নারী দিবস সবিশেষ
বাংলায় নারীবাদী কাব্যের ধারা ও কবি চন্দ্রাবতী
প্রাচীন বেদীয় ঋষিকাদের উল্লেখ থেকে শুরু করে চর্যাপদের সম্ভাব্য নারী কবি কুক্কুরীপা, বৈষ্ণব পদকর্ত্রী মাধবী এবং শেষ পর্যন্ত মধ্যযুগের বিশিষ্ট কবি চন্দ্রাবতীর সাহিত্যকৃতি বিশ্লেষিত হয়েছে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে। বিশেষত চন্দ্রাবতীর রামায়ণকে কেন্দ্র করে দেখানো হয়েছে কীভাবে নারীর অভিজ্ঞতা, বেদনা ও প্রতিবাদ মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্যে এক নতুন স্বর সৃষ্টি করেছিল।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা, তথা ভারতীয়, তথা বিশ্বসাহিত্যে পুরুষ কবির অভাব নেই; কিন্তু নারী কবির সংখ্যা একেবারেই হাতে গোনা। বিশ্বের আদিগ্রন্থ বেদে অসংখ্য মন্ত্রদ্রষ্টা বা মন্ত্রস্রষ্টা ঋষির মধ্যে অল্প কয়েকজন নারী ঋষি বা ঋষিকার নামও পাওয়া যায়। যেমন বাক্, বিশ্ববারা, গার্গী, লোপামুদ্রা, রাত্রি, শ্রদ্ধা, শাশ্বতী। এঁদের অনেকে বিখ্যাত সব সূক্তের রচয়িতা, যেমন রাত্রিরচিত ‘রাত্রিসূক্ত’।
ঋগ্বেদের আরেক মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি ছিলেন সূর্যা। বিবাহের বহু মন্ত্রের দ্রষ্টা তিনি। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে নারীর সম্মান ও মর্যাদার অত্যন্ত সুন্দর নির্দেশ পাওয়া যায় ঋষি সূর্যার মন্ত্রে। এ অর্থে সূর্যাকে উপমহাদেশে নারীবাদের প্রথম প্রতিভূদের একজন হিসেবে গণ্য করা যায়।
কিন্তু বেদ-পরবর্তী কয়েক হাজার বছরের সাহিত্যে নারীদের নাম আর তেমন পাওয়া যায় না। ডাকসাইটে বিদুষী নারীরা বেদ রচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সময়ের একপর্যায়ে নারীদের বেদপাঠ পর্যন্ত নিষিদ্ধ হয়ে গেল। এ সময়ে অশ্বষোষ, নাগার্জুন, কালিদাস, ভবভূতি, বাণভট্ট, সন্ধ্যাকর নন্দী প্রমুখ সংস্কৃত ভাষায় কবিতা লিখেছেন, নাটক লিখেছেন; কিন্তু তাঁদের সমসাময়িক কোনো নারী কবি বা নাট্যকারের নাম বা রচনা পাওয়া যায় না। পুরুষ নাট্যকারদের লেখা সেসব নাটকে পুরুষেরা সংস্কৃতে কথা বললেও, নারীদের সে অধিকার দেওয়া হয়নি। নাটকের নানি থেকে চাকরানি পর্যন্ত সব নারী চরিত্রের মুখে বসানো হয়েছে সংস্কৃত-ভাঙা প্রাকৃত ভাষা; অর্থাৎ তৎকালীন বুদ্ধিজীবীদের মতে, অশিক্ষিত মূর্খের ভাষা।
ঋগ্বেদের আরেক মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি ছিলেন সূর্যা। বিবাহের বহু মন্ত্রের দ্রষ্টা তিনি। বিয়ের পর স্বামীর সংসারে নারীর সম্মান ও মর্যাদার অত্যন্ত সুন্দর নির্দেশ পাওয়া যায় ঋষি সূর্যার মন্ত্রে। এ অর্থে সূর্যাকে উপমহাদেশে নারীবাদের প্রথম প্রতিভূদের একজন হিসেবে গণ্য করা যায়।
হাজার বছরের প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ চর্যাচর্য বিনিশ্চয় বা চর্যাপদের রচয়িতা কবি ২২ জন সিদ্ধাচার্যের মধ্যে মাত্র একজন—কুক্কুরীপা বা কুক্কুরীপাদ—নারী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে তা–ও নিশ্চিত নয়, অনুমাননির্ভর ধারণা। অনুমানের প্রথম কারণ, কবির স্ত্রীলিঙ্গবাচক ‘কুক্কুরী’ নাম আর দ্বিতীয় জোরালো কারণ, ড. সুকুমার সেনের মতে, তাঁর কবিতায় পরিদৃষ্ট নারীসুলভ উপমাদি এবং ইতর গ্রাম্য ভাষা ও ভাব। যেমন:
‘দুলি দুহি পিটা ধরণ ন জাই।
রুখের তেন্তলি কুম্ভীরে খাঅ॥
আঙ্গন ঘরপণ সুন ভো বিআতী।
কানেট চোরে নিল অধরাতী॥
সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।
কানেট চোরে নিল কা গই [ন] মাগঅ॥
দিবসই বহুড়ী কাড়ই ডরে ভাঅ।
রাতি ভইলে কামরু জাঅ॥
অইসন চর্য্যা কুক্কুরীপাএঁ গাইড়।
কোড়ি মঝেঁ একু হিঅহি সমাইড়॥’
আধুনিক বাংলায়:
কাছিমের দুধ দুয়ে কি পাত্র ভরা যায়?
গাছের তেঁতুল তো কুমিরে খায়।
অবধূতি শোনো, উঠোন ঘরের ভেতরে
মাঝরাতে কানফুল চোর চুরি করে।
বউ জেগে আছে আর শ্বশুর ঘুমায়
চুরি যাওয়া কানফুল খুঁজব কোথায়?
দিনের বেলায় বউ কাককে ডরায়
রাতের বেলায় বউ কামরূপে যায়।
এমন চর্যা কুক্কুরীপা গায়
কোটিতে একজন তার অর্থ খুঁজে পায়।
পদ-২
হাঁউ নিরাসী খমণভতারে
মোহোর বিগোআ কহণ ন জাই॥
ফেটলিউ গো মাএ অন্তউড়ি চাহি।
জা এথু বাহাম সো এথু নাহি॥
পহিল বিআণ মোর বাসনপূড়।
নাড়ি বিআরন্তে সেব বায়ুড়া॥
জাণ জৌবণ মোর ভইলেসি পূরা।
আধুনিক বাংলায়:
আমি নিরাশ, ভাতার শূন্যমন
আমার বিগ্রহ না যায় কহন।
গর্ভ খুলি গো মা, আঁতুড়ঘর চাই
যা আমি চাই, তা এখানে নাই।
প্রথম প্রসব আমার বাসনা পুরাল
নাড়ি বিচারান্তে সে–ও বিলুপ্ত হলো।
জীবন–যৌবন হলো পরিপূর্ণ আমার
চর্যাচর্যের এই পদ দুটির উদ্ধৃত পঙ্ক্তিতে নারীসুলভ ভাব-ভাবনার পরিচয় মেলে ঠিকই, তবে অবমাননার নিগ্রহ থেকে নারীদের মুক্তির কোনো উপায় বলে না।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাধবীর পরবর্তী এক শতকের ভেতরে আরেকটি উজ্জ্বল নারী কবির নাম পাই আমরা—চন্দ্রাবতী। তবে তিনি নাগরিক পরিশীলনের অধিকারী বৈষ্ণব পদকর্ত্রী নন, একান্তই একজন লোককবি। পল্লিগ্রামে প্রচলিত লোকায়ত বাংলা ভাষাকেই তিনি তাঁর কবিতার ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
চর্যাপদের কালের প্রায় অর্ধসহস্রাব্দ পরে এসে আমরা আরেকজন নারী কবির দেখা পাই, তিনি মাধবী। বৈষ্ণব পদাবলি রচয়িতাদের অন্যতমা তিনি এবং একমাত্র পদকর্ত্রী। নিজের লেখা পদের শেষে কখনো কখনো তিনি ‘মাধবীদাসী’ নামেও ভণিতা দিয়েছেন। ইনি গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যের সমসাময়িক এবং তাঁর একান্ত ভক্ত ছিলেন। তবে বয়সে সম্ভবত তিনি মহাপ্রভুর চেয়ে বড় ছিলেন। ষোড়শ শতকের প্রথমার্ধের এই কবি নীলাচল বা পুরীধামে সপারিষদ ও সনৃত্য কৃষ্ণকীর্তনরত মহাপ্রভুকে দেখে তাঁর নিজের একান্ত নারীসুলভ বিহ্বল মুগ্ধতার বর্ণনা দিয়েছেন:
‘আনন্দে নাচত
সঙ্গে ভকত
গৌরকিশোররাজ।
ফাগু উঝালি
করে ফেলাফেলি
নীলাচলপুরী মাঝ॥
শুনিয়া নাগরী
প্রেমেত আগরী
ধাইয়া চলিল বাটে।
হেরিয়া গৌরে
পড়িয়া ফাঁফরে
বদনে চাহিয়া থাকে॥’
আবার কখনো গোরাচাঁদের মুখ দেখতে না পেয়ে আক্ষেপ করেছেন:
‘যে দেখয়ে গোরা মুখ সেই প্রেমে ভাসে।
মাধবী বঞ্চিত হৈল নিজ কর্মদোষে॥’
মাধবীরচিত পদাবলিতে আমরা কালাপ্রেমমুগ্ধ শ্রীরাধিকার মতো গোরাপ্রেমমুগ্ধ এক নারীহৃদয়ের ঘনিষ্ঠ পরিচয় পাই।
২
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মাধবীর পরবর্তী এক শতকের ভেতরে আরেকটি উজ্জ্বল নারী কবির নাম পাই আমরা—চন্দ্রাবতী। তবে তিনি নাগরিক পরিশীলনের অধিকারী বৈষ্ণব পদকর্ত্রী নন, একান্তই একজন লোককবি। পল্লিগ্রামে প্রচলিত লোকায়ত বাংলা ভাষাকেই তিনি তাঁর কবিতার ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। পুরো মধ্যযুগ আলো করে রেখেছে এই যুগন্ধর প্রতিভাময়ী নারী কবির রচনাবলি। লোকজ বাংলায় লেখা তাঁর রামায়ণ কৃত্তিবাসের রামায়ণের সমান্তরালভাবে যুগের পর যুগ ধরে পঠিত ও প্রশংসিত হয়ে আসছে। পালাকার হিসেবেও তিনি সমধিক প্রশংসিত। বিভিন্ন লোকগায়কের কণ্ঠে পরিবেশিত হয়ে আসছে তাঁর রচিত মলুয়া, পদ্মপুরাণ, দস্যু কেনারামের পালা প্রভৃতি পালা।
আজকে আমরা নারীবাদ বলতে যা বুঝি, কামিনী রায়, কুসুমকুমারী দাশ, বেগম সুফিয়া কামাল, অনীতা অগ্নিহোত্রী, কবিতা সিংহ, যশোধরা রায়চৌধুরী, মল্লিকা সেনগুপ্ত, তসলিমা নাসরিন প্রমুখের কবিতায় নানাভাবে যে নারীবাদী সুর বেজে ওঠে, তার প্রাথমিক রণন শোনা যায় চন্দ্রাবতীর লেখায়। বাংলা কাব্যে নারীকণ্ঠের তিনি পথিকৃৎ প্রতিভূ শুধু নন, প্রগতিবাদী চিন্তাধারার অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্বও বটে।
নারীবাদের প্রধান কথাগুলো হলো নারী-পুরুষের লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত শোষণ ও সহিংসতা নির্মূলকরণ। চন্দ্রাবতীর কাব্যে একজন নারী হিসেবে নারীর এই চাওয়াগুলো কমবেশি তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর রামায়ণ রচিত হয়েছে পুরুষ রামকে নয়; বরং তাঁর সহধর্মিণী সীতাকে কেন্দ্র করে। নারীর যত মান-অভিমান, অভিযোগ, অপ্রাপ্তি আর অসংগতিকে তিনি তাঁর রামায়ণে তুলে ধরেছেন সীতার জবানিতে। সীতার প্রতি নানা অপরাধে অপরাধী পুরুষদের তিনি অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করালেও চূড়ান্ত বিচারে ক্ষমার একটা মনোভাব দেখিয়েছেন। এগুলোকে যেন তিনি নিয়তির নির্মম পরিহাস হিসেবে মেনে নিয়েছেন। চন্দ্রাবতী লিখেছেন:
‘বসুমতী কয়, মাগো আইস আমার কোলে
দুঃখিনী কন্যারে লয়্যাগো আমি যাইব পাতালে॥
সুখে থাউক রাজা রামগো রাইজ্য প্রজা লয়্যা।
আমার কন্যা সীতারে আমিগো লয়্যা যাই চলিয়া॥...
দুষ্ট লোকের কথা শুইনাগো কী কাম করিলা।
জন্মের মতন রামগো সীতারে হারাইলা॥
চন্দ্রাবতী কাইন্দা কয়গো কাহারো দোষ নাই।
কর্মফল সুখদুঃখগো দাতা বিধাতা গোঁসাই॥’
গর্ভবতী অবস্থায় সীতাকে বনবাসে পাঠালে, চন্দ্রাবতী স্পষ্ট ভাষায় তার নিন্দা করে লিখেছেন:
‘পুড়িবে অযোধ্যা পুরী গো কিছুদিন পরে।
লক্ষ্মীশূন্য হইয়া গো রাজ্য যাবে ছারখারে॥
পরের কথা কানে লইলে গো নিজের সর্বনাশ।
চন্দ্রাবতী কহে রামের গো বুদ্ধি হইল নাশ॥’
আজকে আমরা নারীবাদ বলতে যা বুঝি, কামিনী রায়, কুসুমকুমারী দাশ, বেগম সুফিয়া কামাল, অনীতা অগ্নিহোত্রী, কবিতা সিংহ, যশোধরা রায়চৌধুরী, মল্লিকা সেনগুপ্ত, তসলিমা নাসরিন প্রমুখের কবিতায় নানাভাবে যে নারীবাদী সুর বেজে ওঠে, তার প্রাথমিক রণন শোনা যায় চন্দ্রাবতীর লেখায়।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্ত্তী লিখেছেন, ‘তিনি (চন্দ্রাবতী) প্রচলিত-প্রতিষ্ঠিত কৃত্তিবাস বা বাল্মীকির রামায়ণকাহিনিকে অনুসরণ করেননি, বরং এ বিষয়ে গ্রাম্যগল্পকে প্রাধান্য দিয়ে এক ব্যতিক্রমী রামায়ণ পালা রচনা করেন। চন্দ্রাবতী তাঁর রামায়ণ পালাগানে কোনো প্রকার ভক্তিরস, বীররস, শৃঙ্গার রস তুলে ধরেননি। কেবল মধুর আর করুণরসকে উপজীব্য করে গড়ে তুলেছেন কাহিনি। কবি তাঁর রচনায় সীতাকে দেখিয়েছেন মুখ্যরূপে। প্রচলিত রামায়ণকারদের পথে না হেঁটে সীতার জীবনকেই পাঠককুলের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছেন চন্দ্রাবতী। তাই রামকে তিনি কোনো কোনো স্থানে সমালোচনা করতেও পিছপা হননি।’
বেদের মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষিকাদের কথা বাদ দিলে, বিশ্বসাহিত্যে নারীবাদের প্রথম কণ্ঠস্বর হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রায় তিন হাজার বছর আগেকার গ্রিক কবি স্যাফোকে। অনুরূপভাবে, ষোড়শ শতকের কবি চন্দ্রাবতীকে বাংলা নারীবাদী কবিদের অগ্রজ বলা যায়। স্যাফো যেভাবে আধুনিক যুগের ভার্জিনিয়া উল্ফ, নাতালিয়া বার্নি, সিডনি আবোট, মেরি বার্নার্ডের মতো নারী কবি-লেখকদের প্রভাবিত করেছেন, একইভাবে বাংলা সাহিত্যের একালের নারীবাদী মল্লিকা-তসলিমাদের সামনে প্রেরণা ও দিকনির্দেশনার বাতিঘর হিসেবে রয়েছেন চন্দ্রাবতী।
তবে স্যাফোর চেয়ে চন্দ্রাবতী একজায়গায় আরও এগিয়ে। এজিয়ান সাগরের দ্বীপনগরী লেসবসের ধনী বণিক পরিবারের কন্যা স্যাফোর কবিতা একান্তভাবে একজন ধনাঢ্য নারীর ব্যক্তিগত প্রেম-কামের আবেগ-অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। তাঁর কবিতার ভাব, ভাষা, ছন্দ, উপমা, চিত্রকল্প প্রভৃতি সবকিছুর বিচারে তাঁকে অনায়াসেই প্রাচীন গ্রিসের অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি বলা চলে। অন্যদিকে ময়মনসিংহের কিশোরগঞ্জ শহরের অদূরবর্তী ফুলেশ্বরী নদীতীরের পাতুয়াইর গ্রামের দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারের কন্যা চন্দ্রাবতী ছিলেন বাংলার পল্লিসমাজের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। লোকজ ভাষা ও ভাব, শৈলী সব দিক থেকে তিনি নিজের রচনাবলিকে সমাজের বঞ্চিত, অবহেলিত দরিদ্র অন্ত্যজ শ্রেণির গণমানুষের ও নারীদের সাহিত্য করে তুলতে পেরেছেন।
এ জন্যই আজও কিশোরগঞ্জ ও পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঘরে ঘরে নারীকণ্ঠে গীত হয় চন্দ্রাবতীর রামায়ণ। এ এক ভিন্নধারার কাব্য। চন্দ্রাবতীর রামায়ণের সঙ্গে কৃত্তিবাস বা বাল্মীকির রামায়ণের তুলনা করা যায় না। চন্দ্রাবতী মূলত এখানে তাঁর সময়কার কৃষিনির্ভর গ্রামীণ বাংলার সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহকে বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরেছেন সীতার জবানিতে, আর তাই তিনি পালাটার নাম রামায়ণ না রেখে সীতায়ণ রাখলেও ভুল কিছু হতো না। আঙ্গিকের দিক থেকেও অভিনবত্বের সৃষ্টি করেছেন চন্দ্রাবতী। সাত খণ্ডের রামায়ণের কাহিনিকে তিনি বিন্যস্ত করেছেন মাত্র তিনটি খণ্ডে।
চন্দ্রাবতী সব সময়েই মূল বা কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে সীতা বা মলুয়ার মতো কোনো নারী বা দস্যু কেনারামের মতো কোনো অন্ত্যজ পুরুষকে নিয়ে পালা রচনা করেছেন। এভাবে এই উচ্চবর্ণজাত ব্রাহ্মণকন্যা সমাজের প্রগতিমুখী চিন্তাধারার পথ খুলে দিয়েছেন। চন্দ্রাবতী কেবল রামায়ণ রচয়িতা বা পালাকার নন, তিনি ছিলেন নারীর, তথা প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর কাব্যকৃতী আরও বহুকাল প্রেরণার মশাল হয়ে জ্বলতে থাকবে নারীর, তথা গণমানুষের অধিকার ও আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামরতদের সামনে।