লালনের গোষ্ঠগানে গোপাল প্রেম ও বিচ্ছেদ বন্দনা
রাধা-গোবিন্দ শব্দবন্ধের মতনই গোপাল-যশোদা শব্দবন্ধটিও কৃষ্ণ–ভক্তদের কাছে অতি প্রিয়, সুমধুর, মিষ্টি। রাধা-গোবিন্দর প্রেমের মাঝে জীবাত্মা আর পরমাত্মা একাকার হয়ে যায়। ভগবান এবং ভক্তের মাঝের সীমারেখা তখন লীন-বিলীন হয়ে পড়ে। ঈশ্বরের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক কেমন হবে তার সর্বোচ্চ ধাপ এই প্রেমময় স্তরটি। স্বয়ং ঈশ্বর মনুষ্যরূপ ধারণ করে ভক্তের চরণ স্পর্শ করতে চাইলে, ভক্ত বুঝতে পারে না এর তুল্য তপস্যা সে কি করেছে এই জনমে কিংবা আর জনমে? চণ্ডীদাসের পদে রাঁধার মনের এভাবে ধরা দেয়:
‘এ কথা কহিবে সই এ কথা কহিবে,
অবলা এমন তপঃ করিয়াছে কবে?
পুরুষ-পরশমণি নন্দের কুমার,
কী ধন লাগিয়া ধরে চরণে আমার।’
— চণ্ডীদাস
পঞ্চরসের হাঁড়ি ফুঁড়ে মোক্ষলাভ
বৈষ্ণব দর্শনে যে পাঁচটি রসের উল্লেখ আমরা পাই, সেটা ধাপে ধাপে ঈশ্বরকে পাবার রাস্তা বাতলে দেয়। এই রাস্তার সর্বশেষ বা চূড়ান্ত গন্তব্য হলো এই প্রেমের স্তর, বড় মধুর বড় মায়াময় এ রূপ। জীবাত্মা-পরমাত্মার মহামিলনের এই মাধুর্য রসই জীবনে মোক্ষ এনে দেয়। ভগবান যে কেবল প্রেমিক হয়েই ধরা দেন তা নয়, তিনি নানারূপে ভক্তের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আসেন। মাধুর্যরসের এক–দুই ধাপ নিচে নামলে পাওয়া যায় চতুর্থরস, বাল্যলীলা বা বাৎসল্য রস এবং তৃতীয় রস সখ্যরস। এই বিশেষ দুই রস আস্বাদনের নিমিত্ত আজকের এই লেখাটি, যার মাধ্যমে শ্রীকৃষ্ণে-লীলার গুহ্য অর্থ প্রকাশ করে এক মায়াময় ঘোর সৃজিত হয়। গোপাল-যশোদার সম্পর্ক, মান–অভিমান পর্ব, সর্বোপরি মায়ের অপত্যস্নেহে ঈশ্বরের বেড়ে ওঠার পর্বটি কেমন তা নির্ণয় করার পাশাপাশি সখা গোপালের বন্ধুদের সঙ্গে ভাগে–যোগে আহার-বিহারের আলাপ উঠে এসেছে আজকের এই সংক্ষিপ্ত ভাষণে। বালকদের সাথে গরু (ধেনু) চরাতে গিয়ে শিশুসুলভ খেলা—লীলা, লুকালুকি, কাঁধে চড়া, ঝগড়াঝাঁটির সূত্র ধরে মাকে নালিশ করার মধ্য দিয়ে যে কেবল তাঁর বালখিল্য প্রকাশ পেয়েছে তা নয় গৌড় নিতাই হয়ে লালন সাঁইয়ের গোষ্ঠ সংগীতের যে পরম্পরা, তার সুতা ধরে আলাপ চালাতে চালাতে বোঝা যাবে অতি সাধারণের ভেতর দিয়েই ঈশ্বর ধরাধামে প্রকাশিত হন। বৈষ্ণব দর্শনের পঞ্চরস অমোঘ হয়ে ধরা দিয়েছে এই লেখায়। তাই নদীয়া ঢুকে পড়েছে পাশাপাশি বৃন্দাবনকেও রাখা হয়েছে—নইলে পুরোটা আসে না।
অর্থাৎ লেখার মূল বিষয় গোপাল-যশোদা অর্থাৎ কিনা ঈশ্বর-জীবের মধ্যে পাল্য-পালক সম্বন্ধ আর বলাই, শ্রীদাম, সুবল প্রভৃতি বাল্যসখাদের সঙ্গে প্রভুর মিলন পর্ব।
গোষ্ঠগানের তালে তালে আলোচনা বেগ পেয়েছে। এতে দৃশ্যকল্প তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে পাঠকের ঘটনা পরম্পরা বুঝতে সহায়ক হবে, আবার লেখাটি সুখপাঠ্যও হবে। গোষ্ঠ গানগুলো গড়ে উঠেছে গোপালের যে বিশেষ পর্ব নিয়ে, সেখানে বাৎসল্য রস আর সখ্যরস মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। পঞ্চরসের দুটি রস যথাক্রমে শান্ত এবং দাস্য—এগুলো অতিক্রান্ত হয়ে ক্রমে ভক্ত উভয়ই সখ্য, বাৎসল্য এবং মাধুর্য—এই তিনটি রসের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে ঈশ্বরের আরও নিকটবর্তী হতে থাকে। এবং ভক্ত ক্রমে ক্রমে সখারূপে, মাতৃরূপে, প্রেমিকারূপে উপলব্ধি করতে থাকি ঈশ্বর সখার মতন দস্যিপনা, শিশুর মতন অসহায়ত্ব কিংবা প্রেম-পিপাসায় কতটা ব্যাকুল হয়ে থাকেন। স্বয়ং ঈশ্বর ভক্তকে আরও কাছে পাবার নেশায় মাতৃক্রোড়ে শিশুরূপে ধরা দেন।
‘গোষ্ঠে চল রে ও নীলমণি’
বাউল সাধনায় গোষ্ঠগান গুরুত্বপূর্ণ অংশ, রিচুয়াল। গোষ্ঠ সংগীত দিয়েই আসলে দিনের সূচনা করেন বাউলরা। সূর্য উদিত হবার আগেই, খানিক আলো–আঁধারিতে পূর্ব দিগন্ত রেঙে ওঠে, সে বেলার নামই গোষ্ঠবেলা। তখন এপার বাংলার সাধুরা সফেদ পোশাকে পরম ভক্তিভরে গোষ্ঠ গান করেন। গরু বা গোধন চরাতে গিয়ে গোপালের কষ্ট কিংবা যশোদার সঙ্গে গোপালের সাময়িক বিচ্ছেদ, উৎকণ্ঠা এবং গোপালকে হারিয়ে রাখালবালকদের শঙ্কা, উদ্বেগ কিংবা বিরহ তাদের গলায় সমগ্র চরাচরজুড়ে স্নিগ্ধ কিন্তু সর্বব্যাপী হয়ে ওঠে।
এই সকল গোষ্ঠগানের রচয়িতা লালনের সঙ্গে গোপালের যেন কিছুটা মিলও রয়েছে। লালন নিজেও গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে নদীতে ভেসে এসে মাতা মতিজানের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেন। ওদিকে কংসমামার চক্রান্তে শ্রীকৃষ্ণ জন্মদাত্রী মাকে ছেড়ে গোকুলে বেড়ে ওঠেন।
গোষ্ঠ অর্থাৎ রাখালবালকেরা বাড়ি-শস্যজমি পেরিয়ে যে তৃণভূমিতে যান গোচারণে—গোষ্ঠ মূলত তা-ই। আর গোষ্ঠ যিনি রক্ষা করেন, সেই গোপাল। তাই রাখালবালকেরা চান স্বয়ং কৃষ্ণ তাঁদের সঙ্গ করুন। বড় কোনো বিপদে তিনিই তাঁদের ত্রাতা হবেন।
‘লয়ে গোধন গোষ্ঠের কানন
চল গোকুল বিহারী
গোষ্ঠে চল হরি মুরারী
তুই আমাদের সঙ্গে যাবি
বনফল সব খেতে পাবি
আমরা ম’লে তুই বাঁচাবি
তাই তোরে সঙ্গে করি’
— লালন ফকির
রাখালবালক শ্রীদাম, সুবল, বলাই গোপালকে বনফল পেড়ে, সংগ্রহ করে খাওয়াবে, কথা দেয়। তারা কৃষ্ণকে চরণে নূপুর পরে, মোহন চূড়া বেঁধে, বাঁশি নিয়ে প্রস্তুত হতে বলে।
কিন্তু কৃষ্ণকে একই সঙ্গে সখা এবং ঈশ্বর রূপে তারা কি চিনে নিতে পারবে?
গোষ্ঠগানের তালে তালে আলোচনা বেগ পেয়েছে। এতে দৃশ্যকল্প তৈরির সুযোগ রয়েছে বলে পাঠকের ঘটনা পরম্পরা বুঝতে সহায়ক হবে, আবার লেখাটি সুখপাঠ্যও হবে। গোষ্ঠ গানগুলো গড়ে উঠেছে গোপালের যে বিশেষ পর্ব নিয়ে, সেখানে বাৎসল্য রস আর সখ্যরস মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে।
‘আজকের মত তোরাই যা রে, গোপাল যাবে না’
শিশু গোপাল গোষ্ঠ সাঙ্গ হলে ঘরে ফেরে। মায়ের চোখে ক্ষুধায় আকুল, ক্লান্ত গোপাল ধরা পড়ে। ভক্ত ঈশ্বরসাধনায় ব্যাপৃত হবেন, এমনধারা চিন্তাই তো আমরা করি। ঈশ্বর তিনি তো উপাস্য, পরম আরাধ্য। কিন্তু মা যশোদার কাছে এসে ঈশ্বর শিশু, যিনি জগতের পালনকর্তা, তিনি নিজেই এখানে পাল্য-পোষ্য। এখানে এসে তাই ঈশ্বর এবং জীবের মধ্যকার স্বাভাবিক সম্পর্কের কাঠামো ধসে পড়ে। মায়ের মমতারসের ধারায় শিশু যখন অবগাহন করে, তাতে কেবল সন্তানই নয়<bha>;</bha> বরং মাতাও পরম সুখলাভ করেন। শিশুকে নাওয়ানো–খাওয়ানো, গান গেয়ে ঘুম পাড়ানো, গায়ে জামা পরানো, চুল বাঁধা কি কপালে নজরফোঁটা পরানো ইত্যাকার নানা কাজের ভেতর দিয়ে পরমানন্দ লাভ করেন মমতা, বিশ্বাস, সেবা এবং নিষ্ঠা—এই চারটি বৈশিষ্ট্য দিয়ে। মায়ের এই সেবানিষ্ঠায় যেন কোনো ক্লান্তি নেই। সারা দিন শত কাজের ভিড়েও পুত্রের কথা মা বিস্মরণ হন না। রাতের বেলা চোখে যতই ক্লান্তি নামুক, সন্তানের নিশ্বাসের শব্দটিও যেন ঘুমের অতল থেকে মায়ের কর্ণগোচর থাকে।
অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণনিধি
তার কি আছে কভু গোষ্ঠ খেলা
ব্রহ্মরূপে সে অটলে বসে
লীলাকারী তার অংশকলা
………..
জন্ম–মৃত্যু যার নাই ভবের পর
সে তো নয় স্বয়ং কভু নন্দলালা
—লালন ফকির
গোপালই ঈশ্বর, যখন তিনি নিতান্ত দুগ্ধপোষ্য শিশু পুতনা রাক্ষুষি বধ করেন। কালিয়ানাগ দমনকারী কৃষ্ণ সাধারণ বালক হয়ে মাতা যশোদার ক্রোড়ে আশ্রয় নেন। ওদিকে মাতা গোপালের মাঝে ঈশ্বর রূপ বিস্মৃত হন। এই ঐশীভাব সম্পর্কে সচেতন থাকলে, বিস্মৃতি না ঘটলে ঈশ্বর দুরতিক্রম্য হয়ে ওঠে। দুষ্টের দমন করতে যার আবির্ভাব তার পায়ে কাঁটা ফুটল কি না, সে চিন্তায় মা আকুল হয়ে ওঠেন। গোপালকে রাখালবালকদের সঙ্গে গোষ্ঠে পাঠিয়ে শঙ্কিত থাকেন মা, পাছে শিশু গোপাল হারিয়ে যায় নাকি কষ্ট পায় ক্ষুধার জ্বালায়। গোপাল নিজেও তার দুর্বলতার কথা, কষ্টের কথা, রাখালবালকদের সঙ্গে হেরে গিয়ে শাস্তি পাবার কথা কেঁদে কেঁদে বললে মায়ের প্রাণ আরও আকুল হয়ে ওঠে। এমনভাবে মাকে গোপাল কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তুলতে চান, বাৎসল্য রস ভক্তকে একটি বিশেষ দশায় উপনীত করে রাখে। না হলে যিনি স্বয়ং ঈশ্বর, তাঁকে ননি চুরির দায়ে যশোদা বেঁধে রাখতে পারতেন না। একই ঘটনা ঘটে রাখাল বন্ধু, ভ্রাতাদের সনে। তাঁরাও কানাইয়ের সঙ্গে খেলায় মত্ত হয়ে এঁটো খাইয়ে মিঠা সুখলাভ করেন।
‘বলাই দাদা দয়া নাই প্রাণে
গোষ্ঠে আর যাব না, মাগো
দাদা বলাইয়ের সনে
বড় বড় রাখাল যারা
বসে বসে থাকে তারা
আমায় করে জিন্দা মরা
…..
ক্ষুধাতে প্রাণ আকুল হয় মা
ধেনু রাখার বল থাকে না
বলাই দাদা বোল বোঝে না
কথা কয় হেনে’
—লালন ফকির
শিশু গোপাল গোষ্ঠ সাঙ্গ হলে ঘরে ফেরে। মায়ের চোখে ক্ষুধায় আকুল, ক্লান্ত গোপাল ধরা পড়ে। ভক্ত ঈশ্বরসাধনায় ব্যাপৃত হবেন, এমনধারা চিন্তাই তো আমরা করি। ঈশ্বর তিনি তো উপাস্য, পরম আরাধ্য। কিন্তু মা যশোদার কাছে এসে ঈশ্বর শিশু, যিনি জগতের পালনকর্তা, তিনি নিজেই এখানে পাল্য-পোষ্য।
বল রে বলাই তোদের ধরম কেমন হা রে
গোপালের এমন ক্রন্দনে মা যশোদা নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেন না। তিনি রাখাল বালকদের প্রশ্ন করেন, তাদের কি কাণ্ডজ্ঞান বলে কিছু নেই, যাঁকে তাঁরা ঈশ্বর জানেন, তাঁকে কী করে এঁটো খাওয়ায়। গোপাল ছোট বলে খেলায় হেরে যায়, শাস্তিস্বরূপ বড় রাখালেরা তখন কাঁধে চড়ে বসে।
বলরে বলাই তোদের ধর্ম
ধর্ম তোদের কেমনি হা রে
তোরা বলিস চিরকাল
রাখাল ঈশ্বর, তবে
গোপালকে মানিস কৈরে
বনে যেয়ে বনফল পাও
এঁটো করে গোপালকে দাও
….
….
তোরা ঈশ্বর বলিস যার
স্কন্ধে চড়িস তার
কোন বিচারে
—লালন ফকির
আসলে কাণ্ডজ্ঞান এখানে কেবল যে সখাদেরই নেই, তা নয়। মা যশোদারও নেই। কেননা ঈশ্বর এখানে রইতে চান সাধারণ রাখালবালক হয়ে। ঐশীভাব সুপ্ত না রাখলে কিংবা ভক্ত ঈশ্বরগুণে সচেতন হয়ে উঠলে তার সঙ্গে সখ্য করা যায় না, সন্তানরূপে লালন করা যায় না। যশোদার প্রশ্নের জবাবে রাখালরা বলেন, সখা গোপালের জন্য তাদের মনের যে ভাব, সে ভাব অব্যক্ত রয়ে যায় অস্ফুট থেকে যায়। এ ভাব বলে বোঝানোর নয়। তাঁরা বলেন গোপালের সঙ্গ, তার বাল্যক্রীড়া বড় মিঠা। তার বন্ধুত্ব পাওয়ার বাসনায় পাপ-পুণ্যবোধও লোপ পেয়ে যায়। তাদের স্বীয় কর্মে তাদের দোষ কোথায়? গোপাল যে ভাবের দশায় তাদের উপনীত করে, তারা সেই ভাবের দশায় অঘোর থাকেন।
‘কান্ধে চড়ায় কান্ধে চড়ি
যে ভাব ধরায় সে ভাব ধরি
এসবই বাসনা তারি
বুঝেছি পূর্বে
মিঠার জন্যে এঁটো দিই মা
পাপ-পুণ্যের জ্ঞান থাকে না
গোপাল খেলে হই সান্ত্বনা
পাপ পুণ্য কে ভাবে’
— লালন ফকির
কৃষ্ণ গুপ্ত বৃন্দাবনে গেলে, রাখালবালকেরা বিপদে পড়ে যান। একে প্রিয় সখা, তার ওপর মা যশোদার বারংবার সতর্কবচনের পর এমন কাণ্ড। কী জবাব দেবে বলাই? রোজ যে সময়ে বাড়ি ফেরে, সে সময় বয়ে যাচ্ছে তবু তারা কানাইকে খুঁজে পাচ্ছে না। তখন একে একে বলাইয়ের মনে পড়তে থাকে মা বারবার বলতেন, শ্বাপদসংকুল বনে ভয়ের কতশত কারণ।
‘বনে এসে হারালাম কানাই’
কৃষ্ণ গুপ্ত বৃন্দাবনে গেলে, রাখালবালকেরা বিপদে পড়ে যান। একে প্রিয় সখা, তার ওপর মা যশোদার বারংবার সতর্কবচনের পর এমন কাণ্ড। কী জবাব দেবে বলাই? রোজ যে সময়ে বাড়ি ফেরে, সে সময় বয়ে যাচ্ছে তবু তারা কানাইকে খুঁজে পাচ্ছে না। তখন একে একে বলাইয়ের মনে পড়তে থাকে মা বারবার বলতেন, শ্বাপদসংকুল বনে ভয়ের কতশত কারণ। তার কেবলি মনে হয়, মা গোপালকে তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাই সে গোপালকে পেলেই বাড়ি চলে যেতে চায়। পরে কখনো আবার খেলা যাবে।
সকালে যাই ধেনু লয়ে
এই বনে ভয় আছে ভাই
মা আমায় দিয়েছে কয়ে
…
বলেছিল মা যশোদে
কানাই দিলাম বলাইয়ের হাতে
ভালমন্দ হলে তাতে
…
— লালন ফকির
এভাবে গোপাল সকল গোপ শিশুর সখা হয়ে সখ্যরসে নিজেকে এবং অন্য গোপবালকদের নিমজ্জিত করেন। এমনকি গোকুলে কৃষ্ণ যে কেবল যশোদাকেই মাতৃরূপে পেয়েছিল, তা নয়। ব্রহ্মা কৃষ্ণের সঙ্গে ঠাট্টাবশত একদিন সমস্ত গোপবালক এবং গো বৎস চুরি করে লুকিয়ে রাখেন। ব্রহ্মা মোটে দুই মুহূর্তকাল পরিমাণ এই কাজটি করেন কিন্তু ব্রহ্মার দুই মুহূর্তকাল পৃথিবীতে দুই বৎসরের সমান। এই দুই বৎসর গোপিনী মাতারা যেন সন্তানের শোকে মুহ্যমান না থাকেন, এমন জায়গা থেকে কৃষ্ণ গ্রামের সমস্ত মায়েদের সন্তান রূপে দীর্ঘ দুই বৎসর কাল অবধি প্রকাশিত হতে থাকেন। এবং গোপিনী মাতাদের সন্তানরূপে নিত্য মমতা, সেবা এবং শাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। এবং গোপিনীরা এই সময় সন্তানদের প্রতি স্বাভাবিক সময় যে বাৎসল্য অনুভব করেন, তার থেকেও ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সন্তানরূপে পেয়ে তার থেকেও বেশি মমতা অনুভব করেন। এভাবে সব বালকের সঙ্গে সখারূপে, বালিকাদের সঙ্গে প্রেমিকরূপে এবং মাতাদের সঙ্গে সন্তানরূপে তিনি প্রকাশিত হন। একই সঙ্গে তিনি প্রেম এবং বিচ্ছেদের মাধ্যমে ভক্তদের চূড়ান্ত রসে নিমজ্জিত করেন।
‘অনাদির আদি শ্রীকৃষ্ণ নিধি’
আমরা ঈশ্বরকে যতটা না আরাধনা করি, যতটা না কাছে চাই, ভক্তকে কাছে পেতে যেন ঈশ্বরের ব্যাকুলতা তার থেকেও বেশি। যিনি জগতের পালনকর্তা, তিনি উঁচু আসন থেকে ভক্তের প্রার্থনা শুনে কেবল অনুকম্পা বোধ করে তৃপ্ত হন না। বরং হৃদয় দিয়ে ভক্তের হৃদয়কে স্পর্শ করতে চান। সম্পর্কের ছোটত্ব–বড়ত্ব এমন সকল ব্যবধান ঘুচিয়ে, শিশুর অসহায়ত্ব নিয়ে, প্রেমিকের পাগলামিতে বন্ধুত্বের বাঁধনে ধরা দেন তিনি এ ধরাধামে। বাঁধা পড়তে চান, জীবাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে চান আবেগের সকল সীমানা অতিক্রম করে। বৈষ্ণব দর্শনে তাই ঈশ্বর সদা সর্বদা জীবের মাঝেই বিরাজমান। ঈশ্বর তাঁর সন্তানের কাছে নানারূপে নানান লীলায় ধরা দেন। বলা যেতে পারে সকলের মাঝেই রয়েছে জীবাত্মা এবং পরমাত্মার সহাবস্থান। এই ভব রূপ সংসারে সন্তান, জীবনসঙ্গী কিম্বা সখা-বন্ধু-পরিজনের কাছে হৃদয়ের সমস্ত প্রেম দিয়েই জীবনের পরমানন্দ খুঁজে নিয়েই মুক্তির আনন্দ খুঁজে নিতে হবে।
একজন সাধারণ মানুষের জীবনে শ্রীকৃষ্ণের এই লীলার গুরুত্ব তবে কী! কেবল অসাধারণের জন্যই কি তার জীবন, প্রেম বা বাল্যক্রীড়া অনুধাবনযোগ্য! প্রতিটা মানুষের জীবনচক্রেই আদতে এই পঞ্চরসের গুরুত্ব রয়েছে। ব্যক্তি যদি শান্ত দশা কিংবা দাস্য দশায় নিজের মন এবং কর্মকে উপনীত করতে না পারে, তবে তার জন্য স্বাভাবিক নির্বিঘ্ন জীবন পাড়ি দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। আর এর পরের স্তরে সুখ এবং আনন্দলাভ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জীবনচক্রের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে জীবন আকাঙ্ক্ষা ভিন্নতা পায়। ভিন্ন ভিন্ন সময় সে ভিন্ন ভিন্ন রূপে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। কখনো বন্ধু, কখনো প্রেমী, কখনোবা সন্তানের কাছে ব্যক্তি নিজেকে নিবেদন করতে চায় নিঃশর্ত ভালোবাসা নিয়ে। বন্ধুত্ব উপভোগ করতে চায়, প্রেমীর চরণ স্পর্শ করতে চায় কিংবা ছোট্ট শিশুকে বুকে টেনে সস্নেহ বন্ধনে আটকে থাকতে চায়। আর এর অন্যথা হলে বিরহ-বিচ্ছেদে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এই ব্যাকুলতাও ব্যক্তিজীবনের আরেক অবিচ্ছেদ্য বা বলা যেতে পারে স্বাভাবিক অংশ।