সংলাপ-বিতর্কেরও কি ইনসাফ আছে

অরিন্দম চক্রবর্তী ও ‘মহাভারত নাউ: ন্যারেশন, অ্যাসথেটিকস, এথিকস’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ভারতীয় দার্শনিক অধ্যাপক অরিন্দম চক্রবর্তীর প্রবন্ধ ‘জাস্ট ওয়ার্ডস: অ্যান এথিকস অব কনভারসেশন ইন দ্য মহাভারত’ পড়ার সময় প্রতি মুহূর্তে আমাদের হালের যাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বচন-শব্দ-বিতণ্ডা-বাহাস প্রসঙ্গে ভাবছিলাম। অরিন্দম চক্রবর্তী ও শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত মহাভারত নাউ: ন্যারেশন, অ্যাসথেটিকস, এথিকস গ্রন্থে প্রবন্ধটি মুদ্রিত হয়েছে। প্রবন্ধের গূঢ়ার্থ ও বহুবিধ ব্যঞ্জনাকে বচনে বা লিখনে প্রকাশ করার এলেম আমার আছে বলে মনে করি না। কিন্তু প্রবন্ধটি পড়তে পড়তে যে প্রসঙ্গগুলো জরুরি বলে মনে হয়েছে, সেগুলো নিজের সামান্য বোঝাপড়ার মাধ্যমে উপস্থাপন করার ইচ্ছা থেকেই এই লেখা। বহুস্তরবিশিষ্ট ব্যাখ্যাটি অনুধাবনের জন্য আগ্রহী ও নিবিড় পাঠকেরা অবশ্যই অরিন্দম চক্রবর্তীর মূল প্রবন্ধটি পড়ে নেবেন। লেখাটির সীমাবদ্ধতার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। সংলাপের ইনসাফ কামনা করছি।

ভূমিকা: সংলাপের বহুত্ববাদী অবয়ব ও দ্বিমুখী নৈতিকতা

মহাভারতের শান্তিপর্বের অন্তর্গত মোক্ষধর্মপর্বে রাজা যুধিষ্ঠির পিতামহ ভীষ্মের কাছে জানতে চান, একজন মানুষ কি রাজদণ্ড বা গৃহস্থজীবন পরিচালনা করেও পরম মুক্তি লাভ করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তর এবং একটি তাত্ত্বিক দৃষ্টান্ত হিসেবে ভীষ্ম রাজা জনক ও পরিব্রাজিকা সুলভার এই ঐতিহাসিক বাদ-সংবাদটি উপস্থাপন করেন (উৎসগত বিচারে ‘বাদ’ শব্দের অর্থ এখানে একপাক্ষিক জয়লাভের উদ্দেশ্যে করা বিতর্ক বা জল্প এবং ‘সংবাদ’ শব্দের অর্থ সম্যকরূপে তত্ত্বনিষ্ঠ আলোচনা বা পারস্পরিক শ্রদ্ধাপূর্ণ সংলাপ)। রাজা জনক নিজেকে সম্পূর্ণ আসক্তিমুক্ত এবং রাজসিংহাসনে থেকেও জীবন্মুক্ত পুরুষ বলে ঘোষণা করতেন। সুলভা নামের এক বিদুষী, যোগসিদ্ধ সন্ন্যাসিনী জনকের এই আধ্যাত্মিক খ্যাতির সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য তাঁর রাজসভায় আসেন এবং যোগবলের মাধ্যমে জনকের বুদ্ধিতে প্রবেশ করেন। এতে জনক মানসিকভাবে অত্যন্ত বিচলিত ও ক্রুদ্ধ হয়ে সুলভাকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করেন এবং তাঁর সন্ন্যাসব্রতের অসারতা নিয়ে দীর্ঘ তিরস্কারমূলক প্রলাপ বকেন।

রাজা জনকের এই মনস্তাত্ত্বিক বিকার ও আক্রমণাত্মক বাচনভঙ্গির প্রত্যুত্তরে সুলভা কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রকাশ না করে একটি নিরপেক্ষ বাক্যের গুণাগুণ-সংক্রান্ত তাত্ত্বিক মানদণ্ড উপস্থাপন করেন। তিনি স্পষ্ট করেন, বাক্য বা সংলাপ কেবল তখনই সত্য প্রকাশে সমর্থ হয়, যখন তা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও গুণান্বিত। অধ্যাপক অরিন্দম চক্রবর্তী তাঁর গবেষণামূলক প্রবন্ধে এই তাত্ত্বিক বিভাজনের জন্য সরাসরি পণ্ডিত রামচন্দ্র শাস্ত্রী কিঞ্জবডেকর সম্পাদিত, মহর্ষি বেদব্যাসের মূল শ্লোকসংবলিত মহাভারতের শান্তিপর্বের ৩২০তম অধ্যায়ের ৭৮ থেকে ৯১ নম্বর শ্লোক এবং এর ওপর সপ্তদশ শতকের প্রখ্যাত ভাষ্যকার পণ্ডিত নীলকণ্ঠ চতুর্ধরের ‘ভারতভাবদীপ’ নামক প্রাচীন টীকাকে আকর হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নীলকণ্ঠের এই টীকা অনুযায়ী, বাক্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নয়টি বাচিক দোষ এবং নয়টি অভিপ্রায়গত বা মানসিক দোষের বিভাজন রয়েছে; একই সঙ্গে একটি সামগ্রিকভাবে শুভ বাক্যে আঠারোটি গুণের সমাবেশ আবশ্যক বলা হয়েছে। এটিই এই সংলাপের প্রধান শিক্ষণীয় পরিপ্রেক্ষিত।

এই সংলাপের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো এর আত্মপ্রতিফলনমূলক চরিত্র। এখানে বক্তারা কেবল একটি আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে কথা বলছেন না; বরং কীভাবে কথা বলা উচিত এবং কথোপকথনের নৈতিক সীমা কী, তা নিয়েই আলোচনা করছেন। সংলাপটির প্রেক্ষাপট ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্মমার্গী গৃহস্থাদর্শ (রাজা জনক) বনাম শ্রমণপন্থী বৈরাগ্যবাদী সন্ন্যাসাদর্শের (সুলভা) এক ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে ধারণ করে। সুলভার মূল বার্তাটি ছিল—প্রকৃত সমদর্শিতা বা মুক্তি কখনো রাজদণ্ড বা ত্রিদণ্ডের মতো বাহ্যিক চিহ্নের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে মানসিক অহং ও বিকারের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির ওপর।

মহাভারতের সুবিশাল নৈতিক ও দার্শনিক গোলকধাঁধায় সংলাপ কেবল ভাববিনিময়ের মাধ্যম নয়; বরং তা মানুষের সমস্ত সামাজিক ও পারমার্থিক ক্রিয়াকলাপের জ্ঞানতাত্ত্বিক চালিকা শক্তি। অরিন্দম চক্রবর্তীর ‘জাস্ট ওয়ার্ডস: অ্যান এথিকস অব কনভারসেশন ইন দ্য মহাভারত’ প্রবন্ধটির মূল অন্বেষণ হলো—ভাষার সীমানা এবং মুখোমুখি আলাপের সমতা কীভাবে মানুষের চেতনার গভীরতম স্তরকে স্পর্শ করে? ছান্দোগ্য উপনিষদের বৈদিক প্রজ্ঞা থেকে শুরু করে রোমান চিন্তাবিদ সিসেরো কিংবা আধুনিক ইউরোপীয় দার্শনিক লেভিনাসের তত্ত্বকে সমান্তরালে এনে লেখক এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করেন যে ন্যায়-অন্যায়ের সূক্ষ্মতম বিভাজনরেখাগুলো সংলাপের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছাড়া কখনোই বাচনিক রূপ লাভ করতে পারে না।

বৈদিক যুগের যজ্ঞ-সংস্কৃতিতে যেমন আনুষ্ঠানিক আচারের পাশাপাশি যৌথ অন্বেষণ ও শাস্ত্রীয় বিতর্ক (সংবাদ) অপরিহার্য ছিল, মহাভারতেও সেই একই ধারা প্রবহমান। উগ্রশ্রবা যখন নৈমিষারণ্য থেকে ফিরে ঋষিদের কাছে জনমেজয়ের রাজসূয় যজ্ঞের গল্প শোনান, তখন তিনি মূলত একটি সংলাপের ভেতরে থাকা অজস্র প্রাচীনতর সংলাপেরই পুনরুত্থান ঘটান। কৃষ্ণ-অর্জুনের অলৌকিক কথোপকথন থেকে শুরু করে ধৃতরাষ্ট্র-সঞ্জয় কিংবা যুধিষ্ঠির ও বক-যক্ষের এই জটিল বাচনিক আদান-প্রদানগুলোর কারণেই সমগ্র ইতিহাসসংহিতাকে ‘জয়’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। তবে চক্রবর্তী এই নামকরণের অন্তরালে থাকা এক গভীর রূপক ও পরিহাসের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। কুরুক্ষেত্রের এই মহাযুদ্ধে জাগতিক অর্থে আদতে কেউ জেতেনি; সমস্ত উত্থান যেখানে পতনে এবং সমস্ত মিলন যেখানে বিরহে শেষ হয়, সেখানে এই মহাকাব্য মূলত মানুষের অস্তিত্বের এক পরম সংকটের আখ্যান। শব্দের এই যুদ্ধক্ষেত্রে জয়-পরাজয়ের প্রচলিত ধারণাগুলো ভেঙে যায় এবং নৈতিক সত্যের স্বরূপটি চিরকালের জন্য মানুষের বুদ্ধির গূঢ় অন্তরালে নিহিত থাকে।

মহাভারতীয় দর্শনের এই জটিলতাকে চক্রবর্তী ‘দ্বিপক্ষীয় নৈতিকতা’ (টু-সাইডেড মোরাল থিঙ্কিং) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। শান্তিপর্বের মোক্ষধর্মপর্বে ভীষ্ম স্পষ্ট করেই যুধিষ্ঠিরকে সতর্ক করেছিলেন যে রাজধর্ম কিংবা আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা কোনো একরৈখিক বা ‘একশাখাবিশিষ্ট’ ছকে বাঁধা তত্ত্ব নয়। এই অপরিহার্য দ্বিমুখিতা অনুধাবন করতে হলে মানুষকে ‘দ্বৈধজ্ঞ’ হতে হবে, অর্থাৎ একই সঙ্গে সংকটের দুটি বিপরীত স্রোতকে ধারণ করার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। মহাভারত কোনো মনোলিথিক বা একচেটিয়া সত্যের দাবিদারকে প্রশ্রয় দেয় না; বরং তা আমাদের এক মহৎ জ্ঞানতাত্ত্বিক সতর্কতার (এপিস্টেমিক কশন) মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

অরিন্দম চক্রবর্তী
ছবি: সংগৃহীত
সুলভা যে শব্দ-সাম্যের দর্শন (সেম্যান্টিক জাস্টিস) হাজির করেন, তা অত্যন্ত গভীর: ‘ভোক্তা বা বক্তা, শ্রোতা এবং বাক্য—এই তিনটি উপাদান যখন সমতার ভিত্তিতে (সমম্) অভীষ্ট অর্থের দিকে অগ্রসর হয়, তখনই সত্যের প্রকাশ ঘটে।’ চক্রবর্তী মহাভারতের শান্তিপর্বের ১৬৪তম অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন, মহাভারতে ‘নৃশংসতা’ বা ক্রূরতার প্রকৃত সংজ্ঞা হলো ‘অসম্বিভাগী’, অর্থাৎ ক্ষমতা ও সম্পদকে সমতার ভিত্তিতে ভাগ না করার মানসিকতা। জনক সংলাপে এই ক্ষমতার সমতা রক্ষা করতে না পারায় তাঁর বক্তব্য একধরনের ‘বাচনিক নিপীড়নে’ রূপ নিয়েছে।

আখ্যানের মনস্তাত্ত্বিক পটভূমি ও আধ্যাত্মিক অহংকার

শান্তিপর্বের ৩২০তম অধ্যায়ে এই তত্ত্বেরই এক চূড়ান্ত পরীক্ষা ঘটে। সেখানে শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মের কাছে যুধিষ্ঠির তাঁর চিরন্তন সংশয়টি পেশ করেন—একজন মানুষ কি গৃহস্থের দায়িত্ব পালন করে, রাজকীয় ঐশ্বর্যের কেন্দ্রে থেকেও মোক্ষ লাভ করতে পারেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্ম মিথিলার কিংবদন্তি রাজা জনক ও পরিব্রাজিকা সুলভার ঐতিহাসিক বাদানুবাদটি উপস্থাপন করেন। রাজা জনকের অপর নাম ছিল ‘ধর্মধ্বজ’। চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, এই নামটির ভেতরেই একধরনের আত্মবিজ্ঞাপন ও আধ্যাত্মিক দাম্ভিকতার বীজ নিহিত ছিল। জনক দাবি করতেন, তিনি ঋষি পঞ্চশিখের কাছ থেকে সাংখ্য দর্শনের পরম জ্ঞান লাভ করে রাজপ্রাসাদে থেকেও সম্পূর্ণ আসক্তিমুক্ত এবং একজন প্রকৃত জীবন্মুক্ত পুরুষ। তাঁর এই তাত্ত্বিক দাবির সত্যতা পরীক্ষা করতেই ভিক্ষুণী সুলভার রাজসভায় আগমন।

সুলভাকে মূল পাঠে ‘লঘ্বস্ত্রগতিগামিনী’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চক্রবর্তী বলেন, সুলভার এই বাহ্যিক দ্রুতগতি আসলে তাঁর ক্ষুরধার ও তীব্র বুদ্ধিরই রূপান্তর। তাঁর মন এই সংলাপে একটি অদৃশ্য অস্ত্রের (বুদ্ধি-অস্ত্র) মতো কাজ করেছিল। সুলভা যখন যোগবলে নিজের বুদ্ধি দিয়ে জনকের বুদ্ধির গভীরে প্রবেশ করে তাঁর মনস্তত্ত্ব নিরীক্ষণ করতে শুরু করেন, তখন পরম জ্ঞানী হিসেবে পরিচিত রাজা জনক মানসিকভাবে অত্যন্ত অরক্ষিত ও ক্রুদ্ধ বোধ করেন। ভীষ্ম এই আধ্যাত্মিক মিলনকে ‘একস্মিন্ অধিষ্ঠানে’ বা একটি একক আধারে সংঘটিত বলে উল্লেখ করেছেন। নীলকণ্ঠের প্রথাগত ব্যাখ্যাকে ছাপিয়ে চক্রবর্তী এখানে এক সুগভীর লৈঙ্গিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন—এই একক আধার কি আসলে পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্রক্ষমতা এবং অবদমিত নারীসুলভ স্পষ্ট বাচনভঙ্গির মধ্যকার এক চিরন্তন মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের প্রতীক নয়?

জনকের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা ও লৈঙ্গিক রাজনীতি

নিজের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও কামজ চাঞ্চল্য সুলভার নীরব পরীক্ষায় ধরা পড়ে যাওয়ায় রাজা জনক রাজসভায় চরম আক্রমণাত্মক ও অসংলগ্ন আচরণ শুরু করেন। মহাভারতের পরিভাষায় জনকের এই মানসিক অবস্থাকে ‘উৎস্ময়ন’ বা অবজ্ঞাসূচক দম্ভ বলা হয়েছে, যা আদতে তাঁর অবদমিত পুরুষতান্ত্রিক অহংকারেরই বহিঃপ্রকাশ। জনক সুলভাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাঁর সামাজিক পরিচয়, বয়স, রূপ ও গোত্র নিয়ে একের পর এক অপমানজনক প্রশ্ন করতে থাকেন।

তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে গিয়ে দাবি করেন, তাঁর চিত্ত চন্দন লেপনকারী এবং কুঠার দিয়ে হাত কেটে ফেলা ব্যক্তির প্রতি সমানভাবে উদাসীন। তিনি সন্ন্যাসীদের বাহ্যিক প্রতীককে—গেরুয়া বসন, মুণ্ডিত মস্তক কিংবা ত্রিদণ্ড বহন—তীব্রভাবে উপহাস করে বলেন, এগুলো মুক্তির কারণ হতে পারে না; বরং রাজদণ্ড ধারণ করে আসক্তিমুক্ত থাকাই প্রকৃত মোক্ষ। কিন্তু চক্রবর্তী জনকের এই উচ্চদার্শনিক বাগাড়ম্বরের ভেতরের ফাঁপা দিকটি উন্মোচিত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, জনক আসলে সুলভার যুবতী ও লাবণ্যময় শরীরের আকর্ষণে মোহিত হয়ে নিজের ভেতরের অবদমিত কামভাব সুলভার ওপর প্রক্ষেপণ করছিলেন। এই মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রান্তি থেকে জনক সুলভার বিরুদ্ধে চারটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক ও নৈতিক অভিযোগ আনেন:

বর্ণসংকর: সুলভা যদি ব্রাহ্মণ হন এবং জনক যেহেতু ক্ষত্রিয়, তবে যোগবলে জনকের অন্তরে প্রবেশ করে সুলভা বর্ণভেদ নষ্ট করছেন।

আশ্রমসংকর: সুলভা সন্ন্যাসাশ্রমের এবং জনক গৃহস্থাশ্রমের হওয়ায় এই দুই বিপরীত ধারার মিশ্রণ ঘটিয়ে সুলভা অধর্ম করছেন।

গোত্রসংকর: পরস্পরের গোত্রপরিচয় না জেনে এই মানসিক মিলন একধরনের নিষিদ্ধ অন্তর্বিবাহ বা গোত্রীয় পবিত্রতার লঙ্ঘন।

ধর্মসংকর বা ব্যভিচার: সুলভার স্বামী যদি কোথাও জীবিত থাকেন, তবে পরপুরুষের চিত্তে এভাবে প্রবেশ করা একধরনের প্রতারণা ও ব্যভিচার।

জনকের বক্তৃতাটি শেষ পর্যন্ত সুলভাকে ‘দুষ্টা’ (উইকেড ওম্যান) ও ছদ্মবেশী গণিকাসদৃশ আখ্যা দিয়ে এক চূড়ান্ত পুরুষতান্ত্রিক ক্রোধে পর্যবসিত হয়। তিনি অভিযোগ করেন, সুলভা তাঁর এই গুহ্য যোগশক্তির মাধ্যমে গোটা রাজসভাকে বশ করে এক অলৌকিক যৌন বিজয় (অকাল্ট সেক্সুয়াল ভিক্টরি) অর্জন করতে চান।

বাচনিক সমতা ও শব্দ-ন্যায়ের দর্শন

রাজা জনকের এই তীব্র বাচনিক আক্রমণ ও অপমানের মুখেও সুলভা কীভাবে সম্পূর্ণ নিস্পৃহ ও শান্ত রইলেন, চক্রবর্তী তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন। সুলভা জনকের ব্যক্তিগত কাদা-ছোড়াছুড়ির উত্তর সরাসরি না দিয়ে বিষয়টিকে একটি ‘সভ্য সংলাপের সাধারণ নিয়ম’ বা মেটা-ডিসকোর্সের দিকে ঘুরিয়ে দেন। সুলভার এই তাত্ত্বিক অবস্থানকে চক্রবর্তী ‘ভাষার রাজনৈতিক অর্থনীতি’ (পলিটিক্যাল ইকোনমি অব কনভারসেশন) হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। সুলভার মতে, যেকোনো অর্থপূর্ণ সংলাপে নয়টি বাচনিক দোষ (ব্লেমিশেস অব এক্সপ্রেশন) এবং নয়টি মানসিক দোষ (ব্লেমিশেস অব ইনটেন্ট) বর্জন করা বাধ্যতামূলক।

সুলভা নির্দেশিত বাচনিক দোষগুলোর মধ্যে বাক্‌বাহুল্য, ব্যাকরণগত ত্রুটি ও শব্দ-নিষ্ঠুরতার পাশাপাশি একটি অনন্য ধারণা রয়েছে, যাকে তিনি ‘পরান্মুখসুখম্’ বা ‘যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়াই একমাত্র সুখকর’ (অফেনসিভ ওয়ার্ডস) বলে বর্ণনা করেছেন। চক্রবর্তী দেখিয়েছেন, সুলভা নিজে জনকের কটুবক্তব্যকে ঠিক এই পদ্ধতিতেই মোকাবিলা করেছিলেন, তা থেকে নিজের মুখ ফিরিয়ে নিয়ে।

একই সঙ্গে সুলভা বক্তার মনের নয়টি কু-অভিপ্রায় বা মনস্তাত্ত্বিক ত্রুটি চিহ্নিত করেন, যা মূলত জনকের নিজের বক্তব্যেরই একটি নিখুঁত মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ:

কাম (রেজ) ও ক্রোধ (রেজ): জনকের সুলভার শরীরবিষয়ক বয়ান ও ‘দুষ্টা’ সম্বোধনে যা স্পষ্ট।

ভয় (ফিয়ার) ও লজ্জা (শেইম): সভায় সবার সামনে নিজের আসল রূপ প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ভয় ও রাজত্ব হারানোর আশঙ্কা।

লোভ (গ্রিড) ও অহমিকা (কনসিট): নিজের জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া।

দীনতা (ডিফিডেন্স), করুণা (পিটি) ও আত্মশ্লাঘা (ইগোটিজম): নিজেকে একমাত্র যোগ্য মোক্ষ-বক্তা ভাবা।

এর বিপরীতে সুলভা যে শব্দ-সাম্যের দর্শন (সেম্যান্টিক জাস্টিস) হাজির করেন, তা অত্যন্ত গভীর:

‘ভোক্তা বা বক্তা, শ্রোতা এবং বাক্য—এই তিনটি উপাদান যখন সমতার ভিত্তিতে (সমম্) অভীষ্ট অর্থের দিকে অগ্রসর হয়, তখনই সত্যের প্রকাশ ঘটে।’

চক্রবর্তী মহাভারতের শান্তিপর্বের ১৬৪তম অধ্যায়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখিয়েছেন, মহাভারতে ‘নৃশংসতা’ বা ক্রূরতার প্রকৃত সংজ্ঞা হলো ‘অসম্বিভাগী’, অর্থাৎ ক্ষমতা ও সম্পদকে সমতার ভিত্তিতে ভাগ না করার মানসিকতা। জনক সংলাপে এই ক্ষমতার সমতা রক্ষা করতে না পারায় তাঁর বক্তব্য একধরনের ‘বাচনিক নিপীড়নে’ রূপ নিয়েছে।

এই ক্ষণভঙ্গুর শরীরে লিঙ্গ বা জাতিকে কেন্দ্র করে ‘নির্ধারণবাদ’ (ডিটারমিনিজম) আরোপ করা কোনো প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞের কাজ হতে পারে না। চোখ নিজেকে দেখতে পায় না, কান নিজেকে শুনতে পায় না। যদি আত্মার কথা বলা হয়, তবে আত্মা এক, অদ্বিতীয় এবং লিঙ্গ-জাতি-কুলবিবর্জিত। চক্রবর্তী প্রশ্ন তোলেন: যদি সমস্ত আত্মাই এক হয়, তবে পুরুষ-নারী বা রাজা-সন্ন্যাসীর এই কৃত্রিম সামাজিক বিভেদ জনককে কেন এত মানসিকভাবে আলোড়িত করবে?

আঠারোটি বাক্যগুণ

উৎস: মহাভারত, শান্তিপর্ব, অধ্যায় ৩২০, শ্লোক ৭৮–৯১ এবং নীলকণ্ঠের ‘ভারতভাবদীপ’ টীকা (কিঞ্জবডেকর সংস্করণ, ১৯৭৯)

সুলভার তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি আদর্শ জ্ঞানতাত্ত্বিক আলাপে যে আঠারোটি বাচিক ও উপস্থাপনগত গুণের সমাবেশ ঘটে, তা নিচে অর্থসহ উল্লেখ করা হলো:

১. সূক্ষ্মতা: বাক্যের অর্থ উপরিতলীয় বা স্থূল হবে না; শব্দের গভীরতম স্তরকে স্পর্শ করবে।

২. যথার্থ গণনা: আলোচনার বিষয়বস্তুর পক্ষে ও বিপক্ষে যতগুলো যুক্তি বা বিভাগ আছে, তা নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত করা।

৩. ক্রম: যত্রতত্র প্রসঙ্গ পরিবর্তন না করে কোন যুক্তির পর কোন যুক্তি আসবে, সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা।

৪. নির্ণয়: বিষয়কে সংশয়ে আটকে না রেখে পূর্বাপর বিচার শেষে একটি অকাট্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।

৫. উদ্দেশ্য: সংলাপের পেছনে বক্তার উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ সৎ ও স্পষ্টভাবে ঘোষিত থাকা।

৬. অর্থপূর্ণতা: বাক্যটি যেন তার অভিপ্রেত অর্থ প্রকাশে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়; কোনো অংশ যেন বাদ না পড়ে।

৭. সুসংহত অভিপ্রায়: বাক্যের ভেতরে বা একাধিক বাক্যের মধ্যে কোনো স্ববিরোধিতা না থাকা।

৮. যৌক্তিকতা: সংলাপের প্রতিটি বাক্য যেন যুক্তিশাস্ত্রের নিয়ম ও নৈতিক মানদণ্ড দ্বারা অনুমোদিত হয়।

৯. পরিমিতি: প্রয়োজনের অতিরিক্ত বা অনর্থক কোনো শব্দ ব্যবহার না করা; বাচালতামুক্ত কথন।

১০. অন্যূনতা: ভাব প্রকাশের জন্য যতটুকু ভাষার প্রয়োজন, তার চেয়ে কম না বলা; বাক্য যেন খণ্ডিত না হয়।

১১. মাধুর্য: বাচনিক ভঙ্গি যেন কর্কশ বা রূঢ় না হয়ে অত্যন্ত মার্জিত, সুষম ও চারুত্বপূর্ণ হয়।

১২. স্পষ্টতা: শ্রোতার মনে কোনো ধরনের দ্ব্যর্থতা বা অস্পষ্টতা তৈরি না করে অর্থকে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তোলা।

১৩. অর্থবত্তা: প্রতিটি উচ্চারিত শব্দ যেন কোনো না কোনো গভীর ভাব বা বস্তুনিষ্ঠ অর্থ বহন করে।

১৪. শুদ্ধতা: ভাষা হবে অপভ্রংশহীন এবং ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী সম্পূর্ণ শুদ্ধ ও মার্জিত।

১৫. মধুরত্ব: শব্দের প্রাঞ্জলতা, যা শ্রোতার মনে কোনো ধরনের বিরক্তি বা ক্ষোভ তৈরি না করে মনোযোগ ধরে রাখে।

১৬. প্রসাদ: বাক্য শোনামাত্রই যেন শ্রোতার বুদ্ধিতে তার অর্থ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে।

১৭. ওজঃ: বাক্যের ভেতরের ওজস্বিতা বা তেজ, যা সত্যকে অত্যন্ত দৃঢ় ও বলিষ্ঠভাবে প্রকাশ করতে সাহায্য করে।

১৮. সাম্য বা সমতা: যেখানে বক্তা, শ্রোতা ও বাক্য—এই তিন উপাদানই অর্থের সমান অংশীদারত্ব লাভ করে।

আঠারোটি বাক্যদোষ

উৎস: মহাভারত, শান্তিপর্ব, অধ্যায় ৩২০, শ্লোক ৮২–৯০ এবং নীলকণ্ঠের ‘ভারতভাবদীপ’ টীকা (কিঞ্জবডেকর সংস্করণ, ১৯৭৯)

অধ্যাপক চক্রবর্তীর ব্যবহৃত আকর-উৎস অনুযায়ী, এই আঠারোটি দোষকে বাচিক ও অভিপ্রায়গত বা মানসিক—এই দুটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে:

নয়টি বাচিক দোষ

১. বাচালতা: অপ্রয়োজনীয় কথার বিস্তার, যা মূল বক্তব্যকে হালকা বা অযথা দীর্ঘ করে।

২. অশ্লীলতা: এমন কুরুচিপূর্ণ বা রূঢ় শব্দ প্রয়োগ, যা শুনলে শালীন মানুষের মন তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

৩. অসত্য: বাস্তব সত্যকে আড়াল করে বিভ্রান্তিকর বা মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করা।

৪. ত্রিবর্গ-বৈপরীত্য: মানবজীবনের তিনটি মূল অন্বেষণকে—ধর্ম, অর্থ ও কাম—যা একযোগে আঘাত করে বা লঙ্ঘন করে।

৫. অসংস্কৃতত্ব: ব্যাকরণহীন, অপভাষিক বা অমার্জিত শব্দের ব্যবহার, যা ভাষার স্বাভাবিক রূপ নষ্ট করে।

৬. ন্যূনতা: এত কম বা অসম্পূর্ণ কথা বলা যে শ্রোতা বক্তার মূল ভাবটি উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন।

৭. কৃত্রিম জটিলতা: সরলভাবে কথা না বলে জোর করে এমন সব জটিল বাক্যাংশ তৈরি করা, যা শ্রোতাকে ক্লান্ত করে।

৮. অহংকারী উক্তি: সংলাপের স্বাভাবিক নিয়ম ও শালীনতার শৃঙ্খলা ভেঙে, অথবা নিজের পালার বাইরে গিয়ে উদ্ধতভাবে কথা বলা।

৯. অযৌক্তিকতা: মূল আলোচনা থেকে বিচ্যুত হয়ে কুযুক্তি দেওয়া কিংবা অপ্রাসঙ্গিক প্রলাপ বকা।

নয়টি অভিপ্রায়গত দোষ

১. কাম: সংলাপের আড়ালে কোনো শারীরিক বা কামজ লালসার অভিপ্রায় ও বিকার লুকিয়ে থাকা।

২. ক্রোধ: সত্য অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য ভুলে প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগতভাবে অপমান বা দমন করার হিংস্র জেদ।

৩. ভয়: প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্বে সন্ত্রস্ত হয়ে নিজের ক্ষমতা বা মর্যাদা হারানোর অমূলক ভীতি ও সন্দেহপ্রবণতা।

৪. লোভ: নিজের পাণ্ডিত্য প্রকাশ বা বিপণন করে পার্থিব লাভ, খ্যাতি বা সস্তা প্রতিপত্তি পাওয়ার হীন উদ্দেশ্য।

৫. ক্ষুদ্রতা: নিজের তত্ত্ব বা বিশ্বাসের ওপর গভীর আস্থা না থাকায় একধরনের হীনম্মন্যতা নিয়ে কথা বলা।

৬. অহংকার: ‘আমার চেয়ে বড় জ্ঞানী বা মুক্তপুরুষ কেউ নেই’—এমন তীব্র অহংবোধচালিত উক্তি।

৭. লজ্জা: জনসমক্ষে নিজের অবদমিত আকর্ষণ বা ছদ্ম-আচরণ ধরা পড়ে যাওয়ার পর তা ঢাকার জন্য উল্টো প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা।

৮. ছদ্ম-করুণা: প্রতিপক্ষকে মানসিক ও তাত্ত্বিকভাবে ছোট দেখানোর উদ্দেশ্যে তার প্রতি অনাবশ্যক বা ছদ্ম-দয়া প্রদর্শন করা।

৯. দম্ভ: নিজের রাজপদ, বংশগরিমা বা মর্যাদার মিথ্যা বড়াইয়ে অন্ধ হয়ে অন্যের স্বাধীন অস্তিত্বকে অস্বীকার করা।

ব্যক্তিগত পরিচয়ের অবিনির্মাণ ও প্রোটো-বৌদ্ধ ক্ষণভঙ্গুরতাবাদ

জনক যখন বারবার সুলভাকে ‘তুমি কে?’ বলে সামাজিক পরিচয়ের খোঁটা দিচ্ছিলেন, তখন সুলভা সেই প্রশ্নটির এক আমূল দার্শনিক অবিনির্মাণ (ডিকনস্ট্রাকশন) ঘটান। চক্রবর্তী ব্যাখ্যা করেছেন, সুলভার এই উত্তর মূলত প্রাচীন ভারতের একটি স্বতন্ত্র, প্রাক্-বৌদ্ধ (প্রোটো-বৌদ্ধিস্ট) এবং আদি সাংখ্য দর্শনের অনাত্মবাদকে (নো-সেলফ ভিউ) নির্দেশ করে। সুলভা বলেন, এই দৃশ্যমান জগৎ ও মানুষের শরীর আসলে পঞ্চভূত ও ইন্দ্রিয়ের এক-একটি সাময়িক ‘সংঘাত’ বা জড় উপাদানের সমষ্টি (অ্যামালগাম) মাত্র।

সুলভা মানুষের ভ্রূণাবস্থা থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত শরীরের রূপান্তরের একটি ধারাবাহিক বিবরণ দেন। মাতৃগর্ভে শুক্র ও শোণিতের মিলনে প্রথমে ‘কলল’, তারপর ‘বুদ্‌বুদ’, তারপর ‘পেশি’ এবং শেষে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ ঘটে। জন্মগ্রহণের পর শৈশব, যৌবন ও বার্ধক্যের প্রতিটি স্তরে শরীরের ভেতরের কোষগুলো এত সূক্ষ্ম ও ক্ষণস্থায়ীভাবে পরিবর্তিত হয় যে তা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না। সুলভা একে একটি ‘স্থির দীপশিখা’র সঙ্গে তুলনা করেছেন, যা আপাতদৃষ্টিতে অপরিবর্তিত মনে হলেও প্রতি মুহূর্তে নতুন তেলের দহন ও পুরোনো তেলের বিনাশের মাধ্যমে এক নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ তৈরি করে।

এই ক্ষণভঙ্গুর শরীরে লিঙ্গ বা জাতিকে কেন্দ্র করে ‘নির্ধারণবাদ’ (ডিটারমিনিজম) আরোপ করা কোনো প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞের কাজ হতে পারে না। চোখ নিজেকে দেখতে পায় না, কান নিজেকে শুনতে পায় না। যদি আত্মার কথা বলা হয়, তবে আত্মা এক, অদ্বিতীয় এবং লিঙ্গ-জাতি-কুলবিবর্জিত। চক্রবর্তী প্রশ্ন তোলেন: যদি সমস্ত আত্মাই এক হয়, তবে পুরুষ-নারী বা রাজা-সন্ন্যাসীর এই কৃত্রিম সামাজিক বিভেদ জনককে কেন এত মানসিকভাবে আলোড়িত করবে?

১ / ৬
বচন ও বাচনিকতার ইনসাফগ্রাফিকস সহযোগিতা: এআই
মহাভারতের এই আখ্যানটি আমাদের শেখায়, সংলাপ যখন ক্ষমতার দম্ভ, কাম, ক্রোধ বা ভয় থেকে মুক্ত হয়ে মুখোমুখি সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখনই তা সমাজকে ধরে রাখতে (ধর্ম) সাহায্য করে। শব্দের যেমন সমাজকে ধ্বংস করার বা যুদ্ধ বাধানোর ক্ষমতা আছে, তেমনি মানুষের অহংকার বিসর্জন দিয়ে পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সমাজকে পুনর্গঠন ও শান্তি স্থাপনের ক্ষমতাও কেবল ‘শব্দ’ বা সার্থক সংলাপেরই রয়েছে।

রাজধর্মের পরাধীনতা ও সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্যবাদী যুক্তি

জনকের রাজকীয় অহংকারকে চূর্ণ করতে সুলভা সার্বভৌম রাজপদের তথাকথিত ‘স্বাধীনতা’র ধারণাকে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে ব্যবচ্ছেদ করেন। তিনি দেখান, একজন রাজা আসলে ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দাস। রাজা সমস্ত পৃথিবীর অধিপতি দাবি করলেও তিনি একটি প্রাসাদের একটি শয়নকক্ষের একটি শয্যায় ঘুমান, যার অর্ধেক আবার রানিকে ছেড়ে দিতে হয়।

রাজার জীবন প্রতি মুহূর্তে দ্বিধা ও আশঙ্কায় ভরা। রাজকোষ থেকে দান করলে কোষাগার শূন্য হয়, আর দান না করলে প্রজারা শত্রু হয়ে ওঠে। রাজার নিজস্ব বলতে কোনো স্বাধীন সময় নেই; তিনি কখন খাবেন, ঘুমাবেন বা স্নান করবেন, তা অন্যের নির্দেশ বা প্রজার প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে। অথচ সাধারণ প্রজারা প্রত্যেকে নিজের ঘরের রাজা ও স্বাধীন নিয়ন্তা। রাজ্যে বিপর্যয় ঘটলে রাজাও সাধারণ মানুষের মতোই শোকে আকুল হন। অতএব এই রাজত্ব খড়ের আগুনের মতো ক্ষণস্থায়ী এবং জলবিন্দুর মতো অসার। সুলভা জনককে বলেন, আপনি আসলে মুক্তির চটকদার গল্প বলেন; তাই আপনি একজন ‘মোক্ষবার্তিক’ (মোক্ষ-বক্তা)।

জনকের বর্ণসংকর ও অশুচিতার ভয়ের উত্তরে সুলভা ‘সম্পর্কের স্বাতন্ত্র্যবাদী যুক্তি’ (আর্গুমেন্ট ফ্রম ডিসক্রিটনেস) হাজির করেন, যা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ দার্শনিক ধর্মকীর্তির দর্শনে দেখা যায়:

‘হাতের মধ্যে একটি পাত্র আছে, পাত্রের ভেতর দুধ আছে, আর দুধের ওপর একটি মাছি বসে আছে। এরা একসঙ্গে অবস্থান করলেও পাত্র কখনোই দুধের সঙ্গে মিশে যায় না, আর দুধও মাছির প্রকৃতি ধারণ করে না।’

ঠিক তেমনি, সুলভা যোগবলে জনকের বুদ্ধির আধারে প্রবেশ করলেও পদ্মপাতায় জলের বিন্দুর মতো তিনি সম্পূর্ণ অস্পৃশ্য, নিস্পৃহ ও স্বতন্ত্র থাকেন।

সুলভার নিস্পৃহ প্রস্থান ও জ্ঞানতাত্ত্বিক নীরবতা

বক্তব্যের শেষে সুলভা কোনো ধরনের আত্মশ্লাঘা ছাড়াই নিজের প্রকৃত বংশপরিচয় দেন। তিনি জানান, তিনি ‘প্রধান’ নামক এক মহান রাজর্ষির বংশে জন্মগ্রহণকারী ক্ষত্রিয় কন্যা। উপযুক্ত পাত্রের অভাব এবং মোক্ষধর্মের প্রতি অনুরাগের কারণে তিনি আজীবন অবিবাহিত থেকে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেছেন।

সুলভা স্পষ্ট করে বলেন, তিনি নিজের শ্রেণির বড়াই করতে বা জনককে লজ্জিত করতে আসেননি। তিনি সম্পূর্ণ আন্তরিকতা ও ঋজুতা (আর্জব) থেকে সত্যের অনুসন্ধান করতে এসেছেন। একজন প্রকৃত মুক্তপুরুষ কখনোই কেবল জয়লাভের উদ্দেশ্যে বাদানুবাদে অংশ নেন না। সুলভা বলেন, একজন সন্ন্যাসী যেমন কোনো শূন্য বা পরিত্যক্ত গৃহে এক রাতের জন্য আশ্রয় নেন, ঠিক তেমনি তিনি জ্ঞানশূন্য রাজা জনকের এই শরীরে এক রাতের জন্য বৌদ্ধিক আশ্রয় নিয়েছেন এবং পরদিন সকালে নিস্পৃহভাবে প্রস্থান করবেন।

ভীষ্মের বর্ণনা অনুযায়ী, সুলভার এই সুযুক্তিপূর্ণ, গম্ভীর ও অকাট্য বক্তব্য শোনার পর রাজা জনক সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে যান। ন্যায়শাস্ত্রের পরিভাষায় একে ‘অপ্রতিভা’ বলা হয়—অর্থাৎ পরাজয়ের গ্লানিতে উত্তর খুঁজে না পেয়ে মাথা নত করে আঙুল দিয়ে মাটিতে দাগ কাটার অবস্থা।

পরিশেষে...

মহাভারতের এই আখ্যানটি আমাদের শেখায়, সংলাপ যখন ক্ষমতার দম্ভ, কাম, ক্রোধ বা ভয় থেকে মুক্ত হয়ে মুখোমুখি সমতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখনই তা সমাজকে ধরে রাখতে (ধর্ম) সাহায্য করে। শব্দের যেমন সমাজকে ধ্বংস করার বা যুদ্ধ বাধানোর ক্ষমতা আছে, তেমনি মানুষের অহংকার বিসর্জন দিয়ে পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সমাজকে পুনর্গঠন ও শান্তি স্থাপনের ক্ষমতাও কেবল ‘শব্দ’ বা সার্থক সংলাপেরই রয়েছে।

চক্রবর্তীর মতে, চূড়ান্ত মোক্ষে সমস্ত নৈতিক দ্বৈততা বা বাইনারি অবলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু তার আগে স্বয়ং রাজা জনককে যেমন সুলভার মাধ্যমে ‘নিজের মোক্ষ বা মুক্তি’র অহংকার থেকেই মুক্ত হতে হয়েছিল, ঠিক তেমনি আমাদেরও সমস্ত একরৈখিক চিন্তার বাইরে গিয়ে সংলাপের এই বহুত্ববাদী ও দ্বিপক্ষীয় রূপটিকে গ্রহণ করতে হবে। একমাত্র তবেই আমরা একটি স্বনিয়ামক, সহনশীল ও মানবিক সমাজের ভিত্তি স্থাপন করতে পারব।

তথ্যসূত্র

  • চক্রবর্তী, এ. (২০১৪)। জাস্ট ওয়ার্ডস: অ্যান এথিকস অব কনভারসেশন ইন দ্য মহাভারত। এ. চক্রবর্তী ও এস. বন্দ্যোপাধ্যায় (সম্পা.), মহাভারত নাউ: ন্যারেশন, অ্যাস্থেটিকস, এথিকস (পৃ. ২৪৪–২৮২)। রাউটলেজ।

  • কিঞ্জাভাডেকর, আর. এস. (সম্পা.)। (১৯৭৯)। দ্য মহাভারত: ভলিউম ৫। শান্তিপর্ব (নীলকণ্ঠ চতুর্ধর-প্রণীত ‘ভারতভাবদীপ’ ভাষ্যসহ)। ওরিয়েন্টাল বুকস রিপ্রিন্ট সার্ভিসেস।