বিশ্বাস ও সংস্কৃতির আলাপ

তৌফিক আল-জাইদি নির্মিত চলচ্চিত্র ‘নোরা’র (২০২৩) একটি দৃশ্য অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

২০২৩ সালে কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশেষ স্বীকৃতি পায় তৌফিক আল-জাইদির চলচ্চিত্র নোরা। ১৯৯০-এর দশকের পটভূমিতে নির্মিত এ সিনেমায় দেখা যায়, নাদের নামের এক প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক গোপনে ক্যানভাসে ছবি আঁকেন, আর নোরা নামের এক অবরুদ্ধ তরুণী নিজের মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলার আকুতি নিয়ে তাঁর মুখোমুখি হয়। নোরার প্রতিকৃতি অঙ্কন কোনো অনৈতিক প্রেমের রূপ নেয় না; বরং তা হয়ে ওঠে আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। এটি দেখায় যে প্রতিকৃতি আঁকা স্রষ্টার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; বরং আত্মিক অস্তিত্ব উপলব্ধির নজর বা দৃষ্টির প্রকাশ। চলচ্চিত্রটি আলোছায়ার খেলা ও নিস্তব্ধতার মাধ্যমে ‘শালীনতার ব্যাকরণ’ মেনে ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে দাঁড়ায়। এ চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় ১৯৬৫ সালের বাংলাদেশি চলচ্চিত্র রূপবান-এর কথা; এ ছবিতে রূপবানের সতীত্বের প্রতিকৃতি আঁকার ঘটনাটি গ্রামীণ নারীদের সিনেমা হলে যাওয়ার সামাজিক বৈধতা দিয়েছিল।

১৯৭০-এর দশকের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে মুসলিম উম্মাহর ধর্মীয় কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও সিনেমা হলের ওপর প্রথাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। ইসলামি আকিদা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় শালীনতা রক্ষার তাগিদে দৃশ্য রূপায়ণ ও সিনেমা হলকে দীর্ঘ চার দশক ধরে সামাজিক ও আইনি অনীহার মধ্যে রাখা হয়। তবে এই দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা কোনো একক ধর্মতাত্ত্বিক ফতোয়ার ফসল ছিল না; এটি ছিল বিশ শতকের শেষ ভাগের জটিল ভূরাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রতিফলন। বিশেষ করে ১৯৭৯ সালের মক্কা অবরোধ এবং অঞ্চলজুড়ে উত্থাপিত ধর্মীয় রক্ষণশীল ‘সাহওয়া আন্দোলন’-এর পর রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক নীতিতে ব্যাপক কঠোরতা আরোপ করা হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শনীকে পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হতো। তবে ১৯৭০-এর দশকের আগে সৌদি আরবে প্রথাগত কোনো বাণিজ্যিক প্রেক্ষাগৃহ না থাকলেও তেল কোম্পানির নিজস্ব কমপ্লেক্স, বিদেশি দূতাবাস এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি ওপেন-এয়ার স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক সিনেমা প্রদর্শনী সামাজিকভাবে বিদ্যমান ছিল।

হায়েফা আল-মনসুর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘ওয়াজদা’র (২০১২) একটি দৃশ্য
ছবি: সংগৃহীত
২০০৬ সালে নির্মিত হয় সৌদি আরবের প্রথম বিগ বাজেট চলচ্চিত্র কেফ আল-হাল?। ছবিটি তৎকালীন সৌদি সমাজের প্রথাগত দ্ব্যর্থতার এক ঐতিহাসিক দলিল। এতে একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের টানাপোড়েন এবং কট্টর ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন ভাই ও উদারপন্থী সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত তুলে ধরা হয়।

পরে ‘ভিশন ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে ২০১৮ সালে চলচ্চিত্রে চার দশকের দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে নেওয়া হয় এবং দেশজুড়ে অত্যাধুনিক সিনেমা হল চালু হয়। এর ফলে সৌদি আরবে এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক আন্দোলন সূচিত হয়। এই কয়েক বছরেই লক্ষ করা গেছে, সমকালীন সৌদি চলচ্চিত্র নির্মাতারা দৃশ্য মাধ্যমকে ইমান বা ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুশাসনের সঙ্গে সংঘাতময় না বানিয়ে নতুন দৃশ্যভাষার মাধ্যমে তাঁদের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় নির্মাণ করে চলেছেন। বারাকা মিটস বারাকা, ওয়াজদা, সায়িদাত আল-বাহর এবং সাম্প্রতিক নোরার মতো চলচ্চিত্রগুলো সে পরিচয়েরই অংশ। এ চলচ্চিত্রগুলো শুধু দেশের ভেতরের প্রেক্ষাগৃহেই চলেনি, অস্কারের সেরা আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগ এবং কান চলচ্চিত্র উৎসবের মতো বৈশ্বিক মঞ্চে পদার্পণ করে নব্য সৌদি চলচ্চিত্রের স্বায়ত্তশাসিত পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে।

সৌদি সরকারের আনুষ্ঠানিক যাত্রা ২০১৮ সালে হলেও এর জন্য রয়েছে সেখানকার নির্মাতাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম। ২০০৬ সালে নির্মিত হয় সৌদি আরবের প্রথম বিগ বাজেট চলচ্চিত্র কেফ আল-হাল?। ছবিটি তৎকালীন সৌদি সমাজের প্রথাগত দ্ব্যর্থতার এক ঐতিহাসিক দলিল। এতে একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের টানাপোড়েন এবং কট্টর ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন ভাই ও উদারপন্থী সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত তুলে ধরা হয়। এক সাংবাদিক তরুণীর থিয়েটার ও মিডিয়া চর্চার অধিকারের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়—টিভিতে মুখ দেখানো, চলচ্চিত্রে অভিনয় করা কিংবা ক্যামেরা ব্যবহার করা কি আসলেই ইসলামি অনুশাসনের পরিপন্থী?

মাহমুদ সাব্বাগ নির্মিত চলচ্চিত্র ‘বারাকা মিটস বারাকা’র (২০১৬) একটি দৃশ্য
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের প্রথাগত ওয়াহাবি ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে দীর্ঘকাল ক্যামেরা ধারণ ও চলচ্চিত্রকে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হলেও পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও মাধ্যমগত পরিবর্তনের সঙ্গে ফতোয়ার অবস্থানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।

সে যুগে সৌদি আরবে সিনেমা হল না থাকায় চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন সে দেশে সম্ভব হয়নি; এটি দুবাইয়ে চিত্রায়িত হয়ে স্যাটেলাইট মাধ্যমে প্রচারিত হয়। কেফ আল-হাল? প্রথাগত ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির মুখে দাঁড়িয়ে সিনেমা হলের প্রয়োজনীয়তা ও দৃশ্যমাধ্যমের সামাজিক বৈধতা নিয়ে সৌদি সমাজে প্রথম উন্মুক্ত তাত্ত্বিক তর্কের সূচনা করে। এটি প্রমাণ করে যে চলচ্চিত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও জনগণের মধ্যে দৃশ্য রূপায়ণের ক্ষুধা ও সংলাপের প্রয়োজনীয়তা বিদ্যমান।

ইসলামিক শিল্পকলা ও ফিকহশাস্ত্রের ঐতিহাসিক আলোচনায় দৃশ্য রূপায়ণ বা প্রতিকৃতি নির্মাণের অবস্থান অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বহুমাত্রিক। 

পবিত্র কোরআনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অনুভূতির জগৎ এবং দৃশ্যমান বৈচিত্র্যকে স্রষ্টার একত্ববাদ অনুধাবনের পরম চিহ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সরাসরি দৃশ্য রূপায়ণে কোনো আইনি নিষেধাজ্ঞা সেখানে আরোপ করা হয়নি। কোরআনের মূল সুরটি প্রতিকৃতি নির্মাণের নান্দনিক কৌশলের বিরুদ্ধে নয়; বরং তা আরাধনার ক্ষেত্রে প্রতিমাপূজা বা শিরকের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক ও সমাজবিদ্যা বিভাগের প্রধান বিশ্ববরেণ্য ফকিহ্ ড. তাহা জাবের আল-আলওয়ানির বিখ্যাত ফতোয়া রয়েছে। পৌত্তলিক সমাজের জড়পদার্থকে উপাসনার অনুষঙ্গ বানানো ইসলামের বিচারে ধর্মীয় গোঁড়ামির পরাকাষ্ঠা।

সৌদি আরবের প্রথাগত ওয়াহাবি ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামোতে দীর্ঘকাল ক্যামেরা ধারণ ও চলচ্চিত্রকে কঠোর দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হলেও পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও মাধ্যমগত পরিবর্তনের সঙ্গে ফতোয়ার অবস্থানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। বিশ শতকের শেষ ভাগে তৎকালীন গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ ইবনে বাজ ডিজিটাল ও দৃশ্যমাধ্যমকে ‘স্রষ্টার সৃষ্টির অনুকরণ’ মনে করে কঠোর থাকলেও পরবর্তী সময়ে ওলামা পরিষদ স্বীকার করেন যে ভিজ্যুয়াল মিডিয়া একটি নিছক নিরপেক্ষ পাত্র বা মাধ্যম। বর্তমানে তাঁদের মূল অবস্থান হলো চলচ্চিত্র যদি অনৈতিকতা না ছড়িয়ে সামাজিক সচেতনতা ও শালীনতা রক্ষা করে সত্য ফুটিয়ে তোলে, তবে তা ধর্মীয় মূল্যবোধের পরিপন্থী নয়। ফলে চলচ্চিত্রকে সরাসরি নিষিদ্ধ করার বদলে তাঁরা এখন এর জন্য প্রয়োজনীয় সেন্সরশিপ ও শালীনতার রূপরেখা নির্দিষ্ট করার পক্ষে মত দিচ্ছেন।

তৌফিক আল-জাইদি নির্মিত চলচ্চিত্র ‘নোরা’র (২০২৩) একটি দৃশ্য
ছবি: সংগৃহীত
২০২০ সালে নির্মিত শামস আল-মাআরিফ (দ্য বুক অব সান) চলচ্চিত্রে নির্মাতা ফারিস গোদুস দারুণভাবে তুলে আনেন চলচ্চিত্র সম্পর্কে সৌদি আরবের মানুষের প্রকৃত মানসিকতা। ছবিটি ২০১০ সালের মাঝামাঝি সৌদি তরুণদের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং ক্যামেরা ব্যবহারের সামাজিক-ধর্মীয় সংঘাত নিয়ে নির্মিত।

সমকালীন সৌদি চলচ্চিত্রের দৃশ্যভাষা পাঠে তিনটি প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব অত্যন্ত মৌলিক ভূমিকা পালন করে। প্রথমত, সিরীয় তাত্ত্বিক সামের আক্কাসের ‘নজরতত্ত্ব’, যেখানে দৃশ্য পর্যবেক্ষণ কেবল চোখ দিয়ে দেখা নয়; বরং নৈতিকতা ও আত্মিক উপলব্ধির এক ফ্রেমওয়ার্কও, যা ক্যামেরাকে সত্য প্রকাশের হাতিয়ারে উন্নীত করে। দ্বিতীয়ত, নেগার মোত্তাহেদের ‘গ্রামার অব মডেস্টি’, যার মূল কথা হলো নগ্নতা বা অনৈতিক কায়িক প্রদর্শন ছাড়াই ইশারা, নীরবতা ও ফ্রেমিংয়ের দূরত্বের মাধ্যমে গল্পকে উচ্চ নান্দনিকতা দেওয়া সম্ভব। আর তৃতীয়ত, অ্যান্টনি ক্লিকের ‘অনুমতির সীমানা’, যা দেখায় কীভাবে নির্মাতারা আইনি ও সামাজিক সেন্সরশিপকে বাধা না ভেবে সেই নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরেই রূপক ও সিনেম্যাটিক সাব-টেক্সট প্রয়োগ করে শৈল্পিক স্বাধীনতা প্রকাশ করছেন।

সমকালীন সৌদি চলচ্চিত্রের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তারা পশ্চিমা বা প্রাচ্যবাদী ফ্রেমিংয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি, যে আত্মসমর্পণ এডওয়ার্ড সাঈদ ‘ওরিয়েন্টালিজম’ বা ‘প্রাচ্যবাদ’-এ আমাদের দেখিয়েছেন । অস্কার বা কান চলচ্চিত্র উৎসবে তারা যে দৃশ্যভাষা পেশ করছে, তা কোনো ভিকটিমহুড বা কৃত্রিম পশ্চিমাকরণের গল্প নয়; বরং তারা তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস, দৈনন্দিন জীবনচর্চা, লোকজ রূপকথা এবং নিজস্ব দ্বন্দ্বগুলো নিজেদের চোখ দিয়ে উপস্থাপন করছে। এটি প্রাচ্যবাদী নজরের বিপরীতে একটি স্বাধীন, আত্মমর্যাদাশীল ও স্বায়ত্তশাসিত সৌদি মুসলিম সিনেম্যাটিক আইডেনটিটি গড়ে তুলছে। ইতিমধ্যে আমরা দেখেছি, নোরা চলচ্চিত্রের চরিত্র নোরা গ্রামের এক অবরুদ্ধ তরুণী, যে নিজের মুখাবয়ব বা প্রতিকৃতি আঁকার আকুতি নিয়ে শিক্ষকের মুখোমুখি হয় এবং কেফ আল-হাল? চলচ্চিত্রের চরিত্র সাহার, যে অভিনয়ের মাধ্যমে টিভিতে মুখ দেখাতে গিয়ে পরিবারের ছোড়া ধর্মতাত্ত্বিক তর্কের কেন্দ্রে পড়ে যায়। এই নোরা ও সাহার মতো চরিত্রগুলো সৌদি আরবের আগামী দিনের পথপ্রদর্শক।

২০২০ সালে নির্মিত শামস আল-মাআরিফ (দ্য বুক অব সান) চলচ্চিত্রে নির্মাতা ফারিস গোদুস দারুণভাবে তুলে আনেন চলচ্চিত্র সম্পর্কে সৌদি আরবের মানুষের প্রকৃত মানসিকতা। ছবিটি ২০১০ সালের মাঝামাঝি সৌদি তরুণদের ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি এবং ক্যামেরা ব্যবহারের সামাজিক-ধর্মীয় সংঘাত নিয়ে নির্মিত। গল্পে দেখা যায়, হাইস্কুলের শিক্ষার্থী হুসাম ও তার বন্ধুরা যখন একটি অপেশাদার হরর ফিল্ম বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন স্কুল কর্তৃপক্ষ ও প্রথাগত সমাজব্যবস্থা তাদের প্রচেষ্টাকে গুনাহ বা অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ হিসেবে দেখে। ক্যামেরা ও লেন্সের স্পর্শকে নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক হিসেবে দেখার সামাজিক মনস্তত্ত্বকে এতে প্রকাশ করা হয়েছে।

ফারিস গোদুস নির্মিত চলচ্চিত্র ‘শামস আল-মাআরিফ’ –এর একটি দৃশ্য
ছবি: সংগৃহীত
সৌদি আরবের সমকালীন চলচ্চিত্র আন্দোলন কেবল বাজারমুখী বিনোদনের গল্প নয়; বরং পশ্চিমের নির্মিত প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নিজেদের ইতিহাস, রাজনীতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে স্বায়ত্তশাসিত দৃশ্যভাষায় ফুটিয়ে তোলার এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। বৈশ্বিক যুদ্ধজালের ভেতরে অবস্থান করেও নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো এড়িয়ে বৃহত্তর খ্যালিজি জাতিসত্তা রক্ষা করে চলছে সৌদি আরব এবং গালফের অন্যান্য  দেশের নির্মাতারা।

শামস আল-মাআরিফ অত্যন্ত তীক্ষ্ণ কৌতুকের মাধ্যমে দেখায় কীভাবে ডিজিটাল যুগের তরুণেরা কোনো প্রথাগত বা অনৈতিক পথ না ধরে, নিজেদের সংস্কৃতি ও শালীন পরিবেশের ভেতরে থেকেই ইউটিউব ও নিজস্ব ক্যামেরা দিয়ে গল্প বলতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে ক্যামেরা কেবল প্রথাগত পশ্চিমা সংস্কৃতির বাহক নয়; বরং তা সৌদি তরুণদের নিজস্ব সামাজিক বয়ান তৈরির আধুনিক হাতিয়ার।

ক্যামেরা বা ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তি বৈধ হলেও অ্যানিমেশন–বিষয়ক প্রশ্নটি ছিল অমীমাংসিত। কেননা অ্যানিমেশনের জন্য ছবি আঁকতে হয়। কট্টরপন্থী আলেমদের মতে, এটা ধর্মসম্মত নয়। ২০২০ সালে মালেক নেজের পরিচালিত অ্যানিমেটেড ফিচার ফিল্ম মাসামির প্রথাগত ফিকহশাস্ত্রের আরেকটি বড় বিতর্ক—সজীব প্রাণীর ছবি বা অ্যানিমেশন তৈরিকে চ্যালেঞ্জ করে। ইসলামি ফিকহর কট্টর ধারায় প্রাণীর অবয়ব বা পুতুল আঁকা নিয়ে যে ঐতিহাসিক আপত্তি ছিল, মাসামির তার কার্টুনিশ স্যাটায়ার ও অবাস্তব অ্যানিমেশনশৈলী ব্যবহার করে সেই বিধিনিষেধের তীব্রতা কমিয়ে আনে। অ্যানিমেশন ও অতিরঞ্জিত দৃশ্যভাষা ব্যবহার করে চলচ্চিত্রটি আধুনিক প্রযুক্তি, সামাজিক কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোঁড়ামিকে হাস্যরসের মধ্য দিয়ে খোঁচা দেয়। এটি প্রমাণ করে যে অ্যানিমেশন বা ইমেজের সৃষ্টিশীলতা সামাজিক সংশোধনের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

মাহমুদ সাব্বাগ পরিচালিত এবং ৮৯তম অস্কারে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত বারাকা মিটস বারাকা চলচ্চিত্রটি পাবলিক স্পেসে তরুণ-তরুণীর মুখোমুখি হওয়া, ছবি তোলা ও ইমেজ প্রকাশের দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত। চলচ্চিত্রটিতে ইনস্টাগ্রাম ইমেজ বনাম নীতি পুলিশ (মুতাওয়া) ধরা পড়েছে। প্রধান নারী চরিত্র বিবিয়ান একজন ইনস্টাগ্রাম ইনফ্লুয়েন্সার, যার জীবন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ফ্যাশন ইমেজের ওপর দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে পুরুষ চরিত্র বারাকা সরকারি পৌরসভার নীতি পুলিশের প্রতিনিধি। পাবলিক স্পেসে ছবি তোলা, ক্যামেরা দিয়ে মুহূর্ত ধরে রাখা এবং একটি ডেটে যাওয়ার জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে পাওয়ার যে ব্যাকুলতা, তা চলচ্চিত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্যাটায়ারের মাধ্যমে উঠে এসেছে।

‘অনুমতির সীমানা’ ও শালীনতার ব্যাকরণ বোঝার জন্যও চলচ্চিত্রটি জরুরি। এটি সরাসরি সেন্সরশিপকে আক্রমণ না করে ফ্রেমে বিশেষ ভিজ্যুয়াল সেন্সরশিপ আইকন ‘ব্লার ইফেক্ট’ ব্যবহার করে নীতিমালার আইরনি ফুটিয়ে তুলেছে। কোনো প্রকার অশ্লীল দৃশ্য ছাড়াই এটি দেখিয়েছে যে আধুনিক সৌদি যুবসমাজ তাদের ইমান ও সামাজিক শালীনতা বজায় রেখেই ডিজিটাল ভিজ্যুয়াল ওয়ার্ল্ডে নিজেদের প্রকাশ করতে চায়।

সৌদি আরবের সমকালীন চলচ্চিত্র আন্দোলন কেবল বাজারমুখী বিনোদনের গল্প নয়; বরং পশ্চিমের নির্মিত প্রাচ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বাইরে গিয়ে নিজেদের ইতিহাস, রাজনীতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে স্বায়ত্তশাসিত দৃশ্যভাষায় ফুটিয়ে তোলার এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রয়াস। বৈশ্বিক যুদ্ধজালের ভেতরে অবস্থান করেও নিজেদের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো এড়িয়ে বৃহত্তর খ্যালিজি জাতিসত্তা রক্ষা করে চলছে সৌদি আরব এবং গালফের অন্যান্য  দেশের নির্মাতারা। তৌফিক আল-জাইদির নোরা বা মাহমুদ সাব্বাগের বারাকা মিটস বারাকা—প্রতিটি কাজই প্রমাণ করেছে যে ক্যানভাস বা ক্যামেরার লেন্স কোনো ঈশ্বরদ্রোহী স্পর্ধা নয়, বরং তা স্রষ্টার সৃষ্টি অনুধাবনেরই এক আধুনিক প্রতীক। তাদের ‘ইমেজ’ ও ‘ইমান’-এর এই বৈপ্লবিক রূপান্তর আঞ্চলিক গণ্ডির বাইরেও বৈশ্বিক মুসলিম সংস্কৃতির জন্য স্বশাসিত ইসলামি ভিজ্যুয়াল আইডেনটিটি প্রতিষ্ঠার নতুন তাত্ত্বিক ও নান্দনিক দিকনির্দেশনা তৈরি করছে।

  • অনার্য মুর্শিদ: গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

  • গ্রন্থপঞ্জি

১. প্রাথমিক ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় উৎস

আল-কোরআনুল কারিম। (সুরা আল-মাইদাহ, আয়াত: ৯০; সুরা আল-আনবিয়া, আয়াত: ৫২)।

• আল-বুখারি, এম. আই. (১৯৯৭)। সহিহ আল-বুখারি (হাদিস নম্বর: ২২২৫, ৫৯৫০)। রিয়াদ: দারুস সালাম।

• মুসলিম, আই. এইচ. (২০০০)। সহিহ মুসলিম (হাদিস নম্বর: ২১০৯, ২১১০)। রিয়াদ: দারুস সালাম।

২. ফিকহ ও ফতোয়া সংকলন

• আল-কারজাভি, ওয়াই. (১৯৮৪)। আল-হালাল ওয়াল-হারাম ফিল ইসলাম [ইসলামে হালাল ও হারামের বিধান]। কায়রো: আল-মাকতাব আল-ইসলামি।

• আল-লজনাহ আল-দাইমাহ লিল-বুহুস আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ইফতা। (২০০২)। ফাতাওয়া আল-লজনাহ আল-দাইমাহ (ফতোয়া নম্বর: ২১৭২৮)। রিয়াদ: রিয়াসাত আল-ইফতা।

• ইবনে বাজ, এ. এ. (১৯৯৯)। মাজমু’ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওউইআহ (খণ্ড ৫)। রিয়াদ: রিয়াসাত আল-ইফতা।

৩. একাডেমিক গবেষণা ও গ্রন্থ

• আক্কাচ, এস. (সম্পা.) (২০২১)। নাজার: ভিশন, বিলিফ অ্যান্ড পারসেপশন ইন ইসলামিক কালচারস। ব্রিল। https://doi.org/10.1163/9789004467262

• আল-ঘেইথি, এস. (২০০১)। ইমেজ ইন ইসলাম অ্যান্ড ইসলামিক ভিজ্যুয়াল আর্ট: আ থিওরেটিক্যাল স্টাডি উইথ পার্টিকুলার রেফারেন্স টু রিসেন্ট আর্ট এডুকেশন ইন সৌদি আরাবিয়া (অপ্রকাশিত পিএইচডি অভিসন্দর্ভ)। ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, ম্যানচেস্টার, ইউকে।

• আলমেনিয়া, এম. এম. (২০২৫)। মডার্নিস্ট সৌদি সিনেমা: আ স্টাডি অব ফোর ফিল্মস অ্যাজ রিফ্লেকশন্স অব দ্য ইন্ডিভিজুয়াল অ্যান্ড সোসাইটি। কালচুরা, ২২(৮এস), ১৫৭–১৭০।

• কিলিক, এ. (২০২৫)। দ্য পলিটিক্স অব রিপ্রেজেন্টেশন ইন নিউ সৌদি অ্যারাবিয়ান সিনেমামিডল ইস্ট জার্নাল অব কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন, ১৮(১), ৪৫–৬২।

• মোত্তাহেদেহ, এন. (২০০৮)। ডিসপ্লেসড অ্যালিগরিজ: পোস্ট-রেভলিউশনারি ইরানিয়ান সিনেমা। ডিউক ইউনিভার্সিটি প্রেস।

• সাঈদ, ই. ডব্লিউ. (১৯৭৮)। ওরিয়েন্টালিজম। রাউটলেজ অ্যান্ড কেগান পল।

  • ফিল্মোগ্রাফি

• আল-আয়্যাফ, এ. (পরিচালক)। (২০০৬)। কেফ আল-হাল? [চলচ্চিত্র]। রোটানা স্টুডিওস।

• আল-মানসুর, এইচ. (পরিচালক)। (২০১২)। ওয়াজদা [চলচ্চিত্র]। রেজর ফিল্ম প্রোডুকশন; হাই লুক প্রোডাকশনস।

• আলজাইদি, টি. (পরিচালক)। (২০২৩)। নোরা [চলচ্চিত্র]। ব্ল্যাক লাইট সিনেমা।

• আমিন, এস. (পরিচালক)। (২০১৯)। স্কেলস (সায়িদাত আল-বাহর) [চলচ্চিত্র]। ইমেজ নেশন আবুধাবি।

• গোদুস, এফ. (পরিচালক)। (২০২০)। দ্য বুক অব সান (শামস আল-মাআরিফ) [চলচ্চিত্র]। টেপ প্রোডাকশন।

• নেজের, এম. (পরিচালক)। (২০২০)। মাসামির: দ্য মুভি [চলচ্চিত্র]। মিরকট অ্যানিমেশন স্টুডিও।

• সাব্বাগ, এম. (পরিচালক)। (২০১৬)। বারাকা মিটস বারাকা [চলচ্চিত্র]। এল হোশ প্রোডাকশনস।