তিনি কোনো আগন্তুক নন

গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাংলা আধুনিক কবিতার উন্মোচনলগ্নে, চল্লিশের দশকের প্রেক্ষাপটে যখন চেতনার উন্মোচন ও সামাজিক ভাঙা–গড়ার এক তীব্র অস্থিরতা কাব্যভুবনকে আলোড়িত করছিল, তখন আহসান হাবীব এক ব্যতিক্রমী নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁরা স্লোগানসর্বস্ব, কোলাহলপূর্ণ কবিতার যুগেও মিতভাষী, শান্ত অথচ গভীর জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। তাঁর কবিতা ছিল জীবনের নিভৃত কোণের প্রতিচ্ছবি, মানব মনের গহন নির্জনতার অনবদ্য এক রসায়ন, যা জীবনের বহুমাত্রিক রস ও রূপকে ধারণ করেছিল এক সহজ, সাবলীল বাচনে। তাঁর কাব্যিক উচ্চারণ কখনো চিৎকার করে ওঠেনি; বরং ফিসফিস করে বলে গেছে জীবনের গভীরতম সত্য, যা পাঠকের মননে এক শান্ত সমর্পণের মধ্য দিয়ে নতুন ভোরের স্বপ্ন বুনে দিত। তাঁর এক অনবদ্য পঙ্‌ক্তি যেন এই শান্ত সমর্পণেরই প্রতিধ্বনি: ‘রাত্রি এখন অনেক হলো, প্রদীপ নেভাও/ এবার আমাদের ঘুমানোর পালা...’ এই পঙ্‌ক্তি কেবল একটি দিনের সমাপ্তি নয়; বরং জীবনের এক পর্যায় থেকে আরেক পর্যায়ে উত্তরণের নিভৃত আহ্বান, যেখানে দিনের কোলাহল শেষে শ্রান্তি নিয়ে আসে এক চিরন্তন প্রত্যাশা—নতুন এক আরম্ভের, নতুন এক আলোকোজ্জ্বল দিনের। আহসান হাবীবের কাব্যবিশ্বের নির্জনতা তাই শূন্যতা নয়; বরং তা এক গভীর মননশীলতার উৎস, যেখানে জীবনের রসায়ন প্রকৃতি, প্রেম, স্বদেশ ও বিশ্বজনীনতার এক অখণ্ড রূপে প্রতিভাত হয়।

তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁরা স্লোগানসর্বস্ব, কোলাহলপূর্ণ কবিতার যুগেও মিতভাষী, শান্ত অথচ গভীর জীবনবোধের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। তাঁর কবিতা ছিল মানব মনের গহন নির্জনতার অনবদ্য এক রসায়ন।

আহসান হাবীবের কাব্যযাত্রা ছিল এক বিরল ক্রমবিবর্তনের ফল, যা সময় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে রোমান্টিক সংবেদনশীলতা থেকে মরমি বাস্তবতার দিকে ধাবিত হয়েছিল। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাত্রিশেষ’ (১৯৪৭) ছিল সেই সময়ের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক সন্ধিক্ষণ। এতে ছিল তারুণ্যের রোমান্টিকতা, প্রকৃতির প্রতি মুগ্ধতা এবং জীবনের এক অসংজ্ঞায়িত বিষাদ। তাঁর প্রথম দিকের কবিতায় প্রচলিত ছন্দ ও প্রকরণের প্রতি সশ্রদ্ধ আনুগত্য বজায় রেখেও তিনি স্বতন্ত্র এক বাচনিকতার পথ উন্মোচন করছিলেন। এরপর আসে তাঁর কাব্যগ্রন্থগুলো, ‘ছায়াহরিণ’ (১৯৬২) ও ‘সারাদুপুর’ (১৯৬৪)। এই পর্যায় তাঁর কাব্যচেতনায় নিয়ে আসে এক নতুন গভীরতা। এখানে নাগরিক জীবনের জটিলতা, বিষণ্নতা, আর মানুষের একাকিত্ব এক নিভৃতচারী সুর হয়ে বাজে। নাগরিক যান্ত্রিকতার ভিড়েও মানব মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অনির্দিষ্ট বিষাদ এই পর্বের কবিতার মূল সুর। এখানে কবি শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির প্রকাশক নন; বরং সমাজ ও সভ্যতার এক সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা এবং আত্মানুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা। তাঁর পরিণত পর্যায়ে ‘মেঘ বলে চৈত্রে যাবো’র (১৯৭৬) মতো কাব্যগ্রন্থগুলোয় এক দার্শনিক গভীরতা ও প্রজ্ঞাবান মননের প্রকাশ ঘটে। এই সময়ে এসে তাঁর কবিতা জীবন, মৃত্যু, সময় এবং প্রকৃতির চিরন্তন চক্র নিয়ে এক নিগূঢ় উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়। এখানে রোমান্টিক বিহ্বলতা রূপান্তরিত হয় এক স্থিতধী প্রজ্ঞায়, যেখানে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব ও প্রাকৃতিক লীলার চিরন্তনতা একাকার হয়ে যায়। তাঁর কাব্যে প্রকৃতি আর মানবজীবন অভিন্ন সত্তায় মিশে যায়, যেখানে প্রকৃতির প্রতিটি উপাদান মানব অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ধরা দেয়। ‘মেঘ বলে চৈত্রে যাবো, মাটি বলে আয়/ জল বলে তৃষ্ণা পাবো, ছায়া বলে আয়’—এই পঙ্‌ক্তিগুলো নিছক প্রকৃতির ঋতুচক্রের বর্ণনায় সীমায়িত না থেকে হয়ে উঠেছে জীবনের প্রতি এক গভীর আত্মিক টান, এক অবিরাম প্রবাহের ঘোষণা। এখানে প্রতিটি উপাদানই একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত, যা জীবনের অনন্ত জিজ্ঞাসার এক মরমি সমাধান দেয়। এই পঙ্‌ক্তিগুলোয় প্রকৃতির এক স্বাভাবিক ও অবিরাম গতিশীলতার সঙ্গে জীবনের গভীর সম্পর্ক এবং প্রতিটি অস্তিত্বের পারস্পরিক নির্ভরতা এক দার্শনিক ব্যঞ্জনা লাভ করে।

তাঁর পরিণত পর্যায়ে ‘মেঘ বলে চৈত্রে যাবো’র (১৯৭৬) মতো কাব্যগ্রন্থগুলোয় এক দার্শনিক গভীরতা ও প্রজ্ঞাবান মননের প্রকাশ ঘটে। এই সময়ে এসে তাঁর কবিতা জীবন, মৃত্যু, সময় এবং প্রকৃতির চিরন্তন চক্র নিয়ে এক নিগূঢ় উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়।

আহসান হাবীবের কবিতায় অস্তিত্বের শিকড় সন্ধানের এক গভীর আকুতি পরিলক্ষিত হয়, যা রাষ্ট্রীয় গণ্ডি পেরিয়ে মাটি ও মানুষের সঙ্গে এক চিরন্তন, অলৌকিক সম্পর্কের প্রকাশ ঘটায়। ‘আমি কোনো আগন্তুক নই’—এই বোধ তাঁর কাব্যসত্তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তাঁর কাছে মাটি কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; বরং তা জীবনের মৌল অস্তিত্বের আশ্রয়, আত্মিক সম্পর্কের উৎস। এই বোধ তাঁর কবিতায় এক সুদৃঢ় আত্মপরিচয়বোধ ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়, যা তাঁকে দেশ ও কালের সীমানা পেরিয়ে এক বিশ্বজনীন সত্তায় উপনীত করে। তিনি তাঁর জন্মভূমির প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি জলাধারকে নিজের অস্তিত্বের অংশ হিসেবে প্রত্যক্ষ করেন। তাঁর এই অস্তিত্বের ঘোষণায় রয়েছে একধরনের নির্মল দৃঢ়তা, অবিচল প্রত্যয় যা পাঠককেও স্বভূমির প্রতি নতুন ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ করে তোলে। তিনি বলেন:

‘আসমানের তারা সাক্ষী/ সাক্ষী এই জমিনের ফুল, এই/ নিশিরাত বাঁশবাগান ছাওয়া তিমির এই জারুল জামরুল/ ... আমি কোনো আগন্তুক নই।’ এই উদ্ধৃতিতে কবি কোনো রেজিমেন্টাল দেশপ্রেমের কথা বলেন না, তবু প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানকে সাক্ষী মেনে নিজের অস্তিত্বের শিকড়কে প্রোথিত করেন দেশের মাটিতেই। আসমানের তারা, জমিনের ফুল, বাঁশবাগানের নিশিরাতের অন্ধকার, জারুল আর জামরুলের উপস্থিতি—সবই কবির আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যা শুধু ভৌগোলিক অস্তিত্ব নয়, একই সাথে তা মানব আত্মার এক চিরন্তন আশ্রয়।

তিনি সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে এক ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ করে এক অখণ্ড পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সব ভেদাভেদ ভুলে মানুষ যদি পারস্পরিক মমতা ও ভালোবাসার হাত বাড়ায়, তবেই পৃথিবীতে শান্তি ও সংহতি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তাঁর কবিতায় এই বিশ্বজনীনতার সুর এক স্নিগ্ধ, শান্ত পরিবেশে ধ্বনিত হয়, যা তাঁর মিতভাষী শিল্পরীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাঁর কাব্যে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মানবজীবনের আনন্দ-বেদনা এক অপূর্ব মেলবন্ধন সৃষ্টি করে, যা বিশ্বচরাচরের সব প্রাণের মাঝে এক নিগূঢ় ঐক্যসূত্র প্রতিষ্ঠা করে। তিনি প্রকৃতির বিশালতা ও মানব মনের উদারতাকে এক সূত্রে গ্রথিত করে এক এমন পৃথিবীর ছবি আঁকেন, যেখানে সবাই মিলেমিশে থাকে, যেখানে কোনো বিভেদ নেই, শুধু আছে ভালোবাসা। তাঁর ‘মেলা’শীর্ষক কবিতায় এই বিশ্বজনীন ঐক্যের চিত্র এক অসাধারণ ব্যঞ্জনায় ফুটে উঠেছে: ‘ফুলের মেলা, পাখির মেলা, আকাশজুড়ে তারার মেলা/ রোজ সকালে সাজের বেলায় এই যে শুরু দিনের খেলা/... এই মেলাতে মিশে আছে এক মনে এক প্রাণের খেলা।’ তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ মূলত ভালো, এবং এই ভালোত্বের সূত্র ধরেই এক সুন্দর পৃথিবী নির্মাণ সম্ভব।

আহসান হাবীব (২ ফেব্রুয়ারি ১৯১৭—১০ জুলাই ১৯৮৫)
ছবি: সংগৃহীত

আহসান হাবীবের শিল্পরূপ ও নন্দনতত্ত্ব ছিল তাঁর কাব্যস্বরের মতোই স্বতন্ত্র ও নিভৃতচারী। তাঁর কবিতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল মিতভাষিতা। তিনি কম শব্দে, সংক্ষিপ্ত পঙ্‌ক্তিতে গভীর ব্যঞ্জনা তৈরির এক অসাধারণ ক্ষমতা রাখতেন। তাঁর ভাষা ছিল সহজ, সরল, কিন্তু তার গভীরে লুকিয়ে থাকত এক সুবিশাল অর্থ, এক অনন্ত জিজ্ঞাসা। অপ্রয়োজনীয় শব্দের বাহুল্য তাঁর কবিতায় কখনো দেখা যায়নি; বরং নির্বাচিত শব্দের সুচারু প্রয়োগে তিনি পাঠকের মনে এক চিরস্থায়ী ছাপ ফেলতেন। তাঁর এই মিতভাষিতা ছিল তাঁর গভীর মননশীলতারই প্রতিচ্ছবি। তিনি বুঝতে পারতেন, যা কিছু শাশ্বত, তা প্রকাশের জন্য কোলাহল বা জাঁকজমকের প্রয়োজন নেই; বরং নিভৃত উচ্চারণেই তার প্রকৃত সৌন্দর্য উন্মোচিত হয়। দ্বিতীয়ত, তাঁর কবিতার আরেকটি অনবদ্য দিক ছিল তাঁর চিত্রকল্প। তিনি সাধারণ প্রাত্যহিক দৃশ্যকে অসাধারণ শিল্পরূপে রূপান্তরিত করার এক অসাধারণ কৌশল জানতেন। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির অনুষঙ্গ, গ্রামের জীবনযাত্রা, নাগরিক দৃশ্যাবলি এমনভাবে চিত্রিত হয়, যা পাঠককে এক ভিন্ন জগতে নিয়ে যায়, যেখানে পরিচিত দৃশ্যও নতুন রূপে ধরা দেয়। তাঁর চিত্রকল্পগুলো ছিল জীবন্ত, বাস্তবসম্মত এবং একই সঙ্গে গভীর প্রতীকী ব্যঞ্জনায় সমৃদ্ধ। তিনি প্রকৃতির উপাদানকে মানব মনের অনুভূতি প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। একটি সাধারণ নদীর বালুচর বা চকাচকিদের বাসা তাঁর কবিতায় এক গভীর শান্তি ও নির্জনতার প্রতীক হয়ে ওঠে। যেমন তাঁর ‘দুই তীরে’ কবিতায় আমরা পাই: ‘আমি ভালোবাসি আমার নদীর বালুচর/ শরৎকাল যে নির্জনে চকাচকিদের ঘর।’ এই চিত্রকল্পটি চিরন্তন বাংলার প্রকৃতির সঙ্গে কবির আত্মিক বন্ধন নির্দেশ করে, যা এক মানসিক প্রশান্তি ও গভীর ভালোবাসার উৎস হিসেবে কবির কাছে ধরা দেয়। এভাবেই আহসান হাবীব তাঁর মিতভাষিতা আর চিত্রকল্পের জাদুতে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য কাব্যবিশ্ব, যা বাংলা সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

তিনি আধুনিকতার সব উপাদানকে আত্মস্থ করেও তাঁর কবিতায় বজায় রেখেছিলেন প্রাঞ্জলতা, সাবলীল বাচনভঙ্গি, যা আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতার বিপরীতে এক স্বস্তিকর আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর কবিতা গভীর, কিন্তু তাতে জটিলতা ছিল না।

আহসান হাবীবের সাহিত্যকর্মের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাঁর সৃষ্ট শিশুসাহিত্য, যা শিল্পমান ও গভীরতায় অনবদ্য। শিশুদের জন্য লেখা তাঁর ছড়া ও কবিতাগুলোয় লুকিয়ে ছিল শিশুদের মনস্তত্ত্ব অনুধাবনের এক গভীর প্রজ্ঞা। তিনি শিশুদের সহজ-সরল মনকে বুঝতে পেরেছিলেন এবং তাদের উপযোগী করে এমন সব রচনা তৈরি করেছিলেন, যা তাদের কল্পনার জগৎকে বাড়িয়ে তুলত, একই সাথে দিত জীবনবোধের মৌলিক শিক্ষাও। তাঁর ছড়াগুলোতে ছন্দ ও অন্ত্যমিলের চপলতা ছিল, কিন্তু তার ভেতরের বার্তা ছিল সুদূরপ্রসারী। শিশুরা হাসতে খেলতে শিখতে পারত প্রকৃতি, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও জীবনের ছোট ছোট আনন্দ। তিনি শিশুদের চোখে জগৎকে দেখতেন, আর সেই দেখার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে এক সুস্থ ও সংবেদনশীল মনন তৈরি করতে চেষ্টা করতেন। তাঁর শিশুসাহিত্যে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল না কোনো উপদেশমূলক কাঠিন্য; বরং গল্পের ছলে, ছড়ার তালে তিনি এমনভাবে জীবনকে উপস্থাপন করতেন, যা শিশুদের কচি মনে গভীর প্রভাব ফেলত। তাঁর ‘ছুটি’ বা ‘ট্যাংরা মাছ’ ইত্যাদি ছড়াগুলোতে সহজ ভাষা ও সরল কাহিনির আড়ালে জীবনের এক গভীর দিক উন্মোচিত হয়। তিনি শিশুদের কল্পনার জগৎকে সম্মান করে, তাদের কৌতূহলকে উসকে দিয়ে এক আনন্দময় শেখার পরিবেশ তৈরি করতেন। এই কারণে, তাঁর শিশুসাহিত্য শুধু শিশুদের কাছেই প্রিয় নয়; বরং বয়স্করাও তাঁর শিশুসাহিত্যের মধ্যে এক শাশ্বত সত্য ও সৌন্দর্যের সন্ধান পান।

সমকালীন বাংলা কবিতায় আহসান হাবীবের উত্তরাধিকার নিভৃতে অথচ শক্তিশালী স্রোতের মতো প্রবাহিত। চল্লিশের দশকের যে আধুনিক কবিতা আত্মপ্রকাশ করেছিল, তার অনেকটাই ছিল পশ্চিমের প্রভাবপুষ্ট, কখনোবা দুর্বোধ্যতার মোড়কে আবৃত। অনেক আধুনিক কবি শিল্পকে শিল্পীর একান্ত উপলব্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখায় বিশ্বাসী ছিলেন, যার ফলে সাধারণ পাঠকের কাছে তা হয়ে উঠত দুর্গম। এই পটভূমিতে আহসান হাবীবের আবির্ভাব ছিল এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। তিনি আধুনিকতার সব উপাদানকে আত্মস্থ করেও তাঁর কবিতায় বজায় রেখেছিলেন এক প্রাঞ্জলতা, এক সাবলীল বাচনভঙ্গি, যা আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতার বিপরীতে এক স্বস্তিকর আশ্রয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর কবিতা ছিল গভীর, কিন্তু তাতে জটিলতা ছিল না, ছিল মননশীলতা; কিন্তু তা পাঠকের নাগালের বাইরে ছিল না। তিনি এমন এক সেতু নির্মাণ করেছিলেন, যা আধুনিকতার নবীন ধারণাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারত। তাঁর এই বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মের অনেক কবিকে প্রভাবিত করেছে, যাঁরা কবিতার গভীরতাকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করার অনুপ্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন তাঁদের লেখায়। তাঁর প্রভাব হয়তো কোনো নির্দিষ্ট কাব্যধারার জন্ম দেয়নি, কিন্তু তাঁর নিভৃত, শান্ত স্বর বাংলা কবিতায় এক নতুন সংবেদনশীলতার দিক উন্মোচন করেছে।

তিনি তাঁর মিতভাষিতা, নন্দনতাত্ত্বিক গভীরতা এবং সহজ-সরল বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতাকে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন ঘটিয়েছেন। তিনি এমন এক কাব্যভাষা তৈরি করেছেন, যা একই সাথে আধুনিক ও চিরায়ত, ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও অপরিহার্য কণ্ঠস্বর হিসেবে চিরকাল মূল্যায়িত হবেন।