্যায়বিচার চেয়েছিলেন, কিন্তু প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়; সত্য উদ্‌ঘাটন, জবাবদিহি ও পুনর্মিলনের মাধ্যমে। এ দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে।

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো সর্বজনীন ভোটাধিকারভিত্তিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। সে বিজয় কেবল একজন মানুষের ছিল না; ছিল শতাব্দীব্যাপী বঞ্চিত কোটি মানুষের আত্মমর্যাদার পুনরুদ্ধার। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ম্যান্ডেলার প্রথম কাজগুলোর একটি ছিল এমন একটি সংবিধান প্রণয়নের পথ সুগম করা, যেখানে মানুষের অধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়।

ক্ষমতায় এসে ম্যান্ডেলা যে সংযম ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আধুনিক রাজনীতিতে বিরল। তিনি জানতেন, রাজনৈতিক বিজয়ের পরও একটি বিভক্ত সমাজকে একত্র করা সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাই তিনি জাতিগত প্রতিশোধের পরিবর্তে জাতীয় পুনর্মিলনকে অগ্রাধিকার দেন। রাগবি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় দলকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানানো কিংবা শ্বেতাঙ্গ নাগরিকদের আশ্বস্ত করার নানা পদক্ষেপ ছিল সে বৃহত্তর রাষ্ট্রনৈতিক দর্শনের অংশ। তাঁর নেতৃত্বে গঠিত ‘সত্য ও পুনর্মিলন কমিশন’ অতীতের অপরাধকে আড়াল করেনি; বরং সত্য প্রকাশের মাধ্যমে ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করেছে। ইতিহাসে এ রকম উদ্যোগের দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।

ম্যান্ডেলার জীবন আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তিনি ক্ষমতাকে কখনো ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করেননি। মাত্র এক মেয়াদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করে তিনি স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান। আফ্রিকার বহু দেশে যেখানে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে তাঁর এ সিদ্ধান্ত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে মহান নেতার পরিচয় ক্ষমতায় দীর্ঘদিন থাকা নয়; বরং সঠিক সময়ে ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে যাওয়া।

এসব অভিজ্ঞতার আলোয় ফিরে তাকালে ১৯৫৩ সালের সেই ভাষণ যেন নতুন অর্থে উদ্ভাসিত হয়। সেখানে তিনি যে বলেছিলেন, স্বাধীনতার পথে সহজ কোনো পথ নেই—পরবর্তী চার দশকের জীবন দিয়ে তিনি সে কথার সত্যতা প্রমাণ করেছেন। কারাগার, নির্বাসন, আন্তর্জাতিক চাপ, আলোচনার টেবিল, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন হয়ে উঠেছে সেই দীর্ঘ ও কঠিন পথেরই জীবন্ত ইতিহাস।

৩.

নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনকে কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসের ভেতর সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না। তিনি এমন এক সময়ের নেতা, যখন বিশ্বের বহু দেশে উপনিবেশবাদ, বর্ণবাদ, সামরিক শাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষ নতুন করে অধিকার ও মর্যাদার লড়াই শুরু করেছিল। কিন্তু এ বৃহত্তর পরিবর্তনের ইতিহাসে ম্যান্ডেলার বিশেষত্ব ছিল তাঁর নৈতিক নেতৃত্ব। তিনি কেবল একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো বদলাতে চাননি; তিনি মানুষের চিন্তার ভেতরও পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে স্বাধীনতার অর্থ ছিল না কেবল শৃঙ্খলমুক্ত হওয়া; বরং এমন এক সমাজ নির্মাণ করা, যেখানে অন্যের স্বাধীনতাকেও নিজের স্বাধীনতার মতো সম্মান করা হবে।

আত্মজীবনী লং ওয়াক টু ফ্রিডম-এ ম্যান্ডেলা লিখেছেন, স্বাধীনতার পথে এগোতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, শুধু নিজের শৃঙ্খল ভাঙাই যথেষ্ট নয়; এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে অন্যের স্বাধীনতাও প্রসারিত হয়। এ উপলব্ধিই তাঁকে সাধারণ রাজনৈতিক নেতার সীমা অতিক্রম করে মানবতাবাদী চিন্তকে পরিণত করেছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মর্যাদা। বর্ণ, ধর্ম, ভাষা কিংবা সংস্কৃতির পার্থক্য তাঁর কাছে কখনো মানুষের মৌলিক অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠেনি।

১৯৫৩ সালের ভাষণে তিনি যে বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছিলেন, তা হলো সংগঠনের শক্তি। তিনি বলেছিলেন, কেবল আবেগ, স্লোগান কিংবা ক্ষণিকের উত্তেজনা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলন সফল হয় না। আন্দোলনের জন্য প্রয়োজন শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক শিক্ষা, বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষমতা এবং মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী আস্থা গড়ে তোলা। আজকের বিশ্বেও এ শিক্ষা সমান প্রাসঙ্গিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত উত্তেজনা অনেক সময় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মুহূর্তের আবেগই যেন সবকিছু। কিন্তু ম্যান্ডেলার জীবন শেখায়, ইতিহাস পরিবর্তন করে ধৈর্য, সংগঠন, অধ্যবসায় ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি।

কারাগার প্রাঙ্গণ, রবেন দ্বীপ
নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন আমাদের শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। স্বাধীনতা কোনো এক দিনে অর্জিত বিজয় নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষার অবিরাম দায়িত্ব। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায় নয়; এটি সমাজের প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। আর নেতৃত্ব মানে কেবল জনতার সামনে দাঁড়ানো নয়; বরং সংকটের সময় মানুষের আশা, সাহস ও আস্থাকে ধরে রাখা।

ম্যান্ডেলার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো নেতৃত্বের নৈতিকতা। তিনি কখনো নিজেকে ইতিহাসের একমাত্র নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি, বরং প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের কথা স্মরণ করেছেন—অলিভার ট্যাম্বো, ওয়াল্টার সিসুলু, গোভান এমবেকি, আহমেদ কাথরাদা, আলবার্ট লুথুলি, জো স্লোভো, রুথ ফার্স্ট এবং আরও অসংখ্য পরিচিত-অপরিচিত সংগ্রামী মানুষকে। তিনি জানতেন যে ইতিহাস কোনো একক মানুষের হাতে নির্মিত হয় না; এটি অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। এ বিনয় ম্যান্ডেলাকে আরও বড় করে তুলেছে।

ক্ষমাশীলতা নিয়ে ম্যান্ডেলার দর্শনও গভীরভাবে আলোচনার দাবি রাখে। অনেকেই ক্ষমাকে দুর্বলতার লক্ষণ বলে মনে করেন। কিন্তু তাঁর কাছে ক্ষমা ছিল শক্তির পরিচয়। কারণ, ক্ষমা মানে অন্যায়কে ভুলে যাওয়া নয়; বরং অন্যায়ের প্রতিক্রিয়ায় নিজেকে ঘৃণার বন্দী হতে না দেওয়া। তিনি বুঝেছিলেন, প্রতিশোধের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নতুন প্রতিশোধই সৃষ্টি করে। তাই তিনি ন্যায়বিচার, সত্য প্রকাশ ও পুনর্মিলনের মধ্যে একটি ভারসাম্য গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। এ দৃষ্টিভঙ্গি আজও সংঘাতপীড়িত বিশ্বের জন্য মূল্যবান শিক্ষা।

তবে ম্যান্ডেলার জীবনকে অতিমানবীয় কিংবদন্তিতে পরিণত করাও ঠিক নয়। তিনি নিজেই বহুবার বলেছেন, তিনি সাধু নন—যদি না সাধু বলতে এমন মানুষকে বোঝানো হয়, যিনি ভুল করেন, সে ভুল থেকে শিক্ষা নেন এবং আবার উঠে দাঁড়ান। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তাঁর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা। এ আত্মসমালোচনার ক্ষমতাই তাঁকে ক্রমাগত পরিণত করেছে।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পরও ম্যান্ডেলা জনজীবন থেকে সরে যাননি। শিশুদের শিক্ষা, এইচআইভি/এইডস প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবকল্যাণমূলক নানা উদ্যোগে তিনি সক্রিয় ছিলেন। বিশেষ করে নিজের পরিবারের ভেতর এইডসে মৃত্যুর অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে তুলে ধরে তিনি সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রবীণ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তিনি দেখিয়েছিলেন যে নেতৃত্ব ক্ষমতার মঞ্চে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই তার প্রকৃত অর্থ নিহিত।

২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর নেলসন ম্যান্ডেলা পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং এক উত্তরাধিকারের সূচনা। আজও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন মানুষ বর্ণবাদ, বৈষম্য, দারিদ্র্য, রাষ্ট্রের দমননীতি কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, তখন ম্যান্ডেলার নাম নতুন করে উচ্চারিত হয়। কারণ, তাঁর জীবন প্রমাণ করেছে যে দীর্ঘতম অন্ধকারও চিরস্থায়ী নয়; সংগঠিত মানুষের ইচ্ছাশক্তির কাছে অন্যায় একদিন পরাজিত হবেই।

১৮ জুলাই ম্যান্ডেলার জন্মদিন। দিনটি আন্তর্জাতিকভাবে ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। এ দিবসের মূল আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—প্রত্যেক মানুষ যেন অন্তত কিছু সময় অন্যের কল্যাণে ব্যয় করেন। এতে ম্যান্ডেলাকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় হিসেবে কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানবসেবাকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি তাঁর জীবনদর্শনেরই স্বাভাবিক সম্প্রসারণ।

আজ যখন আমরা ম্যান্ডেলার ১৯৫৩ সালের ভাষণ পড়ি, তখন বিস্মিত হই এই ভেবে যে এক তরুণ নেতা কী অসাধারণ দূরদর্শিতায় ভবিষ্যতের সংগ্রামের রূপরেখা এঁকেছিলেন। তিনি জানতেন, রাষ্ট্রের দমননীতি সাময়িকভাবে আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারে, কিন্তু মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরকাল দমিয়ে রাখতে পারে না। তাই তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের হতাশ হতে দেননি; বরং নতুন বাস্তবতা বুঝে নতুন পথ নির্মাণের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর ভাষণের প্রতিটি অনুচ্ছেদে যে বাস্তববাদ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও মানবিক সংবেদনশীলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

নেলসন ম্যান্ডেলার জীবন আমাদের শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। স্বাধীনতা কোনো এক দিনে অর্জিত বিজয় নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলন। গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন নয়; এটি মানুষের মর্যাদা রক্ষার অবিরাম দায়িত্ব। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায় নয়; এটি সমাজের প্রত্যেক মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। আর নেতৃত্ব মানে কেবল জনতার সামনে দাঁড়ানো নয়; বরং সংকটের সময় মানুষের আশা, সাহস ও আস্থাকে ধরে রাখা।

তাই নেলসন ম্যান্ডেলাকে স্মরণ করা মানে শুধু এক কিংবদন্তি রাষ্ট্রনায়ককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং নিজের সময়ের অন্যায়, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান নেওয়ার সাহস অর্জন করা। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাসের প্রতিটি বড় অর্জনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষা, অসংখ্য মানুষের ত্যাগ এবং অবিচল বিশ্বাস। যে মানুষ সাতাশ বছর কারাগারে থেকেও স্বাধীনতার স্বপ্ন হারাননি, তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন—অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, মানুষের স্বাধীনচেতা মন তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।

এ কারণেই নেলসন ম্যান্ডেলার কণ্ঠে উচ্চারিত সেই বাক্য সময়ের সীমানা অতিক্রম করে আজও আমাদের বিবেককে স্পর্শ করে—স্বাধীনতার পথে সত্যিই সহজ কোনো পথ নেই। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই কঠিন পথেই মানবমর্যাদার সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয়গুলো অর্জিত হয়েছে।