রবীন্দ্রনাথের ইতালি ভ্রমণের শতবর্ষ
ইতালির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে জলে ডুবে থাকা, অথবা ভেসে ওঠা এক অপূর্ব ভূখণ্ড, নাম ভেনেৎজিয়া। চলতি ভাষায় আমরা বলি ভেনিস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাকে বলেছিলেন ‘অ্যাড্রিয়াটিকের রানী’। সেই সবুজাভ ভেনেশিয়ান ল্যাগুনের ভেতর থেকে পানকৌড়ির মতো মাথা বের করা শহর ভেনিসে আমি যখন পা রাখি, তখন মনের ভেতর বাজতে থাকে, তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা। দিনটি ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ঠিক ১০০ বছর আগে এই শহরে ঘুরতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিন দিনের জন্য। আমার সফর ১৪ দিনের। যাত্রা শুরুর আগে থেকেই বাংলা ভাষার এক ক্ষুদ্র লেখক হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মতো বাংলা ভাষার মহান লেখক ও শিল্পীর ইতালি ভ্রমণের বিষয়টি আমাকে বিশেষভাবে পুলকিত করছিল। এই লেখা তারই ফল। বলা যেতে পারে, এই রচনা ভেনিস ঘুরে এসে রবীন্দ্রনাথের ইতালি ভ্রমণের শতবর্ষ উদ্যাপন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইতালিতে গিয়েছিলেন দুবার। একবার ১৯২৫ সালে, দ্বিতীয় ও শেষবার ১৯২৬ সালে। অবশ্য এর আগেও তিনি ইতালির মাটি স্পর্শ করেছেন, তবে সেটা ছিল ইতালিতে যাত্রাবিরতি মাত্র। ১৯২৫ সালে তিনি প্রথম ইতালিতে যান কয়েকটি দিন থাকবেন বলে। দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে, মানে আর্জেন্টিনাতে ভিক্তোরিয়া ওকাম্পোর আতিথেয়তায় সুস্থ হয়ে বুয়েনস এইরেস থেকে জাহাজে করে ইতালির জেনোয়া বন্দরে তিনি পৌঁছান ১৯ জানুয়ারি। পরিকল্পনা ছিল ২৫ দিন থাকার, কিন্তু অসুস্থতার জন্য এই সফর কমে আসে ১৫ দিনে। ইনফ্লুয়েঞ্জায় আক্রান্ত হয়েছিলেন কবি। ইতালির জেনোয়া বন্দরে কবিকে অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত ছিলেন রোম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির অধ্যাপক কার্লো ফর্মিকি। তাঁর একক প্রচেষ্টাতেই রবীন্দ্রনাথের দুবার ইতালি সফর সম্ভব হয়েছিল। দ্বিতীয়বারের সফর সম্পর্কে পরে বলি, আগে বলি ১৯২৫ সালের সফরের কথা। কারণ, ওই বছরই কবি ভেনিস ঘুরতে যান।
অবশ্য ভেনিসের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে মিলানে বসে রবীন্দ্রনাথ ইতালিকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতাতেও দেখা যায় ভেনিসের মতো ইতালিকেও ‘রানী’ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন কবি। কাব্যসুষমা দিয়ে ভোলাতে চেয়েছিলেন সম্রাজ্ঞীর মন।
কহিলাম, ‘ওগো রানী,
কত কবি এল চরণে তোমার উপহার দিল আনি।
এসেছি শুনিয়া তাই,
উষার দুয়ারে পাখির মতন গান গেয়ে চলে যাই।’
শুনিয়া দাঁড়ালে তব বাতায়ন-’পরে
ঘোমটা আড়ালে কহিলে করুণ স্বরে,
‘এখন শীতের দিন
কুয়াশায় ঢাকা আকাশ আমার, কানন কুসুমহীন।’
কহিলাম, ‘ওগো রানী,
সাগরপারের নিকুঞ্জ হতে এনেছি বাঁশরিখানি।
উতারো ঘোমটা তব,
বারেক তোমার কালো নয়নের আলোখানি দেখে লব।’
কহিলে, ‘আমার হয় নি রঙিন সাজ
হে অধীর কবি, ফিরে যাও তুমি আজ
মধুর ফাগুন মাসে
কুসুম-আসনে বসিব যখন ডেকে লব মোর পাশে।’
কহিলাম, ‘ওগো রানী,
সফল হয়েছে যাত্রা আমার, শুনেছি আশার বাণী।
বসন্তসমীরণে
তব আহ্বানমন্ত্র ফুটিবে কুসুমে আমার বনে।
মধুপমুখর গন্ধমাতাল দিনে
ওই জানালার পথখানি লব চিনে,
আসিবে সে সুসময়।
আজিকে বিদায় নেবার বেলায় গাহিব তোমার জয়।’
‘ইটালিয়া’ নামের এই কবিতা কবি লেখেন ১৯২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি। বাংলায় লেখা কবিতাটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে তিনি অধ্যাপক ফর্মিকির হাতে দেন। পরে ফর্মিকি সেটি ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। পরের দিন অনূদিত কবিতাটি প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায় ছাপা হয় ‘টু ইটালিয়া’ শিরোনাম নিয়ে। পরবর্তীকালে ‘পূরবী’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পায় কবিতাটি।
ভেনিসের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে মিলানে বসে রবীন্দ্রনাথ ইতালিকে নিয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন। সেই কবিতাতেও দেখা যায় ভেনিসের মতো ইতালিকেও ‘রানী’ হিসেবে কল্পনা করেছিলেন কবি। কাব্যসুষমা দিয়ে ভোলাতে চেয়েছিলেন সম্রাজ্ঞীর মন।
মিলান থেকে রওনা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ২৯ জানুয়ারি ভেনিসে পৌঁছান। ভেনিসে ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ শুনতে পান স্লোগান: ভিভা ইল পোয়েতা ইন্ডিয়ানো (ভারতের কবি দীর্ঘজীবী হোন), ভিভা ট্যাগোর (ট্যাগোর দীর্ঘজীবী হোন), ভিভা ইল পোয়েটা ডেল আমোরে আর ডেলা পেস (প্রেম ও শান্তির কবি দীর্ঘজীবী হোন) ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথ ভেনিসের গ্র্যান্ড হোটেলে তিনতলার স্যুটে ছিলেন। তিনি বিভিন্ন উপহ্রদ ঘুরে দেখেন, বিভিন্ন ব্যক্তি ও ছাত্রছাত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ৩১ জানুয়ারি ইল গ্যাজেটিনো ডি ভেনেৎসিয়া পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের সফর, তাঁর দর্শন ও ভেনিস নিয়ে তাঁর ভাবনা প্রকাশ পায়। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ভেনিস সম্পর্কে বলছেন: ‘ভেনিস অনেকটা বারাণসীর মতো নির্মল ও স্বচ্ছ শহর, যার একটা বিশেষ চরিত্র রয়েছে। যেখানে জীবন ও ইতিহাস পরিষ্কারভাবে প্রকাশিত। বারাণসীর চরিত্রে এক ধরনের অতীন্দ্রিয়, ধর্মীয় এবং দার্শনিক প্রকৃতি রয়েছে। ভেনিসের চরিত্রে আছে জীবন ও শিল্প। এ যেন সমুদ্রের ওপর অত্যাশ্চর্য আধিপত্য। অ্যাড্রিয়াটিকের রানী…।’
‘রানী’র আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়ে গভীর রাতে গ্র্যান্ড ক্যানালে ভেসেছিলেন কবি, ময়ূরপঙ্খির মতো নৌকো গন্ডোলায় বসে বসে আপ্লুত হয়েছিলেন অচেনা নারীকণ্ঠে সংগীত শুনে। ৩১ জানুয়ারি কবি সদলবল (পুত্র, পুত্রবধূ, তাঁদের পালিতা কন্যা, কন্যার দেখাশোনা করার জন্য ন্যানি, ভারতীয় চিত্রশিল্পী, অধ্যাপক ফর্মিকি প্রমুখ) ম্যুরানো দ্বীপের কাচশিল্প, বুড়ানো দ্বীপের লেসের কাজ ইত্যাদি ঘুরে ঘুরে দেখেন। ভেনিসে দিন তিনেকের মতো থেকে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ শেষে ২ ফেব্রুয়ারি কবি ভেনিস থেকে স্টিমারে ব্রিন্দিসি রওনা হন, বোম্বাইগামী জাহাজ ধরার জন্য।
ভেনিস তথা ইতালি ছাড়ার আগে নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন সাংবাদিকদের কাছে, যা পরের দিন ৩ ফেব্রুয়ারি ছাপা হয় কুরিয়ের দেলা সেরা পত্রিকায়। ইতালিতে তিনি শিগগিরই ফিরে আসার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সেখানে। ভেনিস ছাড়ার আগে পত্রিকায় দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় কবি বলেন, ‘যখন দেশ পরিভ্রমণ কষ্টসাধ্য ছিল তখন পাশ্চাত্যের দূতেরা দক্ষিণের মানুষদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগে তাদের বোঝার জন্য এক আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি নিয়ে যেতেন। আপনাদের মারকো পোলো-ই তো এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তিনি পুবের মানুষদের ভালোবেসেছিলেন, তারাও তাঁকে ভালোবাসতো। আজ এই ধরনের দীর্ঘ পথপরিক্রমা চড়ুইভাতির মতো সহজ হয়ে গেছে। ট্যুরিস্টরা রেলে ভ্রমণ করছেন ভারতে গিয়ে বিলাসবহুল হোটেলে উঠছেন কিন্তু কখনোই তাদের ইচ্ছে হয় না মানুষের দরজায় গিয়ে নাড়া দিয়ে দেখতে যে প্রকৃত মানুষটি কীরকম। সেই হল না বোঝার কারণ এবং তা থেকেই ভুল বোঝাবুঝি ও মতদ্বৈধের সূত্রপাত।’
তবে অধুনার উল্টো চিত্রও আছে। মারকো পোলোর মতো আমিও ভেনিস ভ্রমণের আগে আধ্যাত্মিক প্রস্তুতিই নিয়েছি এক অর্থে। ভাসমান শহরটিকে বোঝার জন্য মানচিত্র থেকে শুরু করে সাহিত্যের পত্র, সবকিছুর ওপর দিয়েই সন্তরণ করেছি। বারবার প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বিরক্ত করেছি কৃত্রিম এক বুদ্ধিমানকে। তারপর আকাশ থেকে ভেনিসের মারকো পোলো বিমানবন্দরে অবতরণের আগে অবলোকন করেছি, কেমন করে একটি জনপদ জল ও স্থলের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। কেমন করে তারা উভচর জীবনকে করে তুলেছে শিল্পমণ্ডিত। আমি মূল ভূখণ্ড ভেনেৎজিয়ার একটি বড় এলাকা ভিয়া মিরানিজের একটি ছিমছাম পাড়া, নাম পিয়েমন্তে, সেখানে উঠেছিলাম। তো এই পাড়া থেকে ৭ নম্বর বাসে করে পিয়াৎজেল রোমাতে যেতাম, লাগত আধা ঘণ্টার ওপর। আবার সেখান থেকে ভ্যাপোরেত্তো বা পানির বাসে করে যেতাম লিডো দ্বীপে, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে, এই যাত্রায় লাগত পৌনে এক ঘণ্টা। এই যাতায়াত দিনে ও রাতে মিলিয়ে আমার ২২ বার করতে হয়েছে। এই প্রতিদিনকার যাওয়া–আসায় আমার একটি কথাই মনে হয়েছে—বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৃতিকে এরা মিলিয়ে নিতে পেরেছে যথাযথভাবে। নয়তো ভেনিসে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ত। একটা শহরকে তারা যেভাবে বিশ্বের সামনে উপস্থাপনযোগ্য করে গড়ে তুলেছে, তা অতুলনীয়। শহরের ঐতিহ্যকে তারা যেভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছে, তার কোনো জবাব নেই। এই শহরে মানুষ এসে প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন দেখে যেমন মুগ্ধ হয়, তেমনি এখানকার শিল্পচর্চাও পর্যটকদের বিমোহিত করে। বিশেষ করে রেনেসাঁ যুগ ও তার পূর্বাপর চিত্রকর্মগুলো।
মিলান থেকে রওনা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ ২৯ জানুয়ারি ভেনিসে পৌঁছান। ভেনিসে ট্রেন থামার সঙ্গে সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ শুনতে পান স্লোগান: ভিভা ইল পোয়েতা ইন্ডিয়ানো (ভারতের কবি দীর্ঘজীবী হোন), ভিভা ট্যাগোর (ট্যাগোর দীর্ঘজীবী হোন), ভিভা ইল পোয়েটা ডেল আমোরে আর ডেলা পেস (প্রেম ও শান্তির কবি দীর্ঘজীবী হোন) ইত্যাদি।
ইতালির শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি অদম্য আকর্ষণ থেকেই রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার দেশটিতে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেন। ভার্জিল, দান্তে, লিওনার্দো, ম্যাকিয়াভেলি, গ্যালিলিও, ক্রোচের দেশ বলে কথা! তা ছাড়া প্রথমবার তো ২৫ দিনের বদলে থেকেছিলেন মাত্র ১৫ দিন। একটা অতৃপ্তি তো ছিলই। সেবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অনেক কাজ রয়ে গিয়েছিল অসম্পূর্ণ। বক্তৃতা ও অনুষ্ঠান বাদ দিতে হয়েছিল। তাই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৮ মাসের মাথায় কবি দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো আবার ইতালি যান। সেটি ১৯২৬ সাল। এবং এ যাত্রাতেই তিনি ব্যাপক সমালোচিত ও বিতর্কিত হন। কারণ, এবার তিনি সরাসরি সরকারি আমন্ত্রণে, অর্থাৎ বেনিতো মুসোলিনির আমন্ত্রণে ইতালি গিয়েছিলেন। মুসোলিনির সঙ্গে দেখাও করেছিলেন।
১৯২৬ সালের ৩০ মে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নেপলসে পৌঁছান। এবারও তাঁর সঙ্গে ছিলেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পুত্রবধূ প্রতিমা ঠাকুর, তাঁদের পালিতা কন্যা নন্দিনীসহ অনেকে। সেখান থেকে বিশেষ ট্রেনে করে তিনি বিকেলের ভেতরে চলে যান রোমে। পরের দিন ৩১ মে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যান প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন পালাৎসো কিজিতে। সেখানেই মুসোলিনির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ও আলাপ। প্রথম সাক্ষাতেই মুসোলিনি জানান, তিনি কবির প্রায় সব লেখাই পড়েছেন। কবিও তাঁর প্রশংসা করেন। বাস্তবতা হলো, রবীন্দ্রনাথ আসলে ইউরোপে তথা ইতালিতে মুসোলিনির ভূমিকা ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অতটা ওয়াকিবহাল ছিলেন না, যা তিনি জানতে পেরেছিলেন, তা সবই মুসোলিনির পক্ষের লোকজনের কাছ থেকে। তা ছাড়া ভাষাও একটি দেয়ালের কাজ করেছে। কাজেই ইতালি ও মুসোলিনি সম্পর্কে প্রথমে তিনি ভ্রান্ত ধারণা পেয়েছিলেন। সেই ধারণা থেকে ২ জুন ১৯২৬ সালে দ্য নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড পত্রিকায় প্রকাশ পেল রবীন্দ্রনাথের মুসোলিনি-প্রশংসা। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়: রবীন্দ্রনাথ বলেছেন—‘মুসোলিনি একজন মহানায়ক, যাঁর কথায় এবং কাজে ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ। তাঁর দেহ ও আত্মা মিকেলাঞ্জেলোর বাটালি দিয়ে খোদাই করা।’
স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে এরপর তুমুল সমালোচনার ঝড় ওঠে। কিন্তু মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী চরিত্র রবীন্দ্রনাথ বুঝতে শুরু করেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের পর। রোমা রোঁলাসহ অনেকেই রবীন্দ্রনাথের সামনে আসল সত্যটা যখন তুলে ধরতে থাকেন, তখনই কুয়াশার পর্দা সরতে শুরু করে। ভুল বুঝতে পেরে কবি দীর্ঘ চিঠি লেখেন তাঁর বন্ধু ও বিশ্বভারতী গঠনে সহযোগী চার্লস অ্যান্ড্রুজকে। চিঠিটি লিখেছিলেন ইতালি ছাড়ার পর, ২০ জুলাই, ভিয়েনাতে বসে। তিনি চাচ্ছিলেন, দেশে ফেরার আগেই সব বিতর্কের অবসান হোক। অ্যান্ড্রুজকে লেখা চিঠিখানা ১৯২৬ সালের ৫ আগস্ট ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত ম্যানচেস্টার গার্ডিয়ান পত্রিকায় ‘ফিলোসফি অব ফ্যাসিজম: রিফিউজাল অব সাপোর্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। চিঠিতে কবিসুলভ মৃদুভাষ ও বিনয়সহকারে ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ও মুসোলিনির সমালোচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি লেখেন: ‘এই ফ্যাসিবাদের কর্মপন্থা ও আদর্শ সমগ্র মানবগোষ্ঠীর চিন্তার বিষয় এবং যে আন্দোলন মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নির্দয়ভাবে দলন করে, ব্যক্তিকে বিবেক-বিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণে বাধ্য করে, এবং হিংসার রক্ত-মাখা পথ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়, সেই আন্দোলনকে আমি কখনও সমর্থন করতে পারি এটা কল্পনা করাও অযৌক্তিক। আমি অসংখ্যবার ঘোষণা করেছি, পাশ্চাত্যের অধিকাংশ জাতি ধর্মীয় নিষ্ঠার সঙ্গে যে উগ্র ও আগ্রাসী জাতীয়তাবাদী এবং সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করে চলে, তা সমগ্র বিশ্বের পক্ষেই বিপজ্জনক।’
ইতালির শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি অদম্য আকর্ষণ থেকেই রবীন্দ্রনাথ দ্বিতীয়বার দেশটিতে যাওয়ার তাগিদ বোধ করেন। ভার্জিল, দান্তে, লিওনার্দো, ম্যাকিয়াভেলি, গ্যালিলিও, ক্রোচের দেশ বলে কথা! তা ছাড়া প্রথমবার তো ২৫ দিনের বদলে থেকেছিলেন মাত্র ১৫ দিন। একটা অতৃপ্তি তো ছিলই। সেবার অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। অনেক কাজ রয়ে গিয়েছিল অসম্পূর্ণ। বক্তৃতা ও অনুষ্ঠান বাদ দিতে হয়েছিল। তাই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৮ মাসের মাথায় কবি দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো আবার ইতালি যান। সেটি ১৯২৬ সাল। এবং এ যাত্রাতেই তিনি ব্যাপক সমালোচিত ও বিতর্কিত হন। কারণ, এবার তিনি সরাসরি সরকারি আমন্ত্রণে, অর্থাৎ বেনিতো মুসোলিনির আমন্ত্রণে ইতালি গিয়েছিলেন। মুসোলিনির সঙ্গে দেখাও করেছিলেন।
একই চিঠি তিনি ইতালিতে থাকা ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফর্মিকিকেও পাঠিয়েছিলেন। সঙ্গে ফর্মিকিকে কবি আলাদা একটি চিঠিও লেখেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন: ‘ফ্যাসিজমের সমর্থন ও প্রচার আমার কাছে এক ধরনের নৈতিক আত্মহনন।’
বলার অপেক্ষা রাখে না, ফর্মিকি ও মুসোলিনি-সরকারের কাছে কবির সমালোচনা পৌঁছানোর পর অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছিল, তাঁরা বিব্রত ও ক্ষুব্ধও হয়েছিলেন। তবে এটা স্পষ্ট যে মানবতার কবি রবীন্দ্রনাথ, মুসোলিনির রাজকীয় আতিথেয়তা ও উষ্ণ সংবর্ধনা পাওয়ার পরও সত্যকে জলাঞ্জলি দেননি। তিনি চিঠির মোড়কে সেই প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছেন: ‘ইতালির মানুষের প্রতি আমার যেমন ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা রয়েছে, তাদের অনুভূতি ও ভালোবাসাও আমি গভীরভাবে অনুভব করতে পারি। অন্যদিকে ইতালির ফ্যাসিজম আমার সামনে উন্মোচিত হয়েছে। এক মহৎ দেশের যে আদর্শ স্মৃতি আমার হৃদয়ে বহন করে রাখতে পারতাম তাতে বিরোধ দেখা দিয়েছে।’
এই বিরোধের নাম ‘ফ্যাসিবাদ’, যার বিরোধিতা রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে করেছেন। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝখানে গোটা দুনিয়া, বিশেষ করে ইউরোপের ভূরাজনীতির পরিবর্তন বুঝতে পারছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এবং সে সময়টায় ফ্যাসিবাদের উত্থানকেও কিছুটা নিজের অভিজ্ঞতা এবং কিছুটা বন্ধুদের সহায়তায় অনুধাবন করেছিলেন। তাই অন্তর থেকে জানিয়েছিলেন ফ্যাসিবাদের প্রতি ঘৃণা।
এ কারণেই কি না জানি না, ইতালি নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে রবীন্দ্রনাথের লেখা, মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া থাকলেও, পূর্ণাঙ্গ কোনো ভ্রমণগদ্য নেই। অথচ দুবারের বাইরেও তিনি ইউরোপে যাতায়াতের সময় কিছু সময়ের জন্য হলেও ইতালিতে নেমেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ না লিখলেও, আমি কিন্তু এবারের ভেনিস সফর নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণগদ্য, চলচ্চিত্র উৎসবের বদৌলতে, রচনা করেছি। নাম রেখেছি ‘ভেনিস ভিটাস্কোপ’। সে স্বতন্ত্র আলাপ। বর্তমান নিবন্ধের আলাপ হলো, কাকতালীয় হলেও, রবীন্দ্রনাথের ইতালি সফরের একেবারের শতবর্ষে আমি যে সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম, ঘটনাটি আমাকে যারপরনাই আনন্দিত করেছে। তা ছাড়া শহর ভেনিস নিজের সৌন্দর্য আর ঐতিহ্য দিয়ে গভীর রেখাপাত করেছে আমার অন্তরে।
সূত্র
১. কল্যাণকুমার কুণ্ডু, ইতালি সফরে রবীন্দ্রনাথ ও মুসোলিনি প্রসঙ্গ, (কলকাতা: পুনশ্চ, ২০১৯)
২. শিবাশীষ বসু, ফ্যাসিবাদ ও উগ্র জাতীয়তাবাদ: প্রতিবাদ প্রতিরোধে রবীন্দ্রনাথ, (কলকাতা: বুকপোস্ট পাবলিকেশন, ২০২৬)
৩. ইন্দ্রাণী দাশ, রবীন্দ্রনাথের ইতালি ভ্রমণ, তাপস ভৌমিক সম্পাদিত ‘কোরক (সাহিত্য পত্রিকা): ভ্রমণ ও ভ্রমণসাহিত্য’, শারদীয় ২০২২।