নজরুল-জীবনীর মূল্যায়ন
কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯-১৯৭৬) জন্মের প্রায় সমকালে, ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) একটি প্রবন্ধ লেখেন, নাম ‘কবিজীবনী’। কবি টেনিসনের পুত্র টেনিসনের জীবনী লিখেছিলেন দুই খণ্ডে, সেই বইয়ের আলোচনা রবীন্দ্রনাথের ওই প্রবন্ধ। বইটি রবীন্দ্রনাথের পছন্দ হয়নি। কারণ, ‘ইহা টেনিসনের জীবনচরিত হইতে পারে; কিন্তু কবির জীবনচরিত নহে। আমরা বুঝিতে পারিলাম না, কবি কবে মানব হৃদয়সমুদ্রের মধ্যে জাল ফেলিয়া এত জ্ঞান ও ভাব আহরণ করিলেন এবং কোথায় বসিয়া বিশ্বসংগীতের সুরগুলি তাঁহার বাঁশিতে অভ্যাস করিয়া লইলেন। কবি কবিতা যেমন করিয়া রচনা করিয়াছেন, জীবন তেমন করিয়া রচনা করেন নাই। তাঁহার জীবন কাব্য নহে; যাঁহারা কর্মবীর, তাঁহারা নিজের জীবনকে নিজে সৃজন করেন।’ তারপর রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কোনো ক্ষণজন্মা ব্যক্তি কাব্যে এবং জীবনের কর্মে উভয়তেই নিজের প্রতিভা বিকাশ করিতে পারেন; কাব্য ও কর্ম উভয়ই তাঁহার এক প্রতিভার ফল। তাঁহাদের কাব্যকে তাঁহাদের জীবনের সহিত একত্র করিয়া দেখিলে তাহার অর্থ বিস্তৃততর, ভাব নিবিড়তর হইয়া উঠে।’ এই প্রবন্ধ থেকে কোনো কবির জীবনী কেমন হওয়া উচিত, সে-সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা-ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ কবির আত্মিক জীবনের বিকাশকেই গুরুত্ব দিয়েছেন সব সময়। এ রকম একটি আত্মজীবনী লিখেই তিনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের রবীন্দ্রজীবনী এ-কারণেই তাঁর পছন্দ হয়নি; কিন্তু কোনো কবি যদি তাঁর জীবনকেও সৃষ্টি করে নেন, তবে তাঁর জীবনের কর্মবহুল ইতিবৃত্ত লেখা যেতে পারে—এটিই রবীন্দ্রনাথের ধারণা। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ দুই রকম কবির দুই রকম জীবনীর কথা ভেবেছেন—যিনি শুধু কবি, তাঁর আত্মিক জীবনের ইতিহাস লিখতে হবে; আর যিনি একই সঙ্গে কবি ও কর্মবীর, তাঁর আত্মিক জীবনের সঙ্গে কর্মজীবন মিলিয়ে নিতে হবে। এই বিবেচনার উদাহরণ হিসেবে কেবলমাত্র কবি (অর্থাৎ সৃজনশীল শিল্পী) হিসেবে আমরা নজরুল ইসলামকে ধরতে পারি; এবং কবি ও কর্মবীর হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।
রবীন্দ্রনাথ একটি কবিতায় আরেকবার বলেছিলেন, ‘কবিরে পাবে না তাহার জীবনচরিতে।’ সব-মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের মনোপ্রতিন্যাস বোঝা যায়—কবির আত্মিক জীবনের বিকাশকেই তিনি বেশি মূল্য দিতেন, ‘কবিজীবনী’ প্রবন্ধে যাকে তিনি ‘কাব্যগত জীবনচরিত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
আমাদের ধারণা: কবির আত্মিক জীবনকে নিশ্চয়ই মূল্য দিতে হবে; কিন্তু তা মূখ্যত কবির বাস্তব জীবনের ওপরেই স্থাপিত বা সম্পৃক্ত। বাস্তবতা মানুষের জীবনে কাজ করে নানাভাবে—কখনো সরাসরি, কখনো প্রতিফলিত-প্রতিসরিত হয়ে। কবিজীবনের ঘটনাবলির সঙ্গে তাঁর সৃষ্টির এ রকম প্রত্যক্ষ প্রতিফলিত বা প্রতিসরিত সম্পর্ক থাকে। দু–এক সময়ে মনে হয়, কোনো সম্পর্কই নেই; কিন্তু সেখানেও জীবনানন্দের ভাষায় দেখা যাবে আছে কোনো ‘সুড়ঙ্গলালিত’ সম্পর্ক। জীবনানন্দ দাশের মতো অ্যাবস্ট্র্যাকশনের কবিও স্বীকার করেছেন, ‘কবিতা ও জীবন একই জিনিসের দুই রকম উত্সারণ।’
হ্যাঁ, দুই রকম উত্সারণ। সে জন্যই প্রকৃতি বা ঈশ্বরনির্মিত জীবনের আর দ্বিতীয় নির্মাণ সম্ভব নয়। একটি যে-জীবন অতিবাহিত হয়ে গেছে, তা আর পুনর্নির্মাণ করা যাবে না। কাজী নজরুল ইসলামের মতো অসাধারণ প্রতিভাবানের কেন, একজন সাধারণ মানুষের জীবনও পুনর্গঠন করা যায় না। জীবনীকার তাহলে কী করবেন? তিনি নির্বাচন করবেন—কোনো ব্যক্তির জীবনের নির্বাচিত অংশে আলোসম্পাত। নির্বাচিত অংশে আলোসম্পাত মানে হচ্ছে একটি দৃষ্টিকোণের প্রয়োগ। তাই একই ব্যক্তির জীবনী রচনা করলেও প্রত্যেক সফল জীবনীকার অন্যের থেকে স্বতন্ত্র; একই ব্যক্তির জীবনী হলেও প্রত্যেক সফল জীবনী স্বতন্ত্র।
২.
বাঙালি পল্টন ভেঙে দেওয়া হলে ১৯২০ সালের মার্চ মাসে নজরুল করাচি থেকে কলকাতায় চলে আসেন। কলকাতায় পৌঁছানোর পরদিনই নজরুল সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করেন। সওগাত প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৮ সালে। সওগাতের পৃষ্ঠাতেই ১৯১৯ সালে নজরুল ইসলামের প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়, একটি গল্প, ‘বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী’। প্রথম পর্যায়ে সওগাত প্রকাশিত হয় ১৩২৫-২৭ কাল পর্যায়ে। সওগাতের প্রথম সংখ্যা (অগ্রহায়ণ ১৩২৫) থেকেই ‘বর্তমান বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যিকগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয়’ প্রকাশিত হচ্ছিল। তাতে মোজাম্মেল হক, মোহাম্মদ আকরম খাঁ, মিসেস আর এস হোসেন, সৈয়দ এমদাদ আলী, সৈয়দ আবু মোহাম্মদ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কায়কোবাদ, শেখ হবিবর রহমান, শাহাদাৎ হোসেন, গোলাম মোস্তফা, মুজাফফর আহমদ প্রমুখ সাহিত্যিকের পরিচিতি প্রকাশিত হয়। এসব অব্যবহিত পূর্বজ এবং সমকালীন সাহিত্যিকদের পটভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলামের অভ্যুদয় ঘটে। ওই ধারাবাহিক তালিকায় নজরুলের নাম আসেনি; কিন্তু ওই ১৯২০ সালেই নজরুল চিহ্নিত হয়ে যাচ্ছেন। তাঁর আবাস ‘বঙ্গীয়-মুসলমান সাহিত্য-সমিতি’র অফিসে ভিড় জমে উঠছে তাঁকে ঘিরে; সদ্য প্রকাশিত মোসলেম ভারত পত্রিকায় তাঁর ‘শাতিল আরব’, ‘বাদল প্রাতের শরাব’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহররম’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ-দহম’ প্রভৃতি কালোত্তর কবিতা বেরোচ্ছে; মোহিতলাল মজুমদার ও রবীন্দ্রনাথের সচিব সুধাকান্ত রায়চৌধুরী তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখছেন; তখনই উপাসনা পত্রিকায় তাঁর কবিতার পর কবিতা আলোচিত হচ্ছে; ওই বছরই ‘সওগাত ক্লাব’ সদ্য স্থাপিত হলে তার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ‘গত কয়েক অধিবেশনে কাজী নজরুল ইসলাম, শাহাদাৎ হোসেন প্রমুখ কবি তাঁহাদের স্ব স্ব রচিত কবিতা পাঠ করিয়াছিলেন এবং নাটক, ছোটগল্প ও উপন্যাস সম্বন্ধে অনেক মূল্যবান কথা বালিয়াছিলেন।’ লক্ষণীয়: ১৯২০ সালেই বয়োজ্যেষ্ঠ কবি শাহাদাৎ হোসেনের আগে নাম আসছে নজরুলের।
১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি শুক্রবার নজরুল ইসলামের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশিত হলো সাপ্তাহিক বিজলী পত্রিকায়। বাংলা সাহিত্যে আর কোনো একটি কবিতা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে এত বিপুল আলোচনা-সমালোচনা হয়নি আর, যেমন হয়েছে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা নিয়ে। ১৯২২ সাল নজরুল-জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বছর। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এ বছর প্রকাশিত হয়। নজরুলের প্রথম গল্পগ্রন্থ ব্যথার দান, প্রথম কবিতাগ্রন্থ অগ্নিবীণা, প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী প্রকাশিত হয় এ বছরেই। যুগবাণী প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত হয়—অর্থাৎ ১৯২২ সাল নজরুলের প্রথম গ্রন্থ–বাজেয়াপ্তিরও বছর। নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় অর্ধসাপ্তাহিক ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২ সালের ১১ আগস্ট। ২৬ সেপ্টেম্বর ধূমকেতু পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার জন্য বাজেয়াপ্ত হয়েছিল ধূমকেতু এবং নজরুল গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এক-জীবনের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা যেন ওই এক বছরে নজরুল উপার্জন করেছিলেন। ১৯২২ সালে নজরুল সারা বাংলাদেশে পরিচিত হয়ে গেলেন। অতঃপর ‘বিদ্রোহী কবি’—এই একডাকেই সবাই চিনবে তাঁকে।
১৯২২ সালেই নজরুল প্রথমবারের মতো সংবর্ধিত হয়েছিলেন তাঁর স্বভূমিতে। ধূমকেতু পত্রিকার ২৬ আশ্বিন ১৩২৯, ১৩ অক্টোবর ১৯২২, শুক্রবারের সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল ‘কবি কাজী নজরুল ইসলামের রাণীগঞ্জে আগমন উপলক্ষে অভিনন্দনগীতি’ (প্রথম পঙ্ক্তি: ‘এসো রৌদ্র-রসের বিদ্রোহী-কবি! অদ্রি-অটল ধর্ম!’) শক্তিপদ ভট্টাচার্য রচিত ‘বর্ধমানের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী-কবির অভিনন্দন’-শীর্ষক মানপত্র। এই মানপত্রের একটি অনুচ্ছেদ: ‘মনে পড়ে কবিগুরুকে নোবেল প্রাইজ দিয়ে পাশ্চাত্যেরা যখন ভারতবর্ষকে টিটকিরি দিতে লাগল, তখন ছন্দ-রাজ সত্যেন্দ্রনাথ, সুপণ্ডিত চারুবাবু প্রমুখ অন্তত মাথা উঁচু করে বলতে পেরেছিলেন, ‘আমরাও গুণীকে চিনি, গুণের আদর জানি এবং তোমাদের বহু পূর্বেই আমাদের শ্রদ্ধা–অঞ্জলি তাঁর চরণ স্পর্শ করে ধন্য হয়েছে। আজ বর্ধমানের বুক থেকে তোমাকে অভিনন্দন দিয়ে, ভবিষ্যতে আমরাও সেই একই দাবির ওপর দাঁড়াতে চাই। আমরা জানি, আমাদের এ আশা ব্যর্থ হবে না।’ না, হয়নি। ১৯২২ সালে নজরুলের জন্মজেলা বর্ধমান থেকে যে অভিনন্দন-সংবর্ধনা এসেছিল প্রথমবারের মতো, ১৯৯৯ সালে, নজরুল ইসলামের জন্মশতবর্ষে, সারা বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গে এবং সারা পৃথিবীতে সেই অভিনন্দনের ঢেউ ধ্বনিত-রণিত হচ্ছে।
ধূমকেতু পত্রিকার প্রথম সংখ্যা (১১ আগস্ট) থেকে একবিংশ সংখ্যা (১০ নভেম্বর ১৯২২) পর্যন্ত ২১টি সংখ্যা নজরুল সম্পাদনা করেছিলেন। দ্বাবিংশ সংখ্যা (১৭ নভেম্বর ১৯২২) থেকে দ্বাত্রিংশ সংখ্যা (২৭ জানুয়ারি ১৯২৩) পর্যন্ত ১০টি সংখ্যা সম্পাদনা করেন অমরেশ কাঞ্জিলাল। সর্বশেষ এই সংখ্যা ছিল নজরুল-সংখ্যা। নজরুল নিজে ধূমকেতু পত্রিকার মহররম সংখ্যা, আগমনী সংখ্যা, দেওয়ালী সংখ্যা প্রভৃতি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন, এখন তাঁরই প্রতিষ্ঠিত পত্রিকায় নজরুল সংখ্যা। পরবর্তীকালে সংখ্যাহীন পত্রিকা নজরুল সংখ্যা প্রকাশ করেছে—ধূমকেতু পত্রিকার ২৭ জানুয়ারি ১৯২৩ সংখ্যাটি তার প্রথম সূচনা করে।
প্রথম পর্যায়ের সওগাত বছর তিনেক চলে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয়বার সওগাত বেরোয় ১৯২৬ সালে—হিসাব ধরা হয় চতুর্থ বর্ষ থেকে। তত দিনে নজরুল কবি ও লেখক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। অনেকগুলো বই বেরিয়ে গেছে। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, প্রবাসী, নূর, মোসলেম ভারত, বঙ্গনূর, সাধনা, নারায়ণ, ভারতী, উপাসনা, বিজলী, সহচর, মাসিক বসুমতী, বঙ্গবাণী, ধূমকেতু, কল্লোল ইত্যাদি পত্রিকায় অনেক লিখেছেন—সওগাতে তো বটেই; কিন্তু ১৩৩৩-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের সওগাতের প্রথম তিনটি সংখ্যায় নজরুল অনুপস্থিত। দ্বিতীয় পর্যায়ের সওগাত শুরু হয়েছে সৈয়দ এমদাদ আলীর লেখা দিয়ে। সওগাত গোলাম মোস্তফার ‘নিয়ন্ত্রিত’ কবিতাও ছেপেছে—একটি নোট দিয়ে। নবপর্যায়ের চতুর্থ সংখ্যায় (আশ্বিন ১৩৩৩) নজরুল প্রথম পৃষ্ঠায় অবতীর্ণ হলেন ‘সর্বসহা’ কবিতা নিয়ে। তারপর নজরুল অনেক লিখেছেন সওগাতে। সওগাতেই নজরুলের সর্বাধিক রচনা প্রকাশিত হয়েছে। তবে অন্তর্বর্তীকালে একবার তিনি লেখা বন্ধও করে দিয়েছিলেন।
ওই ১৯২৬ সালেই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বার্ষিক সওগাত (১৩৩৩) প্রকাশ করেন। ওই সংখ্যার জন্য নজরুল ‘বার্ষিক সওগাত’ নামে এক চমত্কার কবিতা লিখে দিয়েছিলেন; আর লিখেছিলেন অসামান্য এক কবিতা ‘খালেদ’। প্রকৃত সম্পাদকসুলভ প্রজ্ঞা ছিল মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের। প্রথম পর্যায়ের সওগাতে তিনি ধারাবাহিক তত্কালীন মুসলমান লেখকদের পরিচিতি ছেপেছিলেন। এখন এই বার্ষিক সওগাতে তদানীন্তন অনেক বিখ্যাত বাঙালি মুসলমান লেখকের সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের ক্ষুদ্রাকার জীবনী ও ফোটা ছাপা হয়েছিল। যত দূর মনে হয়, এটিই ছিল নজরুল ইসলামের প্রথম প্রকাশিত জীবনী। কৌতূহলকর একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করি—সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী এবং ডাক্তার লুত্ফর রহমানের পরিচিতি ছাপা হলেও তাঁদের ছবি ছাপা হয়নি। কেননা, তাঁরা ফটো তোলার বিরোধী ছিলেন, তখনো অনেক বাঙালি মুসলমান ফটো তোলাকে শরিয়তবিরোধী কাজ বলে মনে করতেন।
১৯২৬ সালে বার্ষিক সওগাত পত্রিকায় নজরুলের জীবনী প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪১ সালে নজরুলের জীবনী আরেকটু বিস্তারিতভাবে লেখেন আবদুল কাদির। এত দিনে নজরুলের সক্রিয় জীবনধারা ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। অন্তর্বর্তীকালে নজরুলের জীবন সাহিত্য সংগীত নাটক চলচ্চিত্র ইত্যাদি বিষয়ে সমকালীন পত্রপত্রিকায় অজস্র মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। নজরুলের ব্যক্তিজীবনের দুটি ঘটনা—তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ আলোড়ন তুলেছে সমাজে এবং পত্রপত্রিকায় সে-সম্বন্ধে মন্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। জৈবনিক ও সাহিত্যিকভাবে নজরুলের পক্ষ-বিপক্ষ দলের অভাব ঘটেনি কোনোদিনই। ইসলাম-দর্শন মোসলেম জগৎ, মোসলেম দর্পণ, শনিবারের চিঠি, সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, মাসিক মোহাম্মদী প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুলের জীবন ও সাহিত্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয়েছে। পক্ষেও ছিল অগণন পত্রিকা—বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা থেকে বুলবুল পর্যন্ত। একটি পত্রিকার কথা ঈষৎ বিস্তারিতভাবে বলি। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত সাপ্তাহিক সওগাত বেরিয়েছিল ১৯২৮ সালে। এই পত্রিকায় প্রকাশিত নজরুল-সম্পৃক্ততার কয়েকটি চুম্বক অংশ:
১. ১৬ নবেম্বর ১৯২৮ (১: ২৬) সংখ্যায় সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও মোহাম্মদ মোদাব্বের—দুজন প্রবীণ ও নবীনের দুটি পত্র প্রকাশিত হলো আগামী নজরুল-সংবর্ধনা (১৯২৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য) সমর্থন ও স্বাগত জানিয়ে।
২. ২৩ নভেম্বর ১৯২৮ (১: ২৭) সংখ্যায় ১৯ আগস্ট ১৯১৯ সালে করাচি থেকে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে লেখা পত্র প্রকাশিত হলো।
৩. ওই সংখ্যাতেই প্রকাশিত হলো আসন্ন নজরুল সংবর্ধনাকে স্বাগত জানিয়ে রানীগঞ্জে নজরুলের সহপাঠী আবদুল ওহাবের চিঠি।
৪. ৩০ নবেম্বর ১৯২৮ (১: ২৮) সংখ্যায় নজরুল-সংবর্ধনা বিভাগে ‘এছলাম ও নজরুল ইসলাম’ শিরোনামে মাসিক মোহাম্মদীতে প্রকাশিত নজির আহমদ চৌধুরীর প্রবন্ধের জবাব। লেখক: মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেন খান বিএ, ময়মনসিংহ।
৫. ৭ ডিসেম্বর (১: ২৯) সংখ্যায় চিঠিপত্র বিভাগে নজরুল-সংবর্ধনা প্রসঙ্গে চিঠি ও সম্পাদকীয় মন্তব্য। ওই সংখ্যাতেই সংবর্ধনা প্রসঙ্গে এ হাদী বিএর চিঠি।
৬. ১৪ ডিসেম্বর (১: ৩০) সংখ্যায় ‘চট্টগ্রামে বিপুল আয়োজন’ শিরোনামে ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামে নজরুল ও অন্যদের আমন্ত্রণের সংবাদ প্রকাশিত।
৭. ওই সংখ্যাতেই নজরুলের ধারাবাহিক উপন্যাস কুহেলিকা। প্রতিবেদন ‘গোলাম মোস্তফার নতুন উদ্যম’। মুহম্মদ হবীবুল্লাহর ‘বিচিত্রা’। সভাসমিতি: ক) চট্টগ্রামে ছাত্রসভা; খ) হারাগাছা মুসলিম সম্মিলন। ‘নজরুলিস্তান’ বিভাগ ক) কবি-সম্রাটের আশীর্বাদ; খ) বিশ্বকবির বসন্ত নাটকের উত্সর্গপত্র; গ) জার্মানির নজরানা; ঘ) বাদশা-পীরের পয়গাম।
৮. ২১ ডিসেম্বর ১৯২৮ (১: ৩১) সংখ্যায় চট্টগ্রামে বর্ষবরণ, বড়দিনের সওগাত, ‘নজরুলিস্তান’ বিভাগ (‘বঙ্গবাণী’র বাণী, অধ্যক্ষের চিঠি, মৌলানার মোবারকবাদ), চিঠিপত্র (নজরুল প্রসঙ্গে—আশুতোষ রায় চৌধুরী বিএ, চট্টগ্রাম)।
৯. ২৮ ডিসেম্বর ১৯২৮ (১: ৩২) সংখ্যায় নজরুলের ধারাবাহিক উপন্যাস কুহেলিকা, দেশ-বিদেশ (রাজশাহীতে নজরুল ইসলাম), নিখিল ভারত কৃষক ও শ্রমিক দল সম্মিলন, নিখিল ভারত সামাজিক যুবক কংগ্রেস।
১০. ১১ জানুয়ারি ১৯২৯ (১: ৩৪) সংখ্যায় ‘নজরুল সংবর্ধনা’ (রিপোর্ট)।
১১. ১৮ জানুয়ারি ১৯২৯ (১: ৩৫) সংখ্যায় ‘নজরুল সংবর্ধনা’ (রিপোর্ট) এবং ধারাবাহিক প্রকাশিত নজরুলের কুহেলিকা উপন্যাস।
১২. ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ (১: ৩৯) সংখ্যায় ‘কবি নজরুল ইসলাম’।
১৩. ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৯ (১: ৪০) সংখ্যায় ‘বগুড়ায় নজরুল সংবর্ধনা’।
১৪. ৮ মার্চ ১৯২৯ (১: ৪২) সংখ্যায় ‘কুষ্টিয়ায় নজরুল সংবর্ধনা’।
১৫. ২২ মার্চ ১৯২৯ (১: ৪৩) সংখ্যায় ‘আক্কেলপুরে নজরুল সংবর্ধনা’।
১৬. ২৬ এপ্রিল ১৯২৯ (১: ৪৮) সংখ্যায় ‘চানাচুর’ বিভাগ।
১৭. ৩ মে ১৯২৯ (২: ১) সংখ্যায় ‘চানাচুর’ বিভাগ।
১৮. ১৩ সেপ্টেম্বর (২: ১৯) সংখ্যায় ‘সওগাত’ বর্ষ-সম্মিলন।
নজরুল-জীবনের এ রকম টুকরা সংবাদ আরও কোনো কোনো পত্রিকায় ছড়ানো আছে।
স্বতন্ত্র প্রবন্ধকারে নজরুল-জীবনী প্রথম লিখিত হয় ১৯৪১ সালে। ১৩৪৭ সালের ২৯ পৌষ সোমবারের দৈনিক কৃষক পত্রিকায় ‘নজরুল-জন্মবার্ষিকী’ শিরোনামে এবং সে বছরেরই ঈদসংখ্যা সাপ্তাহিক কৃষক পত্রিকায় ‘নজরুল-জীবনী’ শিরোনামে কবি আবদুল কাদির রচিত দুটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। নজরুল-রচনা-সম্ভার (দ্বি সং ১৯৬৯–এ বলা হয়েছে, ‘দুটি প্রবন্ধই কবি সাগ্রহে পড়েছিলেন এবং সে বিষয়ে আবদুল কাদিরের সঙ্গে আলোচনাকালে দু–একটি তথ্যের ওপর নতুন নতুন আলোকপাত করেছিলেন।’ অর্থাৎ আবদুল কাদির-লিখিত সংক্ষিপ্ত নজরুল-জীবনীকে আমরা নজরুল-অনুমোদিত বলে ধরে নিতে পারি। ‘নজরুলের জীবন ও সাহিত্য’ শিরোনামে আকাশবাণী থেকে কথিকা প্রচার করেন আবদুল কাদির ১৯৪৬ সালে’ ১৯৪৬ সালে সেটিই পরিবর্ধিত আকারে সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় (জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৪)। নজরুলবিষয়ক আলোচনামূলক প্রথম গ্রন্থ কাজী আবদুল ওদুদের নজরুল-প্রতিভায় (১৯৪৯) আবদুল কাদিরের নজরুল-জীবনী সংকলিত হয়।
আরও একটি অতিসংক্ষিপ্ত নজরুল-জীবনী সংকলিত হয় কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার সম্পাদিত কাব্য-মঞ্জুষা সংগ্রহে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২ সালে।
৩.
১৯৪২ সালে নজরুল অসুস্থ এবং ক্রমশ নির্বাক হয়ে যান।
তারপর নজরুল-জীবন ও সৃষ্টিকর্মের আলোচনা-সমালোচনা এবং স্মৃতিচারণার আরেকটি অধ্যায় শুরু হয়। বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত কবিতা পত্রিকা এবং এস ওয়াজেদ আলী প্রতিষ্ঠিত গুলিস্তাঁ পত্রিকার দুটি নজরুল সংখ্যা প্রথমদিকের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। বুদ্ধদেব বসু এবং এস ওয়াজেদ আলী দুজনের সঙ্গেই সম্পৃক্ততা ছিল নজরুলের। বুদ্ধদেব বসু ও অজিত দত্ত সম্পাদিত প্রগতি পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন নজরুল। ১৯৩৫ সালে যখন বুদ্ধদেব বসু ও প্রেমেন্দ্র মিত্রের সম্পাদনায় কবিতা পত্রিকা প্রকাশিত হয়, নজরুল তখন সংগীতবিশ্বে নিমগ্ন। কিন্তু নজরুল-সাহিত্য-ও-সংগীত বিষয়ে বুদ্ধদেব বসুর শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম। কবিতা পত্রিকার শতাধিক সংখ্যার মধ্যে চারজন কবির সম্পর্কে চারটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়। তাঁরা হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও নজরুল ইসলাম। কবিতা এবং গুলিস্তাঁ পত্রিকায় বেশকিছু স্মৃতিচারণা প্রকাশিত হয়।
এরপর এই প্রায় ৬০ বছর ধরে নজরুল সম্পর্কে অসংখ্য স্মৃতিচারণা রচিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিকথা রচনা করেছেন প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীন, শামসুননাহার মাহমুদ, মুজফফর আহমদ, সুফি জুলফিকার হায়দার, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী, শান্তিপদ সিংহ, সুলতান মাহমুদ মজুমদার, মাহমুদ নূরুল হুদা, মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন, বন্দে আলী মিয়া, শফি চাকলাদার প্রমুখ। প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়ের কাজী নজরুল তিন পর্বে রচিত। প্রথম পর্বের দ্বিতীয় সংস্করণ আমূল পরিবর্তিত হয়েছে। শুনেছি, তৃতীয় পর্বটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। নজরুলের হুগলিতে বাসকালীন জীবনের সবচেয়ে প্রামাণিক রূপকার প্রাণতোষ। যেমন চট্টগ্রাম পর্বের শামসুননাহার মাহমুদ, কুমিল্লা পর্বের সুলতান মাহমুদ মজুমদার, ধূমকেতু পর্বের শান্তিপদ সিংহ, কারাগার পর্বের নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী, নবযুগ দ্বিতীয় পর্বের মাহমুদ নূরুল হুদা, খান মুহম্মদ মঈনুদ্দীনের বইটি টুকরা টুকরা ঘটনার মালায় গাঁথা—মূল্যবান। শফি চাকলাদারের বইটি এসবের ব্যতিক্রম—ঢাকায় আনার পরে অসুস্থ নজরুলের শেষ দিনগুলোর চিত্রণ। মুজফফর আহমদ এবং মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের বই দুটি অসাধারণ। নজরুল-জীবন সম্পর্কে চিরকালের আকরগ্রন্থ এগুলো। দুজনার দৃষ্টিই নির্মোহ ও সত্যসন্ধ।
টুকরা স্মৃতিকথা রচনা করেছেন অনেকে। তার মধ্যে সাহিত্যিক যতজন, সাংগীতিক যত নন, আরও কম নাট্যকার ও চলচ্চিত্রব্যক্তিত্ব। ফলে নজরুলের নাটক ও চলচ্চিত্র-সম্পৃক্তি এত দিন আড়ালে পড়ে ছিল, এখনো হয়তো অনেকখানিই আচ্ছাদিত আছে। আত্মজীবনী রচনা করতে গিয়ে নজরুল প্রসঙ্গ এনেছেন অনেকে।
পূর্ণাঙ্গ এবং খণ্ড স্মৃতিকথা থেকে নজরুল-চরিত-মানস অনেকখানি উদ্ঘাটিত হয়েছে—এ রকম বলা যেতে পারে। বন্ধু ও প্রেমিকা, প্রকাশক ও সম্পাদক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংগীতিক, নাট্যকার, বেতারব্যক্তিত্ব, ছাত্রসাধারণ, শ্রোতা-দর্শক-পাঠক, বন্ধুকন্যা, শিক্ষক— কত বিচিত্র মানুষই যে নজরুলের স্মৃতিচারণা করেছেন। জাহানারা চৌধুরী ও প্রতিভা বসু কিছু স্মৃতিচারণা করেছেন, কিন্তু নার্গিস আক্তার খানম ও মিস বা মিসেস ফজিলাতুন্নেসা গভীর নীরবতা অবলম্বন করেছেন। এমনকি খানিকটা আশ্চর্যের বিষয়—অনেক দিন পর্যন্ত বেঁচে থেকেও প্রমীলা নজরুল ও অগণন বন্ধুদের অনেকে নিঃশব্দ থেকেছেন; কিন্তু যা আমরা পেয়েছি, তা কম নয়।
১৯৪৭ সালে আবুল ফজল একটি ছাত্রপাঠ্য জীবনী লিখেছিলেন। প্রথম জীবনীগ্রন্থ—এর তথ্য ব্যতিরেকে বইটিকে আমরা অগ্রাহ্য করতে পারি। যেমন শিশুকিশোরতোষ নজরুল-জীবনীগুলো আমাদের আওতায় আসে না। কেননা, তাতে নজরুল-জীবনের নতুন কোনো আবিষ্কার বা উন্মোচন নেই। আজহারউদ্দীন খান তাঁর বাংলা সাহিত্যে নজরুল গ্রন্থে নজরুল-জীবনী যুক্ত করেছিলেন; সম্প্রতি প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থের নতুন সংস্করণে সেই জীবনী নতুন তথ্যের আলোকে পুনর্গঠন করেছেন। সম্প্রতি প্রয়াত সুশীলকুমার গুপ্তর নজরুল-চরিত-মানসকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন স্বয়ং মুজফফর আহমদ ও কাজী আবদুল ওদুদ। সুশীলকুমার গুপ্তও তাঁর গ্রন্থের জীবনী অংশ ওই বইয়ের সর্বশেষ সংস্করণে পুনর্বিন্যস্ত করেছেন। (মিলন দত্তের নজরুল-জীবন-চরিত আমি দেখিনি বলে আলোচনা থেকে বাদ রাখছি।) স্বতন্ত্রভাবে প্রথম পূর্ণাঙ্গ নজরুল-জীবন-চরিত রচনা করেছেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। ১৯৭২ সালে। ১০ বছর পরে তিনি প্রকাশ করেন কাজী নজরুল ইসলাম: জীবন ও কবিতা। এই বইয়ের প্রতি সংস্করণে নতুন তথ্যাবলি যোজিত হচ্ছে, এমনকি বইয়ের নাম পর্যন্ত পাল্টে দিতে হচ্ছে। আজহারউদ্দীন খান, সুশীলকুমার গুপ্ত, রফিকুল ইসলাম যে তাঁদের জীবনী অংশ বা জীবনীগ্রন্থ বইয়ের প্রতি সংস্করণে পরিশোধিত-পরিবর্ধিত করে চলেছেন, তাতে এ কথা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে নজরুল জীবন ও সৃষ্টির নতুন দিক ক্রমাগত আবিষ্কৃত হয়ে চলেছে। নজরুলের চট্টগ্রাম সফর, কুমিল্লা সফর, দার্জিলিং সফর সম্পর্কে যেমন নতুন তথ্য বেরিয়ে আসছে, তেমনি গ্রামোফোন বেতার নাটক ও চলচ্চিত্র—এই চার মাধ্যম সম্পর্কে সম্প্রতিকালেই অনেক নতুন বিষয় উদ্ঘাটিত হয়েছে। এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন সংগীতজ্ঞ আবদুস সাত্তার, ব্রহ্মমোহন ঠাকুর, আসাদুল হক, অনুপম হায়াৎ প্রমুখ। এসব থেকে মনে হচ্ছে, এখনো লুক্কায়িতও আছে অনেক কিছু। ‘দারা শিকোহ’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন নজরুল—সেটি কোথায় গেল? ‘পুরুষ-সংসদ’ নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ হবে বলে বিজ্ঞাপিত হয়েছিল; নাম শুনে মনে হয় হাসির নাটক, সেটা কি চিরতরে লুপ্ত হয়েছে? তারপরও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সুধী নজরুল-বিশেষজ্ঞেরা নজরুলের অনেক লুপ্ত রচনা, এমনকি পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করছেন। এসব নজরুল-জীবনীকে সমৃদ্ধ করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে আবদুল আজিজ আল আমান সম্পাদিত ‘অপ্রকাশিত নজরুল’ একটি উল্লেখযোগ্য কাজ। বিচ্ছিন্নভাবে নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে এত দিকে এত রকম উদ্যম প্রবাহিত হচ্ছে, যা প্রমাণিত করে যে বাঙালি অকৃতজ্ঞ নয়।
আমি এই প্রবন্ধে জোর দিয়েছি নজরুলের সকর্মক আধুনিক সৃষ্টিকাল সম্পর্কে। নজরুলের আধুনিক মানস সংগঠনে শৈশব-কৈশোরকালেরও একটি ভূমিকা আছে। এসব বিষয়ে কিছু নতুন তথ্য পেশ করেছেন এম আবদুর রহান, শেখ আজিবুল হক, শেখ দরবার আলম, ড. আবদুস সামাদ প্রমুখ। অসুস্থ নজরুলের সঙ্গে ইউরোপে গিয়েছিলেন রবীউদ্দীন আহমদ। তিনি লিখেছেন, সেখানে নজরুলের অসুখ ও অবস্থান বিষয়ে। নজরুল–সংক্রান্ত পত্রিকাগুলো কবির জীবন সম্পর্কে সব সময়ই নতুন নতুন উপঢৌকন দিয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে অগ্রসূরির ভূমিকা পালন করেছে কবিতা ও গুলিস্তাঁ পত্রিকার নজরুল সংখ্যা দুটি। আবদুল কাদির সম্পাদিত মাহে-নও পত্রিকার প্রতিবছরের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যাগুলোতে একটি নিয়মিত নজরুলচর্চা চলেছিল— যার মধ্যে জীবনবিষয়ক স্মৃতিকথাও অন্তর্গত। আবদুল আজিজ আল আমান সম্পাদিত জাগরণ ও কাফেলা পত্রিকা দুটি প্রসঙ্গত স্মরণীয়। নজরুল একাডেমি পত্রিকা নজরুল-জীবন ও সাহিত্যচর্চার আদি বাহক। নজরুল ইনস্টিটিউট পত্রিকা নজরুল–সম্পর্কিত কিছু মূল্যবান স্মৃতিকথা উপহার দিয়েছে। অজস্র দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা নজরুলের জন্মদিনে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে আসছে। ১৯৭৬ সালের পরে নজরুলের মৃত্যুবার্ষিকীতেও বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে। জীবনসম্পৃক্ত লেখা নিয়ে অনেক সংকলনও বেরিয়েছে।
নজরুল জন্মশতবর্ষে এসে আমরা দেখছি—নজরুলের জীবনের মূল্যায়ন-পুনর্মূল্যায়ন এবং তাঁর সৃস্টিকর্মের উদ্ধার ও সংরক্ষণের ধারা বিপুল বেগে বহমান।
৪.
কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টিশীল জীবন অসম্ভব সৃষ্টিশীল; কিন্তু স্বল্পস্থায়ী। বৈচিত্র্যে এবং বৈভবে তার কোনো তুলনা নেই; কিংবা তুলনা একমাত্র চলতে পারে বাংলা সাহিত্যের বা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিভাবানদের সঙ্গে। সরল–জটিল দ্রুতগামী এক জীবন। তাই তাঁর জীবনী রচনায় সতর্কতা বোধ হয় একটু বেশি কাম্য—যদিও তার অভাবটাই বেশি চোখে পড়ে। স্মৃতিচারণায় ভুল থেকে যায়, সেই ভুল আবার প্রবেশ করে জীবনীর মধ্যে বা অসম্পূর্ণতা। কাননবালা তাঁর স্মৃতিচারণায় বলেছেন, ‘বিদ্যাপতি হিন্দি ছায়াছবি বোম্বে ও করাচিতে ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রদর্শিত হয়।’ এই তথ্যই জানানো হয়েছে ‘চলচ্চিত্রে নজরুল’ গ্রন্থে। তারপর ১৯৪২ সালের ২ অক্টোবর কলকাতায় প্রদর্শিত বিদ্যাপতির সমালোচনা আনন্দবাজার পত্রিকা ও অমৃতবাজার পত্রিকা থেকে উদ্ধৃত হয়েছে। পড়ে মনে হবে বিদ্যাপতির হিন্দি ভার্সন বুঝি ১৯৪২ সালে কলকাতায় প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯৩৮ সালের একটি পত্রিকা লিখেছে, ‘নিউ থিয়েটার্সের বিদ্যাপতি চিত্রের হিন্দি সংস্করণখানা গত ২৩শে এপ্রিল শনিবার কলকাতায় সর্বপ্রথম নিউ সিনেমা চিত্রগৃহে মুক্তিলাভ করেছে। ছবিখানা বহু পূর্বেই বাংলার বাহিরে ভারতের নানা স্থানে প্রদর্শিত হয়েছে।’ নজরুলের নিজের রচনাও কিছু কিছু ভুল নিরসন করতে পারে কিংবা তথ্য-তারিখ শনাক্তকরণে কাজে লাগতে পারে। একটি উদাহরণ দেব—‘কুষ্টিয়ার অন্তর্গত কার্পাসডাঙা গ্রামে নজরুল কিছুকাল কাটিয়েছেন বলে দাবি করছেন স্থানীয় লোকেরা। এ বিষয়ে প্রধান অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন এম ইব্রাহিম সাহেব। নজরুল যখন কৃষ্ণনগরে ছিলেন, তখন তাঁর দুই ছেলেকে নিয়ে সপরিবার এসেছিলেন তাঁরা কার্পাসডাঙায়’—এই হচ্ছে স্মৃতিচারণাকারীদের অভিমত। নজরুলের নিজের রচনায় একটি সূত্র পেয়ে গেলাম। মুহম্মদ মনসুরউদ্দীনের হারা-মণি সংগ্রহের অভিমত দিতে গিয়ে নজরুল লিখছেন, ‘ভৈরব নদীর তীরে ঝাউতলায় নিরালায় বসে হারা-মণি দেখছিলাম। মাথার উপর ঝাউতলার করুণ মর্মরধ্বনি দূরে গোচারণের মাঠে রাখালের তলুতা বাঁশের বাঁশির সুর, সামনে উদাস মাঠের বুকে হাটুরে পথিকের পায়ে চলা এবং মনে হচ্ছিল—হারা-মণির গান যদি শুনতে হয়, তাহলে এমনই নিরালা একটু স্থান খুঁজে নিতে হয়। সঙ্গে থাকবে এমনই একতারার মতো অপ্রখর নদীস্রোতের মৃদুল গুঞ্জন।’ কার্পাসডাঙা গ্রামেই ভৈরব নদ; আর সেখানে ঝাউগাছও আছে। মনে হয় এই আলোচনা নজরুল লিখেছিলেন কার্পাসডাঙাতেই বসে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘জয়তী’ পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৩৭ সংখ্যায়। সব মিলিয়ে—কার্পাসডাঙার লোকেরা যদিও বলছেন কৃষ্ণনগর থেকে সপরিবার গিয়েছিলেন;আমাদের মনে হচ্ছে, ১৯৩০ সালে কার্পাসডাঙা সফর করেন নজরুল, সঙ্গে ছিল শিশু বুলবুল আর সব্যসাচী।
নজরুল-জীবনী অনেককাল ধরে অনেক হাতে তৈরি হয়ে চলেছে। এ ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় ভূমিকা কবি আবদুল কাদিরের। কেননা, একমাত্র তাঁর রচিত নজরুল-জীবনীটিই কবির সুস্থ অবস্থায় রচিত এবং সেটি তিনি দেখেছিলেন। অবিস্মরণীয় ভূমিকা কমরেড মুজফফর আহমদের। কেননা, তিনি স্মৃতিকথা লিখেছেন বটে; কিন্তু লিখেছেন গবেষকের সন্ধিত্সা আর নিষ্ঠা নিয়ে: যুক্তিতর্কের সমর্থন ছাড়া এক পা এগোননি। অবিস্মরণীয় ভূমিকা অধ্যাপক রফিকুল ইসলামের—কেননা, নজরুলের সৃষ্টি–উত্সব-মুখর ও নীরব জীবন তিনিই প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থে রূপান্তর করেছেন।
বহুবিচিত্রভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে নজরুল-জীবনকে যে আমরা আধারিত করতে চাই, তার কারণ বাংলা সাহিত্যের এই একজন মহান শিল্পীকে আমরা সম্যক অনুধাবন করতে চাই। প্রায় শতবর্ষ ধরে সেই চেষ্টাই চলেছে।