কবিতা হঠাৎ আসে, নাকি বানাতে হয়?

কবিদের ছবি ও প্রতিকৃতি অবলম্বনে। প্রথম আলো গ্রাফিকস

স্বতঃস্ফূর্ত কবিতা—এই শব্দবন্ধের মধ্যেই একটা দ্বন্দ্ব লুকিয়ে আছে। ‘কবিতা’ মানেই তো শব্দের বিন্যাস, ছন্দের হিসাব, চিত্রকল্পের বুনন—একরকম কারিগরি। আর ‘স্বতঃস্ফূর্ত’ মানে যেখানে কোনো হিসাব নেই, যেখানে ভাব নিজেই ফুটে ওঠে ঝরনার মতো, বিনা আমন্ত্রণে। তাহলে প্রশ্ন জাগে—কবিতা কি সত্যিই নিজে থেকে জন্মায়, নাকি কবির দীর্ঘ সাধনার ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়, অথচ প্রকাশের মুহূর্তে মনে হয় যেন অনায়াসে এসেছে?

পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্বে ওয়ার্ডসওয়ার্থ একটা বিখ্যাত ধারণা দিয়েছিলেন—কবিতা হলো প্রবল অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত উপচে পড়া, যা শান্ত স্মৃতিচারণার মধ্যে ফিরে আসে। অর্থাৎ আবেগ প্রথমে জ্বলে ওঠে, তারপর সেই আগুনের প্রতিফলন হয় শব্দে। এখানেই লুকিয়ে আছে স্বতঃস্ফূর্ততার আসল রহস্য—আবেগ তাৎক্ষণিক হলেও তার রূপায়ণ ঘটে একধরনের প্রশান্ত দূরত্ব থেকে। বাংলা কবিতার ধারায় এই স্বতঃস্ফূর্ততাকে আমরা অন্যভাবে দেখি। বাউল-লালনের গান তো আক্ষরিক অর্থেই তাৎক্ষণিক রচনা—আসরে বসে, একতারা হাতে, মুহূর্তের ভাব থেকে গান বেরিয়ে আসত। নজরুলের কথাও মনে পড়ে—তাঁর সম্পর্কে কিংবদন্তি আছে, তিনি নাকি একরকম প্রবাহের মধ্যে বসেই একের পর এক কবিতা-গান রচনা করতেন, কলম থামত না। অথচ জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়লে মনে হয় ঠিক উল্টো—নিরিবিলি, ধীর, বহু সংশোধনের ফসল। তবু তাঁর ‘রূপসী বাংলা’র পঙ্‌ক্তিগুলো পড়লে মনে হয় যেন কবি নিজেও জানতেন না এই চিত্রকল্প কোথা থেকে এল।

তাহলে দাঁড়াচ্ছে এই যে—স্বতঃস্ফূর্ততা দুই রকম হতে পারে। এক. রচনার মুহূর্তে সত্যিকারের তাৎক্ষণিকতা—যেখানে ভাবনা আর প্রকাশের মধ্যে কোনো ফাঁক নেই। দুই. পাঠকের কাছে যে অনায়াসতার অনুভূতি তৈরি হয়, যদিও তার পেছনে বহু বছরের অনুশীলন, বহু ব্যর্থ খসড়া। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, দীর্ঘ সাধনার পর একসময় ছন্দ রক্তের ভেতর ঢুকে যায়, তখন আর হিসাব করতে হয় না—হাত নিজে থেকেই সঠিক শব্দ খুঁজে নেয়। এই ‘নিজে থেকে’ হওয়াটাই আসল স্বতঃস্ফূর্ততা, যা আসলে সাধনার সবচেয়ে পরিণত রূপ। তাই স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাকে যদি নদীর সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে বলতে হয়—নদী স্বাধীনভাবে বইছে ঠিকই, কিন্তু তার গতিপথ তৈরি করেছে হাজার বছরের মাটি, পাথর, ভূমির ঢাল। কবিও তেমনি যখন নির্ভার হয়ে লেখেন, তখন আসলে তাঁর ভেতরে জমে থাকা পাঠ, অভিজ্ঞতা আর ছন্দবোধই তাঁকে পথ দেখায়। স্বতঃস্ফূর্ততা তাই স্বাধীনতা নয় শুধু, এক গভীর প্রস্তুতির নীরব ফসল। সাধারণত যাঁরা স্বভাবকবি, তাঁদের মধ্যে কবিতার এই স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা যায় খুব। আর ‘স্বভাবকবি’ শব্দটার মধ্যেই একটা রায় লুকিয়ে আছে—এটা কেবল বর্ণনা নয়, একরকম স্বীকৃতিও। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই পরিভাষাটি ব্যবহৃত হয় তাঁদের জন্য, যাঁদের কাব্যপ্রতিভা এসেছে জন্মগত সহজাত ক্ষমতা থেকে, প্রাতিষ্ঠানিক শাস্ত্রশিক্ষা বা সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের পাণ্ডিত্য থেকে নয়। এঁদের বিপরীতে দাঁড়ান ‘পণ্ডিত কবি’ বা ‘শাস্ত্রজ্ঞ কবি’রা—যাঁদের কবিতায় ব্যাকরণ, ছন্দশাস্ত্র, অলংকার—সবকিছুর সচেতন প্রয়োগ থাকে, যা তাঁরা অর্জন করেছেন দীর্ঘ অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে। স্বভাবকবির ভাষা সেখানে অনেক বেশি সরল, প্রায় মুখের বুলির কাছাকাছি, আর তাঁর চিত্রকল্প আসে সরাসরি জীবন-পর্যবেক্ষণ থেকে, বইয়ের পাতা থেকে নয়।

মজার ব্যাপার হলো, বাংলা সাহিত্যে এই ‘স্বভাবকবি’ উপাধিটা কার্যত একজন নির্দিষ্ট কবির নামের সঙ্গেই সেঁটে গেছে—তিনি গোবিন্দচন্দ্র দাস (১৮৫৫-১৯১৮)। সিলেটের এই কবিকে লোকে ‘স্বভাবকবি গোবিন্দচন্দ্র দাস’ নামেই চেনে, যেন এটা তাঁর নামের অংশ। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি, সংসারজীবন, ভক্তি—এসব এমন সাবলীলভাবে এসেছে যে পাঠকের মনে হয় এই মানুষটি কখনো ছন্দ নিয়ে মাথা ঘামাননি, কথা যেমন বেরোয়, তেমনি করেই কবিতাও বেরিয়ে এসেছে তাঁর কলম থেকে। মধ্যযুগে এই ধারার আরেক প্রতিনিধি চণ্ডীদাস—যদিও ইতিহাসবিদেরা ‘চণ্ডীদাস সমস্যা’ নিয়ে তর্ক করেন (একাধিক চণ্ডীদাস ছিলেন কি না), তবু তাঁর পদাবলি পড়লে মনে হয় রাধা-কৃষ্ণের প্রেম যেন সরাসরি হৃদয় থেকে উৎসারিত, কোনো শাস্ত্রীয় কাঠামো তার আগে বসানো হয়নি। একই কথা খাটে রামপ্রসাদ সেনের ক্ষেত্রে—কালীভক্তির গানগুলোতে যে আকুতি, তা মনে হয় যেন গায়ক নিজেও জানেন না পরের পঙ্‌ক্তিটা কী হবে, শুধু মায়ের কাছে কথা বলে যাচ্ছেন। আবার, বাউল-ফকির ঐতিহ্যে লালন শাহকে না আনলে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিংবদন্তি বলে তিনি ছিলেন প্রায় নিরক্ষর, অথচ তাঁর গানে যে দার্শনিক গভীরতা—দেহতত্ত্ব, মানুষতত্ত্বের যে জটিল ভাবনা, তা কোনো পুঁথিগত শিক্ষা থেকে আসেনি, এসেছে সরাসরি জীবন-অভিজ্ঞতা আর ধ্যান থেকে। এটাই স্বভাবকবিত্বের চরম রূপ, যেখানে অভিজ্ঞতাই একমাত্র শিক্ষক।

আরেকটা চমৎকার দৃষ্টান্ত হলো কবিয়াল বা কবিগানের কবিরা—অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রা, রামবসুর মতো মানুষেরা। ‘কবির লড়াই’-এর আসরে তাঁরা প্রতিপক্ষের ছুড়ে দেওয়া প্রশ্নের জবাব তাৎক্ষণিকভাবে পদ্যে রচনা করতেন, কোনো খসড়া ছাড়াই, দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে। এখানে স্বতঃস্ফূর্ততা শুধু কাব্যিক গুণ নয়, একরকম বেঁচে থাকার কৌশলও—মুহূর্তেই ভাবতে আর বলতে হতো একসঙ্গে। তাহলে স্বভাবকবির পরিচয় দাঁড়ায় এভাবে যে—তাঁদের কবিতা জন্ম নেয় জীবনের সরাসরি অভিজ্ঞতা, লোকজ সংস্কৃতি আর সহজাত ভাষাবোধ থেকে, শাস্ত্রীয় শিক্ষা তার ভিত্তি নয়। এই কারণেই তাঁদের রচনায় একধরনের অকৃত্রিম সারল্য থাকে, যা কখনো কখনো পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাব্যের চেয়েও বেশি হৃদয় ছুঁয়ে যায়—কারণ সেখানে কারিগরির আগে থাকে সততা।

অন্যদিকে পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিতা বা ‘বানানো কবিতা’—এই দ্বিতীয় নামটাই যেন একটা টিটকারি, তাই না? যেন বলা হচ্ছে, এখানে সৃষ্টি নেই, নির্মাণ আছে; হৃদয় নেই, কারিগরি আছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? নাকি এই কবিতাও তার নিজস্ব একধরনের সততা বহন করে—যেখানে কবি লুকান না যে তিনি শিখেছেন, পড়েছেন, চর্চা করেছেন; বরং সেই শেখাটাকেই কবিতার শরীরে প্রকাশ্যে বুনে দেন। এই ধারার শিকড় রয়েছে সংস্কৃত কাব্যতত্ত্বে। ক্ল্যাসিক্যাল সংস্কৃত সাহিত্যে কবিপ্রতিভাকে বিচার করা হতো তাঁর শাস্ত্রজ্ঞান, অলংকারকুশলতা আর ছন্দনৈপুণ্য দিয়ে—কালিদাস, ভারবি, দণ্ডী, মাঘের মধ্যে যে বিখ্যাত তুলনা প্রচলিত আছে, তাতে প্রত্যেক কবির একটা নির্দিষ্ট গুণকে চিহ্নিত করা হয়েছে—উপমার নৈপুণ্য, অর্থের গাম্ভীর্য, পদবিন্যাসের লালিত্য। অর্থাৎ কবিত্বকে সেখানে দেখা হতো কারিগরি দক্ষতার মাপকাঠিতেই, স্বতঃস্ফূর্ততার আবেগ দিয়ে নয়।

বাংলা সাহিত্যে এই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রাক্‌-আধুনিক দৃষ্টান্ত ভারতচন্দ্র রায়। তাঁর ‘অন্নদামঙ্গল’ পড়লে বোঝা যায় এই কবি শব্দ নিয়ে খেলছেন সচেতনভাবে—দ্ব্যর্থবোধক শব্দচয়ন, জটিল যমক-অনুপ্রাস, সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রের সচেতন প্রয়োগ। তাঁর বিখ্যাত আত্মপরিচয়— ‘অমিত্রাক্ষরে যাহা লিখিয়াছি আমি’-জাতীয় পঙ্‌ক্তিগুলোতে (এখানে আমি হুবহু উদ্ধৃত করছি না) তিনি নিজেই ঘোষণা করেন যে তাঁর ভাষা সহজ কিন্তু অর্থগর্ভ হবে—একরকম সচেতন কাব্য-দর্শন, যা স্বভাবকবির থাকে না।

কিন্তু বাংলা কাব্যে নির্মিত কবিতার সবচেয়ে বিশাল ও সাহসী নিদর্শন নিঃসন্দেহে মাইকেল মধুসূদন দত্ত। ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ আক্ষরিক অর্থেই এক নির্মিত স্থাপত্য—তিনি ইংরেজি ব্ল্যাংক ভার্সের আদলে বাংলায় প্রবর্তন করলেন অমিত্রাক্ষর ছন্দ, সংস্কৃত সমাসবদ্ধ পদ দিয়ে ভাষাকে করলেন ভারী-গম্ভীর, গ্রিক-ল্যাটিন মহাকাব্যের কাঠামো ধার করে পুরাণকে দিলেন নতুন ব্যাখ্যা। রাবণকে তিনি ভিলেন না বানিয়ে বানালেন ট্র্যাজিক নায়ক—এ এক সচেতন পুনর্নির্মাণ, কোনো সহজাত আবেগের উচ্ছ্বাস নয়। প্রতিটি পঙ্‌ক্তি যেন স্থপতির হাতে গড়া, প্রতিটি শব্দচয়ন যেন পরিকল্পিত। তাঁর উত্তরসূরি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় আর নবীনচন্দ্র সেনও এই মহাকাব্যিক-পাণ্ডিত্যের ধারা বহন করেছেন—ঐতিহাসিক-পৌরাণিক বিষয়বস্তু, ভারী সংস্কৃতমিশ্রিত ভাষা, সচেতন নির্মাণকৌশল।

বিশ শতকে এই ধারা রূপ বদলে ফিরে আসে বুদ্ধিদীপ্ত-দার্শনিক কবিতায়। সুধীন্দ্রনাথ দত্তকে প্রায়ই বলা হয় বাংলার সবচেয়ে ‘কঠিন’ কবি—তাঁর কবিতায় দর্শন, ইতিহাস, পাশ্চাত্য সাহিত্যের ইঙ্গিত এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে একবার পড়ে অর্থ ধরা পড়ে না, বারবার পড়তে হয়, টীকা খুঁজতে হয়। বুদ্ধদেব বসুও এই তালিকায় পড়েন—বোদলেয়ার, হ্যোল্ডারলিনের অনুবাদক, যাঁর নিজের কবিতাতেও ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদের গভীর প্রভাব আর মননশীলতা স্পষ্ট। অমিয় চক্রবর্তীর কবিতাও দর্শন আর মরমিয়াবাদের জটিল বুনটে গড়া, সহজপাঠ্য নয়। মজার বিষয়, একই কবির মধ্যেও এই দুই মেরু দেখা যায়। রবীন্দ্রনাথের প্রথম যুগের কবিতা—‘সন্ধ্যাসংগীত’, ‘প্রভাতসংগীত’ পর্ব—ভারী, সংস্কৃতাশ্রয়ী, প্রায় কৃত্রিম বলে সমালোচিতও হয়েছিল। অথচ পরিণত বয়সে তিনিই লিখলেন এমন ভাষা, যা সহজতার চূড়ান্ত রূপ। অর্থাৎ পাণ্ডিত্য থেকে সহজিকতায় যাত্রাও একধরনের কাব্যিক পরিণতি হতে পারে।

এবার প্রশ্ন হলো—একজন পাঠকের কাছে এই বানানো, পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিতার উপযোগিতা কী? স্বভাবকবিতা যদি হয় তাৎক্ষণিক আবেগের সঞ্চার, তাহলে পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিতা এক ভিন্ন ধরনের আনন্দ—বৌদ্ধিক উদ্দীপনার আনন্দ। এখানে পাঠকও কবির সঙ্গে একরকম যৌথ সাধনায় অংশ নেন—প্রতিটি ইঙ্গিত, প্রতিটি পৌরাণিক-ঐতিহাসিক রেফারেন্স খুঁজে বের করার মধ্যে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক শিকারের রোমাঞ্চ আছে, ঠিক যেমন জটিল স্থাপত্য দেখে স্থপতির কৌশল বোঝার চেষ্টা করা। এমন কবিতা পাঠককে ভাষার ভেতরের লুকানো ক্ষমতাগুলো চিনতে শেখায়—মধুসূদন যেমন বাংলা ভাষাকে দেখিয়েছিলেন সে গ্রিক-ল্যাটিন মহাকাব্যের ভার বহন করতে সক্ষম, তেমনি এই ধারার কবিতা প্রতিবার ভাষার সীমানা ঠেলে দেয়, পাঠকের শব্দভান্ডার আর চিন্তার পরিধি বাড়ায়। এটা একরকম সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধও—পাঠককে সংস্কৃত পুরাণ, ইতিহাস, দর্শনের বিশাল ভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, যা স্বভাবকবিতা প্রায়ই এড়িয়ে যায়।

তবে এর একটা মূল্যও আছে—এই কবিতা সহজে হৃদয় ছোঁয় না, প্রথম পাঠে দূরত্ব তৈরি করে। পাঠককে এখানে প্রস্তুতি নিয়ে আসতে হয়, নইলে কবিতা তার দরজা খোলে না। তাই এই কবিতার উপযোগিতা তাৎক্ষণিক আবেগমুক্তিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বৌদ্ধিক সমৃদ্ধিতে—যেমন জটিল কোনো সংগীত রচনা বারবার শুনে তবেই তার স্তরগুলো ধরা পড়ে, তেমনি পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিতাও বারবার ফিরে পড়ার দাবি রাখে, আর প্রতিবার ফেরায় নতুন কিছু উন্মোচিত হয়।

ও যখন প্রতিরাত্রে মুখে নিয়ে এক লক্ষ ক্ষত

আমার ঘরের দরজা খোলা পেয়ে ফিরে আসে ঘরে

দাঁড়ায় দুয়ারপ্রান্তে সমস্ত বিশ্বের স্তব্ধতায়

শরীর বাঁকিয়ে ধরে দিগন্তের থেকে শীর্ষাকাশ

আর মুখে জ্বলে থাকে লক্ষ লক্ষ তারার দাহন

অবলম্বনহীন ওই গরিমার থেকে ঝুঁকে পড়ে

মনে হয় এই বুঝি ধর্মাধর্মজ্ঞানহীন দেহ

মুহূর্তে মূর্ছিত হলো আমার পায়ের তীর্থতলে—

শূন্য থেকে শূন্যতায় নিরাকার অস্ফুট নিশ্বাস

মধ্যযামিনীর স্পন্দে শব্দহীন হলো, তখনও সে

দূর দেশে দূর কালে দূর পৃথিবীকে ডেকে বলেঃ

এত যদি ব্যুহ চক্র তীর তীরন্দাজ, তবে কেন

শরীর দিয়েছ শুধু বর্মখানি ভুলে গেছ দিতে!

[বর্ম/শঙ্খ ঘোষ]

হুইটম্যানের কবিতা পড়তে গিয়ে আমরা প্রায়ই ধন্দে পড়ে যাই যে তিনি কি স্বতঃস্ফূর্ততার কবি নাকি নির্মাণের? হুইটম্যান আসলে এমন এক কবি, যিনি এই দুই ধারার মধ্যে যে সীমারেখা আমরা টানছিলাম, তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দেন। উপরিতলে দেখলে তিনি স্বতঃস্ফূর্ততার সবচেয়ে বড় প্রবক্তা—কিন্তু গভীরে গেলে বোঝা যায়, সেই স্বতঃস্ফূর্ততা নিজেই ছিল এক আজীবন-দীর্ঘ কারিগরির ফসল।

আসুন, প্রথমে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ততার দিকটা দেখা যাক। হুইটম্যান যখন ‘Leaves of Grass’ নিয়ে এলেন ১৮৫৫ সালে, তখন তিনি ইংরেজি কবিতার প্রায় সব প্রথাগত নিয়ম ভেঙে দিলেন—অন্ত্যমিল নেই, নির্দিষ্ট ছন্দ-মাত্রা নেই, স্তবক-কাঠামো নেই। তাঁর পঙ্‌ক্তি লম্বা, শ্বাসের ছন্দে বাঁধা, যেন কেউ কথা বলছেন উচ্চস্বরে, কবিতা লিখছেন না। ‘Song of Myself’-এ তিনি নিজেকে, প্রকৃতিকে, আমেরিকার সাধারণ মানুষদের—কৃষক, কামার, দাস, বেশ্যা, প্রেসিডেন্ট—সবাইকে একই কাব্যিক শ্বাসে জড়িয়ে ফেলেন, দীর্ঘ তালিকার (catalog) আকারে। এই তালিকা-কৌশল যেন উপচে পড়া চেতনার প্রবাহ, যেখানে কবি থামছেন না, সম্পাদনা করছেন না, শুধু দেখছেন আর নাম করে যাচ্ছেন। ‘I Hear America Singing’-এও একই কৌশল—বিভিন্ন পেশার মানুষের গান একটার পর একটা সাজানো, যেন কবি রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে যা শুনছেন তাই লিখে ফেলছেন।

এই আপাত-অগোছালো, শ্বাসনির্ভর মুক্তছন্দ (free verse) তখনকার আমেরিকান-ব্রিটিশ কাব্য-সমালোচকদের কাছে প্রায় বর্বরতা মনে হয়েছিল। হুইটম্যান নিজেও নিজের কণ্ঠস্বরকে বর্ণনা করেছিলেন একধরনের অসংস্কৃত, তীব্র চিৎকার হিসেবে—পৃথিবীর ছাদ থেকে ছুড়ে দেওয়া এক আদিম হুংকার, যা কোনো ভদ্র কাব্যরীতির ধার ধারে না। এই আত্মবর্ণনাই বলে দেয় তিনি সচেতনভাবেই নিজেকে পণ্ডিতি-কাব্যের বিপরীত মেরুতে দাঁড় করাচ্ছিলেন।

কিন্তু এখানেই আসল বিস্ময়টা—এই ‘স্বতঃস্ফূর্ততা’ আসলে ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুচিন্তিত প্রকল্প। ‘Leaves of Grass’ তিনি প্রথম প্রকাশ করেন ১৮৫৫-তে, আর তারপর মৃত্যুর আগপর্যন্ত—প্রায় চার দশক ধরে—বইটিকে বারবার সংশোধন করে গেছেন, নতুন কবিতা যোগ করেছেন, পুরোনো পঙ্‌ক্তি পাল্টেছেন, একের পর এক সংস্করণ বের করেছেন। যে কণ্ঠস্বরকে পাঠকের কাছে মনে হয় বাঁধনহীন, স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের বিস্ফোরণ, তা আসলে দশকের পর দশক ধরে পালিশ করা এক নির্মিত রীতি। এ অনেকটা আমাদের প্রথম আলোচনার সেই কথাটার প্রতিধ্বনি—রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন সাধনার শেষে ছন্দ রক্তে ঢুকে যায়, হুইটম্যানের ক্ষেত্রেও তাই—তাঁর মুক্তছন্দ কোনো নিয়মহীনতা নয়, বরং নতুন এক শৃঙ্খলা, যা তিনি নিজেই আবিষ্কার করেছেন আর নিখুঁত করেছেন।

আরেকটা চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় যখন হুইটম্যান নিজের প্রধান রীতি থেকে সরে আসেন। আব্রাহাম লিংকনের মৃত্যুর পর লেখা ‘O Captain! My Captain!’ কবিতাটি তাঁর অন্য সব রচনার তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম—এখানে নির্দিষ্ট অন্ত্যমিল আছে, প্রথাগত স্তবক-কাঠামো আছে, প্রায় গীতিকবিতার নিয়ম মেনে লেখা। এটাই প্রমাণ করে হুইটম্যান পাণ্ডিত্যপূর্ণ রীতিতেও সমান দক্ষ ছিলেন, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে সেই রীতি এড়িয়ে গিয়েছিলেন তাঁর মূল কাব্যদর্শনের জন্য—কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, আমেরিকার নতুন গণতান্ত্রিক আত্মাকে ধরতে পুরোনো ইউরোপীয় ছন্দ-কাঠামো যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে ‘When Lilacs Last in the Dooryard Bloom'd’—এই একই লিংকন-শোকগাথায় তিনি ফিরে যান নিজের চেনা মুক্তছন্দে, প্রতীকের পুনরাবৃত্তিতে (লিলাক ফুল, তারা, পাখির গান) গড়া দীর্ঘ, তরঙ্গায়িত শোকসংগীতে।

তাহলে হুইটম্যানকে কোথায় বসাব? তিনি আসলে এই দুই ধারার একটা সংশ্লেষ তৈরি করেন—ফর্মের দিক থেকে তিনি স্বভাবকবির মতো, প্রথাগত শাস্ত্র প্রত্যাখ্যান করে জীবনের কাঁচা অভিজ্ঞতা, শরীর, প্রকৃতি, গণতন্ত্রকে সরাসরি ধরতে চান। কিন্তু সেই ধরার প্রক্রিয়াটা ছিল অত্যন্ত সচেতন, বুদ্ধিদীপ্ত এক নান্দনিক প্রকল্প—নতুন আমেরিকান কণ্ঠস্বর তৈরি করার জন্য যা ইউরোপীয় পাণ্ডিত্যের বিরুদ্ধে এক ঘোষিত বিদ্রোহ। তাঁর কবিতা তাই শেখায়—স্বতঃস্ফূর্ততা মানে অগভীরতা নয়; বরং এটি হতে পারে এমন এক গভীরতম শিল্পকৌশল, যা নিজের কারিগরিকে এমনভাবে লুকিয়ে ফেলে যে পাঠক ভুলে যান কোনো কারিগরি ছিল।

জয় গোস্বামীর ক্ষেত্রে এসে আবারও সেই একই প্রশ্ন ফিরে আসে, যা হুইটম্যানের বেলাতেও এসেছিল—উপরিতলের সারল্য কি সত্যিই সারল্য, নাকি সেটা এক গভীরতর কারিগরির মুখোশ? আর জয় গোস্বামীর কবিতা পড়লে এই দ্বন্দ্বটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে, কারণ তিনি আক্ষরিক অর্থেই দুই মেরুর মধ্য দিয়ে যাত্রা করেছেন—একেবারে শাস্ত্রীয় পশ্চিমা ফর্ম থেকে শুরু করে চূড়ান্ত কথ্যভাষার আবেগঘন উচ্চারণ পর্যন্ত। শুরুটা হয়েছিল আশ্চর্যজনকভাবে পাণ্ডিত্যপূর্ণ দিক থেকেই। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম নিজেই সাক্ষ্য দেয়—‘ক্রিসমাস ও শীতের সনেটগুচ্ছ’ প্রকাশ পায় ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে। ভাবুন তো—সনেট! ইউরোপীয় কাব্যের সবচেয়ে কঠোর নিয়মে বাঁধা এক রূপ, যেখানে চৌদ্দ পঙ্‌ক্তি, নির্দিষ্ট অন্ত্যমিল-বিন্যাস, নির্দিষ্ট ছন্দ মেনে চলতে হয়। এটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত তরুণের প্রথম উচ্ছ্বাস নয়—এটা একজন তরুণ কবির সচেতন ঘোষণা যে তিনি ফর্মের শৃঙ্খলা জানেন, আয়ত্ত করেছেন।

কিন্তু এরপর যা ঘটল, তা এক আশ্চর্য রূপান্তর। সমালোচকেরা তাঁকে বর্ণনা করেন এমন এক কবি হিসেবে, যিনি জীবনানন্দের পরে বাংলা কাব্যজগতে এক স্পষ্ট বাঁকবদলের কাব্যভাষা নির্মাণ করে গেছেন—আর সেই বাঁকবদলের মূল চরিত্র হলো, তাঁর ভাষা অত্যন্ত কথ্য, প্রাঞ্জল ও বাস্তবনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ‘প্রাক্তন’ কবিতাটিই এর ভালো দৃষ্টান্ত—বিচ্ছেদ-পরবর্তী জীবনের একাকিত্ব, অভ্যস্ততার প্রশ্ন নিয়ে লেখা এই কবিতায় তিনি প্রায় দৈনন্দিন কথোপকথনের ভাষা ব্যবহার করেন, যেন কেউ পাশে বসে সরাসরি মনের কথা বলছেন, কোনো আলংকারিক আড়াল ছাড়াই। আর তাঁর সেই বিখ্যাত ‘পাগলি’ ধারার কবিতাগুলো—এই সিরিজ পড়লে মনে হয় যেন কবি নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন, প্রেম আর আসক্তির এক দুর্বার প্রবাহে ভেসে যাচ্ছেন। এই কবিতাগুলোর সুর এমনই তীব্র ব্যক্তিগত আর তাৎক্ষণিক যে পাঠকের মনে হয় এ যেন সরাসরি কবির উন্মত্ত হৃদয় থেকে উৎসারিত, কোনো সম্পাদনার ছোঁয়া লাগেনি। এই দিক থেকে তিনি স্বভাবকবির খুব কাছাকাছি দাঁড়ান—আবেগের অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস, শাস্ত্রীয় দূরত্ব ভেঙে ফেলা।

তবু এখানেই আসল কৌশলটা লুকিয়ে। যাঁরা তাঁর কবিতা গভীরভাবে পড়েছেন তাঁরা লক্ষ করেন যে এই আপাত-উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বরের পেছনে আছে ছন্দের বৈচিত্র্য এবং প্রতীকের ব্যবহারে অনন্য এক দক্ষতা। অর্থাৎ তিনি একই কবিতার মধ্যে বিভিন্ন ছন্দরীতি বদলে বদলে ব্যবহার করেন, প্রতীক আর চিত্রকল্পকে এমনভাবে সাজান, যা প্রথম পাঠে চোখে পড়ে না, কিন্তু কাঠামোটা নিখুঁতভাবে বোনা। উইকিপিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী তাঁর কবিতা চমৎকার চিত্রকল্পে, উপমা এবং উৎপ্রেক্ষায় ঋদ্ধ—আর উপমা-উৎপ্রেক্ষা তো সংস্কৃত অলংকারশাস্ত্রেরই পরিভাষা, যা নিছক আবেগের উচ্ছ্বাসে আসে না, দীর্ঘ কাব্যচর্চার ফসল। ‘বজ্রবিদ্যুৎ-ভর্তি খাতা’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন—এই ধরনের স্বীকৃতি সাধারণত ফর্মের ওপর দখলকেই কুর্নিশ জানায়।

তাহলে বলা যায়, জয় গোস্বামী যেন হুইটম্যানেরই এক বাংলা প্রতিধ্বনি—পার্থক্য শুধু এই যে হুইটম্যান শুরু থেকেই মুক্তছন্দে বিদ্রোহ করেছিলেন, আর জয় গোস্বামী শুরু করেছিলেন সনেটের কঠোর শৃঙ্খলে বাঁধা হয়ে, তারপর ধীরে ধীরে সেই শৃঙ্খল ভেঙে খুঁজে নিয়েছেন কথ্যভাষার মুক্তি। তাঁর কবিতা তাই এক অদ্ভুত দ্বৈততা বহন করে—উপরিতলে যা মনে হয় পাগলামির মতো বাঁধনহীন আবেগ, তার নিচে বহমান থাকে সংস্কৃত অলংকার আর ছন্দশাস্ত্রের গভীর জ্ঞান। যেন এক নদী, যার স্রোত দেখে মনে হয় সে খেয়ালখুশিমতো বইছে, অথচ তার প্রতিটি বাঁক আসলে ভূতত্ত্ববিদের নিখুঁত হিসেবে গড়া।

এখানেই বোধ হয় আধুনিক বাংলা কবিতার এক বড় শিক্ষা লুকিয়ে—স্বভাবকবিতা আর পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিতা আসলে দুই বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; বরং একই বর্ণালীর দুই প্রান্ত, আর সবচেয়ে শক্তিশালী কবিরা প্রায়ই দুই প্রান্তের মধ্যে সেতু বেঁধে দেন, যাতে পাঠক আবেগের উষ্ণতাও পান, আবার ভাষার গভীর কারুকাজও।

কথা প্রসঙ্গে পলাশ দত্ত একবার বলেছিলেন, ‘এ দেশে সমকালীন খুব কম লোকই কবি হতে পেরেছেন। মজনু শাহ্ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তবে তিনি সৃষ্টি নয়, কবিতা নির্মাণ করেন।’ হ্যাঁ, মজনু শাহর ক্ষেত্রে একটা দারুণ ব্যাপার ঘটে—তিনি নিজেই এই যে প্রশ্নটা নিয়ে আমরা এতক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছি, তার একটা সরাসরি উত্তর দিয়ে রেখেছেন, নিজের ভাষাতেই। ফলে তাঁর কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমাদের শুধু বাইরে থেকে বিচার করলেই চলবে না, তাঁর নিজের কাব্য-দর্শনের দিকেও তাকাতে হবে। জন্ম ১৯৭০ সালের ২৬ মার্চ—মজনু শাহ্ সমকালীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি, বর্তমানে ইতালিপ্রবাসী। তাঁর কাব্যসমগ্র ‘বাল্মীকির কুটির’-এ আছে আনকা মেঘের জীবনী, লীলাচূর্ণ, মধু ও মশলার বনে, জেব্রামাস্টার, ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না, আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া—এই বইগুলোর কবিতা।

প্রথমে যদি পাণ্ডিত্যের দিকটা দেখি—তাঁর কাব্যভাষায় একটা গভীর মিথতাত্ত্বিক আর দার্শনিক স্তর কাজ করে। তাঁর কাব্যসমগ্রের নাম ‘বাল্মীকির কুটির’—এই শিরোনামেই লুকিয়ে আছে এক সচেতন সাহিত্যিক ইঙ্গিত, কারণ বাল্মীকি তো সংস্কৃত কাব্যের আদিকবি, রামায়ণের রচয়িতা। এই নামকরণ নিছক কাকতালীয় নয়—এতে কবির নিজের অবস্থানকে বাংলা কাব্যের এক দীর্ঘ ঐতিহ্যের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার প্রয়াস স্পষ্ট। সমালোচকেরা তাঁর কবিতাকে বর্ণনা করেন এমন ভাষায়, যেখানে অর্থস্তরে বহমান সংকেত উদ্ধার করাই এক বড় চ্যালেঞ্জ, আর তাঁর কবিতা স্থানিক অনুষঙ্গে নিজেকে জড়ালেও হারিয়ে-ফেলা জীবনরহস্যের চাবি ফিরে পাওয়ার মনোবাসনায় কবিকে বাস্তবাতীত পরাবিশ্বে নিয়ে যায়। অর্থাৎ তাঁর কবিতা সহজপাঠ্য নয়—পুরাণ, দর্শন, প্রতীকের জটিল স্তর পেরিয়ে তবেই অর্থ ধরা দেয়, অনেকটা সুধীন্দ্রনাথ বা বুদ্ধদেব বসুর ধারার মতোই দুরূহ।

তাঁর সংক্ষিপ্ত কবিতার বই ‘আমি এক ড্রপআউট ঘোড়া’-তেও এই বৌদ্ধিক কাঠামোর প্রমাণ মেলে—দুই-তিন লাইনের ২৬২টি ক্ষুদ্র কবিতা নিয়ে গড়া এই বইয়ের কবিতাগুলোকে কবি নিজেই প্রশ্ন তুলে বলেন এগুলো ব্ল্যাকহিউমার, হেত্বাভাস, নাকি ন্যানো—এই নামকরণ নিয়ে দ্বিধান্বিত। ‘হেত্বাভাস’ শব্দটা লক্ষ করুন—এটা ন্যায়দর্শনের পরিভাষা, যুক্তিবিদ্যার একটা কৌশলগত ভ্রান্তি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। একজন কবি যখন নিজের কবিতা বর্ণনা করতে সংস্কৃত দর্শনশাস্ত্রের পরিভাষা টেনে আনেন, বোঝা যায় তাঁর কাব্যভাবনার পেছনে কতটা বৌদ্ধিক প্রস্তুতি কাজ করছে। অথচ ঠিক এই জায়গা থেকেই তিনি নিজে স্বতঃস্ফূর্ততার পক্ষে দাঁড়িয়ে পড়েন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজের কথ্য, সরল ভাষাব্যবহারের কথা বলতে গিয়ে স্বীকার করেন যে মাঝেমধ্যে এমন অদ্ভুত পঙ্‌ক্তি তাঁর হাতে চলে আসে, যার উৎস তিনি নিজেও ব্যাখ্যা করতে পারেন না। তাঁর নিজস্ব সিদ্ধান্ত এখানে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ—তিনি মনে করেন অদ্ভুত রস সৃষ্টি সব সময় সচেতন প্রয়াস নয়, তা স্বতঃস্ফূর্তভাবেও আসতে পারে। এটা প্রায় আমাদের গোটা আলোচনার সারসংক্ষেপের মতো শোনায়। একজন কবি নিজেই বলছেন—এই দুই ধারা পরস্পরবিরোধী নয়, একসঙ্গে বাস করতে পারে একই সৃষ্টিপ্রক্রিয়ায়।

তাঁর ‘নির্বাচিত দশ কবিতা’ সংকলনের কবিতাগুলোতেও এই দ্বৈততা স্পষ্ট—একদিকে পুরাণ-দর্শনের ইঙ্গিত (নটরাজ, ক্লাউনের ইশারার ছন্দের মতো জটিল প্রতীক), অন্যদিকে ‘আত্মজীবনী’ শিরোনামের কবিতায় শিউলি ফুল, ধুলো—এমন খুবই সাধারণ, প্রায় গার্হস্থ্য চিত্রকল্পের সরাসরি ব্যবহার। এই দুইয়ের মিশ্রণেই তাঁর কণ্ঠস্বরের নিজস্বতা তৈরি হয়। তাহলে মজনু শাহকে যদি এককথায় বসাতে হয়—তিনি স্বভাবকবি নন, কারণ তাঁর কবিতার পেছনে স্পষ্ট বৌদ্ধিক-দার্শনিক কাঠামো, পুরাণ-সচেতনতা কাজ করে। কিন্তু তিনি খাঁটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ কবিও নন, কারণ তিনি নিজেই বিশ্বাস করেন যে ভাষার সবচেয়ে চমকপ্রদ মুহূর্তগুলো পরিকল্পনার বাইরে থেকে আসে। তাঁর কবিতা তাই দাঁড়ায় এক তৃতীয় বিন্দুতে—যেখানে সচেতন কারিগর অপেক্ষা করে থাকেন অচেতনের আকস্মিক উপহারের জন্য, আর দুটো মিলেই তৈরি হয় সেই ‘রূপময় চোরাটান’, যা পাঠককে বারবার ফিরিয়ে আনে তাঁর কবিতায়।