অস্তিত্ববাদের সূচনা হয় ১৯২০-এর দশকে জার্মানিতে। এটা বিংশ শতাব্দীর পাশ্চাত্য দর্শনের অন্যতম প্রধান ধারা এবং আজও পশ্চিমা পুঁজিবাদী মতাদর্শে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। অস্তিত্ববাদী দর্শনের ইতিহাসে জঁ পল সার্ত্র (১৯০৫–১৯৮০) একটি উল্লেখযোগ্য নাম। তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শন মানুষের ইচ্ছাশক্তি অনুসন্ধান করে এবং মানব স্বাধীনতাকে কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের অস্তিত্ব তার সত্তার পূর্বে আসে। অস্তিত্ববাদকে তিনি মানবতাবাদ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা আজও বাস্তবিক অর্থে গুরুত্ব বহন করে।
ফরাসি দার্শনিক ও কথাসাহিত্যিক জঁ পল সার্ত্র ছিলেন মার্ক্সবাদী অস্তিত্ববাদের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তিত্ব। অস্তিত্ববাদ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী দর্শনধারা, যার প্রতিষ্ঠাতা সোরেন কিয়ের্কেগার্দ (১৮১৩–১৮৫৫)। তবে সার্ত্র নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে অস্তিত্ববাদের নতুন ব্যাখ্যা দেন এবং মতবাদটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান। তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনের মূল ভাবনা নিহিত রয়েছে তাঁর লে-ত্রে এ ল্যো নিয়ঁ বা সত্তা ও শূন্যতা (১৯৪৩) বইটিতে।
এডমন্ড হুসার্ল (১৮৫৯–১৯৩৮) উদ্ভাবিত প্রপঞ্চতত্ত্বকে সার্ত্র অস্তিত্ববাদের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।
সার্ত্রের জীবন ছিল কিংবদন্তিময়। তিনি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, যখন পৃথিবী যুদ্ধের অভিঘাতে কাঁপছিল এবং সর্বত্র সহিংসতা বিরাজ করছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং শত্রুশিবিরে ১০ মাস কাটান। এই ১০ মাস তাঁর চিন্তাধারায় গভীর পরিবর্তন আনে।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে তিনি সমাজ ও জনগণের অবস্থার প্রতি মনোযোগী হন। তিনি কলমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন, সাহিত্যকে গ্রহণ করেন মানুষের মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদে মানুষের অস্তিত্বের মূল্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি মানবসত্তার অটল অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘নজিয়া’ বা ‘নসিয়া’তে তিনি অস্তিত্ববাদী মতবাদকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করেন।
‘সত্তা ও শূন্যতা’ এবং ‘অস্তিত্ববাদ একটি মানবতাবাদ’
পরবর্তীকালে সার্ত্র তাঁর একাডেমিক শ্রেষ্ঠ রচনা লে-ত্রে এ ল্যো নিয়ঁ বা সত্তা ও শূন্যতা প্রকাশ করেন। গ্রন্থটি সে সময়ের দার্শনিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে তাঁর ‘লেক্সিস্তঁশিয়ালিজম এতে ইউমানিজম’ বা ‘অস্তিত্ববাদ একটি মানবতাবাদ’ শীর্ষক বক্তৃতায় তিনি অস্তিত্ববাদী দর্শনের মৌলিক ধারণাগুলো জনসাধারণের সামনে তুলে ধরে চমৎকারভাবে ‘সার্ত্রীয় অস্তিত্ববাদ’ ব্যাখ্যা করেন।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের মূল ভাবনা হলো মানব অস্তিত্বের প্রকৃত সত্তা খুঁজে পাওয়া। অস্তিত্ববাদের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো স্বাধীনতার মাধ্যমে দায়িত্ব। এর মৌলিক যুক্তি হলো, অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে। সার্ত্রের অস্তিত্ববাদী দর্শনের তিনটি মৌলিক নীতি হলো:
১. অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে
২. পৃথিবী অযৌক্তিক, জীবন কষ্টকর
৩. পছন্দের স্বাধীনতা
এ তিনটি নীতি শুধু সার্ত্রের অস্তিত্ববাদকে নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করে না; বরং তাঁর জীবনের কর্মপন্থারও দিকনির্দেশক হয়ে ওঠে।
সার্ত্র বলেছেন, স্বাধীন পছন্দ মানুষের প্রবৃত্তিগত। মানুষ নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার জন্যই সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য, আর এই স্বাধীনতা একধরনের সামাজিক বোঝা, যা থেকে সে মুক্ত হতে পারে না। মানুষের চূড়ান্ত অস্তিত্ব নির্ধারিত হয় তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে। স্বাধীনতাই মানুষের অনন্য অস্তিত্বের ধরন। অন্য সত্তার থেকে মানুষের মৌলিক পার্থক্য হলো, মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের প্রকৃতি ও অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে।
১. অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে
‘অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে’—এটা হলো সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের মৌলিক নীতি। তিনি তাঁর বিভিন্ন রচনায় ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোনো ঈশ্বর নেই যিনি মানব প্রকৃতির আদর্শ পূর্বনির্ধারণ করেছেন। তাই ক্লাসিক্যাল দর্শনের প্রচলিত ‘সর্বজনীন মানব প্রকৃতি’ বলে কিছু নেই।
সার্ত্রে তাঁর ১৯৪৫ সালের ‘অস্তিত্ববাদ একটি মানবতাবাদ’ শীর্ষক বক্তৃতায় বলেন, এ বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো অস্তিত্ববাদকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া অভিযোগগুলোর মুখে আত্মপক্ষ সমর্থন করা। তিনি তিনটি অভিযোগের জবাব দেন:
প্রথমত, অস্তিত্ববাদ মানুষকে হতাশাজনক নিষ্ক্রিয়তায় উৎসাহিত করে না।
দ্বিতীয়ত, অস্তিত্ববাদ মানব অবস্থার অন্ধকার দিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে নোংরা ও কদর্য জিনিসকে তুলে ধরে, অথচ মানব প্রকৃতির উজ্জ্বল ও সুন্দর দিকগুলোকে উপেক্ষা করে, তা কিন্তু নয়।
তৃতীয়ত, অস্তিত্ববাদ মানব প্রচেষ্টার সত্য ও গুরুত্বকে অস্বীকার করে না।
এ প্রবন্ধে সার্ত্র ব্যাখ্যা করেন: ‘যদি ঈশ্বর না থাকেন, তবে অন্তত একটি সত্তা আছে যার ক্ষেত্রে প্রমাণ করা যায় যে অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে। আর সেই সত্তা হলো মানুষ।’
হাইডেগারের ভাষায়, এটি মানুষের বাস্তবতা।
সার্ত্র এই নীতিকে তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছেন:
· জীবন সীমিত— প্রত্যেককে একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে।
· জীবন নিজেই অর্থহীন, তাই মানুষকে নিজের জীবনের অর্থ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে।
· একাকিত্ব চিরন্তন, কারণ প্রত্যেকের অন্তর্দৃষ্টি অনন্য, যা অন্য কেউ সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারে না।
অতএব, ‘অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে।’ অর্থাৎ, প্রথমে মানুষ বিদ্যমান থাকে, তারপর সে নিজেকে সংজ্ঞায়িত করে।
সার্ত্রের নাস্তিক অস্তিত্ববাদে বলা হয়েছে: পৃথিবীতে কোনো মানব প্রকৃতি নেই, কারণ কোনো ঈশ্বর নেই যিনি মানব প্রকৃতি নির্ধারণ করেছেন। জীবনের শুরুতে মানুষ শূন্য থাকে—কোনো জন্মগত বৈশিষ্ট্য বা সত্তা ছাড়াই। পরে সে নিজের ইচ্ছাশক্তি অনুযায়ী নিজের সত্তা নির্মাণ করে। মানুষকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়েছে, আর যখন তার অস্তিত্ব নেই তখন পৃথিবী তার কাছে শূন্য। আবার যখন সে বিদ্যমান, তখনও তার সত্তা শূন্য, তাই সে সর্বদা শূন্যতার মুখোমুখি।
২. পৃথিবী অযৌক্তিক, জীবন কষ্টকর
সার্ত্র একবার বলেছিলেন: ‘পৃথিবী অযৌক্তিক, জীবন কষ্টকর, জীবন অর্থহীন।’ এ বক্তব্যে নিহিত রয়েছে গভীর নৈরাশ্য। তবে ‘অযৌক্তিকতা’ বলতে তিনি সমাজের নিয়মকানুনকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে অস্বীকার করেননি, বরং মানুষের অস্তিত্বকেই বোঝাতে চেয়েছেন। মানুষের অস্তিত্ব কোনো পূর্বনির্ধারিত কারণ ছাড়াই বিদ্যমান। কোনো ঈশ্বর বা দার্শনিক মানব সত্তা নির্ধারণ করে তাকে সৃষ্টি করেননি। মানুষ যেমন আছে তেমনই বিদ্যমান, আর এই অস্তিত্বই অযৌক্তিক। তাই পৃথিবী অযৌক্তিক।
এবং জীবন কষ্টকর, কারণ মানুষ অর্থহীন পৃথিবীতে বিদ্যমান। সে পৃথিবীর সাথে একধরনের শত্রুতার অবস্থায় থাকে।
সার্ত্র মনে করেন, মানুষ স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারে, স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাই একজন মানুষ হল ‘কর্তা’, আর অন্য মানুষেরা তার দৃষ্টিতে ‘বস্তু’। কিন্তু যখন প্রত্যেক মানুষই নিজের দৃষ্টিতে কর্তা, তখন বস্তু কিভাবে বিদ্যমান?
সার্ত্রের মতে, মানুষেরা নিজের অস্তিত্বের কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য অন্যদের সাথে সংগ্রামে লিপ্ত হয়। তাই মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনিবার্য। এই দ্বন্দ্বই অস্তিত্বের মৌলিক অর্থ। যুদ্ধ, অপরাধ, সংঘাত—সবই এই দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নেয়।
এ প্রসঙ্গেই পাওয়া যায় সার্ত্রের সেই বিখ্যাত উক্তি: ‘অন্যজনই নরক।’
অর্থাৎ, আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হয় অন্যের দৃষ্টির মধ্যে। কর্তা ও বস্তু হিসেবে নিজের সত্তা ও অপরের সত্তা সবসময় পরস্পরের বিপরীত। মতাদর্শ বা দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে তারা একে অন্যকে নিজের চেতনার বস্তুতে পরিণত করে, এমনকি তাকে ভার্চুয়াল সত্তা হিসেবেও গড়ে তোলে।
সার্ত্র ‘অন্যজনের দৃষ্টি’র ভয়াবহতা বোঝাতে গ্রিক পুরাণের মেদুসার উদাহরণ দেন। মেদুসার দিকে তাকালে মানুষ পাথরে পরিণত হত। সার্ত্রের ‘অন্যজনই নরক’ কথাটা এসেছে তাঁর নাটক ‘ল্যো কঁফিনেমঁ’ বা ‘বন্দিদশা’ থেকে। এতে তিনটি ভূত নরকে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে এবং তারা একে অপরকে প্রতারিত করে ও যন্ত্রণা দেয়। শেষে তারা উপলব্ধি করে যে, নরকে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, কারণ তারা ইতিমধ্যেই নরকে আছে। অর্থাৎ, বর্তমান পৃথিবীই নরক, যেখানে বেঁচে থাকা কষ্টকর এবং তা ধনী-গরিব নির্বিশেষে মানুষকে দুঃখ ও হতাশার দিকে ঠেলে দেয়।
৩. পছন্দের স্বাধীনতা
সার্ত্র স্বাধীন পছন্দকে শুধু তত্ত্বে নয়, নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে প্রায়শই যুক্ত হয় বোভোয়ারের নাম, যিনি ছিলেন তাঁর সঙ্গিনী, একজন বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং আধুনিক নারীবাদের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর গ্রন্থ ‘দ্য সেকেন্ড সেক্স’ নারীবাদের ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
সার্ত্র ও বোভোয়ার তাঁদের সম্পর্ককে উন্মুক্ত ভালোবাসার চুক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা বিশ্বাস করতেন—মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীন, আর ভালোবাসাও কোনো বন্ধনের মধ্যে গিয়ে নয়, স্বাধীনভাবেই বেছে নেওয়া উচিত। তাই তাঁরা এমন একটি সম্পর্ক বজায় রাখেন, যেটা সমাজে সহজে গ্রহণযোগ্য ছিল না। দুই বছর পরপর তাঁদের সম্পর্ক পুনর্নিশ্চিত করতে হতো। যদিও এটা অনেকের কাছে অগ্রহণযোগ্য ছিল, সম্পর্কটি টিকে ছিল ৫১ বছর, সার্ত্রের মৃত্যুর আগপর্যন্ত। এ সম্পর্কই তাঁর অস্তিত্ববাদী দর্শনকে জীবনে বাস্তবায়নের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
সার্ত্র বলেছেন: ‘অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে।’ তাই আমাদের মেনে নিতে হবে যে জীবন অর্থহীন। এটি আপাতদৃষ্টিতে নৈরাশ্যজনক মনে হতে পারে। কারণ, মানুষ সারা জীবন জীবনের অর্থ খুঁজে বেড়ায়। কিন্তু অস্তিত্ববাদ এখানে থেমে যায় না। বরং জীবন অর্থহীন বলেই মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট কাজ পূরণ করতে হয় না, তাই সে স্বাধীন।
সার্ত্রের মতে:
• মানুষকে স্বাধীন হিসেবে বিচার করা হয়, আর স্বাধীনতাই মানুষের নিয়তি।
• মানুষ স্বাধীনতা থেকে মুক্ত হতে পারে না, কারণ সে পৃথিবীতে বিদ্যমান এবং ক্রমাগত পছন্দের মাধ্যমে নিজের অর্থ তৈরি করে।
• এই স্বাধীনতাকে কখনো কখনো কোনো অচেনা শক্তি সীমাবদ্ধ করে ফেলে, যা সৃষ্টি করে সংকট ও নৈরাশ্যের।
• তবু, যত ছোটই হোক, যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক, মানুষ মূলত স্বাধীন।
সার্ত্রের পছন্দের স্বাধীনতার তত্ত্ব সব ধরনের ডিটারমিনিজম বা নিয়তিবাদকে প্রত্যাখ্যান করে। তাঁর মতে, স্বাধীনতা মানুষের কোনো জন্মগত প্রকৃতি নয়; বরং মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে তা অবিচ্ছেদ্য। স্বাধীনতা মানে মানুষের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
স্বাধীন পছন্দ মানুষের প্রবৃত্তিগত
সার্ত্র বলেছেন, স্বাধীন পছন্দ মানুষের প্রবৃত্তিগত। মানুষ নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার জন্যই সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য, আর এই স্বাধীনতা একধরনের সামাজিক বোঝা, যা থেকে সে মুক্ত হতে পারে না।
মানুষের চূড়ান্ত অস্তিত্ব নির্ধারিত হয় তার নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মাধ্যমে। স্বাধীনতাই মানুষের অনন্য অস্তিত্বের ধরন। অন্য সত্তার থেকে মানুষের মৌলিক পার্থক্য হলো, মানুষ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের প্রকৃতি ও অস্তিত্ব নির্ধারণ করতে পারে।
মানুষ প্রথমে থাকে শূন্য, ফাঁকা, যেন একটি খোলসমাত্র। তারপর ধীরে ধীরে নিজের পছন্দ ও ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে নিজের সত্তা নির্মাণ করে।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ নিঃসন্দেহে একধরনের মানবতাবাদ। কারণ, এটি মানবজাতির ভাগ্যকে মানুষের নিজের হাতে তুলে দেয়। মানবতাবাদ ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে উদ্ভূত, যেখানে মানুষের মূল্য, মর্যাদা, যত্ন, ভালোবাসা ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’র আহ্বান দেখা যায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, দান্তে প্রমুখ রেনেসাঁ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সৃজনকর্মে।
মানুষ তার নিজের কর্মের ফল
সার্ত্রের মতে: ‘মানুষ কর্মের মাধ্যমে নিজেকে গড়ে তোলে। সে তার নিজের কর্মের ফল, আর কিছু নয়।’ অর্থাৎ কাপুরুষেরা নিজেদের কাপুরুষ বানায়, বীরেরা নিজেদের বীর বানায়। আজ তুমি যা হয়েছ, তা সম্পূর্ণ তোমার অতীত কর্মের দ্বারা নির্ধারিত।
সার্ত্র বলেন, প্রথমে মানুষ বিদ্যমান থাকে, তারপর স্বাধীনভাবে নিজের নির্বাচিত কর্মের মাধ্যমে সে ভালো বা মন্দ হয়। জন্মগতভাবে কোনো মানুষ বীর বা কাপুরুষ নয়; বরং নিজের সক্রিয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই সে বীর বা কাপুরুষে পরিণত হয়। মানুষের সিদ্ধান্তই তাকে গড়ে তোলে। এ ব্যাপারে কোনো পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড নেই, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোনো প্রয়োজনীয়তার দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়; বরং চিন্তার স্বায়ত্তশাসন—এটাই ‘অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে’ কথাটার মৌলিক যুক্তি।
প্রত্যেক মানুষ জন্ম থেকেই স্বাধীন। তার ভাগ্য নির্ধারিত হয় তার নিজের উদ্যোগে। তবে সার্ত্র এর সঙ্গে যোগ করেন: ‘মানুষকে তার অস্তিত্ব এবং সমস্ত কর্মের দায়ভার নিতে হবে।’
অতএব, ‘অস্তিত্ব সত্তার পূর্বে আসে’র সঙ্গে দায়িত্বের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সার্ত্র বলেছেন, ‘আমি মানুষের কল্যাণ বা সমাজের উন্নতির প্রতি তাদের আগ্রহের ওপর আস্থা রাখতে পারি না। কারণ, মানুষ স্বাধীন এবং কোনো মৌলিক মানব প্রকৃতি বলতে কিছু নেই।’ অর্থাৎ মানব প্রকৃতি পূর্বনির্ধারিত কিছু নয়, এটা গড়ে ওঠে ইতিহাসের কালানুক্রমিকতায় এবং মানুষের স্বাধীন সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ নিঃসন্দেহে একধরনের মানবতাবাদ। কারণ, এটি মানবজাতির ভাগ্যকে মানুষের নিজের হাতে তুলে দেয়। মানবতাবাদ ইউরোপীয় রেনেসাঁ থেকে উদ্ভূত, যেখানে মানুষের মূল্য, মর্যাদা, যত্ন, ভালোবাসা ও সম্মানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’র আহ্বান দেখা যায় লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মিকেলাঞ্জেলো, দান্তে প্রমুখ রেনেসাঁ শিল্পী ও সাহিত্যিকদের সৃজনকর্মে।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ মূলত বলতে চায়, মানুষ স্বাধীন ও বন্ধনহীন। ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে যে কেউ যা হতে চায় তা–ই হতে পারে। এ মতবাদ ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ সম্মান দেয়। পৃথিবী আসলে মানবতার এক বন, যেখানে প্রতিটি গাছের নিজস্বভাবে বেড়ে ওঠার জায়গা আছে। গুরুত্বপূর্ণ হলো গাছ কী হবে তা নয়, বরং সে বেড়ে উঠছে কি না, সেটাই।
সার্ত্রের মৃত্যুর পর প্রায় অর্ধশতক পেরিয়ে গেছে; কিন্তু তিনি এখনো প্রাসঙ্গিক, পঠনীয়। কারণ, সময় বদলালেও জীবন একই থাকে। পৃথিবী এখনো ‘অযৌক্তিক’, জীবন এখনো ‘কষ্টকর’। তবে সার্ত্র আমাদের বলেন: ভবিষ্যতে আমরা কী হব, তা নির্ভর করে আজ আমরা কী করছি তার ওপর। আমরা জন্মগতভাবে এমন নই; বরং আমাদের অতীত কর্ম আজকের আমাদেরকে গড়েছে, আর আমাদের আজকের কর্ম গড়ে তুলবে আগামীর আমাদেরকে।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ ব্যক্তির মূল্যকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। এ মতবাদ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে নিজের জীবনের অনন্য মূল্য গড়ে তুলতে। মানবমুক্তির উদ্দেশ্যে তাঁর অসীম উদ্বেগ ও প্রেরণা আজও দর্শনের ইতিহাসে ভাস্বর নিজস্ব দীপ্তিতে। জীবন বিলীন হয়ে যায় সময়ের সঙ্গে; কিন্তু ইতিহাসে যাঁরা বর্ণাঢ্য পদচিহ্ন রেখে যান, তাঁদের জীবন চিরন্তন অর্থ পেয়ে যায়। সার্ত্র আমাদের যে মূল্যবান আত্মিক সম্পদ দিয়ে গেছেন তা হলো: স্থবির হয়ো না, অলস হয়ো না, প্রতিদিনের জীবনকে পূর্ণ করো।