স্পেনের কাতালোনিয়ার রুক্ষ অথচ মায়াবী মাটি, যেখানে পাইনবনের ঘ্রাণ আর ভূমধ্যসাগরের নোনা হাওয়া মিলেমিশে একাকার, সেখানেই ১৯০৪ সালের ১১ মে সালভাদর ডোমিঙ্গো ফেলিপি জেসিন্তো দালি ই দোমেনেখের জন্ম। কিন্তু পৃথিবী তাঁকে একনামে চেনে সালভাদর দালি নামে।
দালির জীবন এক চলন্ত ক্যানভাস, যেখানে রঙের ছোপে মিশে আছে পাগলামি, প্রতিভা আর অসীম অহমিকা। সেই পরাবাস্তববাদী জাদুকরের জীবনের অলিগলি যেন এক কাব্যিক আখ্যান। বেড়ে উঠেছিলেন যেন মৃত এক ছায়ার নিচে। দালির জন্মের ঠিক ৯ মাস আগে তাঁর এক বড় ভাই মারা যান, যাঁর নামও ছিল সালভাদর। শৈশবে দালি যখন তাঁর মা–বাবার সঙ্গে সেই ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তখন তাঁকে বলা হতো, ‘তুমিই তোমার সেই ভাইয়ের পুনর্জন্ম।’
কথাটি দালির কচি মনে এক গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। দালি বড় হতে লাগলেন এক অদ্ভুত দোটানায়। তিনি কি তবে শুধুই কারও ছায়া, নাকি এক স্বতন্ত্র সত্তা? দালির ভাষায়, ‘আমি সারা জীবন প্রমাণ করতে চেয়েছি যে আমি সেই মৃত ভাইটি নই, আমি জীবিত।’ আর এই অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই থেকেই জন্ম নিল তাঁর চরম আত্মকেন্দ্রিকতা এবং অদ্ভুত সব আচরণ। কৈশোরেই দালির তুলিতে ধরা দিতে শুরু করল অদ্ভুত সব অবয়ব। ১৯২২ সালে তিনি যখন মাদ্রিদের ‘রেয়াল অ্যাকাদেমি দে বেলা আর্টেস ডি সান ফার্নান্দো’তে ভর্তি হলেন, তখন থেকেই তিনি এক নক্ষত্র। লম্বা চুল, কানে ঝোলানো দুল আর সেই আইকনিক খাড়া সরু গোঁফ—দালি যেন নিজেই নিজের আঁকা এক চরিত্র। সেখানেই তাঁর বন্ধুত্ব হলো কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা আর চলচ্চিত্রকার লুইস বুনুয়েলের সঙ্গে। এই ত্রয়ী মিলে স্পেনের শিল্পকলায় এক নতুন বিপ্লব আনলেন। তবে দালির প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয়নি। তিনি শিক্ষকদের সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আপনাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি আমাকে পরীক্ষা করার যোগ্যতা রাখেন।’ এই ঔদ্ধত্যই ছিল তাঁর শিল্পসত্তার চালিকা শক্তি।
দালি যখন তাঁর মা–বাবার সঙ্গে ভাইয়ের কবরের পাশে দাঁড়াতেন, তাঁকে বলা হতো, ‘তুমিই তোমার সেই ভাইয়ের পুনর্জন্ম।’ দালি বড় হতে লাগলেন এক অদ্ভুত দোটানায়। তিনি কি শুধুই কারও ছায়া, নাকি এক স্বতন্ত্র সত্তা? দালির ভাষায়, ‘আমি সারা জীবন প্রমাণ করতে চেয়েছি যে আমি সেই মৃত ভাইটি নই, আমি জীবিত।’
প্যারিসে পাবলো পিকাসো এবং পরাবাস্তববাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে দালির পরিচয় হলো। দালি বুঝতে পারলেন, বাস্তবতার হুবহু নকল আঁকা তাঁর কাজ নয়। তিনি আঁকতে চাইলেন মানুষের অবচেতন মন, স্বপ্ন আর ভয়কে। এমন এক পরাবাস্তববাদ, যেখানে সময় গলে যায়। ১৯৩১ সালে আঁকলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ—‘দ্য পার্সিস্টেন্স অব মেমোরি’। তপ্ত রোদে ঘড়িগুলো গলে গলে পড়ছে, যেন সময় নিজেই এখানে পঙ্গু। দালির এই পরাবাস্তববাদ ছিল এক ‘প্যারানয়িক-ক্রিটিক্যাল’ পদ্ধতি, যেখানে যুক্তির চেয়ে অযুক্তি বেশি সত্য।
গালা যেন ছিলেন দালির ধমনির রক্ত। দালির জীবন অপূর্ণ থেকে যেত, যদি না সেখানে গালা আসতেন। গালা রুশ বংশোদ্ভূত, দালির চেয়ে ১০ বছরের বড়। দালি তাঁকে দেখামাত্রই প্রেমে পড়লেন। গালা ছিলেন তাঁর প্রেমিকা, তাঁর মা, তাঁর ম্যানেজার এবং তাঁর প্রধান অনুপ্রেরণা। দালি লিখেছিলেন, ‘গালার জন্যই আমি চিত্রশিল্পী হয়েছি। তাকে ছাড়া আমি কিছুই না।’ গালা দালির বিশৃঙ্খল জীবনকে শৃঙ্খলায় বেঁধেছিলেন, তাঁর পাগলামিকে শিল্পের বাজারে ডলারে রূপান্তর করেছিলেন।
দালির শিল্প কেবল ক্যানভাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তিনি কাজ করেছেন চলচ্চিত্রে, ভাস্কর্যে, এমনকি বিজ্ঞাপনেও। তাঁর আঁকা প্রতিটি ছবি ছিল একেকটি রহস্যের জট। কখনো সেখানে দেখা গেছে হাতির লম্বা সরু পা, কখনো আবার শূন্যে ভাসমান পেঁয়াজ কিংবা পারমাণবিক বিচ্ছুরণ। দালি প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন কেবল ঘুমের ঘোরে দেখার বস্তু নয়, তাকেও তুলির ডগায় নামিয়ে এনে অমর করে রাখা যায়।
‘আমি ড্রাগ নিই না, কারণ আমিই ড্রাগ’—সালভাদর দালি
সালভাদর দালির জীবন যেন এমনই এক অন্তহীন গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি মোড়েই অপেক্ষা করে আছে নতুন কোনো বিস্ময়। দালির পাগলামি এমন, যখন ব্যক্তিই হয়ে ওঠে শিল্প। দালি বিশ্বাস করতেন, একজন শিল্পী কেবল তখনই মহান, যখন তাঁর জীবন এবং শিল্প মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তাঁর অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা ছিল তৎকালীন সমাজের জন্য এক বিশাল ধাক্কা।
একবার লন্ডনে এক প্রদর্শনীতে দালি বক্তব্য দিতে এলেন একটি ভারী ডাইভিং স্যুট (ডুবুরির পোশাক) পরে। সঙ্গে ছিল দুটি শিকারি কুকুর। কথা বলতে গিয়ে তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসছিল, কিন্তু তিনি স্যুট খুললেন না। তাঁর যুক্তি ছিল, ‘আমি মানুষের অবচেতন মনের গভীরে ডুব দিচ্ছি, তাই আমার এই পোশাক প্রয়োজন।’
দালি হাতে একটি চামচ বা চাবি নিয়ে চেয়ারে বসে ঘুমাতেন। নিচে রাখা থাকত একটি ধাতব থালা। ঘুমের ঘোরে যখনই তাঁর হাত শিথিল হয়ে চামচটি থালায় পড়ত, সেই শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যেত। ঠিক সেই মুহূর্তে মস্তিষ্কে ভাসতে থাকা অস্পষ্ট স্বপ্নের চিত্রগুলো তিনি দ্রুত এঁকে ফেলতেন।
দালি তাঁর স্বপ্নগুলোকে ক্যানভাসে ধরার জন্য এক অদ্ভুত কৌশল অবলম্বন করতেন। তিনি হাতে একটি চামচ বা চাবি নিয়ে চেয়ারে বসে ঘুমাতেন। নিচে রাখা থাকত একটি ধাতব থালা। ঘুমের ঘোরে যখনই তাঁর হাত শিথিল হয়ে চামচটি থালায় পড়ত, সেই শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যেত। ঠিক সেই মুহূর্তে মস্তিষ্কে ভাসতে থাকা অস্পষ্ট স্বপ্নের চিত্রগুলো তিনি দ্রুত এঁকে ফেলতেন।
১৯৩১ সালের এক তপ্ত দুপুর। দালি ও গালা এক বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাবেন, কিন্তু দালির হঠাৎ শরীর খারাপ হওয়ায় তিনি থেকে গেলেন। তিনি দেখলেন টেবিলের ওপর রাখা ‘ক্যামেম্বার্ট’ পনির রোদে পুড়ে গলে যাচ্ছে।
এই সাধারণ দৃশ্যটিই তাঁকে মহাজাগতিক চিন্তায় নিমগ্ন করল। তিনি তাঁর স্টুডিওতে গেলেন এবং একটি অসমাপ্ত ল্যান্ডস্কেপের ওপর গলে যাওয়া ঘড়ি আঁকতে শুরু করলেন। ছবিটির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন, সময় কোনো স্থির বা অনমনীয় বিষয় নয়। আমাদের অভিজ্ঞতায় সময় কখনো থমকে দাঁড়ায়, কখনো গলে যায়। এটিকে আইনস্টাইনের ‘থিওরি অব রিলেটিভিটি’র এক অসাধারণ শৈল্পিক প্রতিফলন বলে মনে করা হয়।
দালির ছবিতে প্রায়ই দেখা যায় অদ্ভুত লম্বা এবং সরু পাবিশিষ্ট হাতি। বাস্তবের ভারী হাতিকে তিনি মাকড়সার মতো সরু পায়ে দাঁড় করিয়েছিলেন। এটি ছিল আধ্যাত্মিকতার প্রতীক। তিনি মনে করতেন, মানুষ তার পার্থিব অস্তিত্বের ভার নিয়ে আকাশের দিকে বা উচ্চতর চেতনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, ঠিক যেমন সেই সরু পাগুলো বিশাল শরীরের ভার বহন করে।
দালি তাঁর জীবনের শেষ বড় কাজটি করেন তাঁর জন্মস্থানে। একটি পুরোনো থিয়েটার হলকে তিনি রূপান্তরিত করেন ‘দালি থিয়েটার-মিউজিয়াম’-এ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম পরাবাস্তববাদী বস্তু হিসেবে পরিচিত। আজ দালির সমাধি এই মিউজিয়ামের নিচেই অবস্থিত। অর্থাৎ মৃত্যুর পরেও তিনি তাঁর নিজের তৈরি এক মায়ার জগতে চিরনিদ্রায় শায়িত।
২
সালভাদর দালির জগৎ মানেই যুক্তির দেয়াল ভেঙে অযুক্তির অরণ্যে প্রবেশ করা। তিনি ছিলেন একাধারে চিত্রকর, স্থপতি, চিত্রনাট্যকার এবং একজন দক্ষ শোম্যান। তাঁর সৃজনশীলতার দুটি অনন্য দিক ‘মে ওয়েস্ট লিপস সোফা’ এবং তাঁর পরাবাস্তববাদী চলচ্চিত্রগুলো:
মে ওয়েস্ট লিপস সোফা: আসবাব যখন কবিতা
১৯৩০-এর দশকে হলিউডের জনপ্রিয় এবং সাহসী একজন অভিনেত্রী ছিলেন মে ওয়েস্ট। দালি এই অভিনেত্রীর চেহারার প্রতি ভীষণভাবে মোহিত ছিলেন। ১৯৩৫ সালে তিনি একটি পরাবাস্তববাদী কোলাজ তৈরি করেন, যার বিষয় ছিল ‘মে ওয়েস্টের মুখমণ্ডল, যা একটি পরাবাস্তববাদী অ্যাপার্টমেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে’।
দালি চিন্তা করলেন, মে ওয়েস্টের ঠোঁট জোড়া যদি একটি আসবাব হতো, তবে তা দেখতে কেমন হতো? এ ভাবনা থেকেই জন্ম নিল বিখ্যাত ‘মে ওয়েস্ট লিপস সোফা’। এটি উজ্জ্বল লাল রঙের একটি সোফা, যার গঠন ঠিক মে ওয়েস্টের কামুক ঠোঁটের মতো। দালি এমন একটি কক্ষের কল্পনা করেছিলেন, যেখানে গোল্ডেন কার্লের মতো দেখতে পর্দা হবে অভিনেত্রীর চুল, দুটি ঝোলানো ছবি হবে তাঁর চোখ, আর একটি চিমনি হবে তাঁর নাক। সেই কক্ষের ঠিক মাঝখানে থাকবে এই ঠোঁট-আকৃতির সোফা।
এটি আধুনিক ফার্নিচার ডিজাইনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। আজও এই সোফাটি পপ-আর্ট এবং পরাবাস্তববাদী নকশার প্রতীক হয়ে আছে।
দালির রুপালি পর্দা: স্বপ্নের চলমান চিত্রায়ণ
দালি মনে করতেন, স্থিরচিত্রের চেয়ে চলচ্চিত্র মানুষের অবচেতন মনকে বেশি আলোড়িত করতে পারে। তাঁর চলচ্চিত্রজীবন মূলত দুই ভাগে বিভক্ত—লুইস বুনুয়েলের সঙ্গে তাঁর শুরু এবং পরবর্তী সময়ে আলফ্রেড হিচককের সঙ্গে কাজ।
‘উঁ শিয়ঁ আনদালু’ ছিল দালি এবং বুনুয়েলের প্রথম যৌথ সিনেমা। এটি কোনো গতানুগতিক গল্প ছিল না, বিচ্ছিন্ন এবং অদ্ভুত দৃশ্যের সমষ্টি। সিনেমার শুরুতে একটি মেঘ চাঁদকে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম করছে, ঠিক তখনই একটি ক্ষুর দিয়ে এক নারীর চোখ চিরে ফেলার দৃশ্য দেখানো হয়। এটি দর্শককে মানসিকভাবে নাড়া দেওয়ার জন্য দালির একটি নিষ্ঠুর কিন্তু শক্তিশালী কৌশল ছিল।
ছবিতে দেখা যায় পিয়ানোর ওপর মরা গাধা। একজন মানুষ একটি বিশাল পিয়ানো টেনে নিয়ে যাচ্ছে, যার ওপর পড়ে আছে দুটি পচা গাধার মৃতদেহ। দালি এর মাধ্যমে সমাজের মধ্যবিত্ত নৈতিকতা ও বুর্জোয়া সংস্কৃতির পচনকে তুলে ধরেছিলেন।
দালির জীবন ছিল এক সুপরিকল্পিত থিয়েটার। তিনি কেন এমন করতেন? অহমিকা নাকি বিপণন? দালি বলতেন, ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি এক অপার্থিব আনন্দ অনুভব করি এই ভেবে যে আমিই সালভাদর দালি!’ তিনি জানতেন কীভাবে সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে হয়।
‘ল’এজ দ’র’ ছিল তাঁদের দ্বিতীয় ছবি। এটি এতটাই বিতর্কিত হয়েছিল যে প্যারিসের পুলিশ ছবিটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। এ ছবিতে দালি ধর্ম, সমাজ ও যৌনতার ওপর প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিলেন।
হলিউডের মাস্টার অব সাসপেন্স আলফ্রেড হিচকক যখন তাঁর মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার ‘স্পেলবাউন্ড-১৯৪৫’-এর জন্য একটি স্বপ্নের দৃশ্য তৈরি করতে চাইলেন, তিনি সরাসরি দালির শরণাপন্ন হন। দালি সেখানে বিশাল বিশাল চোখ আঁকা পর্দা, অদ্ভুত কাঁচি এবং ছাদ থেকে ঝুলন্ত পাথর ব্যবহার করেছিলেন। হলের সে দৃশ্য আজও সিনেমার ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘ড্রিম সিকোয়েন্স’ হিসেবে গণ্য হয়।
দালির জীবন ছিল এক সুপরিকল্পিত থিয়েটার। তিনি কেন এমন করতেন? অহমিকা নাকি বিপণন? দালি বলতেন, ‘প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি এক অপার্থিব আনন্দ অনুভব করি এই ভেবে যে আমিই সালভাদর দালি!’ তিনি জানতেন কীভাবে সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে হয়। একবার তিনি সাদা রঙের একটি রোলস রয়েস গাড়ি ভরে ৫০০ কেজি ফুলকপি নিয়ে প্যারিস ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। লোকে অবাক হয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ‘সবকিছুতেই গাণিতিক জ্যামিতি আছে, ফুলকপিতেও আছে!’
তাঁর অতিমাত্রায় বাণিজ্যিক মানসিকতার জন্য পরাবাস্তববাদী দলের নেতা আন্দ্রে ব্রেতোঁ দালিকে ডলারের জন্য ক্ষুধার্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন। শুনে দালি রেগে না গিয়ে উল্টো আনন্দিত হয়েছিলেন।
৩
সালভাদর দালির ছবিগুলো আসলে একেকটি চাক্ষুষ ধাঁধা। তিনি জানতেন যে মানুষের চোখ যা দেখে, মস্তিষ্ক তাকে সব সময় ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে। এ ফাঁকটিকেই দালি ব্যবহার করেছেন তাঁর শিল্পে। পাশাপাশি দালি ছিলেন আধুনিক নকশা ও নান্দনিকতার এক মহাবিস্ময়। আজকের দিনে আমরা যে পপ-কালচার, হাই-ফ্যাশন কিংবা ডিজিটাল গ্রাফিক্স দেখি, তার ডিএনএতে দালির পরাবাস্তববাদী চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। দালির সেই অদ্ভুতুড়ে ভাবনা কীভাবে আধুনিক জীবনযাত্রায় মিশে গেছে, তা এক মুগ্ধকর অধ্যায়।
দালি বিশ্বাস করতেন, মানুষের শরীর নিজেই একটি চলমান ভাস্কর্য। ১৯৩০-এর দশকে প্রখ্যাত ফ্যাশন ডিজাইনার এলসা শিয়াপারেল্লির সঙ্গে দালির বন্ধুত্ব ফ্যাশন দুনিয়ায় এক ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছিল।
দ্য লবস্টার ড্রেস: দালি একটি সাদা সিল্কের গাউনের ওপর বিশাল এক লাল গলদা চিংড়ি এঁকে দিয়েছিলেন। সেই সময়ে এটি ছিল অকল্পনীয়। আজও ‘মেট গালা’ বা আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোতে যখন অদ্ভুত সব থিম দেখা যায়, তার উৎস মূলত দালির এই লবস্টার ড্রেস।
হলিউডের সায়েন্স ফিকশন এবং থ্রিলার সিনেমার ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ দালির কাছে ঋণী। ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমায় যখন শহরগুলো উল্টে যায় বা সময়ের প্রবাহ বদলে যায়, তখন আমাদের দালির ‘গলে যাওয়া ঘড়ি’র কথা মনে পড়ে। অবচেতন মনকে ভিজ্যুয়ালি উপস্থাপন করার ব্যাকরণ দালিই লিখে গেছেন।
জুতো-টুপি: দালি এবং শিয়াপারেল্লি মিলে একটি টুপি তৈরি করেছিলেন, যা দেখতে হুবহু ওল্টানো একটি হাই হিল জুতা। এটি ছিল প্রথাগত সৌন্দর্যের গালে একটি চড়। বর্তমানে লেডি গাগা বা কাইলি জেনারের মতো তারকারা যে ‘আভঁ-গার্দ’ পোশাক পরেন, তার পথপ্রদর্শক ছিলেন দালি।
কঙ্কাল গাউন: মানুষের শরীরের ভেতরের কঙ্কালকে পোশাকের বাইরে ফুটিয়ে তোলার ধারণাটিও দালির। আজকের ‘বডি কন্টুরিং’ বা ‘ট্রান্সপারেন্ট ফ্যাশন’-এ এর প্রভাব সরাসরি দৃশ্যমান।
ললিপপ ব্র্যান্ড ‘চুপা-চুপস’-এর লোগোটি দালির সেরা গ্রাফিকস কাজ। তিনি মাত্র এক ঘণ্টায় এটি ডিজাইন করেছিলেন। উজ্জ্বল হলুদ রঙের ওপর লাল রঙের ডেইজি ফুল। এটি আজও বিশ্বের অন্যতম স্বীকৃত লোগো।
দালি ফরাসি রেলওয়ে বা সুগন্ধি ব্র্যান্ডের জন্য যে পোস্টারগুলো করেছিলেন, সেখানে তিনি ‘অপটিক্যাল ইলিউশন’ বা দৃষ্টিভ্রম ব্যবহার করতেন। আজকের ডিজিটাল গ্রাফিকস ডিজাইনাররা যখন কোনো ছবির ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য ছবি তৈরি করেন, তাঁরা অজান্তেই দালির দেখানো পথ অনুসরণ করেন।
হলিউডের সায়েন্স ফিকশন এবং থ্রিলার সিনেমার ভিজ্যুয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ দালির কাছে ঋণী। ক্রিস্টোফার নোলানের সিনেমায় যখন শহরগুলো উল্টে যায় বা সময়ের প্রবাহ বদলে যায়, তখন আমাদের দালির ‘গলে যাওয়া ঘড়ি’র কথা মনে পড়ে। অবচেতন মনকে ভিজ্যুয়ালি উপস্থাপন করার ব্যাকরণ দালিই লিখে গেছেন। দালি স্বয়ং ওয়াল্ট ডিজনির সঙ্গে কাজ করেছিলেন ‘ডেস্টিনো’ নামের একটি শর্ট ফিল্মে। আধুনিক থ্রি-ডি অ্যানিমেশনে যে বিমূর্ত জগৎ দেখানো হয়, তার আদি রূপ ছিল দালির সে কাজগুলো।
আজকের ‘মডার্ন আর্ট’ ফার্নিচার বা অদ্ভুত আকৃতির আসবাবপত্রের জনক দালি। দ্য মে ওয়েস্ট লিপস সোফা আধুনিক ফার্নিচার ডিজাইনের ইতিহাসে একটি আইকন। যখন আমরা কোনো শপিং মল বা ক্যাফেতে ঠোঁট বা জুতা আকৃতির বসার আসন দেখি, তখন তা আসলে দালির সেই পরাবাস্তববাদী আসবাবেরই বিবর্তন। দালি একটি টেলিফোনের রিসিভারে গলদা চিংড়ি বসিয়ে দিয়েছিলেন। এটি ছিল ‘অপ্রত্যাশিত মিলন’-এর প্রতীক। বর্তমানে অনেক অদ্ভুতুড়ে হোম ডেকোরেশনে থিমটি ব্যবহৃত হয়।
দালি ও ফিলিপ হ্যালসম্যান মিলে ১৯৪৮ সালে ‘দালি অ্যাটমিকাস’ নামের একটি ছবি তুলেছিলেন, যেখানে দালি, চেয়ার এবং বিড়াল—সবকিছু বাতাসে ভাসছিল। ফটোশপ আসার অনেক আগেই দালি ছবির সঙ্গে খেলা করতেন। আজকের দিনে আমরা মোবাইলে যেসব ‘বিয়র্ড’ বা ‘পরাবাস্তব’ ফিল্টার ব্যবহার করি, কিংবা ইনস্টাগ্রামে ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট’ ফটোগ্রাফি দেখি, তার মূল সুরটি বেঁধে দিয়েছিলেন দালি।
দালির উত্তরাধিকার মানে যেখানে পাগলামিই বাস্তবতা। দালি বিশ্বাস করতেন, শিল্প জাদুঘরে বন্দী থাকার বিষয় নয়। শিল্প আমাদের পোশাকে, আমাদের খাবারের মোড়কে, এমনকি আমাদের বসার ঘরের সোফাতেও থাকতে পারে। ‘আমি মনে করি না যে আমি একজন খুব ভালো চিত্রশিল্পী, তবে আমি মনে করি আমি একজন অসাধারণ প্রতিভাবান ব্যক্তি।’ নিজের ব্যাপারে সালভাদর দালির মন্তব্য ছিল এ–ই।
জীবনের শেষ দিকে দালি কিছুটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৮২ সালে গালার মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দেয়। ফিগুয়েরেসে নিজের তৈরি করা ‘দালি থিয়েটার-মিউজিয়াম’-এ তিনি নিভৃতে সময় কাটাতেন। ১৯৮৯ সালের ২৩ জানুয়ারি, হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে এই মহান শিল্পী ধরাধাম থেকে বিদায় নেন। তাঁর বিদায় ছিল বিংশ শতাব্দীর এক মহাবিস্ময়ের বিদায়। অবশ্য বিদায়ের আগে তিনিই বলে গিয়েছিলেন, ‘পাগলামি আর প্রতিভার মধ্যে পার্থক্য খুব সামান্য আর আমি সেই পার্থক্যের নাম—সালভাদর দালি।’