বাংলায় মাদ্রাসাশিক্ষার সূচনা ও প্রসার

বাংলায় মাদ্রাসা কেবল ধর্মশিক্ষার ইতিহাস নয়; এটি একসময়ের জ্ঞানচর্চা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশেরও ইতিহাস। মধ্যযুগের বাংলায় মাদ্রাসাগুলো শিক্ষা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। শিলালিপি ও ঐতিহাসিক সূত্রের আলোকে সেই ইতিহাস আলোচিত হয়েছে এই নিবন্ধে। আজ প্রকাশিত হলো এর প্রথম পর্ব

কোলাজ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বাংলার প্রাচীন শিলালিপিগুলোয় বেশ কিছু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার উল্লেখ পাওয়া যায়। এই বিপুলসংখ্যক মাদ্রাসা একদিকে শিক্ষাদীক্ষা সম্প্রসারণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, অন্যদিকে জ্ঞান–বিজ্ঞানচর্চার একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্বভাবতই এসব বিদ্যাপীঠ থেকে যেসব শিক্ষাবিদ ও পণ্ডিত তথা ওলামা বের হতেন, তাঁরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ও বিভিন্ন স্তরে শিক্ষা সম্প্রসারণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। তাঁদের অনেকে ছিলেন সুফি সাধক, যাঁরা খানকাহে বসে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি আধ্যাত্মিকতা চর্চার প্রশিক্ষণও দিতেন। তাঁদের অনেকেই স্থানীয় সন্ন্যাসী ও যোগীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তাঁদের একটা মানসিক যোগসূত্র কায়েম হয়েছিল।

তেরো শতকের প্রথম দিকে সুলতান আলা-দীন আলী মর্দান খিলজির শাসনকালে এমনই একটা যোগাযোগ ঘটেছিল কামরূপ কামাখ্যা মন্দিরের পুরোহিত ভোজার ব্রাহ্মণ এবং লক্ষ্মণাবতীর মুফতি ও ইমাম রুকন আল–দীন সামারকান্দির মধ্যে। এই সাক্ষাৎ একপর্যায়ে গড়ায় পণ্ডিত ভোজার ব্রাহ্মণের ইসলাম দীক্ষার মধ্য দিয়ে। পণ্ডিতজির সাহায্য নিয়ে রুকন আল-দীন সামারকান্দি যোগবিদ্যা নিয়ে সংস্কৃত ভাষায় লেখা অমৃতকুণ্ড নামের সে যুগের অন্যতম গ্রন্থটি প্রথমে আরবি এবং পরে ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন। এর নাম দেওয়া হয় আরবিতে হাউস আল-হায়াত, আর ফারসিতে আবে হায়াত

হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে জ্ঞান–বিজ্ঞানের আদান-প্রদান মুসলিম শাসনের প্রারম্ভ থেকেই শুরু হয়ে যায়। দু-চারটি বিরল উদাহরণ থেকে এটাও অনুমান করা যায় যে জ্ঞানপিপাসু হিন্দু তথা অমুসলিম ছাত্ররা মাদ্রাসা থেকেও শিক্ষা আহরণে পিছপা হতো না। রাজা রামমোহন রায় স্বয়ং একটি মাদ্রাসায় শিক্ষা গ্রহণ করে সে যুগের একজন বিখ্যাত আরবি ও ফারসিবিদ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। তাঁকে সেকালের একজন ‘জবরদস্ত মৌলবি’ বলে অভিহিত করা হতো। তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থগুলো আরবি ও ফারসি ভাষায় রচিত (যেমন: তুহফাতু’ল-মুওয়াহ্হিদীন) এবং ধর্ম বিষয়ে সে যুগের একটি অনবদ্য রচনা। পবিত্র কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক গিরীশচন্দ্র সেনের আরবি-ফারসি জ্ঞান খুব গভীর ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে গৌড় অঞ্চলের খ্যাতনামা পণ্ডিত মুনশি (কেরানি) শ্যামপ্রসাদ আরবি ও ফারসি ভাষায় এতটাই দখল রাখতেন যে সে এলাকার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন কর্মচারী কর্নেল উইলিয়াম ফ্রাঙ্কলিনের মুনশি হিসেবে তিনি নিযুক্ত হন। এই মুনশি শ্যামপ্রসাদই গৌড় ও পাণ্ডুয়ার পুরাকীর্তির ওপরে আহওয়াল-ই-গৌড় ওয়া পাণ্ডুয়া নামে প্রথম একটি ফারসি বই রচনা করেন।

বাংলার আনাচকানাচে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা মাদ্রাসাগুলোয় শিক্ষাপ্রাপ্ত বহু আলেম সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন খাতে চাকরির সুযোগ–সুবিধা পেতেন, ঠিক যেমন বর্তমান কালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাস করা ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন ধরনের চাকরির সুযোগ-সুবিধা পেয়ে থাকেন। আরও স্পষ্ট করে বললে সে যুগের মাদ্রাসাগুলো বর্তমান কালের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই ভূমিকা পালন করত। মাদ্রাসা ও খানকাহ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের জ্ঞান–বিজ্ঞান ও প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। তবে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা গ্রহণের জন্য সাধারণত শিক্ষানবিশদের প্রায় সবাইকেই স্থানীয় মাদ্রাসা বা মক্তবে গিয়ে হাতেখড়ি নিতে হতো। মাদ্রাসায় শিক্ষা শেষ হলে যাঁরা চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ পেতে চাইতেন, তাঁরা সে এলাকার কোনো বিখ্যাত হাকিম তথা চিকিৎসকের দ্বারস্থ হতেন এবং তাঁর সহায়ক হিসেবে কাজ করতে করতে হাতে–কলমে চিকিৎসাবিদ্যা রপ্ত করতেন।

মধ্যযুগে বাংলায় মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্রমবিকাশের মানচিত্র
ছবি: লেখকের সৌজন্যে
রাজশাহী শহরের কাছাকাছি নৌহাটায় পাওয়া তেরো শতকের বাংলার ক্ষণস্থায়ী মুসলিম শাসক বলকা খান খিলজির (৬২৬-২৮ হিজরি বা ১২২৯-৩১ খ্রিষ্টাব্দ) আমলের একটি শিলালিপিতে আমরা দেখতে পাই যে সে এলাকায় এমন একটি ইমারত তৈরি করা হয়েছিল, যা মসজিদের ভূমিকা পালন করার সঙ্গে সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাঙ্গন ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অনেকে সে যুগের হাসপাতাল বা চিকিৎসালয়গুলোতে—যা ‘বিমারিস্থান’ নামে খ্যাত ছিল—যোগ দিতেন এবং সেখানে প্রশিক্ষণ পেয়ে পুরোদস্তুর হেকিম বা চিকিৎসক হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতেন। যাঁরা জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে আগ্রহী হতেন, তাঁরা প্রশিক্ষণের জন্য যোগ দিতেন মানমন্দিরগুলোতে। সামরিক শিক্ষার জন্য শিক্ষানবিশেরা সেনাবাহিনীতে যোগদান করতেন। অনেক ক্ষেত্রে কারিগরি ও পেশাদার প্রশিক্ষণগুলো পারিবারিক সূত্রে বংশানুক্রমে শিক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে চলতে থাকত। ঠিক যেমন যুগ যুগ ধরে হিন্দু সমাজব্যবস্থায় কুমারেরা মৃত্তিকার কাজ, কামারেরা লোহার কাজ, স্বর্ণকারেরা সোনার কাজ ইত্যাদি ধরনের পিতৃপুরুষের পেশাগত কর্মগুলো বংশপরম্পরায় প্রশিক্ষণ পাওয়ার মাধ্যমে ধরে রাখার ব্যবস্থা জারি রাখে।

বাংলার শিলালিপিগুলো এসব বিষয়ে কিছু কিছু আলোকপাত করে। এসব শিলালিপির মাধ্যমে আমরা কিছুটা জানতে পারি যে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় মাদ্রাসাবাড়ি বা দারসবাড়ি ইত্যাদি নামে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। অনেক ক্ষেত্রে বড় বড় জামে মসজিদ মাদ্রাসার ভূমিকা পালন করত। আবার ছোট ছোট ওয়াক্তিয়া অর্থাৎ দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের জন্য নির্মিত মসজিদের বেশির ভাগই মক্তব হিসেবে কাজ করত। ছোট বাচ্চারা সেখানে অক্ষরজ্ঞান ও প্রাথমিক শিক্ষা পেত। আরবি অক্ষর শিক্ষাদানের সেই পুরোনো ঐতিহ্য আজ পর্যন্ত অনেকাংশে টিকে রয়েছে।

রাজশাহী শহরের কাছাকাছি নৌহাটায় পাওয়া তেরো শতকের বাংলার ক্ষণস্থায়ী মুসলিম শাসক বলকা খান খিলজির (৬২৬-২৮ হিজরি বা ১২২৯-৩১ খ্রিষ্টাব্দ) আমলের একটি শিলালিপিতে আমরা দেখতে পাই যে সে এলাকায় এমন একটি ইমারত তৈরি করা হয়েছিল, যা মসজিদের ভূমিকা পালন করার সঙ্গে সঙ্গে একটি উচ্চ পর্যায়ের শিক্ষাঙ্গন ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলার যত্রতত্র ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য আরবি-ফারসি শিলালিপির আলোকে আমরা সহজে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে তেরো শতকের প্রারম্ভ থেকে রাজধানী গৌড় শহর বাংলার উত্তরাঞ্চলে সংস্কৃতি ও জ্ঞান–বিজ্ঞানচর্চার একটি মুখ্য কেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে বহু শিক্ষাকেন্দ্র ও মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। এ ছাড়া গৌড়ে অসংখ্য মসজিদও নির্মিত হয়, যেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মাদ্রাসার ভূমিকা পালন করত। খোদ গৌড় ও তার আশপাশের এলাকাগুলোয় ৫০টির বেশি মসজিদ–সংক্রান্ত শিলালিপি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সেখানে বেশ কিছু খানকাহও নির্মিত হয়েছিল। সেখানে সুফিদের আধ্যাত্মিক তালিম বা প্রশিক্ষণও দেওয়া হতো।

মুসলিম শাসনামলে বাংলার সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান দক্ষিণ এশিয়ার পরিধি ছাড়িয়ে কতকটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময়ে মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও আরব বিশ্ব থেকে বিভিন্ন শ্রেণির পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, ওলামা ও সুফি সাধকদের বাংলায় আনাগোনা করতে দেখা যায়। তাঁদের অনেকেই বাংলার বিখ্যাত মাদ্রাসা, খানকাহ ও অন্যান্য বিদ্যাপীঠের সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন এবং কেউ কেউ এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।

বাংলার উত্তরাঞ্চলের আরেকটি শহর হজরত পাণ্ডুয়ায়ও একইভাবে মসজিদ, খানকা ও মাদ্রাসার বহু শিলালিপি পাওয়া গেছে। সেগুলো পাণ্ডুয়া শহর এবং এর সন্নিহিত এলাকার সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত রাখে। বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ঢাকার সন্নিহিত সোনারগাঁ অঞ্চলটিও চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে ইসলামি জীবনদর্শনের হাম্বলি মাজহাবের (ইসলামের চারটি মূলধারার আইন এবং আইনি দর্শনের একটি ঘরানা) একজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট পণ্ডিত শায়খ শারাফ আল-দীন আবু তাওয়ামার তত্ত্বাবধানে একটি মাদ্রাসা বিশাল আকারের আন্তর্জাতিক শিক্ষাকেন্দ্রের রূপ নেয়। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশ–বিদেশ থেকে জ্ঞান অন্বেষণে আসা বিদ্যার্থীরা ভিড় জমাতেন। চৌদ্দ শতকে বিখ্যাত মনীষী শায়খ শারাফ আল-দীন ইয়াহিয়া মানেরিও একপর্যায়ে উত্তর ভারত থেকে এই বিদ্যানিকেতনে এসে বিভিন্ন শাস্ত্রে এতই ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন যে পুরো উপমহাদেশে তাঁর নাম ছড়িয়ে গিয়েছিল। এর পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ষোলো ও সতেরো শতকে তাণ্ডা (তাঁড়া), রাজমহল, জাহাঙ্গীরনগর (ঢাকা) ও মুর্শিদাবাদে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে।

মোগল যুগে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে বর্তমান দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে একটি সুবিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা না উল্লেখ করলেই নয়, যা বহু মনীষী ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদকে আকর্ষণ করেছিল। অন্যদিকে বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ত্রিবেণী এবং বর্তমান হুগলি জেলার অন্তর্গত ছোট পাণ্ডুয়া ইত্যাদি শহরগুলোয়ও বেশ কতগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ও নামকরা বিদ্যাপীঠটির নাম ছিল দার আল-খায়রাত। সেখানে পাওয়া একটি শিলালিপি অনুযায়ী এটি ৭১৩ হিজরি বা ১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল।

ত্রিবেণীর অদূরে বর্তমান বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট শহরে যে বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছিল, তা উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কোনোমতে টিকে ছিল। মাদ্রাসাটি শোচনীয়ভাবে বিলুপ্ত হওয়ার সময় এর বিখ্যাত গ্রন্থাগারের বহু দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও বই কলকাতার ভারতীয় জাতীয় গ্রন্থাগার বা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে সংরক্ষণ করা হয়।

ব্রিটিশ আমলে বাংলার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্দর শহর চট্টগ্রামও শিক্ষাদীক্ষার একটি প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। উনিশ শতকের শেষের দিকে গড়ে ওঠা মহসিনিয়া মাদ্রাসা এবং বিশ শতকে গড়ে ওঠা হাটহাজারী মাদ্রাসা সে এলাকায় জ্ঞান–বিজ্ঞানের আলো ছড়াতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। হাটহাজারী মাদ্রাসায় বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার) এবং বিশেষ করে আরাকান ইত্যাদি দূরদূরান্ত থেকে ছাত্ররা পড়াশোনা করতে আসত। মাদ্রাসাটি এখন পর্যন্ত বেশ সাফল্যের সঙ্গে টিকে আছে।

মুসলিম শাসনামলে বাংলার সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান দক্ষিণ এশিয়ার পরিধি ছাড়িয়ে কতকটা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ সময়ে মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া ও আরব বিশ্ব থেকে বিভিন্ন শ্রেণির পণ্ডিত, শিক্ষাবিদ, ওলামা ও সুফি সাধকদের বাংলায় আনাগোনা করতে দেখা যায়। তাঁদের অনেকেই বাংলার বিখ্যাত মাদ্রাসা, খানকাহ ও অন্যান্য বিদ্যাপীঠের সঙ্গে ক্রমশ জড়িয়ে পড়েন এবং কেউ কেউ এ দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন।

মক্কার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চিন্তাধারা ছিল উদার। এখানে সব ধরনের ফিকহ বা ইসলামি মতবাদ পড়ানো হতো। বাংলার মাটিতে অনুসৃত আজম শাহের উদার নীতি ও খোলা মনের চিন্তাধারার জোয়ার সুদূর মক্কার বাঙালি মাদ্রাসার ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। সে যুগের বিশ্বায়নে বঙ্গদেশও যে একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিল, মক্কায় বাঙালি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

৮১৩-১৪ হিজরি বা ১৪১০-১১ খ্রিষ্টাব্দ সময়ে বাংলার ইলিয়াস শাহি বংশের একজন বিখ্যাত সুলতান আজম শাহ মক্কা ও মদিনা শরিফে একটি করে বিদ্যাপীঠ বা বিশ্ববিদ্যালয় (মাদ্রাসা) নির্মাণ করেন। মক্কার মাদ্রাসাটি মসজিদ-আল-হারামের উম্মে হানি তোরণদ্বার (যা আল-রুকন আল-ইয়েমেনি কোনার দিকে অবস্থিত ছিল) থেকে অনতিদূরে স্থাপিত হয়েছিল। আবার মদিনার মাদ্রাসাটি নবীজির মসজিদ অর্থাৎ মসজিদে নববি একটি দরজা বাব আল-সালামের (শান্তির দরজা) কাছাকাছি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সুলতান গিয়াস আল-দীনের নামে নামাঙ্কিত এই মাদ্রাসা দুটি ‘আল-মাদ্রাসা আল-সুলতানিয়া আল-গিয়াসিয়াহ আল-বাঙ্গালিয়াহ’—অর্থাৎ বাঙালি বিশ্ববিদ্যালয়—নামে খ্যাত হয়েছিল। সুলতান আজম শাহ এ মাদ্রাসাটির রক্ষণাবেক্ষণ, ভরণপোষণ ও খরচাদির জন্য বেশ কিছু জমিজায়গা ও ধন-সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ হিসেবে বরাদ্দ করেন। শিগগিরই এ বাঙালি বিশ্ববিদ্যালয় দুটির সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে যায়, যা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাঙালি জাতির পরিচয়কে বিশেষভাবে তুলে ধরে।

মক্কার মাদ্রাসাটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ৮১৩ হিজরি বা ১৪১১ খ্রিষ্টাব্দের রমজান মাসে এবং উদ্বোধন করা হয় ৮১৪ হিজরি বা ১৪১২ খ্রিষ্টাব্দে। সে যুগের বহু গণ্যমান্য পণ্ডিত এই মাদ্রাসা দুটিতে অধ্যাপনা ও গবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন। এদের মধ্যে একজন শায়খ তাকি আল-দীন আল-ফাসি (৭৭৫-৮৩২ হিজরি বা ১৩১৪-১৪২৮ খ্রিষ্টাব্দ) ইসলামি আইনশাস্ত্রে মালিকি মাজহাবের বিশেষজ্ঞ ছিলেন। এ ছাড়া সে যুগের একজন শিলালিপি–বিশেষজ্ঞ হিসেবেও তিনি পরিচিতি লাভ করেছিলেন। এই মাদ্রাসাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকজন উল্লেখযোগ্য পণ্ডিত ছিলেন জামাল আল-দীন আহমদ ইবন আলী আল-শিবি (৭৭৯-৮৩৭ হিজরি বা ১৩৭৮-১৪৩৩ খ্রিষ্টাব্দ)। শিলালিপি গবেষণায় তাঁর মৌলিক অবদানটি নিঃসন্দেহে শিলালিপিবিদ্যার পথের দিশারি। আল-শিবির পরিবারটি মক্কার সে যুগের একটি অতিপরিশীলিত ও সংস্কৃতিমনা পরিবার বলে গণ্য হতো। এই পরিবারের আরও অনেকে মক্কার বাঙালি মাদ্রাসায় পঠনপাঠন ও শিক্ষাদানের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে সংযুক্ত হয়েছিল।

মক্কার এই বাঙালি মাদ্রাসার সঙ্গে সংযুক্ত পণ্ডিত ও অধ্যাপকদের সম্পর্কে আল-ফাসি বেশ কিছু চমৎকার তথ্য পরিবেশন করে গেছেন। মাদ্রাসার সঙ্গে সংযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন কাজি (বিচারপতি) জামাল আল-দীন আহমাদ ইবনে আবদ-আল্লাহ আল-কারশি (মৃত্যু ৮১৭ হিজরি বা ১৪১৪ খ্রিষ্টাব্দ), শিহাব আল-দীন আবু’ল-খায়ের আহমাদ ইবন মুহম্মদ আল-সাগানি (মৃত্যু ৮২৫ হিজরি বা ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দ), কাজী মুহয়ি’ল-দীন’আবদ আল-কাদির আল-হুসাইনি আল-ফাসি (মৃত্যু ৮২৭ হিজরি বা ১৪২৪ খ্রিষ্টাব্দ) প্রমুখ মনীষী।

মক্কার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির চিন্তাধারা ছিল উদার। এখানে সব ধরনের ফিকহ বা ইসলামি মতবাদ পড়ানো হতো। বাংলার মাটিতে অনুসৃত আজম শাহের উদার নীতি ও খোলা মনের চিন্তাধারার জোয়ার সুদূর মক্কার বাঙালি মাদ্রাসার ওপরও প্রভাব ফেলেছিল। সে যুগের বিশ্বায়নে বঙ্গদেশও যে একটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিল, মক্কায় বাঙালি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শুধু কি তাই! গিয়াস আল-দীন আজম শাহের মৃত্যুর পর বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে অভ্যুদয় হওয়া নতুন একটি দেশীয় রাজপরিবারের কর্তা রাজা গণেশের ছেলে যদু (জালাল আল-দীন মুহম্মদ শাহ, রাজত্বকাল ১৪১৪-৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতানরূপে মসনদে আসীন হন। বাংলার মাটির এই খাঁটি বাঙালি সন্তান নিজেও মক্কার বাঙালি মাদ্রাসার জন্য যথেষ্ট সহায় সম্পত্তি ওয়াক্‌ফ করে পাঠান, যা মাদ্রাসা দুটিকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলে। কোনো কোনো ঐতিহাসিক সূত্রে এমনও ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে তিনি নিজেও মক্কা ও মদিনায় দুটি আলাদা মাদ্রাসা তৈরি করেছিলেন।