বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কেন জরুরি ছিল

(ওপরে বাম থেকে) আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, আবুল ফজল, (নিচে বাম থেকে) কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও আবদুল কাদিরের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

অন্ধকারটা খুবই ঘন গভীর হয়ে বিস্তার লাভ করেছিল, চারপাশে। বিশেষত, পূর্ব বাংলায় ঢাকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। কী রকম সেটা? ইতিহাস থেকে এ ব্যাপারে একটি নজির পেশ করা ভালো।

‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) প্রতিষ্ঠার সময় ঢাকায় শিক্ষিত মুসলমানের সংখ্যা ছিল অতি নগণ্য। এবং তার একটা বড় অংশ ছিল ঢাকার বাইরে থেকে আগত। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল এই কারণে স্বল্প। এরও অধিকাংশ, ঢাকায় ছিল বহিরাগত। ঢাকায় যারা স্থানীয়, তারা ছিল ‘কুট্টি’। এ নামেই তারা পরিচিত ছিল তখন। শিক্ষার প্রতি কোনো আগ্রহ ছিল না তাদের। কেবল তা–ই নয়, যাতে আগ্রহ তৈরি না হয়, এ জন্য ঢাকার নবাবদের ছিল গোপন প্রবল তৎপরতা।

এই দুর্গম ও ভয়ানক আবহে যাঁরা বুদ্ধির মুক্তির কার্যক্রম আরম্ভ করেছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র-শিক্ষক ছিলেন তার মধ্যে প্রধান। বাইরে থেকে যদিও তাঁরা কিছু সমর্থন পেয়েছিলেন কিন্তু সে ছিল তখনকার ‘উচ্চশিক্ষিত’ ও ‘উদারপন্থী’ ব্যক্তিদের অভিনন্দনের সম্মান মাত্র! ধরা যাক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬—১৯৩৮), চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৭৭—১৯৩৮), মোহিতলাল মজুমদার (১৮৮৮—১৯৫২), রমেশচন্দ্র মজুমদার (১৮৮৮—১৯৮০), সুশীলকুমার দে (১৮৮৯—১৯৬৮), কালিকারঞ্জন কানুনগো (১৮৯৫—১৯৭২), নলিনীকান্ত ভট্টশালী (১৮৮৮—১৯৪৭), হেমলতা দাস (১৮৬৮—১৯৪৩), লীলা নাগ (১৯০০—১৯৭০) প্রমুখ ব্যক্তির কথা। তাঁদের মধ্যে একমাত্র শরৎচন্দ্রকে বাদ দিলে প্রায় আর সবাই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ‘হিন্দু ভদ্রলোক’! তাঁদের কাছ থেকে অভাবিত উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা এলেও, মুসলিম সমাজের ভেতরেই তৈরি হয়েছিল বুদ্ধি মুক্তির বিরুদ্ধে অকল্পনীয় বাধা ও প্রতিরোধ। এর স্বরূপটা কী? এ স্থলে দু–একটি প্রমাণ পেশ করা দরকার। কেননা এই প্রতিবন্ধকতার স্বরূপটা জানতে পারলে এর লক্ষ্যটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে শিক্ষিত সমাজের কাছে।

উল্লিখিত জিজ্ঞাসার উত্তর পেতে হলে আগে বুদ্ধি মুক্তির মৌল সূত্রটা জানা দরকার। এ আন্দোলনের নেতৃত্বে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের বক্তব্য ছিল—বুদ্ধির মুক্তি, তথা বিচার-বুদ্ধিকে অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রের আনুগত্য থেকে মুক্তি দেওয়া। কেন? কারণ এটা মানুষের নতুন নতুন চিন্তাভাবনায় বাধা দেয়। জীবন ও জগৎকে জানাবোঝার ক্ষেত্র সংকীর্ণ ও ছোট করে ফেলে। অবশেষে মানসিক মৃত্যু ঘটে! অথচ মানুষের মনে আধুনিক জীবন ও জগৎ নিয়ে জিজ্ঞাসা ও প্রশ্নের শেষ নেই। মানুষের মন স্বভাবতই সৃষ্টিশীল। এটাই মানসিক স্তরের সর্বপ্রধান পরিচয়। কিন্তু ধর্মীয় সংস্কার ও শাস্ত্র মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবণতায় বাধা দেয়। তার স্বরূপের স্থিরতা তার মৌল কারণ, তাঁরা মনে করেন। তাই ও-আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে উত্তম সমাজের চিন্তা ও ধারণা যেভাবে কাজ করে, তার একটা দুর্দান্ত দার্শনিক সূত্রের কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। তাঁরা মনে করলেন, যে সমাজে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পারতপক্ষে সব নারী-পুরুষ মুক্ত মনে নিজেদের কথা বিনিময় করতে পারে এবং যেখানে আছে উদার, উপযোগী পরিবেশ এবং ব্যক্ত কথা বিচার করার শিক্ষিত মন—এমন সমাজ প্রতিষ্ঠা জরুরি। কেননা এ রকমই হতে পারে মুক্ত ও মানবিক সমাজের দৃষ্টান্ত।

বলা বাহুল্য, এই মনোভাব ও শিক্ষা মহৎ। অথচ এর বিরুদ্ধে প্রথমে বাধা আসে ঢাকার জমিদার নবাবদের তরফ থেকে। তাঁদের বাধাটা একই সঙ্গে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক। দেখা গেল, ও-আন্দোলনের নেতৃত্বে যখন শিখা (১৯২৭) পত্রিকা প্রকাশিত হলো এবং তাঁদের সাংগঠনিক কার্যক্রমে প্রতিবছর যখন সাধারণ বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হতে শুরু করল এবং তাঁরা যখন নিজেদের বক্তব্য নানা পত্রপত্রিকা ও সভা-সমিতিতে পেশ করলেন, তখন চারপাশ থেকে ‘রক্ষণশীল মুসলিম সমাজ’-এর মধ্যে প্রচণ্ড সমালোচনার ‘ঝড়’ উঠল। বিশেষত, ও-আন্দোলনের প্রধান নেতৃত্ব, তথা কাজী আবদুল ওদুদ (১৮৯৪—১৯৭০) ও আবুল হুসেন (১৮৯৭—১৯৩৮)-এর ‘সম্মোহিত মুসলমান’, ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’, ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’, ও ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রকাশিত হলো, তখন ‘পূর্ব বাঙলা’য় যেন মূঢ়তার আগুনে জ্বলে ওঠে ‘রক্ষণশীল’ পুরো মুসলিম সমাজ! এরই মধ্যে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এ যোগ দেওয়ায় বিষয়টি আরও বেগবান হয়ে ওঠে। এর কারণ ইতিমধ্যে নজরুল নিজেই তাঁর সমাজে স্বীকৃত ও গৃহীত হয়ে ওঠেননি, পুরোপুরি! তিনি ‘কাফের’, ‘মুরতাদ’, ‘নাস্তিক’, ‘ইসলামদ্রোহী’, ‘শয়তান’ প্রভৃতি বিশেষণে আখ্যাত; অতএব সমাজচ্যুত, একপ্রকার! আর তিনি কিনা ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’কে অভিনন্দন জানিয়ে, সমর্থন করে তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন!

মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রকাশিত ‘শিখা’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষের নামপত্র, ১৯২৮
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর ইতিহাসে পাওয়া যাচ্ছে—বাঙালি মুসলমানের অভিভাবক যে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৫—১৯৬৯) নেতৃত্বে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় ও-সমাজ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল, কাজী মোতাহার হোসেন সাক্ষ্য দিয়েছেন, সেই মনীষী এই গোষ্ঠীকে ত্যাগ করেন এক সময়, ধীরে ধীরে, কৌশলে। কেন? এই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড তাঁর পছন্দ হয়নি, যেন হট্টগোল কেবলই। এখানে থামলেন না তিনি।

হয়তো এই কারণেও, সমস্ত ক্ষুব্ধতা ও বিদ্বেষ গিয়ে পড়ল কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেনের ওপর! ফল কী হলো? ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগে প্রথমে ঢাকার বলিয়াদীর জমিদার খানবাহাদুর মৌলবী কাজেমুদ্দিন আহমদ সিদ্দিকী (১৮৭৬—১৯৩৭) তাঁর বাসভবনে এই দুজনকে আহ্বান করলেন। সময়টা ছিল ১৯২৮ সনের ২০ আগস্ট, সোমবার। কিছুকাল পরে আবুল হুসেনের ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধের জন্য তাঁর ডাক পড়ল ঢাকার আহসান মঞ্জিলের ‘আঞ্জুমান অফিস’ কক্ষে। সময়টা ১৯২৯ সনের ৮ ডিসেম্বর। দুই স্থানেই দুজনকে যে হেনস্তা ও অসম্মান করা হয়েছিল, লেখাপড়ার জন্য এমনটা করা হয়, তার পূর্ব নজির বাংলার ইতিহাসে ছিল না! আবুল হুসেনকে তাঁর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিচ্যুতিসমেত তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়!

এ তো গেল নবাব-জমিদারদের তরফের একটি দিক! অন্যদিকে ভিন্ন খবরও কম শোকাবহ নয়! কী রকম সেটা? ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর ইতিহাসে পাওয়া যাচ্ছে—বাঙালি মুসলমানের অভিভাবক যে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৫—১৯৬৯) নেতৃত্বে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যাঁর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় ও-সমাজ উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল, কাজী মোতাহার হোসেন সাক্ষ্য দিয়েছেন, সেই মনীষী এই গোষ্ঠীকে ত্যাগ করেন এক সময়, ধীরে ধীরে, কৌশলে। কেন? এই গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড তাঁর পছন্দ হয়নি, যেন হট্টগোল কেবলই। এখানে থামলেন না তিনি। ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান (১৯৩৭—২০২০) এক বক্তৃতায় (২০১৬ সনের ৬ অক্টোবর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আয়োজিত ‘মুক্তচিন্তা বিকাশের উপায়’ শীর্ষক বক্তৃতা। এখনো ইউটিউবে বিদ্যমান এ বক্তৃতা।) বলেন, আহসান মঞ্জিলে আহূত সভায়, যেখানে আবুল হুসেনকে ডাকা হয়েছিল, সেখানে শহীদুল্লাহকেও আহ্বান করা হয়েছিল এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়—আবুল হুসেন ধর্মের অবমাননা করেছেন, এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী? শহীদুল্লাহ বলেন, না, তিনি ধর্মের অবমাননা করেননি, তবে তাঁর ভাষায় এবং প্রকাশভঙ্গির মধ্যে সংযমের অভাব আছে। এ জন্য তাঁকে তিরস্কার করা যায়! আহসান মঞ্জিলের এই ঘটনার পরে, আবুল হুসেন ৯ ডিসেম্বর ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর তিনি যে সম্পাদক ছিলেন, তার থেকে পদত্যাগ করেন! সে পদত্যাগপত্র মাসিক সঞ্চয় পত্রিকায় সে মাসেই (পৌষ ১৩৩৬) প্রকাশিত হয়।

এটা গেল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর বিদ্যমান সময়ের কথা। পরবর্তীকালেও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের তাৎপর্য এবং ভূমিকা বাঙালি মুসলিম শিক্ষিত সমাজ সংবেদনশীলতা ও আন্তরিকতা দিয়ে বুঝতে চাননি! বরঞ্চ ও-আন্দোলনকে তাঁরা অস্বীকার করেছেন সমূলে! এর একটি বড় প্রমাণ এই যে তখনকার পূর্ব বাংলায় যখন রবীন্দ্র-বিরোধিতা প্রবল হয়ে ওঠে, তখন অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান (১৯২২—২০০২) ১৯৫১ সনে, আগস্ট মাসে মাহে-নও (১৯৪৯) পত্রিকায় লিখলেন ‘পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্যের ধারা’ নামে এক পলিটিক্যাল অভিসন্ধিমূলক প্রবন্ধ। সেখানে তিনি রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বললেন, ‘আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখবার এবং হয়তোবা জাতীয় সংহতির জন্য যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রবীন্দ্রনাথকেও অস্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছি।’ এই ঐতিহাসিক বিরুদ্ধ বক্তব্যের পরেই আলী আহসান বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নিয়ে তাঁর মতামত ব্যক্ত করেন। সে মতামতে বলা হয়, ‘দেশ বিভাগের পূর্ব পর্যন্ত মুসলমান সাহিত্যিকেরা অনেকটা হিন্দু ভাবধারায় দীক্ষিত ছিলেন। এই দীক্ষার চরম নিদর্শন মেলে ঢাকার মুসলমান সাহিত্য সমাজের তথাকথিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে। ইসলামী নীতিবোধকে লাঞ্ছিত করে যে মুক্তবুদ্ধির প্রতিষ্ঠা তা বিকৃত মানসের সৃষ্টি, তাতে নতুনত্বের উন্মত্ততা আছে; কিন্তু স্থির বিবেচনার প্রশান্তি নেই। কাজী আবদুল ওদুদ এই আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন সত্য, কিন্তু তাঁর প্রাজ্ঞ চিন্তাধারার দ্বারা এই আন্দোলন লালিত হ’তে পারেনি। বাবু যত বলে পারিষদ দলে বলে তার শতগুণ।—অবস্থাটা দাঁড়িয়েছিলো তাই। অতিরিক্ত বলায় ও বিকৃত ব্যাখ্যায় সাধারণ ত্রুটিও আকাশচুম্বী হ’য়ে দাঁড়িয়েছিলো। এই মুক্তবুদ্ধির আন্দোলনকে বাংলার মুসলমান কখনও স্বীকার করে নেয়নি।’

সত্য যে পাকিস্তানি আদর্শের মোহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রবীন্দ্রনাথকে অস্বীকার করা হলে, তা মেনে নেওয়া হয়নি অবশ্য। সেটা আজ ঐতিহাসিক সত্য। জিজ্ঞাসা হচ্ছে, যে আদর্শের কারণে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ পরিচালিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকেও বাতিল করা হয়েছিল, সেটা নিতান্তই খামখেয়ালি ব্যাপার ছিল, নাকি সচেতনভাবেই তা সম্পন্ন করা হয়েছিল? বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে, বর্তমান লেখকের জানামতে, সৈয়দ আলী আহসানের এই অস্বীকৃতি নিয়ে কোথাও উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা কিংবা সমালোচনা হয়নি, ও-প্রবন্ধ প্রকাশের পরেও না, তার পরবর্তীকালেও না।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ছিল বাঙালি মুসলিম সমাজে প্রথম সুগঠিত ও সুস্থধারার একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ কেউ তখনকার মুসলিম লীগের (ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সনের ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ খান (১৮৭১—১৯১৫), আগা খান (১৮৭৭—১৯৫৭) প্রমুখের নেতৃত্বে) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, যদিও তাঁরা ছিলেন পুরোপুরি রাজনীতিসচেতন মানুষ। তাঁরা প্রত্যেকে রসসাহিত্যের চর্চা করেছেন যদিও, কিন্তু মৌল ঝোঁকটা ছিল বুদ্ধি ও যুক্তির ভাষার ওপর। এর মূলে ছিল এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মনোভাব। কী সেটা?

এই প্রত্যাখ্যান, অস্বীকৃতি ও আত্মঘাতী সমালোচনার অবসান হয়নি আরও পরবর্তীকালে, যখন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সুবর্ণজয়ন্তী, তথা পঞ্চাশ বছর অতিক্রম হয়েছে, তখনো! অধ্যাপক সাঈদ-উর-রহমান সম্পাদিত ওদুদ-চর্চা (১৯৮২) সংকলন গ্রন্থে দেখা যায়, আহমদ শরীফ (১৯২১—১৯৯৯) ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, ‘কাজী আবদুল ওদুদ’ ও ‘আগুন নয় আলো’ নামে দুটি প্রবন্ধ। উল্লেখ্য যে দুটি প্রবন্ধেই রয়েছে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন বিষয়ে স্ববিরোধিতা ও প্রত্যাখ্যানের সুর! সংকলনে সম্পাদকীয় ভূমিকায় সম্পাদকও জানিয়েছেন সে কথা। এই একই সুরে কথা বলেছেন মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ (১৯৩৬—২০১৩) ও বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর (১৯৩৬—২০২০), তাঁদের নিজ নিজ লেখায়। এর ব্যতিক্রম দেখা যায় হুমায়ুন কবির (১৯০৬—১৯৬৯), আবদুল হক (১৯১৮—১৯৯৯), আনিসুজ্জামান (১৯৩৭—২০২০) প্রমুখের লেখায়। তবে এঁদের স্বর তেমন উঁচু নয়, বরঞ্চ বেশ নিম্নকণ্ঠ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নিয়ে!

তবু তীব্র-কঠিন সমালোচনার পরও যখন কেউ কেউ এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন আমাদের ‘সাহিত্যিক রুচি উন্নয়নে’, ‘বাঙালী মুসলমানদের নবজাগরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ’ এবং ‘বুদ্ধিবাদী বাঙালী মুসলমানের মনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল’ কিছু পরিমাণে, তখন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ক্ষীণকণ্ঠ হলেও মন্তব্য করেন, ‘কোন স্বল্পস্থায়ী সাহিত্য-আন্দোলনের পক্ষে এসব সামান্য অবদান নয়। এর চেয়ে বেশী আদায় না হয়ে থাকলেও আমার অতৃপ্তি নেই।’

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের উল্লিখিত বক্তব্যের পরে, আর বিশেষ কোনো কথা থাকে না যদিও, তবু কথা শেষ হতে চায় না যেন! কেন? তার প্রথম কারণ এই যে বাঙালি মুসলিম সমাজে বুদ্ধি ও যুক্তিবোধের ভাষা ছিল না, যাতে আধুনিক জীবনের দৃষ্টি উন্মোচিত হতে পারে। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ প্রথম সাংগঠনিকভাবে এর প্রতিষ্ঠা করে এবং এর বৈরী আবহের বিরুদ্ধে লড়াই করে, আর সব ছেড়ে দিয়ে! এর কোনো তুলনা নেই বাঙালি মুসলিম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে। এখান থেকে দ্বিতীয় একটি কথা উঁকি দিচ্ছে, দেখা যায়।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ছিল বাঙালি মুসলিম সমাজে প্রথম সুগঠিত ও সুস্থধারার একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এ আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ কেউ তখনকার মুসলিম লীগের (ঢাকায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৬ সনের ৩০ ডিসেম্বর, নবাব সলিমুল্লাহ খান (১৮৭১—১৯১৫), আগা খান (১৮৭৭—১৯৫৭) প্রমুখের নেতৃত্বে) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না, যদিও তাঁরা ছিলেন পুরোপুরি রাজনীতিসচেতন মানুষ। তাঁরা প্রত্যেকে রসসাহিত্যের চর্চা করেছেন যদিও, কিন্তু মৌল ঝোঁকটা ছিল বুদ্ধি ও যুক্তির ভাষার ওপর। এর মূলে ছিল এক গভীর তাৎপর্যপূর্ণ মনোভাব। কী সেটা? সাধারণ শিক্ষিত মানুষের মন আগে বুদ্ধির ভাষায় অভ্যস্ত হওয়া চাই। বিশ্বাস স্থাপন করা চাই যুক্তিবোধে। কেননা সংস্কারমুক্ততা আসে এই সত্য প্রত্যয়ের সঙ্গে বসবাসের ফলে। মানুষের মনের জড়ত্ব কিংবা অন্ধত্ব ঘোচানোর ক্ষেত্রে চিন্তা-সংস্কার তাই সর্বপ্রথম জরুরি কাজ। জাতীয় সংকট নিরসনে তাই রাজনীতির মতো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকা এক মৌল স্বীকার্য বিষয়। কেন? আর্থিক জীবনের ভিত্তি রাজনীতি অধিকারের মূল বিষয় হলেও, মানসিক উৎকর্ষে সাংস্কৃতিক বোধ রাজনীতিরও পূর্বশর্ত! আর এ কথা তো মিথ্যে নয় যে রাজনীতি সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিমন্ত অংশ। ঠিক এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক আন্দোলনই জাতীয় সংকট-মুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত। আমাদের ভাষা-আন্দোলন তার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাফল্যেও আছে এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অনস্বীকার্য মৌল ভূমিকা। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্তরে ছিল বিকশিত মানুষ সম্পর্কে এই ধারণা। তাই চিন্তা-সংস্কারকে তাঁরা সর্বপ্রথম জরুরি লক্ষ্য মনে করেছিলেন। এর উপযোগী ভাষা নির্মাণ করা ছিল, তাই তাঁদের এক ঐতিহাসিক দায়। এই অনুভব থেকে তৃতীয় একটি বক্তব্য পরিষ্কার হতে চাইছে।

আমাদের সমাজে এই এক শ বছরের মধ্যে এই আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রসার ও বিস্তার, রাজনৈতিক ও অন্যবিধ ঐতিহাসিক কারণে ব্যাপক হতে পারেনি, সে কথা আলাদা, কিন্তু তাঁদের উদ্ভাবিত ক্লাসিক বাণী, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—এর সূক্ষ্ম-গভীর অনুরণন, অনুভব ও ব্যঞ্জনা, আজকের আধুনিক মনের পক্ষে মুক্তচিন্তার ঐশ্বর্যকে বিপুলভাবে গতি দান করতে চাইছে। কোন দিকে সেটা?

শতবর্ষ আগে যাঁরা সাংগঠনিকভাবে সমবেত হয়ে বুদ্ধির মুক্তি (Emancipation of Intellec) আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন, তাঁদের সেই আহ্বানে একসঙ্গে, একত্রে কতকগুলো উন্নত মানবিক মূল্যবোধের সমুন্নত সমাবেশ ঘটেছিল, যা ছিল গণতান্ত্রিক আদর্শের সম্মিলন। অসাম্প্রদায়িকতা, অন্ধ শাস্ত্রানুগত্য থেকে মুক্ততা, মুক্তবুদ্ধি, উদার গণতন্ত্র এবং আজকের অপরাজেয় মুক্তচিন্তা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা, যুক্তিবোধ ও মানবতন্ত্র—প্রকৃতপক্ষে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ থেকে অনুপ্রাণিত। বাঙালি মুসলিম সমাজ বিচ্ছিন্নভাবে এসবের মধ্যে দু–একটির ধারণা ইতিমধ্যে পেয়ে থাকলেও, প্রথম এইসব আদর্শ ও মূল্যবোধ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন থেকেই উদ্বোধিত, ব্যাখ্যাসমেত। এই প্রসঙ্গে বাঙালি মুসলিম সমাজ বুদ্ধির ভাষা ও যুক্তিবোধের পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়ে ওঠে।

তাই খোঁটায় বাঁধা-বাঁধা খোরাক খাওয়া যাদের অভ্যাস, মুক্ত হয়ে স্বেচ্ছাকৃত উপযোগী খাদ্য আহরণ তাদের পক্ষে ভীতিকর। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা আর আত্মকৃত শিক্ষার মধ্যে যে পার্থক্য, এ–ও অনেকটা সে-রকম। অভ্যস্ততায় স্বস্তি, অনভ্যাসে অশান্তি—এক প্রত্যক্ষবাস্তব! জীবনের পক্ষে স্বেচ্ছাকৃত পরীক্ষা ও নিরীক্ষায় যেন শাস্তি, বাঁধা-খোরাকে অভ্যস্ত মানুষের! বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ছিল এই জড়ত্বের স্বস্তি ও অনভ্যাসের ভয়ানক ভীতির আবহ থেকে উত্তরণের একটা নতুন পটভূমি, বাঙালি মুসলিম সমাজে। সে জন্য মানুষের সমাজে এমন আদর্শ আছে, যার কথা বারবার বলতে হয়। বারবার বলেও যার কথা পুরোনো হয় না। কালের চক্রে, তেমন আদর্শ হারিয়ে গেলেও তাকে আবার ফিরে পেতে সচেষ্ট হতে চায় মানুষের মন, জীবনের জন্য, সময়ের প্রয়োজনে। যেমন—সাম্য ও স্বাধীনতা। ন্যায়বিচার ও মানবাধিকার। সে রকম একটি আদর্শের নাম বুদ্ধির মুক্তি। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ পূর্ব বাংলায় এই আন্দোলনের দুঃসাহস দেখিয়েছিল আজ থেকে এক শ বছর আগে।

আমাদের সমাজে এই এক শ বছরের মধ্যে এই আদর্শ ও মূল্যবোধের প্রসার ও বিস্তার, রাজনৈতিক ও অন্যবিধ ঐতিহাসিক কারণে ব্যাপক হতে পারেনি, সে কথা আলাদা, কিন্তু তাঁদের উদ্ভাবিত ক্লাসিক বাণী, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—এর সূক্ষ্ম-গভীর অনুরণন, অনুভব ও ব্যঞ্জনা, আজকের আধুনিক মনের পক্ষে মুক্তচিন্তার ঐশ্বর্যকে বিপুলভাবে গতি দান করতে চাইছে। কোন দিকে সেটা? ইতিমধ্যে সেই সমাজের কথা বলা হয়েছে! আজকের আধুনিক শিক্ষিত মনের মানবায়িত সেই ধারণা, সন্দেহাতীতভাবে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়, বিশেষভাবে।

জ্ঞানের সামাজিক মূল্য সম্বন্ধে তাঁদের এই যে স্বপ্ন, কল্পনা ও প্রতীতি—খোদ উনিশ শতকের বাংলার রেনেসাঁসেও শোনা যায়নি, যদিও তার প্রাতঃস্মরণীয় সব মনীষা এরই প্রযত্নে নিযুক্ত হয়েছিল! এ কারণে আজ আমাদের মানতে হবে যে নিত্য স্মরণযোগ্য মূল্যের জন্য, অপর কোনো গোষ্ঠী কিংবা ব্যক্তির সঙ্গে তুল্যমূল্যে বিচার না করেও, কেবল এই আদর্শ ও প্রত্যয়গুলোর নিজস্ব মূল্যের জন্য, আমরা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কাছে ঋণী। আজ শতবর্ষ পরে এই কথা অত্যন্ত আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করা ভালো। এবং কোনো ব্যক্তি কিংবা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, নির্মল ও নির্মোহ সত্যের স্বার্থে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের এই আলোটুকু জ্বালিয়ে রাখতে হবে আমাদের।