বিটিভির লোগো পরিবর্তন বিতর্ক প্রসঙ্গে
বাংলাদেশ টেলিভিশন আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম। একটি পাইলট প্রজেক্টের আওতায় জাপানের এনইসি টিভির কারিগরি সহযোগিতায় ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় বাংলা ভাষার প্রথম টেলিভিশনটি চালু হয়। সেকালের ডিআইটি বিল্ডিংয়ের দুটি মাত্র কক্ষ নিয়ে এই টেলিভিশন কেন্দ্রের সূচনা!
বড় কক্ষটিতে ছিল স্টুডিও আর অপেক্ষাকৃত ছোট কক্ষটি ছিল টেলিভিশন কার্যালয়। সম্প্রচার পদ্ধতি ছিল সরাসরি! এখনকার মতো আগে রেকর্ডিং সিস্টেম বা ধারণপদ্ধতি তখন ছিল না বা আবিষ্কৃত হয়নি।
পাইলট প্রজেক্টের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জামিল চৌধুরী, যিনি এখনো জীবিত, বাস করছেন কানাডায়। তাঁর সঙ্গে প্রায় প্রথম থেকে যুক্ত ছিলেন বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী কলিম শরাফী, শহীদ মনিরুল আলম, মুস্তাফা মনোয়ার, ইঞ্জিনিয়ার এস ডি খান, ক্যামেরা পারসন রফিকুল বারী চৌধুরী, শিল্পী আনোয়ারুল হক, কেরামত মওলা, আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ আবদুল হাদী প্রমুখ। টেলিভিশন উদ্বোধনের আগে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটসের অধ্যক্ষ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে এই প্রতিষ্ঠানটির উপদেষ্টা করেন।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান পাইলট টেলিভিশনটির উদ্বোধন করেন। তখন রঙিন টিভি ছিল না, সম্প্রচার ব্যবস্থাও ছিল সাদাকালো।
উদ্বোধনের আগে সেকালের ঢাকা মহানগরে আগ্রহী গ্রাহকদের মধ্যে আবেদনের মাধ্যমে চার শ টাকার নির্ধারিত মূল্যে কয়েক শ সাদাকালো টিভি সেট বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। এখনকার নামজাদা চিত্রশিল্পী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী তখন সদ্য পাস করে চারুকলায় শিক্ষক নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি আবেদন করে প্রথম দফায় আসা জাপানের এনইসি ব্র্যান্ডের ২৪ ইঞ্চি একটি টেলিভিশন সেট পেয়ে যান। তিনি তখন মা–বাবা, ভাই-বোনদের সঙ্গে পুরান ঢাকার নারিন্দায় বাস করতেন। আশপাশের মানুষ কীভাবে যেন খবর পেয়ে ২৫ ডিসেম্বর বিকেলবেলায় টেলিভিশন উদ্বোধনের আগেই টিভিতে অনুষ্ঠান প্রচার দেখতে চলে আসেন। বাইরের মানুষকে বসার জায়গা দিতে গিয়ে তাঁরা নিজেরাই উদ্বোধন পর্ব দেখতে পারেননি! সেদিন প্রথম শিল্পী হিসেবে গান করেছিলেন আব্বাসউদ্দীনকন্যা ফেরদৌসী বেগম (রহমান)।
টেলিভিশনের লোগোটির খসড়া অঙ্কন করেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। ভাষাসংগ্রামী শিল্পী ইমদাদ হোসেন সেটিকে পূর্ণাঙ্গ করেন। সোনার বাংলার স্বর্ণালি রঙে টিভির কাঠামোর অভ্যন্তরে একটি রেখার ওপরে লাল সূর্য।
পাকিস্তান সরকার পাইলট টেলিভিশনকে একটি করপোরেশনে রূপান্তর করে, এর নাম হয় পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশন। পর্যায়ক্রমে ঢাকা, করাচি ও পিন্ডিতে গড়ে ওঠে তিনটি সম্প্রচার কেন্দ্র। ১৯৬৮-৬৯ সালে পাকিস্তানের উভয় অংশ থেকে অনেক মেধাবী শিল্পনির্দেশক, প্রযোজক, ক্যামেরা পারসন ও প্রকৌশলী টিভিতে যোগ দেন। তাঁদেরই একজন শিল্পী আবদুল মান্নান।
রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে বিজয় অর্জন করে মুক্ত হয়। সেদিন অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে শিল্পনির্দেশক মান্নান ডিআইটির অফিসে আসেন। ওই দিন বিকেল থেকেই টিভি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। টিভির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আলোচনা করে এর নাম ঠিক করেন বাংলাদেশ টেলিভিশন। সেদিন গ্রাফিকস শিল্পী কেউই উপস্থিত না থাকায় বাংলাদেশ টেলিভিশন নামাঙ্কিত লেখার টেলপ লিখেছিলেন শিল্পী আবদুল মান্নান। কালো রং করা টেলপ নামের চার গুণিতক পাঁচ ইঞ্চি কাগজের টুকরায় তিনি সাদা রঙে লিখেছিলেন—বাংলাদেশ টেলিভিশন!
নতুন দেশ, চেনা মুখের সমাহারে নতুন সরকার, প্রশাসন, জনজীবনেও ব্যাপক উৎসাহ–উদ্দীপনা! ১৯৭৩-৭৪ সাল থেকেই রামপুরায় বিটিভির কিছু কিছু রেকর্ডিং শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বিটিভির সব শাখা রামপুরার নবনির্মিত ভবনে স্থানান্তর হয়। ৯ জানুয়ারি এই কেন্দ্র উদ্বোধন করেন তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম।
১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে রঙিন টেলিভিশন চালু হলে শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার লোগোর ওই কাঠামোটিকেই জ্যামিতিক পরিমাপে গ্রাফ পেপারে এঁকে পরিশুদ্ধভাবে আঁকার উদ্যোগ নেন। লোগোর নিচে স্টাইলিক হস্তাক্ষরে বাংলাদেশ টেলিভিশন লেখাটির রেখাচিত্র তিনি এঁকে ডিজাইন শাখার প্রধান শিল্পী ইমদাদ হোসেনকে এটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেন। তিনি গ্রাফিক ডিজাইনার এ কে এম মাহতাবকে দিয়ে ওই আদলে লোগোর নিচের বাংলাদেশ টেলিভিশন লেখাটি লিখতে দেন। শিল্পী মাহতাব তুলি ও কালিতে লোগোর লেখাটি সম্পন্ন করেন। লোগোর রং ছিল আগের অনুরূপ।
১৯৯৬ সালের জুনের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলে তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাঈদের নির্দেশে তৎকালীন উপমহাপরিচালক অনুষ্ঠান মোস্তফা কামাল সৈয়দের তৎপরতায় বিটিভির লোগোর রং একপ্রকার বদলে যায়! লোগো নকশাবিদ মুস্তাফা মনোয়ারের সম্মতি ছাড়াই জাতীয় পতাকার সবুজ রঙে রাঙানো হয় টিভি কাঠামোটি। লাল বৃত্ত আগের মতোই বহাল থাকে। বাংলাদেশ টেলিভিশন লেখাটিও গোল্ডেন থেকে যায়।
সে সময় বিটিভির ডিজাইন শাখার পরিচালক শিল্পী আনোয়ার হোসেন লোগোর রং পরিবর্তনের বিরোধিতা করে মহাপরিচালক বরাবর চিঠি দেন এবং এর একটি কপি দেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে। এখন ওই রঙের আদলে সংবাদপাঠের টেবিল ও অ্যানিমেশনকৃত ব্যাকগ্রাউন্ডের ক্ষেত্রে ওই লোগোর রংগুলোই ব্যবহৃত হচ্ছে। আগের রঙের লোগোটির ব্যবহার দেখা যায় সকালবেলা অধিবেশনে শুরুর সংগীতচিত্র প্রচারকালে।
বিএনপির চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর বেসরকারি টেলিভিশনে টক শো উপস্থাপনাখ্যাত ব্যক্তিত্ব কাজী জেসিনকে বিটিভির মহাপরিচালক নিয়োগ দিয়েছেন। তিনি বিটিভির পর্দাকে বদলে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। এটি লক্ষণ হিসেবে ভালো!
তবে প্রথমেই তিনি একটি বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। এটি তাঁর মার্কেটিং পলিসি কি না, এ নিয়ে কেউ কেউ ধারণা করছেন। রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালক নতুন দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক দিন পর দেখা গেল—বিটিভির লোগো পরিবর্তনের লক্ষ্যে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার ঘোষণাসংবলিত একটি বিজ্ঞাপন প্রচার শুরু হয়েছে।
আর এ থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের সূত্রপাত।
বিশেষ করে বিটিভির সাবেক কর্মকর্তা যাঁরা এখন দেশ ও দেশের মানুষের কাছে অগ্রজ শিল্পী-বুদ্ধিজীবী হিসেবে সুপরিচিত, তাঁরা প্রায় সবাই লোগো পরিবর্তনকে অযৌক্তিক ও অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন। তাঁদের মতে, বিটিভির লোগোর ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে এবং দেশবরেণ্য শিল্পী ও টিভি ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পনা ও নকশায় সচল লোগোটির যেকোনো ধরনের পরিবর্তন কাম্য নয়। বিটিভির সাবেক পরিচালক শিল্পী আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য—এমন সহজ, সুন্দর ও অর্থবোধক লোগো আর হয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক রিলে দেখতে পেলাম, ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান টেলিভিশন করপোরেশনে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং পরে বিটিভির শিল্পনির্দেশনা শাখার সাবেক পরিচালক বয়োজ্যেষ্ঠ চিত্রশিল্পী আবদুল মান্নান বলেছেন, বিটিভির লোগো পরিবর্তন কোনো কাজের কথা নয়। কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুষ্ঠান ও সংবাদ পরিবেশনে পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন।
নাটকসহ বিটিভির বহু সফল অনুষ্ঠানের প্রযোজক সাবেক দুজন উপমহাপরিচালক খ. ম হারূন ও ফরিদুর রহমান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং চ্যানেল আইয়ে প্রচারিত প্রতিক্রিয়ায় লোগো পরিবর্তনের উদ্যোগকে অপ্রয়োজনীয় ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতাবিরোধী বলে আখ্যায়িত করেছেন।
খ. ম হারূন এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে জাপানের সরকারি টিভি চ্যানেল এনএইচকে, বিটিভি এবং বিবিসির লোগোর বিবর্তনের ছবি তুলে ধরেছেন। যাতে দেখা যাচ্ছে তিনটি লোগোতেই সামান্য কিছু পরিবর্তন হলেও মূল লোগোগুলো প্রায় একই আছে।
বিটিভির সাবেক উপমহাপরিচালক বীর মুক্তিযোদ্ধা লেখক-ভ্রামণিক ও ভ্রমণবিষয়ক কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফরিদুর রহমান তাঁর ফেসবুক পোস্টে বিটিভির লোগো পরিবর্তনের চেষ্টার বিরোধিতা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে টেলিভিশন প্রতিষ্ঠার পরপর নিয়োগপ্রাপ্ত শিল্পী এবং পরে বিটিভির সাবেক মুখ্য শিল্পনির্দেশক একুশে পদকপ্রাপ্ত অগ্রজ শিল্পী ও অভিনেতা কেরামত মওলার অভিমত নিয়েছি। তিনি বলেছেন, লোগো বদলাতে হবে না। আপনারা অর্থাৎ বিটিভি কর্তৃপক্ষ অনুষ্ঠানের মান বাড়ান, বৈচিত্র্য আনেন, সংবাদ পরিবেশনায় নিরপেক্ষতা দেখান, এতে বিটিভির দর্শক ক্রমান্বয়ে বাড়বে। একই মত দিয়েছেন বিটিভির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ লুৎফি আলী।
কথা বলেছি বিটিভির সাবেক দুই নিয়ন্ত্রক মানিক দে ও মোহাম্মদ আলমগীরের সঙ্গে। তাঁরাও লোগো পরিবর্তনের বিপক্ষে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক টিভি ইঞ্জিনিয়ার লতিফা বানু সুগন্ধিও একই মত ব্যক্ত করেছেন।
কর্মসূত্রে আমি দেখেছি, সরকারি টেলিভিশনের অনেক সীমাবদ্ধতা। সরকার চাইলেও অনেক সময় টিভি কর্মী ও কর্মকর্তারা সেলফ সেন্সরে এমন অভ্যস্ত, যা প্রতিষ্ঠানটির গণমুখী চরিত্র অর্জনের জন্য প্রতিবন্ধক। টিভি বিশ শতকের মাধ্যম। একুশ শতকে এসে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম দর্শকদের সব ধরনের বিনোদন চাহিদা পূরণ করার সামর্থ্য রাখে না। রিমোট হাতে দর্শক সব সময় বিকল্প খোঁজেন। দর্শককে পর্দামুখী করতে হলে অনুষ্ঠান এবং সংবাদকে গণমুখী ও নিরপেক্ষ করতে হবে। লোগো পরিবর্তন এসব সমস্যার সমাধান দেবে না।
লেখক: সাবেক পরিচালক (ডিজাইন), বাংলাদেশ টেলিভিশন