পাঠকেরা কেন এখন থ্রিলারের দিকে ঝুঁকছেন?

থ্রিলার সাহিত্যের এখন জয়জয়কার। সেবার নতুন কোনো বই বা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের নতুন কোনো বইয়ের জন্য মুখিয়ে থাকেন পাঠকেরা। কিন্তু কেন থ্রিলার সাহিত্যের দিকে ঝুঁকছেন এই তরুণ পাঠকেরা?

কোলাজআপন জোয়ার্দার

বাংলা থ্রিলারের এখন ভরা যৌবন। কিশোর-তরুণ—সবারই বেশ আগ্রহ রহস্য গল্পে। বইমেলায় সেটি ভালো বোঝা যায়। তবে থ্রিলার প্রকাশনীগুলো আজকাল আর মেলার অপেক্ষায় থাকে না। সারা বছরই প্রকাশিত হচ্ছে নানা ধরনের গল্প। কোনোটা মৌলিক, বেশির ভাগই অনুবাদ। পাঠকও আগ্রহভরে বছরজুড়েই কিনছেন এসব বই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে নিয়মিতই। আবার এসব থ্রিলার বা রহস্য–রোমাঞ্চ সাহিত্য অবলম্বনে ওটিটিতে নির্মিত হচ্ছে নানান ধারাবাহিকও। বলা বাহুল্য, সেগুলো দর্শকপ্রিয়তাও পাচ্ছে।

কিন্তু কেন? কেন এমন ঘটছে? থ্রিলার গল্পের পালে এই হঠাৎ হাওয়া লাগল কীভাবে? হঠাৎ নাকি দীর্ঘদিন ধরে থ্রিলারের আবেদন রয়েছে এ দেশের পাঠকদের কাছে?
এই প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজতে চাইলে খানিকটা পেছন ফিরে দেখা জরুরি।

বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট বলা যায় কাজী আনোয়ার হোসেনকে। তাঁর হাতে গড়ে উঠেছে মাসুদ রানা, কুয়াশার মতো জনপ্রিয় চরিত্র। সেবা প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে দীর্ঘদিন একা হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন থ্রিলার সাহিত্যের। আজকের লেখকদের বেশির ভাগই এককথায় বলবেন, তাঁদের লেখালেখির পেছনে এই প্রকাশনীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। ‘মাসুদ রানা’, ‘তিন গোয়েন্দা’ ওয়েস্টার্ন বা হরর—রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পের সব শাখাতেই অবাধ বিচরণ এ প্রকাশনীর। আর প্রকাশনীটির প্রতিষ্ঠাতা কাজী আনোয়ার হোসেন—সবার প্রিয় কাজীদা, প্রথমবারের মতো নির্মাণ করেন থ্রিলারের ভাষা। তাঁর গদ্য ছিল স্বাদু, সহজ ও দ্রুতলয়ের। সেবার বই তাই আন্দোলন তোলে কিশোর-তরুণদের মনে। ধীরে ধীরে তৈরি হয় থ্রিলার সাহিত্যের বাজার।

থ্রিলার বা রহস্য গল্পে একদিকে থাকে মাথা খাটানোর সুযোগ। এটা ঠিক পাজল মেলানোর মতো। কিংবা জাদু দেখার মতো—আপনি জানেন, জাদুকর প্রতারণা করছেন, অথচ বসে থাকেন প্রতারিত হওয়ার অপেক্ষায়। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কবিতায় যেমন বলেন, ‘ক্যামন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় জাদুকর!’ তাই তো। ব্যস্ত দিন শেষে পয়সা দিয়ে জাদু দেখা বা পাজল মেলানোর সুযোগ পেলে কেউ ছাড়বেন কেন? অন্যদিকে অধিকাংশ থ্রিলারে অপরাধীর শাস্তি হয়। বিচার মেলে। এতে স্বস্তি পায় পাঠকমন।

সেই পালে পরের বড় হাওয়াটি লাগে বাতিঘর প্রকাশনীর হাত ধরে। এই প্রকাশনীর প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন নিজেও থ্রিলার লেখক হিসেবে তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। সমকালীন বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে তাঁর প্রভাব রয়েছে। এই প্রভাব কেবল লেখক হিসেবে নয়, নিজের প্রকাশনীর মাধ্যমে এই ঘরানার লেখক তৈরিতেও তাঁর ভূমিকাকে স্বীকার করেন অনেকেই। যে কারণে অনুজ অনেক থ্রিলার লেখক তাঁকে ‘গুরু’ বলে সম্বোধনও করেন।

বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট বলা যায় কাজী আনোয়ার হোসেনকে
ছবি: সুমন ইউসুফ

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন শুরু করেছিলেন ‘নেমেসিস’ দিয়ে, যার কেন্দ্রে ছিল এক জনপ্রিয় সাহিত্যিকের মৃত্যু। এ বইয়ে প্রথমবারের মতো দেখা যায় তাঁর জনপ্রিয় দুই চরিত্রকে—জেফরি বেগ ও বাস্টার্ড। তাদের লড়াই চলছে আজও। ইতিমধ্যেই বেরিয়েছে এ সিরিজের পাঁচটি বই। পাঠকই এ সিরিজের নাম দিয়েছেন ‘বেগ-বাস্টার্ড’ সিরিজ। এ ছাড়া ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’, ‘কেউ কেউ কথা রাখে’ সাড়া জাগিয়েছে।

আবার সাম্প্রতিককালে তাঁর লেখা ‘ঢাবাকা’ও আলোচিত হয়েছে। যদিও এটাকে যদিও তিনি ‘গ্রাফিক নভেল’ হিসেবে দাবি করেছেন, কিন্তু অনেকে বইটিকে ‘ইলাস্টে৶টেড নভেল’ বলারই পক্ষপাতী।

থ্রিলার ঘরানার বইয়ের এই রোমাঞ্চকর ঢেউ যে পাঠকসমাজকে আন্দোলিত করেছে, তার প্রমাণ বইমেলা কিংবা বছরজুড়ে এ ধারার বইয়ের বিক্রি প্রতিনিয়তই বাড়ছে। এই বইগুলোর লেখকেরাও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়। তালিকাটিও নিতান্ত ছোট নয়। ‘সাম্ভালা’খ্যাত শরীফুল হাসান, ‘বাজিকর’–এর লেখক নাবিল মোহতাসিম, ‘জাদুঘর’খ্যাত কিশোর পাশা ইমন, হরর গল্পের জন্য লুৎফল কায়সার, জাপানি থ্রিলার অনুবাদে সালমান হক বা কৌশিক জামান বর্তমানে আলোচিত নাম।

কাজী আনোয়ার হোসেনের বিখ্যাত ‘মাসুদ রানা’ সিরিজের প্রথম বই ‘ধ্বংস পাহাড়’–এর প্রচ্ছদ
ছবি: সংগৃহীত

আর কল্পবিজ্ঞান বা পরাবাস্তব ধরনের গল্পের জন্য বিখ্যাত শিবব্রত বর্মনের নাম উল্লেখ না করলে হাল আমলের তরুণদের রুচির অনেকাংশই অনুল্লেখিত থেকে যাবে। তাঁর দুটি বই ‘বানিয়ালুলু’ ও ‘সুরাইয়া’; দুটিই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। সত্যি বলতে, জনপ্রিয় লেখকদের এ তালিকা এত দীর্ঘ, নাম বলে শেষ করা যাবে না। তারচেয়ে বরং সেই প্রশ্নটিতে ফেরা যাক।

হঠাৎ কেন হাওয়া লাগল থ্রিলার সাহিত্যের পালে?

থ্রিলার বরাবরই সাহিত্যের জনপ্রিয় ধারার অন্তর্ভুক্ত। তবে থ্রিলার হয়েও যে ভালো সাহিত্য হওয়া যায়, বিশ্বসাহিত্যে তার উদাহরণ কম নয়। অ্যাডগার এলান পো, আগাথা ক্রিস্টি বা কোনান ডয়েল—এই বিশ্ববরেণ্যদের লেখা সাহিত্যমানে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। তবে এ ঘরানার সাহিত্য লিখে কেউ নোবেল পুরস্কার পাননি, সে কথা হয়তো কেউ দাবি করতেই পারেন।

আসলেই কি পারেন? গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের ‘নিঃসঙ্গতার এক শ বছর’, নাগিব মাহফুজের ‘কায়রো ট্রিলজি’ কিংবা ওরহান পামুকের ‘মাই নেম ইজ রেড’কে কি রহস্য-রোমাঞ্চ ধারার গল্প হিসেবে শনাক্ত করা যায় না? অবশ্য রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পের সীমানা ছাড়িয়ে এই বইগুলো হয়ে উঠেছে মানুষের জীবনের আখ্যান।

এবারে একটু বাংলাদেশের সামাজিক ঘরানার উপন্যাসের কথা ভাবি। সেই সঙ্গে, এ দেশের মানুষ কেন থ্রিলার পড়ে, সে কথা না বলে বরং বলি, আমি কেন থ্রিলার পড়ি। কারণ, শিল্পসাহিত্য চিরকালই ‘সাবজেক্টিভ’ বা ব্যক্তিনির্ভর। ব্যক্তিভেদে সাহিত্যের বিচার এবং আবেদনও ভিন্ন।

থ্রিলার সাহিত্যের সমসাময়িকতা। মানুষ যে সময়ে বেঁচে আছে, সে সময়ের গল্প শুনতে চায়। এ ধরনের সামাজিক উপন্যাস বোধ হয় এখন কমই লেখা হচ্ছে আমাদের এখানে। বেশির ভাগ সামাজিক উপন্যাসেই দেখা যাচ্ছে, কোনো কাল বা কারও জীবনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় থ্রিলারে এই সমসাময়িকতাটা হয়তো একটু বেশিই স্পষ্ট।

আমরা যে দেশে থাকি, সে দেশের যেকোনো পত্রিকা হাতে তুলে নিন। পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে আমাদের জীবনের অন্ধকার দিকটির কথা। পত্রিকাকে যদি ‘সমাজের আয়না’ হিসেবে বিবেচনা করি, তবে এ আয়নায় আলোর চেয়ে অন্ধকারের ছোপই বেশি দেখা যাবে। মানুষের প্রবৃত্তিই হলো, অন্ধকার থেকে সে বেরোতে চায়। আর ঠিক তা-ই ঘটে রহস্য-রোমাঞ্চ গল্পে। যেখানে কেউ খুন হলে চতুর পুলিশ অফিসার ঠিক ঠিক বের করে আনেন অপরাধীকে। যতই অন্ধকারের ছায়া থাকুক, দিন শেষে জিতে যায় আলো। এই আলো আমাদের জীবনে বড় প্রয়োজন।

মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন থ্রিলার লেখক হিসেবে এখন তরুণদের কাছে খুবই জনপ্রিয়
ছবি: সংগৃহীত

থ্রিলার বা রহস্য গল্পে একদিকে থাকে মাথা খাটানোর সুযোগ। এটা ঠিক, পাজল মেলানোর মতো। কিংবা জাদু দেখার মতো—আপনি জানেন, জাদুকর প্রতারণা করছেন, অথচ বসে থাকেন প্রতারিত হওয়ার অপেক্ষায়। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক তাঁর কবিতায় যেমন বলেন, ‘ক্যামন মোচড় দিয়া টাকা নিয়া যায় জাদুকর!’ তাই তো। ব্যস্ত দিন শেষে পয়সা দিয়ে জাদু দেখা বা পাজল মেলানোর সুযোগ পেলে কেউ ছাড়বেন কেন? অন্যদিকে, অধিকাংশ থ্রিলারে অপরাধীর শাস্তি হয়। বিচার মেলে। এতে স্বস্তি পায় পাঠকমন।

আরেকটা বড় বিষয় হলো, থ্রিলার সাহিত্যের সমসাময়িকতা। মানুষ যে সময়ে বেঁচে আছে, সে সময়ের গল্প শুনতে চায়। এ ধরনের সামাজিক উপন্যাস বোধ হয় এখন কমই লেখা হচ্ছে আমাদের এখানে। বেশির ভাগ সামাজিক উপন্যাসেই দেখা যাচ্ছে, কোনো কাল বা কারও জীবনীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় থ্রিলারে এই সমসাময়িকতাটা হয়তো একটু বেশিই স্পষ্ট।

‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’—মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের পাঠকপ্রিয় একটি বই
ছবি: সংগৃহীত

একুশ শতকে চিঠি পাঠানো হয় না কোনো গোয়েন্দার কাছে ডাকে। ফরেনসিক বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির ব্যবহার বাদ দিয়ে আগের কালের মতো করে অপরাধী খুঁজতে যদি নামেন গোয়েন্দা, তাহলেই হয়েছে! এই সমসাময়িকতার সঙ্গে মানুষ নিজের চারপাশের পরিবেশের সংযোগ খুঁজে পান। নিজের সময়ের প্রতিচ্ছবি পান। থ্রিলারের পাঠকপ্রিয় হওয়ার পেছনে এটাও বোধহয় একটা বড় ভূমিকা রাখে।

তবে সবচেয়ে বড় বিষয় সম্ভবত, মানুষ কল্পনায় ডানা মেলতে ভালোবাসে। নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চোখের সামনে দেখতে ভালোবাসে। ‘মাসুদ রানা’ পড়ে তার মতো হতে চায়নি, এমন যুবক খুঁজে পাওয়া ভার। আর রানার প্রেমে পড়েছে কত তরুণী, তার হিসাব মেলাতে গেলে অকেজো হয়ে যাবে ক্যালকুলেটর। রানার নায়িকা সোহানাকে ভালোবাসেনি কে? কিংবা হাল আমলের মুশকান জুবেরী? এই অপূর্ণ অতৃপ্ত স্বপ্ন পূরণের সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইবে কেউ?

‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেননি’ উপন্যাস থেকে ওটিটিতে নির্মিত হয়েছে সিরিজ
ছবি: সংগৃহীত

এসব কারণেই আমি থ্রিলার পছন্দ করি। আমার ধারণা, যাঁরা থ্রিলার পছন্দ করেন, চেতন বা অবচেতনে তাঁদের মধ্যেও এসব বিষয় কাজ করে। সঙ্গে হয়তো কাজ করে আরও কিছু বিষয়। উদাহরণ দিই। জীবন এখন অনেক গতিশীল। স্থির, ধীরে এগোনো ভাষার চেয়ে থ্রিলারের গতিশীল ভাষা তাই হয়তো অনেকের কাছেই বেশি আকর্ষণীয়।

কে ঠিক কী কারণে থ্রিলার পড়েন—এ কথা বলা মুশকিল। তবে আমাদের থ্রিলার সাহিত্য যে তরুণ লেখকদের হাতে আরও পরিণত হচ্ছে—এ নিয়ে আমার মতো থ্রিলারপ্রিয় পাঠকেরা আশাবাদী হয়ে উঠতেই পারেন।