ফরিদউদ্দিন আত্তারের বিহঙ্গসভা: ৩০ পাখির রহস্য

‘দ্য কনফারেন্স অব দ্য বার্ডস, দ্য সিলেক্টেড সুফি পোয়েট্রি অব ফরিদউদ্দিন আত্তার’ প্রচ্ছদ  ও আত্তারের প্রতিকৃতি অবলম্বনেগ্রাফিকস প্রথম আলো

ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি সমবেত হচ্ছে এক বিশাল প্রান্তরে। ডানায় ডানায় আবৃত আকাশ। উড়ে আসছে বন পেরিয়ে। নদীর নির্মল প্রবাহ পেরিয়ে। পাহাড়ের প্রান্ত ঘেঁষে, রোদের কিরণে ভেসে। মরুপ্রান্তর পেছনে ফেলে উড়ে আসছে অগণিত পাখি। কেন এ মহাসম্মেলন? উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই আছে। তারও পেছনে আছে শূন্যতা। যে শূন্যতা, যে হাহাকার তাদের সমবেত করেছে।

তাদের একজন রাজা দরকার। সবার রাজা আছে। পশুদের আছে, মানুষেরও আছে। রাজা ছাড়া রাজ্য টেকানো দায়। আত্মপরিচয়ের পথে সৃষ্টি হয় সংকটের। শূন্যতার সূচনা সেখানেই। রাজা খুঁজতে হবে। মহাসমাগমের মূল উদ্দেশ্য এটাই। ভেতরের শূন্যতা তাড়না দেয় বাইরের রাজাকে সন্ধান করার।

রাজা মিলবে কোথায়? পাখিদের দলে প্রতিধ্বনিত হয় একই প্রশ্ন। উত্তর নেই জানা, ক্লান্ত নিথর ডানা। আচমকা এক বিজ্ঞ পাখি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

পাখির নাম হুদহুদ। নবী সোলায়মানের সঙ্গে এই পাখির একটা সংযোগসূত্র আছে। হুদহুদ নামের পক্ষী নবীর কাছে সংবাদ বহন করে আনত। সে সুবাদে দূরদেশ তার দেখা হয়েছে। হুদহুদ বলে:

‘রাজা তো আছেন, আমাদের অপেক্ষায়। শুধু প্রয়োজন অনুসন্ধান।’

চমকিত পাখিদের সমবেত প্রশ্ন:

‘কোথায় তিনি? কী নাম তাঁর?

পাড়ি দেব কোন পাহাড়?’

হুদহুদ শূন্যে তাকিয়ে উত্তর দেয়:

নাম তাঁর সিমুর্গ। কাফ পর্বতের ওপারে তাঁর সন্ধান মিলবে। কোনো এক কালে তাঁর রাজসিক পালকের একটি পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। সেই থেকে পাখিদের হৃদয়ে তার সুপ্ত স্মৃতি। অনুপস্থিতির অস্থির বেদনা।

হুদহুদ আরও বলল:

‘যদি চাও রাজাকে, তবে তার কাছে যেতে হবে। প্রয়োজন সুদীর্ঘ ভ্রমণ। একে একে সাতটি উপত্যকা করতে হবে অতিক্রম। প্রতি পর্যায়েই আছে নানান সংকট।’

মহাসম্মেলনের প্রথম বাধা এসে দাঁড়াল ঠিক এই জায়গাতেই। দূরত্বের দম, বিপদের ভয় আর অনিশ্চয়তার অতল অন্ধকার বাদ সাধল পাখিদের মনোবলে। একে একে উপস্থাপিত হলো তাদের অজুহাত।

বুলবুল গোলাপের প্রেমে বুঁদ। গোলাপের পাপড়িতে ভোরের শিশির বুলবুলের প্রাণে দেয় শীতলতা। রাত্রি নেমে এলে সে অন্ধকারের গান গেয়ে শোনায় গোলাপকে। তাই প্রেমের অজুহাতে সে অনিশ্চয়তাকে প্রত্যাখ্যান করে।

হুদহুদ বলে, ‘গোলাপের সৌন্দর্যের আসক্তি তোমাকে আটকেছে। সৌন্দর্যের ছায়ায় তুমি আটকে গেছ, তাই সৌন্দর্যের মূল উৎস তোমাকে টানছে না।’

তোতা মরতে চায় না। চিরকাল বেঁচে থাকার ইচ্ছা তাঁর। সিমুর্গের সন্ধানে কঠিন পথে যদি তার মৃত্যু আসে? এ ভয় তাকে তাড়া করে। তাই সে যেতে চায় না।

হুদহুদ তার উদ্দেশে বলে:

‘নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রেখে, অস্তিত্বের সীমা অতিক্রম করা যায় না। পুরোনো সত্তাকে আঁকড়ে ধরে, নতুন জন্ম পাওয়া যায় না।’

এমনই বিচিত্র সব অজুহাত পাখিদের। ঠিক যেন মানুষের মতো। কেউ পার্থিব আসক্তিতে আটক, কেউবা মৃত্যুভয়ে। কারও আছে ক্ষমতার দম্ভ, কারও বা প্রাচুর্যের প্রতাপ। তারা সবাই মনে মনে চায় সিমুর্গের সন্ধান, অথচ কাজেকর্মে ও ত্যাগে তার বৈপরীত্য। হুদহুদ কিছুক্ষণ নীরব রইল। সে জানে যে যুক্তি দিয়ে তাদের ভয় ভাঙানো যাবে না। উপদেশ দিয়ে মোহ-মায়া ছিন্ন করা যাবে না। কিছু সত্যবাণী গল্পের পথ ধরেই হৃদয়ে প্রবেশ করে।

ময়ূর হারানো অতীত নিয়ে হতাশায় কাতর। তার স্থান ছিল স্বর্গে। ভুলের মাশুল গুনতেই পৃথিবীতে তার বিচরণ। তার মনে শুধুই পুরোনো আবাসে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।

হুদহুদ তাকে জানায়:

‘অতীতের মোহ তোমার গন্তব্যের পথে বাধা। স্বর্গের স্বপ্ন তোমাকে স্বর্গের অধিপতির কাছে পৌঁছাতে দিচ্ছে না।’

হাঁস তার চিরচেনা পুকুরের পানিতে বিচরণ করতে অভ্যস্ত। এ পুকুর তার নিরাপদ আশ্রয়। তার পরিপূর্ণ পৃথিবীর নিরাপদ-নির্ভেজাল পরিবেশ সে ছাড়তে নারাজ।

হুদহুদ খণ্ডন করে:

‘তোমার সীমাবদ্ধতা তোমাকে মহাসমুদ্রের বিশালতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।’

বাজপাখির কণ্ঠে রাজকীয়তার অহংকার। বাদশাহি বাসিন্দা সে। বাদশাহর হাত তার নিরাপদ আশ্রয়। রাজদরবারের খাবার তার ক্ষুধা মেটায়। এ সম্মান ছেড়ে সে সিমুর্গের সন্ধানে উড়াল দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

হুদহুদ তাকে বুঝিয়ে দেয়:

‘ক্ষমতার ছায়া তোমাকে মহাসত্যের নৈকট্য থেকে আড়াল করছে।’

পেঁচা ভালোবাসে ধ্বংসস্তূপ। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে থাকা গুপ্তধন পাহারা দেয় সে। এসব ফেলে উড়াল দিতে তার যত গড়িমসি।

হুদহুদ মন্তব্য করে:

‘হৃদয়ের গুপ্তধন চাপা দিয়ে মাটির গুপ্তধন খুঁজে বেড়াচ্ছ তুমি।’

এমনই বিচিত্র সব অজুহাত পাখিদের। ঠিক যেন মানুষের মতো। কেউ পার্থিব আসক্তিতে আটক, কেউবা মৃত্যুভয়ে। কারও আছে ক্ষমতার দম্ভ, কারও বা প্রাচুর্যের প্রতাপ। তারা সবাই মনে মনে চায় সিমুর্গের সন্ধান, অথচ কাজেকর্মে ও ত্যাগে তার বৈপরীত্য।

হুদহুদ কিছুক্ষণ নীরব রইল। সে জানে যে যুক্তি দিয়ে তাদের ভয় ভাঙানো যাবে না। উপদেশ দিয়ে মোহ-মায়া ছিন্ন করা যাবে না। কিছু সত্যবাণী গল্পের পথ ধরেই হৃদয়ে প্রবেশ করে।

সবার উদ্দেশে তাই হুদহুদ এবার বলে ওঠে:

‘তোমরা যে ভয়, ভালোবাসা, মোহের অজুহাত দেখাচ্ছ, তার প্রতিটির একটি করে গল্প আছে। শোনো।’

সবাই এবার খুব আগ্রহ নিয়ে গল্পে মনোনিবেশ করে। হুদহুদের গল্প বলা শুরু হয়।

এক ভিখারি এক রাজার প্রেমে পড়ে। খবর রটে যায় রাজ্যজুড়ে। রাজদরবারে তাকে হাজির করা হয়। রাজা ভিখারিকে জানিয়ে দেয়, ‘পথ তোমার দুটি। মৃত্যু অথবা নির্বাসন। কোনটা নেবে?’

ভিখারি নির্বাসন বেছে নেয়। কিন্তু রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। কারণ, সত্যিকার ভালোবাসায় বিচ্ছেদ মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়োজনে মৃত্যুবরণ করা যেতে পারে। মৃত্যুভয় এ ক্ষেত্রে তুচ্ছ হওয়া চাই। নির্মম এক পরীক্ষা। মৃত্যুর বদলে নির্বাসনে গিয়ে বিচ্ছেদকে বরণ করার কারণে ভিখারি তার প্রেমের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলো। তাকে পেতে হলো শাস্তি।

পাখিসকল, তোমরাও ভেবে দেখো। সিমুর্গকে তোমরা সত্যিই চাও, নাকি শুধু তাকে পাওয়ার কথা ভাবতে ভালোবাসো? সিমুর্গের বিচ্ছেদবেদনা তোমাদের মৃত্যুভয়কে জয় করতে পেরেছে কি?

তবে একটা কথা, বন্ধুগণ, প্রেমে নিজেকে হারানোই শেষ কথা নয়। তোমরা যে রাজার সন্ধান করছ, তাকে দেখার জন্য দরকার অন্য এক দৃষ্টি। যে আয়নায় তোমরা তাকে দেখবে, সেটি ধুলোমাখা হলে সে পবিত্র প্রতিচ্ছবি কীভাবে দৃষ্টিগোচর হবে?

কোনো এক রাজ্যে একজন রাজা ছিলেন অতুল সুন্দর। খালি চোখে তার দিকে তাকানো মুশকিল। রূপের রওশনে চোখ ঝলসে যায়। তাঁর দিকে সরাসরি দৃষ্টিপাত করার সামর্থ্য কারও নেই। তাই একটা আয়না বানানো হয়। সবাই রাজাকে সেই আয়নায় দেখে। একইভাবে হৃদয়ও একটা আয়নার মতো। ধুলোয় ঢেকে গেলে, সত্যের প্রতিচ্ছবি আড়াল হয়ে যায়।

ধরে নিলাম, তোমরা আয়নায় জমে থাকা ধুলা সাফ করলে। এরপর আমিত্বকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কারণ নিজের আত্মমর্যাদা, সাধনার অহংকার তোমাদের পথে পাথর হয়ে দাঁড়াবে।

আত্মমর্যাদার কথা যেহেতু এল, একটি কাহিনি তোমাদের না বললেই নয়। বহু বছর আগের কথা। এমনই এক সাধক ছিলেন। চারশত শিষ্য তাঁর। জ্ঞান-গরিমা ও সম্মানে অতুলনীয়। স্বপ্ন দেখলেন একদিন, তিনি মূর্তি উপাসনা করছেন। এ স্বপ্ন তাঁর অস্থিরতা বাড়িয়ে তোলে। আদর্শের সঙ্গে এমন সাংঘর্ষিক স্বপ্ন দেখে অস্থির সাধক যাত্রা করেন। সঙ্গে নিয়ে যান শিষ্যদের।

ঘটনাক্রমে সাধক এক খ্রিষ্টান তরুণীর প্রেমে পড়েন। এ প্রেম তাঁর আত্মপরিচয় ভেঙে চুরমার করে দেয়। তরুণীর দেওয়া এমন সব শর্ত তিনি মেনে নেন যেগুলো তাঁর পূর্বপরিচয়ের সঙ্গে বেমানান। মদ্যপান থেকে মূর্তি উপাসনা—কিছুই বাদ থাকে না। এমনকি চারশত শিষ্যের গুরু একপর্যায়ে শূকরের পাল নিয়ে পথে পথে ঘুরতে থাকেন।

এভাবেই অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সেই সাধকের পবিত্রতার গর্ব ধ্বংস হয়। আত্মপরিচয়ের পতন হয়। আমিত্বের মৃত্যু ঘটে।

কোনো এক রাজ্যে একজন রাজা ছিলেন অতুল সুন্দর। খালি চোখে তার দিকে তাকানো মুশকিল। রূপের রওশনে চোখ ঝলসে যায়। তাঁর দিকে সরাসরি দৃষ্টিপাত করার সামর্থ্য কারও নেই। তাই একটা আয়না বানানো হয়। সবাই রাজাকে সেই আয়নায় দেখে। একইভাবে হৃদয়ও একটা আয়নার মতো। ধুলোয় ঢেকে গেলে, সত্যের প্রতিচ্ছবি আড়াল হয়ে যায়। ধরে নিলাম, তোমরা আয়নায় জমে থাকা ধুলা সাফ করলে। এরপর আমিত্বকে গুঁড়িয়ে দিতে হবে। কারণ নিজের আত্মমর্যাদা, সাধনার অহংকার তোমাদের পথে পাথর হয়ে দাঁড়াবে।

এদিকে শিষ্যরা ফিরে এসে শায়খের জন্য টানা ৪০ দিন আন্তরিক প্রার্থনায় মগ্ন থাকেন। একপর্যায়ে এক শিষ্যের স্বপ্নে আসে ঐশী ইঙ্গিত—শায়খের মোহ কেটে গেছে, তাঁর অন্তর আবার সত্যের দিকে ফিরেছে। শিষ্যরা ছুটে যান তাঁর কাছে। সত্যিই তা–ই। তাঁরা দেখেন, শায়খের অন্তরে পরিবর্তন এসেছে।

পুনর্জাগরণের পর শায়খ নিজের অবস্থা দেখে নিজেই ভেঙে পড়লেন। নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। ফিরে এলেন তাঁর পূর্বের সাধনার পথে। ক্ষমা চাইলেন ইবাদতের একমাত্র অধিকারীর কাছে।

শায়খের ফিরে যাওয়ার পর তরুণীর অন্তরেও যেন অদৃশ্য এক ঝড় বয়ে গেল। যে মানুষকে সে নিজের প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিল, তার ভেতরের সেই অদৃশ্য শক্তিই এবার তাকে আলোড়িত করতে শুরু করল। নিজের জীবনের পথ নিয়ে তার মনে জেগে উঠল নতুন প্রশ্ন। শেষ পর্যন্ত সে-ও শায়খের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল। হৃদয়ের সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন তাকে শায়খের পথের অনুসারী হতে প্রেরণা দিল।

সাধক যে আত্মমর্যাদার দেয়াল ভেঙেছিলেন, তার চেয়ে কঠিন একটি দেয়াল আছে। নিজের ভেতরের দেয়াল।

প্রিয় পক্ষীকুল, শোনো! যেখানেই উড়ে বেড়াও, যত দূর পাহাড়-মরুভূমিতে যাও, তোমার ভেতরের কুকুরটা তোমার সঙ্গ ছাড়বে না। তোমার সাথে সাথে সে–ও দৌড়াবে। সে হলো তোমার নফস। তোমার সত্যপথের বাধা। তোমার নিজের ভেতরের শত্রু। তার কাজ হলো, সাধু হলে সাধুতার গর্ব করা। এমনকি গরিব হলে ত্যাগস্বীকারের গর্ব করে বেড়ানো।

হুদহুদ সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকায়। এখনো অনেকের চোখে প্রশ্ন। কেউ কেউ হয়তো যাত্রাপথের হিসাব কষছে। হুদহুদ মৃদু হাসি দিয়ে বলল:

হে বিহঙ্গবৃন্দ, আমি জানি তোমাদের মনে কী প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তোমরা ভাবছ, যাত্রাপথের শেষ কোথায়। কত পথ পাড়ি দিতে হবে। কত ধৈর্য, কত দম দরকার হবে। এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে শায়খ মাহনার এক ভ্রমণকাহিনি থেকে।

একদিন শায়খ বের হয়েছিলেন সত্য তলবে। খোদাকে তিনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সাধনায়। কিন্তু তাঁর মনে শান্তি আসে না। মনে হয় যেন দিন দিন সত্যের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে। মরুভূমির রুক্ষ পথে হাঁটতে হাঁটতে এক সাধারণ বৃদ্ধ গ্রামবাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ। তাঁকে নিজের মনের দুঃখ জানালেন।

বৃদ্ধ লোকটি অতি সাধারণ। কিন্তু শুনিয়ে দিলেন অসাধারণ এক বাণী। তিনি বললেন, পাখির ঠোঁট দিয়ে এক হাজার বছরে একটা করে যবের দানা ফেলে তাবৎ পৃথিবী ভরাট করতে যে ধৈর্য লাগে, সত্যসন্ধানীর ধৈর্য তার বেশি হওয়া চাই। পথ চলো, সহ্য করো, পরিশুদ্ধ হও। ফলের কথা ভুলে যাও।

অতএব বিহঙ্গ ভ্রাতাসকল, শিক্ষক সব সময় মসজিদের মিম্বরে থাকেন না। বিরান মরুভূমির ধূলিধূসর গ্রামেও থাকেন। আর জ্ঞান তোমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারে। সে দরজা পার হতে লাগে আন্তরিক আত্মসমর্পণ, দ্বিধাহীন ধৈর্য।

দীর্ঘ বক্তব্য শেষে হুদহুদ কিছুক্ষণ নীরব থাকল। বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বয়ে গেল সুশীতল বাতাস। অজুহাতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পাখিদের মুখে আর কোনো কথা নেই। তাদের সবার মন মোড় নেয়। তবু এক পাখি ধীরে ধীরে জিজ্ঞাসা করল:

‘যদি আর না ফিরতে পারি?’

হুদহুদ তার দিকে তাকিয়ে মৃদুকণ্ঠে উত্তর দেয়:

‘ফিরে আসার পথ আগে করে নেওয়া মানে হলো, যাত্রা এখনো শুরুই হয়নি।’

পাখিদের আর কোনো অজুহাত অবশিষ্ট থাকল না। শেষমেশ হুদহুদের নেতৃত্ব সবাই মেনে নেয়। তাকে পথপ্রদর্শক মেনে যাত্রা শুরু হয়।

আকাশে ডানা মেলে হাজারো পাখি। যাত্রার শুরুতে সবার চোখেমুখে উত্তেজনা। কতশত প্রশ্ন তাদের মনে দোলা দিচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। একে একে সাতটি উপত্যকা অতিক্রম করে কাফ পর্বতে যেতে হবে।

উড়ন্ত পাখিরা প্রথম উপত্যকায় প্রবেশ করে। এ উপত্যকার নাম দেওয়া যায় অনুসন্ধানের উপত্যকা। চারপাশে অগণিত পথ। একেক পাখি একেক পথ বেছে নিতে চায়। কিন্তু এই জায়গায় পথিক পাখিকে তার পুরোনো নিশ্চয়তা বিসর্জন দিতে হবে। হুদহুদের সঙ্গে অজানা পথে এগোতে হবে সামনে। যারা এগিয়ে গেল, তারাই সত্যিকার অনুসন্ধানী।

দ্বিতীয় উপত্যকার নাম দেওয়া যায় প্রেমের উপত্যকা। যুক্তি যেখানে অকার্যকর। ক্লান্ত পাখিরা সেখানে উড়েই চলছে। রাজার প্রতি প্রেম প্রমাণ করতে সেই ভিখারির পরীক্ষার মতোই। যে পাখিরা বলেছিল, ‘কেন যাব?’ তাদের প্রশ্নের সুর পাল্টে হবে, ‘না গেলে কি বাঁচব?’ প্রেম এমন এক আগুন, যা পুরোনো পরিচয় পুড়িয়ে দেয়।

পাখিরা তৃতীয় উপত্যকায় প্রবেশ করে। এটার নাম গভীর জ্ঞানের উপত্যকা। পাখিদের উপলব্ধির আমূল পরিবর্তন আসে। যতই তারা জানতে শুরু করে, মনে হয়, ততই কম জানে। তারা বুঝতে পারল, সিমুর্গ কথায় সীমাবদ্ধ নয়। সত্যকে ভাষায় বন্দী করা যায় না।

চার নম্বর উপত্যকা হলো অনাসক্তির উপত্যকা। এখানে পাখিদের পুরোনো পরিচয়, গৌরব, আকাঙ্ক্ষা বিসর্জিত হয়। বাজপাখির রাজদরবারের স্মৃতি কিংবা বুলবুলের গোলাপে আসক্তি—কিছুই রইল না। পাখির সংখ্যা কমতে থাকে পর্যায়ক্রমে। কেউ কেউ ফেলে আসা উপত্যকায় হাল ছেড়ে দেয়।

আকাশে ডানা মেলে হাজারো পাখি। যাত্রার শুরুতে সবার চোখেমুখে উত্তেজনা। কতশত প্রশ্ন তাদের মনে দোলা দিচ্ছে, তার ইয়ত্তা নেই। একে একে সাতটি উপত্যকা অতিক্রম করে কাফ পর্বতে যেতে হবে। উড়ন্ত পাখিরা প্রথম উপত্যকায় প্রবেশ করে। এ উপত্যকার নাম দেওয়া যায় অনুসন্ধানের উপত্যকা। চারপাশে অগণিত পথ। একেক পাখি একেক পথ বেছে নিতে চায়। কিন্তু এই জায়গায় পথিক পাখিকে তার পুরোনো নিশ্চয়তা বিসর্জন দিতে হবে। হুদহুদের সঙ্গে অজানা পথে এগোতে হবে সামনে। যারা এগিয়ে গেল, তারাই সত্যিকার অনুসন্ধানী।

পঞ্চম উপত্যকার নাম একত্বের উপত্যকা। এখানে এসে ঘটল এক অভূতপূর্ব ঘটনা। পাখিরা আলাদা আলাদা পাখি হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। এখন তাদের মনে হচ্ছে, এ বিভাজন ছিল তাদের প্রথম ভ্রম। কোনো কিছুই যেন আর আলাদা নেই। বহুত্বের অন্তরালে ক্রিয়াশীল রয়েছে ঐক্য। সব ছায়া যেমন এক অন্ধকারে মিশে যায়।

ষষ্ঠ উপত্যকা বিস্ময়ের। পাখিরা এখানে এসে বিস্ময়ে বিভ্রান্ত হলো। জ্ঞান তাদের পথ দেখিয়েছিল। এখন সেই জ্ঞানই তাদের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিল। সত্যের সঙ্গে দূরত্ব যত কমে, ভাষা তত বেকার হয়ে যায়। এক পাখি জানতে চাইল, ‘আমরা কি ঠিক পথে আছি?’

আরেক পাখি বলল, ‘পথ কি আদৌ কোনো পথ?’

অন্য আরেকটি পাখি বলে, ‘সিমুর্গ কোথায়?’

হুদহুদ নীরব। কিছু প্রশ্নের উত্তর হয় না।

অবশেষে সপ্তম তথা শেষ উপত্যকায় পৌঁছাল মাত্র ত্রিশটি পাখি। এ উপত্যকা বিলয়ের। পাখিদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। না অর্জনের গৌরব, না পরিচয়ের নিশ্চয়তা। এমনকি ‘আমি সিমুর্গকে পাব,’ এ আশাটুকুও। কারণ, তাদের শেষ সম্পদটি ছিল ‘আমি’। এখন ‘আমি’ বলে আর কিছু নেই।

অগণিত পাখি থেকে মাত্র ত্রিশটি পাখি। ক্লান্ত, ক্ষতবিক্ষত। তারা কাফ পর্বতের দুর্গম প্রান্ত পেরিয়ে সিমুর্গের দরবারে প্রবেশ করে। নীরব, নিস্তব্ধ পরিবেশ। কোনো অতিরঞ্জিত আনুষ্ঠানিকতা নেই। অলৌকিক গর্জন নেই। তাদের সামনে ছিল এক অপূর্ব অপার্থিব দীপ্তি। তারা দেখতে পেল একটি আয়না। সেখানে ত্রিশটি পাখির সম্মিলিত প্রতিবিম্ব। মনে আছে সেই রূপবান রাজার কাহিনি? যাকে শুধু আয়নায় দেখা যেত? ঠিক সে রকমই।

এবার যেন শব্দের আড়ালে লুকিয়ে থাকা রহস্যটিও উন্মোচিত হলো। ফারসি ভাষায় ‘সি’ অর্থ ত্রিশ আর ‘মুর্গ’ অর্থ পাখি। অর্থাৎ ‘সিমুর্গ’ শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ‘ত্রিশ পাখি’র ইঙ্গিত।

ত্রিশটি পাখি নিজেদের মুখ দেখে হতবাক হয়ে গেল। তারা এত দিন যার খোঁজে, তিনি কখনো দূরে ছিলেন না। যাত্রা সিমুর্গের পানে নয়, নিজেদের আবরণ ভাঙার মিছিলের পানে ছিল। তারা নিজেদের থেকেই ছিল বিচ্ছিন্ন।

সিমুর্গ সাধারণ অর্থে ‘আমি’ নয়। তবে ‘আমি’ থেকে আলাদাও নয়। ব্যক্তিগত সব সীমাবদ্ধতা ভেঙে পাখিরা এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে অনুসন্ধানী ও অনুসন্ধানের বিষয়ের সীমারেখা মুছে গেছে। এটি এমন এক আত্মবিসর্জন, যেখানে অনুসন্ধানী ‘আমি’ নিজেই বদলে যায়।

‘সিমুর্গ কোথায়?’ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার মতো যে ‘আমি’ ছিল, তার কোনো অস্তিত্ব অবশিষ্ট রইল না।

তথ্যসূত্র:

ফরিদউদ্দিন আত্তার, মন্তিকুত তায়র (The Conference of the Birds), C. S. Nott-এর ইংরেজি রূপান্তর।