গান বন্ধের এই সময়ে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ কেন জরুরি
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশ লাইনসে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার কারণে অনুষ্ঠান পণ্ড হয়ে গেছে। একই সময়ে একদল লোকের দাবির মুখে কিশোরগঞ্জ জেলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য কনসার্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গানসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হামলা বা হুমকির মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়ার বেশ কিছু ঘটনা গত কয়েক মাসে ঘটেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হামলাকারী বা হুমকিদাতারা তাদের এসব পদক্ষেপের পেছনে কারণ হিসেবে ‘ধর্ম’কে সামনে নিয়ে এসেছে। একবিংশ শতাব্দীর সিকি ভাগ পার হওয়ার পরও তারা দাবি করছে, গান ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে ইসলাম ধর্মের সম্পর্ক সাংঘর্ষিক। এ ভূখণ্ডে ধর্মের এমন স্বঘোষিত ব্যাখ্যাকারের আবির্ভাব নতুন নয়। গত শতাব্দীতেও এমন অযৌক্তিক ও উগ্র কথাবার্তা শোনা গেছে।
১৯২৬ সালে ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য সমাজের উদ্যোগে সংগঠিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এ বছর শতবর্ষে পদার্পণ করেছে। এ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ প্রবন্ধে তিনি বলেছিলেন—
‘মুসলমানের যে গৃহ নেই, তার একটা কারণ, আনন্দের উপকরণের অভাব। মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এক কথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনও সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে বাড়বে, আর বসে বসে স্বামীর পা টিপে দেবে;—তা ছাড়া খেলাধুলা, হাসিতামাশা বা কোনও প্রকার আনন্দ তারা করবে না—সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত হয়ে থাকবে। মুসলমান বাপের সামনে হাসবে না, বড় ভাইয়ের সামনে খেলবে না, গুরুজনের অন্যায় কথারও প্রতিবাদ করবে না,—এমনকি কচি ছেলেমেয়েরা পর্যন্ত মার খেলেও চেঁচিয়ে কাঁদবে না! এই রকম হাজার হাজার আইনকানুনের বেড়াজালে পড়ে মুসলমান ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছে। আনন্দ? কোথায় আনন্দ? কী হবে আনন্দে? মুসলমান তো বেঁচে থাকতে আনন্দ করে না, সে মরে গিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করে পেট ভরে খাবে, আর হুরপরীদের নিয়ে অনন্তকাল ধরে আনন্দ করবে। ব্যস্! এই তার সান্ত্বনা!’
এ উদ্ধৃতাংশটুকু অনায়াসে বর্তমান সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে পাঠ করা যায়। শুধু কাজী মোতাহার হোসেন নন, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী অন্য লেখকেরাও তাঁদের প্রবন্ধে যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন, শিল্পকলা ও সংস্কৃতিচর্চা মানে ধর্মবিরোধিতা নয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের নেতৃত্বে সংগঠিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে নানা চড়াই-উতরাই পার হতে হয়েছে। উদার ও শিক্ষিত মুসলমানরা এ আন্দোলনকে স্বাগত জানালেও রক্ষণশীল নবাব পরিবার ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারকবাহকেরা এ আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। শুধু বিরোধিতা করেনি, আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় সংগঠকদের মানসিক নির্যাতন করেছে, এমনকি জীবননাশের হুমকিও দিয়েছে। আন্দোলনের বিরুদ্ধ পক্ষ নিজেদের পত্রপত্রিকায় সংগঠকদের সম্পর্কে কুৎসা রটনা ও অপপ্রচার চালিয়েছে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কখনো ধর্মবিরোধিতা করেনি। অথচ এ আন্দোলনের উদ্যোক্তাদের ‘ধর্মবিরোধিতা’র দায়ে অভিযুক্ত হতে হয়েছে। উদার মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল এ আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য। ধর্মান্ধতা, সংকীর্ণতা ও কূপমণ্ডূকতার অন্ধকারের বিপরীতে এ আন্দোলন জ্ঞানের আলো জ্বালিয়েছিল। এ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত চিন্তাবিদদের মধ্যে কেউ ‘নাস্তিক’ বলে নিজের পরিচয় দেননি। কেউ কেউ ‘ধার্মিক’ ছিলেন। কেউ কেউ ‘ধর্মমোহ’ দ্বারা আচ্ছন্ন হননি। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতারা অন্ধ শাস্ত্রানুগত্য বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন যুক্তিবাদ ও মানবকল্যাণের তাগিদ থেকে। তাঁরা যে জ্ঞানভিত্তিক, পরমতসহিষ্ণু, উদার ও মুক্ত সমাজের জন্য লড়াই করেছিলেন, সেই সমাজ কি আমরা পেয়েছি?
শতবর্ষ আগে মুসলিম সাহিত্য সমাজ যে সমস্যাগুলো মোকাবিলা করেছিল, এর মধ্যে ছিল অন্ধ শাস্ত্রানুগত্য, ধর্মীয় কূপমণ্ডূকতা, নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা, শিল্পকলার প্রতি বিরূপতা, সর্বোপরি প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী জীবনদর্শনের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ। এ থেকে কি আমরা মুক্ত হতে পেরেছি? সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, অশিক্ষা, নারীবিদ্বেষ, শিল্পকলার প্রতি বিরূপতা একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশেও বিদ্যমান। কোনো কোনো সমস্যা আগের চেয়েও প্রকট হয়েছে। গত কয়েক বছরে ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা এমনভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে যে সম্পদহানির পাশাপাশি বিপুল প্রাণহানিও ঘটেছে। নারীর অবরোধদশা ক্ষেত্রবিশেষে আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
চল্লিশের দশক থেকে এ ভূখণ্ডে পাকিস্তান আন্দোলনের জোয়ার তৈরি হয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র পাকিস্তান নিঃসন্দেহে বাঙালি মুসলমানের সমর্থন লাভ করেছিল। তবে দ্রুত তাদের পাকিস্তান মোহ কেটে যায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালির প্রথম শক্তিশালী প্রতিবাদ। এ প্রতিবাদ সাংস্কৃতিক তথা ভাষাভিত্তিক। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রশ্নে বাঙালির অনমনীয় অবস্থান বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনেরই ফলশ্রুতি। এ আন্দোলনের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ গোটা পাকিস্তান পর্বেই মুক্তবুদ্ধির আলোকশিখা প্রজ্বলিত রেখেছেন। ষাটের দশকে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনেরই ফলাফল। ষাটের দশকের সাংস্কৃতিক জাগরণ বাঙালি জাতিকে রক্তাক্ত মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। বাংলাদেশের অভ্যুদয় বাঙালির জাগরণের এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।
কাজেই এটি দাবি করা অযৌক্তিক হবে না, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রভাব একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম লাভ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে নৈরাশ্য ও স্বপ্নভঙ্গ জাতির মর্মবেদনার কারণ হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎ প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। কখনো কখনো পশ্চাৎপদ চিন্তা আমাদের আচ্ছন্ন করেছে। তবে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও মুক্তবুদ্ধির মশালটি নির্বাপিত হয়নি। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উত্তরসূরিরা কখনো বিচ্ছিন্নভাবে, কখনোবা ঐক্যবদ্ধভাবে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা পালন করেছেন। স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংস্কৃতিচর্চায় উদার মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার যে ধারা দৃশ্যমান, তা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনেরই উত্তরাধিকার বহন করছে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চলার পথে যে চড়াই-উতরাই থাকে, তা এক কঠিন সত্য। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। ইউরোপের ইতিহাসে যাকে ‘মধ্যযুগ’ বলা হয়, সেই মধ্যযুগে অজ্ঞতার অন্ধকারকে টিকিয়ে রেখেছিল তখনকার ক্যাথলিক চার্চকেন্দ্রিক ধর্মতন্ত্রের ধারকেরাই। সেই অন্ধকার দূর করে রেনেসাঁস ঘটাতে চাইলেন যাঁরা, তাঁদের অনেককেই ক্ষমতাধর ধর্মতন্ত্রীদের আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। যাঁর বিরুদ্ধেই ধর্মবিরোধিতার অভিযোগ উঠত, তাঁরই প্রাণ হনন করা হতো। সে সময়কার প্রখ্যাত মুক্তবুদ্ধিসাধক গিওর্দানো ব্রুনোকে ধর্মবিরোধিতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে আট বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হয় এবং পরে চার্চের আদেশে তাঁকে অগ্নিদগ্ধ করে মেরে ফেলা হয়। এর বেশ কিছুদিন পর ‘সূর্য নয়, পৃথিবীই সূর্যের চারদিকে ঘোরে’—বিজ্ঞানী গ্যালিলিও যখন অকাট্য প্রমাণসহযোগে এই সত্য উপস্থিত করলেন, তখন চার্চের ক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। তাই ব্রুনোর মতো তাঁকে পুড়িয়ে মেরে ফেলতে পারেনি, কারাগারে আটক করে রেখেছিল। পরবর্তী সময়ে চার্লস ডারউইন যখন ‘প্রাণীর ক্রমবিবর্তনের’ যুগান্তকারী তত্ত্ব প্রকাশ করলেন, তখন সারা পৃথিবীর ধর্মান্ধ গোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হলেও ডারউইন ও তাঁর সমর্থকদের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি।
উনিশ শতকে কলকাতায় রেনেসাঁসের মতো যে ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল, সেই রেনেসাঁসের পথিকৃৎ রাজা রামমোহন রায় যদিও গভীরভাবে ঈশ্বর-বিশ্বাসী ও ধার্মিক ছিলেন, তবু একেশ্বরবাদের কথা বলে ও হিন্দু সমাজে প্রচলিত সতীদাহর মতো চূড়ান্ত অমানবিক প্রথাকে উচ্ছেদ করতে গিয়ে তিনি ধর্মবিরোধীরূপে চিহ্নিত হন এবং সীমাহীন লাঞ্ছনার শিকার হন। একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল বিধবাবিবাহ প্রবর্তন ও বহুবিবাহ বন্ধে উদ্যোগী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরসহ রেনেসাঁস-চৈতন্যের ধারকবাহক প্রায় সব মনীষীরই। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রযাত্রাকে রুদ্ধ করতে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এ আন্দোলনের সংগঠকদের ধর্মবিরোধিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন। এ অভিযোগ অসাধারণ যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করেছেন যতীন সরকার। ‘মুক্তবুদ্ধির চড়াই-উতরাই’ বইয়ে তিনি লিখেছিলেন—
‘দুর্গতির পঙ্ক থেকে উদ্ধার করে সমাজকে এঁরা প্রগতির রথযাত্রী করতে চেয়েছিলেন। এঁরা ধর্মবিরোধী তো ছিলেন না, বরং প্রকৃত ধর্ম প্রতিষ্ঠাই ছিল এঁদের জীবনের ব্রত। মুসলমানরূপে এঁরা অবশ্যই ইসলামের মর্মবাণীকে অন্তরে ধারণ করতেন। তবে এঁদের ইসলাম-ভাবনা তথা ধর্মবোধ সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার ঘোলাজলের ডোবায় আবদ্ধ ছিল না, ছিল বিশ্ববোধের স্বচ্ছ স্রোতোধারায় স্নাত। তাই, অনায়াসেই এঁরা পূর্বসূরি নানক, কবীর, রামমোহন প্রমুখ মনীষীর উদার ধর্মচিন্তার উপাদান দিয়েও নিজেদের সমৃদ্ধ করে নিতে পেরেছিলেন। বিকৃত ভাষ্যের অন্ধকার থেকে ধর্মের মুক্তি ঘটিয়ে সমাজকে আলোকিত করে তোলাই ছিল এঁদের আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য।’
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম বিশেষত্ব হচ্ছে সংঘবদ্ধভাবে মুক্তবুদ্ধির চর্চা করা। এ আন্দোলনের আগেও উপমহাদেশের মুসলমান মুক্তচিন্তা ও যুক্তিবাদিতার চর্চা করেছে; কিন্তু তা ছিল বিচ্ছিন্ন প্রয়াস। বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে তা ছিল লক্ষ্যহীন। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংঘবদ্ধভাবে কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত প্রথম স্থাপন করে মুসলিম সাহিত্য সমাজ।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে এর সংগঠকেরা সচেতন ছিলেন। কেউ কেউ আত্মসমালোচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম মোতাহের হোসেন চৌধুরী। মুসলিম সাহিত্য সমাজ কেন তখন লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি, সে বিষয়ে ‘রিনেসাঁস: গোড়ার কথা ও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছিলেন, ‘এর আরব্ধ কাজ শেষ হতে পারেনি রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের আবির্ভাবে।’ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণাকে পুষ্ট করেছিল। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রেরণা ছিল সেক্যুলারিজম অর্থাৎ ইহজাগতিকতা, যা চরিত্রগতভাবে অসাম্প্রদায়িক, উদার ও যুক্তিবাদী। এ আন্দোলনের সঙ্গে তৎকালীন রাজনৈতিক ধারার সংঘাত অনিবার্য ছিল। বাঙালি মুসলমান রাজনীতিবিদদের ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের লেখকদের দৃষ্টিভঙ্গিগত অবস্থান ছিল বিপরীত মেরুতে। রাজনীতি কখনোই সাহিত্য সমাজের আগ্রহের বিষয় ছিল না। তাঁদের অবলম্বিত পথ ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতি। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মানুষের মনোজগতের উৎকর্ষ সাধন করতে চেয়েছিলেন।
মুসলিম সাহিত্য সমাজ রাজনীতিতে না জড়াতে চাইলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁদের কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। এটাই স্বাভাবিক। সমাজ কখনো রাজনীতি–বিচ্ছিন্ন নয়। সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অভাবে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এক চলমান প্রক্রিয়া। ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান আমল পেরিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নানা ঘাত–প্রতিঘাতের সম্মুখীন হচ্ছে। বর্তমান সমাজ যেসব সংকটের মুখোমুখি, সেই সংকট নিরসনে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন এক অসামান্য প্রেরণা। অজ্ঞানতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা ও পশ্চাৎপদ চিন্তাভাবনা যত দিন সমাজে থাকবে, তত দিন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা থাকবে। এ ক্ষেত্রে সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিসীম। এটি নিশ্চিত করতে হলে সংস্কৃতিচর্চা বেগবান করার কোনো বিকল্প নেই। হাঙ্গেরির দার্শনিক লুকাচ বলেছিলেন, সংস্কৃতিই লক্ষ্য, রাজনীতি সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় মাত্র। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের পুনর্জাগরণের জন্য কথাটি মনে রাখা খুব জরুরি।