বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিসরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ঘিরে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। বরং বলা যায়, তাঁকে নিয়ে বিতর্কের পরিমাণ অনেক সময় তাঁর সাহিত্যপাঠের চেয়ে বেশি। বিশেষত একটি অভিযোগ বারবার উচ্চারিত হয়—রবীন্দ্রনাথ নাকি মুসলমানবিরোধী ছিলেন, তাঁর সাহিত্যে নাকি মুসলমান চরিত্রের অনুপস্থিতি রয়েছে, ইসলামি সংস্কৃতি বা মুসলিম জীবনবোধ নাকি তাঁর কাব্যচেতনার অংশ হয়ে ওঠেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগামী ও প্রায়ই অসম্পূর্ণ তথ্যনির্ভর আলোচনায় এ অভিযোগ কখনো আবেগ, কখনো রাজনৈতিক অবস্থান, কখনোবা পরিচয়সংকটের ভাষা হিসেবে সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এই ধারণা কতটা তথ্যসম্মত? তাঁর সাহিত্য, বক্তব্য, ব্যক্তিজীবন, দার্শনিক অনুরাগ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কগুলোকে সমগ্রভাবে বিবেচনা করলে কি তাঁকে ইসলামবিদ্বেষী বা মুসলিমবিরোধী বলা যায়?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হয়, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী। উনিশ শতকের বাংলায় ব্রাহ্মধর্ম একেশ্বরবাদ, নিরাকার উপাসনা এবং ধর্মীয় উদারতার একটি বিশেষ ধারা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল। ব্রাহ্মধর্মের উৎস হিন্দুসমাজের ভেতর হলেও তার ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো কেবল হিন্দু–ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম ও উপনিষদীয় ভাবধারার একটি সম্মিলিত মানবতাবাদী বোধ সেখানে ক্রিয়াশীল ছিল। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পরে রবীন্দ্রনাথ যে ধর্মীয় চেতনাকে ধারণ করেছিলেন, তার কেন্দ্রে ছিল মানুষের আত্মিক মুক্তি, সাম্প্রদায়িক বিভাজন নয়।
এই প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, রবীন্দ্রনাথের ধর্মবোধকে কেবল ‘হিন্দু কবি’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর চিন্তার প্রকৃতি বোঝা অসম্ভব। শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। সেখানে কোনো মূর্তি ছিল না, ছিল নানা ধর্মের মহামানবদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের এক উদার অনুশীলন। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায় সেখানে গৌতম বুদ্ধ, যিশুখ্রিষ্ট, গুরু নানক ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা হতো। তাঁদের জন্মদিন উপলক্ষে বিশেষ সংগীত পরিবেশনেরও প্রচলন ছিল।
গৌতম বুদ্ধকে স্মরণ করে গাওয়া হতো—‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী’, যিশুকে স্মরণ করে—‘এত দিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে’, গুরু নানকের জন্মোৎসবে ধ্বনিত হতো—‘গগনের থালে রবিচন্দ্র দীপক জ্বলে’, আর মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর স্মরণে গাওয়া হতো—‘কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ/ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস’। এ গান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এতে রবীন্দ্রনাথ নবী মুহাম্মদ (সা.)–কে কেবল একটি ধর্মের প্রবর্তক হিসেবে দেখেননি, তিনি তাঁকে দেখেছেন মানবপ্রেম, আত্মত্যাগ ও মহত্ত্বের এক আধ্যাত্মিক প্রতীক হিসেবে।
‘কোন্ আলোতে প্রাণের প্রদীপ
জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস।
সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো,
পাগল ওগো, ধরায় আস।’
রবীন্দ্রনাথের ইসলাম-ভাবনা কেবল সংগীত বা কাব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে তিনি ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে স্পষ্ট ও শ্রদ্ধাশীল বক্তব্য রেখেছেন। ১৯৩৩ সালে ‘পয়গম্বর দিবস’-এর একটি অনুষ্ঠানে তাঁর লেখা একটি বাণী পাঠ করেছিলেন সরোজিনী নাইডু। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বলেন, পৃথিবীর মহান ধর্মগুলোর অন্যতম ইসলাম এবং তার অনুসারীদের দায়িত্বও তাই গভীর।
এই পঙ্ক্তিগুলোয় নবীকে ‘সাধক’, ‘প্রেমিক’, ‘পাগল’ অভিধায় ডাকা নিছক কাব্যিক অলংকার নয়; বরং সুফি ভাবধারার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত এক আধ্যাত্মিক উপলব্ধি। এখানে রবীন্দ্রনাথ নবীকে এক অনন্ত প্রেম ও মানবমুক্তির অভিযাত্রায় নিবেদিত আত্মা হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর ভাষায় নবী কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক প্রতীকে সীমাবদ্ধ নন, তিনি মানবিক যন্ত্রণার সহযাত্রী।
রবীন্দ্রনাথের ইসলাম-ভাবনা কেবল সংগীত বা কাব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বিভিন্ন সময়ে তিনি ইসলাম ও মহানবী সম্পর্কে স্পষ্ট ও শ্রদ্ধাশীল বক্তব্য রেখেছেন। ১৯৩৩ সালে ‘পয়গম্বর দিবস’-এর একটি অনুষ্ঠানে তাঁর লেখা একটি বাণী পাঠ করেছিলেন সরোজিনী নাইডু। সেখানে রবীন্দ্রনাথ বলেন, পৃথিবীর মহান ধর্মগুলোর অন্যতম ইসলাম এবং তার অনুসারীদের দায়িত্বও তাই গভীর। তিনি মনে করিয়ে দেন, ধর্মের মহত্ত্ব কেবল বিশ্বাসে নয়, জীবনাচরণে প্রতিফলিত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ককে কেবল রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয় হিসেবে দেখেননি, বরং সত্যদ্রষ্টাদের মানবিক ও নৈতিক আদর্শকে দুই সম্প্রদায়ের সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৩৪ সালে মহানবী (সা.)–এর জন্মদিন উপলক্ষে বেতারে প্রচারিত তাঁর আরেকটি প্রবন্ধেও একই সুর ধ্বনিত হয়। সেখানে তিনি বলেন, ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মগুলোর একটি এবং মুসলমানদের জীবনের মধ্য দিয়েই এই ধর্মের মহত্ত্বের সাক্ষ্য প্রকাশ পাওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, ভারতের বিভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে সত্যিকারের মিলন কেবল রাষ্ট্রিক স্বার্থবোধ দিয়ে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন সেই নৈতিক অনুপ্রেরণা, যা মানবতার মহান দূতদের জীবন থেকে উৎসারিত হয়।
১৯৩৬ সালে দিল্লির জামে মসজিদ থেকে প্রকাশিত দ্য পেশোয়া পত্রিকার ‘পয়গম্বর নাম্বার’-এর জন্য শান্তিনিকেতন থেকে পাঠানো তাঁর ইংরেজি বাণীটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদকে (সা.) ‘ওয়ান অব দ্য গ্রেটেস্ট পারসোনালিটিস বর্ন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, মহানবী মানব–ইতিহাসে এক নতুন জীবনীশক্তির সঞ্চার করেছিলেন এবং ধর্মীয় পবিত্রতার এক শক্তিশালী আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি কামনা করেন, নবী (সা.)–এর অনুসারীরা যেন আধুনিক ভারতের ইতিহাস নির্মাণে শান্তি, পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও সভ্যতার কল্যাণে ভূমিকা রাখেন।
এই বক্তব্যগুলো নিছক সৌজন্যমূলক আনুষ্ঠানিকতা ছিল—এমন ধারণা করা কঠিন। কারণ, রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন ও সাহিত্যিক চেতনার গভীরে পারস্য সুফিবাদ ও ইসলামি কাব্য-ঐতিহ্যের যে প্রভাব কাজ করেছে, তা সুস্পষ্ট।
বিশেষত পারস্যের সুফি কবি হাফিজের প্রতি রবীন্দ্রনাথের অনুরাগ প্রায় কিংবদন্তিতুল্য। এই অনুরাগ কেবল তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় ছিল না; এটি ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন হাফিজের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি ফারসি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং দেওয়ান-ই-হাফিজ তাঁর প্রায় কণ্ঠস্থ ছিল। জানা যায়, তিনি ভোরবেলায় সন্তানদের নিয়ে উপনিষদের সঙ্গে হাফিজের গজলও পাঠ করতেন। রবীন্দ্র-গবেষক শেখ সাদীর ভাষ্যমতে, মৃত্যুশয্যাতেও দেবেন্দ্রনাথ হাফিজের কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন।
এই সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক মানস গঠনে সুফি ভাবধারার প্রভাব পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদেও অনেকে পারস্যীয় সুফি ঐতিহ্যের ছাপ লক্ষ করেছেন। ঢোলা আলখাল্লা, দীর্ঘ দাড়ি ও ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিত্ব—এসব কেবল নান্দনিক রুচির বিষয় ছিল না; বরং তাঁর আত্মিক প্রবণতারও বহিঃপ্রকাশ।
এই সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যিক মানস গঠনে সুফি ভাবধারার প্রভাব পড়বে—এটাই স্বাভাবিক। তাঁর পোশাক-পরিচ্ছদেও অনেকে পারস্যীয় সুফি ঐতিহ্যের ছাপ লক্ষ করেছেন। ঢোলা আলখাল্লা, দীর্ঘ দাড়ি ও ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিত্ব—এসব কেবল নান্দনিক রুচির বিষয় ছিল না; বরং তাঁর আত্মিক প্রবণতারও বহিঃপ্রকাশ।
এই অনুরাগের চূড়ান্ত প্রকাশ দেখা যায় ১৯৩২ সালের পারস্য সফরে। তখন রবীন্দ্রনাথের বয়স ৭১। শারীরিকভাবে দুর্বল, তবু তিনি ইরান ও ইরাক সফরে যান। এ সফরের বিবরণ তিনি লিখেছেন ‘পারস্যযাত্রী’ গ্রন্থে। সেখানে স্পষ্ট বোঝা যায়, এটি নিছক কূটনৈতিক বা সাহিত্যিক সফর ছিল না; ছিল বহুদিনের আত্মিক আকাঙ্ক্ষার পরিপূর্ণতা।
১৯৩২ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি পৌঁছান শিরাজে, হাফিজের সমাধিতে। সেখানে তিনি দীর্ঘক্ষণ নীরবে বসে থাকেন। স্থানীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর সামনে দেওয়ান-ই-হাফিজ খুলে দেওয়া হয়। বিশ্বাস ছিল, চোখ বন্ধ করে বই খুললে যে কবিতা সামনে আসবে, তা মানুষের অন্তর্গত আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী উত্তর বহন করে। রবীন্দ্রনাথও চোখ বন্ধ করে একটি পৃষ্ঠা খুললেন। যে কবিতাটি পাঠ করা হলো, তার ভাষায় ছিল আধ্যাত্মিক মুক্তি ও অন্তরের বন্ধনমোচনের কথা।
এরপর রবীন্দ্রনাথ তাঁর দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার কথা জানালেন—হাফিজের কবিতা সুরসহ শুনতে চান। গজল পরিবেশিত হতে শুরু করলে উপস্থিত ব্যক্তিরা লক্ষ করেন, রবীন্দ্রনাথ গভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েছেন। ইরানি কবি মুক্তাদেরি লিখেছেন, তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। আরেকজন লেখক জিয়াউদ্দিন বারানি লিখেছেন, গজল শেষ হওয়ার পরও রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘক্ষণ আবেগাপ্লুত অবস্থায় ছিলেন।
এ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছিলেন, তাঁর সমগ্র সাহিত্যজীবনের অভিজ্ঞতা এক দিকে আর সেই মুহূর্তের অনুভূতি আরেক দিকে। তিনি অনুভব করেছিলেন, বহু শতাব্দী পেরিয়ে যেন তিনি হাফিজের এক চিরপরিচিত সঙ্গীর কাছে এসে পৌঁছেছেন।
এ ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এগুলো প্রমাণ করে যে ইসলামি পারস্য-সংস্কৃতি ও সুফি ভাবধারার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল গভীর আত্মিক সংযোগের। যিনি হাফিজের কবিতায় নিজের আত্মার প্রতিধ্বনি খুঁজে পান, তাঁকে সহজে ইসলামবিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করা যায় না।
অবশ্য সমালোচকেরা বলতে পারেন, ব্যক্তিগত অনুরাগ থাকলেও তাঁর সাহিত্যে মুসলমান চরিত্রের উপস্থিতি কম। এই প্রশ্ন আংশিকভাবে যুক্তিসংগত। উনিশ ও বিশ শতকের বাংলার জনসংখ্যাগত বাস্তবতার তুলনায় রবীন্দ্রসাহিত্যে মুসলমান চরিত্রের সংখ্যা খুব বেশি নয়—এ কথা স্বীকার করতেই হবে। কিন্তু ‘কম উপস্থিতি’ ও ‘বিদ্বেষ’—এই দুই বিষয় এক নয়।
বাস্তবে রবীন্দ্রনাথের বহু গল্পে মুসলমান চরিত্র রয়েছে। সবচেয়ে জনপ্রিয় উদাহরণ ‘কাবুলিওয়ালা’। রহমত নামের আফগান মুসলমান চরিত্রটিকে তিনি নির্মাণ করেছেন গভীর মানবিকতা দিয়ে। মিনির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ধর্মীয় পরিচয় অতিক্রম করে পিতৃত্বের এক সর্বজনীন অনুভূতিতে রূপ নেয়।
‘দালিয়া’ গল্পে আছে জুলিখা ও আমিনা, ‘সমস্যা পূরণ’-এ আছে আছিমদ্দি ও মির্জা বিবি। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এ মুসলিম চরিত্রগুলোকে তিনি রহস্য, ইতিহাস ও মানবিক আবেগের সমন্বয়ে নির্মাণ করেছেন। কিন্তু সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সম্ভবত ‘মুসলমানির গল্প’।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সময়ের সন্তান। তিনি ঔপনিবেশিক বাংলার এক জটিল সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকে ইসলামবিদ্বেষ বলে চিহ্নিত করা তথ্যগতভাবে দুর্বল। বরং তাঁর বক্তব্য, চিঠিপত্র, সংগীত, প্রবন্ধ, পারস্যপ্রেম, সুফি-অনুরাগ এবং মুসলমান চরিত্রের মানবিক নির্মাণ—সব মিলিয়ে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো এক গভীর মানবতাবাদী শিল্পীর, যিনি ধর্মীয় পরিচয়ের ভেতরে মানুষের আত্মিক ঐক্য খুঁজেছেন।
জীবনের শেষ দিকে লেখা এই অসমাপ্ত গল্পে রবীন্দ্রনাথ সাম্প্রদায়িক পরিচয়ের চেয়ে মানবিক আশ্রয় ও ভালোবাসাকে বড় করে তুলেছেন। গল্পের কমলা একজন হিন্দু ব্রাহ্মণকন্যা, যে আশ্রয় পায় মুসলমান হাবির খাঁর বাড়িতে। হাবির খাঁ তাকে বলে, ‘যারা যথার্থ মুসলমান, তারা ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণকেও সম্মান করে।’ এই সংলাপ কেবল চরিত্রের বক্তব্য নয়; এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিও প্রতিফলিত।
গল্পে কমলা শেষ পর্যন্ত ঘোষণা করে, ‘যে দেবতা আমাকে আশ্রয় দিয়েছেন, সেই ভালোবাসার সম্মানের মধ্যে তাঁকেই আমি পুজো করি। তিনি হিন্দুও নন, মুসলমানও নন।’ এই উচ্চারণ রবীন্দ্র-মানবতাবাদের সারবত্তাকে ধারণ করে। ধর্ম এখানে বিভেদের প্রাচীর নয়; বরং মানুষের মধ্যে সম্পর্কের নৈতিক রূপ।
তবে এ-ও সত্য যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যজগতে মুসলিম সমাজের পূর্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব গড়ে তুলতে পারেননি, বিশেষত গ্রামীণ বাঙালি মুসলমান জীবনের বাস্তবতা তাঁর সাহিত্যে সীমিতভাবে এসেছে। এই সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা হতে পারে, হওয়াও উচিত। তাঁর জমিদারি, বঙ্গভঙ্গবিরোধী অবস্থান কিংবা মুসলিম কৃষকসমাজ সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু সমালোচনার ক্ষেত্র আর বিদ্বেষের অভিযোগ এক জিনিস নয়।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সময়ের সন্তান। তিনি ঔপনিবেশিক বাংলার এক জটিল সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতাকে ইসলামবিদ্বেষ বলে চিহ্নিত করা তথ্যগতভাবে দুর্বল। বরং তাঁর বক্তব্য, চিঠিপত্র, সংগীত, প্রবন্ধ, পারস্যপ্রেম, সুফি-অনুরাগ এবং মুসলমান চরিত্রের মানবিক নির্মাণ—সব মিলিয়ে যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা হলো এক গভীর মানবতাবাদী শিল্পীর, যিনি ধর্মীয় পরিচয়ের ভেতরে মানুষের আত্মিক ঐক্য খুঁজেছেন।
আজকের সময়ে রবীন্দ্রনাথকে নতুনভাবে পড়ার প্রয়োজন এখানেই। তাঁকে দেবতা বানিয়ে অন্ধ ভক্তি করার প্রয়োজন নেই, আবার রাজনৈতিক বিদ্বেষে তাঁকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ প্রমাণের চেষ্টাও বুদ্ধিবৃত্তিক সততার পরিচয় নয়। তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমালোচনা হোক, তাঁর সাহিত্যিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিতর্ক হোক, কিন্তু সেই আলোচনা যেন তথ্যনিষ্ঠ ও ন্যায়সংগত হয়। কারণ, যে মানুষটি উপনিষদের সঙ্গে সমান আবেগে হাফিজ পাঠ করেছেন, যিনি মহানবী মুহাম্মদ (সা.)–কে মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বলে অভিহিত করেছেন, যিনি হাফিজের সমাধির পাশে বসে সজল চোখে নিজেকে ‘চিরকালের চেনা লোক’ বলে অনুভব করেছেন, তাঁকে একমাত্রিক বিদ্বেষের প্রতীকে পরিণত করা ইতিহাসের প্রতি অন্যায়।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যজগৎ শেষ পর্যন্ত মানুষের জগৎ—সেখানে ধর্ম আছে, কিন্তু ধর্মান্ধতা নেই; আধ্যাত্মিকতা আছে, কিন্তু ঘৃণা নেই; পরিচয় আছে, কিন্তু মানবতার ঊর্ধ্বে কোনো পরিচয় নেই। তাঁর কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়—
‘এই অকুল সংসারে
দুঃখ-আঘাত তোমার প্রাণে বীণা ঝংকারে।
ঘোরবিপদ-মাঝে
কোন্ জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস!’