মহাফেজখানা থেকে
হাজার বছর আগের জাপানি উপন্যাস: দ্য টেল অব গেঞ্জি
২০০৫ সালের ১৯ আগস্ট প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত এ লেখা আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
উজি স্টেশন থেকে বের হলেই চোখে পড়বে ‘দ্য সিটি অব টেল অব গেঞ্জি’, একটা উপন্যাসের নামে পুরো শহর পরিচিত। আমার মুগ্ধতার শুরু এখান থেকেই। একাদশ শতাব্দীতে লেখা জাপানি ক্ল্যাসিক ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’র লেখক মুরাসাকি শিকিবু (৯৭৮-১০১৬) জন্মেছিলেন তত্কালীন জাপানের রাজধানী কিয়োটোর এক অভিজাত পরিবারে। অল্প বয়সেই তিনি কাব্য রচনা এবং চায়নিজ অক্ষর ‘কাঞ্জি’তে লেখায় বিশেষ পারঙ্গমতা অর্জন করেন। তখনকার দিনে জাপানের নিজস্ব অক্ষর ‘হিরাগানা’য় সাহিত্য রচনা কিংবা দাপ্তরিক কাজকর্ম করার চেয়ে চায়নিজ অক্ষর এবং শব্দগুচ্ছ ‘কাঞ্জি’তে সাহিত্য রচনা এবং দাপ্তরিক কাজকর্ম করাকে বেশি গৌরবের ব্যাপার বলে মনে করা হতো। কাঞ্জিতে দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও মুরাসাকি শিকিবু পুরো উপন্যাসটিই লিখেছেন জাপানিদের নিজস্ব অক্ষরমালা ‘হিরাগানা’য়। ওই সময় জাপানে সাধারণ নারীদের বিদ্যার্জনের তেমন সুযোগ ছিল না। মুরাসাকি শিকিবু অভিজাত পরিবারের কন্যা ছিলেন বলেই হয়তো বিদ্যার্জন ও সাহিত্যচর্চার সুযোগ পেয়েছেন।
‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ লেখা হয় জাপানের হেইয়ান যুগের (নবম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী) মধ্যবর্তী সময়ে। বৃহদায়তন এ উপন্যাস ইংরেজি অনুবাদে ১০০০ পৃষ্ঠার বেশি। অধ্যায় ৫৪। কথিত আছে, ১০০৪ সালের আগস্টে এক পূর্ণিমার রাতে ইশিয়ামা শহরে মুরাসাকি শিকিবু উপন্যাসটি লিখতে শুরু করেন। ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ পৃথিবীর প্রথম উপন্যাস হিসেবে পরিচিত; পৃথিবীর প্রথম মনোবিশ্লেষণমূলক উপন্যাসও বলা হয় এটিকে।
২২ বছর বয়সে লেখক মুরাসাকি শিকিবুর বিয়ে হয়। তিনি এক কন্যাসন্তান লাভ করেন। কিছুকাল পরেই তিনি স্বামী হারান। ধারণা করা হয়, ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার জন্যই তিনি ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ লিখতে শুরু করেন। ১০০৫ সালে তিনি সম্রাজ্ঞীর শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তখন প্রতিদিনের খুঁটিনাটি সব ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। উপন্যাসের বিভিন্ন অংশে উজি নদীটি এসেছে নানাভাবে। উপন্যাসের শেষাংশে রাজকুমারী ইউকিফুনে তার দুই প্রেমিক নিউ ও কাওরোর প্রেমের টানাপোড়েনে আত্মহত্যা করার জন্য ঝাঁপ দেয় উজি নদীতে।
২. উজি স্টেশনের ইনফরমেশন সেন্টার থেকে ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ মিউজিয়ামের ম্যাপ সংগ্রহ করে কিছুদূর এগোতেই চোখে পড়ে বুনো, উদ্দাম-খরস্রোতা উজি নদী। শরতের লাল ম্যাপলপাতায় ছাওয়া দুই পাশে পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলা এই উদ্দাম নদীর সৌন্দর্য দেখে মনে হলো রূপকথার স্বপ্নরাজ্যে চলে এসেছি। স্থানে স্থানে বাঁধ দিয়ে নদীটিকে আরও বেশি খরস্রোতা করে তোলা হয়েছে। ফলে এর সৌন্দর্য আরও বেড়েছে। আবারও মনে হলো জাপানিরা খুবই সৌন্দর্যবোধসম্পন্ন জাতি। নদীর পাড়ে সাদা পাথরে তৈরি লেখক মুরাসাকির মূর্তি, তার পাশ ঘেঁষে পাথুরে সিঁড়ি নেমে গেছে উজি নদীতে। ২২ বছর বয়সে লেখক মুরাসাকি শিকিবুর বিয়ে হয়। তিনি এক কন্যাসন্তান লাভ করেন। কিছুকাল পরেই তিনি স্বামী হারান। ধারণা করা হয়, ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্ট ভুলে থাকার জন্যই তিনি ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ লিখতে শুরু করেন। ১০০৫ সালে তিনি সম্রাজ্ঞীর শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। তখন প্রতিদিনের খুঁটিনাটি সব ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। উপন্যাসের বিভিন্ন অংশে উজি নদীটি এসেছে নানাভাবে। উপন্যাসের শেষাংশে রাজকুমারী ইউকিফুনে তার দুই প্রেমিক নিউ ও কাওরোর প্রেমের টানাপোড়েনে আত্মহত্যা করার জন্য ঝাঁপ দেয় উজি নদীতে। উজি ব্রিজ পার হয়ে এক-দুবার গলি চিনতে ভুল করে ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’, অর্থাৎ ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ মিউজিয়ামে পৌঁছে যাই। গেটে ঢুকে চারপাশে ‘মমিজি’র (ম্যাপলপাতার জাপানি নাম) বাহারি রং দেখতে দেখতে সামনে চোখে পড়ল চারপাশে জলাধারের মধ্যে একতলা দালানটি। কাচের দরজা দিয়ে ঢুকেই সামনে টিকিট কাউন্টার। টিকিট কেটে প্রথমেই যে কক্ষে ঢুকলাম, তার নাম ‘স্প্রিং রুম’ (বসন্তঘর)।
এ ঘরে প্রথমেই চোখে পড়ল দেয়ালজুড়ে বিশাল স্ক্রিনে ধবধবে সাদা চেরিফুল, তারপরই দৃশ্যপট বদলে যেতে থাকে—দেখি, গোলাপি আভাময় চেরি, কখনো ম্যাপলপাতা ঝরছে, কখনো স্ক্রিনজুড়ে আগুন ধরে গেছে, আবার আগুন এক পাশে নিভে এলে অভিজাতদের জন্য ব্যবহৃত ষাঁড়ে টানা বিশেষ বাহন ‘গিশশা’ থেকে কোনো রাজকুমারী নামছে; জাপানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং হাজার বছর আগেকার জীবনযাপন স্ক্রিনে ভেসে আসছে অনন্য নান্দনিকতায়। আর কক্ষজুড়ে ঐতিহ্যবাহী জাপানি সংগীতের সুর নেশা ছড়াচ্ছে।
স্প্রিং রুমটি বানানো হয়েছে উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্র ‘গেঞ্জি’র প্রাসাদ রোকুজো ইন ভিলার আদলে। উপন্যাসের বর্ণনায় এই রোকুজো ইন ভিলায় আছে সুবিশাল চারটি বাগান, যার প্রতিটি তৈরি করা হয়েছে জাপানের চারটি বিশেষ ঋতুকে সেলিব্রেট করার জন্য।
গেঞ্জির সৎভাই সম্রাট হওয়ার পর তখন রাজনৈতিক শত্রুর কন্যার সঙ্গে প্রেমের অভিযোগে গেঞ্জিকে রাজধানী কিয়োটোর বাইরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। সেখানে থেকেও তিনি প্রেম করেন কিয়োটোর আরেক অভিজাত কন্যা লেডি আকাশির সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে গেঞ্জিপুত্র রেইজি সম্রাট হন, গেঞ্জি রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরে পায়, তাকে মন্ত্রী বানানো হয়। তখন তিনি রোকুজো ইন ভিলা নামের এক বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেন। এখানে নারীদের নিয়ে তার দিন বেশ সুখেই কাটছিল, সমস্যা তৈরি হয় তৃতীয় রাজকুমারী বলে পরিচিত অপর এক স্ত্রী ঘরে আনার পর।
রুমের এক পাশে বিশাল দুই চাকার মধ্যে চকচকে রঙিন কাপড়ে মোড়া পর্দাঢাকা ‘গিশশা’—এতই ঝকঝকে যে দেখে মনে হয়, এক্ষুনি কোনো দিঘল চুলের রাজকুমারী নেমে আসবে ওই পর্দাঢাকা বাহন থেকে।
একপাশে রাজদরবারের আদলে বর্ণিল স্টেজ, তার সামনে সেই সময়কার নানা রঙিন পোশাক পরে যেন সভাসদেরা দাঁড়িয়ে আছেন। কক্ষের অন্য পাশে রয়েছে ‘জুনিহিতো’ অভিজাত নারীদের জন্য বহু স্তরের কাপড় দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি কিমোনো। মুরাসাকি শিকিবুর বিভিন্ন প্রতিকৃতিতে তাকে জুনিহিতো পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়।
উপন্যাসের শুরুতে কিয়োটো রাজদরবারের এক সাধারণ নারী সম্রাটের বিশেষ নজর ও বাড়তি আনুকূল্য পেতে থাকে। এই বাড়তি আনুকূল্যের ফলে সেই নারী অতি সুন্দর চেহারার স্বাস্থ্যবান এক পুত্রসন্তান জন্ম দেয়, নাম রাখা হয় গেঞ্জি। অতিসাধারণ এক নারী হয়েও গেঞ্জির মা সম্রাটের কাছে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন বলে তিনি রাজদরবারের অভিজাত এবং অনভিজাত নারীকুলের তীব্র ঈর্ষা ও শত্রুতার মুখে পড়েন। নানামুখী যন্ত্রণায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে গেঞ্জির মায়ের অকালমৃত্যু ঘটে।
গেঞ্জি তরুণ বয়স থেকেই শিল্প, কাব্য, নৃত্য ইত্যাদি বিষয়ে অসাধারণ পারঙ্গমতা অর্জন করেন। এসব গুণ ও তার সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ অন্যদের চেয়ে তাকে স্বতন্ত্র ও আকর্ষণীয় করে তোলে। তার রূপ-গুণমুগ্ধ রাজদরবারের লোকজন ধারণা করে হয়তো ক্রাউন প্রিন্স হবে গেঞ্জিই, কিন্তু যেহেতু তার জন্য সুপারিশের তেমন কেউ ছিল না, রাজদরবারের কর্মচারী হিসেবে তিনি অবশেষে নিয়োগ পান। তখন তার নাম ‘হিকারু গেঞ্জি’, অর্থাৎ ‘শাইনিং গেঞ্জি’ হিসেবে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় সম্রাট, অর্থাৎ গেঞ্জির পিতা ফুজিত্সুবু নামের এক তরুণী স্ত্রী ঘরে আনেন, যার চেহারার সঙ্গে তরুণ গেঞ্জি তার মৃত মায়ের চেহারার অনেক মিল খুঁজে পান। মাতৃতৃষ্ণার কারণে দ্রুত সম্রাজ্ঞীর খুব কাছের মানুষে পরিণত হন এবং তা এক সময় অবৈধ সম্পর্কে রূপ নেয়। ফলে সম্রাজ্ঞী এক অবৈধ পুত্রসন্তানের জন্ম দেন, যিনি পরবর্তী সময়ে ওই উপন্যাসে সম্রাট রেইজি নামে পরিচিত হন। গেঞ্জির পুরো জীবনটাই বিভিন্ন অবৈধ সম্পর্কতাড়িত।
গেঞ্জি ‘আউই’ নামের এক নারীকে বিয়ে করেন। এর বেশ কিছুকাল পর মুরাসাকি নামের এক দুর্দশাগ্রস্ত কিশোরীকে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন, পূর্ণাঙ্গ নারী না হওয়া পর্যন্ত তাকে যত্নে লালন পালন করেন। মুরাসাকি বড় হয়ে উঠলে গেঞ্জি তাকে তার স্ত্রীর স্থানে অধিষ্ঠিত করেন। গেঞ্জি তার পুরোটা জীবন একের পর এক রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যাদের প্রত্যেককেই তিনি ভালোবাসেন। তাঁর নারীদের মধ্যে আছেন সরল রাজকুমারী, তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর প্রেমিকা, রাজনৈতিক শত্রুর কন্যা, এমনকি ৬০ বছরের বিধবাও। গেঞ্জির সৎভাই সম্রাট হওয়ার পর তখন রাজনৈতিক শত্রুর কন্যার সঙ্গে প্রেমের অভিযোগে গেঞ্জিকে রাজধানী কিয়োটোর বাইরে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। সেখানে থেকেও তিনি প্রেম করেন কিয়োটোর আরেক অভিজাতকন্যা লেডি আকাশির সঙ্গে। পরবর্তী সময়ে গেঞ্জিপুত্র রেইজি সম্রাট হন, গেঞ্জি রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরে পান, তাঁকে মন্ত্রী বানানো হয়। তখন তিনি রোকুজো ইন ভিলা নামের এক বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেন। এখানে নারীদের নিয়ে তাঁর দিন বেশ সুখেই কাটছিল, সমস্যা তৈরি হয় তৃতীয় রাজকুমারী বলে পরিচিত অপর এক স্ত্রী ঘরে আনার পর। কাশিওয়াশি নামের গেঞ্জিপুত্রের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তৃতীয় রাজকুমারী এবং প্রিন্স কাওরো নামের এক সন্তানের জন্ম দেন। গেঞ্জি তাঁর ভাগ্যকেই এই ক্ষেত্রে দোষারোপ করেন। তাঁর মনে পড়ে, তিনি নিজেও অবৈধ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। ভাগ্যের পরিহাসের ক্ষত তাঁর মধ্যে বাড়তেই থাকে এবং একসময় তিনি স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান।
‘শেষ দশ চ্যাপ্টার’ নামে পরিচিত উপন্যাসের শেষাংশ মূলত পরবর্তী প্রজন্মের কাহিনি, যেখানে উজি শহরকে কেন্দ্র করে গেঞ্জিপুত্র প্রিন্স কাওরো ও নাতি প্রিন্স নিও নিওর জীবন দেখতে পাই। অফিস-আদালত, কোর্ট-কাছারিসহ সবকিছু ছিল তখন রাজধানী কিয়োটোকেন্দ্রিক। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত উজি ছিল তখন অভিজাতদের বিনোদন ও বিশ্রামকেন্দ্র। গোপনীয়তা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ এই শহরে বিশেষ সম্মানের ব্যাপার ছিল। উপন্যাসের প্রথম অংশে লেখক লালসা, আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসায় পূর্ণ নারী-পুরুষের সম্পর্ক বর্ণনা করেছেন, শেষের অংশে দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রেমের বর্ণনা করেছেন বিষণ্নতা, বিরহ ও আত্মসংযমের মধ্য দিয়ে। গেঞ্জিপুত্র বলে পরিচিত প্রিন্স কাওরোর মধ্যে তাঁর পিতা গেঞ্জির কিনা এ নিয়ে সন্দেহ জাগে। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর প্রকৃত পিতা কাশিওয়াশি নামের এক লোক। ফলে প্রবল বিষণ্নতায় আক্রান্ত হন তিনি।
কাওরোর প্রেমের ট্র্যাজিক পরিণতির মাধ্যমে শেষ হয় এই দীর্ঘ উপন্যাস। এই উপন্যাসের অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে বিভিন্ন মানবিক দ্বন্দ্ব আর মনোসংকটের বিশ্লেষণ, আছে সামাজিকভাবে অস্বীকৃত প্রেম, শরীরী সম্পর্ক, আর তীব্র ঈর্ষার বিবরণ। এসব বিষয় থাকলেও কোথাও কোনো হত্যা, সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা নেই। উপন্যাসটি যখন লেখা হয় সে সময়, অর্থাৎ জাপানের হেইয়ান যুগে, ৭৯৪-১১৯২ সালে সম্রাটের মাতৃ-পিতৃকুলীয় আত্মীয়স্বজন এবং স্ত্রীর দিকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হতো এবং ক্ষমতাশালী অমাত্য হিসেবে নিয়োগ পেত।
এক শরতে প্রিন্স কাওরো আগাম সংবাদ না দিয়ে গেঞ্জির সৎভাই, ন্যায়পরায়ণ ও বিচক্ষণ বলে খ্যাত অষ্টম যুবরাজের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে যান। অষ্টম যুবরাজকে প্রিন্স কাওরো তাঁর গুণাবলির জন্য বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করতেন এবং নিজের মধ্যে ওই সব গুণ ধারণ করার চেষ্টা করতেন। অষ্টম যুবরাজ বাড়ির বাইরে ছিলেন। প্রিন্স কাওরো বাড়িতে ঢুকতেই চন্দ্রালোকে দেখলেন অষ্টম যুবরাজের কন্যারা ‘কোতো’, অর্থাৎ হার্পজাতীয় সংগীতযন্ত্র বাজাচ্ছে; প্রথম দর্শনেই বড় রাজকুমারী অইগিমির প্রেমে পড়লেন প্রিন্স কাওরো। গেঞ্জির এক পৌত্র প্রিন্স নিও প্রিন্স কাওরোর কাছে উজির রাজকুমারীদের রূপের বর্ণনা শুনে উজি গেলেন রাজকন্যাদের দর্শন লাভের উদ্দেশ্যে। এতে তাঁর লাভ হলো এই যে রাজকুমারী অইগিমির ছোট বোন রাজকুমারী নাকানোকিমির সঙ্গে পত্র বিনিময়ের সম্পর্ক তৈরি হলো। এদিকে অষ্টম যুবরাজ অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং বুঝতে পারলেন, আর বেশি দিন বাঁচবেন না। তাঁর মৃত্যুর পর মেয়েদের ভালোমন্দ দেখাশোনার দায়িত্ব দেন তিনি প্রিন্স কাওরোকে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অষ্টম যুবরাজ মৃত্যুবরণ করেন। প্রিন্স কাওরো রাজকুমারীদের পক্ষে তাদের পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করেন। বছরখানেক পর রাজকুমারীদের তিনি আবার দেখলেন একনজরের জন্য। তখনো তাঁর মনে হলো রাজকুমারী অইগিমির সৌন্দর্য অতুলনীয়; তাঁর প্রতি তিনি ভীষণভাবে অনুরক্ত। রাজকুমারীর পিতার মৃত্যুবার্ষিকী পার হলে এক বিশ্বস্ত ভৃত্যকে সঙ্গে নিয়ে তিনি রাজকুমারীদের অন্তঃপুরের দিকে যান। রাজকুমারী অইগিমি প্রিন্সের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখান থেকে সরে যান। কিন্তু তাঁর ঘরে ছোট বোন নাকানোকিমিকে ঘুমন্ত অবস্থায় ফেলে আসেন। তিনি ভেবেছেন, প্রিন্স কাওরোর সঙ্গে হয়তো তাঁর ছোট বোনকেই ভালো মানাবে। প্রিন্স কাওরো নাকানোকিমির দিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ না করে প্রমাণ করলেন, তাঁর ভালোবাসা শুধু অইগিমির জন্যই।
এ ছাড়া কাওরো চাচ্ছিলেন, নাকানোগিমি আর প্রিন্স নিওর সঙ্গে সম্পর্কটা গাঢ় হোক। কিছুদিন পর দেখা গেল, প্রায় প্রতি রাতেই প্রিন্স নিও নাকানোগিমির সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে হঠাৎই তাদের সম্পর্কে খানিকটা চিড় ধরে। রাজকুমারী অইগিমি ছোট বোনের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি কাওরোর ভালোবাসা প্রতিনিয়ত প্রত্যাখ্যান করতে করতে টের পান, তাঁর নিজের মধ্যেও কাওরোর প্রতি তীব্র ভালোবাসা জন্মেছে। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁর অসুস্থতা আরও বাড়ে; দিন দিন শুকিয়ে শুকনো পাতার মতো জীর্ণ হয়ে যান এবং মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর প্রেমিক কাওরো তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন। কাওরো বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন অবস্থায় তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন করেন। অইগিমির মৃত্যুর পর প্রচণ্ড শোকগ্রস্ত কাওরো দীর্ঘ সময় নিঃসঙ্গ ও বিষণ্ন কাটান। এদিকে নাকানোকিমিও বাবা ও বড় বোনকে হারিয়ে খুবই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। প্রিন্স নিও তাঁর স্বামী হলেও সে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর স্বামীর চেয়ে প্রিন্স কাওরোর ওপরই বেশি নির্ভর করেন। যেহেতু তাঁর স্বামীর বাড়ি ‘নিজো’ প্রাসাদটি কিয়োটোতে অবস্থিত, তাঁকে উজি ছেড়ে চলে যেতে হয়। এতে প্রিন্স কাওরো আরও বেশি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। কিয়োটো গিয়েও নাকানোকিমি কাওরোর জন্য অস্থিরবোধ করেন এবং কাওরোকে অনুরোধ করেন তাঁকে উজিতে ফিরিয়ে নিতে। কাওরোরও দিনে দিনে নাকানোকিমির প্রতি কিছুটা অনুরাগ তৈরি হয়, কিন্তু যখন আবিষ্কার করেন যে নাকানোকিমি অন্তঃসত্ত্বা এবং তাঁর গর্ভে প্রিন্স নিওর সন্তান, তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেন।
পরবর্তী সময়ে প্রিন্স কাওরো রাজকুমারী অইগিমির সৎবোন ইউকিফুনেকে দেখে চমকে ওঠেন। কারণ, ইউকিফুনের সঙ্গে অইগিমির চেহারার অনেক মিল। ইউকিফুনের কাছে কাওরো তাঁর ভালো লাগার কথা প্রকাশ করেন।
এদিকে ইউকিফুনে তাঁর সৎবোন নাকানোকিমির সঙ্গে দেখা করতে কিয়োটোতে নিজো প্রাসাদে যায়। প্রিন্স নিও বাইরে থেকে বাড়ি ফিরে পেছন থেকে ইউকিফুনেকে দেখে ভাবেন, এ বোধ হয় এ বাড়ির নতুন কোনো আশ্রিতা। তাঁর স্ত্রী চুলের যত্নে অন্যত্র ব্যস্ত আছে ভেবে প্রিন্স পেছন থেকে ইউকিফুনেকে জড়িয়ে ধরেন। ওই যাত্রায় ইউকিফুনে রক্ষা পান এবং প্রচণ্ড ভয় পেয়ে নিজো প্রাসাদ থেকে পালিয়ে যান। ঘটনাটি পরে প্রিন্স কাওরো জানতে পারেন। তিনি ইউকিফুনের সঙ্গে দেখা করেন এবং দিনে দিনে তাদের প্রেম তীব্র হয়।
তবে কাওরো অইগিমিকে প্রেমিকা হিসেবে যতটা সম্মানের চোখে দেখতেন, ইউকিফুনেকে ঠিক ততটা সম্মানের চোখে দেখতেন না। কারণ, অইগিমি ও ইউকিফুনের মা এক হলেও অইগিমির বাবা ছিলেন অষ্টম যুবরাজ এবং ইউকিফুনের বাবা ছিলেন জনৈক স্থানীয় গভর্নর।
এদিকে প্রিন্স নিও ইউকিফুনেকে ভুলতে পারেন না। তিনি জানতে পারেন ইউকিফুনেকে উজিতে পালিয়ে গেছেন, কাওরো তাঁর প্রেমিক। বরাবরই তিনি কাওরোকে শত্রু মনে করতেন। ইউকিফুনেকে পেতে তিনি সংকল্পবদ্ধ হন এবং উজির দিকে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে কাওরো সেজে ইউকিফুনের সঙ্গে দেখা করতে যান। সকালে ইউকিফুনে এই ভুল বুঝতে পেরে হতভম্ব হয়ে পড়েন। নিও শঠতার আশ্রয় নেওয়া সত্ত্বেও তার প্রতি নিওর তীব্র আকর্ষণ ও অনুরাগকে তিনি আর অবহেলা করতে পারে না। নিওর প্রতি তিনি নিজের মধ্যেও কিছুটা দুর্বলতা অনুভব করেন।
এদিকে কাওরো প্রেমিকাকে নিওর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁর বাসস্থানের বাইরে নিরাপত্তা প্রহরী নিয়োগ করে। অবশেষে দুই প্রেমিকের প্রেমের টানাপোড়েনে ইউকিফুনে আত্মহত্যার উদ্দেশে উজি নদীতে ঝাঁপ দেন। তাঁকে মুমূর্ষু অবস্থায় নদীর কিনারা থেকে উদ্ধার করেন জনৈক পুরোহিত এবং শুশ্রূষার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলে। ইউকিফুনে আর বাড়ি ফিরে যেতে চান না। সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে মন্দিরেই থেকে যেতে চান। তিনি জীবিত আছেন সংবাদ পেয়ে কাওরো তাঁকে ফিরিয়ে নিতে আসেন, ইউকিফুনের সৎভাইয়ের মাধ্যমে তাঁকে চিঠি লিখে পাঠান এবং পুরোহিতের মাধ্যমে তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ইউকিফুনে পূর্বজীবনে ফিরে যেতে অস্বীকৃতি জানান। কাওরোর প্রেমের ট্র্যাজিক পরিণতির মাধ্যমে শেষ হয় এই দীর্ঘ উপন্যাস। এই উপন্যাসের অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে বিভিন্ন মানবিক দ্বন্দ্ব আর মনোসংকটের বিশ্লেষণ, আছে সামাজিকভাবে অস্বীকৃত প্রেম, শরীরী সম্পর্ক, আর তীব্র ঈর্ষার বিবরণ। এসব বিষয় থাকলেও কোথাও কোনো হত্যা, সহিংসতা ও নিষ্ঠুরতা নেই। উপন্যাসটি যখন লেখা হয় সে সময়, অর্থাৎ জাপানের হেইয়ান যুগে ৭৯৪-১১৯২ সালে সম্রাটের মাতৃ-পিতৃকুলীয় আত্মীয়স্বজন এবং স্ত্রীর দিকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হতো এবং ক্ষমতাশালী অমাত্য হিসেবে নিয়োগ পেত।
সেই সময়ে নারীরা কখনো জনসমক্ষে বের হতো না, তারা সাধারণত পর্দার আড়ালে, অন্তঃপুরে থাকত। অভিজাত পুরুষেরা তাদের পছন্দের নারীদের খুঁজে বের করত লোকমুখে শুনে, হার্প বাজানো শুনে কিংবা কোথাও একপলক দেখে অথবা তার হাতের লেখা দেখে সৌন্দর্য অনুমান করে। তারপর তারা প্রস্তাব পাঠাত। পত্রবিনিময় ছিল সম্পর্কোন্নয়নের প্রধান উপায়। মানুষ ছিল মূলত বহুগামী। কোনো পুরুষ কোনো নারীকে এক-দুবার দেখে অথবা লোকমুখে তার প্রশংসা শুনে তাকে পেতে ইচ্ছে হলে তার ভালো লাগা জানিয়ে পত্র পাঠাত মেয়েটির পরিবারে। নারীর মা–বাবা পত্র লেখার দক্ষতা, হাতের লেখা—এসব দেখে যাচাই করত পত্রপ্রেরকের পরিবারের আভিজাত্য কেমন। তারপর পত্র প্রেরককে অনুমতি দেওয়া হতো তার পছন্দের পাত্রীর সঙ্গে দেখা করার। পরপর তিন রাত্রি পাত্রপাত্রী দেখা করার অর্থ ছিল সম্পর্কটি বিয়ের দিকে এগোচ্ছে। বিয়ে হলেও স্বামী-স্ত্রী হিসেবে এক বাড়িতে থাকত না, মেয়েরা তাদের মা–বাবার বাড়িতেই থাকত। পুরুষেরা বহু স্ত্রীর অধিকারী ছিল, নারীদেরও ছিল একই অবস্থা। যে নারীর সামাজিক অবস্থান ছিল সবচেয়ে উঁচুতে, তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া হতো। গেঞ্জির রোকুজো ভিলার আদলে তৈরি স্প্রিং রুম থেকে বের হয়ে অটাম রুম, অর্থাৎ শরৎ কক্ষের দিকে যাই। স্প্রিং রুম থেকে অটাম রুমে যাওয়ার পথটা একটা সরু প্যাসেজ। সাদা প্লাস্টিকজাতীয় স্বচ্ছ পদার্থে তৈরি মেঝের নিচ থেকে হালকা সবুজ অডিও ভিজুয়্যাল প্রদর্শনী শেষ হলে বের হয়ে আসি। যাই পাশের গ্যালারিতে। সেখানে পাশাপাশি দুই রুমজুড়ে দেখলাম ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ উপন্যাসভিত্তিক গেঞ্জি পিকচার সিরিজের আঁকা চিত্রপ্রদর্শনী। এটি হলো উপন্যাসটিকে দর্শকদের কাছে জীবন্ত করে তোলার এক অসাধারণ উদ্যোগ! একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে গেঞ্জি মনোগাতারি মিউজিয়াম থেকে বের হই।
শিগা জাপান