গত শতকের পঞ্চাশের দশকে দু-একটি প্রবন্ধ লিখেই পাঠকদের যারপরনাই বিচলিত করেছিলেন শিবনারায়ণ রায় এবং তা হয়েছিল তাঁর চিন্তার স্বাতন্ত্র্য আর রবীন্দ্রনাথকে বিষয় করে লেখার কারণেই। যিনি নানা লক্ষ্যে ও উপলক্ষে বাঙালিদের চেতনায় আসন গেড়ে বসে আছেন, তিনি তাঁর সাহিত্যজীবনে কী করেছেন, কী করতে পারেননি বা কী করতে পারতেন, তার আলোচনা গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না পাঠকেরা। প্রতিক্রিয়া কী রকম হয়েছিল, তার কিছু আলোচনা পরবর্তী সময়ে অনেকের লেখায় এসেছে, কিন্তু সেই সময়ে শান্তিনিকেতনের ছাত্রী গৌরী আইয়ুবের লেখায় রয়েছে তার বিশ্বস্ত বর্ণনা:
‘ঐ দুটি ঢিল শান্তিনিকেতনের নিস্তরঙ্গ ডোবায় পড়ে বেশ বড় বড় ঢেউ তুলেছিল। ছাত্র ও শিক্ষক মহলে খুব উত্তেজনা হয়েছিল। তাঁর প্রবন্ধের বাক্য মুখে মুখে ফিরছিল। বলাই বাহুল্য যে যতই মুখ থেকে মুখান্তরে যাচ্ছিল, ততই মূল থেকে তার আকৃতি পাল্টে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছিল।’
এই মন্তব্যের শেষবাক্যে একটুখানি অন্য রকমের স্বর যে পাওয়া যাচ্ছে, ধারণা করি, তা আসলে পরবর্তীকালে তাঁর শিবনারায়ণ রায়ের প্রবন্ধ-পাঠেরই ফল। কারণ, পরে যখন তিনি ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ পড়লেন, তাঁর কাছে—মুখে মুখে যতটা শুনেছিলেন—ততটা ‘মারাত্মক’ মনে হয়নি। কিন্তু তখনো তিনি ছিলেন কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত, কিছুটা বিস্মিতও। কারণ, এর আগে শিবনারায়ণ রায়ের সঙ্গে যখন তাঁর দেখা হয় তখন তাঁকে দেখে ভালো তো লেগেছিলই, কাঁধে ‘শানব্যাগ’ থাকায় ‘প্রায় শান্তিনিকেতনী রোমান্টিক ধরনের’ মানুষও মনে হয়েছিল। তার কিছুদিন বাদে, আবু সয়ীদ আইয়ুবের সঙ্গে সংসার শুরু করার কয়েক দিন পর একদিন এই মানুষটিই কোনো প্রথাদ্রোহী লেখকের বই না দিয়ে তাঁকে সলজ্জ ভঙ্গিতে একগুচ্ছ লাল ও হলুদ গ্ল্যাডিওলাস উপহার দিয়েছিলেন। এভাবে, পারিবারিকভাবে একাত্ম হয়ে যাওয়ার পরে গৌরকিশোর ঘোষও তাঁকে দেখেছিলেন পরিবারাশ্রয়ী, পত্নীপ্রেমী ও বন্ধুবৎসলরূপে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখার আগেই তাঁর সঙ্গে যখন প্রথম দেখা হয়, তখন তিনি দেখেছিলেন, শিবনারায়ণ রায় কথা বলেন ‘চিবিয়ে চিবিয়ে’, হাঁটেন ‘ল্যাগব্যাগিয়ে’ কিন্তু ‘এই ঋজু মানুষটার মাথার উপরিভাগে কোঁকড়া কোঁকড়া চিরুনিভাঙা একরাশ চুল আর অন্তর্দেশে ক্ষুরধার প্রজ্ঞা, যা তার দুটি চোখে অবিরত উদ্ভাসিত।’ এই মানুষটিকে দেখে গৌরকিশোর ঘোষের যখন যাজ্ঞবল্ক্যের কথা মনে পড়ছে, তখনই তাঁর র্যাডিক্যাল বন্ধুদের বেশির ভাগই তাঁকে চিহ্নিত করছিল ‘দাম্ভিক’ হিসেবে। এই [অ]খ্যাতি অতিদ্রুত অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়েছিল।
১৯৫৬ সালে দেশ পত্রিকায় ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর, তখনই রবীন্দ্রবিরোধী হিসেবে তাঁর নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু তিনি কি মূলত রবীন্দ্রবিরোধী ছিলেন? একবাক্যে বলতে গেলে বলতে হয়, শিবনারায়ণ রবীন্দ্রবিরোধী ছিলেন না, তবে রবীন্দ্রনাথকে নিজের বোধবুদ্ধিমতো মূল্যায়ন করতে চেয়েছেন।
মনে রাখা জরুরি, তখন ১৯৪৬ সাল, এর এক বছর আগে, ১৯৪৫ সালে মাত্র ৪০ বছর বয়সে বেরিয়েছে শিবনারায়ণ রায়ের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘প্রেক্ষিত’, যা বাংলা সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা, যেটি পড়লে কিছুটা অন্তত বোঝা যাবে, কেন তিনি তখনই তার্কিক এবং কেন তাঁকে দাম্ভিক বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। কিন্তু বইটি প্রত্যাশিত পাঠক পাওয়া দূরের কথা, সম্ভাব্য পাঠক পেয়েছে বলেও মনে হয় না। তারপর মাঝখানে আরও নানা রকম লেখা ছাপা হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রতি সবার দৃষ্টি পড়ল ১৯৫৬ সালে দেশ পত্রিকায় ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর, তখনই রবীন্দ্রবিরোধী হিসেবে তাঁর নাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল।
কিন্তু তিনি কি মূলত রবীন্দ্রবিরোধী ছিলেন? একবাক্যে বলতে গেলে বলতে হয়, শিবনারায়ণ রবীন্দ্রবিরোধী ছিলেন না, তবে রবীন্দ্রনাথকে নিজের বোধবুদ্ধিমতো মূল্যায়ন করতে চেয়েছেন। আমরা দেখব শিবনারায়ণ রায় তাঁর লেখায় সব সময়ই আত্মবিশ্বাসী এবং তাতে আত্মভাবনার এমনই এক প্রবল চাপ থাকে, যা সাধারণ মানের যুক্তিবাদীর পক্ষে সহ্য করা কঠিন। তাঁর লেখা পড়ার সময় স-চেতন ও স-তর্ক থাকতে হয়, ধারণা করি, আত্মবিশ্বাসী মনোভাব থাকা সত্ত্বেও শুরু থেকেই এ রকম তর্ক প্রত্যাশা করেই নানা লেখায় তাঁর মত প্রকাশ করে গেছেন শিবনারায়ণ। প্রথম বইয়ে যে শ্রেণি-ঐক্যের কথা বলেছিলেন, কেউ তার উল্লেখযোগ্য বিরোধিতা না করলেও পরে তিনি নিজেই সেই চিন্তা থেকে সরে এসেছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় বই ‘সাহিত্য চিন্তা’র অন্তর্ভুক্ত ‘প্লেটোর সাহিত্যবিচার’ প্রবন্ধে দেখিয়েছিলেন, সভ্যতার ইতিহাসে সমাজ কীভাবে ব্যক্তির অনন্য ভূমিকাকে খর্ব করে এবং ব্যক্তির আত্মবিকাশে সহযোগী না হয়ে আত্মবিলোপের কারণ হয়। এভাবে দেখা যায় ব্যক্তি তার স্বভাব অস্বীকার করে ‘সমাজনির্দিষ্ট ছাঁচে নিজেকে ঢালাই করার মধ্যে পরমার্থ খোঁজে।’ বোঝা যায় এমন ছাঁচে-ঢালাই-হয়ে-যাওয়া ‘ব্যক্তি’ শিবনারায়ণের অপছন্দ, তিনি সমাজে সেই বিকশিত ব্যক্তিকে চান, যে সমাজকে পুষ্ট ও গতিশীল করে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু কথা হলো, এই ব্যক্তির বিকাশের জন্য কি সমাজের ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় আছে? সমাজনিরপেক্ষ বিকশিত ব্যক্তির কথা চিন্তা করলে কিছুটা বংশধারা আর বাকিটা পূর্বধার্য [অলৌকিক] সিদ্ধান্তের কথাও ভাবতে হয়, যা তাঁর আদর্শের বিরোধী। আমরা মনে করি না তিনি তা সমর্থন করতেন। একটু মোটাদাগে চিন্তা করলে এবং ‘ব্যক্তি’ ও ‘সমাজ’-এর পরস্পরস্পর্শী নানা অভিব্যক্তির কথা মাথায় রাখলে মনে হবে দুই চিন্তার মধ্যে বড় রকমের কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু পার্থক্য আছে। সেটিকে তত্ত্বগতভাবে না ধরেও সাধারণভাবে দ্বান্দ্বিক বলেও চিহ্নিত করা যায়, তবু আমাদের মনে হয় না শিবনারায়ণ রায় এমন ভাবনার পক্ষপাতী। তাঁর আসল সমালোচনার জায়গা হলো, ব্যক্তির আত্মবিলোপকারী সমাজ-‘যন্ত্র’-এর ভয়াবহতা, এখানেই তাঁর চিন্তার পার্থক্য, একে তাঁর চিন্তার পরিবর্তন না বলে চিন্তার বিবর্তন বলেও ভাবা যেতে পারে, শিবনারায়ণও সে রকম ভাবতেন।
তিনি এই ধারণায় পৌঁছেছিলেন সাহিত্যিক ‘কৌতূহল’ ও তার অভিব্যক্তির কথা মাথায় রেখে। তিনি জানতেন, সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের চরিত্রগুলো ‘সামাজিক টাইপ’ নয়, ব্যক্তি হিসেবে এরা অনন্য, ন্যায় বা ঔচিত্যের ‘গজকাঠি’ দিয়ে তা মাপা যায় না। সমাজ-যন্ত্রের ভয়াবহতা আর এই ভাবনাই তাঁকে রবীন্দ্রচিন্তার কাছাকাছি নিয়ে যায়, যার সত্যতা পাওয়া যায় তাঁর বহুলপঠিত প্রবন্ধ ‘মৌমাছিতন্ত্র’-এর শুরুতে উদ্ধৃত রবীন্দ্রনাথের এই উক্তির মাধ্যমে :
‘লক্ষ লক্ষ বৎসর ধরে মৌমাছি যে-চাক তৈরি করে আসছে সেই চাক তৈরি করার একটানা ঝোঁক কিছুতেই সে কাটিয়ে উঠতে পারছে না। এতে করে তাদের চাক নিখুঁত-মতো তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তাদের অন্তঃকরণে এই চিরাভ্যাসের গণ্ডির মধ্যে বন্ধ হয়ে আছে, সে আপনাকে নানা দিকে মেলে দিতে পারছে না...’
তিনি দুজনের অমিল খোঁজার চেষ্টা করেছেন এবং বলেছেন এই দুজনের মধ্যে বিরোধ হলো ‘অস্তিত্ববাদীর সঙ্গে ভাববাদীর বিরোধ’। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের এই ভাববাদ মানুষের সমগ্র রূপ উদ্ঘাটনের বিরোধী, এ কারণে ঋষি, বিশ্বকবি ও গুরুদেব প্রভৃতির আড়ালে মানুষ রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস আমাদের অজানা, আর এ কারণে গ্যেটের মতো উৎকৃষ্ট রচনা লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
শিবনারায়ণ যে প্রসঙ্গ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধে বলতে চাইবেন, তা বোঝার জন্য এই উদ্ধৃতিই যথেষ্ট। সমাজের যে যান্ত্রিক দিকের কথা বলতে চান, তার জন্য রবীন্দ্রনাথের একাধিক নাটকের প্রসঙ্গও তোলা যায়, আর এই সূত্রে যে কেউ এই সিদ্ধান্তেও পৌঁছতে পারেন যে তিনি মূলত রবীন্দ্রবিরোধী ছিলেন কি না। ‘মৌমাছিতন্ত্র’-এ তো অবশ্যই, ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ প্রবন্ধটি পড়লেও বোঝা যায় এই দুজনের মিল খুঁজতে গিয়ে তাদের সৃষ্টিশীল প্রতিভা, যুক্তিবাদ ও স্বতঃসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছেন আর রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে বলেছেন, তিনি ছিলেন গ্যেটের মতো রেনেসাঁর উত্তরসাধক, শিক্ষিতদের ভৌগোলিকতার সীমা থেকে মুক্ত করে বৈশ্বিকতার বোধে উজ্জীবিত করেছিলেন এবং আধুনিক ভারতের, বিশেষত আধুনিক বাংলার, সাংস্কৃতিক উজ্জীবনে তাঁর একক দান অন্য সবার সমবেত দানের চেয়েও বেশি। এর চেয়ে উত্তম প্রশংসা বা স্বীকৃতি আর কী হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়, যেখানে তিনি দুজনের অমিল খোঁজার চেষ্টা করেছেন এবং বলেছেন এই দুজনের মধ্যে বিরোধ হলো ‘অস্তিত্ববাদীর সঙ্গে ভাববাদীর বিরোধ’। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের এই ভাববাদ মানুষের সমগ্র রূপ উদ্ঘাটনের বিরোধী, এ কারণে ঋষি, বিশ্বকবি ও গুরুদেব প্রভৃতির আড়ালে মানুষ রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস আমাদের অজানা, আর এ কারণে গ্যেটের মতো উৎকৃষ্ট রচনা লেখা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি।
যুক্তি থাকলে শিবনারায়ণ রায়ের এই মতের সমালোচনা করা যায়, তিনিও তা–ই চাইতেন, কিন্তু তাঁর লেখা ভালোভাবে না পড়ে এবং যোগ্যভাবে সমালোচনা না করে, দীর্ঘদিন ধরে শুনে শুনে, মুখে মুখে, বা লিখিতভাবে তার বিরুদ্ধাচরণ করাটা যেন একটা অভ্যাসেই দাঁড়িয়ে গেছে। ‘বাংলা সমালোচনার ইতিহাস’-এর লেখক অরুণকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন:
‘আধুনিক বাংলা সমালোচনা নব নব পথে আত্মপ্রকাশের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে। একটিমাত্র বিষয় বা একজন কবিকে নিয়ে বিরুদ্ধ মতবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ ধারা যাক, রবীন্দ্র-সাহিত্য। এ নিয়ে আজো তীব্র মতভেদের অন্ত নেই। কেউ রবীন্দ্রনাথকে বোদলেয়র বা র্যাবো-র সঙ্গে তুলনা করেছেন, কেউবা রিল্কে-র সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং তাদের তুলনায় নিচুস্তরের কবি বলে প্রমাণ করতে চাইছেন [দ্র. বুদ্ধদেব বসুর ‘সঙ্গ, নিঃসঙ্গতা, রবীন্দ্রনাথ’ এবং শিবনারায়ণ রায়ের ‘সাহিত্য চিন্তা’]।’
লক্ষ করা যেতে পারে, শেষ বাক্যটিতে আপত্তি তুলছেন অরুণকুমার মুখোপাধ্যায়, থাকতেই পারে, কিন্তু এখানে শিবনারায়ণ রায়ের লেখা না পড়েই মন্তব্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন এই সমালোচক। শিবনারায়ণ তাঁর সাহিত্য চিন্তা বইয়ে ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছিলেন কিন্তু এখানে গ্যেটের কোনো উল্লেখই নেই। যে প্রবন্ধ নিয়ে পাঠকদের এত এত আলোচনা, এ ছাড়া যিনি পরে আরও একাধিক প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথকে মুক্তভাবে মূল্যায়ন করে বাংলা সমালোচনা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন, তার জন্য বাংলা সমালোচনা সাহিত্য গ্রন্থের লেখক পৃথক একটি বাক্য ব্যয় করারও প্রয়োজন মনে করেননি। উপরিউক্ত প্রবন্ধ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক মন’, ‘পটুয়া রবি ঠাকুর ও চিত্রবিপ্লব’ এবং ‘চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের প্রবন্ধ তিনটি উল্লেখযোগ্য।
‘রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক মন’ প্রবন্ধে প্রথমেই রবীন্দ্রপূজা বিষয়ে আপত্তির কথা জানিয়েছিলেন, তাঁর মতে, তা এখন আড়ম্বর আর সংখ্যাধিক্যের দিক থেকে দুর্গাপূজাকে হার মানিয়ে সর্বজনীন রবীন্দ্রোৎসবে পরিণত হয়েছে। যাঁরা কোনো দিন রবীন্দ্র–রচনাবলীর পাতা উল্টে দেখেছেন কি না সন্দেহ, সেই সব মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, ব্যবসায়ী এবং শক্তিমান দলীয় মাতবরদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টা এবং খবরের কাগজে ছবিসহ সংবাদ ছাপানোর জন্য ‘তৈলনিষেক’-এর ব্যাপারটিকে তিনি রবীন্দ্রনাথের জন্য অপমানকর বলে মনে করেছেন। তিনি চান, একজন রবীন্দ্রানুরাগী রবীন্দ্রনাথকে পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তার বিচার করবে। রবীন্দ্রপ্রতিভায় ভারতের ঔপনিষদিক চিন্তার সঙ্গে রেনেসাঁ-পরবর্তী চিন্তার সম্মিলন ঘটেছে এবং এর আলোকেই তিনি সারা জীবন সাহিত্য রচনা করে গেছেন—এ কথা মোটের ওপর অনেকেই বলেছেন। এই প্রবন্ধে শিবনারায়ণ রায়ও প্রথমে সে কথা বলেছেন, কিন্তু কোনো প্রতিভার কৃতকর্মের স্বরূপ উন্মোচনের মধ্য দিয়েই শিবনারায়ণ রায়ের মতো যুগদর্শী চিন্তকের বক্তব্য শেষ হয় না, তিনি এর সঙ্গে লেখকের সমকালের যন্ত্রণা এবং তার পরকালের অর্থাৎ একালের বিবেচনা এবং কখনো কখনো চিরকালের অভিব্যক্তির প্রসঙ্গও উত্থাপনের উচ্চাশা পোষণ করেন।
রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে বিশ্বসংকট যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল, সেই পরিস্থিতিতে শিবনারায়ণ রায়ের আশা ছিল রবীন্দ্রসাহিত্য সেই যুগযন্ত্রণার মোকাবিলা করবে। তাঁর এই আশা যে একজন শুভার্থীর আশা, তার প্রমাণ হলো, তিনি প্রথমে এই যুগ-সংকট ধারণের সূত্রে ত্রিশের দশকের সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, ধূর্জটিপ্রসাদ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ করেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানিয়ে দেন যে রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভা না থাকায় তারা সে ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি।
তিনি লক্ষ করেছিলেন, তাঁর গান এবং কবিতার বড় একটি অংশে সুস্পষ্টভাবে এবং গল্প, উপন্যাস, নাটক এবং বহু প্রবন্ধে পরোক্ষভাবে ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের ছাপ পড়েছে এবং এ ক্ষেত্রে স্বীকারও করেছেন, বিশ্বাসের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি মজবুত না হলেও এই ঐতিহ্যের ফলপ্রসূ প্রভাবে ‘প্রকৃতিপ্রেম, করুণা, ধৈর্য, প্রীতি, সৌন্দর্যচেতনা, নির্ভীকতা ইত্যাদি নানা মানবীয় সদ্গুণের বিকাশে সাহায্য করে।’ তাই যদি হয়, তবে এই সদর্থক ঐতিহ্যচেতনার বিকাশে আপত্তি কোথায়? আমাদের ধারণা, শিবনারায়ণ রায়ের আপত্তি এখানেই যে তিনি নিজে সে রকম কাঠামোয় চিন্তা করেন না এবং তা তাঁর লালিত আদর্শের বিরোধী।
অন্যদিকে রেনেসাঁর প্রভাবে বা সেই চেতনার আলোকে রবীন্দ্রনাথ যা কিছু লিখেছেন, তার প্রতি শিবনারায়ণের বিশেষ পক্ষপাত একাধিক প্রবন্ধে রয়েছে। সত্যনিষ্ঠার প্রয়োজনে গান্ধীর বিজ্ঞানবিমুখ ভাবনার প্রতিবাদ, তাঁর ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘ল্যাবরেটরী’ এবং ‘নামঞ্জুর গল্প’-এর প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়েছেন; তিনি এটাও স্বীকার করেছেন যে এই রবীন্দ্রনাথ আমাদেরকে ভৌগোলিকতার সংস্কারবদ্ধ ধারণা থেকে মুক্ত করে বিশ্বের দিকে তাকানোর প্রেরণা দিয়েছেন। তাহলে এ ক্ষেত্রে সমালোচনার স্থান কোথায়?
এই জায়গায় রবীন্দ্রনাথের মতো বড় প্রতিভার কাছে তাঁর আশা ছিল একটু বেশি। রবীন্দ্রনাথের শেষজীবনে বিশ্বসংকট যে পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল, সেই পরিস্থিতিতে শিবনারায়ণ রায়ের আশা ছিল রবীন্দ্রসাহিত্য সেই যুগযন্ত্রণার মোকাবিলা করবে। তাঁর এই আশা যে একজন শুভার্থীর আশা, তার প্রমাণ হলো, তিনি প্রথমে এই যুগ-সংকট ধারণের সূত্রে ত্রিশের দশকের সুধীন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে, ধূর্জটিপ্রসাদ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উল্লেখ করেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানিয়ে দেন যে রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভা না থাকায় তারা সে ক্ষেত্রে সফল হতে পারেননি। অর্থাৎ মোটের ওপর তিনি যেন এই কথাটাই বলতে চান যে যথার্থভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ের সংকট ধারণের জন্য যে রকম প্রতিভা থাকা দরকার, তা রবীন্দ্রনাথেরই ছিল। তাঁর এই অভিব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেও বলব, তিনি রবীন্দ্রনাথের কাছে যেভাবে, বা যা কিছু আশা করেছেন, তাতে অনেক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ সেই অত্যাশার ভারে আক্রান্ত। লক্ষ করলে দেখব এ ক্ষেত্রে শিবনারায়ণ রায় অধিক মাত্রায় মন্তব্যধর্মী এবং তা করতে গিয়ে বৃহৎ প্রতিভার বিপুল রচনাবলীর দিকে তাঁর দৃষ্টি পড়েছে কম, বিচিত্র ভাবনার প্রবন্ধগুলোও বিবেচনায় এনেছেন বলেও মনে হয় না, এমনকি এ ক্ষেত্রে ‘সভ্যতার সংকট’-এর মতো মর্মান্তিক ও দিগ্দর্শী প্রবন্ধও যে কেন আলোচিত হয়নি, তা–ও কিছুটা বিস্ময় জাগায়। রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর মতো করে নিজের বিবেচনা অনুযায়ী যুগ–সংকটের মোকাবিলা করেছিলেন, সে বিষয়টা বিবেচনায় আনেননি শিবনারায়ণ রায়। সে কারণে রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটেকে নিয়ে একের পর এক মন্তব্য করে যাওয়ার সময় তাঁর নিজের আগ্রহের বিষয়ের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের সময় ও সমাজ-পটভূমি যে ভিন্ন এবং তাঁরা যে দুই ঐতিহ্যের প্রতিনিধি এ কথা মাথায় রাখেননি। গ্যেটের আত্মজীবনীতে আমরা দেখি তাঁর জন্মের পর ঠাকুরমার মৃত্যুর পর পুরোনো বাড়ি ভেঙে নতুন বাড়ি তোলা হয়, সেখানে প্রাচীন শিল্পীদের চিত্রকর্মের পাশাপাশি সমকালের চিত্রশিল্পীদের ছবিও টাঙানো হয়। তাঁর বাবা বলতেন, শিল্পসাহিত্য বা যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রে প্রাচীন বলেই যে তা শ্রেষ্ঠ হবে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। ধর্ম বিষয়ে গ্যেটে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, তিনি প্রকৃতির মধ্যে ঈশ্বরকে খুঁজবেন এবং সেই ঈশ্বরকেই খুঁজবেন, যিনি গোটা দুনিয়ার স্রষ্টা ও নিয়ন্তা, যার মধ্যে ক্রোধের প্রবলতা নেই, শুধু অশেষ সৌন্দর্য, যে সৌন্দর্যের স্রোতে সতত সর্বত্র ক্রিয়াশীল। রবীন্দ্রনাথের লেখায়ও তাঁর বাড়ির আসবাব বদলের পাশাপাশি চিন্তার পরিবর্তনের কথা আছে, পরিবারের চিত্রকলাপ্রীতিও রয়েছে, কিছু ভিন্নতার কথা বাদ দিলে আছে ঈশ্বর সম্পর্কেও চিন্তার সাযুজ্য। কিন্তু এরপরও এই দুই লেখকের মধ্যে আরও লক্ষ্যযোগ্য পার্থক্য যে রয়ে গেছে, তা বোঝার জন্য রবীন্দ্রনাথের ‘গ্যেটে ও তাঁর প্রণয়িনীগণ’ প্রবন্ধটিই যথেষ্ট।
জর্মান-সাহিত্যের ‘অহংকার’, ‘অলংকার’, ‘অদ্বিতীয়রূপে সূক্ষ্মদর্শী ও বহুদর্শী’ প্রভৃতি বলে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধ শুরু করেছেন ঠিকই, কিন্তু গ্যেটের প্রেমকাহিনি বলার সময় স্থানে স্থানে এ কথাটিও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে এ-জাতীয় প্রেমে তাঁর কৌতূহল থাকলেও আগ্রহ নেই। ১৫ বছর থেকে শুরু করে আমৃত্যু একজনের পর আরেকজনকে ভালোবেসে গেছেন গ্যেটে কিন্তু বিয়াত্রিচে বা লরার মতো একজন ‘প্রণয়িনী’র নামও তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে পারলেন না, তার কারণ গ্যেটের প্রেম পার্থিব অর্থাৎ সাধারণ আর দান্তে ও পিত্রার্কার প্রেম হলো প্রেমের আদর্শ। গ্যেটের স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন, প্রেম নিয়ে হৃদয়ে আঘাত লাগলে তিনি কীভাবে নাটক লিখে তা থেকে রেহাই পেতেন এবং তিনি ততটুকুই ভালোবাসতেন যতটুকু ভালোবাসলে কোনো আশঙ্কা নেই। রবীন্দ্রনাথের এসব বর্ণনার একাধিক জায়গায় রয়েছে বিদ্রূপের ভাব: ‘লেখাও শেষ হইল আর তাঁহার প্রেমও শেষ হইল। এখন তিনি আবার নূতন পথে যাইবার বল পাইলেন।’...‘নূতন পথে যাইতে তাঁহার বড় বিলম্ব হয় নাই। লিলি নামক ষোড়শবর্ষী বালিকার (আমাদের দেশে যুবতী) সহিত তাঁহার প্রণয় জন্মিল’। গ্যেটের প্রেম নিয়ে এই মনোভাবের বিষয়ে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে লেখা চিঠির এই অংশটি পড়লে:
‘আমরা যখন একসঙ্গে ছিলাম, আমরা প্রধানত শব্দ নিয়ে খেলা করতাম, পরস্পরকে স্পষ্ট করে চিনে নেবার আমরা যে সর্বোৎকৃষ্ট সুযোগ পেয়েছিলাম হেলায় তাকে অবহেলা করেছি।... যখন ছোট্ট বাসাটি আকাশের হিংসুটে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে চায়—এ রকম বিন্দুমাত্র কোনো সম্ভাবনাতেও আমার মন পরিযায়ী পাখির মতো কোনো সুদূরের পানে ধাবিত হয়।’
এ হলো রুচি ও ঐতিহ্যের কিংবা দুই স্থানের বা দুই আদর্শের পার্থক্য। শিবনারায়ণ রায়ের মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী সমালোচক হয়তো এই দুই ঐতিহ্যের কোনোটিকেই একবাক্যে মেনে নেবেন না, কিন্তু এ ক্ষেত্রে তিনি পক্ষপাত দেখিয়েছেন গ্যেটের অকপট দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি এবং আশ্চর্যের বিষয় এই যে তিনি এই দুজনকে নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করার সময় একবারের জন্য রবীন্দ্রনাথের ‘গ্যেটে ও তাঁর প্রণয়িনীগণ’ প্রবন্ধের উল্লেখ কোথাও করেননি। তিনি তাঁর পঠিত বিশ্বসাহিত্য, প্রধানত গ্যেটের সাহিত্যে মুক্তচিন্তার দৃষ্টান্ত দেখে মুগ্ধ হয়েছেন এবং তারই আলোকে রবীন্দ্রনাথকে মূল্যায়ন করেছেন। শিবনারায়ণ জানতেন, সৃজনশীল সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ মূলত ভারতীয় ঐতিহ্যের অধিকারী আর এ ক্ষেত্রে তাঁর আশা ও আদর্শ ভিন্ন ছিল বলে তার সমালোচনা করেছেন। এ কথার সত্যতা মিলবে তাঁর ‘পটুয়া রবি ঠাকুর ও চিত্রবিপ্লব’ প্রবন্ধে।
‘বিশ্বভারতী-শান্তিনিকেতনের গুরুদেব এবং ভারতাত্মার প্রতিনিধি ও প্রবক্তা’রূপে তাঁর আবির্ভাব, যা, শিবনারায়ণ রায়ের মতে, রবীন্দ্রনাথের কাছেই একসময় ‘গুরুভার’ হয়ে উঠেছিল। এ কথার পক্ষে উদ্ধৃত করেন রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য: ‘আছি বার্লিনে—বড়োলোক সেজে বড়ো কথা কথা বলতে হবে—বড়ো খ্যাতির বোঝা বয়ে চলতে হবে দিনের পর দিন’।
‘ভাবুকতা’র ক্ষেত্রে রামমোহন রায়, কবিতার ক্ষেত্রে মাইকেল মধুসূদন এবং কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে বঙ্কিম যে অবদান রেখেছেন, সার্বভৌম প্রতিভার অধিকারী হিসেবে সমগ্র সাহিত্যক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কাছে তাই আশা করেছিলেন শিবনারায়ণ রায়। তাঁর সেই আশা পূরণ হয়নি, তাঁর মতে, স্বদেশি হিন্দু সংস্কৃতিপরম্পরাকে রবীন্দ্রনাথ উপরিউক্ত তিনজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু কথা হলো, হিন্দু সংস্কৃতি বলতে রবীন্দ্রনাথ যা ভাবতেন, তা কি তাঁর সাহিত্যচর্চার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল? আর রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনাবলি সম্পর্কেও কি এ কথা গ্রহণযোগ্য? হিন্দু জাতীয়তা, স্বাদেশিকতার উত্তরাধিকারের সঙ্গে বাংলার রেনেসাঁর চেতনাকে যুক্ত করে ভারতবর্ষের প্রকৃত সার্থকতার পথ যেভাবে খুঁজেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাকে বিশ শতকের ‘অমূল্য ভাবসম্পদ’রূপে চিহ্নিত করেছিলেন কাজী আবদুল ওদুদ। রবীন্দ্রজীবনের শুরুর দিকে স্বল্পকালীন আবিষ্টতার কথা বাদ দিলে পরবর্তী সময়ের আলোচনায় আচারপ্রধান হিন্দুসমাজের সমালোচনার পাশাপাশি তার সহিষ্ণু-গ্রহিষ্ণু ঐতিহ্যের যে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন, তা অস্বীকার করতে হলে আমাদের রবীন্দ্র-প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিক আলোচনা করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ নানা উপলক্ষে এই কথাগুলো বললেও বিষয়টি পরে তাত্ত্বিক রূপ পেয়েছে ক্ষিতিমোহন সেনের ‘হিন্দুধর্ম’ গ্রন্থে। বইটি সম্পর্কে অমর্ত্য সেন লিখেছিলেন, নানা ধর্মীয় যুক্তি উপস্থাপন করে ক্ষিতিমোহন স্পষ্টভাবে দেখান, হিন্দুধর্ম বহুবিধ ধর্মবিশ্বাসকে অনুমোদন করে, তার ‘মতাদর্শের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হলো এক সর্বব্যাপী উদারতা। তিনি এটিকে বিশ্বের চিন্তাজগতে হিন্দুধর্মের একটি মননগত উপাদানরূপে চিহ্নিত করেন’। ব্রাহ্মমতের অনুসারী রবীন্দ্রনাথ এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিই লালন করেছিলেন, তবে সাহিত্যের নানা মাধ্যমে কাজ করার সময় তার নিজের বিচার-বোধ অনুযায়ী প্রেরণা ও উপাদান নিয়েছেন এবং অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে শিবনারায়ণ ধরেই নিয়েছিলেন যে সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের কাছে তাঁর যা আশা ছিল, তা পূরণ না হওয়ার কারণ হলো হিন্দুসংস্কৃতির প্রতি তাঁর অত্যধিক গুরুত্বারোপ।
এ প্রবন্ধে আরেকটি বদ্ধতার কথাও বলেছিলেন, তা হলো ‘বিশ্বভারতী-শান্তিনিকেতনের গুরুদেব এবং ভারতাত্মার প্রতিনিধি ও প্রবক্তা’রূপে তাঁর আবির্ভাব, যা, শিবনারায়ণ রায়ের মতে, রবীন্দ্রনাথের কাছেই একসময় ‘গুরুভার’ হয়ে উঠেছিল। এ কথার পক্ষে উদ্ধৃত করেন রবীন্দ্রনাথের এই মন্তব্য: ‘আছি বার্লিনে—বড়োলোক সেজে বড়ো কথা কথা বলতে হবে—বড়ো খ্যাতির বোঝা বয়ে চলতে হবে দিনের পর দিন’। এই পরিপ্রেক্ষিতে একান্ত ‘নিভৃতি’র, ‘গোপন ভাষার’ এবং বাণীবিতরণের দায় থেকে মুক্ত হয়ে নিজের নিরুদ্ধ অস্তিত্বকে মেলে দিয়ে স্বয়ংসিদ্ধ অভিব্যক্তি প্রকাশের দরকার হয়ে পড়েছিল রবীন্দ্রনাথের, এই অবস্থাই তাকে অপ্রস্তুতরূপেই ক্রমশ চিত্রকলায় মগ্ন করে তুলল। শিবনারায়ণ রায় লিখলেন:
‘গুরুদেবি জোব্বা কখনও-সখনও খুলে ফেলে, ভারতীয় ঐতিহ্যকে বিশ্বের দরবারে ব্যাখ্যা করবার দায়িত্ব মাঝেমধ্যে বিস্মৃত হয়ে, নিজের তৈরি জীবনদেবতার আদলে নিজেকে রচনার দুঃসহ কর্তব্য সাময়িকভাবে সরিয়ে রেখে,... শৈশবের গরুত্মতী কল্পনায় ফিরে যাওয়া, নির্জ্ঞানের স্রোতে আপনাকে ভাসিয়ে দেওয়া, অপরনিরপেক্ষ নিরভিমান একান্ত কোনও সান্দ্র ভাষায় নিজের নিরুদ্ধ আবেগ ও কামনাকে প্রকাশ করা—ঘনায়মান অন্ধকারে এই প্রয়োজন তীব্রতর হয়েছিল।’
গত শতকের আশির দশকের শুরুতে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ হয়ে আসার পরে বিচিত্র রকম ছবি দেখার যে অভিজ্ঞতা হয়, তার ওপর ভিত্তি করে ১৯৮৬ সালে উপরিউক্ত প্রবন্ধটি লেখেন শিবনারায়ণ রায়। এটি পড়লে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি ঠিক কী আশা করেছিলেন। তাঁর ধারণা, ‘বিদ্যুন্নিভ অভিমানিনী’ কাদম্বরী দেবীর আত্মহত্যা রবীন্দ্রনাথের জীবনে যে স্থায়ী বেদনা ও গ্লানির ছাপ রেখে যায়, তা পরবর্তীকালে কোনো বিশেষ নারীর কামনা-উদ্বেল ভালোবাসার প্রতি তাঁকে আর আগ্রহী হতে দেয়নি। শিবনারায়ণ এ কথাটি মিথ্যা নয়, কারণ পরে রবীন্দ্র-জীবনের উল্লেখযোগ্য নারী ভিকতোরিয়া ওকাম্পো নিজেই জানিয়েছিলেন, তিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য চেয়েছিলেন, কিন্তু কবি সেই কমবয়সী জন্তুটিকে বশ করে আনেন। ১৯৮৬ সালে পৌঁছে যে কথাটি লিখলেন শিবনারায়ণ রায়, তা তার আকস্মিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তার অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ শীর্ষক প্রবন্ধ লেখারও এক বছর পূর্বে, ১৯৫৫ সালে, লিখেছিলেন ‘চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধটি। অনুমান করি এই প্রবন্ধের মূল বক্তব্যকে আরও যুক্তিশীল ও উদাহরণযোগে উপস্থাপন করার জন্যই পরে রবীন্দ্রনাথ ও গ্যেটেকে পাশাপাশি রেখে লিখতে হয়েছিল তাঁর বহুল আলোচিত এই প্রবন্ধটি।
‘চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে তিনি রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে আলোচনা করার ক্ষেত্রে যে দুটি বাধার উল্লেখ করেছিলেন তার প্রথমটি হচ্ছে ছবি সম্পর্কে কম লোকই পরিচিত, দ্বিতীয় বাধা এই কর্তাভজার দেশে রবীন্দ্রনাথের বিচারবিমুখ ভক্তিগদগদ পাঠকসমাজ। প্রথম বাধা সম্পর্কে বলার কিছু নেই, কিন্তু দ্বিতীয় বাধার পরিচয় তো এই প্রবন্ধ এবং তার এক বছর পরে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ ও গোয়েটে’ প্রবন্ধটি ছাপা হওয়ার পরেই পাওয়া গিয়েছিল। তারপরও তিনি আলোচনার পক্ষপাতী, কারণ তা না হলে দ্বন্দ্ববিরোধময় বহুমুখী রবীন্দ্রপ্রতিভার যাথার্থ্য ও গভীরতা অনালোচিত থেকে যাবে। তিনি জানেন, রবীন্দ্রনাথের ছবিতে যে অন্তর্বিরোধ রয়েছে, তা তাঁর প্রতিভার প্রধান লক্ষণ নয়, তবু দার্শনিক শব্দশিল্পী রবীন্দ্রনাথ আর চিত্রশিল্পী রবীন্দ্রনাথের মাঝখানে ‘একটা মস্ত চওড়া খাদের উপস্থিতি বেখাপ্পা চমকলাগানো ভাবেই যে প্রত্যক্ষ’ রয়েছে, তার প্রতি তিনি আকর্ষণ করতে চান, কারণ এর মধ্য দিয়ে তার অন্তর্জীবনের খোঁজ পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে কেউ না কেউ রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সত্তার পরিচয় তুলে ধরবেন।
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আরেকটি বক্তব্য আছে শিবনারায়ণ রায়ের আর সেটিই মূলত তাঁর প্রধান বক্তব্য এবং আফসোসের বিষয়, তা হলো ‘তিনি শেকসপীয়র, গোয়েটে ও ডস্টয়েভস্কির উত্তরসাধক নন’ এবং ‘তিনি মূলত শান্তির, প্রেমের, প্রত্যয়ের কবি।’ এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ নিজে তা-ই হতে চেয়েছিলেন কি না সেদিকে আগ্রহী না হয়ে তিনি তাঁর সাহিত্যসমগ্রে তাঁর বিপরীত চেতনার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গের খোঁজ করেছেন শিবনারায়ণ রায়, খুঁজে পেয়ে তার আলোচনা করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আরেকটি বক্তব্য আছে শিবনারায়ণ রায়ের আর সেটিই মূলত তাঁর প্রধান বক্তব্য এবং আফসোসের বিষয়, তা হলো ‘তিনি শেকসপীয়র, গোয়েটে ও ডস্টয়েভস্কির উত্তরসাধক নন’ এবং ‘তিনি মূলত শান্তির, প্রেমের, প্রত্যয়ের কবি।’ এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ নিজে তা-ই হতে চেয়েছিলেন কি না সেদিকে আগ্রহী না হয়ে তিনি তাঁর সাহিত্যসমগ্রে তাঁর বিপরীত চেতনার প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গের খোঁজ করেছেন শিবনারায়ণ রায়, খুঁজে পেয়ে তার আলোচনা করেছেন। চিত্রকলায় তার বিস্তর খোঁজ পেয়েছেন, সেখানে অবদমনের অপ্রস্তুত প্রকাশও লক্ষ করেছেন। পরে ছবিগুলোতে যা প্রকাশিত হলো তা কেন আগে সাহিত্যে সবিস্তার এল না, তার জন্য তিনি রবীন্দ্রনাথকেই দায়ী করেন, কারণ বাধা বা ভাবমূর্তি যা–ই বলি, তিনি নিজেই তা তৈরি করেছিলেন, যেটি পরে আর ভাঙতে পারলেন না। কৃষকের জীবনের শরিক হতে না পারার বাস্তবতা থেকে একসময় তিনি যে লিখেছিলেন, ‘আমার কবিতা, জানি আমি,/গেলেও বিচিত্র পথে হয়নি সে সর্বত্রগ্রামী’, তা, শিবনারায়ণ রায়ের মতে, ‘তাঁর সুরের প্রধান অপূর্ণতা নয়। যাঁদের সঙ্গে তাঁর অন্তরের পরিচয় আছে বলে তিনি মনে করেছিলেন, তাঁদের কথাও যে তিনি বহু ক্ষেত্রে সত্য করে বলতে পারলেন না, এটিই তাঁর সাহিত্যের সব চাইতে বড় ত্রুটি।’ এসব বলে শিবনারায়ণ মূলত এই কথাটাই বলত চান, রবীন্দ্রনাথের যে প্রতিভা ও ক্ষমতা ছিল, তিনি চাইলে সেই ত্রুটি অতিক্রম করতে পারতেন, যেভাবে প্রেমের মাধ্যমে গোয়েটে ‘ভাবের পাঁচিল, নীতির পাঁচিল, ভাষার পাঁচিল’ অতিক্রম করেছিলেন।
আবার প্রেমের মাধ্যমে পাঁচিল টপকানোর কথা যখন উঠল, তখন শিবনারায়ণের আলোচনায় না আসা গোয়েটের প্রেমিকাদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আলোচনার কথা তো মনে পড়বেই। পাঁচিল টপকানোর প্রসঙ্গ তিনি তুলেছেন এ কথা বলার জন্য যে, মানুষ হয়েও শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বলতে পারলেন না মানুষের কোনো কিছুই তাঁর অনাত্মীয় নয়। রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আরও বললেন, ‘মানবতন্ত্র এবং মানুষের মাঝখানে ভাববাদী শুচিতা দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।’ বিরাট রবীন্দ্র–রচনাবলী আর তাঁর শেষজীবনের নানা দৃষ্টান্ত সামনে নিয়েও এই মূল্যায়ন সেই সময়কার পাঠকদের বিচলিত করবারই কথা, তার পঁয়ষট্টি বছর পরে একালের পাঠকের কী প্রতিক্রিয়া হবে জানি না, তবে এ কথাটি নিশ্চয়ই মনে হবে যে, এর মধ্য দিয়ে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের অনুসারী শিবনারায়ণ রায় নিজেও আরেক রকম শুচিতায় আক্রান্ত হলেন। আগ্রহী পাঠক নব মানবতাবাদের ২২টি সূত্রের কোনো কোনো চিন্তার পরিচয়ও খুঁজে পেতে পারেন তাঁর এ সব মন্তব্যে। আসলে শিবনারায়ণ রায়ের প্রকৃতিই এমন যে, তিনি যখন তাঁর প্রথম বই প্রেক্ষিত রচনা করেন সেই সময়কার লেখায় মার্ক্সবাদী চিন্তার প্রভাব ছিল, পরে মানবতন্ত্রী হয়ে উঠলে তাঁর লেখায় তারও ব্যাপক পরিচয় পাওয়া গেল। তিনি যে সুনির্দিষ্ট ধারণার আলোকে বিচার করতে পছন্দ করতেন, তার সত্যতা পাওয়া যাবে গোলাম মুরশিদের ‘শিবনারায়ণ’ শিরোনামক লেখায়। শিবনারায়ণ রায়ের তত্ত্বাবধানে গবেষণা করার সময় সন্দর্ভের প্রথম অধ্যায় লিখে তাঁর কাছে জমা দেন গোলাম মুরশিদ, কিছুদিন পরে শিবনারায়ণ তাঁকে জানালেন, লেখায় প্রচুর তথ্য আছে কিন্তু তাঁর ‘সুনির্দিষ্ট ধারণাগত কাঠামোটা’ কী, তা তিনি বুঝতে পারছেন না, অর্থাৎ ‘ইট–পাথর দিয়ে’ তিনি কী গড়তে চাচ্ছেন, তা তাঁর কাছে ‘প্রত্যক্ষ’ নয়।
কিন্তু কথা হলো, সৃষ্টিশীল লেখকের পাঠবস্তু মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে সব সময় এ রকম পূর্বনির্দিষ্ট ধারণাকাঠামো থাকাটা জরুরি কি না। সাহিতের ইতিহাস তো বলে, গুরুত্বপূর্ণ পাঠবস্তু সব সময় তছনছ করে দেয় সব পূর্বধার্য ধারণাকে। এ দেশে অসংখ্য জাতিগোষ্ঠী আর অভিযাত্রীদের আগমনের পরে গড়ে ওঠা বিচিত্রমুখ ভারত-সংস্কৃতির প্রেরণা নিয়ে, নানা গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে সৃজন-মননে আমৃত্যু মগ্ন ছিলেন যে বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ, তাঁকে চিহ্নিত করার জন্য একজন মূল্যায়নকারী যদি কোনো নির্দিষ্ট চিন্তাকাঠামোর প্রতি অনুগত থাকেন, তাহলে সেই মূল্যায়ন খণ্ডিত হতে বাধ্য। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে শিবনারায়ণ যে মূল্যায়ন করেছেন, তার বহু মন্তব্যই এর দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।